আমেরিকার নির্বাচন : ট্রাম্প না বাইডেন
jugantor
তৃতীয় মত
আমেরিকার নির্বাচন : ট্রাম্প না বাইডেন

  আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী  

২৬ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমেরিকার নির্বাচন : ট্রাম্প না বাইডেন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আর মাত্র সপ্তাহখানেক বাকি। শুধু আমেরিকা নয়, সারা বিশ্ব রুদ্ধ নিঃশ্বাসে অপেক্ষা করছে এ নির্বাচনে কে জেতেন- তা দেখার জন্য। কারণ, এ নির্বাচনের ফলাফল সারা বিশ্বের জনগণের মধ্যেই প্রভাব বিস্তার করবে। ‘গার্ডিয়ানের’ কলামিস্ট জনাথন ফ্রিডল্যান্ড গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) তার কলামের শিরোনাম দিয়েছেন- ‘Dare we dream of a Biden win’ (আমরা কি বাইডেনের জেতার স্বপ্ন দেখার সাহস করতে পারি)। তিনি নিজেই তার প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। চার বছর আগে এই ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট পদের নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটন জনমত জরিপে এগিয়ে ছিলেন। ওই নির্বাচনে ট্রাম্পের জয় ছিল অবিশ্বাস্য। হিলারির নির্বাচন বিজয়ের উৎসবে যোগদানের জন্য ওয়াশিংটনে এলিট ক্লাস প্রস্তুত হচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় ট্রাম্পের বিজয় লাভের খবর শুধু তাদের মধ্যে নয়, সারা বিশ্বে ‘শক ওয়েভ’ ছড়িয়েছিল।

এবার তাই দুনিয়ার বুদ্ধিজীবী ও পণ্ডিতকুলও সতর্ক। তারা কায়মনোবাক্যে জো বাইডেনের বিজয় কামনা করছেন। কিন্তু আরেকটি শক ওয়েভের জন্য নিজেদের প্রস্তুত রেখেছেন। তবে ‘গার্ডিয়ানের’ কলামিস্ট জনাথন ফ্রিডল্যান্ডের আশা, ‘ট্রাম্প অস্থিরমতি; বাইডেন স্থিরমতির লোক। নির্বাচন ক্যাম্পেইন পরিচালনায় বাইডেনের অর্থের জোরও বেশি। সর্বোপরি, এটি ২০১৬ সাল নয়। ট্রাম্প তখন ছিলেন অপরিচিত। এখন তার আদিনক্ষত্র লোকে জানে। আমেরিকার অধিকাংশ মানুষ জানে, বাইডেন একজন স্থিরমতির লোক। তার হাতে আমেরিকার ভবিষ্যৎ নিরাপদ এবং তিনি একজন ভদ্রস্বভাবের মানুষ।’

গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটন সম্পর্কে এ ধারণাটি তার দেশের মানুষ অথবা বিদেশের মানুষেরও ছিল না। কারণ হোয়াইট হাউসে ফার্স্ট লেডি অথবা ওবামা সরকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তার ভূমিকা স্বচ্ছ ছিল না। মধ্যপ্রাচ্যে গোপনে তহবিল জুগিয়ে তথাকথিত ইসলামিস্ট অথবা জিহাদিস্ট বাহিনী গঠন করে সিরিয়ায় রক্তের ধারা প্রবাহিত করেছিলেন তিনি। বাংলাদেশের ব্যাপারেও তার ভূমিকা ছিল- ব্যক্তিগত বন্ধু ড. ইউনূসের অবৈধ ব্যাংকিং কার্যকলাপের পক্ষ নিয়ে তিনি হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধাচরণ শুরু করেছিলেন এবং বাংলাদেশে অনুগত একটি সুশীল সমাজকে হাসিনাবিরোধী কার্যকলাপে উৎসাহিত করেছিলেন। ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশের প্রতি আমেরিকার ট্র্যাডিশনাল নীতি পরিবর্তন করেননি। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা নষ্ট করার কোনো তৎপরতা চালাননি। এক কথায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশ নিয়ে মাথা ঘামাননি। এজন্য হিলারিকে পরাজিত করে ট্রাম্প জয়ী হওয়ায় বিশ্বে যে শক ওয়েভ তৈরি হয়েছিল, তার ধাক্কা বাংলাদেশে আসেনি। বরং বাংলাদেশের এক শ্রেণির মানুষ মনে মনে খুশি হয়েছিলেন।

