যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের নবসম্পর্কের স্বরূপ কী?
jugantor
শতফুল ফুটতে দাও
যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের নবসম্পর্কের স্বরূপ কী?

  ড. মাহবুব উল্লাহ্  

২৯ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পৃথিবী এককেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। এ পৃথিবীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে এমন কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র ছিল না। ওইসময় স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা একটি গ্রন্থ রচনা করেন।

গ্রন্থটির নাম হল The End of History and the Last Man. এ গ্রন্থের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল সোভিয়েত কমিউনিজমের পতন প্রমাণ করেছে সমাজতন্ত্র টেকসই কোনো অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক ব্যবস্থা নয়। পুঁজিবাদ একটি চিরস্থায়ী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে অনন্তকাল টিকে থাকবে। তার সঙ্গে পাশাপাশি থাকবে উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। অর্থাৎ অর্থনীতিতে পুঁজিবাদ এবং রাজনীতিতে গণতন্ত্র।

দার্শনিকভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, মানবসভ্যতার উষালগ্নের পর থেকে মানবসমাজে বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। একটি ব্যবস্থার টিকে থাকাটা নির্ভর করত সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে ওই ব্যবস্থা কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ তার ওপর। সামঞ্জস্যের অভাব ঘটলে সৃষ্টি হয় দ্বন্দ্ব। এ দ্বন্দ্বই আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী করে তোলে। সাম্প্রতিককালে প্রফেসর ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা তার অবস্থানে পরিবর্তন এনেছেন।

চিরস্থায়ী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে পুঁজিবাদ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। এ চ্যালেঞ্জের সূচনা ১৯৭৮ সালে। ১৯৭৮ সালে দেং জিয়াওপিংয়ের নেতৃত্বে চীনে অর্থনৈতিক সংস্কার এবং উন্মুক্তকরণ নীতির সূচনা হয়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে অনেক সংস্কার প্রবর্তিত হয়। এখনও সংস্কারের প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে।

তবে চীনে যেসব সংস্কার আনা হচ্ছে সেগুলো যথেষ্ট চিন্তাভাবনা করে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্র ধসে পড়ার পর ক্ষমতায় আসেন বরিস ইয়েলৎসিন। তার সময়ে আইএমএফ বেশকিছু তরুণ অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞকে রাশিয়ায় পাঠিয়েছিল।

তারা অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য শক্ থেরাপির পলিসি গ্রহণে রুশ সরকারকে উদ্বুদ্ধ করে। এর ফলে রাতারাতি অনেক পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু সেই পরিবর্তন মোটেও কল্যাণকর ছিল না। স্বল্পতম সময়ের মধ্যে নতুন ব্যবস্থা অর্থাৎ মুক্তবাজার নীতি কার্যকর করতে গিয়ে অর্থনীতিতে নানা ধরনের অসঙ্গতির সৃষ্টি হয়।

কয়েক মাসের মধ্যে রাশিয়ার জিডিপি ৫০ শতাংশ কমে যায়। ফলে বাজারে দুষ্প্রাপ্যতার সৃষ্টি হয়। সাধারণ মানুষ খাদ্য, বস্ত্র এবং কর্মসংস্থানের অভাবে দারুণ কষ্টের মধ্যে পড়ে।

অভিযোগ আছে, আইএমএফ প্রেরিত পরামর্শকরা বেহাল অর্থনীতির সুযোগ নিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক বনে যায়। অবশ্য তারা তাদের সঙ্গে কোম্পানি গঠনের জন্য কতিপয় রুশ নাগরিককেও এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে।

এভাবে রাশিয়ায় এক ধরনের মাফিয়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু হয়। এরা রাতারাতি শত-সহস্র কোটি ডলারের মালিকে পরিণত হয়। মজার ব্যাপার হল, এদের মধ্যে অনেকেই ছিল ক্ষমতা হারানো কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। এদের বলা হতো Nomen Ketura। এরাই রুশ সমাজের নব্য ধনী।

চীনে সংস্কার প্রবর্তিত হয়েছিল ধীরে ধীরে। দেং জিয়াওপিংয়ের অত্যন্ত প্রিয় একটি চীনা প্রবাদ ছিল। এ প্রবাদে বলা হয়েছে Feeling the stones, while crossing the river. অর্থাৎ নদী পেরোতে গেলে দেখতে হবে পাথরগুলো কীভাবে আছে। এ প্রবাদটির মর্ম কথা হল, কোনো কাজ করতে গেলে বাস্তব অবস্থার সঠিক উপলব্ধি থাকতে হবে।

