ধর্ষণ : প্রতিরোধ ও প্রতিকার
jugantor
ধর্ষণ : প্রতিরোধ ও প্রতিকার

  মো. সোহেল রানা  

১৫ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হয়েছে। ধর্ষণ কমাতে এটি অবশ্যই ডেটারেন্ট বা প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করবে। তবে শাস্তির বিধান আর তার বাস্তবায়ন এক বিষয় নয়। ঘটনা সংঘটন থেকে শুরু করে বিচার পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় একাধিক পক্ষ জড়িত। সব পক্ষ ও পর্যায়ের সুসামঞ্জস্যপূর্ণ উদ্যোগ ও কার্যক্রমে অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত হতে পারে। পুলিশের প্রধান দায়িত্ব হল অভিযোগের তদন্ত করা।

পুলিশের কাছে ধর্ষণের যে কোনো অভিযোগ এলে পুলিশ সেটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে পেশাদারিত্বের সঙ্গে তদন্ত করে। তবে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মতো ঘটনা পুলিশ বা কাউকে না জানানোর একটি প্রবণতা আমাদের অনেকের মধ্যে রয়েছে।

পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদা, সংসার রক্ষা, ভবিষ্যতে মেয়ের বিয়ে দেয়া ইত্যাদি নানা বাস্তবতায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর পরিবার বিষয়টি প্রকাশ থেকে বিরত থাকে। আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে একটি দ্রুত ও সহজ সমাধানের দিকেও অনেকে হাঁটেন।

ধর্ষণের প্রতিটি মামলাকেই স্পেশাল কেস হিসেবে বিবেচনা করে জেলার এসপি এবং মেট্রো এলাকায় পুলিশের ডিসি প্রত্যক্ষভাবে সুপারভাইজ করে থাকেন। এছাড়া পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ সেল রয়েছে। তারা নিয়মিতভাবে মামলার কার্যক্রম মনিটর করে থাকে। তাই পুলিশি তদন্তে বিচ্যুতির সুযোগ অত্যন্ত কম। যথাযথ প্রক্রিয়ায় তদন্ত সম্পন্ন করেই বিচারের জন্য আদালতে প্রতিবেদন পাঠায় পুলিশ।

ধর্ষণের ঘটনা তদন্তে পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অজ্ঞানতাবশত বা সোশ্যাল ট্যাবুর কারণে ঘটনার পরপর গোসল করা, পোশাক-পরিচ্ছদ ধুয়ে ফেলা, ঘটনাস্থল পরিপাটি করে গুছিয়ে ফেলা ইত্যাদি কারণে এভিডেন্স নষ্ট হতে পারে।

আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঘটনার বেশ কয়েকদিন বা অনেকদিন পর থানায় অভিযোগ করা হয়। ততদিনে সব আলামত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এসব প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে কাজ করেই পুলিশকে পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ খুঁজে বের করে একটি তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করতে হয়।

ধর্ষণের অভিযোগের সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করার সুযোগ থাকে না। এদেশে হয়রানিমূলক অনেক মিথ্যা মামলাও হয়। প্রতিপক্ষকে সহজে ঘায়েল করতে কেউ কেউ এ অস্ত্রটি ব্যবহার করে থাকেন। পরিচিত কোনো মিডিয়াকর্মীর সহায়তায় সংবাদ প্রকাশ করে পুলিশের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। মিথ্যা মামলার কারণে মামলার সংখ্যা বেড়ে যায়।

তাই ধর্ষণের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের পাশাপাশি মিথ্যা অভিযোগের সংখ্যা কমানোও জরুরি। মিথ্যা মামলা করার অভিযোগে কয়েকদিন আগে এক নারীকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এভাবে ধর্ষকের শাস্তির পাশাপাশি মিথ্যা অভিযোগকারীর শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে মিথ্যা অভিযোগের সংখ্যাও কমে আসবে।