এবারের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ট্রাম্প ও হিলারির মধ্যে নয়; ট্রাম্প ও জো বাইডেনের মধ্যে। জো বাইডেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী। চেহারায় ও কথাবার্তায় তিনি অত্যন্ত ভদ্র এবং শালীন। ট্রাম্পের মতো অভদ্র ও অশালীন নন। তাই ট্রাম্পের দুঃশাসনে পীড়িত বিশ্বের মানুষ স্বাভাবিকভাবে বাইডেনের মধ্যে স্বস্তির আলো দেখছে এবং তার জয়লাভ কামনা করছে। কিন্তু একইসঙ্গে বিশ্বের মানুষ শঙ্কিত, যদি এবারের নির্বাচনেও কোনো অঘটন ঘটে। ট্রাম্প যদি তার স্বভাবসিদ্ধ ছলচাতুরী দ্বারা জয়ী হয়ে যান, তাহলে এবার এটি বাংলাদেশের জন্যও দুর্ভাগ্যজনক হবে। কারণ ট্রাম্প কতটা বর্ণবাদী ও ফ্যাসিবাদী চরিত্রের লোক তা তার গত চার বছরের দুঃশাসনে সারা বিশ্বের মানুষের মতো বাংলাদেশের মানুষও জেনে গেছে। তাই ‘দানবের ভূপৃষ্ঠে প্রত্যাগমনের’ আশঙ্কায় তারাও ভীত।

কিন্তু জো বাইডেনের জয়ে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশগুলোর আশা করার কি কিছু রয়েছে? বারাক ওবামা আমেরিকার ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর বিশ্বব্যাপী যে উল্লাস ও প্রত্যাশা দেখা দিয়েছিল, তিনি তার দু’দুবারের শাসনামলে তা পূরণ করতে পেরেছিলেন কি? যে কারণেই হোক, তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে তিনি অর্থনৈতিক বৈষম্য ঘুচানোর কিছু ব্যবস্থা করতে পারলেও তিনি বুশের পররাষ্ট্রনীতি-ই অনুসরণ করেছিলেন এবং আল কায়দার নেতা ওসামা বিন লাদেনকে অপর দেশে অবৈধ হামলা চালিয়ে ধরার পর আন্তর্জাতিক আদালতে না পাঠিয়ে নিজেরাই বিনা বিচারে হত্যা করেছিলেন।

সুতরাং এবার ডেমোক্র্যাট দলের শ্বেতাঙ্গ প্রার্থী জো বাইডেন হোয়াইট হাউসে বসতে পারলে তার কাছ থেকেও বেশি কিছু প্রত্যাশা করা যাবে না। তাকেও মার্কিন এস্টাবলিশমেন্টের আধিপত্যবাদী নীতি-ই অনুসরণ করতে হবে। তবে অভ্যন্তরীণ নীতির ক্ষেত্রে ট্রাম্পের শ্বাসরোধকারী নীতিগুলো থেকে হয়তো মার্কিন জনগণকে কিছু মুক্তি দেবেন। ইমিগ্রেশনবিদ্বেষ ও জাতিবিদ্বেষ হ্রাস করবেন। বিশ্বকে বারবার যুদ্ধের হুমকির মুখে নিয়ে যাবেন না। করোনাভাইরাস প্রতিরোধের ব্যাপারে বিশ্বের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত হবেন। ইউরোপের দিকে স্বস্তিদায়ক মৈত্রীর হাত আবার বাড়াবেন। চীনের সঙ্গে টেনশন কমাবেন ইত্যাদি ইত্যাদি। তাতেই ইউরোপ-আমেরিকার বুদ্ধিজীবী শ্রেণি স্বস্তির শ্বাস ফেলবেন। তাদের স্বস্তিতে বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষও স্বস্তি পাবেন। আর সেই স্বস্তিলাভের আশাতেই বাইডেনকে পরিত্রাতা ভেবে দুনিয়ার অধিকাংশ মানুষ তার জয়ের প্রত্যাশায় দিনক্ষণ গুনছে। কিন্তু আশঙ্কা হল, এ প্রত্যাশা ব্যর্থ করে ট্রাম্প ২০১৬ সালের মতো যদি আবার ম্যাজিশিয়ানের কৌশলে জিতে যান? যুদ্ধে রাম না জিতে রাবণ যদি জয়ী হন, সে-ই আশঙ্কাও বিশ্ববাসীর মনে ভালোভাবে দেখা দিয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে বসে যা খুশি করেছেন; যা খুশি বলেছেন; যা খুশি করার ক্ষেত্রে সব সভ্যতা ও ভব্যতার সীমা ছাড়িয়েছেন। তার আচরণ ছিল মধ্যযুগীয় সরদারদের মতো। একজন আধুনিক রুচিশীল মার্কিন প্রেসিডেন্টের মতো তার আচরণ ছিল না। নির্বাচনেও তার ছল-চাতুরীর অন্ত নেই। তিনি শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীদের সমর্থন দিয়ে তাদের একচেটিয়া ভোট বাগানোর ব্যবস্থা করেছেন। আমেরিকায় ডাকযোগে ভোট দেন কোটির বেশি ভোটদাতা। তিনি আগেভাগেই ডাক বিভাগের প্রধানের পদে তার এক অনুগতকে বসিয়ে ডাকযোগে প্রদত্ত ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, যা বাইডেনের পক্ষে গেছে-তা নানা অজুহাতে বাতিলের ব্যবস্থা করেছেন।

