ভেলিকা ক্লাদুসায় অনিশ্চিত বাংলাদেশিদের জীবন
jugantor
খোলা জানালা
ভেলিকা ক্লাদুসায় অনিশ্চিত বাংলাদেশিদের জীবন

  তারেক শামসুর রেহমান  

২৫ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বসনিয়া হারজেগোভিনার একটি ছোট্ট গ্রামের নাম ভেলিকা ক্লাদুসা। এ ভেলিকা ক্লাদুসাই এখন সংবাদের শিরোনাম। কারণ সেখানে জঙ্গলে, কর্দমাক্ত পাহাড়ের ঢালে প্রায় ৭০০ বাংলাদেশি অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টের মাঝে বসবাস করছে। তাদের এই দুঃখ কষ্টের কাহিনীই তুলে এনেছে জার্মান গণমাধ্যম ডয়েচে ভেলের দুই সাংবাদিক। তারা দু’জনই ডয়েচে ভেলের বাংলা বিভাগে কাজ করেন। চিন্তা করা যায় ৭০০ বাংলাদেশি! জঙ্গলে থাকছেন ঠাণ্ডা মেঝেতে পলিথিন বিছিয়ে, পলিথিনের তাঁবুতে। তাদের সবার গন্তব্য পশ্চিম ইউরোপ- ইউরোপের স্বপ্নের দেশ ইতালি!

গুগল ম্যাপে সার্চ করে দেখলাম বাংলাদেশ থেকে ভেলিকা ক্লাদুসার দূরত্ব ৬ হাজার ৯৭৫ কিলোমিটার, আর আকাশপথে ৪ হাজার ২২৭ মাইল। বাংলাদেশের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে বসনিয়া হারজেগোভিনার কোনো মিল নেই। বাংলাদেশিদের সেখানে যাওয়ার কথা নয়। শুধু এক জায়গায় মিল আছে। আর তা হচ্ছে ধর্মীয় বন্ধন- তারাও মুসলমান। কিন্তু ধর্মীয় নৈকট্যের কারণে বাংলাদেশিরা সেখানে ছুটে যাননি। গেছেন ‘স্বপ্নের দেশ’ ইতালি, জার্মানি কিংবা স্পেনে থাকার জন্য। তারা অনেকেই জানেন না ইউরোপে এ সুযোগ এখন নেই। সেখানে ইচ্ছা করলেই থাকা যায় না। তারা অর্থনৈতিক অভিবাসী। ইউরোপের চাকচিক্যময় জীবনের আশায় তারা ইউরোপে যেতে চায়। কিন্তু সেটা যে কত কঠিন বা হয়তো আদৌ সম্ভব নয়- এ কথাটা জানায়নি দালালরা, যারা তাদের নিয়ে গেছে সিলেট থেকে তুরস্কে, তুরস্ক থেকে গ্রিসে, গ্রিস থেকে অনেক পথ পাড়ি দিয়ে ভেলিকা ক্লাদুসায়। পাশেই ক্রোয়েশিয়া। আর ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে হাঙ্গেরি, স্লোভেনিয়া আর অস্ট্রিয়ার। দালালরাই তাদের পৌঁছে দেয় ইউরোপের শিল্পোন্নত যে কোনো একটি দেশে। দালালদের দিতে হয় অনেক টাকা। কোনো কোনো বাংলাদেশি ভেলিকা ক্লাদুসার জঙ্গলে আছেন দু’বছর ধরে- সে কথা তারা জানিয়েছেন ডয়েচে ভেলের সাংবাদিককে।

