রামু ট্র্যাজেডির আট বছর ও করোনাকালে প্রবারণা পূর্ণিমা
jugantor
রামু ট্র্যাজেডির আট বছর ও করোনাকালে প্রবারণা পূর্ণিমা

  ড. সুকোমল বড়ুয়া  

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আজ রামু ট্র্যাজেডির আট বছর পূর্ণ হল। ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বৌদ্ধদের শুভ মধুপূর্ণিমার আগের রাতে রামু-উখিয়া-পটিয়াবাসীর বৌদ্ধদের ওপর এ জঘন্যতম ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। এ ঘটনায় বিশ্বের নানা স্থানে, নানা রাষ্ট্রে, এমনকি জাতিসংঘের সদর দফতরের সামনে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। দল-মত, জাতি-গোষ্ঠী, সম্প্রদায় এবং নানা ধর্ম-বর্ণের মানুষ সেদিন বৌদ্ধদের পক্ষে এককাতারে দাঁড়িয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন।

সেদিন দেখেছি বিপন্ন মানবতার পক্ষে মানুষের সহমর্মিতা। সেই স্মৃতি বৌদ্ধরা এখনও ভোলেনি। আজ মরণঘাতী করোনার ভয়াবহতাও বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। রামু-উখিয়ার ঘটনা মানবসৃষ্ট হলেও কোভিড-১৯-এর ভয়াবহতা প্রাকৃতিক এবং তা বিশ্বমানবতার ওপর আঘাত হেনেছে।

উত্তম বড়ুয়া নামে এক যুবকের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যা একটি স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে রামু ট্র্যাজেডির সূত্রপাত। এটি ছিল সম্পূর্ণ পরিকল্পিত, যা পরবর্তী সময়ে সরকারি-বেসরকারি নানা তদন্তেও প্রমাণিত হয়েছে। অথচ এ মিথ্যা ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেদিন শত শত বছরের প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার, স্থাপনা ও প্যাগোডা আগুন জ্বালিয়ে ধ্বংস করা হয়েছিল।

আগুনের লেলিহান শিখার ধোঁয়ায় ওই জনপদ অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল। স্বর্ণ, ব্রোঞ্চ ও অষ্টধাতু নির্মিত বহু মূল্যবান বুদ্ধমূর্তি, প্রাচীন পুঁথি-পুস্তক ও পাণ্ডুলিপিসহ বৌদ্ধ কৃষ্টি-সংস্কৃতির বিভিন্ন অমূল্য সম্পদ সেদিন পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। মোট ২১টি গৃহ ভস্মীভূত হয়েছিল, যেখানে ছিল অতিদরিদ্র ও নিঃস্ব বৌদ্ধ পরিবারের বসতি।

অথচ রাত পোহালেই মধু নিয়ে বিহারে যাওয়ার কথা ছিল শত শত শিশু-কিশোর-কিশোরীসহ নানা বয়সের নারী-পুরুষের। এর মধ্য দিয়ে মধু দানোৎসবের আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি হতো। এ দান সারা দিন চলত, বুদ্ধপূজা হতো, পঞ্চশীল-অষ্টশীল নেয়া হতো। ভিক্ষুসংঘকে পিণ্ডদান করা হতো, প্রদীপ জ্বালানো হতো, সমবেত প্রার্থনা করা হতো, আরও কত কিছু করা হতো ধর্মীয় ভাবগম্ভীর পরিবেশে।

কিন্তু পূর্ণিমার রাতেই সব শেষ হয়ে গেল। নিমিষেই সবার আশা-আকাক্সক্ষা পুড়ে ছারখার হয়ে গেল। সবাই চারদিকে দেখছিল শুধু আগুনের লেলিহান শিখা। সেই রাতে ভয়ে অনেক নারী-পুরুষ ঘর ছেড়ে চলেও যায়। পরদিন সকালে অনেক শিশু তাদের মা-বাবাকে জিজ্ঞেস করছিল- মধু নিয়ে আমরা বিহারে যাব না? এ কথা শুনে তাদের চোখ দিয়ে শুধু জল ঝরেছিল, কোনো উত্তর দিতে পারেননি তারা।