যারা নিজেরা উপস্থিত হয়ে ভোট দেন, তাদের যথাসময়ে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হওয়ায় বাধাদানের ব্যবস্থা করে রেখেছেন। তার সম্ভবত আশা, এভাবে বাইডেনের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের সঙ্গে তার ভোটের ব্যবধান কমিয়ে এনে নির্বাচনে কে জিতেছেন-তা নিয়ে বিতর্ক ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেয়ার জন্য সুপ্রিমকোর্টের দ্বারস্থ হওয়া। সুপ্রিমকোর্ট যাতে ট্রাম্পের পক্ষে রায় দেন, সে জন্য প্রেসিডেন্সিয়াল ক্ষমতায় তিনি তার অনুগত ও বিতর্কিত জজকে সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি পদে বসিয়েছেন। জর্জ বুশ জুনিয়র ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আল গোরের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টের সিদ্ধান্তের জোরেই জয়ী বলে ঘোষিত হয়েছিলেন। বর্তমান নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই পথ অনুসরণ করতে চান বলে এখনই অভিযোগ উঠেছে। শনিবার ‘গার্ডিয়ানে’ কলামিস্ট জনাথন ফ্রিডল্যান্ডও এ অভিযোগটি তুলেছেন।

আমাদের দেশের সুশীল সমাজের একটি অংশ ‘কুমারী গণতন্ত্র’ চান। আর এই ‘কুমারী গণতন্ত্রের’ দাবিতে অহরাত্রি চিৎকার করছেন। কিন্তু তাদের গণতন্ত্রের স্বপ্নভূমি আমেরিকায় আজ প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনেও গণতন্ত্রের কৌমার্য যে বারবার হরণ করা হচ্ছে, সে সম্পর্কে তারা একেবারেই নীরব কেন-সে প্রশ্নটি এখানে করা যায়। এখন দেখা যাচ্ছে, অভিযোগ উঠেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার মতো দেশে গণতন্ত্রের রীতি-নীতির কোনো ধার ধারছেন না। তিনি একজন আত্মস্বীকৃত আয়কর ফাঁকিদাতা। নারীদের সঙ্গে অশোভন আচরণের জন্য অভিযুক্ত। তিনি মার্কিন প্রশাসনে দলতন্ত্রও নয়; পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। হোয়াইট হাউসকে তার পুত্র-কন্যা-জামাইয়ের ব্যবসায়ের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতে দিচ্ছেন। তিনি দু’দুবার বিশ্বের যুদ্ধাশঙ্কা সৃষ্টি করে অস্ত্র নির্মাতা ও বিক্রেতাদের অবাধ মুনাফা অর্জনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আমেরিকাকে মিত্রহীন করেছেন। আমেরিকার বিশ্ব নেতৃত্বের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছেন। তার করোনানীতি আমেরিকার হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটিয়েছে। তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ, তিনি কপট এবং মিথ্যাচারী।