বাস্তব অবস্থার সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই সংস্কার প্রবর্তিত হবে। দেংয়ের আরেকটি উক্তি ছিল, To be rich is not bad. অর্থাৎ ধনী হওয়া খারাপ নয়। আপাতভাবে মনে হতে পারে এমন একটি উক্তি অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল। কিন্তু সমাজতন্ত্রের উদ্দেশ্য গরিব থাকা নয়। সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য হল দারিদ্র্য অতিক্রমণ করে দেশের নাগরিকদের অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য আনয়ন করা।

এটাকেই বলা হচ্ছে চীনা বৈশিষ্ট্যের সমাজতন্ত্র। সমাজতন্ত্রের প্রাথমিক স্তরে উৎপাদিকা শক্তি থাকে অত্যন্ত দুর্বল। এ উৎপাদিকা শক্তিকে বিকশিত করতে গিয়ে সমাজে বৈষম্যের উদ্ভব ঘটতে পারে। কার্ল মার্কস সমাজতন্ত্র সম্পর্কে তেমন কিছু লেখেননি। তার গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সংকট এবং এ সংকটের ফলে পুঁজিবাদের পতন কেন অবশ্যম্ভাবী হবে। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কায়িক শ্রম ও মানসিক শ্রমের মধ্যে পার্থক্য থাকে। যারা মানসিক শ্রমে নিযুক্ত তারা বেশি আয় করে।

সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গ্রাম ও শহরের মধ্যে অর্থনৈতিক পার্থক্য থাকে। তুলনামূলকভাবে গ্রামের মানুষের শহরের মানুষের তুলনায় আয় কম হয়। এছাড়া জনমিতিক কারণে অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি হতে পারে। একই সমান মজুরি পায় এমন দুটি পরিবারের মধ্যে যে পরিবারে পোষ্যের সংখ্যা কম, সে পরিবারটি তুলনামূলকভাবে সচ্ছল হয়। সমাজতান্ত্রিক সমাজে বৈষম্য সম্পর্কে কার্ল মার্কস শুধু এ সামান্য কথাগুলো বলেছিলেন।

১৯৭৮ সালে সংস্কার এবং উন্মুক্তকরণ নীতি প্রবর্তিত হওয়ার পর চীনের শনৈ শনৈ অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে। বিশ্ববাজারে চীনের পণ্য প্রতিযোগিতামূলক দামে বিক্রি হচ্ছে। চীন এখন বিশ্বের ফ্যাক্টরিতে পরিণত হয়েছে। বড় অর্থনীতি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরই চীনের অবস্থান।

চীনের এ উন্নয়নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও অবদান আছে। ১৯৭১-এ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তনের সূচনা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। উভয়পক্ষ সোভিয়েত আগ্রাসন মোকাবেলা করার জন্য একটি সমঝোতায় উপনীত হয়।

কিন্তু একটা সময় আসে যখন এ সমঝোতাকে ধরে রাখা সম্ভব হয় না। চীনে অনেক বহুজাতিক কোম্পানি তাদের পুঁজি বিনিয়োগ করেছে। ফলে চীনের অর্থনীতিতে প্রবল গতির সঞ্চার হয়। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো চীনা শ্রমিকদের কর্মনিষ্ঠা এবং মজুরি কম থাকায় লাভবান হয়। কিন্তু চীনও উপকৃত হয়। চীনা শ্রমিক এবং ইঞ্জিনিয়াররা বহুজাতিক ফার্মে কাজ করে উন্নতমানের মার্কিন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠে। চীন থেকে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীকে উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়।

অবশ্য আরও অনেক দেশে, যেমন ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স ও জার্মানির মতো দেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য চীন সরকার ছাত্রছাত্রীদের পাঠায়। ফলে চীনা শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন উন্নত দেশের প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠে। চীনা শিক্ষার্থীদের একটি বড় সামর্থ্য হল গাণিতিক বিদ্যায় পারদর্শিতা। গণিতশাস্ত্রে পারদর্শী হলে উচ্চতর প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান আয়ত্ত করা সহজসাধ্য হয়ে ওঠে। এসব শিক্ষার্থীর বেশির ভাগই শিক্ষা সমাপন শেষে নিজ দেশে ফিরে আসে।

চীন যতই উন্নতি করতে থাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনকে ততই বিপদের উৎস হিসেবে গণ্য করতে থাকে। এভাবে চীন-মার্কিন সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন চীনের ওপর কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করে। ফলে উভয় দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার মাত্রা হ্রাস পায়।

চীনও বাধ্য হয় বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার সমান্তরালে মার্কিন পণ্যের ওপর বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে। চীন এককেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থায় বিশ্বাস করে না। তারা যে উন্নতি এবং সমৃদ্ধি অর্জন করেছে তার ফলে একটি সামরিক শক্তি হিসেবেও চীন নিজের ওপর আস্থাবান হয়ে উঠেছে।

