বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো!
jugantor
বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো!

  মো. ফিরোজ মিয়া  

২৩ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান আনা সংশোধনীটি হয়তো জনগণের ক্ষোভ প্রশমনে কার্যকর হবে।

এছাড়া একে রাজনৈতিক সাফল্য প্রচারেও ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু তা নারীর মর্যাদা ও সম্মান রক্ষা এবং নারীর প্রতি সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর হবে বলে মনে হয় না।

বিদ্যমান দণ্ডবিধি, সাক্ষ্য আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধি যুগপৎভাবে সংশোধন না করে কেবল খণ্ডিতভাবে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা ‘বজ্র আঁটুনির ফসকা গেরো’ ছাড়া আর কিছুই নয়।

এটা অনস্বীকার্য, ধর্ষণের মহামারী ও ভয়াবহতা রোধে মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর দণ্ডের বিধান করার কোনো বিকল্প ছিল না। তাই সরকারের এ উদ্যোগ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য হলেও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আনতে মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়।

আমাদের বিচারব্যবস্থায় ধর্ষণের মতো ঘৃণিত অপরাধের বিচার পাওয়ার পেছনে পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, আর্থিক ও আইনি প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করার পদক্ষেপ গ্রহণ ছাড়া কেবল মৃত্যুদণ্ডের বিধান দ্বারা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা আদৌ সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।

নারীর প্রতি অপরাধের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে আইনি প্রতিবন্ধকতা দূর করা। বাংলাদেশ এবং পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে একই দণ্ডবিধি, সাক্ষ্য আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধি প্রচলিত।

ভারত নারীর প্রতি অপরাধের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণের জন্য নতুন আইন প্রণয়ন না করে ওইসব আইন যুগপৎভাবে সংশোধন করে সেগুলোকে সমৃদ্ধ ও যুগোপযোগী করেছে।

অথচ বাংলাদেশে উল্লিখিত আইনগুলোয় যুগপৎভাবে প্রয়োজনীয় সংশোধনী না এনে খণ্ডিতভাবে অসম্পূর্ণ ও ক্রটিপূর্ণ নারী ও শিশু নির্যাতন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। আইনটির বয়স বিশ বছর হলেও এর অসম্পূর্ণতা ও ত্রুটি সংশোধনের কোনো কার্যক্রমই এখনও পর্যন্ত গ্রহণ করা হয়নি।

বর্তমান সংশোধনীর সময়ও আইনটি পর্যালোচনা করে এর অসম্পূর্ণতা ও ত্রুটি দূর করা হয়নি। ফলে নারীর প্রতি সংঘটিত অপরাধের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আশা দুরাশাই থেকে যাচ্ছে।

বিদ্যমান ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইন অনুযায়ী ধর্ষণ ও নারী সংক্রান্ত অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে নারীর চরিত্র নিয়ে আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করে নারীকে বিব্রত করা হয়।

এরূপ বিব্রত হওয়ার আশঙ্কায় অনেক নারী এবং তাদের পরিবার আইনের আশ্রয় নিতে আগ্রহী হয় না। এ অসুবিধা দূর করার লক্ষ্যে ভারত ২০১৩ সালে সাক্ষ্য আইনে ব্যাপক সংশোধনী এনেছে।

সেসব সংশোধনীর কারণে ভারতের আদালতে ধর্ষণ, নারীর শ্লীলতাহানি, যৌন নিপীড়ন, নারীর অশ্লীল ও আপত্তিকর চিত্রধারণ, স্টকিং ইত্যাদি অপরাধের বিচারের সময় নারীর চরিত্র নিয়ে কোনোরূপ প্রশ্ন উত্থাপন করা যায় না। অর্থাৎ ওইসব অপরাধের বিচারের সময় আসামি পক্ষের আদালতে নারীর চরিত্র বা পূর্ব যৌন অভিজ্ঞতার বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে নারীকে বিব্রত করার কোনো সুযোগও নেই।

এছাড়া আদালতে ধর্ষণের অপরাধ প্রমাণের জন্য যে ক্ষেত্রে নারীর সম্মতি থাকা বা না থাকার প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক হয়, ওই ক্ষেত্রেও আসামি পক্ষের নারীর চরিত্রসংক্রান্ত কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ হাজির করার বা জেরায় নারীর চরিত্র বা পূর্ব যৌন অভিজ্ঞতার বিষয়ে জেরা করার সুযোগ রাখা হয়নি।

