পয়সা দিয়ে পরিষেবা পেতে কেন এত হয়রানি?
jugantor
পয়সা দিয়ে পরিষেবা পেতে কেন এত হয়রানি?

  আহমেদ আববাস  

২০ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আপনি দেশের একজন নিরপেক্ষ ও ন্যায়নিষ্ঠ নাগরিক। দেশের বাসিন্দা হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে বিভিন্ন পরিষেবা পাওয়ার জন্য আপনি অর্থ প্রদান করে থাকেন। অর্থাৎ আপনি ফি-বছর বিভিন্ন খাতে খাজনা দেন, কর প্রদান করেন।

সেই টাকা দিয়েই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন হয়, তাদের সংসার চলে। কিন্তু যখনই আপনি কোনো দফতরে সেবা গ্রহণ করতে যাবেন, তখনই দেখা যাবে উল্টোচিত্র। আপনি সেখানে নাজেহাল হবেন, ক্রমাগত নাকাল হতে থাকবেন, জেরবারের কোনো শেষ থাকবে না।

কিন্তু কেন? আপনি তো সময়মতো সেবা পাওয়ার জন্য কর্মচারীদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করে থাকেন। তাহলে কেন এ হয়রানি? কেন এ বিড়ম্বনা? দুর্নীতিবাজদের কোনোকিছু মনে থাকে না, তাদের চক্ষুলজ্জা নেই। নীতিভ্রষ্টতায় তাদের নৈতিকতা নষ্ট হয়ে গেছে। আপনার পয়সায় পরিপুষ্ট হয়ে এখন আপনার ওপরই ছোবল হানে তারা।

আপনি কোথায় যাবেন? ভূমি অফিসে কর পরিশোধের জন্য যাবেন, সেখানেও নীরবে-নিঃশব্দে ঘুষ দিয়ে কাজ হাসিল করতে হবে। পারিতোষিক গ্রহণকারীর পরিচয় উন্মোচন করতে চাইলে আপনিই ঝামেলায় পড়বেন।

আপনি সেবার জন্য পুলিশের কাছে যাবেন, প্রথমে জিডি করতে টাকা তারপর আসামিকে ধরা কিংবা কারও সঙ্গে মধ্যস্থতা করার জন্য আরেক প্রস্থ পয়সা। তাছাড়া আরও আছে- নির্দোষ-নিরপরাধ ব্যক্তির পকেটে মাদকদ্রব্য ঢুকিয়ে কিংবা মাদকসেবী সন্দেহে গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ।

কর অঞ্চলে আয়কর দিতে যাবেন, সেখানে অনেক কিছুর ওপর করারোপ করে আপনাকে একটা মোটা অঙ্কের ফর্দ ধরিয়ে দেয়া হবে। আপনি অ্যামাউন্ট ছোট করার জন্য বাধ্য হয়ে কড়কড়ে কড়ি গুনে দেবেন। কাস্টমসের কথা কিছু বলার নেই।

এ সংস্থার একজন পিয়নের বাসায় গেলেই নিজের দৈন্যের কথা চাগাড় দিয়ে উঠবে। রাতে আট ঘণ্টা ডিউটি করে যে কাস্টমস কর্মকর্তা ব্রিফকেস হাতে সকালে বাসায় ফেরে, সেই ব্রিফকেস ভাগমতো একটা যদি কোনোভাবে আপনার হাতে আসে, তাহলে আপনার ভাগ্যের চাকা অটোমেটিক ঘুরে যাবে।

আপনি শিক্ষক হয়েও যদি শিক্ষা দফতরের কোনো কাজে যান, সেখানেও কড়ি না ফেলে কোনো কাজ করতে পারবেন না। আপনি সরকারি হাসপাতালে যাবেন, সেখানে কোনো ওষুধ নেই, রোগ নিরূপণের জন্য কোনো নিরীক্ষা নেই। স্বাস্থ্য বিভাগের বিরুদ্ধে কোনো কিছু লিখে আর কাউকে খাটো করতে চাইছি না।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মচারী আবজাল এবং ড্রাইভার আবদুল মালেকের সম্পদ দিয়েই একটা পদ্মা সেতু তৈরি করা সম্ভব। সেবার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগ, তিতাস গ্যাস কিংবা ওয়াসায় কোনো অভিযোগ নিয়ে যাবেন, নিষ্পত্তির জন্য নাস্তানাবুদ নয়, নগদ কিছু দিলেই খুশি হয়ে তারা সব সমস্যার সমাধান করে দেবে।