পাঠক, স্মরণ করতে পারেন লিবিয়ায় বাংলাদেশিদের করুণ কাহিনীর কথা। লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশির মৃত্যুর করুণ কাহিনী গত ৩০ মে বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলোতে ছাপা হয়েছিল। লিবিয়ার মিজদা শহরে ওই ঘটনাটি ঘটে। হতভাগ্য মানুষগুলো লিবিয়া থেকে ইতালি যেতে চেয়েছিল। মানব পাচারকারীরা তাদের বিভিন্ন রুট দিয়ে ইউরোপে পৌঁছে দেবে বলে লিবিয়ায় নিয়ে যায়। বেশ কিছুদিন ধরেই মানব পাচারকারীদের কাছে লিবিয়া হচ্ছে একটি ট্রানজিট পয়েন্ট, যেখান থেকে ইউরোপ, বিশেষ করে ইতালিতে পাচার করানো সহজ। ভূমধ্যসাগরের এক পাড়ে লিবিয়া, অপর পাড়ে ইতালি। পাচারকারীরা এ সুযোগটিই গ্রহণ করে। তারা মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় রুট ব্যবহার করে সাধারণ নৌকায় বিভিন্ন দেশ থেকে আনা লোকদের তুলে দেয়। সাগর পাড়ি দিয়ে নৌকা এক সময় ওপারে যায়। সমুদ্রপথে দূরত্ব মাত্র ৫৮১ নটিক্যাল মাইল। অনেক সময় ইতালির কোস্টগার্ডদের হাতে কেউ কেউ ধরা পড়ে। একবার ইতালির সীমানায় পৌঁছলেই হল- তারা তখন রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থী হয়ে যায়। এর পরের খরচ সব ইতালি সরকারের। পাচারকারীরা স্বপ্ন দেখায়- ইতালি মানেই ইউরোপ আর স্বপ্নের বসবাস! পাচারকারীরা কখনই এ দুর্গম পথে সাগর পার হওয়ার কাহিনী শোনায় না। সাগর অনেক সময় বিক্ষুব্ধ থাকে। সমুদ্র ঝড়ের মাঝেও পড়তে হয়। নৌকা মাঝ সাগরে নষ্ট হয়ে যায়। তারপর ভাসতে থাকে সাগরে দিনের পর দিন।

এ ধরনের শত শত ঘটনার কোনো কোনোটি সংবাদপত্রে ছাপা হয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছাপা হয় না। গত বছর এ সমুদ্র রুট ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশের ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ ইউরোপ গেছে। এ পথে ইতালি, গ্রিস ও স্পেনেও যাওয়া যায়। ইতালি সবচেয়ে কাছের। তাই পাচারকারীরা ইতালিকেই প্রথম পছন্দ করে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মতে, ইউরোপে পাচার হওয়া মানব সন্তানদের শতকরা ৮২ ভাগ এই লিবিয়া রুট ব্যবহার করেছিল। পাচাকারীরা বাংলাদেশ, ভারত, আফগানিস্তান ও আফ্রিকা থেকে শত শত মানব সন্তানকে প্রধানত তুরস্ক নিয়ে যায়। সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়ায়। তারপর ইঞ্জিনচালিত নৌকায় তুলে দেয়া হয় ভূমধ্যসাগরে। ২০১৭ সালে আইওএমের তথ্যমতে ৩ হাজার ১০৮ জনের সাগরে মৃত্যু ঘটেছিল। পাঠক, নিশ্চয়ই স্মরণ করতে পারেন ২০১৫-২০১৬ সালে লাখ লাখ সিরীয় নাগরিকের ইউরোপে আশ্রয় নেয়ার কাহিনী। ইউরোপের পথে, ঘাটে, জঙ্গলে শত শত সিরীয় নাগরিকের উপস্থিতি ওই সময় আন্তর্জাতিক সংবাদে পরিণত হয়েছিল। তাদের প্রায় সবাই এ সমুদ্র রুট ব্যবহার করেছিল। পরবর্তী ক্ষেত্রে এ রুটে কিছুটা কড়াকড়ি আরোপ করা হলেও মানব পাচার থামেনি। তারা আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ২০০৮ সালে লিবিয়ার ওপর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার পরপরই লিবিয়া মানব পাচারকারীদের জন্য আকর্ষণীয় স্পটে পরিণত হয়। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে লিবিয়ার পরিস্থিতি ভালো নয়, সেখানে গৃহযুদ্ধ চলছে; কিন্তু আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের কাছে তা গুরুত্ব পায়নি। কারণ তারা ইতোমধ্যেই লিবিয়ার স্থানীয় ‘ওয়ার লর্ড’দের সঙ্গে একটা সখ্য গড়ে তুলেছে। অতিসম্প্রতি লিবিয়ার পাশাপাশি সুদানও পাচারকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশিরা এ সুদান রুটটি ব্যবহার করছে। একটা অবৈধ ট্রাভেল ডকুমেন্ট দিয়ে বাংলাদেশিদের সুদানে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর তাদের সুদান থেকে নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়ার বেনগাজি। সুদান থেকে তাদের ট্রাকে করে সীমান্ত পার করে লিবিয়ায় ঢোকানো হয়। বাংলাদেশিরা এ পথেই লিবিয়ায় ঢুকছে। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা এ তথ্যগুলো জানি না। লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশির মৃত্যুর পর আমরা এখন জেনেছি।