প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চীনের একটি অনন্য সাফল্য হল চাঁদের যে অর্ধেক অংশ সৃষ্টিলগ্ন থেকেই অন্ধকারে ছিল সেখানে মহাশূন্য যান প্রেরণ করা। এমন একটি উদীয়মান শক্তিকে প্রতিহত করা সত্যিই কঠিন।

কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনকে প্রতিহত করার জন্য সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। চীন মনে করে বিশ্বায়ন থেকে বিচ্যুত হলে পৃথিবীর অনেক দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। চীনের উন্নয়ন বিশ্বায়ন থেকে বহুলভাবে শক্তিশালী হয়েছে। তাই চীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প সরকারের বিশ্বায়নবিরোধী নীতির তীব্র সমালোচক।

ট্রাম্প মনে করছেন, চীন থেকে কম দামে যেসব পণ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা হয় একসময় সেসব পণ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত হতো। কিন্তু শ্রমব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সেসব পণ্য এখন আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত হয় না। ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন থেকে আমদানি করা বেশকিছু পণ্যের ওপর শুল্ক হার চড়িয়ে দিয়েছে যাতে সেসব পণ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত হয়।

ট্রাম্পের ধারণা এভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। বাস্তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সে রকম কোনো সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। ট্রাম্পকে যারা ভোট দিয়েছিল, তাদের মধ্যে একটি বড় অংশ হল হাইস্কুল ড্রপআউট। এরা ট্রাম্পের Make America Great Again স্লোগানে বিভ্রান্ত হয়।

ট্রাম্প ক্ষমতায় এলে তাদের চাকরি হবে, এ আশায় তারা ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিল। এছাড়া আরও কিছু নীতিগত প্রশ্নে ট্রাম্পের অবস্থান ছিল অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল। এ অবস্থান রক্ষণশীলরা খুব পছন্দ করেছিল। যা হোক, চীন বলছে বিশ্ব ব্যবস্থা হবে Multilateralism ভিত্তিক। কোনো একক শক্তির বিশ্বব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা অনৈতিক ও অন্যায়।

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের আনুষ্ঠানিক বৈঠকের মধ্য দিয়ে মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর সই হয়েছে ভূ-স্থানিক সহযোগিতামূলক ‘বেসিক এক্সচেঞ্জ অ্যান্ড কো-অপারেশন এগ্রিমেন্ট’ (বেকা)। এ চুক্তিটি ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি প্রধান সামরিক চুক্তি।

চুক্তিটি এমন একটি সময়ে স্বাক্ষরিত হল, যখন ভারত-চীন সীমান্তে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। এ বৈঠকে যোগ দিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপার ২৬ অক্টোবর দুপুরে দিল্লি এসে পৌঁছান। সন্ধ্যায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর বৈঠকে বসেন মাইক পম্পেওর সঙ্গে।

দুই মার্কিন মন্ত্রী দেখা করবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঠিক এক সপ্তাহ আগে এ বৈঠক ও চুক্তি স্বাক্ষর কূটনৈতিক অঙ্গনে প্রচণ্ড কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে। কী এমন তাড়া ছিল যে চুক্তিটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ৭ দিন আগেই স্বাক্ষর করতে হল! মার্কিন নির্বাচনের ফল কী হবে, তা এখনও আমাদের জানা নেই।

যদি জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তাহলে এ চুক্তির ব্যাপারে তার অবস্থান হয়তো ভিন্ন রকম হতে পারে। সে কারণেই নির্বাচনকে সামনে রেখে তাড়াহুড়া করে এ চুক্তি সম্পাদন অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি হঠাৎ করে বদলে যায় না। পররাষ্ট্র সম্পর্কের মধ্যে একধরনের অপরিবর্তনশীলতা বজায় থাকে।

এ কারণে কূটনীতিবিদরা ভাবছেন, জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে এ চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসবেন না।

ভারত যেভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক চুক্তি করল, সেটাও এক দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফল। জওহরলাল নেহেরু ১৯৫৫ সালে বান্দুং সম্মেলনে পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হিসেবে পঞ্চশিলা নীতি গ্রহণ করেছিলেন। একই নীতিতে মিসর ও যুগোশ্লাভিয়াসহ অনেক দেশই স্বাক্ষর করেছিল। পঞ্চশিলা নীতির প্রস্তাব করেছিলেন চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই।