সরকার এ ঘটনার বিচারের আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু প্রকৃত অপরাধীদের সাজা হয়নি আজও। জানা গেছে, সে সময় কক্সবাজার ও নিকটবর্তী অন্যান্য জায়গায় যারা প্রশাসনের উচ্চপদে ছিলেন, বর্তমানে তারা পদোন্নতি নিয়ে আছেন ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে। ভস্মীভূত সেই প্রাচীন বৌদ্ধ ঐতিহ্যগুলো দেশ-বিদেশের পর্যটকদের জন্য কত মূল্যবান ও আকর্ষণীয় ছিল, তা বলাই বাহুল্য। পরবর্তী সময়ে সরকার আধুনিক নির্মাণশৈলীতে অনেক কিছু তৈরি করে দিলেও ওই প্রাচীন ঐতিহ্য আর ফিরে পাওয়া যাবে না। তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের জন্যও দেশ-বিদেশ থেকে পণ্ডিত-গবেষকরা আর আসবেন না।

বৌদ্ধদের প্রশ্ন- সেই উত্তম বড়ুয়া এখন কোথায়? জীবিত না মৃত? ওই ঘটনার বিচার দৃশ্যমান হল না কেন? ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিচার ও শাস্তি হল না কেন? প্রশাসনের এত নজরদারি থাকতে সেদিন গানপাউডারসহ এত রাসায়নিক দ্রব্য কীভাবে, কোত্থেকে আনা হয়েছিল? গোটা কক্সবাজারের প্রশাসন সেদিন নীরব ছিল কেন? পরদিন আবার রামু, উখিয়া ও পটিয়ার কয়েকটি বিহারসহ ধর্মীয় স্থাপনা কীভাবে জ্বালিয়ে দেয়া হল?

আমরা বৌদ্ধরা কিংবা সংখ্যালঘুরা আর এ রকম বর্বরতা দেখতে চাই না। এ দেশ সবার। এ দেশকে অসাম্প্রদায়িক বলে দাবি করি আমরা। আমাদের প্রার্থনা, সবার শুভবুদ্ধির উদয় হোক। ‘ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার’- এ নীতি যেন আমরা সবাই পালন করি। আবারও বলতে চাই, হাজার বছরের আমাদের সম্প্রীতির বন্ধন যেন অটুট থাকে। বৌদ্ধ সহযায়ীদের রচিত আদি চর্যাপদের সুর যেন আবার বাংলার আকাশে বাতাসে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়।

আগামী ১ অক্টোবর শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা। এটি বৌদ্ধদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব। বিশ্বের সব বৌদ্ধ এ শুভ তিথিটি যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে উদযাপন করবে। প্রবারণা বৌদ্ধ ধর্মীয় বিধানে বিনয়ভিত্তিক একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্রতকর্ম ও অনুষ্ঠান। এর অপর নাম আশ্বিনী পূর্ণিমা। প্রবারণার এ আবেদন বৌদ্ধ ভিক্ষু জীবনে অধিক গুরুত্ব পেলেও বৌদ্ধ নর-নারী, উপাসক-উপাসিকাদের জীবনেও এর গুরুত্ব কম নয়।

শুধু ধ্যানের দিক থেকে নয়, আত্মশুদ্ধিতা, রিপু সংযম এবং আত্মোপলব্ধিতে এর অর্থবহ দিক আমাদের পূর্ণ মনুষ্যত্ব বিকাশে অনেক অবদান রাখে। এ উৎসবের আচার-অনুষ্ঠান তো আছেই, তার সঙ্গে আছে আমাদের আত্মশাসন ও আত্মবোধের মূল শিক্ষা। এ যেন এক জীবনবোধ তৈরির সর্বোত্তম শিক্ষা। কারণ শাস্ত্রে প্রবারণার অর্থে বলা হয়েছে, প্রকৃষ্টরূপে বরণ করা এবং নিষেধ করা।