অনেক ক্ষেত্রেই পাচারকারীরা লিবিয়ায় নিয়ে আসা যাত্রীদের জিম্মি করে তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে। নিহত হতভাগ্য যাত্রীদের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেছিল। নিহত বাংলাদেশিরা প্রায় তিন মাস আগে লিবিয়ায় পৌঁছেছিলেন। তারা জেলেও ছিলেন। জেল থেকে ওই পাচারকারীরা তাদের ছাড়িয়ে আনে। টাকার জন্য তাদের জিম্মি করে। একপর্যায়ে ওই আফ্রিকান পাচারকারীকে জিম্মিরা হত্যা করে। আর এর প্রতিশোধ হিসেবেই বাংলাদেশি এবং কয়েকজন আফ্রিকান নাগরিককে হত্যা করা হয়।

এই মৃত্যুর ঘটনা কয়েকটি প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। এক. এ পাচার প্রক্রিয়া আজকে নতুন নয়। বহুদিন ধরে এভাবে পাচার চক্র বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে মানুষ পাচার করছে। যাদের পাচার করা হয় তাদের ইউরোপের স্বপ্ন দেখানো হয়। বলা হয়, স্পেন ও ইতালিতে কৃষিকাজে লোক লাগবে। ওখানে পৌঁছতে পারলেই একসময় অবৈধ অভিবাসীদের বৈধতা দেয়া হবে। এ ফাঁদে পড়েই হতভাগারা লিবিয়া গিয়েছিলেন। এখন আমাদের জানা দরকার কারা তাদের বাংলাদেশ থেকে রিক্রুট করেছিল। কোন কোন রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে তারা সেখানে গিয়েছিলেন। তাদের যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া না হয়, তাহলে এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটবে। সুতরাং এ মুহূর্তে যা দরকার তা হচ্ছে নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে পাচারকারীদের সবার এজেন্টদের খুঁজে বের করা এবং তাদের আইনের আওতায় আনা। দু-একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু তা যথেষ্ট নয়।

দুই. এসব হতভাগা বাংলাদেশি ভুয়া ট্রাভেল ডকুমেন্ট দেখিয়ে সুদান গিয়েছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, এটি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন বিভাগের কর্মকর্তাদের দৃষ্টি এড়ালো কীভাবে? তারা তো জানতেন সুদানে কাজের কোনো সুবিধা নেই। সেখানেও গৃহযুদ্ধ চলছে। এতজন লোক ভুয়া ডকুমেন্ট দেখিয়ে বিমানবন্দর পার হল, কেউ সেটা বুঝতে পারল না- এটা হতে পারে না। এর অর্থ হচ্ছে, ওই পাচারকারীদের সঙ্গে বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন অফিসারদের ‘সখ্য’ আছে। তারাই বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে হতভাগা যাত্রীদের বিমানবন্দর পার করে দেন। সুতরাং ওই দিন যেসব কর্মকর্তা বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন, তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত।

তিন. বাংলাদেশে কিছু অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত। পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের কাছে এ তথ্য থাকার কথা। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, ওইসব অসাধু এজেন্সির বিরুদ্ধে আমরা কোনো ব্যবস্থা নিলাম না কেন? এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা দরকার। দু-একজনকে গ্রেফতার করেই কি সব শেষ হল? বাকিরা কোথায়? তাদের গ্রেফতার করা হলে এ ধরনের পাচার কমবে।