এছাড়া ধর্ষণ প্রমাণ হওয়ার ক্ষেত্রে নারীর সম্মতি ছিল কী ছিল না, এ বিষয়ে আদালতে প্রশ্ন উঠলে নারী যদি আদালতে প্রদত্ত সাক্ষ্যে জানায় যে তার সম্মতি ছিল না, সেক্ষেত্রে আদালত নারীর সম্মতি ছিল না বলেই ধরে নেবে।

অর্থাৎ নারীর সম্মতি ও অসম্মতির বিষয়ে নারীর সাক্ষ্য ছাড়া অন্য কোনো সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না। অথচ বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হলেও সাক্ষ্য আইন সংশোধন করে বিচারের সময় নারীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলে নারীকে বিব্রত ও অপমানিত করার সুযোগ রহিত করা হয়নি। এরূপ অসম্পূর্ণ সংশোধনী নারীর মর্যাদা রক্ষা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য মোটেই সন্তোষজনক নয়।

নারীকে বিব্রত না করে এবং নারীর মর্যাদা রক্ষা করে নারীর প্রতি অপরাধের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে ভারতে ফৌজদারি কার্যবিধিতেও ব্যাপক সংশোধনী আনা হয়েছে।

ওই সংশোধনীর ফলে ভারতে কোনো নারী উল্লিখিত অপরাধের অভিযোগ করলে এফআইআর ও নারীর জবানবন্দি নারী পুলিশ কর্মকর্তা কর্তৃক লিপিবদ্ধ করতে হয়। অর্থাৎ কোনো পুলিশ কর্মকর্তা এফআইআর লিপিবদ্ধ করতে পারে না এবং নারীর জবানবন্দিও গ্রহণ করতে পারে না।

ফলে নারী নিঃসংকোচে নারী পুলিশ কর্মকর্তার কাছে তার প্রতি ঘটে যাওয়া অপরাধের সঠিক বর্ণনা দিতে সক্ষম হয়। এটা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

এছাড়া পুলিশ অপরাধের সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক অপরাধের শিকার নারীর বক্তব্য গ্রহণের বাধ্যবাধকতাও ভারতে আরোপ করা হয়েছে। উপরন্তু প্রতিবন্ধী নারীর বক্তব্য ওই নারীর ইচ্ছানুযায়ী তার বাড়িতে বা তার সুবিধাজনক স্থানে প্রতিবন্ধী বিশেষজ্ঞের উপস্থিতিতে লিপিবদ্ধ করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।

ভারতে এ ধরনের সংশোধনী দ্বারা অপরাধের শিকার নারীর ডাক্তারি পরীক্ষা, পুলিশ কর্তৃক তদন্তের সময়সীমা নির্ধারণ, বিচারকালে আদালত কর্তৃক একাধারে প্রতিদিন সাক্ষ্য গ্রহণ, অপরাধের শিকার নারীকে ক্ষতিপূরণ প্রদান, সরকারি ও বেসরকারি সব হাসপাতালে বিনা খরচে ধর্ষণের শিকার নারীর চিকিৎসার সুবিধা প্রদানের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।

ধর্ষণের অপরাধে অভিযুক্তের জামিন সংক্রান্ত বিষয়েও ব্যাপক সংশোধনী এনে ন্যায়বিচার প্রাপ্তির আইনি প্রতিবন্ধকতা দূর করা হয়েছে। অথচ এ দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধনের সময় এসব দিক বিবেচনা করা হয়নি।

ধর্ষণের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ভারতে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধিতেও ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা আমাদের এখানে করা হয়নি। মনে রাখতে হবে পাঁচ-সাত বছরের অপ্রাপ্তবয়স্ক অবুঝ শিশুকে ধর্ষণ এবং প্রেমের সম্পর্ক স্থাপন করে পনেরো-ষোলো বছরের শিশুকে ধর্ষণ একই মাত্রার অপরাধ নয়।

ভারতে এসব দিক বিবেচনায় দণ্ডবিধিতে ভিন্ন ভিন্ন বিধান করা হয়েছে, যা এ দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধনের সময় বিবেচনা করা হয়নি।

এছাড়া ভারতে ওই ধরনের সংশোধীর দ্বারা ধর্ষণের শিকার নারীর চিকিৎসা ও নারীর পুনর্বাসনের জন্য ন্যায়সঙ্গত ও যথোপযুক্ত পরিমাণ জরিমানা দণ্ড আরোপের এবং ওই জরিমানার অর্থ অপরাধের শিকার নারীকে প্রদানের বাধ্যবাধকতাও আরোপ করা হয়েছে।