ট্রাম্প অহংকারী হলেও নিজের গুণগুলো জানেন। তাই এ নভেম্বরের নির্বাচনে তার জয়ের সম্ভাবনা কিছুটা থাকলেও তিনি পরাজয়ের ভয়ে ভীত এবং আতঙ্কিত। পরাজিত হলে তিনি কী করবেন, সে কথা আগেভাগেই বলতে শুরু করেছেন। জর্জিয়ার ম্যাকোনে এক নির্বাচনী সভায় বক্তৃতাদানের সময় ট্রাম্প বলেন, ‘আমি হেরে গেলে কী করব, তা আপনারা কল্পনা করতে পারেন? পরাজিত হলে আমার ভালো লাগবে না। আমাকে হয়তো দেশ ছেড়েই চলে যেতে হবে।’ একই বক্তৃতায় ট্রাম্প তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে অভব্য ভাষায় আক্রমণ চালিয়ে নিজের রুচির পরিচয় দিয়েছেন। বলেছেন, ‘আমার হাসি-ঠাট্টা করা উচিত নয়। কেন, আপনারা তা জানেন? আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ইতিহাসে সবচেয়ে বাজে প্রার্থীর বিরুদ্ধে আমাকে লড়তে হচ্ছে।’

কিন্তু আমেরিকার একজন সচেতন শিশুও জানে, তার দেশে সবচেয়ে বাজে ও নিকৃষ্ট প্রেসিডেন্ট কে? সেই নামটি ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি যদি ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে জিতে যান, তাহলে নিজে বাঁচবেন; কিন্তু মার্কিন জাতি ডুববে। আর যদি সত্যি পরাজিত হন, তাহলে দেশে তাকে নানা অপকর্মের দায়ে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে। আর যদি পালান, তাহলে পৃথিবীর কোন দেশ তাকে আশ্রয় দেবে?

লন্ডন, ২৫ অক্টোবর, রোববার, ২০২০

তৃতীয় মত

আমেরিকার নির্বাচন : ট্রাম্প না বাইডেন

 আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী 
২৬ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
আমেরিকার নির্বাচন : ট্রাম্প না বাইডেন
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেন। ফাইল ছবি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আর মাত্র সপ্তাহখানেক বাকি। শুধু আমেরিকা নয়, সারা বিশ্ব রুদ্ধ নিঃশ্বাসে অপেক্ষা করছে এ নির্বাচনে কে জেতেন- তা দেখার জন্য। কারণ, এ নির্বাচনের ফলাফল সারা বিশ্বের জনগণের মধ্যেই প্রভাব বিস্তার করবে। ‘গার্ডিয়ানের’ কলামিস্ট জনাথন ফ্রিডল্যান্ড গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) তার কলামের শিরোনাম দিয়েছেন- ‘Dare we dream of a Biden win’ (আমরা কি বাইডেনের জেতার স্বপ্ন দেখার সাহস করতে পারি)। তিনি নিজেই তার প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। চার বছর আগে এই ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট পদের নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটন জনমত জরিপে এগিয়ে ছিলেন। ওই নির্বাচনে ট্রাম্পের জয় ছিল অবিশ্বাস্য। হিলারির নির্বাচন বিজয়ের উৎসবে যোগদানের জন্য ওয়াশিংটনে এলিট ক্লাস প্রস্তুত হচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় ট্রাম্পের বিজয় লাভের খবর শুধু তাদের মধ্যে নয়, সারা বিশ্বে ‘শক ওয়েভ’ ছড়িয়েছিল।