নারীর সমস্যা ও অভিযোগের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা দেখাতেই প্রশিক্ষণ দেয়া হয় প্রত্যেক পুলিশ সদস্যকে। নানামুখী কর্মশালা ও মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এ বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। তারপরও মাথায় রাখতে হবে, পুলিশ সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। এ সমাজেই তারা বেড়ে উঠেছেন। সমাজের ভালোমন্দ ও সংস্কার তাদেরও প্রভাবিত করতে পারে। তাই নারীর প্রতি আচরণে পরিবর্তন আনতে হলে পুরুষের মানসিকতাও পাল্টাতে হবে।

ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনায় সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে বড় শহরগুলোয় রয়েছে পুলিশের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার এবং ডিএমপিতে রয়েছে উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন। প্রতিটি থানায় চালু হয়েছে নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী সহায়তা ডেস্ক।

পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে রয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ সেল। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার ঘটনায় নারী ও শিশুর পাশে দাঁড়াচ্ছে পুলিশ। পুলিশের পেজগুলোয় করা হচ্ছে নানা ধরনের সচেতনতামূলক প্রচারণা।

এছাড়া আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ, বিপিএম (বার)-এর উদ্যোগে বিট পুলিশিং কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে পুলিশিং কার্যক্রম চালু করা হচ্ছে। এর ফলে দ্রুততম সময়ে প্রতিটি এলাকায় ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনা আরও দ্রুত জানতে পারবে পুলিশ। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়াও সহজ হবে।

পরিশেষে প্রতিকারের পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক আয়োজনও থাকা চাই। ধর্ষণ সামাজিক অবক্ষয় ও নৈতিক মূল্যবোধের অবনতির ইঙ্গিত দেয়। তাই যেসব মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পারিপার্শ্বিক বিষয়াদি ধর্ষণের প্রভাবক হিসেবে কাজ করে, সেসব বিষয় শনাক্ত করে তার উপযুক্ত প্রতিকারের ব্যবস্থাও করতে হবে। তা না হলে কেবল আইন প্রয়োগ করে এ সমস্যার সমাধান সহজ নয়।

মো. সোহেল রানা : এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স), বাংলাদেশ পুলিশ

ধর্ষণ : প্রতিরোধ ও প্রতিকার

 মো. সোহেল রানা 
১৫ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হয়েছে। ধর্ষণ কমাতে এটি অবশ্যই ডেটারেন্ট বা প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করবে। তবে শাস্তির বিধান আর তার বাস্তবায়ন এক বিষয় নয়। ঘটনা সংঘটন থেকে শুরু করে বিচার পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় একাধিক পক্ষ জড়িত। সব পক্ষ ও পর্যায়ের সুসামঞ্জস্যপূর্ণ উদ্যোগ ও কার্যক্রমে অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত হতে পারে। পুলিশের প্রধান দায়িত্ব হল অভিযোগের তদন্ত করা।

পুলিশের কাছে ধর্ষণের যে কোনো অভিযোগ এলে পুলিশ সেটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে পেশাদারিত্বের সঙ্গে তদন্ত করে। তবে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মতো ঘটনা পুলিশ বা কাউকে না জানানোর একটি প্রবণতা আমাদের অনেকের মধ্যে রয়েছে।

পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদা, সংসার রক্ষা, ভবিষ্যতে মেয়ের বিয়ে দেয়া ইত্যাদি নানা বাস্তবতায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর পরিবার বিষয়টি প্রকাশ থেকে বিরত থাকে। আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে একটি দ্রুত ও সহজ সমাধানের দিকেও অনেকে হাঁটেন।

ধর্ষণের প্রতিটি মামলাকেই স্পেশাল কেস হিসেবে বিবেচনা করে জেলার এসপি এবং মেট্রো এলাকায় পুলিশের ডিসি প্রত্যক্ষভাবে সুপারভাইজ করে থাকেন। এছাড়া পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ সেল রয়েছে। তারা নিয়মিতভাবে মামলার কার্যক্রম মনিটর করে থাকে। তাই পুলিশি তদন্তে বিচ্যুতির সুযোগ অত্যন্ত কম। যথাযথ প্রক্রিয়ায় তদন্ত সম্পন্ন করেই বিচারের জন্য আদালতে প্রতিবেদন পাঠায় পুলিশ।