অথচ এ দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে অর্থদণ্ডকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে গণ্য করে অপরাধের শিকার নারীকে তা প্রদানের বিষয়ে বাধ্যবাধকতা আরোপ না করে আদালতের বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডকে আমৃত্যু কারাদণ্ড হিসেবে ব্যাখ্যায়িত করার প্রয়োজন ছিল, যা ভারত তাদের দণ্ডবিধিতে করেছে। এছাড়া সরকারি কর্মচারী, বিভিন্ন পেশাজীবী কর্তৃক কর্তৃত্বের সুযোগ নিয়ে নারীর প্রতি কোনো অপরাধ করার জন্য পৃথক বিধান রাখার প্রয়োজন ছিল। ধর্ষণের অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তি কর্তৃক পুনর্বার ধর্ষণের অপরাধের জন্যও পৃথক বিধান করার প্রয়োজন ছিল।

নারীর বিচার প্রাপ্তিতে আইনি প্রতিবন্ধকতা ছাড়াও রয়েছে পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা। অনেক ক্ষেত্রেই সালিশের মাধ্যমে ধর্ষণের ঘটনাকে ধামাচাপা দেয়া হয়।

এ প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্য পুলিশে মামলা দায়েরের পরিবর্তে সালিশের মাধ্যমে মীমাংসার ক্ষেত্রে প্রত্যেক সালিশকারীর জন্য আইনে শাস্তির বিধান করা জরুরি। নতুবা রাজনৈতিক, সামাজিক ও আর্থিকভাবে প্রভাবশালী অপরাধীরা মৃত্যুদণ্ডের হাত থেকে বাঁচার জন্য ধর্ষণের শিকার নারী ও তার পরিবারকে সালিশ মীমাংসায় আসতে বাধ্য করবে এবং তাদের ইচ্ছামতো সালিশের সিদ্ধান্ত নারী ও তার পরিবারের ওপর চাপিয়ে দেবে।

আমেরিকাসহ অনেক দেশে ধর্ষকের তালিকা জনগণের জ্ঞাতার্থে পুলিশের ওয়েবসাইটে দেয়া থাকে এবং তাদের গতিবিধি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং জনগণকে অবহিত করা হয়। ওইসব দেশে কেউ কারাভোগ করে মুক্ত হলেও তাকে এ যাতনা সারা জীবন বহন করতে হয়। তার পক্ষে কোনো চাকরি পাওয়া বা বাসাভাড়া পাওয়া অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়ে। অথচ আমাদের সমাজে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ধর্ষণকারীরা জামিনে মুক্ত হয়ে বা কারাভোগ শেষে মুক্ত হয়ে সমাজে বুক উঁচু করে ঘুরে বেড়ায়। অনেক সময় রাজনৈতিক বা আর্থিক ক্ষমতার জোরে সমাজের হর্তাকর্তা বনে যায়। অন্যান্য দেশের মতো কঠোরতা অবলম্বন হয়তো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে ধর্ষকদের যে কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক দল বা তাদের অঙ্গসংগঠনে অনুপ্রবেশের ব্যাপারে কঠোর নিয়মনীতি প্রণয়ন করে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে না পারলে সমাজ এদের অপকর্ম থেকে রেহাই পাবে না।

আমাদের বিচার প্রক্রিয়ায় অর্থ ও ক্ষমতার যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। অনেক সময় অর্থ বা ক্ষমতার দ্বারা ধর্ষণের শিকার নারীকে মামলা দায়ের থেকে বিরত রাখা হয়, মামলা করলেও আপস মীমাংসায় বাধ্য করা হয়, সাক্ষীদের অর্থ বা ভয়ভীতি দ্বারা প্রভাবিত করা হয়।

এছাড়া ডাক্তারি পরীক্ষা, মামলা দায়ের, মামলার তদন্ত, সাক্ষী হাজিরে গড়িমসি, পাবলিক প্রসিকিউটরের ভূমিকা, বিচার প্রলম্বিত করা ইত্যাদি প্রতিটি ক্ষেত্রে অর্থ ও ক্ষমতার প্রভাব কাজ করে থাকে। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগসহ যথোপযুক্ত কর্তৃপক্ষের নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

মো. ফিরোজ মিয়া : অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব, চাকরি ও আইন সংক্রান্ত গ্রন্থের লেখক

বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো!

