করোনা ও খাদ্য নিরাপত্তা
jugantor
করোনা ও খাদ্য নিরাপত্তা

  ড. মো. আবদুছ ছালাম  

১৯ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কৃষিশিক্ষা, গবেষণা এবং সম্প্রসারণের যে ভিত্তি বঙ্গবন্ধু গড়েছিলেন এবং যেসব পলিসি গ্রহণ করেছিলেন তা আরও শক্তিশালী করার মাধ্যমে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় ও কৃষিমন্ত্রীর মেধা ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন নেতৃত্বে আজ কৃষি ক্ষেত্রে উত্তরোত্তর সাফল্য অর্জিত হচ্ছে।

কৃষিশিক্ষা, গবেষণা এবং সম্প্রসারণের যে ভিত্তি বঙ্গবন্ধু গড়েছিলেন এবং যেসব পলিসি গ্রহণ করেছিলেন তা আরও শক্তিশালী করার মাধ্যমে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় ও কৃষিমন্ত্রীর মেধা ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন নেতৃত্বে আজ কৃষি ক্ষেত্রে উত্তরোত্তর সাফল্য অর্জিত হচ্ছে।

কৃষিতে অর্জিত এ সাফল্যকে ধরে রাখতে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি-২০১৮’ বাস্তবায়ন এবং ২০৩০ সলের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনসহ ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা মেটানোর জন্য কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার। করোনাকালে এবং মহামারী-পরবর্তীকালে এ কথা আরও বিশেষভাবে প্রযোজ্য।

উচ্চফলন ও লাভজনক লাগসই নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও অবলম্বনের মাধ্যমে কৃষিতে অর্জিত সাফল্যের ধারাবাহিকতা রক্ষাকল্পে টেকসই কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে ফসলের অবশিষ্টাংশ, জৈব সার এবং পশুবর্জ্য ব্যবহারের মাধ্যমে জৈব চাষকে জনপ্রিয় করার উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

টেকসই কৃষিব্যবস্থায় চাষাবাদের সঙ্গে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত অন্য দিকগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজন। টেকসই কৃষি এমনভাবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করতে হবে যেন তা সম্পদ সাশ্রয়ী, সামাজিকভাবে সহায়ক, বাণিজ্যিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশবান্ধব হয়।

জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেমের আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো চাহিদা অনুযায়ী কৃষি প্রযুক্তি (ফসলের জাত ও ব্যবস্থাপনা) ও তত্ত্ব উদ্ভাবন করে থাকে। এছাড়া প্রযুক্তির উপযোগিতা যাচাইসহ উদ্ভাবিত প্রযুক্তির অধিকতর উন্নতি করে থাকে। দরিদ্র ও অসহায় জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত প্রাকৃতিকভাবে সমস্যাসংকুল এলাকার (যেমন : পাহাড়, উপকূলীয়, হাওর ও বরেন্দ্র এলাকাগুলো) ঝুঁকি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে মোকাবেলা করা জরুরি।

অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত গবেষণা ক্ষেত্র হিসেবে হাইব্রিড, ভালো বীজ, ধান, গম, ভুট্টা, ডাল, পাট, সমুদ্রশৈবাল, তৈলবীজ, সবজি, ফলমূল, তুলা, আখ এবং বিভিন্ন ঘাতসহিষ্ণু ও জলবায়ু পরিবর্তন উপযোগী জাতের উন্নয়ন, মাঠ ফসল, শাকসবজি, ফলমূল, ফুলের জন্য প্রান্তিক ও প্রতিকূল পরিবেশ ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ উন্নত ব্যবস্থাপনা, উত্তম কৃষিচর্চা; ফসল সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা, কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মূল্য সংযোজন, ফসলের রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, জীববৈচিত্র্য, কৃষিতে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, খামার যান্ত্রিকীকরণ, ফলন পার্থক্য হ্রাস, শস্য বহুমুখীকরণ, আর্থ-সামাজিক নীতি, কৃষি সম্প্রসারণ, কৃষিপণ্য ও উপকরণে ভর্তুকি ইত্যাদিবিষয়ক গবেষণা জোরদার করা প্রয়োজন।