যারা পেনশনে একবার গেছেন, তারাই জানেন সারা জীবন চাকরির সুফল উঠানোয় কী হ্যাপা। হাঁটতে হাঁটতে আপনার জুতার তলা ক্ষয় হয়ে যাবে, স্পিডমানি দিতে দিতে সব সঞ্চয় শিকেয় উঠবে, তবু আপনার ফাইল নড়তে চাইবে না। আপনি যেখানেই যান, সেখানেই দেখবেন পয়সা দিয়েও পরিপূর্ণ পরিষেবা পাচ্ছেন না। সবাই পারিতোষিকের জন্য ফাঁদ পেতে বসে আছে।

রাষ্ট্রের সব সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানই সাধারণ মানুষের পকেট খালি করার জন্য জাল পেতে রেখেছে। অথচ তারা সবাই চাকরি করে, মাসে মাসে বেতন পায়। তবু তাদের ধ্যান-ধারণা একটাই- কাজ করতে হলে কড়ি দিতে হবে, নচেৎ কোনো কাজ নয়। আপনি কোনো কাজের জন্য গিয়ে দিনকে দিন ওইসব পরজীবী সরকারি কর্মচারীর হাতের ক্রীড়নকে পরিণত হয়ে পড়েছেন।

বিভিন্ন দফতরে কিছু কিছু সৎ, নির্ভরযোগ্য ও ন্যায়পরায়ণ কর্মচারী আছে বলেই সেখানে দাফতরিক কাঠামো এখনও টিকে আছে। এ জন্য মানুষ কিছুটা স্বস্তি পায়। রাষ্ট্র কিছুটা পরিত্রাণ পায়। জীবন বাজি রেখে পুলিশ অনেক মানবিক কাজ করলেও কিছু অসৎ, অর্থলিপ্সু পুলিশ সদস্যের দুর্বৃত্তায়নের কারণে তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এমন অনেক সংস্থা রয়েছে যেখানে মুদ্রার পাল্লায় মনুষ্যত্ব বিক্রি হয়।

মালকড়িতেই মানবতা। দেশের দুর্নীতি প্রতিরোধকল্পে দুদক কাজ করে যাচ্ছে। অপরাধীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা করছে। কমিশনের ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায় দুর্নীতির মামলায় ৫৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে; তাদের মাঝে ২৮ জনই সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী। একটা দুর্নীতির মামলা নিষ্পত্তি হতে অনেক সময় লেগে যায়।

মধ্যবর্তী সময়ে তার চেয়ে বড় দুর্নীতিবাজের সন্ধান মেলে, তখন মানুষ পূর্ববর্তী দুর্নীতিবাজের কথা ভুলে যায়। আর আইনের ফাঁক-ফোকরে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি অবলীলায় বেরিয়ে পড়ে। আরেকটি অভিযোগ রয়েছে। দুদক কেবল নিু ও মাঝারি গোছের কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সরকারি সংস্থার কোনো শীর্ষ কর্মকর্তা কিংবা বড় আমলার বিরুদ্ধে মামলা করার নজির এখনও চোখে পড়েনি।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সারা জীবনই ছিলেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার এবং কঠোরহস্ত। তিনি তার এক ভাষণে বলেছিলেন, ‘শিক্ষিতজনের কাছে আমার একটাই প্রশ্ন, আমি যে দুর্নীতির কথা বলি- আমার কৃষক কি দুর্নীতিবাজ? না।

আমার শ্রমিক? না। তাহলে ঘুষ খায় কারা? বিদেশি এজেন্ট কারা? বিদেশে টাকা চালান দেয় কারা? হোর্ড করে কারা? এই আমরা, শতকরা ৫ জন শিক্ষিত চাকরিজীবী। এই আমাদের মধ্যেই ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ। আমি সরকারি কর্মচারীদের বলে দিবার চাই, আপনারা একজনও ঘুষ খাবেন না, ঘুষখোরদের আমি ক্ষমা করব না।’

জননেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ঘুষ প্রতিরোধকল্পে সব সরকারি কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধি করেছেন, তবু ঘুষের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হয়নি। গণমাধ্যমে তার ভাষণে তিনি বারবার ঘুষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়েছেন, কঠোর শাস্তির কথা বলেছেন। তারপরও নীতিভ্রষ্ট, বিকৃত ও অসাধু কর্মচারীরা থেমে নেই। এ জন্যই নরসিংদীর নারীনেত্রী পাপিয়ার পাপালয়ে আনন্দ-ফুর্তিবাজদের সারিতে সরকারি কর্মচারীদের প্রাধান্য লক্ষ করা গেছে।