এবার তাই দুনিয়ার বুদ্ধিজীবী ও পণ্ডিতকুলও সতর্ক। তারা কায়মনোবাক্যে জো বাইডেনের বিজয় কামনা করছেন। কিন্তু আরেকটি শক ওয়েভের জন্য নিজেদের প্রস্তুত রেখেছেন। তবে ‘গার্ডিয়ানের’ কলামিস্ট জনাথন ফ্রিডল্যান্ডের আশা, ‘ট্রাম্প অস্থিরমতি; বাইডেন স্থিরমতির লোক। নির্বাচন ক্যাম্পেইন পরিচালনায় বাইডেনের অর্থের জোরও বেশি। সর্বোপরি, এটি ২০১৬ সাল নয়। ট্রাম্প তখন ছিলেন অপরিচিত। এখন তার আদিনক্ষত্র লোকে জানে। আমেরিকার অধিকাংশ মানুষ জানে, বাইডেন একজন স্থিরমতির লোক। তার হাতে আমেরিকার ভবিষ্যৎ নিরাপদ এবং তিনি একজন ভদ্রস্বভাবের মানুষ।’

গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটন সম্পর্কে এ ধারণাটি তার দেশের মানুষ অথবা বিদেশের মানুষেরও ছিল না। কারণ হোয়াইট হাউসে ফার্স্ট লেডি অথবা ওবামা সরকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তার ভূমিকা স্বচ্ছ ছিল না। মধ্যপ্রাচ্যে গোপনে তহবিল জুগিয়ে তথাকথিত ইসলামিস্ট অথবা জিহাদিস্ট বাহিনী গঠন করে সিরিয়ায় রক্তের ধারা প্রবাহিত করেছিলেন তিনি। বাংলাদেশের ব্যাপারেও তার ভূমিকা ছিল- ব্যক্তিগত বন্ধু ড. ইউনূসের অবৈধ ব্যাংকিং কার্যকলাপের পক্ষ নিয়ে তিনি হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধাচরণ শুরু করেছিলেন এবং বাংলাদেশে অনুগত একটি সুশীল সমাজকে হাসিনাবিরোধী কার্যকলাপে উৎসাহিত করেছিলেন। ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশের প্রতি আমেরিকার ট্র্যাডিশনাল নীতি পরিবর্তন করেননি। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা নষ্ট করার কোনো তৎপরতা চালাননি। এক কথায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশ নিয়ে মাথা ঘামাননি। এজন্য হিলারিকে পরাজিত করে ট্রাম্প জয়ী হওয়ায় বিশ্বে যে শক ওয়েভ তৈরি হয়েছিল, তার ধাক্কা বাংলাদেশে আসেনি। বরং বাংলাদেশের এক শ্রেণির মানুষ মনে মনে খুশি হয়েছিলেন।

এবারের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ট্রাম্প ও হিলারির মধ্যে নয়; ট্রাম্প ও জো বাইডেনের মধ্যে। জো বাইডেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী। চেহারায় ও কথাবার্তায় তিনি অত্যন্ত ভদ্র এবং শালীন। ট্রাম্পের মতো অভদ্র ও অশালীন নন। তাই ট্রাম্পের দুঃশাসনে পীড়িত বিশ্বের মানুষ স্বাভাবিকভাবে বাইডেনের মধ্যে স্বস্তির আলো দেখছে এবং তার জয়লাভ কামনা করছে। কিন্তু একইসঙ্গে বিশ্বের মানুষ শঙ্কিত, যদি এবারের নির্বাচনেও কোনো অঘটন ঘটে। ট্রাম্প যদি তার স্বভাবসিদ্ধ ছলচাতুরী দ্বারা জয়ী হয়ে যান, তাহলে এবার এটি বাংলাদেশের জন্যও দুর্ভাগ্যজনক হবে। কারণ ট্রাম্প কতটা বর্ণবাদী ও ফ্যাসিবাদী চরিত্রের লোক তা তার গত চার বছরের দুঃশাসনে সারা বিশ্বের মানুষের মতো বাংলাদেশের মানুষও জেনে গেছে। তাই ‘দানবের ভূপৃষ্ঠে প্রত্যাগমনের’ আশঙ্কায় তারাও ভীত।

কিন্তু জো বাইডেনের জয়ে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশগুলোর আশা করার কি কিছু রয়েছে? বারাক ওবামা আমেরিকার ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর বিশ্বব্যাপী যে উল্লাস ও প্রত্যাশা দেখা দিয়েছিল, তিনি তার দু’দুবারের শাসনামলে তা পূরণ করতে পেরেছিলেন কি? যে কারণেই হোক, তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে তিনি অর্থনৈতিক বৈষম্য ঘুচানোর কিছু ব্যবস্থা করতে পারলেও তিনি বুশের পররাষ্ট্রনীতি-ই অনুসরণ করেছিলেন এবং আল কায়দার নেতা ওসামা বিন লাদেনকে অপর দেশে অবৈধ হামলা চালিয়ে ধরার পর আন্তর্জাতিক আদালতে না পাঠিয়ে নিজেরাই বিনা বিচারে হত্যা করেছিলেন।

