সমস্যার গভীরে যেতে হবে
jugantor
সমস্যার গভীরে যেতে হবে

  ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী  

১৭ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বব্যাপী করোনা সংক্রমণের দুঃসহ বিস্তার ও নির্দয় প্রাণসংহারে ক্ষতবিক্ষত মানবহৃদয় সম্ভাব্য দ্বিতীয় তরঙ্গের ভয়াবহতা নিয়ে চরম উদ্বেগে দিনানিপাত করছে। অদৃশ্য-অজানা আতঙ্ক-আশঙ্কায় বাংলাদেশের জনগণও ভয়ানক ভীতসন্ত্রস্ত। এরই মধ্যে করোনা মহামারীর চেয়েও বীভৎস দৃশ্যপট তৈরি করে ধর্ষণ-নারী নির্যাতন-নারী ও শিশুর প্রতি নৃশংসতা অপসংস্কৃতির নতুন রূপ পরিগ্রহ করেছে।

প্রতিনিয়ত কদাচার এসব সংবাদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিবেদনে বিপুল প্রচার লাভ করছে। যদিও নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা সুদীর্ঘ প্রাচীন অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে; তবে সাম্প্রতিক সময়ে এর পরিসংখ্যান কল্পনাতীতভাবে অতীতের সব কুৎসিত চিত্র পাল্টে দিয়েছে।

আমরা জানি, সংস্কৃতি মানুষের জীবনপ্রবাহ ও সভ্যতার আদর্শ নির্মাণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। আদি থেকে আধুনিক সময় পর্যন্ত সব নান্দনিক-সৃজনশীল-মননশীল এবং মানবকল্যাণ উপযোগী সামগ্রিক সৃষ্টকর্মই সংস্কৃতির অবগাহনে পরিশুদ্ধ। নৃবিজ্ঞানী টেইলারের মতে, ‘সমাজের সদস্য হিসেবে অর্জিত নানা আচরণ, যোগ্যতা এবং জ্ঞান, বিশ্বাস, শিল্পকলা, নীতি-আদর্শ, আইন, প্রথা ইত্যাদির এক যৌগিক সমন্বয় হল সংস্কৃতি।’

নৃবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে মানব সৃষ্ট সব কিছুকেই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর বিপরীতে রাষ্ট্রীয় আইনবিরোধী ও নীতি-নৈতিকতাবিবর্জিত অসামাজিক কার্যকলাপ অপসংস্কৃতির কুৎসিত উপাদান হিসেবে চিহ্নিত।

পুলিশ বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশে নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা ছিল যথাক্রমে ৫ হাজার ৪০০ ও ৮১৫টি। ২০১৮ সালে শিশু ও নারী ধর্ষণের মামলা ছিল যথাক্রমে ৭২৭ ও ৩ হাজার ৯০০টি। ২০১৯ সালে ধর্ষণের কারণে শিশু ও নারীর মৃত্যুবরণের সংখ্যা ছিল ১২ ও ২৬ জন। ২০১৮ সালে এটি ছিল নারী ২১ ও শিশু ১৪। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ২০১৯ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে ধর্ষণের ঘটনা আগের চেয়ে দ্বিগুণ বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৩৫৬ ও ৯০২ জন। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের ২০১৯ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি মাসে গড়ে ৮৪টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা এবং এক বছরে যৌন নির্যাতন বেড়েছে ৭০ শতাংশ। প্রকাশিত সবগুলো প্রতিবেদনে ২০১৮ সালের চেয়ে ২০১৯ সালে শিশু ধর্ষণ ৭৬.১ শতাংশ বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

বিজ্ঞজনের মতে, ব্যাপক জৈবিক-সাংস্কৃতিক-শ্রেণিগত ও নগরকেন্দ্রিক আর্থ-সামাজিক বৈষম্যের কারণে উন্নত দেশগুলোতে ধর্ষণের হার বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ সহিংসতার মূলে পুরুষদের জৈবিক তাড়নার চেয়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসঙ্গতি প্রণিধানযোগ্য। ধর্ষণের ঘটনা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রকাশ পায় না বা করা হয় না। মূলত সামাজিকভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিুআয়ের পেশাজীবী নারী-পোশাকশিল্প কর্মী-দরিদ্র স্বল্পশিক্ষিত ছাত্রী-গৃহবধূ-আদিবাসী নারী এ ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।

