মিয়ানমারের নির্বাচন কোনো আস্থার জায়গা তৈরি করে না
jugantor
খোলা জানালা
মিয়ানমারের নির্বাচন কোনো আস্থার জায়গা তৈরি করে না

  তারেক শামসুর রেহমান  

১৮ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনা মহামারীর মধ্যেই আগামী ৮ নভেম্বর মিয়ানমারে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। একদিকে করোনা সংকট, যাতে করে ইতোমধ্যে মারা গেছে দেশটির ৭৯৯ জন মানুষ, অন্যদিকে জাতিগত দ্বন্দ্ব ও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন এ নির্বাচনের ব্যাপারে খোদ মিয়ানমারের ভেতরে ও বহির্বিশ্বে কোনো আগ্রহ তৈরি করেনি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রাখাইন রাজ্যে অসন্তোষ এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে অনিশ্চয়তা। সব মিলিয়ে এ নির্বাচন অনেকটাই নিয়ম রক্ষার নির্বাচনে পরিণত হতে যাচ্ছে।

এ নির্বাচন মিয়ানমারের জাতিগত দ্বন্দ্বের যেমন কোনো সমাধান দেবে না, ঠিক তেমনি বাংলাদেশে পালিয়ে আসা প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গার জন্যও কোনো সুসংবাদ বয়ে আনবে না। প্রথমত, অস্ট্রেলিয়ার Lowy Institute-এর বুলেটিন The Interpreter-এর এক প্রতিবেদনে (১২ অক্টোবর ২০২০) বলা হয়েছে, মিয়ানমারের এ নির্বাচন ‘free, fair and safe’ হবে না। অর্থাৎ নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা আছে। এটি শান্তিপূর্ণ, স্বাধীন ও অবাধ হবে না। ইতোমধ্যে সেদেশে ৩৩ হাজার ৪৮৮ লোক কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছে, যা থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার চেয়ে বেশি। এখন নির্বাচনের কারণে এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ গত ৫ অক্টোবর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এ নির্বাচন হতে যাচ্ছে একটি ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন।

দ্বিতীয়ত, এ নির্বাচনে রাখাইনের অধিবাসী রোহিঙ্গাদের ভোট প্রদানকে অস্বীকার করা হয়েছে। মিয়ানমারের নির্বাচনী আইনের ১০নং ধারায় বলা হয়েছে, নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও প্রার্থিতার ক্ষেত্রে প্রার্থীকে মিয়ানমারের নাগরিক হতে হবে। ২০১০ সালের Political Parties Registration Law ২০১৪ সালে পরিবর্তন করা হয়, যেখানে বলা হয়েছে, কোনো প্রার্থীকে কোনো দলে যোগ দিতে হলে অথবা নির্বাচনে অংশ নিতে হলে তাকে ‘পূর্ণ’ নাগরিক হতে হবে। এই ‘পূর্ণ’ নাগরিকের বিষয়টি মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তারা পূর্ণ নাগরিক নন। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন সামরিক সরকার যে White card ইস্যু করে, তাতে করে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গাকে তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। ফলে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের অংশগ্রহণে কোনো নির্বাচন এবার হচ্ছে না এবং মুসলমান রোহিঙ্গারা এবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না।

তৃতীয়ত, মিয়ানমার সরকার রাখাইন ও চিন রাজ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ফলে ভোটারদের সম্পর্কে কোনো ধারণা পাওয়া যাবে না। ২০১৯ সালের ২১ জুন সরকার রাখাইন স্টেটের ৮টি টাউনশিপে ইন্টারনেট ব্যবহারের ব্যাপারে বিধিনিষেধ আরোপ করে। এ বিধিনিষেধ এখনও বহাল রয়েছে। ফলে মানুষ নির্বাচন সংক্রান্ত তথ্য জানতে পারছে না। কোভিড-১৯-এর কারণে কোনো নির্বাচনী প্রচারণাও নেই। ফলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা একটি বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

