প্রদীপ-আকবররা সংখ্যায় কত?
jugantor
প্রদীপ-আকবররা সংখ্যায় কত?

  এ কে এম শাহনাওয়াজ  

২০ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে অনেককাল থেকেই রিমান্ডে নিয়ে অভিযুক্ত অপরাধীর কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার জন্য পুলিশি নির্যাতন একটি অবধারিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। হয়তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নির্যাতনের রকমফের হয়েছে- মাত্রার পরিবর্তন হয়েছে।

শুনেছি অনেক সভ্য দেশেই শারীরিক নির্যাতন নয়, মনস্তাত্ত্বিকভাবে অপরাধীর কাছ থেকে কথা আদায় করা হয়। কখনও কখনও বিশেষ প্রয়োজনে শারীরিক নির্যাতনও করা হয়। তবে বাংলাদেশি স্টাইলটি সর্বত্র প্রচলিত আছে কি-না আমার জানা নেই।

বাংলার ইতিহাস থেকে যতটুকু জানা যায়, তাতে ইংরেজ শাসন যুগে বিদ্রোহী বিপ্লবীদের ধরে এনে নির্যাতন করা হতো। ওরাই হয়তো আমাদের শিখিয়েছে পুলিশি ব্যবস্থাপনায় কীভাবে আসামির কাছ থেকে কথা বের করতে হয়। সমকালীন ইতিহাস গ্রন্থ না থাকায় বিদেশি পর্যটকদের বিবরণী এবং সমকালীন বাংলাসাহিত্য থেকে আমরা মধ্যযুগের বাংলার এ সংক্রান্ত কিছু ছবি পাই।

সুলতানি যুগে থানাকে বলা হতো কোতোয়ালি। আর থানার প্রধান দারোগাকে বলা হতো কোতোয়াল। কোতোয়ালরা সুলতান বা স্থানীয় প্রশাসক কাজির আদেশ পালন করতেন। রাজাদর্শ তখন জনকল্যাণমুখী ছিল। ষোলশতকের প্রথম পর্বে বাংলার সবচেয়ে খ্যাতিমান স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহের সময় শ্রী চৈতন্যদেব নব্যবৈষ্ণব আন্দোলনের মাধ্যমে হিন্দু সমাজ রক্ষার চেষ্টা করছিলেন।

সুফি প্রভাবে নিু শ্রেণির বড় সংখ্যক হিন্দু ততক্ষণে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিল। হিন্দু সমাজকে রক্ষার জন্য চৈতন্যদেব রক্ষণশীল ব্রাহ্মণদের কট্টর বিধি-নিষেধের বাইরে একটি উদার ধর্মীয় ধারা প্রচার করলেন। এতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের প্রবণতা কমে যায়। তাই অনেক মুসলমান অমাত্যের ক্ষোভ ছিল চৈতন্যদেবের প্রতি। এর মধ্যে একবার রাজধানী গৌড়ের কাছে চৈতন্য আসেন, তাকে দেখতে ছুটে যায় অসংখ্য মানুষ।

স্বয়ং সুলতানও ঠিক করলেন তিনি চৈতন্যকে দেখতে যাবেন। সভাসদদের অনেকে চৈতন্যের বিরুদ্ধে কান ভারি করতে লাগল সুলতানের। চৈতন্যের কারণে সুফিদের ধর্মান্তর কার্যক্রম কমে যাচ্ছে। তারা সুলতানকে প্ররোচিত করতে থাকেন এ বৈষ্ণব ঠাকুরকে দেশ ছাড়া করতে। চৈতন্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন সুলতান।

গভীর মনোযোগে চৈতন্যের কার্যক্রম পর্যালোচনা করলেন। অবশেষে নগর কোতোয়ালকে ডেকে আদেশ দিলেন এ ঠাকুর যত ইচ্ছা তার ধর্ম প্রচার করবেন- কেউ যদি বাধা দেয় তবে তাকে শাস্তি দেবে। রাষ্ট্রের এমন নিরপেক্ষ-উদার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বলে পুলিশ প্রশাসনকে নিয়ে সমকালীন বাংলাসাহিত্যে তেমন কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