অনেকের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এ হার বৃদ্ধির পেছনে বহুলাংশে দায়ী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৮ সালে পুলিশের কাছে নথিবদ্ধ অপরাধীর মধ্যে ৩৩.৪ শতাংশ অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়। বিপরীতে বাংলাদেশে নারী ও শিশু ধর্ষণের ট্রাইব্যুনালে মাত্র ২.৬ শতাংশ মামলার চূড়ান্ত রায় হয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মামলা প্রক্রিয়া, তদন্ত, ধর্ষণের মেডিকেল রিপোর্ট ও কতিপয় আইনজীবীর অনাগ্রহ বা পক্ষপাতদুষ্টতার কারণে চূড়ান্ত রায়ে মামলা খারিজ হয়ে যায়। আইনগতভাবে তদন্ত কর্মকর্তাদের ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষে চূড়ান্ত চার্জশিট দেয়ার কথা থাকলেও পুলিশের অধিক দায়িত্বভার বা পক্ষপাতদুষ্টের কারণে অথবা প্রশাসনিক মহলের চাপে মামলার চার্জশিট যথাসময়ে দেয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে চার্জশিটে ইচ্ছা বা অনিচ্ছাকৃত দুর্বলতার কারণে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন।

চীনে ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। সংযুক্ত আরব আমিরাতে সাত দিনের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সৌদি আরবে ধর্ষণে জড়িত থাকলে প্রকাশ্যে শিরোñেদ। তবে তার আগে দোষীকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে দেয়া হয়। ফ্রান্সে ধর্ষণের শাস্তি ১৫ বছরের কারাদণ্ড। তবে ঘটনায় ক্ষতি ও নৃশংসতার বিচারে তা ৩০ বছর পর্যন্ত বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও হতে পারে। আফগানিস্তানে আদালত রায় দেয়ার চার দিনের মধ্যে অভিযুক্তকে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয় কিংবা ফাঁসি দেয়া হয়।

উত্তর কোরিয়ায় ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড় করিয়ে অপরাধীকে গুলি করে ঝাঁজরা করে দেয়া হয়। ইরানে শাস্তি মৃত্যুদণ্ড; ফাঁসি অথবা প্রকাশ্যে পাথর মেরে কার্যকর করা হয়। মিসরে ধর্ষণের শাস্তি ফাঁসি। ইসরাইলে দোষ প্রমাণ হলে ১৬ বছরের কারাদণ্ড। সে দেশে ধর্ষণের সংজ্ঞা কিছুটা বর্ধিত। অন্য যৌন নির্যাতনও এর অন্তর্ভুক্ত। রাশিয়ায় ধর্ষকের তিন থেকে ছয় বছরের কারাদণ্ড।

তবে পরিস্থিতি বিচারে তা ১০ বছর পর্যন্ত হতে পারে। যদি ধর্ষকের আচরণ অত্যন্ত নৃশংস হয়ে থাকে, তবে ২০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে স্টেট ও ফেডারেল আইন অনুযায়ী ধর্ষণের বিচার ভিন্ন। ফেডারেল আইন অনুযায়ী, দোষীর সাজা কয়েক বছরের কারাদণ্ড থেকে যাবজ্জীবনও হতে পারে। মঙ্গোলিয়ায় ধর্ষিতার পরিবারের হাত দিয়ে ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। নরওয়েতে সম্মতি ছাড়া যে কোনো যৌনতা ধর্ষণের মধ্যে পড়ে। নৃশংসতা অনুযায়ী দোষীর ৩ থেকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড হয়।

ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন রোধে আমাদের সমস্যার গভীরে যেতে হবে। ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, চুরি-ডাকাতি-রাহাজানি-ছিনতাই-জালিয়াতি-প্রতারণা, দুর্নীতি, অপকর্ম, সন্ত্রাস-অনিয়ম-জঙ্গিবাদ ইত্যাদি সমাজ ও আইনবহির্ভূত কার্যকলাপ অগ্রহণযোগ্য ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে এসব নির্মূল করা না গেলে সমাজ-জাতি-রাষ্ট্রের সব উন্নয়ন ও অর্জন ম্লান হয়ে যাবে এবং দেশ ধ্বংসের তলানিতে গিয়ে পৌঁছবে। ব্যক্তি-গোষ্ঠী-দলগত দোষারোপ নয়; অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে তার কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী : শিক্ষাবিদ; সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