চতুর্থত, দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারে জাতিগত দ্বন্দ্ব ও সশস্ত্র আন্দোলন আন্তর্জাতিক সংবাদ হয়ে আসছে। সাম্প্রতিককালে রাখাইন ও চিন রাজ্যে আরাকান আর্মির সশস্ত্র তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে এ দুই রাজ্যে মানুষ ভোট দিতে পারবে না। একই কথা প্রযোজ্য কাচিন, কারেন ও শান রাজ্যের ক্ষেত্রেও। সশস্ত্র সংঘর্ষের কারণে সেখানে নির্বাচনে ভোট দেয়ার পরিবেশ নেই। স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ওয়া রাজ্যের অবস্থাও তেমনি। ফলে নামমাত্র একটি নির্বাচন হবে বটে; কিন্তু তা অংশগ্রহণমূলক হবে না।

পঞ্চমত, সরকার তথা সেনাবাহিনী বিরোধী বক্তব্যের জন্য অনেক বিরোধীদলীয় প্রার্থী তথা সমর্থককে পেনাল কোডের ৫০৫(বি) ধারায় গ্রেফতার করা হয়েছে। ফলে যারাই অং সান সু চি সরকারের বিরোধিতা করছেন, তাদের স্থান এখন জেলে।

ষষ্ঠত, নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোকে জাতীয় সম্প্রচার মাধ্যম টিভি ও বেতারে তাদের বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু তাদের বক্তব্য আগে নির্বাচন কমিশন থেকে অনুমোদন করিয়ে নিতে হয়। ফলে দলগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখা হচ্ছে, যা মুক্তচিন্তার পরিপন্থী। ক্ষমতাসীন এনএলডি (National League for Democracy) সরকার রাষ্ট্রীয় মিডিয়াকে ব্যবহার করছে, অন্যরা সেই সুযোগ পাচ্ছে না। Democratic Party for a New Society, National Democratic Force Party, Peoples Party’র পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, তারা সমসুযোগ পাচ্ছে না।

সপ্তমত, মিয়ানমারের সংবিধান একটি সর্বজন গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে প্রধান অন্তরায়। এটি অগণতান্ত্রিকও বটে। শুধু ৭৫ শতাংশ আসন পূর্ণ হয় জনগণের ভোটে, বাকি আসন শুধু মনোনয়ন। সেনাবাহিনীর অলিখিত কর্তৃত্ব স্বীকার করে নেয়া হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক চরিত্রের সঙ্গে বেমানান। ২০০৮ সালে এ সংবিধান গ্রহণ করা হয়। এ সংবিধানের আলোকেই ২০১৫ সালে সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল। সংবিধানে এমনসব শর্ত যুক্ত করা হয়েছে, যাতে অং সান সু চি কোনোদিনই প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। শর্তে বলা হয়েছে, ‘মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের স্বামী বা স্ত্রী বিদেশি নাগরিক হতে পারবেন না। তার সন্তানরা যদি বিদেশি নাগরিক হন, তাহলে তিনি প্রেসিডেন্ট পদের জন্য অনুপযুক্ত বলে বিবেচিত হবেন।’ সু চির প্রয়াত স্বামী ব্রিটিশ নাগরিক। তার দুই সন্তানও বিদেশি নাগরিক। সু চি এ শর্ত মেনেই নির্বাচনে গিয়েছিলেন এবং সংবিধান সংশোধনের দাবি বিভিন্ন মহল থেকে উঠলেও সেনাবাহিনীর সমর্থন এতে পাওয়া যায়নি।

অষ্টমত, নির্বাচনে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ভোট দেয়ার সুযোগ না থাকা, ব্যাপকসংখ্যক জনগোষ্ঠীর দেশত্যাগ এ নির্বাচনকে অর্থহীন করেছে। সীমিত কিছুসংখ্যক রোহিঙ্গা সেখানে থাকলেও তাদের ভোট দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। রাখাইনে শুধু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ভোট দিতে পারবেন।