চার. পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, তারা এ হত্যাকাণ্ডের জন্য লিবিয়া সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ এবং দোষী ব্যক্তিদের বিচার চাইবেন। বিষয়টি অনেকটাই হাস্যকর। কেননা এ মুহূর্তে লিবিয়ায় কার্যত কোনো সরকার নেই। ত্রিপোলিতে যে সরকার আছে এবং যা জাতিসংঘ স্বীকৃত, সেই সরকারের অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। জেনারেল হাফতারের বাহিনী যে কোনো সময় ত্রিপোলি দখল করতে পারে। সুতরাং বাংলাদেশ কার কাছে ক্ষতিপূরণ চাইবে? কে ক্ষতিপূরণ দেবে? বরং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশের জনগণকে সতর্ক করা- তারা যেন লিবিয়ায় না যায়। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এ কাজটি করা যেত। কিন্তু তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় করেনি। ত্রিপোলিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। বাংলাদেশি নাগরিকদের রক্ষায় তারা কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি। এসব অদক্ষ লোকদের দিয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা যাবে না।

পাঁচ. হতভাগা বাংলাদেশি নাগরিকদের একটি তালিকা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যদি এসব পরিবারকে কিছু ক্ষতিপূরণ দেয়, তাহলে নিঃসন্দেহে ওইসব পরিবার কিছুটা হলেও সান্ত্বনা পাবে।

ছয়. আহত ১১ বাংলাদেশি এখন লিবিয়ায় চিকিৎসাধীন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা। আমরা জানি না এ কাজটি করা হয়েছে কিনা।

লিবিয়া আর ভেলিকা ক্লাদুসার ঘটনাবলির মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। একজন বাংলাদেশি সাংবাদিক সেখানে যেতে পারলেন, আমাদের দূতাবাসের কোনো কর্মচারীরা সেখানে গেলেন না! এটা ঠিক, বাংলাদেশিরা সেখানে অবৈধভাবে গেছেন। কেউ কেউ দেশে ফিরে আসতে চান। তাদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। শত শত বাংলাদেশির মাসের পর মাস জঙ্গলে অবস্থান আর যাই হোক দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগটি তাই জরুরি।

ড. তারেক শামসুর রেহমান : প্রফেসর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]

খোলা জানালা

ভেলিকা ক্লাদুসায় অনিশ্চিত বাংলাদেশিদের জীবন

 তারেক শামসুর রেহমান 
২৫ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বসনিয়া হারজেগোভিনার একটি ছোট্ট গ্রামের নাম ভেলিকা ক্লাদুসা। এ ভেলিকা ক্লাদুসাই এখন সংবাদের শিরোনাম। কারণ সেখানে জঙ্গলে, কর্দমাক্ত পাহাড়ের ঢালে প্রায় ৭০০ বাংলাদেশি অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টের মাঝে বসবাস করছে। তাদের এই দুঃখ কষ্টের কাহিনীই তুলে এনেছে জার্মান গণমাধ্যম ডয়েচে ভেলের দুই সাংবাদিক। তারা দু’জনই ডয়েচে ভেলের বাংলা বিভাগে কাজ করেন। চিন্তা করা যায় ৭০০ বাংলাদেশি! জঙ্গলে থাকছেন ঠাণ্ডা মেঝেতে পলিথিন বিছিয়ে, পলিথিনের তাঁবুতে। তাদের সবার গন্তব্য পশ্চিম ইউরোপ- ইউরোপের স্বপ্নের দেশ ইতালি!