বরণ করা অর্থ হল, বিশুদ্ধ বিনয়াচারে জীবনকে পরিচালিত করার উত্তম আদর্শ গ্রহণ করা। আর নিষেধ করা অর্থ হল, আদর্শবান ও ধর্মাচারের পরিপন্থী কর্মগুলো থেকে বিরত থাকা অথবা ওইসব কর্ম পরিহার করা। অতএব অর্থের দিক থেকে প্রবারণার গুরুত্ব ও মর্যাদা অতীব মহান ও তাৎপর্যমণ্ডিত। তাই বৌদ্ধ প্রবারণা উদযাপনে বলা হয়, পাপ ও অশুভকর্ম থেকে মুক্ত থাকার জন্যই সৎ এ ব্রতকর্মের সাধনা। সুন্দর জীবন গঠনের ক্ষেত্রে এবং সত্যনিষ্ঠ ধ্যান সমাধির ক্ষেত্রে এর কোনো বিকল্প নেই।

এবার এই শুভ তিথি এসেছে করোনাকালে, ভিন্ন এক পরিবেশে। তারপরও বৌদ্ধ এ প্রবারণার আবেদন সর্বজনীন, সর্বকল্যাণকর। ধর্মীয় ও সামাজিক একতা এবং সংঘশক্তি বৃদ্ধিতেও এটি একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বহন করে। তাই শাস্ত্রে বলা হয়েছে- সুখ সঙ্ঘসস সামগ্গি সামগ্গনং তপো সুখো। অর্থাৎ একত্রে বসবাস করা সুখকর, একত্রে মিলন সুখকর এবং একসঙ্গে তপস্যাজনিত সর্বতো কল্যাণসাধনও সুখকর।

অতএব চলুন আমরা আজ সবাই প্রবারণার এ শিক্ষায় নিজেদের গড়ে তুলি, শান্তি-শৃঙ্খলায় এবং দেশ, সমাজ ও জাতির উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে একত্রে কাজ করি এবং ঐক্যবদ্ধ হই। সব্বে সত্তা সুখিতা ভবন্তু- জগতের সব জীব সুখী হোক। বাংলাদেশ সমৃদ্ধ হোক। বিশ্বে শান্তি বিরাজ করুক।

অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া : সাবেক চেয়ারম্যান, পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সভাপতি, বিশ্ব বৌদ্ধ ফেডারেশন- বাংলাদেশ চ্যাপ্টার

[email protected]

রামু ট্র্যাজেডির আট বছর ও করোনাকালে প্রবারণা পূর্ণিমা

 ড. সুকোমল বড়ুয়া 
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আজ রামু ট্র্যাজেডির আট বছর পূর্ণ হল। ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বৌদ্ধদের শুভ মধুপূর্ণিমার আগের রাতে রামু-উখিয়া-পটিয়াবাসীর বৌদ্ধদের ওপর এ জঘন্যতম ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। এ ঘটনায় বিশ্বের নানা স্থানে, নানা রাষ্ট্রে, এমনকি জাতিসংঘের সদর দফতরের সামনে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। দল-মত, জাতি-গোষ্ঠী, সম্প্রদায় এবং নানা ধর্ম-বর্ণের মানুষ সেদিন বৌদ্ধদের পক্ষে এককাতারে দাঁড়িয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন।

সেদিন দেখেছি বিপন্ন মানবতার পক্ষে মানুষের সহমর্মিতা। সেই স্মৃতি বৌদ্ধরা এখনও ভোলেনি। আজ মরণঘাতী করোনার ভয়াবহতাও বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। রামু-উখিয়ার ঘটনা মানবসৃষ্ট হলেও কোভিড-১৯-এর ভয়াবহতা প্রাকৃতিক এবং তা বিশ্বমানবতার ওপর আঘাত হেনেছে।

উত্তম বড়ুয়া নামে এক যুবকের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যা একটি স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে রামু ট্র্যাজেডির সূত্রপাত। এটি ছিল সম্পূর্ণ পরিকল্পিত, যা পরবর্তী সময়ে সরকারি-বেসরকারি নানা তদন্তেও প্রমাণিত হয়েছে। অথচ এ মিথ্যা ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেদিন শত শত বছরের প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার, স্থাপনা ও প্যাগোডা আগুন জ্বালিয়ে ধ্বংস করা হয়েছিল।