বান্দুং সম্মেলনে গৃহীত পঞ্চশিলা নীতি জোট নিরপেক্ষ গোষ্ঠী সৃষ্টিতে বিশ্বনেতাদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করে। জোটনিরপেক্ষ গোষ্ঠীর প্রধান প্রধান নেতা ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুকোর্ন, যুগোশ্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট যোসেফ টিটো, ভারতের জওহরলাল নেহেরু এবং মিসরের জামাল আবদুল নাসের।

এ জোটনিরপেক্ষ গোষ্ঠী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ঘটনাবলির প্রেক্ষাপটে তার অবস্থান ধীরে ধীরে পরিবর্তন করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন বেশ কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। কারণ নিরপেক্ষতার প্রশ্নটি ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক জোট গঠন করেছিল। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সামরিক চুক্তি হল ন্যাটো, সিয়াটো, সেন্ট্রো এবং আনজুস। কিন্তু কালের প্রবাহে এ সামরিক জোট গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। কূটনৈতিক বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে যুদ্ধজোটের তুলনায় পারস্পরিক বোঝাপড়া গুরুত্ব অর্জন করে।

এ মুহূর্তে চীনের বিশাল উত্থান প্রত্যক্ষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধজোটের ধারণাকে পুনরুজ্জীবিত করার পথে পা বাড়িয়েছে। মূল লক্ষ্য হল চীনের বড় হয়ে ওঠাকে প্রতিহত করা। ভারত একটি বিশাল রাষ্ট্র এবং চীনের সঙ্গে ভারতের অভিন্ন সীমান্ত রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘চীন ঠেকাও’ নীতিতে ভারতকে খুব প্রয়োজন। ভারতেরও প্রয়োজন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে।

১৯৬২ সালে চীন-ভারত সীমান্ত যুদ্ধকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী নেহেরু চীনের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রচুর সমরাস্ত্র পেয়েছেন। এ কারণে চীনের দৃষ্টিতে ভারতের জোট নিরপেক্ষতা ছিল ভুয়া। ভারত এক নিঃশ্বাসে দুই বড় প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সহযোগিতা লাভ করেছিল। এজন্য তখন চীন ভারতকে দু’পক্ষের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বলে চিহ্নিত করেছিল।

সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনা উপস্থিতি জোরদার হয়ে উঠেছে। সফর শুরুর আগে সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে পম্পেও বলেন, ভারত, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ ও ইন্দোনেশিয়া যেতে উদ্গ্রীব হয়ে আছি। এ সহযোগীদের সঙ্গে একযোগে ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর স্বাধীন, ভয়মুক্ত বিকাশে আমরা সচেষ্ট।

চীনের মোকাবেলায় ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি আসা মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কোন দিকে নিয়ে যাবে, তা এখনও সুস্পষ্টভাবে বলা সম্ভব নয়। চীনকে কেন্দ্র করে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি আসা, এমনকি নিবিড় সম্পর্ক সৃষ্টি হওয়া বাংলাদেশের জন্যও গভীর চিন্তার বিষয়।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ঘুরে যাওয়া মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন বিগানের করা বিভিন্ন মন্তব্যে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে চীনা দূতাবাস। চীনা দূতাবাস বলেছে, সবার প্রত্যাশা ছিল বিগান ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বিষয়ে নজর দেবেন।

অথচ বাংলাদেশ ছাড়ার আগে মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ১৫ অক্টোবর চীন-ভারত সীমান্ত সংঘাত, তাইওয়ান প্রণালিতে উত্তেজনা, দক্ষিণ চীন সাগরের প্রসঙ্গ, হংকংয়ের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক আইন নিয়ে চীনকে জড়িয়ে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলেছেন, যার সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো যোগসূত্র নেই। এ ধরনের আচরণ শুধু কূটনৈতিক শিষ্টাচারের লঙ্ঘনই নয়, তা বাংলাদেশের প্রতি অশ্রদ্ধারও প্রতিফলন।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পাল্টাপাল্টি মন্তব্য সম্পর্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন বলেছেন, ‘আমরা বাংলাদেশের স্বার্থ দেখছি। অন্যরা কে কোথায় ঝগড়াঝাঁটি করল, আমরা এর মধ্যে নেই। এ নিয়ে আমরা উদ্বিগ্নও নই।’ নগরীতে আগুন লাগলে দেউল কি রক্ষা পায়? ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর এলাকায় কোনো শান্তি ভঙ্গের অবস্থা সৃষ্টি হলে কিংবা দক্ষিণ এশিয়ায় কোনো রকমের যুদ্ধবিগ্রহ দেখা দিলে বাংলাদেশ নিজেকে কতটা দূরে রাখতে পারবে?

ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে চিকেন নেকের সরু পথ পরিত্যাগ করে ভারতের সামরিক বাহিনীকে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যেতে হবে। এ রকম পরিস্থিতি কি সুখকর হবে?