গুগল ম্যাপে সার্চ করে দেখলাম বাংলাদেশ থেকে ভেলিকা ক্লাদুসার দূরত্ব ৬ হাজার ৯৭৫ কিলোমিটার, আর আকাশপথে ৪ হাজার ২২৭ মাইল। বাংলাদেশের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে বসনিয়া হারজেগোভিনার কোনো মিল নেই। বাংলাদেশিদের সেখানে যাওয়ার কথা নয়। শুধু এক জায়গায় মিল আছে। আর তা হচ্ছে ধর্মীয় বন্ধন- তারাও মুসলমান। কিন্তু ধর্মীয় নৈকট্যের কারণে বাংলাদেশিরা সেখানে ছুটে যাননি। গেছেন ‘স্বপ্নের দেশ’ ইতালি, জার্মানি কিংবা স্পেনে থাকার জন্য। তারা অনেকেই জানেন না ইউরোপে এ সুযোগ এখন নেই। সেখানে ইচ্ছা করলেই থাকা যায় না। তারা অর্থনৈতিক অভিবাসী। ইউরোপের চাকচিক্যময় জীবনের আশায় তারা ইউরোপে যেতে চায়। কিন্তু সেটা যে কত কঠিন বা হয়তো আদৌ সম্ভব নয়- এ কথাটা জানায়নি দালালরা, যারা তাদের নিয়ে গেছে সিলেট থেকে তুরস্কে, তুরস্ক থেকে গ্রিসে, গ্রিস থেকে অনেক পথ পাড়ি দিয়ে ভেলিকা ক্লাদুসায়। পাশেই ক্রোয়েশিয়া। আর ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে হাঙ্গেরি, স্লোভেনিয়া আর অস্ট্রিয়ার। দালালরাই তাদের পৌঁছে দেয় ইউরোপের শিল্পোন্নত যে কোনো একটি দেশে। দালালদের দিতে হয় অনেক টাকা। কোনো কোনো বাংলাদেশি ভেলিকা ক্লাদুসার জঙ্গলে আছেন দু’বছর ধরে- সে কথা তারা জানিয়েছেন ডয়েচে ভেলের সাংবাদিককে।

পাঠক, স্মরণ করতে পারেন লিবিয়ায় বাংলাদেশিদের করুণ কাহিনীর কথা। লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশির মৃত্যুর করুণ কাহিনী গত ৩০ মে বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলোতে ছাপা হয়েছিল। লিবিয়ার মিজদা শহরে ওই ঘটনাটি ঘটে। হতভাগ্য মানুষগুলো লিবিয়া থেকে ইতালি যেতে চেয়েছিল। মানব পাচারকারীরা তাদের বিভিন্ন রুট দিয়ে ইউরোপে পৌঁছে দেবে বলে লিবিয়ায় নিয়ে যায়। বেশ কিছুদিন ধরেই মানব পাচারকারীদের কাছে লিবিয়া হচ্ছে একটি ট্রানজিট পয়েন্ট, যেখান থেকে ইউরোপ, বিশেষ করে ইতালিতে পাচার করানো সহজ। ভূমধ্যসাগরের এক পাড়ে লিবিয়া, অপর পাড়ে ইতালি। পাচারকারীরা এ সুযোগটিই গ্রহণ করে। তারা মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় রুট ব্যবহার করে সাধারণ নৌকায় বিভিন্ন দেশ থেকে আনা লোকদের তুলে দেয়। সাগর পাড়ি দিয়ে নৌকা এক সময় ওপারে যায়। সমুদ্রপথে দূরত্ব মাত্র ৫৮১ নটিক্যাল মাইল। অনেক সময় ইতালির কোস্টগার্ডদের হাতে কেউ কেউ ধরা পড়ে। একবার ইতালির সীমানায় পৌঁছলেই হল- তারা তখন রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থী হয়ে যায়। এর পরের খরচ সব ইতালি সরকারের। পাচারকারীরা স্বপ্ন দেখায়- ইতালি মানেই ইউরোপ আর স্বপ্নের বসবাস! পাচারকারীরা কখনই এ দুর্গম পথে সাগর পার হওয়ার কাহিনী শোনায় না। সাগর অনেক সময় বিক্ষুব্ধ থাকে। সমুদ্র ঝড়ের মাঝেও পড়তে হয়। নৌকা মাঝ সাগরে নষ্ট হয়ে যায়। তারপর ভাসতে থাকে সাগরে দিনের পর দিন।