মানুষ যদি নিজ থেকে সচেতন না হয়, নির্মোহ না হয়, ন্যায়বান না হয়; তাহলে দুর্নীতি কখনও নির্মূল হবে না। এ ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর মতো বিদ্যমান নীতিমালা যদি কখনও চালু করা যেত, তাহলে সব দুর্নীতি কর্পূরের মতো উবে যেত। সেখানে কারও বিরুদ্ধে চুরি ও নারী সংক্রান্ত নৈতিক স্খলনের রিপোর্ট প্রমাণিত হলে তাকে তৎক্ষণাৎ বিনা পেনশনে বহিষ্কার করা হয়, উত্তর বিচার প্রার্থনার কোনো সুযোগ নেই। যদি পঁচিশ পয়সার মতো ছিঁচকে চুরির সন্ধানও মেলে তবু তাকে চাকরিতে রাখা হয় না।

কোনোভাবেই দুর্নীতি রোধ করা না গেলে ক্রমশ পুকুরচুরি হতেই থাকবে। যেমনটি পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে একটি বালিশ ক্রয়ে ৬ হাজার টাকা খরচ হয়েছে কিংবা ফরিদপুর মেডিকেল কলেজে একটি পর্দা ক্রয়ে ৩৭ লাখ টাকা অর্থব্যয়।

আবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পে ২১টি নারিকেল চারা রোপণে পরিব্যয় ধরা হয় ১৩ কোটি টাকা এবং দুটি টিনের ছাপড়া তৈরিতে ব্যয়িত অর্থের পরিমাণও দাঁড়ায় ৬ কোটি টাকা। সেখানে আবার কেউ কেউ কলাগাছ লাগিয়েও আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে।

একটি কলাগাছ লাগানোয় কারও কারও পকেটে আসে ঝরঝরে ৬ লাখ টাকা। এরূপ খরচের অঙ্ক দেখে কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, ‘এ যেন সিঁদ কেটে পুকুরচুরি, একেবারে দিনে-দুপুরে ডাকাতি।’

আহমেদ আববাস : অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা

[email protected]

পয়সা দিয়ে পরিষেবা পেতে কেন এত হয়রানি?

 আহমেদ আববাস 
২০ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আপনি দেশের একজন নিরপেক্ষ ও ন্যায়নিষ্ঠ নাগরিক। দেশের বাসিন্দা হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে বিভিন্ন পরিষেবা পাওয়ার জন্য আপনি অর্থ প্রদান করে থাকেন। অর্থাৎ আপনি ফি-বছর বিভিন্ন খাতে খাজনা দেন, কর প্রদান করেন।

সেই টাকা দিয়েই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন হয়, তাদের সংসার চলে। কিন্তু যখনই আপনি কোনো দফতরে সেবা গ্রহণ করতে যাবেন, তখনই দেখা যাবে উল্টোচিত্র। আপনি সেখানে নাজেহাল হবেন, ক্রমাগত নাকাল হতে থাকবেন, জেরবারের কোনো শেষ থাকবে না।

কিন্তু কেন? আপনি তো সময়মতো সেবা পাওয়ার জন্য কর্মচারীদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করে থাকেন। তাহলে কেন এ হয়রানি? কেন এ বিড়ম্বনা? দুর্নীতিবাজদের কোনোকিছু মনে থাকে না, তাদের চক্ষুলজ্জা নেই। নীতিভ্রষ্টতায় তাদের নৈতিকতা নষ্ট হয়ে গেছে। আপনার পয়সায় পরিপুষ্ট হয়ে এখন আপনার ওপরই ছোবল হানে তারা।

আপনি কোথায় যাবেন? ভূমি অফিসে কর পরিশোধের জন্য যাবেন, সেখানেও নীরবে-নিঃশব্দে ঘুষ দিয়ে কাজ হাসিল করতে হবে। পারিতোষিক গ্রহণকারীর পরিচয় উন্মোচন করতে চাইলে আপনিই ঝামেলায় পড়বেন।

আপনি সেবার জন্য পুলিশের কাছে যাবেন, প্রথমে জিডি করতে টাকা তারপর আসামিকে ধরা কিংবা কারও সঙ্গে মধ্যস্থতা করার জন্য আরেক প্রস্থ পয়সা। তাছাড়া আরও আছে- নির্দোষ-নিরপরাধ ব্যক্তির পকেটে মাদকদ্রব্য ঢুকিয়ে কিংবা মাদকসেবী সন্দেহে গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ।