সমস্যার গভীরে যেতে হবে

 ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী 
১৭ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বব্যাপী করোনা সংক্রমণের দুঃসহ বিস্তার ও নির্দয় প্রাণসংহারে ক্ষতবিক্ষত মানবহৃদয় সম্ভাব্য দ্বিতীয় তরঙ্গের ভয়াবহতা নিয়ে চরম উদ্বেগে দিনানিপাত করছে। অদৃশ্য-অজানা আতঙ্ক-আশঙ্কায় বাংলাদেশের জনগণও ভয়ানক ভীতসন্ত্রস্ত। এরই মধ্যে করোনা মহামারীর চেয়েও বীভৎস দৃশ্যপট তৈরি করে ধর্ষণ-নারী নির্যাতন-নারী ও শিশুর প্রতি নৃশংসতা অপসংস্কৃতির নতুন রূপ পরিগ্রহ করেছে।

প্রতিনিয়ত কদাচার এসব সংবাদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিবেদনে বিপুল প্রচার লাভ করছে। যদিও নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা সুদীর্ঘ প্রাচীন অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে; তবে সাম্প্রতিক সময়ে এর পরিসংখ্যান কল্পনাতীতভাবে অতীতের সব কুৎসিত চিত্র পাল্টে দিয়েছে।

আমরা জানি, সংস্কৃতি মানুষের জীবনপ্রবাহ ও সভ্যতার আদর্শ নির্মাণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। আদি থেকে আধুনিক সময় পর্যন্ত সব নান্দনিক-সৃজনশীল-মননশীল এবং মানবকল্যাণ উপযোগী সামগ্রিক সৃষ্টকর্মই সংস্কৃতির অবগাহনে পরিশুদ্ধ। নৃবিজ্ঞানী টেইলারের মতে, ‘সমাজের সদস্য হিসেবে অর্জিত নানা আচরণ, যোগ্যতা এবং জ্ঞান, বিশ্বাস, শিল্পকলা, নীতি-আদর্শ, আইন, প্রথা ইত্যাদির এক যৌগিক সমন্বয় হল সংস্কৃতি।’

নৃবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে মানব সৃষ্ট সব কিছুকেই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর বিপরীতে রাষ্ট্রীয় আইনবিরোধী ও নীতি-নৈতিকতাবিবর্জিত অসামাজিক কার্যকলাপ অপসংস্কৃতির কুৎসিত উপাদান হিসেবে চিহ্নিত।

পুলিশ বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশে নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা ছিল যথাক্রমে ৫ হাজার ৪০০ ও ৮১৫টি। ২০১৮ সালে শিশু ও নারী ধর্ষণের মামলা ছিল যথাক্রমে ৭২৭ ও ৩ হাজার ৯০০টি। ২০১৯ সালে ধর্ষণের কারণে শিশু ও নারীর মৃত্যুবরণের সংখ্যা ছিল ১২ ও ২৬ জন। ২০১৮ সালে এটি ছিল নারী ২১ ও শিশু ১৪। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ২০১৯ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে ধর্ষণের ঘটনা আগের চেয়ে দ্বিগুণ বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৩৫৬ ও ৯০২ জন। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের ২০১৯ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি মাসে গড়ে ৮৪টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা এবং এক বছরে যৌন নির্যাতন বেড়েছে ৭০ শতাংশ। প্রকাশিত সবগুলো প্রতিবেদনে ২০১৮ সালের চেয়ে ২০১৯ সালে শিশু ধর্ষণ ৭৬.১ শতাংশ বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

বিজ্ঞজনের মতে, ব্যাপক জৈবিক-সাংস্কৃতিক-শ্রেণিগত ও নগরকেন্দ্রিক আর্থ-সামাজিক বৈষম্যের কারণে উন্নত দেশগুলোতে ধর্ষণের হার বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ সহিংসতার মূলে পুরুষদের জৈবিক তাড়নার চেয়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসঙ্গতি প্রণিধানযোগ্য। ধর্ষণের ঘটনা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রকাশ পায় না বা করা হয় না। মূলত সামাজিকভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিুআয়ের পেশাজীবী নারী-পোশাকশিল্প কর্মী-দরিদ্র স্বল্পশিক্ষিত ছাত্রী-গৃহবধূ-আদিবাসী নারী এ ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।