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, বর্ধিষ্ণু আয়ু, বাড়তি চাহিদা, বৃহত্তর বাণিজ্য ও রফতানির বিপরীতে বার্ষিক ফসল উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানো প্রয়োজন। রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের উন্নত প্রযুক্তি এবং স্বল্পমেয়াদি ও প্রতিকূল পরিবেশ উপযোগী জাত ব্যবহার করে প্রতি বছর অধিক ফসল উৎপাদন করা যেতে পারে। এ বিষয়ক গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।

টেকসই খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনে সুষম ও টেকসই মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনা আবশ্যক। স্বল্প উপকরণ সহায়তার মাধ্যমে অধিকতর খাদ্য উৎপাদন কৌশল বের করতে হবে। নতুন উদ্ভাবিত বিভিন্ন প্রযুক্তি যেমন- তথ্যপ্রযুক্তি, ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা, ক্রপ জোনিং, জীব প্রযুক্তি, লেজার প্রযুক্তি, দক্ষ ক্ষুদ্র সেচব্যবস্থা, মাটি পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে সামষ্টিক ও ব্যষ্টিক পুষ্টি উপাদানের জন্য এলাকাভিত্তিক নির্দিষ্ট পুষ্টি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার প্রতি অধিক মনোযোগ দিতে হবে।

কৃষি উৎপাদন পরিকল্পনা এবং বালাই ব্যবস্থাপনা কৌশলের জন্য কৃষি আবহাওয়া তথ্যকে অধিকতর কাজে লাগাতে হবে। রিমোট সেন্সিং টুল ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন ও ফসলের ক্ষতি বিষয়ক গবেষণা জোরদার করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার ফসল ও ফসল উত্তোলন-পরবর্তী ক্ষতি কমায়, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করে, খাটুনি কমায়, উচ্চমানসম্মত পণ্য উৎপাদনে দ্রুততম ও সময়ানুগ পরিচালনা নিশ্চিত করে। সেচসহ খামার যান্ত্রিকীকরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। চাহিদাভিত্তিক কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহারকে জনপ্রিয় করতে এবং কৃষি উৎপাদনে সৌরশক্তিসহ নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারকে সহজতর করতে সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।

জমি চাষে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ আশানুরূপ হলেও রোপণ-বপন এবং ফসল সংগ্রহের ক্ষেত্রে তা অপ্রতুল। সাম্প্রতিক সময়ে হাওরের বোরো ধান সংগ্রহের ক্ষেত্রে আমরা খামার যান্ত্রিকীকরণের সুফল ভোগ করেছি। হাওর অঞ্চলে কম্বাইন্ড হারভেস্টারের মাধ্যমে বোরো ধান নির্বিঘ্ন কর্তন দুর্যোগ মোকাবেলায় কিছুটা হলেও স্বস্তিদায়ক হয়েছে।

জমির উর্বরতা বজায় রাখতে পরিমিত রাসায়নিক সার ও জৈব সার ব্যবহারে বাস্তবমুখী পদ্ধতি গ্রহণে কৃষকদের অব্যাহতভাবে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। শস্য বহুমুখীকরণ সফল হলে খাদ্যশস্য ফলানোর রীতি থেকে বেরিয়ে এসে খাদ্যশস্যবহির্ভূত উচ্চমূল্যের ফসল চাষাবাদের প্রসার ঘটবে।

খাদ্য উৎপাদনের ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে বিবেচনায় রেখে জমির সর্বোত্তম ব্যবহার ও সংরক্ষণ অতি গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদন কার্যক্রমে অর্থনৈতিক, পরিবেশগত, সামাজিক- এ বিষয়গুলোর সমন্বয়ের মাধ্যমে ভূমি ব্যবহারের সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

উৎপাদিত কৃষিপণ্য যেমন- বিভিন্ন ধরনের সবজি, ফল এবং ফুল স্বল্প সময়ের জন্য সংরক্ষণে সচল আধুনিক ভৌত অবকাঠামো অপ্রতুল। মৌসুমে উৎপাদিত শাকসবজি, ফল ও ফুলে প্রায়ই বাজার সয়লাব হয়ে যায়, ফলে কৃষক ন্যায্যমূল্যপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়। এক্ষেত্রে কৃষি বিপণন অধিদফতর কর্তৃক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থাপিত ভৌত অবকাঠামোগুলো সচল করে সংশ্লিষ্টদের ব্যবহারের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক শ্রমঘন কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণসহ খাদ্য শিল্পের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে কৃষিতে। আমাদের দেশে বিভিন্ন পচনশীল কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে মৌসুমে উদ্বৃত্ত দেখা যায়। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধাগুলোর উন্নয়ন হলে ফসল সংগ্রহোত্তর ক্ষতি হ্রাস ও কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের ক্রমেই উন্নয়ন ঘটছে।