এখন তো একশ্রেণির পুলিশ সদস্যের অপকীর্তির কারণে গোটা পুলিশ প্রশাসনকে সাধারণ মানুষের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে। পুলিশি অত্যাচারে সিলেটের যুবক রায়হানের নিহত হওয়ার পর এবার ফুঁসে উঠেছে মানুষ। কিছুদিন আগে মিরপুরে পল্লবী থানায় পুলিশি নির্যাতনে আসামি হত্যায় পুলিশের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে; কিন্তু বেআইনি কাজে লিপ্ত থাকা পুলিশ এতে যে সংযত হয়েছে, একের পর এক অঘটন দেখে তা মনে হয় না।

সবচেয়ে দুর্ভাগ্য হচ্ছে, আমাদের পুলিশ বাহিনীর মধ্যে অনেক সৎ ও আদর্শবান পুলিশ কর্মকর্তা থাকার পরও কিছু সদস্যের দানবিক আচরণের কারণে মন্দদের সংযত করা যাচ্ছে না। এর হয়তো নানা কারণ থাকে; কখনও অর্থ-প্রতিপত্তির কারণে শাসন করা যায় না। কখনও রাজনৈতিক প্রভাব তাদের একচোখা বুনো ষাঁড় করে ফেলে।

না হলে প্রদীপের মতো একজন থানার ওসি এত বেপরোয়া শক্তিমান হয়ে বছরের পর বছর ‘গুরুত্বপূর্ণ’ অঞ্চলে কাটিয়ে দিতে পারে কেমন করে? একজন তরুণ এসআই আকবর তার ১০ হাজার টাকার অবৈধ দাবি পূরণ করতে না পারায় নির্যাতন করে অমানবিকভাবে মেরে ফেলতে পারে আরেক তরুণ রায়হানকে।

স্বল্প বেতনভুক এসআই আকবর এখনই বানিয়ে ফেলেছে প্রাসাদ। অথচ যাদের দেখার কথা চোখ বন্ধ করে রেখেছে। অঘটন ঘটানোর পর হৈচৈ বাধার আগে ওসি প্রদীপের শতকোটি টাকার সম্পদই যখন চোখে পড়ে না, সেখানে আকবর কোন ছাড়! অনেকের ধারণা পুলিশের ভেতর এমন আকবর অনেক পাওয়া যাবে।

ক্ষমতা থাকলে টাকা বানানোর কারখানা যেন এদেশ। ২০০৯-এর কথা বলছি। আমি তখন একটি হলের প্রভোস্ট। আমার এক ছাত্র ছাত্রলীগের নেতাকে একান্তে বললাম তোমরা চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দখলবাজির সংস্কৃতি থেকে বেরোতে পারও না? ওর একটি সরল উক্তি এখনও আমার কানে বাজে।

বলল, অমুক ভাই বিএনপি আমলে ছাত্রদলের বড় নেতা ছিল। এখনও নেতৃত্ব দিচ্ছে। ছাত্র থাকতেই সাভারে একটি আর ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট কিনেছে। নতুন চকচকে গাড়িতে চলাচল করে। ব্যাংকেও আছে অনেক টাকা। আমরা এখন পাওয়ারে, তাই আমাদেরও রাইট আছে সম্পদের মালিক হওয়ার।

আসলে এ-ও এক ধরনের প্রতিযোগিতা। একইভাবে মাঠ পর্যায়ের কোনো কোনো পুলিশ কর্মকর্তা যদি মনে করে ওমুক থানার কর্মকর্তা চাকরির পাঁচ বছরে পাঁচতলা বাড়ির মালিক হয়েছে; আমিইবা পিছিয়ে থাকব কেন, এমন অকাট্য যুক্তির পর আর কী বলার থাকে!