এখানে বলা ভালো, মিয়ানমারের পার্লামেন্ট দুই কক্ষবিশিষ্ট- উচ্চকক্ষ বা House of Nationalities (Amyotha Hluttaw) ও নিম্নকক্ষ বা House of Representative (Pyithu Hluttaw)। House of Nationalities-এর সদস্য সংখ্যা ২২৪। এখানে ১৬৮ আসনে নির্বাচন হয়, আর ৫৬ আসন (শতকরা ২৫ ভাগ) সেনাবাহিনীর সদস্যদের (কর্মরত) জন্য নির্ধারিত। এ কক্ষে অং সান সু চির দল এনএলডির আসন ১৩৫ (শতকরা ৬০.৩ ভাগ), সেনাবাহিনী সমর্থিত Union Solidarity and Development পার্টির আসন ১১, Arakan National Party’র আসন ১০। অন্যদিকে House of Representative-এর আসন সংখ্যা ৪৪০। এখানে ৩৩০ আসনে নির্বাচন হয়, ১১০ আসন সেনাবাহিনীর জন্য রিজার্ভ। ৩২৩ আসনে নির্বাচন হয়েছিল, ৭ আসনে সশস্ত্র বিদ্রোহের কারণে নির্বাচন হয়নি। এ কক্ষে এনএলডির আসন ২৫৫। Union Solidarity and Development party-এর আসন ৩০, Arakan National Party-এর আসন ১২। নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে, রাজ্য পর্যায়ে যেসব আঞ্চলিক দল রয়েছে (Arakan National Party, Shan League for Democracy, Kachin Democratic Party ইত্যাদি) তারা রাজ্য পর্যায়ে নির্বাচনে আসন পেয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে তাদের গ্রহণযোগ্যতা নেই। মিয়ানমারের সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর কোনো পদ নেই। তবে অং সান সু চি বর্তমানে স্টেট কাউন্সেলর, তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং অলিখিত প্রধানমন্ত্রী। একজন প্রেসিডেন্ট আছেন (উইন মিন্ট), যিনি একটি প্রেসিডেনশিয়াল ইলেকটোরাল কলেজের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। সরাসরি জনগণের ভোটে তিনি নির্বাচিত হন না। সাধারণত তিনটি কমিটির সদস্যদের নিয়ে এই ইলেকটোরাল কলেজ গঠিত হয়। একটি কমিটি গঠিত হয় বিভিন্ন রাজ্যের এমপিদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে। দ্বিতীয়টি সেনাবাহিনীর এমপিদের নিয়ে। আর তৃতীয়টি বিভিন্ন টাউনশিপের প্রতিনিধিত্ব (নিম্নকক্ষ) নিয়ে।

কাজেই এ নির্বাচন মিয়ানমারের জন্য আদৌ কোনো ভালো সংবাদ বয়ে আনবে না। গত বেশ কয়েক বছর ধরে সেনাবাহিনীর সঙ্গে অং সান সু চির একটি অলিখিত আঁতাত গড়ে উঠেছে। এ আঁতাতের কারণেই তিনি ক্ষমতায় আছেন। শুধু তাই নয়, হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে অত্যন্ত নগ্নভাবে রোহিঙ্গা গণহত্যায় সেনাবাহিনীর পক্ষে সাফাই গাইছেন। ফলে অং সান সু চির দলের পুনরায় ক্ষমতায় আসা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। সেনাবাহিনী সমর্থিত একটি দল আছে বটে। কিন্তু তাদের পক্ষে ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। স্বাভাবিকভাবেই সেনাবাহিনী চাইবে সু চি ক্ষমতায় আসুক। কিন্তু তাতে করে মিয়ানমারের মূল সমস্যার কোনো সমাধান হবে না। মূল সমস্যা মূলত দুটি- এক. জাতিগত দ্বন্দ্ব। জাতিগতভাবে বিভক্ত মিয়ানমারের সশস্ত্র তথা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের ইতিহাস অনেক পুরনো। গেল পাঁচ বছর অং সান সু চি এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেননি এবং এর কোনো সমাধানও করেননি। ফলে আগামী পাঁচ বছর তার দল ক্ষমতায় থাকলেও তাকে স্টেট কাউন্সেলরের পদ নিয়েই খুশি থাকতে হবে। তিনি প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। সংবিধানে সংশোধনীও আনতে পারবেন না। আর জাতিগত দ্বন্দ্বেরও কোনো সমাধান দিতে পারবেন না। দুই. প্রায় ১১ লাখ মিয়ানমারের নাগরিক (রোহিঙ্গা) এখন বাংলাদেশে অবস্থান করছে। তাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তার কোনো লক্ষণীয় উদ্যোগ নেই। নির্বাচিত হলেও আগামী পাঁচ বছর তার কোনো উদ্যোগ থাকবে না। জনগোষ্ঠীর একটা অংশকে বাইরে রেখে যে নির্বাচন, সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মিয়ানমার নতুন একটি সরকার পাবে বটে; কিন্তু তাতে করে মিয়ানমারের সমস্যার কোনো সমাধান হবে না।

