তথ্য-উপাত্তের মান বাড়াতে হবে
jugantor
তথ্য-উপাত্তের মান বাড়াতে হবে

  ড. মো. আলাউদ্দিন মজুমদার  

২৭ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

একটি দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির প্রথম সারির নির্ধারকগুলোর অন্যতম হল গবেষণা। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর শিল্পবিপ্লব থেকে শুরু করে হাল আমলের মেগা উন্নয়নের পেছনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে গবেষণাজাত প্রযুক্তিগত ও অন্যান্য উদ্ভাবন।

বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের উত্তরণের প্রেক্ষাপটে কল্যাণরাষ্ট্র বিনির্মাণে ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে সামাজিক গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। লোকনীতি (চঁনষরপ ঢ়ড়ষরপু) প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা সামাজিক গবেষণার ফলাফল থেকে প্রাপ্ত প্রামাণিক তথ্য ব্যবহার করে উপকৃত হন। এরূপ প্রামাণিক তথ্যের ভিত্তিতে প্রণীত নীতি অধিকতর কার্যকর বিধায় প্রামাণিক তথ্যভিত্তিক নীতি-প্রণয়ন বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নীতি প্রণয়নের এ অ্যাপ্রোচকে সাদরে গ্রহণ করছে। বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও এ অ্যাপ্রোচের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করছে। উল্লেখ্য, তথ্য-উপাত্ত ছাড়া সামাজিক গবেষণা প্রায় অসম্ভব। একটি দেশের তথ্য-উপাত্তের ভাণ্ডার যত বেশি সমৃদ্ধ হবে, সেদেশের গবেষকরা তত বেশি সুচারুরূপে সামাজিক গবেষণা পরিচালনা করতে পারবেন। এর অর্থ হল, একটি সমৃদ্ধ, স্বচ্ছ ও মানসম্পন্ন তথ্য-উপাত্তের ভাণ্ডার জাতির উন্নয়নের নিয়ামক শক্তি।

বাংলাদেশ যেহেতু একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় উদীয়মান অর্থনীতির দেশ, তথ্য-উপাত্তের মান ও পর্যাপ্ততার দিক থেকে এর অবস্থান কোথায় এ প্রশ্ন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আইএমএফের সাম্প্রতিক প্রাক্কলন অনুযায়ী বাংলাদেশ মাথাপিছু প্রকৃত জাতীয় আয়ের দিক থেকে শিগগিরই ভারতকে টপকে যাবে। যেহেতু আমাদের সরবরাহকৃত তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করেই এ ধরনের প্রাক্কলন করা হয়, সেহেতু দেশের তথ্য-উপাত্তের ভাণ্ডার মানসম্পন্ন না হলে সঙ্গত কারণেই এ প্রাক্কলনসহ দেশের জন্য অন্য অনেক সুখকর সংবাদ প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ জনমিতি ও অর্থনীতি সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও সরবরাহ মানসম্পন্ন উপায়ে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে কতটুকু পারঙ্গম তা বিশ্বব্যাংক পরিসংখ্যান সংক্রান্ত সামর্থ্য সূচক (Statistical capacity indicator) নামে একটি সূচকের মাধ্যমে প্রতি বছর প্রকাশ করে থাকে। সর্বশেষ ২০১৯ সালে প্রকাশিত এ সূচক অনুযায়ী ১০০-এর মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ৬২.২২, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্কোর ৬৯.০৭।

এ স্কোর নিয়ে বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৭তম। একই স্কোর নিয়ে আফ্রিকান দেশ বুর্কিনা ফাসো ও তানজানিয়াও ৪৭তম অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের উপরে আছে ৮৭টি দেশ। অবাক করার বিষয় হল, সার্ক অঞ্চলে আফগানিস্তান ছাড়া আর সবক’টি দেশ বাংলাদেশের উপরে অবস্থান করছে। বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে শ্রীলংকা (স্কোর ৮১.১১), ভারত (স্কোর ৭৫.৫৬), নেপাল (স্কোর ৭৪.৪৪), পাকিস্তান (স্কোর ৭১.১১), মালদ্বীপ (স্কোর ৬৪.৪৪) ও ভুটানের (স্কোর ৬৩.৩৩) অবস্থান যথাক্রমে ১৬, ২৪, ২৭, ৩১, ৪৪ ও ৪৫তম।