বাংলাদেশ আকারে খুব বড় নয়। অনেকেরই সুখ-দুঃখের খবর প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজন জানে। সুতরাং লুকোছাপার কিছু নেই। আসামির কোর্ট থেকে দেয়া রিমান্ড অথবা থানায় ধরে এনে নির্যাতন একটি অবধারিত বিষয়। এ কারণে অপরাধী হোক বা অপরাধী সাজিয়ে আনা হোক, পরিবারের লোকজন চাইবে তাদের স্বজন যাতে কম অত্যাচারিত হয়।

প্রচলিত আছে, অনেক ক্ষেত্রে নাকি পুলিশ দেন-দরবারের জন্য পথ খুলে রাখে। অসহায় পরিবারগুলো বাধ্য হয় চাহিদা মতো একটি বড় অঙ্কের টাকা তুলে দিতে। তাতে যদি স্বজন নির্যাতনের হাত থেকে একটু রেহাই পায়। এমন কথাও প্রচারিত থাকে, থানাদারদের হঠাৎ অর্থের প্রয়োজন পড়লে নাকি কয়েকটি ইয়াবা ধরনের মাদক পকেটে ঢুকিয়ে মাদক মামলায় নিরীহ কাউকে আটক করে।

তখন ছুটোছুটি শুরু হয় আত্মীয়স্বজনদের। টাকা-পয়সা দিয়ে নিরপরাধ লোকটিকে ছাড়িয়ে আনে। এর সত্যাসত্য আমার জানা নেই; কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে এ ধরনের বিশ্বাস জন্মে গেছে। আমি এক স্কুল শিক্ষককে জানি। সংস্কৃতিমনা এ শিক্ষকের সঙ্গে গাজীপুরের এক অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছিল। সহজ-সরল এ শিক্ষক মাঝেমাঝে ফোন করে খবর নিতেন আমার। অনেক বছর আগের কথা।

একদিন খবর পেলাম, জঙ্গি সন্দেহে দশ-পনের জনকে আটক করেছে পুলিশ। তার মধ্যে এ শিক্ষকও আছেন। আমি বেশ বিস্মিত হয়েছিলাম। পরে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় এ শিক্ষকসহ কয়েকজন ছাড়া পেয়েছিলেন। পরে শুনলাম, গ্রেফতারের পর প্রত্যেকের বাড়িতে পুলিশের পক্ষ থেকে খবর যায় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ নিয়ে রাত ১২টার মধ্যে থানায় যেতে হবে। এ শিক্ষক মহোদয়ের স্ত্রীকে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে ছুটতে হয়েছিল টাকা জোগাড় করতে।

আমার কাছে মনে হয়, এসব অভিযোগে বাড়াবাড়ি আছে। না হলে অন্যায়ের এমন ওপেন সিক্রেট অবস্থা অথচ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানবেন না- তা তো হয় না! কিন্তু সাধারণ মানুষের তো স্বস্তি ফিরছে না। প্রদীপ গংরা মানুষকে নির্যাতন করে হত্যা করছে। আকবররা রায়হানদের কাছ থেকে চাহিদামতো অর্থ না পেয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলছে। এসব ঘটনা তো আর আড়াল করা যাচ্ছে না।

এ সমাজেরই মানুষ আমরা। আমাদের আত্মীয়স্বজন, ছাত্রছাত্রী অনেকেই পুলিশ বাহিনীতে আছেন। অনেককেই অত্যন্ত সৎ ও দেশপ্রেমিক অফিসার বলেই জানি। এ হিসেবে বলা যায়, পুলিশ বাহিনীতে অনেক সৎ অফিসার বা সদস্য আছেন। তবে অসৎরা কীভাবে প্রশ্রয় পায় সে এক রহস্য।

আমি এক নামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে গর্ব করে বলতাম মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী রাজারবাগের পুলিশ সদস্যদের কথা। আমার এক অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র এতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। সে তার জীবনের লক্ষ্য ঠিক করেছিল পুলিশ অফিসার হবে। আমি ওকে বলেছিলাম আমার বিশ্বাস তুমি বিসিএস দিয়ে আরও অনেক আকর্ষণীয় ক্যাডার পাবে। তবে পুলিশেই কেন?