সুতরাং এবার ডেমোক্র্যাট দলের শ্বেতাঙ্গ প্রার্থী জো বাইডেন হোয়াইট হাউসে বসতে পারলে তার কাছ থেকেও বেশি কিছু প্রত্যাশা করা যাবে না। তাকেও মার্কিন এস্টাবলিশমেন্টের আধিপত্যবাদী নীতি-ই অনুসরণ করতে হবে। তবে অভ্যন্তরীণ নীতির ক্ষেত্রে ট্রাম্পের শ্বাসরোধকারী নীতিগুলো থেকে হয়তো মার্কিন জনগণকে কিছু মুক্তি দেবেন। ইমিগ্রেশনবিদ্বেষ ও জাতিবিদ্বেষ হ্রাস করবেন। বিশ্বকে বারবার যুদ্ধের হুমকির মুখে নিয়ে যাবেন না। করোনাভাইরাস প্রতিরোধের ব্যাপারে বিশ্বের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত হবেন। ইউরোপের দিকে স্বস্তিদায়ক মৈত্রীর হাত আবার বাড়াবেন। চীনের সঙ্গে টেনশন কমাবেন ইত্যাদি ইত্যাদি। তাতেই ইউরোপ-আমেরিকার বুদ্ধিজীবী শ্রেণি স্বস্তির শ্বাস ফেলবেন। তাদের স্বস্তিতে বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষও স্বস্তি পাবেন। আর সেই স্বস্তিলাভের আশাতেই বাইডেনকে পরিত্রাতা ভেবে দুনিয়ার অধিকাংশ মানুষ তার জয়ের প্রত্যাশায় দিনক্ষণ গুনছে। কিন্তু আশঙ্কা হল, এ প্রত্যাশা ব্যর্থ করে ট্রাম্প ২০১৬ সালের মতো যদি আবার ম্যাজিশিয়ানের কৌশলে জিতে যান? যুদ্ধে রাম না জিতে রাবণ যদি জয়ী হন, সে-ই আশঙ্কাও বিশ্ববাসীর মনে ভালোভাবে দেখা দিয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে বসে যা খুশি করেছেন; যা খুশি বলেছেন; যা খুশি করার ক্ষেত্রে সব সভ্যতা ও ভব্যতার সীমা ছাড়িয়েছেন। তার আচরণ ছিল মধ্যযুগীয় সরদারদের মতো। একজন আধুনিক রুচিশীল মার্কিন প্রেসিডেন্টের মতো তার আচরণ ছিল না। নির্বাচনেও তার ছল-চাতুরীর অন্ত নেই। তিনি শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীদের সমর্থন দিয়ে তাদের একচেটিয়া ভোট বাগানোর ব্যবস্থা করেছেন। আমেরিকায় ডাকযোগে ভোট দেন কোটির বেশি ভোটদাতা। তিনি আগেভাগেই ডাক বিভাগের প্রধানের পদে তার এক অনুগতকে বসিয়ে ডাকযোগে প্রদত্ত ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, যা বাইডেনের পক্ষে গেছে-তা নানা অজুহাতে বাতিলের ব্যবস্থা করেছেন।