এ ধরনের শত শত ঘটনার কোনো কোনোটি সংবাদপত্রে ছাপা হয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছাপা হয় না। গত বছর এ সমুদ্র রুট ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশের ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ ইউরোপ গেছে। এ পথে ইতালি, গ্রিস ও স্পেনেও যাওয়া যায়। ইতালি সবচেয়ে কাছের। তাই পাচারকারীরা ইতালিকেই প্রথম পছন্দ করে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মতে, ইউরোপে পাচার হওয়া মানব সন্তানদের শতকরা ৮২ ভাগ এই লিবিয়া রুট ব্যবহার করেছিল। পাচাকারীরা বাংলাদেশ, ভারত, আফগানিস্তান ও আফ্রিকা থেকে শত শত মানব সন্তানকে প্রধানত তুরস্ক নিয়ে যায়। সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়ায়। তারপর ইঞ্জিনচালিত নৌকায় তুলে দেয়া হয় ভূমধ্যসাগরে। ২০১৭ সালে আইওএমের তথ্যমতে ৩ হাজার ১০৮ জনের সাগরে মৃত্যু ঘটেছিল। পাঠক, নিশ্চয়ই স্মরণ করতে পারেন ২০১৫-২০১৬ সালে লাখ লাখ সিরীয় নাগরিকের ইউরোপে আশ্রয় নেয়ার কাহিনী। ইউরোপের পথে, ঘাটে, জঙ্গলে শত শত সিরীয় নাগরিকের উপস্থিতি ওই সময় আন্তর্জাতিক সংবাদে পরিণত হয়েছিল। তাদের প্রায় সবাই এ সমুদ্র রুট ব্যবহার করেছিল। পরবর্তী ক্ষেত্রে এ রুটে কিছুটা কড়াকড়ি আরোপ করা হলেও মানব পাচার থামেনি। তারা আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ২০০৮ সালে লিবিয়ার ওপর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার পরপরই লিবিয়া মানব পাচারকারীদের জন্য আকর্ষণীয় স্পটে পরিণত হয়। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে লিবিয়ার পরিস্থিতি ভালো নয়, সেখানে গৃহযুদ্ধ চলছে; কিন্তু আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের কাছে তা গুরুত্ব পায়নি। কারণ তারা ইতোমধ্যেই লিবিয়ার স্থানীয় ‘ওয়ার লর্ড’দের সঙ্গে একটা সখ্য গড়ে তুলেছে। অতিসম্প্রতি লিবিয়ার পাশাপাশি সুদানও পাচারকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশিরা এ সুদান রুটটি ব্যবহার করছে। একটা অবৈধ ট্রাভেল ডকুমেন্ট দিয়ে বাংলাদেশিদের সুদানে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর তাদের সুদান থেকে নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়ার বেনগাজি। সুদান থেকে তাদের ট্রাকে করে সীমান্ত পার করে লিবিয়ায় ঢোকানো হয়। বাংলাদেশিরা এ পথেই লিবিয়ায় ঢুকছে। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা এ তথ্যগুলো জানি না। লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশির মৃত্যুর পর আমরা এখন জেনেছি।

অনেক ক্ষেত্রেই পাচারকারীরা লিবিয়ায় নিয়ে আসা যাত্রীদের জিম্মি করে তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে। নিহত হতভাগ্য যাত্রীদের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেছিল। নিহত বাংলাদেশিরা প্রায় তিন মাস আগে লিবিয়ায় পৌঁছেছিলেন। তারা জেলেও ছিলেন। জেল থেকে ওই পাচারকারীরা তাদের ছাড়িয়ে আনে। টাকার জন্য তাদের জিম্মি করে। একপর্যায়ে ওই আফ্রিকান পাচারকারীকে জিম্মিরা হত্যা করে। আর এর প্রতিশোধ হিসেবেই বাংলাদেশি এবং কয়েকজন আফ্রিকান নাগরিককে হত্যা করা হয়।

এই মৃত্যুর ঘটনা কয়েকটি প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। এক. এ পাচার প্রক্রিয়া আজকে নতুন নয়। বহুদিন ধরে এভাবে পাচার চক্র বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে মানুষ পাচার করছে। যাদের পাচার করা হয় তাদের ইউরোপের স্বপ্ন দেখানো হয়। বলা হয়, স্পেন ও ইতালিতে কৃষিকাজে লোক লাগবে। ওখানে পৌঁছতে পারলেই একসময় অবৈধ অভিবাসীদের বৈধতা দেয়া হবে। এ ফাঁদে পড়েই হতভাগারা লিবিয়া গিয়েছিলেন। এখন আমাদের জানা দরকার কারা তাদের বাংলাদেশ থেকে রিক্রুট করেছিল। কোন কোন রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে তারা সেখানে গিয়েছিলেন। তাদের যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া না হয়, তাহলে এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটবে। সুতরাং এ মুহূর্তে যা দরকার তা হচ্ছে নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে পাচারকারীদের সবার এজেন্টদের খুঁজে বের করা এবং তাদের আইনের আওতায় আনা। দু-একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু তা যথেষ্ট নয়।