খামার থেকে ভোক্তা পর্যায়ে কৃষিপণ্যের যৌক্তিক মূল্য নিশ্চিত করার জন্য কৃষি বিপণনের সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন। পণ্যপরিবহনে ভর্তুকি এবং টোল ফ্রি পরিবহন ব্যবস্থা প্রচলন করে কৃষকদের উৎপাদনে উৎসাহিত করা যেতে পারে। ট্রেনগুলোতে কৃষিপণ্য পরিবহনের উপযোগী কামরা যুক্ত করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার।

কৃষকের অপর্যাপ্ত মূলধন ও প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ গ্রামীণ দরিদ্র্র কৃষকদের উৎপাদনকে ব্যাহত করে। আনুষ্ঠানিক অর্থায়নপ্রাপ্তিতে সুযোগের অভাবের কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের অনানুষ্ঠানিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। কৃষিতে ঋণ নিয়ে কেউ খেলাপি হয়নি; যেমনটি অন্যান্য ক্ষেত্রে হয়েছে। তাই এক্ষেত্রে কৃষকবান্ধব প্রয়োজনীয় উদ্যোগ জরুরি ভিত্তিতে নেয়া প্রয়োজন।

কৃষি খাতে যথাযথ প্রযুক্তি হস্তান্তর, বহুমুখীকরণ ও ফসল উৎপাদন কার্যক্রম নিবিড়তর করা যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। যথাসময়ে ও স্থানে প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ এবং অন্যান্য সেবা প্রদান করতে হবে। এসব বিষয় ছাড়াও করোনাকালে এবং মহামারী-পরবর্তীকালে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে করণীয় নির্ধারণ করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। কৃষিতে অর্জিত সাফল্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

ড. মো. আবদুছ ছালাম : সদস্য পরিচালক (পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, ঢাকা

করোনা ও খাদ্য নিরাপত্তা

 ড. মো. আবদুছ ছালাম 
১৯ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
কৃষিশিক্ষা, গবেষণা এবং সম্প্রসারণের যে ভিত্তি বঙ্গবন্ধু গড়েছিলেন এবং যেসব পলিসি গ্রহণ করেছিলেন তা আরও শক্তিশালী করার মাধ্যমে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় ও কৃষিমন্ত্রীর মেধা ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন নেতৃত্বে আজ কৃষি ক্ষেত্রে উত্তরোত্তর সাফল্য অর্জিত হচ্ছে।
ফাইল ছবি

কৃষিশিক্ষা, গবেষণা এবং সম্প্রসারণের যে ভিত্তি বঙ্গবন্ধু গড়েছিলেন এবং যেসব পলিসি গ্রহণ করেছিলেন তা আরও শক্তিশালী করার মাধ্যমে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় ও কৃষিমন্ত্রীর মেধা ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন নেতৃত্বে আজ কৃষি ক্ষেত্রে উত্তরোত্তর সাফল্য অর্জিত হচ্ছে।

কৃষিতে অর্জিত এ সাফল্যকে ধরে রাখতে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি-২০১৮’ বাস্তবায়ন এবং ২০৩০ সলের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনসহ ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা মেটানোর জন্য কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার। করোনাকালে এবং মহামারী-পরবর্তীকালে এ কথা আরও বিশেষভাবে প্রযোজ্য।

উচ্চফলন ও লাভজনক লাগসই নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও অবলম্বনের মাধ্যমে কৃষিতে অর্জিত সাফল্যের ধারাবাহিকতা রক্ষাকল্পে টেকসই কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে ফসলের অবশিষ্টাংশ, জৈব সার এবং পশুবর্জ্য ব্যবহারের মাধ্যমে জৈব চাষকে জনপ্রিয় করার উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

টেকসই কৃষিব্যবস্থায় চাষাবাদের সঙ্গে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত অন্য দিকগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজন। টেকসই কৃষি এমনভাবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করতে হবে যেন তা সম্পদ সাশ্রয়ী, সামাজিকভাবে সহায়ক, বাণিজ্যিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশবান্ধব হয়।

জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেমের আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো চাহিদা অনুযায়ী কৃষি প্রযুক্তি (ফসলের জাত ও ব্যবস্থাপনা) ও তত্ত্ব উদ্ভাবন করে থাকে। এছাড়া প্রযুক্তির উপযোগিতা যাচাইসহ উদ্ভাবিত প্রযুক্তির অধিকতর উন্নতি করে থাকে। দরিদ্র ও অসহায় জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত প্রাকৃতিকভাবে সমস্যাসংকুল এলাকার (যেমন : পাহাড়, উপকূলীয়, হাওর ও বরেন্দ্র এলাকাগুলো) ঝুঁকি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে মোকাবেলা করা জরুরি।

অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত গবেষণা ক্ষেত্র হিসেবে হাইব্রিড, ভালো বীজ, ধান, গম, ভুট্টা, ডাল, পাট, সমুদ্রশৈবাল, তৈলবীজ, সবজি, ফলমূল, তুলা, আখ এবং বিভিন্ন ঘাতসহিষ্ণু ও জলবায়ু পরিবর্তন উপযোগী জাতের উন্নয়ন, মাঠ ফসল, শাকসবজি, ফলমূল, ফুলের জন্য প্রান্তিক ও প্রতিকূল পরিবেশ ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ উন্নত ব্যবস্থাপনা, উত্তম কৃষিচর্চা; ফসল সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা, কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মূল্য সংযোজন, ফসলের রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, জীববৈচিত্র্য, কৃষিতে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, খামার যান্ত্রিকীকরণ, ফলন পার্থক্য হ্রাস, শস্য বহুমুখীকরণ, আর্থ-সামাজিক নীতি, কৃষি সম্প্রসারণ, কৃষিপণ্য ও উপকরণে ভর্তুকি ইত্যাদিবিষয়ক গবেষণা জোরদার করা প্রয়োজন।

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, বর্ধিষ্ণু আয়ু, বাড়তি চাহিদা, বৃহত্তর বাণিজ্য ও রফতানির বিপরীতে বার্ষিক ফসল উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানো প্রয়োজন। রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের উন্নত প্রযুক্তি এবং স্বল্পমেয়াদি ও প্রতিকূল পরিবেশ উপযোগী জাত ব্যবহার করে প্রতি বছর অধিক ফসল উৎপাদন করা যেতে পারে। এ বিষয়ক গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।

টেকসই খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনে সুষম ও টেকসই মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনা আবশ্যক। স্বল্প উপকরণ সহায়তার মাধ্যমে অধিকতর খাদ্য উৎপাদন কৌশল বের করতে হবে। নতুন উদ্ভাবিত বিভিন্ন প্রযুক্তি যেমন- তথ্যপ্রযুক্তি, ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা, ক্রপ জোনিং, জীব প্রযুক্তি, লেজার প্রযুক্তি, দক্ষ ক্ষুদ্র সেচব্যবস্থা, মাটি পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে সামষ্টিক ও ব্যষ্টিক পুষ্টি উপাদানের জন্য এলাকাভিত্তিক নির্দিষ্ট পুষ্টি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার প্রতি অধিক মনোযোগ দিতে হবে।

কৃষি উৎপাদন পরিকল্পনা এবং বালাই ব্যবস্থাপনা কৌশলের জন্য কৃষি আবহাওয়া তথ্যকে অধিকতর কাজে লাগাতে হবে। রিমোট সেন্সিং টুল ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন ও ফসলের ক্ষতি বিষয়ক গবেষণা জোরদার করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার ফসল ও ফসল উত্তোলন-পরবর্তী ক্ষতি কমায়, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করে, খাটুনি কমায়, উচ্চমানসম্মত পণ্য উৎপাদনে দ্রুততম ও সময়ানুগ পরিচালনা নিশ্চিত করে। সেচসহ খামার যান্ত্রিকীকরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। চাহিদাভিত্তিক কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহারকে জনপ্রিয় করতে এবং কৃষি উৎপাদনে সৌরশক্তিসহ নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারকে সহজতর করতে সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।