যারা নিজেরা উপস্থিত হয়ে ভোট দেন, তাদের যথাসময়ে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হওয়ায় বাধাদানের ব্যবস্থা করে রেখেছেন। তার সম্ভবত আশা, এভাবে বাইডেনের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের সঙ্গে তার ভোটের ব্যবধান কমিয়ে এনে নির্বাচনে কে জিতেছেন-তা নিয়ে বিতর্ক ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেয়ার জন্য সুপ্রিমকোর্টের দ্বারস্থ হওয়া। সুপ্রিমকোর্ট যাতে ট্রাম্পের পক্ষে রায় দেন, সে জন্য প্রেসিডেন্সিয়াল ক্ষমতায় তিনি তার অনুগত ও বিতর্কিত জজকে সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি পদে বসিয়েছেন। জর্জ বুশ জুনিয়র ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আল গোরের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টের সিদ্ধান্তের জোরেই জয়ী বলে ঘোষিত হয়েছিলেন। বর্তমান নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই পথ অনুসরণ করতে চান বলে এখনই অভিযোগ উঠেছে। শনিবার ‘গার্ডিয়ানে’ কলামিস্ট জনাথন ফ্রিডল্যান্ডও এ অভিযোগটি তুলেছেন।

আমাদের দেশের সুশীল সমাজের একটি অংশ ‘কুমারী গণতন্ত্র’ চান। আর এই ‘কুমারী গণতন্ত্রের’ দাবিতে অহরাত্রি চিৎকার করছেন। কিন্তু তাদের গণতন্ত্রের স্বপ্নভূমি আমেরিকায় আজ প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনেও গণতন্ত্রের কৌমার্য যে বারবার হরণ করা হচ্ছে, সে সম্পর্কে তারা একেবারেই নীরব কেন-সে প্রশ্নটি এখানে করা যায়। এখন দেখা যাচ্ছে, অভিযোগ উঠেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার মতো দেশে গণতন্ত্রের রীতি-নীতির কোনো ধার ধারছেন না। তিনি একজন আত্মস্বীকৃত আয়কর ফাঁকিদাতা। নারীদের সঙ্গে অশোভন আচরণের জন্য অভিযুক্ত। তিনি মার্কিন প্রশাসনে দলতন্ত্রও নয়; পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। হোয়াইট হাউসকে তার পুত্র-কন্যা-জামাইয়ের ব্যবসায়ের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতে দিচ্ছেন। তিনি দু’দুবার বিশ্বের যুদ্ধাশঙ্কা সৃষ্টি করে অস্ত্র নির্মাতা ও বিক্রেতাদের অবাধ মুনাফা অর্জনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আমেরিকাকে মিত্রহীন করেছেন। আমেরিকার বিশ্ব নেতৃত্বের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছেন। তার করোনানীতি আমেরিকার হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটিয়েছে। তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ, তিনি কপট এবং মিথ্যাচারী।

ট্রাম্প অহংকারী হলেও নিজের গুণগুলো জানেন। তাই এ নভেম্বরের নির্বাচনে তার জয়ের সম্ভাবনা কিছুটা থাকলেও তিনি পরাজয়ের ভয়ে ভীত এবং আতঙ্কিত। পরাজিত হলে তিনি কী করবেন, সে কথা আগেভাগেই বলতে শুরু করেছেন। জর্জিয়ার ম্যাকোনে এক নির্বাচনী সভায় বক্তৃতাদানের সময় ট্রাম্প বলেন, ‘আমি হেরে গেলে কী করব, তা আপনারা কল্পনা করতে পারেন? পরাজিত হলে আমার ভালো লাগবে না। আমাকে হয়তো দেশ ছেড়েই চলে যেতে হবে।’ একই বক্তৃতায় ট্রাম্প তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে অভব্য ভাষায় আক্রমণ চালিয়ে নিজের রুচির পরিচয় দিয়েছেন। বলেছেন, ‘আমার হাসি-ঠাট্টা করা উচিত নয়। কেন, আপনারা তা জানেন? আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ইতিহাসে সবচেয়ে বাজে প্রার্থীর বিরুদ্ধে আমাকে লড়তে হচ্ছে।’

কিন্তু আমেরিকার একজন সচেতন শিশুও জানে, তার দেশে সবচেয়ে বাজে ও নিকৃষ্ট প্রেসিডেন্ট কে? সেই নামটি ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি যদি ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে জিতে যান, তাহলে নিজে বাঁচবেন; কিন্তু মার্কিন জাতি ডুববে। আর যদি সত্যি পরাজিত হন, তাহলে দেশে তাকে নানা অপকর্মের দায়ে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে। আর যদি পালান, তাহলে পৃথিবীর কোন দেশ তাকে আশ্রয় দেবে?

লন্ডন, ২৫ অক্টোবর, রোববার, ২০২০