ধর্ষণের ঘটনা তদন্তে পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অজ্ঞানতাবশত বা সোশ্যাল ট্যাবুর কারণে ঘটনার পরপর গোসল করা, পোশাক-পরিচ্ছদ ধুয়ে ফেলা, ঘটনাস্থল পরিপাটি করে গুছিয়ে ফেলা ইত্যাদি কারণে এভিডেন্স নষ্ট হতে পারে।

আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঘটনার বেশ কয়েকদিন বা অনেকদিন পর থানায় অভিযোগ করা হয়। ততদিনে সব আলামত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এসব প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে কাজ করেই পুলিশকে পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ খুঁজে বের করে একটি তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করতে হয়।

ধর্ষণের অভিযোগের সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করার সুযোগ থাকে না। এদেশে হয়রানিমূলক অনেক মিথ্যা মামলাও হয়। প্রতিপক্ষকে সহজে ঘায়েল করতে কেউ কেউ এ অস্ত্রটি ব্যবহার করে থাকেন। পরিচিত কোনো মিডিয়াকর্মীর সহায়তায় সংবাদ প্রকাশ করে পুলিশের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। মিথ্যা মামলার কারণে মামলার সংখ্যা বেড়ে যায়।

তাই ধর্ষণের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের পাশাপাশি মিথ্যা অভিযোগের সংখ্যা কমানোও জরুরি। মিথ্যা মামলা করার অভিযোগে কয়েকদিন আগে এক নারীকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এভাবে ধর্ষকের শাস্তির পাশাপাশি মিথ্যা অভিযোগকারীর শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে মিথ্যা অভিযোগের সংখ্যাও কমে আসবে।

নারীর সমস্যা ও অভিযোগের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা দেখাতেই প্রশিক্ষণ দেয়া হয় প্রত্যেক পুলিশ সদস্যকে। নানামুখী কর্মশালা ও মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এ বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। তারপরও মাথায় রাখতে হবে, পুলিশ সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। এ সমাজেই তারা বেড়ে উঠেছেন। সমাজের ভালোমন্দ ও সংস্কার তাদেরও প্রভাবিত করতে পারে। তাই নারীর প্রতি আচরণে পরিবর্তন আনতে হলে পুরুষের মানসিকতাও পাল্টাতে হবে।

ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনায় সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে বড় শহরগুলোয় রয়েছে পুলিশের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার এবং ডিএমপিতে রয়েছে উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন। প্রতিটি থানায় চালু হয়েছে নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী সহায়তা ডেস্ক।

পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে রয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ সেল। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার ঘটনায় নারী ও শিশুর পাশে দাঁড়াচ্ছে পুলিশ। পুলিশের পেজগুলোয় করা হচ্ছে নানা ধরনের সচেতনতামূলক প্রচারণা।

এছাড়া আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ, বিপিএম (বার)-এর উদ্যোগে বিট পুলিশিং কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে পুলিশিং কার্যক্রম চালু করা হচ্ছে। এর ফলে দ্রুততম সময়ে প্রতিটি এলাকায় ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনা আরও দ্রুত জানতে পারবে পুলিশ। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়াও সহজ হবে।

পরিশেষে প্রতিকারের পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক আয়োজনও থাকা চাই। ধর্ষণ সামাজিক অবক্ষয় ও নৈতিক মূল্যবোধের অবনতির ইঙ্গিত দেয়। তাই যেসব মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পারিপার্শ্বিক বিষয়াদি ধর্ষণের প্রভাবক হিসেবে কাজ করে, সেসব বিষয় শনাক্ত করে তার উপযুক্ত প্রতিকারের ব্যবস্থাও করতে হবে। তা না হলে কেবল আইন প্রয়োগ করে এ সমস্যার সমাধান সহজ নয়।

মো. সোহেল রানা : এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স), বাংলাদেশ পুলিশ