 মো. ফিরোজ মিয়া 
২৩ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান আনা সংশোধনীটি হয়তো জনগণের ক্ষোভ প্রশমনে কার্যকর হবে।

এছাড়া একে রাজনৈতিক সাফল্য প্রচারেও ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু তা নারীর মর্যাদা ও সম্মান রক্ষা এবং নারীর প্রতি সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর হবে বলে মনে হয় না।

বিদ্যমান দণ্ডবিধি, সাক্ষ্য আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধি যুগপৎভাবে সংশোধন না করে কেবল খণ্ডিতভাবে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা ‘বজ্র আঁটুনির ফসকা গেরো’ ছাড়া আর কিছুই নয়।

এটা অনস্বীকার্য, ধর্ষণের মহামারী ও ভয়াবহতা রোধে মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর দণ্ডের বিধান করার কোনো বিকল্প ছিল না। তাই সরকারের এ উদ্যোগ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য হলেও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আনতে মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়।

আমাদের বিচারব্যবস্থায় ধর্ষণের মতো ঘৃণিত অপরাধের বিচার পাওয়ার পেছনে পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, আর্থিক ও আইনি প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করার পদক্ষেপ গ্রহণ ছাড়া কেবল মৃত্যুদণ্ডের বিধান দ্বারা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা আদৌ সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।

নারীর প্রতি অপরাধের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে আইনি প্রতিবন্ধকতা দূর করা। বাংলাদেশ এবং পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে একই দণ্ডবিধি, সাক্ষ্য আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধি প্রচলিত।

ভারত নারীর প্রতি অপরাধের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণের জন্য নতুন আইন প্রণয়ন না করে ওইসব আইন যুগপৎভাবে সংশোধন করে সেগুলোকে সমৃদ্ধ ও যুগোপযোগী করেছে।

অথচ বাংলাদেশে উল্লিখিত আইনগুলোয় যুগপৎভাবে প্রয়োজনীয় সংশোধনী না এনে খণ্ডিতভাবে অসম্পূর্ণ ও ক্রটিপূর্ণ নারী ও শিশু নির্যাতন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। আইনটির বয়স বিশ বছর হলেও এর অসম্পূর্ণতা ও ত্রুটি সংশোধনের কোনো কার্যক্রমই এখনও পর্যন্ত গ্রহণ করা হয়নি।

বর্তমান সংশোধনীর সময়ও আইনটি পর্যালোচনা করে এর অসম্পূর্ণতা ও ত্রুটি দূর করা হয়নি। ফলে নারীর প্রতি সংঘটিত অপরাধের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আশা দুরাশাই থেকে যাচ্ছে।

বিদ্যমান ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইন অনুযায়ী ধর্ষণ ও নারী সংক্রান্ত অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে নারীর চরিত্র নিয়ে আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করে নারীকে বিব্রত করা হয়।

এরূপ বিব্রত হওয়ার আশঙ্কায় অনেক নারী এবং তাদের পরিবার আইনের আশ্রয় নিতে আগ্রহী হয় না। এ অসুবিধা দূর করার লক্ষ্যে ভারত ২০১৩ সালে সাক্ষ্য আইনে ব্যাপক সংশোধনী এনেছে।

সেসব সংশোধনীর কারণে ভারতের আদালতে ধর্ষণ, নারীর শ্লীলতাহানি, যৌন নিপীড়ন, নারীর অশ্লীল ও আপত্তিকর চিত্রধারণ, স্টকিং ইত্যাদি অপরাধের বিচারের সময় নারীর চরিত্র নিয়ে কোনোরূপ প্রশ্ন উত্থাপন করা যায় না। অর্থাৎ ওইসব অপরাধের বিচারের সময় আসামি পক্ষের আদালতে নারীর চরিত্র বা পূর্ব যৌন অভিজ্ঞতার বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে নারীকে বিব্রত করার কোনো সুযোগও নেই।

এছাড়া আদালতে ধর্ষণের অপরাধ প্রমাণের জন্য যে ক্ষেত্রে নারীর সম্মতি থাকা বা না থাকার প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক হয়, ওই ক্ষেত্রেও আসামি পক্ষের নারীর চরিত্রসংক্রান্ত কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ হাজির করার বা জেরায় নারীর চরিত্র বা পূর্ব যৌন অভিজ্ঞতার বিষয়ে জেরা করার সুযোগ রাখা হয়নি।