ড. তারেক শামসুর রেহমান : প্রফেসর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]

খোলা জানালা

মিয়ানমারের নির্বাচন কোনো আস্থার জায়গা তৈরি করে না

 তারেক শামসুর রেহমান 
১৮ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনা মহামারীর মধ্যেই আগামী ৮ নভেম্বর মিয়ানমারে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। একদিকে করোনা সংকট, যাতে করে ইতোমধ্যে মারা গেছে দেশটির ৭৯৯ জন মানুষ, অন্যদিকে জাতিগত দ্বন্দ্ব ও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন এ নির্বাচনের ব্যাপারে খোদ মিয়ানমারের ভেতরে ও বহির্বিশ্বে কোনো আগ্রহ তৈরি করেনি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রাখাইন রাজ্যে অসন্তোষ এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে অনিশ্চয়তা। সব মিলিয়ে এ নির্বাচন অনেকটাই নিয়ম রক্ষার নির্বাচনে পরিণত হতে যাচ্ছে।

এ নির্বাচন মিয়ানমারের জাতিগত দ্বন্দ্বের যেমন কোনো সমাধান দেবে না, ঠিক তেমনি বাংলাদেশে পালিয়ে আসা প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গার জন্যও কোনো সুসংবাদ বয়ে আনবে না। প্রথমত, অস্ট্রেলিয়ার Lowy Institute-এর বুলেটিন The Interpreter-এর এক প্রতিবেদনে (১২ অক্টোবর ২০২০) বলা হয়েছে, মিয়ানমারের এ নির্বাচন ‘free, fair and safe’ হবে না। অর্থাৎ নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা আছে। এটি শান্তিপূর্ণ, স্বাধীন ও অবাধ হবে না। ইতোমধ্যে সেদেশে ৩৩ হাজার ৪৮৮ লোক কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছে, যা থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার চেয়ে বেশি। এখন নির্বাচনের কারণে এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ গত ৫ অক্টোবর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এ নির্বাচন হতে যাচ্ছে একটি ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন।

দ্বিতীয়ত, এ নির্বাচনে রাখাইনের অধিবাসী রোহিঙ্গাদের ভোট প্রদানকে অস্বীকার করা হয়েছে। মিয়ানমারের নির্বাচনী আইনের ১০নং ধারায় বলা হয়েছে, নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও প্রার্থিতার ক্ষেত্রে প্রার্থীকে মিয়ানমারের নাগরিক হতে হবে। ২০১০ সালের Political Parties Registration Law ২০১৪ সালে পরিবর্তন করা হয়, যেখানে বলা হয়েছে, কোনো প্রার্থীকে কোনো দলে যোগ দিতে হলে অথবা নির্বাচনে অংশ নিতে হলে তাকে ‘পূর্ণ’ নাগরিক হতে হবে। এই ‘পূর্ণ’ নাগরিকের বিষয়টি মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তারা পূর্ণ নাগরিক নন। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন সামরিক সরকার যে White card ইস্যু করে, তাতে করে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গাকে তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। ফলে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের অংশগ্রহণে কোনো নির্বাচন এবার হচ্ছে না এবং মুসলমান রোহিঙ্গারা এবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না।

তৃতীয়ত, মিয়ানমার সরকার রাখাইন ও চিন রাজ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ফলে ভোটারদের সম্পর্কে কোনো ধারণা পাওয়া যাবে না। ২০১৯ সালের ২১ জুন সরকার রাখাইন স্টেটের ৮টি টাউনশিপে ইন্টারনেট ব্যবহারের ব্যাপারে বিধিনিষেধ আরোপ করে। এ বিধিনিষেধ এখনও বহাল রয়েছে। ফলে মানুষ নির্বাচন সংক্রান্ত তথ্য জানতে পারছে না। কোভিড-১৯-এর কারণে কোনো নির্বাচনী প্রচারণাও নেই। ফলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা একটি বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

চতুর্থত, দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারে জাতিগত দ্বন্দ্ব ও সশস্ত্র আন্দোলন আন্তর্জাতিক সংবাদ হয়ে আসছে। সাম্প্রতিককালে রাখাইন ও চিন রাজ্যে আরাকান আর্মির সশস্ত্র তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে এ দুই রাজ্যে মানুষ ভোট দিতে পারবে না। একই কথা প্রযোজ্য কাচিন, কারেন ও শান রাজ্যের ক্ষেত্রেও। সশস্ত্র সংঘর্ষের কারণে সেখানে নির্বাচনে ভোট দেয়ার পরিবেশ নেই। স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ওয়া রাজ্যের অবস্থাও তেমনি। ফলে নামমাত্র একটি নির্বাচন হবে বটে; কিন্তু তা অংশগ্রহণমূলক হবে না।