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

শতফুল ফুটতে দাও

যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের নবসম্পর্কের স্বরূপ কী?

 ড. মাহবুব উল্লাহ্ 
২৯ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পৃথিবী এককেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। এ পৃথিবীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে এমন কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র ছিল না। ওইসময় স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা একটি গ্রন্থ রচনা করেন।

গ্রন্থটির নাম হল The End of History and the Last Man. এ গ্রন্থের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল সোভিয়েত কমিউনিজমের পতন প্রমাণ করেছে সমাজতন্ত্র টেকসই কোনো অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক ব্যবস্থা নয়। পুঁজিবাদ একটি চিরস্থায়ী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে অনন্তকাল টিকে থাকবে। তার সঙ্গে পাশাপাশি থাকবে উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। অর্থাৎ অর্থনীতিতে পুঁজিবাদ এবং রাজনীতিতে গণতন্ত্র।

দার্শনিকভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, মানবসভ্যতার উষালগ্নের পর থেকে মানবসমাজে বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। একটি ব্যবস্থার টিকে থাকাটা নির্ভর করত সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে ওই ব্যবস্থা কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ তার ওপর। সামঞ্জস্যের অভাব ঘটলে সৃষ্টি হয় দ্বন্দ্ব। এ দ্বন্দ্বই আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী করে তোলে। সাম্প্রতিককালে প্রফেসর ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা তার অবস্থানে পরিবর্তন এনেছেন।

চিরস্থায়ী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে পুঁজিবাদ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। এ চ্যালেঞ্জের সূচনা ১৯৭৮ সালে। ১৯৭৮ সালে দেং জিয়াওপিংয়ের নেতৃত্বে চীনে অর্থনৈতিক সংস্কার এবং উন্মুক্তকরণ নীতির সূচনা হয়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে অনেক সংস্কার প্রবর্তিত হয়। এখনও সংস্কারের প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে।

তবে চীনে যেসব সংস্কার আনা হচ্ছে সেগুলো যথেষ্ট চিন্তাভাবনা করে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্র ধসে পড়ার পর ক্ষমতায় আসেন বরিস ইয়েলৎসিন। তার সময়ে আইএমএফ বেশকিছু তরুণ অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞকে রাশিয়ায় পাঠিয়েছিল।

তারা অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য শক্ থেরাপির পলিসি গ্রহণে রুশ সরকারকে উদ্বুদ্ধ করে। এর ফলে রাতারাতি অনেক পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু সেই পরিবর্তন মোটেও কল্যাণকর ছিল না। স্বল্পতম সময়ের মধ্যে নতুন ব্যবস্থা অর্থাৎ মুক্তবাজার নীতি কার্যকর করতে গিয়ে অর্থনীতিতে নানা ধরনের অসঙ্গতির সৃষ্টি হয়।

কয়েক মাসের মধ্যে রাশিয়ার জিডিপি ৫০ শতাংশ কমে যায়। ফলে বাজারে দুষ্প্রাপ্যতার সৃষ্টি হয়। সাধারণ মানুষ খাদ্য, বস্ত্র এবং কর্মসংস্থানের অভাবে দারুণ কষ্টের মধ্যে পড়ে।

অভিযোগ আছে, আইএমএফ প্রেরিত পরামর্শকরা বেহাল অর্থনীতির সুযোগ নিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক বনে যায়। অবশ্য তারা তাদের সঙ্গে কোম্পানি গঠনের জন্য কতিপয় রুশ নাগরিককেও এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে।

এভাবে রাশিয়ায় এক ধরনের মাফিয়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু হয়। এরা রাতারাতি শত-সহস্র কোটি ডলারের মালিকে পরিণত হয়। মজার ব্যাপার হল, এদের মধ্যে অনেকেই ছিল ক্ষমতা হারানো কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। এদের বলা হতো Nomen Ketura। এরাই রুশ সমাজের নব্য ধনী।

চীনে সংস্কার প্রবর্তিত হয়েছিল ধীরে ধীরে। দেং জিয়াওপিংয়ের অত্যন্ত প্রিয় একটি চীনা প্রবাদ ছিল। এ প্রবাদে বলা হয়েছে Feeling the stones, while crossing the river. অর্থাৎ নদী পেরোতে গেলে দেখতে হবে পাথরগুলো কীভাবে আছে। এ প্রবাদটির মর্ম কথা হল, কোনো কাজ করতে গেলে বাস্তব অবস্থার সঠিক উপলব্ধি থাকতে হবে।