ওর উত্তর ছিল আপনার কাছে রাজারবাগের পুলিশদের কথা শুনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পুলিশের মর্যাদা ফিরিয়ে আনব আমি। শহীদদের প্রতি সেটিই হবে আমার শ্রদ্ধা জানানো। ছাত্রটি লক্ষ্যভেদ করেছে। পুলিশের এএসপি হয়ে আমাকে জানিয়েছিল ওর সাফল্যের কথা। পরে পুলিশ দফতর ওর মেধার মূল্যায়ন করেছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেলে ওকে পৃষ্ঠপাষকতা দিয়েছে। ও সাফল্যের সঙ্গে ওর গবেষণা শেষ করেছে। দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে শুনেছি।

এমনি গর্ব করার মতো অনেক পুলিশ সদস্য আছেন আমাদের পুলিশ বাহিনীতে। তাহলে ক্ষতটি কোথায়? মাঠপর্যায়ে আকবর আর প্রদীপদের মতো বিপথগামী (অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বলছি) পুলিশের সংখ্যাও নিতান্ত কম হবে না। তাদের প্রশ্রয়দাতা নিশ্চয়ই আছে। তারা রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং পুলিশ প্রশাসনের ভেতরেই বসবাস করেন।

পুলিশ বাহিনীর সততা ও দৃঢ়তার মধ্যেই দেশের সার্বিক স্থিতিশীলতা ও সাধারণ মানুষের স্বস্তি অনেকটা নির্ভর করে। আমাদের মতো দেশে ক্ষমতার রাজনীতি পুলিশ সদস্যদের আদর্শকে ভেঙে চৌচির করে দেয়। আমরা মনে করি, আমাদের পুলিশ বাহিনীকে সমর্যাদায় উজ্জ্বল রাখতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে শপথ নিতে হবে।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

প্রদীপ-আকবররা সংখ্যায় কত?

 এ কে এম শাহনাওয়াজ 
২০ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে অনেককাল থেকেই রিমান্ডে নিয়ে অভিযুক্ত অপরাধীর কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার জন্য পুলিশি নির্যাতন একটি অবধারিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। হয়তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নির্যাতনের রকমফের হয়েছে- মাত্রার পরিবর্তন হয়েছে।

শুনেছি অনেক সভ্য দেশেই শারীরিক নির্যাতন নয়, মনস্তাত্ত্বিকভাবে অপরাধীর কাছ থেকে কথা আদায় করা হয়। কখনও কখনও বিশেষ প্রয়োজনে শারীরিক নির্যাতনও করা হয়। তবে বাংলাদেশি স্টাইলটি সর্বত্র প্রচলিত আছে কি-না আমার জানা নেই।

বাংলার ইতিহাস থেকে যতটুকু জানা যায়, তাতে ইংরেজ শাসন যুগে বিদ্রোহী বিপ্লবীদের ধরে এনে নির্যাতন করা হতো। ওরাই হয়তো আমাদের শিখিয়েছে পুলিশি ব্যবস্থাপনায় কীভাবে আসামির কাছ থেকে কথা বের করতে হয়। সমকালীন ইতিহাস গ্রন্থ না থাকায় বিদেশি পর্যটকদের বিবরণী এবং সমকালীন বাংলাসাহিত্য থেকে আমরা মধ্যযুগের বাংলার এ সংক্রান্ত কিছু ছবি পাই।

সুলতানি যুগে থানাকে বলা হতো কোতোয়ালি। আর থানার প্রধান দারোগাকে বলা হতো কোতোয়াল। কোতোয়ালরা সুলতান বা স্থানীয় প্রশাসক কাজির আদেশ পালন করতেন। রাজাদর্শ তখন জনকল্যাণমুখী ছিল। ষোলশতকের প্রথম পর্বে বাংলার সবচেয়ে খ্যাতিমান স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহের সময় শ্রী চৈতন্যদেব নব্যবৈষ্ণব আন্দোলনের মাধ্যমে হিন্দু সমাজ রক্ষার চেষ্টা করছিলেন।