আগুনের লেলিহান শিখার ধোঁয়ায় ওই জনপদ অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল। স্বর্ণ, ব্রোঞ্চ ও অষ্টধাতু নির্মিত বহু মূল্যবান বুদ্ধমূর্তি, প্রাচীন পুঁথি-পুস্তক ও পাণ্ডুলিপিসহ বৌদ্ধ কৃষ্টি-সংস্কৃতির বিভিন্ন অমূল্য সম্পদ সেদিন পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। মোট ২১টি গৃহ ভস্মীভূত হয়েছিল, যেখানে ছিল অতিদরিদ্র ও নিঃস্ব বৌদ্ধ পরিবারের বসতি।

অথচ রাত পোহালেই মধু নিয়ে বিহারে যাওয়ার কথা ছিল শত শত শিশু-কিশোর-কিশোরীসহ নানা বয়সের নারী-পুরুষের। এর মধ্য দিয়ে মধু দানোৎসবের আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি হতো। এ দান সারা দিন চলত, বুদ্ধপূজা হতো, পঞ্চশীল-অষ্টশীল নেয়া হতো। ভিক্ষুসংঘকে পিণ্ডদান করা হতো, প্রদীপ জ্বালানো হতো, সমবেত প্রার্থনা করা হতো, আরও কত কিছু করা হতো ধর্মীয় ভাবগম্ভীর পরিবেশে।

কিন্তু পূর্ণিমার রাতেই সব শেষ হয়ে গেল। নিমিষেই সবার আশা-আকাক্সক্ষা পুড়ে ছারখার হয়ে গেল। সবাই চারদিকে দেখছিল শুধু আগুনের লেলিহান শিখা। সেই রাতে ভয়ে অনেক নারী-পুরুষ ঘর ছেড়ে চলেও যায়। পরদিন সকালে অনেক শিশু তাদের মা-বাবাকে জিজ্ঞেস করছিল- মধু নিয়ে আমরা বিহারে যাব না? এ কথা শুনে তাদের চোখ দিয়ে শুধু জল ঝরেছিল, কোনো উত্তর দিতে পারেননি তারা।

সরকার এ ঘটনার বিচারের আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু প্রকৃত অপরাধীদের সাজা হয়নি আজও। জানা গেছে, সে সময় কক্সবাজার ও নিকটবর্তী অন্যান্য জায়গায় যারা প্রশাসনের উচ্চপদে ছিলেন, বর্তমানে তারা পদোন্নতি নিয়ে আছেন ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে। ভস্মীভূত সেই প্রাচীন বৌদ্ধ ঐতিহ্যগুলো দেশ-বিদেশের পর্যটকদের জন্য কত মূল্যবান ও আকর্ষণীয় ছিল, তা বলাই বাহুল্য। পরবর্তী সময়ে সরকার আধুনিক নির্মাণশৈলীতে অনেক কিছু তৈরি করে দিলেও ওই প্রাচীন ঐতিহ্য আর ফিরে পাওয়া যাবে না। তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের জন্যও দেশ-বিদেশ থেকে পণ্ডিত-গবেষকরা আর আসবেন না।

বৌদ্ধদের প্রশ্ন- সেই উত্তম বড়ুয়া এখন কোথায়? জীবিত না মৃত? ওই ঘটনার বিচার দৃশ্যমান হল না কেন? ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিচার ও শাস্তি হল না কেন? প্রশাসনের এত নজরদারি থাকতে সেদিন গানপাউডারসহ এত রাসায়নিক দ্রব্য কীভাবে, কোত্থেকে আনা হয়েছিল? গোটা কক্সবাজারের প্রশাসন সেদিন নীরব ছিল কেন? পরদিন আবার রামু, উখিয়া ও পটিয়ার কয়েকটি বিহারসহ ধর্মীয় স্থাপনা কীভাবে জ্বালিয়ে দেয়া হল?