পঞ্চমত, সরকার তথা সেনাবাহিনী বিরোধী বক্তব্যের জন্য অনেক বিরোধীদলীয় প্রার্থী তথা সমর্থককে পেনাল কোডের ৫০৫(বি) ধারায় গ্রেফতার করা হয়েছে। ফলে যারাই অং সান সু চি সরকারের বিরোধিতা করছেন, তাদের স্থান এখন জেলে।

ষষ্ঠত, নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোকে জাতীয় সম্প্রচার মাধ্যম টিভি ও বেতারে তাদের বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু তাদের বক্তব্য আগে নির্বাচন কমিশন থেকে অনুমোদন করিয়ে নিতে হয়। ফলে দলগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখা হচ্ছে, যা মুক্তচিন্তার পরিপন্থী। ক্ষমতাসীন এনএলডি (National League for Democracy) সরকার রাষ্ট্রীয় মিডিয়াকে ব্যবহার করছে, অন্যরা সেই সুযোগ পাচ্ছে না। Democratic Party for a New Society, National Democratic Force Party, Peoples Party’র পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, তারা সমসুযোগ পাচ্ছে না।

সপ্তমত, মিয়ানমারের সংবিধান একটি সর্বজন গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে প্রধান অন্তরায়। এটি অগণতান্ত্রিকও বটে। শুধু ৭৫ শতাংশ আসন পূর্ণ হয় জনগণের ভোটে, বাকি আসন শুধু মনোনয়ন। সেনাবাহিনীর অলিখিত কর্তৃত্ব স্বীকার করে নেয়া হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক চরিত্রের সঙ্গে বেমানান। ২০০৮ সালে এ সংবিধান গ্রহণ করা হয়। এ সংবিধানের আলোকেই ২০১৫ সালে সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল। সংবিধানে এমনসব শর্ত যুক্ত করা হয়েছে, যাতে অং সান সু চি কোনোদিনই প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। শর্তে বলা হয়েছে, ‘মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের স্বামী বা স্ত্রী বিদেশি নাগরিক হতে পারবেন না। তার সন্তানরা যদি বিদেশি নাগরিক হন, তাহলে তিনি প্রেসিডেন্ট পদের জন্য অনুপযুক্ত বলে বিবেচিত হবেন।’ সু চির প্রয়াত স্বামী ব্রিটিশ নাগরিক। তার দুই সন্তানও বিদেশি নাগরিক। সু চি এ শর্ত মেনেই নির্বাচনে গিয়েছিলেন এবং সংবিধান সংশোধনের দাবি বিভিন্ন মহল থেকে উঠলেও সেনাবাহিনীর সমর্থন এতে পাওয়া যায়নি।

অষ্টমত, নির্বাচনে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ভোট দেয়ার সুযোগ না থাকা, ব্যাপকসংখ্যক জনগোষ্ঠীর দেশত্যাগ এ নির্বাচনকে অর্থহীন করেছে। সীমিত কিছুসংখ্যক রোহিঙ্গা সেখানে থাকলেও তাদের ভোট দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। রাখাইনে শুধু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ভোট দিতে পারবেন।