সুফি প্রভাবে নিু শ্রেণির বড় সংখ্যক হিন্দু ততক্ষণে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিল। হিন্দু সমাজকে রক্ষার জন্য চৈতন্যদেব রক্ষণশীল ব্রাহ্মণদের কট্টর বিধি-নিষেধের বাইরে একটি উদার ধর্মীয় ধারা প্রচার করলেন। এতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের প্রবণতা কমে যায়। তাই অনেক মুসলমান অমাত্যের ক্ষোভ ছিল চৈতন্যদেবের প্রতি। এর মধ্যে একবার রাজধানী গৌড়ের কাছে চৈতন্য আসেন, তাকে দেখতে ছুটে যায় অসংখ্য মানুষ।

স্বয়ং সুলতানও ঠিক করলেন তিনি চৈতন্যকে দেখতে যাবেন। সভাসদদের অনেকে চৈতন্যের বিরুদ্ধে কান ভারি করতে লাগল সুলতানের। চৈতন্যের কারণে সুফিদের ধর্মান্তর কার্যক্রম কমে যাচ্ছে। তারা সুলতানকে প্ররোচিত করতে থাকেন এ বৈষ্ণব ঠাকুরকে দেশ ছাড়া করতে। চৈতন্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন সুলতান।

গভীর মনোযোগে চৈতন্যের কার্যক্রম পর্যালোচনা করলেন। অবশেষে নগর কোতোয়ালকে ডেকে আদেশ দিলেন এ ঠাকুর যত ইচ্ছা তার ধর্ম প্রচার করবেন- কেউ যদি বাধা দেয় তবে তাকে শাস্তি দেবে। রাষ্ট্রের এমন নিরপেক্ষ-উদার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বলে পুলিশ প্রশাসনকে নিয়ে সমকালীন বাংলাসাহিত্যে তেমন কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

এখন তো একশ্রেণির পুলিশ সদস্যের অপকীর্তির কারণে গোটা পুলিশ প্রশাসনকে সাধারণ মানুষের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে। পুলিশি অত্যাচারে সিলেটের যুবক রায়হানের নিহত হওয়ার পর এবার ফুঁসে উঠেছে মানুষ। কিছুদিন আগে মিরপুরে পল্লবী থানায় পুলিশি নির্যাতনে আসামি হত্যায় পুলিশের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে; কিন্তু বেআইনি কাজে লিপ্ত থাকা পুলিশ এতে যে সংযত হয়েছে, একের পর এক অঘটন দেখে তা মনে হয় না।

সবচেয়ে দুর্ভাগ্য হচ্ছে, আমাদের পুলিশ বাহিনীর মধ্যে অনেক সৎ ও আদর্শবান পুলিশ কর্মকর্তা থাকার পরও কিছু সদস্যের দানবিক আচরণের কারণে মন্দদের সংযত করা যাচ্ছে না। এর হয়তো নানা কারণ থাকে; কখনও অর্থ-প্রতিপত্তির কারণে শাসন করা যায় না। কখনও রাজনৈতিক প্রভাব তাদের একচোখা বুনো ষাঁড় করে ফেলে।

না হলে প্রদীপের মতো একজন থানার ওসি এত বেপরোয়া শক্তিমান হয়ে বছরের পর বছর ‘গুরুত্বপূর্ণ’ অঞ্চলে কাটিয়ে দিতে পারে কেমন করে? একজন তরুণ এসআই আকবর তার ১০ হাজার টাকার অবৈধ দাবি পূরণ করতে না পারায় নির্যাতন করে অমানবিকভাবে মেরে ফেলতে পারে আরেক তরুণ রায়হানকে।