জমি চাষে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ আশানুরূপ হলেও রোপণ-বপন এবং ফসল সংগ্রহের ক্ষেত্রে তা অপ্রতুল। সাম্প্রতিক সময়ে হাওরের বোরো ধান সংগ্রহের ক্ষেত্রে আমরা খামার যান্ত্রিকীকরণের সুফল ভোগ করেছি। হাওর অঞ্চলে কম্বাইন্ড হারভেস্টারের মাধ্যমে বোরো ধান নির্বিঘ্ন কর্তন দুর্যোগ মোকাবেলায় কিছুটা হলেও স্বস্তিদায়ক হয়েছে।

জমির উর্বরতা বজায় রাখতে পরিমিত রাসায়নিক সার ও জৈব সার ব্যবহারে বাস্তবমুখী পদ্ধতি গ্রহণে কৃষকদের অব্যাহতভাবে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। শস্য বহুমুখীকরণ সফল হলে খাদ্যশস্য ফলানোর রীতি থেকে বেরিয়ে এসে খাদ্যশস্যবহির্ভূত উচ্চমূল্যের ফসল চাষাবাদের প্রসার ঘটবে।

খাদ্য উৎপাদনের ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে বিবেচনায় রেখে জমির সর্বোত্তম ব্যবহার ও সংরক্ষণ অতি গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদন কার্যক্রমে অর্থনৈতিক, পরিবেশগত, সামাজিক- এ বিষয়গুলোর সমন্বয়ের মাধ্যমে ভূমি ব্যবহারের সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

উৎপাদিত কৃষিপণ্য যেমন- বিভিন্ন ধরনের সবজি, ফল এবং ফুল স্বল্প সময়ের জন্য সংরক্ষণে সচল আধুনিক ভৌত অবকাঠামো অপ্রতুল। মৌসুমে উৎপাদিত শাকসবজি, ফল ও ফুলে প্রায়ই বাজার সয়লাব হয়ে যায়, ফলে কৃষক ন্যায্যমূল্যপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়। এক্ষেত্রে কৃষি বিপণন অধিদফতর কর্তৃক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থাপিত ভৌত অবকাঠামোগুলো সচল করে সংশ্লিষ্টদের ব্যবহারের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক শ্রমঘন কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণসহ খাদ্য শিল্পের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে কৃষিতে। আমাদের দেশে বিভিন্ন পচনশীল কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে মৌসুমে উদ্বৃত্ত দেখা যায়। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধাগুলোর উন্নয়ন হলে ফসল সংগ্রহোত্তর ক্ষতি হ্রাস ও কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের ক্রমেই উন্নয়ন ঘটছে।

খামার থেকে ভোক্তা পর্যায়ে কৃষিপণ্যের যৌক্তিক মূল্য নিশ্চিত করার জন্য কৃষি বিপণনের সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন। পণ্যপরিবহনে ভর্তুকি এবং টোল ফ্রি পরিবহন ব্যবস্থা প্রচলন করে কৃষকদের উৎপাদনে উৎসাহিত করা যেতে পারে। ট্রেনগুলোতে কৃষিপণ্য পরিবহনের উপযোগী কামরা যুক্ত করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার।

কৃষকের অপর্যাপ্ত মূলধন ও প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ গ্রামীণ দরিদ্র্র কৃষকদের উৎপাদনকে ব্যাহত করে। আনুষ্ঠানিক অর্থায়নপ্রাপ্তিতে সুযোগের অভাবের কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের অনানুষ্ঠানিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। কৃষিতে ঋণ নিয়ে কেউ খেলাপি হয়নি; যেমনটি অন্যান্য ক্ষেত্রে হয়েছে। তাই এক্ষেত্রে কৃষকবান্ধব প্রয়োজনীয় উদ্যোগ জরুরি ভিত্তিতে নেয়া প্রয়োজন।

কৃষি খাতে যথাযথ প্রযুক্তি হস্তান্তর, বহুমুখীকরণ ও ফসল উৎপাদন কার্যক্রম নিবিড়তর করা যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। যথাসময়ে ও স্থানে প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ এবং অন্যান্য সেবা প্রদান করতে হবে। এসব বিষয় ছাড়াও করোনাকালে এবং মহামারী-পরবর্তীকালে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে করণীয় নির্ধারণ করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। কৃষিতে অর্জিত সাফল্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

ড. মো. আবদুছ ছালাম : সদস্য পরিচালক (পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, ঢাকা

 

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস