সামারি ট্রায়াল ও মনিটরিং সেল দুটোই জরুরি
jugantor
সামারি ট্রায়াল ও মনিটরিং সেল দুটোই জরুরি

  সালমা ইসলাম  

২৩ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

একটি পরিসংখ্যান দিয়ে শুরু করা যাক- এ দেশে ধর্ষণের বিচারের ক্ষেত্রে মামলা শেষ হয়ে আসামির সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার হার ৩ শতাংশ।

অর্থাৎ ৯৭ শতাংশ অভিযুক্ত এ সংক্রান্ত মামলা থেকে মুক্তি পেয়ে যায়। এখানে আরও খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে।

বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল, পুরুষতান্ত্রিক একটি সমাজে প্রকৃতপক্ষে ধর্ষণের যত ঘটনা ঘটে, তার একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ প্রকাশ্যে আসে। প্রকাশ্যে আসা ঘটনাগুলোর মধ্যে বড় একটি অংশের ক্ষেত্রে ধর্ষকের সঙ্গে বিয়েসহ নানারকম সালিশ-আপস করে মীমাংসার চেষ্টা হয়।

শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসা ঘটনাগুলোর একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশই মামলা পর্যন্ত যায়। তাহলে সাজাপ্রাপ্ত এ তিন শতাংশ ধর্ষণের প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় যে কত নগণ্য হতে পারে, ভাবলে নিশ্চয়ই ভীষণ অবাক হব।

ধর্ষণের বিচার নিয়ে এই যে পরিস্থিতি, সেটি গত এক, দুই বা তিন বছরের ঘটনা নয়। তাহলে খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসতেই পারে- এত বছর রাষ্ট্র এ ব্যাপারটিতে কি মনোযোগ দেয়নি? কেন দেয়নি তাহলে? ধর্ষণের মতো বীভৎস অপরাধের প্রতি রাষ্ট্রের মনোযোগহীনতা কি আরও অনেক ধর্ষণের পথ তৈরি করেনি?

সিলেটের এমসি কলেজের গণধর্ষণ এবং এর ঠিক পরপরই বেগমগঞ্জে নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনার পর বরাবরের মতোই মিডিয়ায় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে- বাংলাদেশে ধর্ষণের মতো অপরাধের বিচার কেন এত কম হয়।

এ আলোচনাগুলো নতুন নয় মোটেও। মাঝে মধ্যেই খুব আলোচিত ধর্ষণের ঘটনা ঘটে এবং সেগুলো যখন মিডিয়ার মনোযোগ পায়, তখন ঠিক এর কারণগুলো আমাদের সামনে উঠে আসে। আমরা জানি পুলিশি তদন্তের সমস্যার কথা, আমাদের আইনের ত্রুটির কথা, বিচার প্রক্রিয়া নারীবান্ধব না হওয়ার কথা, পর্যাপ্ত ট্রাইব্যুনালের অভাবে বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কথা।

এবার অবশ্য মানুষের আন্দোলনের মুখে আর সবকিছুকে বাদ দিয়ে ধর্ষণের ক্ষেত্রে নতুন যুক্ত হয়েছে মৃত্যুদণ্ড। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মৃত্যুদণ্ডের ধারার সংখ্যা সাতটি। ধর্ষণের ক্ষেত্রে এটি যুক্ত করায় ধারার সংখ্যা হয়েছে আটটি। ধর্ষণের ক্ষেত্রে এ সাজা ধর্ষণ কমাতে কতটা প্রভাব রাখতে পারে, সেটি সময়ই বলে দেবে।

ধর্ষণের আইনে মৃত্যুদণ্ড শাস্তি যুক্ত করার আগে আমাদের এটি বিবেচনায় নেয়া খুব জরুরি ছিল- বিদ্যমান শাস্তি যদি ঠিকঠাক মতো দেয়া যায়, তাহলে ধর্ষণ প্রতিরোধ করা যায় কিনা।

আমি বিশ্বাস করি, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তিও যদি ধর্ষকদের দেয়া যেত, তাহলেও সমাজে ধর্ষণের এ বাড়বাড়ন্ত অবস্থা থাকার প্রশ্নই আসত না।

এখন মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পরও তদন্ত, আইন কিংবা বিচারিক প্রক্রিয়ার ত্রুটির কারণে কয়জন আসামির মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত শাস্তি হতে পারে সেই প্রশ্ন খুব যৌক্তিক। বরং অনেক আইন বিশেষজ্ঞ এ কথা বলছেন সে ক্ষেত্রে দণ্ডপ্রাপ্তের হার বর্তমানে ৩ থেকে ১ শতাংশে নেমে আসতে পারে।

অপরাধবিজ্ঞান বলে, শুধু শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কোনো অপরাধ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে আনা যায় না। অপরাধ কমাতে হলে অপরাধ সৃষ্টি হওয়ার মূল কারণ নিয়ে কাজ করতে হয়। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য, দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে অপরাধ দমনে বেশ খানিকটা প্রভাব রাখতে পারে। তেমন শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে ধর্ষণ প্রতিরোধে অন্য সব পদক্ষেপ নেয়া যায়। বিশেষ করে এখন যখন চারদিক থেকে প্রতিদিন অনেক ধর্ষণের সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে, তখন এ ব্যাপারে দৃষ্টি দেয়াটাই স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে সুফল আনবে।

ধর্ষণের বিচার মামলাপ্রাপ্তির তারিখ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে- এটি আইনের অংশ। এছাড়াও ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার জন্য ২০১৯ সালে হাইকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম এবং বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের স্পষ্ট নির্দেশনা আছে। এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি নির্দেশনা হওয়া উচিত বিচারের এ সময়সীমা দৃঢ়ভাবে মেনে চলা।

তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, বর্তমানে ধর্ষণের পরিস্থিতি যেখানে গেছে সেটি একটি জরুরি পরিস্থিতি। জরুরি পরিস্থিতি জরুরি পদক্ষেপ ডিমান্ড করে। এ জরুরি পরিস্থিতিতে ধর্ষণের বিচারের জন্য ১৮০ দিনের সময়সীমাকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা বলে মনে হতেই পারে। তাই খুব বেশি আলোচিত কিছু ধর্ষণের ঘটনায় সামারি ট্রায়ালের ব্যবস্থা করাটা ভালো ফল দেবে।

সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে একেবারে ডেডিকেটেড ট্রাইব্যুনালে সামারি ট্রায়াল করে দ্রুত অপরাধীদের শাস্তি দেয়া গেলে এ মুহূর্তের জরুরি অবস্থা অনেকটা সামাল দেয়া যাবে। সারা দেশকে কাঁপিয়ে দেয়া এমসি কলেজের গণধর্ষণের ঘটনাটি কিংবা বেগমগঞ্জে বিবস্ত্র করে নারী নির্যাতনের ঘটনার অভিযুক্তদের যদি সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক সাজা দেয়া যায়, তাহলে সেটি নিশ্চিতভাবেই সারা দেশে ধর্ষণকারীদের প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।

ধর্ষণের মামলায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হচ্ছে মামলা হওয়ার পর ঠিক কোথায় কোথায় সমস্যা হচ্ছে এবং সেগুলো সমাধান করার জন্য কী কী পদক্ষেপ নেয়া দরকার সেগুলো নিয়ে কোনো মনিটরিং করা হয় না। ফলে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে একটি মামলা হয়তো হয়; কিন্তু সেই মামলাটি নানারকম কারণে কখনও তদন্তের দুর্বলতায়, কখনও প্রসিকিউশনের দুর্বলতায়, কখনও সাক্ষীসংক্রান্ত জটিলতায় আর রায় পর্যন্ত যেতে পারে না।

একটি মনিটরিং সেল থাকলে সেটি সারা দেশের ধর্ষণসংক্রান্ত মামলায়গুলো পর্যালোচনা করে সেগুলোর ক্ষেত্রে খামতি পূরণ করার দিকনির্দেশনা দিতে পারত। তাহলে একটি উল্লেখযোগ্য-সংখ্যক ধর্ষণের মামলা শেষ পর্যন্ত সাজার মুখ দেখত।

এমন একটি সক্ষম, পর্যাপ্তসংখ্যক কর্মীসহ মনিটরিং সেল হওয়া ভীষণ জরুরি ছিল; কিন্তু হয়নি সেটি। এখানে অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার হচ্ছে, হাইকোর্ট বিভাগই ২ বছর আগে ধর্ষণ মামলা পর্যালোচনা করে সেগুলোর গতি বাড়াতে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য একটা মনিটরিং সেল গঠন করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন।

দেশের সর্বোচ্চ আদালতের এ নির্দেশনাও অনুসরণ করা হয়নি। দেশব্যাপী ধর্ষণের এ ভয়ংকর প্রাদুর্ভাবের সময়ে ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড যুক্ত করার চেয়ে এ মনিটরিং সেল গঠন করে এর মধ্যে হওয়া মামলাগুলো পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেয়া অনেক জরুরি। এমন একটি সেলই পারে খুব দ্রুত বেশকিছু সাজা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সমাজে ধর্ষণের প্রাদুর্ভাব কমিয়ে আনতে।

একটি রাষ্ট্রে সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য আইন, বিধিমালা প্রতিষ্ঠান সবকিছু তৈরি করা জরুরি। কিন্তু সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, যে কোনো বিষয়ে ক্ষমতাসীনদের সদিচ্ছা। শুধু ধর্ষণ প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে নয়, এ দেশের সব সংকটে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সব সংকটের সমাধানের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতার অভাব নেই।

কিন্তু এ সত্যও মানতে হবে, অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবের কারণে কিছু অপরাধী অপরাধ করার সাহস পেয়ে যায়।

এমসি কলেজের ঘটনার পর আমরা দেখতে পাই পুলিশের উপস্থিতিতেই স্থানীয় আওয়ামী লীগ এবং তার সহযোগী সংগঠনের নেতা সেই ধর্ষণের ঘটনার আপস রফা করার চেষ্টা করেছিলেন।

আমরা এটিও দেখেছি, বেগমগঞ্জের নারী নির্যাতনের ঘটনার মূল হোতা দেলোয়ার অন্তত দুবার অস্ত্রসহ পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর তার বিরুদ্ধে মামলা হয়নি। ক্ষমতাসীন দলের মধ্য এবং নিম্ন পর্যায়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত এবং চাওয়া স্পষ্টভাবে পৌঁছতে হবে।

এ সংকটের মধ্যেও আমরা আশাবাদী; কারণ আমরা দেখেছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার নিজ দলের মধ্যেই শুদ্ধি অভিযান চালিয়েছেন। নানারকম দুর্নীতির জন্য নিজ দলের মানুষদেরই আইনের আওতায় এনেছেন।

এ দেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমি চাই এ অভিযান চলমান থাকুক। এ অভিযান যেন তার ব্যাপ্তি বাড়িয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রে পৌঁছে যায়। এ অভিযানের ভয়ে ভীত হয়ে এমসি কলেজের ধর্ষকদের মতো কিংবা বেগমগঞ্জের দেলোয়ারদের মতো আর কেউ যেন এমন অপরাধ করতে সাহস না পায়।

কোনো অপরাধের বীভৎসতা বোঝার জন্য নিজের সেই অপরাধের শিকার হতে হবে, এটি জরুরি নয়। এটিও কোনো জরুরি ব্যাপার নয়, বিশেষ লিঙ্গের ওপর ঘটা অপরাধ বোঝার জন্য সেই লিঙ্গের মানুষ হতে হবে। কিন্তু আমি নিজে নারী বলেই নারীর ওপর ঘটা বীভৎস অপরাধ, ধর্ষণ আমাকে বেশি আহত করে, কাঁপিয়ে দেয়। এ অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের নিস্পৃহতা আমাকে কষ্ট দেয়।

মানুষের ওপর ঘটানো খুব বেশি অপরাধ নেই যেগুলো একই সঙ্গে শারীরিক এবং মানসিক আঘাত তৈরি করে। ধর্ষণ সেই বিরল অপরাধগুলোর একটি, যেটি দুটো ক্ষেত্রেই প্রচণ্ডভাবে আহত করে নারীকে। ধর্ষিত নারী যদি বেঁচে যায়, তাহলে শারীরিক আঘাত সেরে যায় কিছুদিনের মধ্যেই।

কিন্তু মানসিক আঘাত তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় আমৃত্যু। সেই বিবেচনায় ধর্ষণ অন্যসব ফৌজদারি অপরাধের তুলনায় বেশি মনোযোগের দাবি রাখে। রাষ্ট্র সেই মনোযোগ এতদিন ধরে দেয়নি; কিন্তু সাম্প্রতিককালে ঘটা বর্বর সব ঘটনার পর আর এক মুহূর্ত দেরি করার সময় নেই। রাষ্ট্রকে এখন থেকে গভীর মনোযোগে এ সমস্যার সমাধান করতেই হবে।

অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি : চেয়ারম্যান, যমুনা গ্রুপ; প্রকাশক, যুগান্তর; সাবেক প্রতিমন্ত্রী, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়

সামারি ট্রায়াল ও মনিটরিং সেল দুটোই জরুরি

 সালমা ইসলাম 
২৩ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

একটি পরিসংখ্যান দিয়ে শুরু করা যাক- এ দেশে ধর্ষণের বিচারের ক্ষেত্রে মামলা শেষ হয়ে আসামির সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার হার ৩ শতাংশ।

অর্থাৎ ৯৭ শতাংশ অভিযুক্ত এ সংক্রান্ত মামলা থেকে মুক্তি পেয়ে যায়। এখানে আরও খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে।

বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল, পুরুষতান্ত্রিক একটি সমাজে প্রকৃতপক্ষে ধর্ষণের যত ঘটনা ঘটে, তার একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ প্রকাশ্যে আসে। প্রকাশ্যে আসা ঘটনাগুলোর মধ্যে বড় একটি অংশের ক্ষেত্রে ধর্ষকের সঙ্গে বিয়েসহ নানারকম সালিশ-আপস করে মীমাংসার চেষ্টা হয়।

শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসা ঘটনাগুলোর একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশই মামলা পর্যন্ত যায়। তাহলে সাজাপ্রাপ্ত এ তিন শতাংশ ধর্ষণের প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় যে কত নগণ্য হতে পারে, ভাবলে নিশ্চয়ই ভীষণ অবাক হব।

ধর্ষণের বিচার নিয়ে এই যে পরিস্থিতি, সেটি গত এক, দুই বা তিন বছরের ঘটনা নয়। তাহলে খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসতেই পারে- এত বছর রাষ্ট্র এ ব্যাপারটিতে কি মনোযোগ দেয়নি? কেন দেয়নি তাহলে? ধর্ষণের মতো বীভৎস অপরাধের প্রতি রাষ্ট্রের মনোযোগহীনতা কি আরও অনেক ধর্ষণের পথ তৈরি করেনি?

সিলেটের এমসি কলেজের গণধর্ষণ এবং এর ঠিক পরপরই বেগমগঞ্জে নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনার পর বরাবরের মতোই মিডিয়ায় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে- বাংলাদেশে ধর্ষণের মতো অপরাধের বিচার কেন এত কম হয়।

এ আলোচনাগুলো নতুন নয় মোটেও। মাঝে মধ্যেই খুব আলোচিত ধর্ষণের ঘটনা ঘটে এবং সেগুলো যখন মিডিয়ার মনোযোগ পায়, তখন ঠিক এর কারণগুলো আমাদের সামনে উঠে আসে। আমরা জানি পুলিশি তদন্তের সমস্যার কথা, আমাদের আইনের ত্রুটির কথা, বিচার প্রক্রিয়া নারীবান্ধব না হওয়ার কথা, পর্যাপ্ত ট্রাইব্যুনালের অভাবে বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কথা।

এবার অবশ্য মানুষের আন্দোলনের মুখে আর সবকিছুকে বাদ দিয়ে ধর্ষণের ক্ষেত্রে নতুন যুক্ত হয়েছে মৃত্যুদণ্ড। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মৃত্যুদণ্ডের ধারার সংখ্যা সাতটি। ধর্ষণের ক্ষেত্রে এটি যুক্ত করায় ধারার সংখ্যা হয়েছে আটটি। ধর্ষণের ক্ষেত্রে এ সাজা ধর্ষণ কমাতে কতটা প্রভাব রাখতে পারে, সেটি সময়ই বলে দেবে।

ধর্ষণের আইনে মৃত্যুদণ্ড শাস্তি যুক্ত করার আগে আমাদের এটি বিবেচনায় নেয়া খুব জরুরি ছিল- বিদ্যমান শাস্তি যদি ঠিকঠাক মতো দেয়া যায়, তাহলে ধর্ষণ প্রতিরোধ করা যায় কিনা।

আমি বিশ্বাস করি, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তিও যদি ধর্ষকদের দেয়া যেত, তাহলেও সমাজে ধর্ষণের এ বাড়বাড়ন্ত অবস্থা থাকার প্রশ্নই আসত না।

এখন মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পরও তদন্ত, আইন কিংবা বিচারিক প্রক্রিয়ার ত্রুটির কারণে কয়জন আসামির মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত শাস্তি হতে পারে সেই প্রশ্ন খুব যৌক্তিক। বরং অনেক আইন বিশেষজ্ঞ এ কথা বলছেন সে ক্ষেত্রে দণ্ডপ্রাপ্তের হার বর্তমানে ৩ থেকে ১ শতাংশে নেমে আসতে পারে।

অপরাধবিজ্ঞান বলে, শুধু শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কোনো অপরাধ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে আনা যায় না। অপরাধ কমাতে হলে অপরাধ সৃষ্টি হওয়ার মূল কারণ নিয়ে কাজ করতে হয়। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য, দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে অপরাধ দমনে বেশ খানিকটা প্রভাব রাখতে পারে। তেমন শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে ধর্ষণ প্রতিরোধে অন্য সব পদক্ষেপ নেয়া যায়। বিশেষ করে এখন যখন চারদিক থেকে প্রতিদিন অনেক ধর্ষণের সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে, তখন এ ব্যাপারে দৃষ্টি দেয়াটাই স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে সুফল আনবে।

ধর্ষণের বিচার মামলাপ্রাপ্তির তারিখ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে- এটি আইনের অংশ। এছাড়াও ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার জন্য ২০১৯ সালে হাইকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম এবং বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের স্পষ্ট নির্দেশনা আছে। এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি নির্দেশনা হওয়া উচিত বিচারের এ সময়সীমা দৃঢ়ভাবে মেনে চলা।

তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, বর্তমানে ধর্ষণের পরিস্থিতি যেখানে গেছে সেটি একটি জরুরি পরিস্থিতি। জরুরি পরিস্থিতি জরুরি পদক্ষেপ ডিমান্ড করে। এ জরুরি পরিস্থিতিতে ধর্ষণের বিচারের জন্য ১৮০ দিনের সময়সীমাকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা বলে মনে হতেই পারে। তাই খুব বেশি আলোচিত কিছু ধর্ষণের ঘটনায় সামারি ট্রায়ালের ব্যবস্থা করাটা ভালো ফল দেবে।

সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে একেবারে ডেডিকেটেড ট্রাইব্যুনালে সামারি ট্রায়াল করে দ্রুত অপরাধীদের শাস্তি দেয়া গেলে এ মুহূর্তের জরুরি অবস্থা অনেকটা সামাল দেয়া যাবে। সারা দেশকে কাঁপিয়ে দেয়া এমসি কলেজের গণধর্ষণের ঘটনাটি কিংবা বেগমগঞ্জে বিবস্ত্র করে নারী নির্যাতনের ঘটনার অভিযুক্তদের যদি সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক সাজা দেয়া যায়, তাহলে সেটি নিশ্চিতভাবেই সারা দেশে ধর্ষণকারীদের প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।

ধর্ষণের মামলায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হচ্ছে মামলা হওয়ার পর ঠিক কোথায় কোথায় সমস্যা হচ্ছে এবং সেগুলো সমাধান করার জন্য কী কী পদক্ষেপ নেয়া দরকার সেগুলো নিয়ে কোনো মনিটরিং করা হয় না। ফলে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে একটি মামলা হয়তো হয়; কিন্তু সেই মামলাটি নানারকম কারণে কখনও তদন্তের দুর্বলতায়, কখনও প্রসিকিউশনের দুর্বলতায়, কখনও সাক্ষীসংক্রান্ত জটিলতায় আর রায় পর্যন্ত যেতে পারে না।

একটি মনিটরিং সেল থাকলে সেটি সারা দেশের ধর্ষণসংক্রান্ত মামলায়গুলো পর্যালোচনা করে সেগুলোর ক্ষেত্রে খামতি পূরণ করার দিকনির্দেশনা দিতে পারত। তাহলে একটি উল্লেখযোগ্য-সংখ্যক ধর্ষণের মামলা শেষ পর্যন্ত সাজার মুখ দেখত।

এমন একটি সক্ষম, পর্যাপ্তসংখ্যক কর্মীসহ মনিটরিং সেল হওয়া ভীষণ জরুরি ছিল; কিন্তু হয়নি সেটি। এখানে অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার হচ্ছে, হাইকোর্ট বিভাগই ২ বছর আগে ধর্ষণ মামলা পর্যালোচনা করে সেগুলোর গতি বাড়াতে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য একটা মনিটরিং সেল গঠন করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন।