এখানে বলা ভালো, মিয়ানমারের পার্লামেন্ট দুই কক্ষবিশিষ্ট- উচ্চকক্ষ বা House of Nationalities (Amyotha Hluttaw) ও নিম্নকক্ষ বা House of Representative (Pyithu Hluttaw)। House of Nationalities-এর সদস্য সংখ্যা ২২৪। এখানে ১৬৮ আসনে নির্বাচন হয়, আর ৫৬ আসন (শতকরা ২৫ ভাগ) সেনাবাহিনীর সদস্যদের (কর্মরত) জন্য নির্ধারিত। এ কক্ষে অং সান সু চির দল এনএলডির আসন ১৩৫ (শতকরা ৬০.৩ ভাগ), সেনাবাহিনী সমর্থিত Union Solidarity and Development পার্টির আসন ১১, Arakan National Party’র আসন ১০। অন্যদিকে House of Representative-এর আসন সংখ্যা ৪৪০। এখানে ৩৩০ আসনে নির্বাচন হয়, ১১০ আসন সেনাবাহিনীর জন্য রিজার্ভ। ৩২৩ আসনে নির্বাচন হয়েছিল, ৭ আসনে সশস্ত্র বিদ্রোহের কারণে নির্বাচন হয়নি। এ কক্ষে এনএলডির আসন ২৫৫। Union Solidarity and Development party-এর আসন ৩০, Arakan National Party-এর আসন ১২। নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে, রাজ্য পর্যায়ে যেসব আঞ্চলিক দল রয়েছে (Arakan National Party, Shan League for Democracy, Kachin Democratic Party ইত্যাদি) তারা রাজ্য পর্যায়ে নির্বাচনে আসন পেয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে তাদের গ্রহণযোগ্যতা নেই। মিয়ানমারের সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর কোনো পদ নেই। তবে অং সান সু চি বর্তমানে স্টেট কাউন্সেলর, তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং অলিখিত প্রধানমন্ত্রী। একজন প্রেসিডেন্ট আছেন (উইন মিন্ট), যিনি একটি প্রেসিডেনশিয়াল ইলেকটোরাল কলেজের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। সরাসরি জনগণের ভোটে তিনি নির্বাচিত হন না। সাধারণত তিনটি কমিটির সদস্যদের নিয়ে এই ইলেকটোরাল কলেজ গঠিত হয়। একটি কমিটি গঠিত হয় বিভিন্ন রাজ্যের এমপিদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে। দ্বিতীয়টি সেনাবাহিনীর এমপিদের নিয়ে। আর তৃতীয়টি বিভিন্ন টাউনশিপের প্রতিনিধিত্ব (নিম্নকক্ষ) নিয়ে।

কাজেই এ নির্বাচন মিয়ানমারের জন্য আদৌ কোনো ভালো সংবাদ বয়ে আনবে না। গত বেশ কয়েক বছর ধরে সেনাবাহিনীর সঙ্গে অং সান সু চির একটি অলিখিত আঁতাত গড়ে উঠেছে। এ আঁতাতের কারণেই তিনি ক্ষমতায় আছেন। শুধু তাই নয়, হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে অত্যন্ত নগ্নভাবে রোহিঙ্গা গণহত্যায় সেনাবাহিনীর পক্ষে সাফাই গাইছেন। ফলে অং সান সু চির দলের পুনরায় ক্ষমতায় আসা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। সেনাবাহিনী সমর্থিত একটি দল আছে বটে। কিন্তু তাদের পক্ষে ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। স্বাভাবিকভাবেই সেনাবাহিনী চাইবে সু চি ক্ষমতায় আসুক। কিন্তু তাতে করে মিয়ানমারের মূল সমস্যার কোনো সমাধান হবে না। মূল সমস্যা মূলত দুটি- এক. জাতিগত দ্বন্দ্ব। জাতিগতভাবে বিভক্ত মিয়ানমারের সশস্ত্র তথা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের ইতিহাস অনেক পুরনো। গেল পাঁচ বছর অং সান সু চি এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেননি এবং এর কোনো সমাধানও করেননি। ফলে আগামী পাঁচ বছর তার দল ক্ষমতায় থাকলেও তাকে স্টেট কাউন্সেলরের পদ নিয়েই খুশি থাকতে হবে। তিনি প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। সংবিধানে সংশোধনীও আনতে পারবেন না। আর জাতিগত দ্বন্দ্বেরও কোনো সমাধান দিতে পারবেন না। দুই. প্রায় ১১ লাখ মিয়ানমারের নাগরিক (রোহিঙ্গা) এখন বাংলাদেশে অবস্থান করছে। তাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তার কোনো লক্ষণীয় উদ্যোগ নেই। নির্বাচিত হলেও আগামী পাঁচ বছর তার কোনো উদ্যোগ থাকবে না। জনগোষ্ঠীর একটা অংশকে বাইরে রেখে যে নির্বাচন, সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মিয়ানমার নতুন একটি সরকার পাবে বটে; কিন্তু তাতে করে মিয়ানমারের সমস্যার কোনো সমাধান হবে না।

ড. তারেক শামসুর রেহমান : প্রফেসর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]