এছাড়া ধর্ষণ প্রমাণ হওয়ার ক্ষেত্রে নারীর সম্মতি ছিল কী ছিল না, এ বিষয়ে আদালতে প্রশ্ন উঠলে নারী যদি আদালতে প্রদত্ত সাক্ষ্যে জানায় যে তার সম্মতি ছিল না, সেক্ষেত্রে আদালত নারীর সম্মতি ছিল না বলেই ধরে নেবে।

অর্থাৎ নারীর সম্মতি ও অসম্মতির বিষয়ে নারীর সাক্ষ্য ছাড়া অন্য কোনো সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না। অথচ বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হলেও সাক্ষ্য আইন সংশোধন করে বিচারের সময় নারীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলে নারীকে বিব্রত ও অপমানিত করার সুযোগ রহিত করা হয়নি। এরূপ অসম্পূর্ণ সংশোধনী নারীর মর্যাদা রক্ষা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য মোটেই সন্তোষজনক নয়।

নারীকে বিব্রত না করে এবং নারীর মর্যাদা রক্ষা করে নারীর প্রতি অপরাধের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে ভারতে ফৌজদারি কার্যবিধিতেও ব্যাপক সংশোধনী আনা হয়েছে।

ওই সংশোধনীর ফলে ভারতে কোনো নারী উল্লিখিত অপরাধের অভিযোগ করলে এফআইআর ও নারীর জবানবন্দি নারী পুলিশ কর্মকর্তা কর্তৃক লিপিবদ্ধ করতে হয়। অর্থাৎ কোনো পুলিশ কর্মকর্তা এফআইআর লিপিবদ্ধ করতে পারে না এবং নারীর জবানবন্দিও গ্রহণ করতে পারে না।

ফলে নারী নিঃসংকোচে নারী পুলিশ কর্মকর্তার কাছে তার প্রতি ঘটে যাওয়া অপরাধের সঠিক বর্ণনা দিতে সক্ষম হয়। এটা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

এছাড়া পুলিশ অপরাধের সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক অপরাধের শিকার নারীর বক্তব্য গ্রহণের বাধ্যবাধকতাও ভারতে আরোপ করা হয়েছে। উপরন্তু প্রতিবন্ধী নারীর বক্তব্য ওই নারীর ইচ্ছানুযায়ী তার বাড়িতে বা তার সুবিধাজনক স্থানে প্রতিবন্ধী বিশেষজ্ঞের উপস্থিতিতে লিপিবদ্ধ করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।

ভারতে এ ধরনের সংশোধনী দ্বারা অপরাধের শিকার নারীর ডাক্তারি পরীক্ষা, পুলিশ কর্তৃক তদন্তের সময়সীমা নির্ধারণ, বিচারকালে আদালত কর্তৃক একাধারে প্রতিদিন সাক্ষ্য গ্রহণ, অপরাধের শিকার নারীকে ক্ষতিপূরণ প্রদান, সরকারি ও বেসরকারি সব হাসপাতালে বিনা খরচে ধর্ষণের শিকার নারীর চিকিৎসার সুবিধা প্রদানের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।

ধর্ষণের অপরাধে অভিযুক্তের জামিন সংক্রান্ত বিষয়েও ব্যাপক সংশোধনী এনে ন্যায়বিচার প্রাপ্তির আইনি প্রতিবন্ধকতা দূর করা হয়েছে। অথচ এ দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধনের সময় এসব দিক বিবেচনা করা হয়নি।

ধর্ষণের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ভারতে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধিতেও ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা আমাদের এখানে করা হয়নি। মনে রাখতে হবে পাঁচ-সাত বছরের অপ্রাপ্তবয়স্ক অবুঝ শিশুকে ধর্ষণ এবং প্রেমের সম্পর্ক স্থাপন করে পনেরো-ষোলো বছরের শিশুকে ধর্ষণ একই মাত্রার অপরাধ নয়।

ভারতে এসব দিক বিবেচনায় দণ্ডবিধিতে ভিন্ন ভিন্ন বিধান করা হয়েছে, যা এ দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধনের সময় বিবেচনা করা হয়নি।

এছাড়া ভারতে ওই ধরনের সংশোধীর দ্বারা ধর্ষণের শিকার নারীর চিকিৎসা ও নারীর পুনর্বাসনের জন্য ন্যায়সঙ্গত ও যথোপযুক্ত পরিমাণ জরিমানা দণ্ড আরোপের এবং ওই জরিমানার অর্থ অপরাধের শিকার নারীকে প্রদানের বাধ্যবাধকতাও আরোপ করা হয়েছে।