বাস্তব অবস্থার সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই সংস্কার প্রবর্তিত হবে। দেংয়ের আরেকটি উক্তি ছিল, To be rich is not bad. অর্থাৎ ধনী হওয়া খারাপ নয়। আপাতভাবে মনে হতে পারে এমন একটি উক্তি অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল। কিন্তু সমাজতন্ত্রের উদ্দেশ্য গরিব থাকা নয়। সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য হল দারিদ্র্য অতিক্রমণ করে দেশের নাগরিকদের অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য আনয়ন করা।

এটাকেই বলা হচ্ছে চীনা বৈশিষ্ট্যের সমাজতন্ত্র। সমাজতন্ত্রের প্রাথমিক স্তরে উৎপাদিকা শক্তি থাকে অত্যন্ত দুর্বল। এ উৎপাদিকা শক্তিকে বিকশিত করতে গিয়ে সমাজে বৈষম্যের উদ্ভব ঘটতে পারে। কার্ল মার্কস সমাজতন্ত্র সম্পর্কে তেমন কিছু লেখেননি। তার গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সংকট এবং এ সংকটের ফলে পুঁজিবাদের পতন কেন অবশ্যম্ভাবী হবে। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কায়িক শ্রম ও মানসিক শ্রমের মধ্যে পার্থক্য থাকে। যারা মানসিক শ্রমে নিযুক্ত তারা বেশি আয় করে।

সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গ্রাম ও শহরের মধ্যে অর্থনৈতিক পার্থক্য থাকে। তুলনামূলকভাবে গ্রামের মানুষের শহরের মানুষের তুলনায় আয় কম হয়। এছাড়া জনমিতিক কারণে অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি হতে পারে। একই সমান মজুরি পায় এমন দুটি পরিবারের মধ্যে যে পরিবারে পোষ্যের সংখ্যা কম, সে পরিবারটি তুলনামূলকভাবে সচ্ছল হয়। সমাজতান্ত্রিক সমাজে বৈষম্য সম্পর্কে কার্ল মার্কস শুধু এ সামান্য কথাগুলো বলেছিলেন।

১৯৭৮ সালে সংস্কার এবং উন্মুক্তকরণ নীতি প্রবর্তিত হওয়ার পর চীনের শনৈ শনৈ অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে। বিশ্ববাজারে চীনের পণ্য প্রতিযোগিতামূলক দামে বিক্রি হচ্ছে। চীন এখন বিশ্বের ফ্যাক্টরিতে পরিণত হয়েছে। বড় অর্থনীতি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরই চীনের অবস্থান।

চীনের এ উন্নয়নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও অবদান আছে। ১৯৭১-এ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তনের সূচনা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। উভয়পক্ষ সোভিয়েত আগ্রাসন মোকাবেলা করার জন্য একটি সমঝোতায় উপনীত হয়।

কিন্তু একটা সময় আসে যখন এ সমঝোতাকে ধরে রাখা সম্ভব হয় না। চীনে অনেক বহুজাতিক কোম্পানি তাদের পুঁজি বিনিয়োগ করেছে। ফলে চীনের অর্থনীতিতে প্রবল গতির সঞ্চার হয়। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো চীনা শ্রমিকদের কর্মনিষ্ঠা এবং মজুরি কম থাকায় লাভবান হয়। কিন্তু চীনও উপকৃত হয়। চীনা শ্রমিক এবং ইঞ্জিনিয়াররা বহুজাতিক ফার্মে কাজ করে উন্নতমানের মার্কিন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠে। চীন থেকে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীকে উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়।

অবশ্য আরও অনেক দেশে, যেমন ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স ও জার্মানির মতো দেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য চীন সরকার ছাত্রছাত্রীদের পাঠায়। ফলে চীনা শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন উন্নত দেশের প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠে। চীনা শিক্ষার্থীদের একটি বড় সামর্থ্য হল গাণিতিক বিদ্যায় পারদর্শিতা। গণিতশাস্ত্রে পারদর্শী হলে উচ্চতর প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান আয়ত্ত করা সহজসাধ্য হয়ে ওঠে। এসব শিক্ষার্থীর বেশির ভাগই শিক্ষা সমাপন শেষে নিজ দেশে ফিরে আসে।

চীন যতই উন্নতি করতে থাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনকে ততই বিপদের উৎস হিসেবে গণ্য করতে থাকে। এভাবে চীন-মার্কিন সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন চীনের ওপর কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করে। ফলে উভয় দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার মাত্রা হ্রাস পায়।

চীনও বাধ্য হয় বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার সমান্তরালে মার্কিন পণ্যের ওপর বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে। চীন এককেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থায় বিশ্বাস করে না। তারা যে উন্নতি এবং সমৃদ্ধি অর্জন করেছে তার ফলে একটি সামরিক শক্তি হিসেবেও চীন নিজের ওপর আস্থাবান হয়ে উঠেছে।