দেশের সর্বোচ্চ আদালতের এ নির্দেশনাও অনুসরণ করা হয়নি। দেশব্যাপী ধর্ষণের এ ভয়ংকর প্রাদুর্ভাবের সময়ে ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড যুক্ত করার চেয়ে এ মনিটরিং সেল গঠন করে এর মধ্যে হওয়া মামলাগুলো পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেয়া অনেক জরুরি। এমন একটি সেলই পারে খুব দ্রুত বেশকিছু সাজা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সমাজে ধর্ষণের প্রাদুর্ভাব কমিয়ে আনতে।

একটি রাষ্ট্রে সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য আইন, বিধিমালা প্রতিষ্ঠান সবকিছু তৈরি করা জরুরি। কিন্তু সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, যে কোনো বিষয়ে ক্ষমতাসীনদের সদিচ্ছা। শুধু ধর্ষণ প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে নয়, এ দেশের সব সংকটে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সব সংকটের সমাধানের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতার অভাব নেই।

কিন্তু এ সত্যও মানতে হবে, অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবের কারণে কিছু অপরাধী অপরাধ করার সাহস পেয়ে যায়।

এমসি কলেজের ঘটনার পর আমরা দেখতে পাই পুলিশের উপস্থিতিতেই স্থানীয় আওয়ামী লীগ এবং তার সহযোগী সংগঠনের নেতা সেই ধর্ষণের ঘটনার আপস রফা করার চেষ্টা করেছিলেন।

আমরা এটিও দেখেছি, বেগমগঞ্জের নারী নির্যাতনের ঘটনার মূল হোতা দেলোয়ার অন্তত দুবার অস্ত্রসহ পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর তার বিরুদ্ধে মামলা হয়নি। ক্ষমতাসীন দলের মধ্য এবং নিম্ন পর্যায়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত এবং চাওয়া স্পষ্টভাবে পৌঁছতে হবে।

এ সংকটের মধ্যেও আমরা আশাবাদী; কারণ আমরা দেখেছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার নিজ দলের মধ্যেই শুদ্ধি অভিযান চালিয়েছেন। নানারকম দুর্নীতির জন্য নিজ দলের মানুষদেরই আইনের আওতায় এনেছেন।

এ দেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমি চাই এ অভিযান চলমান থাকুক। এ অভিযান যেন তার ব্যাপ্তি বাড়িয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রে পৌঁছে যায়। এ অভিযানের ভয়ে ভীত হয়ে এমসি কলেজের ধর্ষকদের মতো কিংবা বেগমগঞ্জের দেলোয়ারদের মতো আর কেউ যেন এমন অপরাধ করতে সাহস না পায়।

কোনো অপরাধের বীভৎসতা বোঝার জন্য নিজের সেই অপরাধের শিকার হতে হবে, এটি জরুরি নয়। এটিও কোনো জরুরি ব্যাপার নয়, বিশেষ লিঙ্গের ওপর ঘটা অপরাধ বোঝার জন্য সেই লিঙ্গের মানুষ হতে হবে। কিন্তু আমি নিজে নারী বলেই নারীর ওপর ঘটা বীভৎস অপরাধ, ধর্ষণ আমাকে বেশি আহত করে, কাঁপিয়ে দেয়। এ অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের নিস্পৃহতা আমাকে কষ্ট দেয়।

মানুষের ওপর ঘটানো খুব বেশি অপরাধ নেই যেগুলো একই সঙ্গে শারীরিক এবং মানসিক আঘাত তৈরি করে। ধর্ষণ সেই বিরল অপরাধগুলোর একটি, যেটি দুটো ক্ষেত্রেই প্রচণ্ডভাবে আহত করে নারীকে। ধর্ষিত নারী যদি বেঁচে যায়, তাহলে শারীরিক আঘাত সেরে যায় কিছুদিনের মধ্যেই।

কিন্তু মানসিক আঘাত তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় আমৃত্যু। সেই বিবেচনায় ধর্ষণ অন্যসব ফৌজদারি অপরাধের তুলনায় বেশি মনোযোগের দাবি রাখে। রাষ্ট্র সেই মনোযোগ এতদিন ধরে দেয়নি; কিন্তু সাম্প্রতিককালে ঘটা বর্বর সব ঘটনার পর আর এক মুহূর্ত দেরি করার সময় নেই। রাষ্ট্রকে এখন থেকে গভীর মনোযোগে এ সমস্যার সমাধান করতেই হবে।

অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি : চেয়ারম্যান, যমুনা গ্রুপ; প্রকাশক, যুগান্তর; সাবেক প্রতিমন্ত্রী, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়