বিশ্ব ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে আমাদের তথ্য-উপাত্ত ভাণ্ডারের চিত্র কতটুকু হতাশাব্যঞ্জক তা বিশ্বব্যাংকের এসব তথ্যে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে। এছাড়া দেশের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বপ্রাপ্ত সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সময়ে সময়ে করা জাতীয় অর্থনৈতিক সূচকগুলোর প্রাক্কলন বিতর্কের জন্ম দেয়ায় সামগ্রিকভাবে দেশের তথ্য-উপাত্তের পর্যাপ্ততা, স্বচ্ছতা ও মান নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে।

সম্প্রতি ওই প্রতিষ্ঠান ২০১৯-২০ সালের জন্য ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির একটি সাময়িক হিসাব দিয়ে নেতিবাচকভাবে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। অনেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া ও তথ্য বিশ্লেষণে গুণগত মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতার ব্যাপারে প্রশ্ন উত্থাপন করেন।

কেউ কেউ অভিযোগের সুরে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সাবেক সচিব রীতি ইব্রাহিম এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমি তরুণ বয়সে দেখেছি জিডিপি কত হবে তা আগে ঠিক করা হয়। পরে ‘ব্যাক ক্যালকুলেশন’ করে হিসাব ঠিক করা হয়।’ তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ও উদ্বেগজনক পর্যবেক্ষণ হল- ‘তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও বিবিএসের ওপর রাজনৈতিক চাপ থাকে। এ চাপ সবসময় ছিল। আমি যখন বিবিএসে ছিলাম, তখন মাঠপর্যায়ে যা তথ্য পেতাম তাই প্রতিবেদনে দিতাম। সেটি করলে সরকারের সুনজরে থাকা যায় না। এ জন্য সংস্থাটির কর্মকর্তারা সরকারের কথা শোনেন। সরকার যা চান, তাই করে দেন।’

অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হল, শুধু ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলনের ঘটনার কারণেই নয়, আগে থেকেই এদেশের তথ্য-উপাত্তের মান নিয়ে বিজ্ঞ মহলে নেতিবাচক ধারণা বহাল ছিল। স্টেইট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক অ্যাট কোরল্যান্ডের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. বিরুপাক্ষ পালের একটি সাক্ষাৎকারকে প্রাসঙ্গিকভাবে টেনে আনা যায়।

ড. পাল বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন বেশ কিছুদিন। সেই সুবাদে এদেশের তথ্য-উপাত্ত ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে বিশদ অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তিনি ওই সাক্ষাৎকারে বলেছেন, শুনতে খারাপ শোনালেও এটি সত্য যে, বাংলাদেশের মতো নিম্ন মানসম্পন্ন তথ্য-উপাত্ত পৃথিবীর আর কোনো দেশের নেই। বিশুদ্ধতার মানদণ্ডে রাষ্ট্রায়ত্ত বিবিএস কর্তৃক পরিবেশিত তথ্য-উপাত্তের অবস্থান বিশ্বের দরবারে একেবারে পেছনের সারিতে।

বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান সংক্রান্ত সামর্থ্য সূচক, রীতি ইব্রাহিম ও ড. পালের পর্যবেক্ষণ এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরের জিডিপির প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিবিএসের বিতর্কিত হিসাব বিবেচনায় নিলে বলার অপেক্ষা রাখে না, এ দেশের তথ্য-উপাত্তের ওপর আস্থার জায়গাটা অত্যন্ত ক্ষীণ। আস্থার সংকটে জর্জরিত এ তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে পরিচালিত গবেষণা যে প্রামাণিক তথ্যের জোগান দেবে তা লোকনীতি (চঁনষরপ ঢ়ড়ষরপু) নির্ধারণের রসদ হিসেবে মানসম্পন্ন হবে না এটাই স্বাভাবিক। তার মানে প্রামাণিক তথ্যভিত্তিক নীতি-প্রণয়ন বাংলাদেশের জন্য সুদূরপরাহতই থেকে যাবে।

তবে কিছু পদক্ষেপের মাধ্যমে অবস্থার উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। প্রথমত, দেশের তথ্য-উপাত্ত ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠান বিবিএসকে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানোর জন্য এর কোনো বিকল্প নেই। দ্বিতীয়ত, বিবিএসে এমন জনবল নিয়োগ দিতে হবে যারা একদিকে পরিসংখ্যানবিষয়ক জ্ঞানে সমৃদ্ধ হবে এবং অন্যদিকে প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হবে।

অভিযোগ আছে প্রতিষ্ঠানটিতে এমন ব্যক্তিদেরও নিয়োগ দেয়া হয়, যাদের পরিসংখ্যান সংক্রান্ত জ্ঞানের সঙ্গে ন্যূনতম পরিচয় নেই। তৃতীয়ত, বিবিএস ছাড়াও অন্য যেসব প্রতিষ্ঠান (গৌণ দায়িত্ব হিসেবে) তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে থাকে তাদের সঙ্গে বিবিএসের সমন্বয় থাকতে হবে। এতে করে তথ্য-উপাত্তের অসঙ্গতি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। সর্বোপরি, পরিসংখ্যানবিষয়ক সক্ষমতায় অগ্রগামী দেশগুলোর সঙ্গে অভিজ্ঞতার বিনিময় ঘটিয়ে নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

ড. মো. আলাউদ্দিন মজুমদার : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

তথ্য-উপাত্তের মান বাড়াতে হবে

 ড. মো. আলাউদ্দিন মজুমদার 
২৭ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

একটি দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির প্রথম সারির নির্ধারকগুলোর অন্যতম হল গবেষণা। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর শিল্পবিপ্লব থেকে শুরু করে হাল আমলের মেগা উন্নয়নের পেছনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে গবেষণাজাত প্রযুক্তিগত ও অন্যান্য উদ্ভাবন।

বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের উত্তরণের প্রেক্ষাপটে কল্যাণরাষ্ট্র বিনির্মাণে ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে সামাজিক গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। লোকনীতি (চঁনষরপ ঢ়ড়ষরপু) প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা সামাজিক গবেষণার ফলাফল থেকে প্রাপ্ত প্রামাণিক তথ্য ব্যবহার করে উপকৃত হন। এরূপ প্রামাণিক তথ্যের ভিত্তিতে প্রণীত নীতি অধিকতর কার্যকর বিধায় প্রামাণিক তথ্যভিত্তিক নীতি-প্রণয়ন বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নীতি প্রণয়নের এ অ্যাপ্রোচকে সাদরে গ্রহণ করছে। বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও এ অ্যাপ্রোচের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করছে। উল্লেখ্য, তথ্য-উপাত্ত ছাড়া সামাজিক গবেষণা প্রায় অসম্ভব। একটি দেশের তথ্য-উপাত্তের ভাণ্ডার যত বেশি সমৃদ্ধ হবে, সেদেশের গবেষকরা তত বেশি সুচারুরূপে সামাজিক গবেষণা পরিচালনা করতে পারবেন। এর অর্থ হল, একটি সমৃদ্ধ, স্বচ্ছ ও মানসম্পন্ন তথ্য-উপাত্তের ভাণ্ডার জাতির উন্নয়নের নিয়ামক শক্তি।