প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চীনের একটি অনন্য সাফল্য হল চাঁদের যে অর্ধেক অংশ সৃষ্টিলগ্ন থেকেই অন্ধকারে ছিল সেখানে মহাশূন্য যান প্রেরণ করা। এমন একটি উদীয়মান শক্তিকে প্রতিহত করা সত্যিই কঠিন।

কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনকে প্রতিহত করার জন্য সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। চীন মনে করে বিশ্বায়ন থেকে বিচ্যুত হলে পৃথিবীর অনেক দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। চীনের উন্নয়ন বিশ্বায়ন থেকে বহুলভাবে শক্তিশালী হয়েছে। তাই চীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প সরকারের বিশ্বায়নবিরোধী নীতির তীব্র সমালোচক।

ট্রাম্প মনে করছেন, চীন থেকে কম দামে যেসব পণ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা হয় একসময় সেসব পণ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত হতো। কিন্তু শ্রমব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সেসব পণ্য এখন আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত হয় না। ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন থেকে আমদানি করা বেশকিছু পণ্যের ওপর শুল্ক হার চড়িয়ে দিয়েছে যাতে সেসব পণ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত হয়।

ট্রাম্পের ধারণা এভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। বাস্তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সে রকম কোনো সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। ট্রাম্পকে যারা ভোট দিয়েছিল, তাদের মধ্যে একটি বড় অংশ হল হাইস্কুল ড্রপআউট। এরা ট্রাম্পের Make America Great Again স্লোগানে বিভ্রান্ত হয়।

ট্রাম্প ক্ষমতায় এলে তাদের চাকরি হবে, এ আশায় তারা ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিল। এছাড়া আরও কিছু নীতিগত প্রশ্নে ট্রাম্পের অবস্থান ছিল অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল। এ অবস্থান রক্ষণশীলরা খুব পছন্দ করেছিল। যা হোক, চীন বলছে বিশ্ব ব্যবস্থা হবে Multilateralism ভিত্তিক। কোনো একক শক্তির বিশ্বব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা অনৈতিক ও অন্যায়।

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের আনুষ্ঠানিক বৈঠকের মধ্য দিয়ে মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর সই হয়েছে ভূ-স্থানিক সহযোগিতামূলক ‘বেসিক এক্সচেঞ্জ অ্যান্ড কো-অপারেশন এগ্রিমেন্ট’ (বেকা)। এ চুক্তিটি ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি প্রধান সামরিক চুক্তি।

চুক্তিটি এমন একটি সময়ে স্বাক্ষরিত হল, যখন ভারত-চীন সীমান্তে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। এ বৈঠকে যোগ দিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপার ২৬ অক্টোবর দুপুরে দিল্লি এসে পৌঁছান। সন্ধ্যায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর বৈঠকে বসেন মাইক পম্পেওর সঙ্গে।

দুই মার্কিন মন্ত্রী দেখা করবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঠিক এক সপ্তাহ আগে এ বৈঠক ও চুক্তি স্বাক্ষর কূটনৈতিক অঙ্গনে প্রচণ্ড কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে। কী এমন তাড়া ছিল যে চুক্তিটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ৭ দিন আগেই স্বাক্ষর করতে হল! মার্কিন নির্বাচনের ফল কী হবে, তা এখনও আমাদের জানা নেই।

যদি জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তাহলে এ চুক্তির ব্যাপারে তার অবস্থান হয়তো ভিন্ন রকম হতে পারে। সে কারণেই নির্বাচনকে সামনে রেখে তাড়াহুড়া করে এ চুক্তি সম্পাদন অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি হঠাৎ করে বদলে যায় না। পররাষ্ট্র সম্পর্কের মধ্যে একধরনের অপরিবর্তনশীলতা বজায় থাকে।

এ কারণে কূটনীতিবিদরা ভাবছেন, জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে এ চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসবেন না।

ভারত যেভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক চুক্তি করল, সেটাও এক দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফল। জওহরলাল নেহেরু ১৯৫৫ সালে বান্দুং সম্মেলনে পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হিসেবে পঞ্চশিলা নীতি গ্রহণ করেছিলেন। একই নীতিতে মিসর ও যুগোশ্লাভিয়াসহ অনেক দেশই স্বাক্ষর করেছিল। পঞ্চশিলা নীতির প্রস্তাব করেছিলেন চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই।