স্বল্প বেতনভুক এসআই আকবর এখনই বানিয়ে ফেলেছে প্রাসাদ। অথচ যাদের দেখার কথা চোখ বন্ধ করে রেখেছে। অঘটন ঘটানোর পর হৈচৈ বাধার আগে ওসি প্রদীপের শতকোটি টাকার সম্পদই যখন চোখে পড়ে না, সেখানে আকবর কোন ছাড়! অনেকের ধারণা পুলিশের ভেতর এমন আকবর অনেক পাওয়া যাবে।

ক্ষমতা থাকলে টাকা বানানোর কারখানা যেন এদেশ। ২০০৯-এর কথা বলছি। আমি তখন একটি হলের প্রভোস্ট। আমার এক ছাত্র ছাত্রলীগের নেতাকে একান্তে বললাম তোমরা চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দখলবাজির সংস্কৃতি থেকে বেরোতে পারও না? ওর একটি সরল উক্তি এখনও আমার কানে বাজে।

বলল, অমুক ভাই বিএনপি আমলে ছাত্রদলের বড় নেতা ছিল। এখনও নেতৃত্ব দিচ্ছে। ছাত্র থাকতেই সাভারে একটি আর ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট কিনেছে। নতুন চকচকে গাড়িতে চলাচল করে। ব্যাংকেও আছে অনেক টাকা। আমরা এখন পাওয়ারে, তাই আমাদেরও রাইট আছে সম্পদের মালিক হওয়ার।

আসলে এ-ও এক ধরনের প্রতিযোগিতা। একইভাবে মাঠ পর্যায়ের কোনো কোনো পুলিশ কর্মকর্তা যদি মনে করে ওমুক থানার কর্মকর্তা চাকরির পাঁচ বছরে পাঁচতলা বাড়ির মালিক হয়েছে; আমিইবা পিছিয়ে থাকব কেন, এমন অকাট্য যুক্তির পর আর কী বলার থাকে!

বাংলাদেশ আকারে খুব বড় নয়। অনেকেরই সুখ-দুঃখের খবর প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজন জানে। সুতরাং লুকোছাপার কিছু নেই। আসামির কোর্ট থেকে দেয়া রিমান্ড অথবা থানায় ধরে এনে নির্যাতন একটি অবধারিত বিষয়। এ কারণে অপরাধী হোক বা অপরাধী সাজিয়ে আনা হোক, পরিবারের লোকজন চাইবে তাদের স্বজন যাতে কম অত্যাচারিত হয়।

প্রচলিত আছে, অনেক ক্ষেত্রে নাকি পুলিশ দেন-দরবারের জন্য পথ খুলে রাখে। অসহায় পরিবারগুলো বাধ্য হয় চাহিদা মতো একটি বড় অঙ্কের টাকা তুলে দিতে। তাতে যদি স্বজন নির্যাতনের হাত থেকে একটু রেহাই পায়। এমন কথাও প্রচারিত থাকে, থানাদারদের হঠাৎ অর্থের প্রয়োজন পড়লে নাকি কয়েকটি ইয়াবা ধরনের মাদক পকেটে ঢুকিয়ে মাদক মামলায় নিরীহ কাউকে আটক করে।

তখন ছুটোছুটি শুরু হয় আত্মীয়স্বজনদের। টাকা-পয়সা দিয়ে নিরপরাধ লোকটিকে ছাড়িয়ে আনে। এর সত্যাসত্য আমার জানা নেই; কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে এ ধরনের বিশ্বাস জন্মে গেছে। আমি এক স্কুল শিক্ষককে জানি। সংস্কৃতিমনা এ শিক্ষকের সঙ্গে গাজীপুরের এক অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছিল। সহজ-সরল এ শিক্ষক মাঝেমাঝে ফোন করে খবর নিতেন আমার। অনেক বছর আগের কথা।