দুই. এসব হতভাগা বাংলাদেশি ভুয়া ট্রাভেল ডকুমেন্ট দেখিয়ে সুদান গিয়েছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, এটি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন বিভাগের কর্মকর্তাদের দৃষ্টি এড়ালো কীভাবে? তারা তো জানতেন সুদানে কাজের কোনো সুবিধা নেই। সেখানেও গৃহযুদ্ধ চলছে। এতজন লোক ভুয়া ডকুমেন্ট দেখিয়ে বিমানবন্দর পার হল, কেউ সেটা বুঝতে পারল না- এটা হতে পারে না। এর অর্থ হচ্ছে, ওই পাচারকারীদের সঙ্গে বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন অফিসারদের ‘সখ্য’ আছে। তারাই বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে হতভাগা যাত্রীদের বিমানবন্দর পার করে দেন। সুতরাং ওই দিন যেসব কর্মকর্তা বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন, তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত।

তিন. বাংলাদেশে কিছু অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত। পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের কাছে এ তথ্য থাকার কথা। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, ওইসব অসাধু এজেন্সির বিরুদ্ধে আমরা কোনো ব্যবস্থা নিলাম না কেন? এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা দরকার। দু-একজনকে গ্রেফতার করেই কি সব শেষ হল? বাকিরা কোথায়? তাদের গ্রেফতার করা হলে এ ধরনের পাচার কমবে।

চার. পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, তারা এ হত্যাকাণ্ডের জন্য লিবিয়া সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ এবং দোষী ব্যক্তিদের বিচার চাইবেন। বিষয়টি অনেকটাই হাস্যকর। কেননা এ মুহূর্তে লিবিয়ায় কার্যত কোনো সরকার নেই। ত্রিপোলিতে যে সরকার আছে এবং যা জাতিসংঘ স্বীকৃত, সেই সরকারের অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। জেনারেল হাফতারের বাহিনী যে কোনো সময় ত্রিপোলি দখল করতে পারে। সুতরাং বাংলাদেশ কার কাছে ক্ষতিপূরণ চাইবে? কে ক্ষতিপূরণ দেবে? বরং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশের জনগণকে সতর্ক করা- তারা যেন লিবিয়ায় না যায়। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এ কাজটি করা যেত। কিন্তু তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় করেনি। ত্রিপোলিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। বাংলাদেশি নাগরিকদের রক্ষায় তারা কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি। এসব অদক্ষ লোকদের দিয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা যাবে না।

পাঁচ. হতভাগা বাংলাদেশি নাগরিকদের একটি তালিকা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যদি এসব পরিবারকে কিছু ক্ষতিপূরণ দেয়, তাহলে নিঃসন্দেহে ওইসব পরিবার কিছুটা হলেও সান্ত্বনা পাবে।

ছয়. আহত ১১ বাংলাদেশি এখন লিবিয়ায় চিকিৎসাধীন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা। আমরা জানি না এ কাজটি করা হয়েছে কিনা।

লিবিয়া আর ভেলিকা ক্লাদুসার ঘটনাবলির মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। একজন বাংলাদেশি সাংবাদিক সেখানে যেতে পারলেন, আমাদের দূতাবাসের কোনো কর্মচারীরা সেখানে গেলেন না! এটা ঠিক, বাংলাদেশিরা সেখানে অবৈধভাবে গেছেন। কেউ কেউ দেশে ফিরে আসতে চান। তাদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। শত শত বাংলাদেশির মাসের পর মাস জঙ্গলে অবস্থান আর যাই হোক দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগটি তাই জরুরি।

ড. তারেক শামসুর রেহমান : প্রফেসর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]