কর অঞ্চলে আয়কর দিতে যাবেন, সেখানে অনেক কিছুর ওপর করারোপ করে আপনাকে একটা মোটা অঙ্কের ফর্দ ধরিয়ে দেয়া হবে। আপনি অ্যামাউন্ট ছোট করার জন্য বাধ্য হয়ে কড়কড়ে কড়ি গুনে দেবেন। কাস্টমসের কথা কিছু বলার নেই।

এ সংস্থার একজন পিয়নের বাসায় গেলেই নিজের দৈন্যের কথা চাগাড় দিয়ে উঠবে। রাতে আট ঘণ্টা ডিউটি করে যে কাস্টমস কর্মকর্তা ব্রিফকেস হাতে সকালে বাসায় ফেরে, সেই ব্রিফকেস ভাগমতো একটা যদি কোনোভাবে আপনার হাতে আসে, তাহলে আপনার ভাগ্যের চাকা অটোমেটিক ঘুরে যাবে।

আপনি শিক্ষক হয়েও যদি শিক্ষা দফতরের কোনো কাজে যান, সেখানেও কড়ি না ফেলে কোনো কাজ করতে পারবেন না। আপনি সরকারি হাসপাতালে যাবেন, সেখানে কোনো ওষুধ নেই, রোগ নিরূপণের জন্য কোনো নিরীক্ষা নেই। স্বাস্থ্য বিভাগের বিরুদ্ধে কোনো কিছু লিখে আর কাউকে খাটো করতে চাইছি না।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মচারী আবজাল এবং ড্রাইভার আবদুল মালেকের সম্পদ দিয়েই একটা পদ্মা সেতু তৈরি করা সম্ভব। সেবার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগ, তিতাস গ্যাস কিংবা ওয়াসায় কোনো অভিযোগ নিয়ে যাবেন, নিষ্পত্তির জন্য নাস্তানাবুদ নয়, নগদ কিছু দিলেই খুশি হয়ে তারা সব সমস্যার সমাধান করে দেবে।

যারা পেনশনে একবার গেছেন, তারাই জানেন সারা জীবন চাকরির সুফল উঠানোয় কী হ্যাপা। হাঁটতে হাঁটতে আপনার জুতার তলা ক্ষয় হয়ে যাবে, স্পিডমানি দিতে দিতে সব সঞ্চয় শিকেয় উঠবে, তবু আপনার ফাইল নড়তে চাইবে না। আপনি যেখানেই যান, সেখানেই দেখবেন পয়সা দিয়েও পরিপূর্ণ পরিষেবা পাচ্ছেন না। সবাই পারিতোষিকের জন্য ফাঁদ পেতে বসে আছে।

রাষ্ট্রের সব সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানই সাধারণ মানুষের পকেট খালি করার জন্য জাল পেতে রেখেছে। অথচ তারা সবাই চাকরি করে, মাসে মাসে বেতন পায়। তবু তাদের ধ্যান-ধারণা একটাই- কাজ করতে হলে কড়ি দিতে হবে, নচেৎ কোনো কাজ নয়। আপনি কোনো কাজের জন্য গিয়ে দিনকে দিন ওইসব পরজীবী সরকারি কর্মচারীর হাতের ক্রীড়নকে পরিণত হয়ে পড়েছেন।

বিভিন্ন দফতরে কিছু কিছু সৎ, নির্ভরযোগ্য ও ন্যায়পরায়ণ কর্মচারী আছে বলেই সেখানে দাফতরিক কাঠামো এখনও টিকে আছে। এ জন্য মানুষ কিছুটা স্বস্তি পায়। রাষ্ট্র কিছুটা পরিত্রাণ পায়। জীবন বাজি রেখে পুলিশ অনেক মানবিক কাজ করলেও কিছু অসৎ, অর্থলিপ্সু পুলিশ সদস্যের দুর্বৃত্তায়নের কারণে তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এমন অনেক সংস্থা রয়েছে যেখানে মুদ্রার পাল্লায় মনুষ্যত্ব বিক্রি হয়।

মালকড়িতেই মানবতা। দেশের দুর্নীতি প্রতিরোধকল্পে দুদক কাজ করে যাচ্ছে। অপরাধীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা করছে। কমিশনের ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায় দুর্নীতির মামলায় ৫৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে; তাদের মাঝে ২৮ জনই সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী। একটা দুর্নীতির মামলা নিষ্পত্তি হতে অনেক সময় লেগে যায়।