একদিন খবর পেলাম, জঙ্গি সন্দেহে দশ-পনের জনকে আটক করেছে পুলিশ। তার মধ্যে এ শিক্ষকও আছেন। আমি বেশ বিস্মিত হয়েছিলাম। পরে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় এ শিক্ষকসহ কয়েকজন ছাড়া পেয়েছিলেন। পরে শুনলাম, গ্রেফতারের পর প্রত্যেকের বাড়িতে পুলিশের পক্ষ থেকে খবর যায় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ নিয়ে রাত ১২টার মধ্যে থানায় যেতে হবে। এ শিক্ষক মহোদয়ের স্ত্রীকে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে ছুটতে হয়েছিল টাকা জোগাড় করতে।

আমার কাছে মনে হয়, এসব অভিযোগে বাড়াবাড়ি আছে। না হলে অন্যায়ের এমন ওপেন সিক্রেট অবস্থা অথচ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানবেন না- তা তো হয় না! কিন্তু সাধারণ মানুষের তো স্বস্তি ফিরছে না। প্রদীপ গংরা মানুষকে নির্যাতন করে হত্যা করছে। আকবররা রায়হানদের কাছ থেকে চাহিদামতো অর্থ না পেয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলছে। এসব ঘটনা তো আর আড়াল করা যাচ্ছে না।

এ সমাজেরই মানুষ আমরা। আমাদের আত্মীয়স্বজন, ছাত্রছাত্রী অনেকেই পুলিশ বাহিনীতে আছেন। অনেককেই অত্যন্ত সৎ ও দেশপ্রেমিক অফিসার বলেই জানি। এ হিসেবে বলা যায়, পুলিশ বাহিনীতে অনেক সৎ অফিসার বা সদস্য আছেন। তবে অসৎরা কীভাবে প্রশ্রয় পায় সে এক রহস্য।

আমি এক নামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে গর্ব করে বলতাম মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী রাজারবাগের পুলিশ সদস্যদের কথা। আমার এক অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র এতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। সে তার জীবনের লক্ষ্য ঠিক করেছিল পুলিশ অফিসার হবে। আমি ওকে বলেছিলাম আমার বিশ্বাস তুমি বিসিএস দিয়ে আরও অনেক আকর্ষণীয় ক্যাডার পাবে। তবে পুলিশেই কেন?

ওর উত্তর ছিল আপনার কাছে রাজারবাগের পুলিশদের কথা শুনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পুলিশের মর্যাদা ফিরিয়ে আনব আমি। শহীদদের প্রতি সেটিই হবে আমার শ্রদ্ধা জানানো। ছাত্রটি লক্ষ্যভেদ করেছে। পুলিশের এএসপি হয়ে আমাকে জানিয়েছিল ওর সাফল্যের কথা। পরে পুলিশ দফতর ওর মেধার মূল্যায়ন করেছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেলে ওকে পৃষ্ঠপাষকতা দিয়েছে। ও সাফল্যের সঙ্গে ওর গবেষণা শেষ করেছে। দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে শুনেছি।

এমনি গর্ব করার মতো অনেক পুলিশ সদস্য আছেন আমাদের পুলিশ বাহিনীতে। তাহলে ক্ষতটি কোথায়? মাঠপর্যায়ে আকবর আর প্রদীপদের মতো বিপথগামী (অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বলছি) পুলিশের সংখ্যাও নিতান্ত কম হবে না। তাদের প্রশ্রয়দাতা নিশ্চয়ই আছে। তারা রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং পুলিশ প্রশাসনের ভেতরেই বসবাস করেন।

পুলিশ বাহিনীর সততা ও দৃঢ়তার মধ্যেই দেশের সার্বিক স্থিতিশীলতা ও সাধারণ মানুষের স্বস্তি অনেকটা নির্ভর করে। আমাদের মতো দেশে ক্ষমতার রাজনীতি পুলিশ সদস্যদের আদর্শকে ভেঙে চৌচির করে দেয়। আমরা মনে করি, আমাদের পুলিশ বাহিনীকে সমর্যাদায় উজ্জ্বল রাখতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে শপথ নিতে হবে।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]