অথচ এ দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে অর্থদণ্ডকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে গণ্য করে অপরাধের শিকার নারীকে তা প্রদানের বিষয়ে বাধ্যবাধকতা আরোপ না করে আদালতের বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডকে আমৃত্যু কারাদণ্ড হিসেবে ব্যাখ্যায়িত করার প্রয়োজন ছিল, যা ভারত তাদের দণ্ডবিধিতে করেছে। এছাড়া সরকারি কর্মচারী, বিভিন্ন পেশাজীবী কর্তৃক কর্তৃত্বের সুযোগ নিয়ে নারীর প্রতি কোনো অপরাধ করার জন্য পৃথক বিধান রাখার প্রয়োজন ছিল। ধর্ষণের অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তি কর্তৃক পুনর্বার ধর্ষণের অপরাধের জন্যও পৃথক বিধান করার প্রয়োজন ছিল।

নারীর বিচার প্রাপ্তিতে আইনি প্রতিবন্ধকতা ছাড়াও রয়েছে পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা। অনেক ক্ষেত্রেই সালিশের মাধ্যমে ধর্ষণের ঘটনাকে ধামাচাপা দেয়া হয়।

এ প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্য পুলিশে মামলা দায়েরের পরিবর্তে সালিশের মাধ্যমে মীমাংসার ক্ষেত্রে প্রত্যেক সালিশকারীর জন্য আইনে শাস্তির বিধান করা জরুরি। নতুবা রাজনৈতিক, সামাজিক ও আর্থিকভাবে প্রভাবশালী অপরাধীরা মৃত্যুদণ্ডের হাত থেকে বাঁচার জন্য ধর্ষণের শিকার নারী ও তার পরিবারকে সালিশ মীমাংসায় আসতে বাধ্য করবে এবং তাদের ইচ্ছামতো সালিশের সিদ্ধান্ত নারী ও তার পরিবারের ওপর চাপিয়ে দেবে।

আমেরিকাসহ অনেক দেশে ধর্ষকের তালিকা জনগণের জ্ঞাতার্থে পুলিশের ওয়েবসাইটে দেয়া থাকে এবং তাদের গতিবিধি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং জনগণকে অবহিত করা হয়। ওইসব দেশে কেউ কারাভোগ করে মুক্ত হলেও তাকে এ যাতনা সারা জীবন বহন করতে হয়। তার পক্ষে কোনো চাকরি পাওয়া বা বাসাভাড়া পাওয়া অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়ে। অথচ আমাদের সমাজে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ধর্ষণকারীরা জামিনে মুক্ত হয়ে বা কারাভোগ শেষে মুক্ত হয়ে সমাজে বুক উঁচু করে ঘুরে বেড়ায়। অনেক সময় রাজনৈতিক বা আর্থিক ক্ষমতার জোরে সমাজের হর্তাকর্তা বনে যায়। অন্যান্য দেশের মতো কঠোরতা অবলম্বন হয়তো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে ধর্ষকদের যে কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক দল বা তাদের অঙ্গসংগঠনে অনুপ্রবেশের ব্যাপারে কঠোর নিয়মনীতি প্রণয়ন করে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে না পারলে সমাজ এদের অপকর্ম থেকে রেহাই পাবে না।

আমাদের বিচার প্রক্রিয়ায় অর্থ ও ক্ষমতার যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। অনেক সময় অর্থ বা ক্ষমতার দ্বারা ধর্ষণের শিকার নারীকে মামলা দায়ের থেকে বিরত রাখা হয়, মামলা করলেও আপস মীমাংসায় বাধ্য করা হয়, সাক্ষীদের অর্থ বা ভয়ভীতি দ্বারা প্রভাবিত করা হয়।

এছাড়া ডাক্তারি পরীক্ষা, মামলা দায়ের, মামলার তদন্ত, সাক্ষী হাজিরে গড়িমসি, পাবলিক প্রসিকিউটরের ভূমিকা, বিচার প্রলম্বিত করা ইত্যাদি প্রতিটি ক্ষেত্রে অর্থ ও ক্ষমতার প্রভাব কাজ করে থাকে। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগসহ যথোপযুক্ত কর্তৃপক্ষের নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

মো. ফিরোজ মিয়া : অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব, চাকরি ও আইন সংক্রান্ত গ্রন্থের লেখক