মধ্যবর্তী সময়ে তার চেয়ে বড় দুর্নীতিবাজের সন্ধান মেলে, তখন মানুষ পূর্ববর্তী দুর্নীতিবাজের কথা ভুলে যায়। আর আইনের ফাঁক-ফোকরে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি অবলীলায় বেরিয়ে পড়ে। আরেকটি অভিযোগ রয়েছে। দুদক কেবল নিু ও মাঝারি গোছের কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সরকারি সংস্থার কোনো শীর্ষ কর্মকর্তা কিংবা বড় আমলার বিরুদ্ধে মামলা করার নজির এখনও চোখে পড়েনি।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সারা জীবনই ছিলেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার এবং কঠোরহস্ত। তিনি তার এক ভাষণে বলেছিলেন, ‘শিক্ষিতজনের কাছে আমার একটাই প্রশ্ন, আমি যে দুর্নীতির কথা বলি- আমার কৃষক কি দুর্নীতিবাজ? না।

আমার শ্রমিক? না। তাহলে ঘুষ খায় কারা? বিদেশি এজেন্ট কারা? বিদেশে টাকা চালান দেয় কারা? হোর্ড করে কারা? এই আমরা, শতকরা ৫ জন শিক্ষিত চাকরিজীবী। এই আমাদের মধ্যেই ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ। আমি সরকারি কর্মচারীদের বলে দিবার চাই, আপনারা একজনও ঘুষ খাবেন না, ঘুষখোরদের আমি ক্ষমা করব না।’

জননেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ঘুষ প্রতিরোধকল্পে সব সরকারি কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধি করেছেন, তবু ঘুষের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হয়নি। গণমাধ্যমে তার ভাষণে তিনি বারবার ঘুষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়েছেন, কঠোর শাস্তির কথা বলেছেন। তারপরও নীতিভ্রষ্ট, বিকৃত ও অসাধু কর্মচারীরা থেমে নেই। এ জন্যই নরসিংদীর নারীনেত্রী পাপিয়ার পাপালয়ে আনন্দ-ফুর্তিবাজদের সারিতে সরকারি কর্মচারীদের প্রাধান্য লক্ষ করা গেছে।

মানুষ যদি নিজ থেকে সচেতন না হয়, নির্মোহ না হয়, ন্যায়বান না হয়; তাহলে দুর্নীতি কখনও নির্মূল হবে না। এ ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর মতো বিদ্যমান নীতিমালা যদি কখনও চালু করা যেত, তাহলে সব দুর্নীতি কর্পূরের মতো উবে যেত। সেখানে কারও বিরুদ্ধে চুরি ও নারী সংক্রান্ত নৈতিক স্খলনের রিপোর্ট প্রমাণিত হলে তাকে তৎক্ষণাৎ বিনা পেনশনে বহিষ্কার করা হয়, উত্তর বিচার প্রার্থনার কোনো সুযোগ নেই। যদি পঁচিশ পয়সার মতো ছিঁচকে চুরির সন্ধানও মেলে তবু তাকে চাকরিতে রাখা হয় না।

কোনোভাবেই দুর্নীতি রোধ করা না গেলে ক্রমশ পুকুরচুরি হতেই থাকবে। যেমনটি পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে একটি বালিশ ক্রয়ে ৬ হাজার টাকা খরচ হয়েছে কিংবা ফরিদপুর মেডিকেল কলেজে একটি পর্দা ক্রয়ে ৩৭ লাখ টাকা অর্থব্যয়।

আবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পে ২১টি নারিকেল চারা রোপণে পরিব্যয় ধরা হয় ১৩ কোটি টাকা এবং দুটি টিনের ছাপড়া তৈরিতে ব্যয়িত অর্থের পরিমাণও দাঁড়ায় ৬ কোটি টাকা। সেখানে আবার কেউ কেউ কলাগাছ লাগিয়েও আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে।

একটি কলাগাছ লাগানোয় কারও কারও পকেটে আসে ঝরঝরে ৬ লাখ টাকা। এরূপ খরচের অঙ্ক দেখে কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, ‘এ যেন সিঁদ কেটে পুকুরচুরি, একেবারে দিনে-দুপুরে ডাকাতি।’

আহমেদ আববাস : অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা

[email protected]