বাংলাদেশ যেহেতু একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় উদীয়মান অর্থনীতির দেশ, তথ্য-উপাত্তের মান ও পর্যাপ্ততার দিক থেকে এর অবস্থান কোথায় এ প্রশ্ন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আইএমএফের সাম্প্রতিক প্রাক্কলন অনুযায়ী বাংলাদেশ মাথাপিছু প্রকৃত জাতীয় আয়ের দিক থেকে শিগগিরই ভারতকে টপকে যাবে। যেহেতু আমাদের সরবরাহকৃত তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করেই এ ধরনের প্রাক্কলন করা হয়, সেহেতু দেশের তথ্য-উপাত্তের ভাণ্ডার মানসম্পন্ন না হলে সঙ্গত কারণেই এ প্রাক্কলনসহ দেশের জন্য অন্য অনেক সুখকর সংবাদ প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ জনমিতি ও অর্থনীতি সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও সরবরাহ মানসম্পন্ন উপায়ে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে কতটুকু পারঙ্গম তা বিশ্বব্যাংক পরিসংখ্যান সংক্রান্ত সামর্থ্য সূচক (Statistical capacity indicator) নামে একটি সূচকের মাধ্যমে প্রতি বছর প্রকাশ করে থাকে। সর্বশেষ ২০১৯ সালে প্রকাশিত এ সূচক অনুযায়ী ১০০-এর মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ৬২.২২, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্কোর ৬৯.০৭।

এ স্কোর নিয়ে বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৭তম। একই স্কোর নিয়ে আফ্রিকান দেশ বুর্কিনা ফাসো ও তানজানিয়াও ৪৭তম অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের উপরে আছে ৮৭টি দেশ। অবাক করার বিষয় হল, সার্ক অঞ্চলে আফগানিস্তান ছাড়া আর সবক’টি দেশ বাংলাদেশের উপরে অবস্থান করছে। বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে শ্রীলংকা (স্কোর ৮১.১১), ভারত (স্কোর ৭৫.৫৬), নেপাল (স্কোর ৭৪.৪৪), পাকিস্তান (স্কোর ৭১.১১), মালদ্বীপ (স্কোর ৬৪.৪৪) ও ভুটানের (স্কোর ৬৩.৩৩) অবস্থান যথাক্রমে ১৬, ২৪, ২৭, ৩১, ৪৪ ও ৪৫তম।

বিশ্ব ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে আমাদের তথ্য-উপাত্ত ভাণ্ডারের চিত্র কতটুকু হতাশাব্যঞ্জক তা বিশ্বব্যাংকের এসব তথ্যে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে। এছাড়া দেশের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বপ্রাপ্ত সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সময়ে সময়ে করা জাতীয় অর্থনৈতিক সূচকগুলোর প্রাক্কলন বিতর্কের জন্ম দেয়ায় সামগ্রিকভাবে দেশের তথ্য-উপাত্তের পর্যাপ্ততা, স্বচ্ছতা ও মান নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে।

সম্প্রতি ওই প্রতিষ্ঠান ২০১৯-২০ সালের জন্য ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির একটি সাময়িক হিসাব দিয়ে নেতিবাচকভাবে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। অনেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া ও তথ্য বিশ্লেষণে গুণগত মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতার ব্যাপারে প্রশ্ন উত্থাপন করেন।

কেউ কেউ অভিযোগের সুরে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সাবেক সচিব রীতি ইব্রাহিম এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমি তরুণ বয়সে দেখেছি জিডিপি কত হবে তা আগে ঠিক করা হয়। পরে ‘ব্যাক ক্যালকুলেশন’ করে হিসাব ঠিক করা হয়।’ তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ও উদ্বেগজনক পর্যবেক্ষণ হল- ‘তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও বিবিএসের ওপর রাজনৈতিক চাপ থাকে। এ চাপ সবসময় ছিল। আমি যখন বিবিএসে ছিলাম, তখন মাঠপর্যায়ে যা তথ্য পেতাম তাই প্রতিবেদনে দিতাম। সেটি করলে সরকারের সুনজরে থাকা যায় না। এ জন্য সংস্থাটির কর্মকর্তারা সরকারের কথা শোনেন। সরকার যা চান, তাই করে দেন।’

অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হল, শুধু ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলনের ঘটনার কারণেই নয়, আগে থেকেই এদেশের তথ্য-উপাত্তের মান নিয়ে বিজ্ঞ মহলে নেতিবাচক ধারণা বহাল ছিল। স্টেইট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক অ্যাট কোরল্যান্ডের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. বিরুপাক্ষ পালের একটি সাক্ষাৎকারকে প্রাসঙ্গিকভাবে টেনে আনা যায়।

ড. পাল বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন বেশ কিছুদিন। সেই সুবাদে এদেশের তথ্য-উপাত্ত ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে বিশদ অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তিনি ওই সাক্ষাৎকারে বলেছেন, শুনতে খারাপ শোনালেও এটি সত্য যে, বাংলাদেশের মতো নিম্ন মানসম্পন্ন তথ্য-উপাত্ত পৃথিবীর আর কোনো দেশের নেই। বিশুদ্ধতার মানদণ্ডে রাষ্ট্রায়ত্ত বিবিএস কর্তৃক পরিবেশিত তথ্য-উপাত্তের অবস্থান বিশ্বের দরবারে একেবারে পেছনের সারিতে।

বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান সংক্রান্ত সামর্থ্য সূচক, রীতি ইব্রাহিম ও ড. পালের পর্যবেক্ষণ এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরের জিডিপির প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিবিএসের বিতর্কিত হিসাব বিবেচনায় নিলে বলার অপেক্ষা রাখে না, এ দেশের তথ্য-উপাত্তের ওপর আস্থার জায়গাটা অত্যন্ত ক্ষীণ। আস্থার সংকটে জর্জরিত এ তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে পরিচালিত গবেষণা যে প্রামাণিক তথ্যের জোগান দেবে তা লোকনীতি (চঁনষরপ ঢ়ড়ষরপু) নির্ধারণের রসদ হিসেবে মানসম্পন্ন হবে না এটাই স্বাভাবিক। তার মানে প্রামাণিক তথ্যভিত্তিক নীতি-প্রণয়ন বাংলাদেশের জন্য সুদূরপরাহতই থেকে যাবে।

তবে কিছু পদক্ষেপের মাধ্যমে অবস্থার উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। প্রথমত, দেশের তথ্য-উপাত্ত ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠান বিবিএসকে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানোর জন্য এর কোনো বিকল্প নেই। দ্বিতীয়ত, বিবিএসে এমন জনবল নিয়োগ দিতে হবে যারা একদিকে পরিসংখ্যানবিষয়ক জ্ঞানে সমৃদ্ধ হবে এবং অন্যদিকে প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হবে।

অভিযোগ আছে প্রতিষ্ঠানটিতে এমন ব্যক্তিদেরও নিয়োগ দেয়া হয়, যাদের পরিসংখ্যান সংক্রান্ত জ্ঞানের সঙ্গে ন্যূনতম পরিচয় নেই। তৃতীয়ত, বিবিএস ছাড়াও অন্য যেসব প্রতিষ্ঠান (গৌণ দায়িত্ব হিসেবে) তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে থাকে তাদের সঙ্গে বিবিএসের সমন্বয় থাকতে হবে। এতে করে তথ্য-উপাত্তের অসঙ্গতি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। সর্বোপরি, পরিসংখ্যানবিষয়ক সক্ষমতায় অগ্রগামী দেশগুলোর সঙ্গে অভিজ্ঞতার বিনিময় ঘটিয়ে নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

 

ড. মো. আলাউদ্দিন মজুমদার : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]