অনেকের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এ হার বৃদ্ধির পেছনে বহুলাংশে দায়ী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৮ সালে পুলিশের কাছে নথিবদ্ধ অপরাধীর মধ্যে ৩৩.৪ শতাংশ অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়। বিপরীতে বাংলাদেশে নারী ও শিশু ধর্ষণের ট্রাইব্যুনালে মাত্র ২.৬ শতাংশ মামলার চূড়ান্ত রায় হয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মামলা প্রক্রিয়া, তদন্ত, ধর্ষণের মেডিকেল রিপোর্ট ও কতিপয় আইনজীবীর অনাগ্রহ বা পক্ষপাতদুষ্টতার কারণে চূড়ান্ত রায়ে মামলা খারিজ হয়ে যায়। আইনগতভাবে তদন্ত কর্মকর্তাদের ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষে চূড়ান্ত চার্জশিট দেয়ার কথা থাকলেও পুলিশের অধিক দায়িত্বভার বা পক্ষপাতদুষ্টের কারণে অথবা প্রশাসনিক মহলের চাপে মামলার চার্জশিট যথাসময়ে দেয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে চার্জশিটে ইচ্ছা বা অনিচ্ছাকৃত দুর্বলতার কারণে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন।

চীনে ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। সংযুক্ত আরব আমিরাতে সাত দিনের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সৌদি আরবে ধর্ষণে জড়িত থাকলে প্রকাশ্যে শিরোñেদ। তবে তার আগে দোষীকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে দেয়া হয়। ফ্রান্সে ধর্ষণের শাস্তি ১৫ বছরের কারাদণ্ড। তবে ঘটনায় ক্ষতি ও নৃশংসতার বিচারে তা ৩০ বছর পর্যন্ত বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও হতে পারে। আফগানিস্তানে আদালত রায় দেয়ার চার দিনের মধ্যে অভিযুক্তকে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয় কিংবা ফাঁসি দেয়া হয়।

উত্তর কোরিয়ায় ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড় করিয়ে অপরাধীকে গুলি করে ঝাঁজরা করে দেয়া হয়। ইরানে শাস্তি মৃত্যুদণ্ড; ফাঁসি অথবা প্রকাশ্যে পাথর মেরে কার্যকর করা হয়। মিসরে ধর্ষণের শাস্তি ফাঁসি। ইসরাইলে দোষ প্রমাণ হলে ১৬ বছরের কারাদণ্ড। সে দেশে ধর্ষণের সংজ্ঞা কিছুটা বর্ধিত। অন্য যৌন নির্যাতনও এর অন্তর্ভুক্ত। রাশিয়ায় ধর্ষকের তিন থেকে ছয় বছরের কারাদণ্ড।

তবে পরিস্থিতি বিচারে তা ১০ বছর পর্যন্ত হতে পারে। যদি ধর্ষকের আচরণ অত্যন্ত নৃশংস হয়ে থাকে, তবে ২০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে স্টেট ও ফেডারেল আইন অনুযায়ী ধর্ষণের বিচার ভিন্ন। ফেডারেল আইন অনুযায়ী, দোষীর সাজা কয়েক বছরের কারাদণ্ড থেকে যাবজ্জীবনও হতে পারে। মঙ্গোলিয়ায় ধর্ষিতার পরিবারের হাত দিয়ে ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। নরওয়েতে সম্মতি ছাড়া যে কোনো যৌনতা ধর্ষণের মধ্যে পড়ে। নৃশংসতা অনুযায়ী দোষীর ৩ থেকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড হয়।

ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন রোধে আমাদের সমস্যার গভীরে যেতে হবে। ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, চুরি-ডাকাতি-রাহাজানি-ছিনতাই-জালিয়াতি-প্রতারণা, দুর্নীতি, অপকর্ম, সন্ত্রাস-অনিয়ম-জঙ্গিবাদ ইত্যাদি সমাজ ও আইনবহির্ভূত কার্যকলাপ অগ্রহণযোগ্য ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে এসব নির্মূল করা না গেলে সমাজ-জাতি-রাষ্ট্রের সব উন্নয়ন ও অর্জন ম্লান হয়ে যাবে এবং দেশ ধ্বংসের তলানিতে গিয়ে পৌঁছবে। ব্যক্তি-গোষ্ঠী-দলগত দোষারোপ নয়; অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে তার কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী : শিক্ষাবিদ; সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়