আমরা বৌদ্ধরা কিংবা সংখ্যালঘুরা আর এ রকম বর্বরতা দেখতে চাই না। এ দেশ সবার। এ দেশকে অসাম্প্রদায়িক বলে দাবি করি আমরা। আমাদের প্রার্থনা, সবার শুভবুদ্ধির উদয় হোক। ‘ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার’- এ নীতি যেন আমরা সবাই পালন করি। আবারও বলতে চাই, হাজার বছরের আমাদের সম্প্রীতির বন্ধন যেন অটুট থাকে। বৌদ্ধ সহযায়ীদের রচিত আদি চর্যাপদের সুর যেন আবার বাংলার আকাশে বাতাসে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়।

আগামী ১ অক্টোবর শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা। এটি বৌদ্ধদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব। বিশ্বের সব বৌদ্ধ এ শুভ তিথিটি যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে উদযাপন করবে। প্রবারণা বৌদ্ধ ধর্মীয় বিধানে বিনয়ভিত্তিক একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্রতকর্ম ও অনুষ্ঠান। এর অপর নাম আশ্বিনী পূর্ণিমা। প্রবারণার এ আবেদন বৌদ্ধ ভিক্ষু জীবনে অধিক গুরুত্ব পেলেও বৌদ্ধ নর-নারী, উপাসক-উপাসিকাদের জীবনেও এর গুরুত্ব কম নয়।

শুধু ধ্যানের দিক থেকে নয়, আত্মশুদ্ধিতা, রিপু সংযম এবং আত্মোপলব্ধিতে এর অর্থবহ দিক আমাদের পূর্ণ মনুষ্যত্ব বিকাশে অনেক অবদান রাখে। এ উৎসবের আচার-অনুষ্ঠান তো আছেই, তার সঙ্গে আছে আমাদের আত্মশাসন ও আত্মবোধের মূল শিক্ষা। এ যেন এক জীবনবোধ তৈরির সর্বোত্তম শিক্ষা। কারণ শাস্ত্রে প্রবারণার অর্থে বলা হয়েছে, প্রকৃষ্টরূপে বরণ করা এবং নিষেধ করা।

বরণ করা অর্থ হল, বিশুদ্ধ বিনয়াচারে জীবনকে পরিচালিত করার উত্তম আদর্শ গ্রহণ করা। আর নিষেধ করা অর্থ হল, আদর্শবান ও ধর্মাচারের পরিপন্থী কর্মগুলো থেকে বিরত থাকা অথবা ওইসব কর্ম পরিহার করা। অতএব অর্থের দিক থেকে প্রবারণার গুরুত্ব ও মর্যাদা অতীব মহান ও তাৎপর্যমণ্ডিত। তাই বৌদ্ধ প্রবারণা উদযাপনে বলা হয়, পাপ ও অশুভকর্ম থেকে মুক্ত থাকার জন্যই সৎ এ ব্রতকর্মের সাধনা। সুন্দর জীবন গঠনের ক্ষেত্রে এবং সত্যনিষ্ঠ ধ্যান সমাধির ক্ষেত্রে এর কোনো বিকল্প নেই।

এবার এই শুভ তিথি এসেছে করোনাকালে, ভিন্ন এক পরিবেশে। তারপরও বৌদ্ধ এ প্রবারণার আবেদন সর্বজনীন, সর্বকল্যাণকর। ধর্মীয় ও সামাজিক একতা এবং সংঘশক্তি বৃদ্ধিতেও এটি একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বহন করে। তাই শাস্ত্রে বলা হয়েছে- সুখ সঙ্ঘসস সামগ্গি সামগ্গনং তপো সুখো। অর্থাৎ একত্রে বসবাস করা সুখকর, একত্রে মিলন সুখকর এবং একসঙ্গে তপস্যাজনিত সর্বতো কল্যাণসাধনও সুখকর।

অতএব চলুন আমরা আজ সবাই প্রবারণার এ শিক্ষায় নিজেদের গড়ে তুলি, শান্তি-শৃঙ্খলায় এবং দেশ, সমাজ ও জাতির উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে একত্রে কাজ করি এবং ঐক্যবদ্ধ হই। সব্বে সত্তা সুখিতা ভবন্তু- জগতের সব জীব সুখী হোক। বাংলাদেশ সমৃদ্ধ হোক। বিশ্বে শান্তি বিরাজ করুক।

অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া : সাবেক চেয়ারম্যান, পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সভাপতি, বিশ্ব বৌদ্ধ ফেডারেশন- বাংলাদেশ চ্যাপ্টার

[email protected]