বান্দুং সম্মেলনে গৃহীত পঞ্চশিলা নীতি জোট নিরপেক্ষ গোষ্ঠী সৃষ্টিতে বিশ্বনেতাদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করে। জোটনিরপেক্ষ গোষ্ঠীর প্রধান প্রধান নেতা ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুকোর্ন, যুগোশ্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট যোসেফ টিটো, ভারতের জওহরলাল নেহেরু এবং মিসরের জামাল আবদুল নাসের।

এ জোটনিরপেক্ষ গোষ্ঠী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ঘটনাবলির প্রেক্ষাপটে তার অবস্থান ধীরে ধীরে পরিবর্তন করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন বেশ কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। কারণ নিরপেক্ষতার প্রশ্নটি ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক জোট গঠন করেছিল। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সামরিক চুক্তি হল ন্যাটো, সিয়াটো, সেন্ট্রো এবং আনজুস। কিন্তু কালের প্রবাহে এ সামরিক জোট গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। কূটনৈতিক বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে যুদ্ধজোটের তুলনায় পারস্পরিক বোঝাপড়া গুরুত্ব অর্জন করে।

এ মুহূর্তে চীনের বিশাল উত্থান প্রত্যক্ষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধজোটের ধারণাকে পুনরুজ্জীবিত করার পথে পা বাড়িয়েছে। মূল লক্ষ্য হল চীনের বড় হয়ে ওঠাকে প্রতিহত করা। ভারত একটি বিশাল রাষ্ট্র এবং চীনের সঙ্গে ভারতের অভিন্ন সীমান্ত রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘চীন ঠেকাও’ নীতিতে ভারতকে খুব প্রয়োজন। ভারতেরও প্রয়োজন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে।

১৯৬২ সালে চীন-ভারত সীমান্ত যুদ্ধকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী নেহেরু চীনের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রচুর সমরাস্ত্র পেয়েছেন। এ কারণে চীনের দৃষ্টিতে ভারতের জোট নিরপেক্ষতা ছিল ভুয়া। ভারত এক নিঃশ্বাসে দুই বড় প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সহযোগিতা লাভ করেছিল। এজন্য তখন চীন ভারতকে দু’পক্ষের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বলে চিহ্নিত করেছিল।

সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনা উপস্থিতি জোরদার হয়ে উঠেছে। সফর শুরুর আগে সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে পম্পেও বলেন, ভারত, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ ও ইন্দোনেশিয়া যেতে উদ্গ্রীব হয়ে আছি। এ সহযোগীদের সঙ্গে একযোগে ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর স্বাধীন, ভয়মুক্ত বিকাশে আমরা সচেষ্ট।

চীনের মোকাবেলায় ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি আসা মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কোন দিকে নিয়ে যাবে, তা এখনও সুস্পষ্টভাবে বলা সম্ভব নয়। চীনকে কেন্দ্র করে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি আসা, এমনকি নিবিড় সম্পর্ক সৃষ্টি হওয়া বাংলাদেশের জন্যও গভীর চিন্তার বিষয়।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ঘুরে যাওয়া মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন বিগানের করা বিভিন্ন মন্তব্যে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে চীনা দূতাবাস। চীনা দূতাবাস বলেছে, সবার প্রত্যাশা ছিল বিগান ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বিষয়ে নজর দেবেন।

অথচ বাংলাদেশ ছাড়ার আগে মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ১৫ অক্টোবর চীন-ভারত সীমান্ত সংঘাত, তাইওয়ান প্রণালিতে উত্তেজনা, দক্ষিণ চীন সাগরের প্রসঙ্গ, হংকংয়ের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক আইন নিয়ে চীনকে জড়িয়ে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলেছেন, যার সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো যোগসূত্র নেই। এ ধরনের আচরণ শুধু কূটনৈতিক শিষ্টাচারের লঙ্ঘনই নয়, তা বাংলাদেশের প্রতি অশ্রদ্ধারও প্রতিফলন।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পাল্টাপাল্টি মন্তব্য সম্পর্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন বলেছেন, ‘আমরা বাংলাদেশের স্বার্থ দেখছি। অন্যরা কে কোথায় ঝগড়াঝাঁটি করল, আমরা এর মধ্যে নেই। এ নিয়ে আমরা উদ্বিগ্নও নই।’ নগরীতে আগুন লাগলে দেউল কি রক্ষা পায়? ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর এলাকায় কোনো শান্তি ভঙ্গের অবস্থা সৃষ্টি হলে কিংবা দক্ষিণ এশিয়ায় কোনো রকমের যুদ্ধবিগ্রহ দেখা দিলে বাংলাদেশ নিজেকে কতটা দূরে রাখতে পারবে?

ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে চিকেন নেকের সরু পথ পরিত্যাগ করে ভারতের সামরিক বাহিনীকে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যেতে হবে। এ রকম পরিস্থিতি কি সুখকর হবে?

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