অবহেলা করার সুযোগ নেই
jugantor
অবহেলা করার সুযোগ নেই

  ড. মো. ফখরুল ইসলাম  

২১ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাসের ব্যাপারে মানুষ দিন দিন যত বেশি অনিয়ম ও অবহেলা প্রদর্শন করছে, ‘কোভিড সাহেব’ তত বেশি খুশি হচ্ছে। কারণ এতে তার অবাধে বংশবিস্তার করার ক্ষেত্র তৈরি হয়ে যাচ্ছে। অনেককে নিয়মের কথা বললে কিছুই শুনতে চান না। অনেকে আবার শুনেই দ্রুত ক্ষেপে ওঠেন অথবা পকেট থেকে মাস্ক বের করে ‘সরি’ বলে পরে নেন। আবার অনেকে এ ব্যাপারে ‘অনেক কিছু বলতে মানা আছে’ বলে মুচকি হেসে পাশ কাটিয়ে চলে যান।

পৃথিবীব্যাপী কোটি কোটি মানুষ করোনার আক্রমণে অসহায় হয়ে পড়েছেন। আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে অনেকে জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে কোনোরকমে দিন পার করে চলেছেন। আবার অনেকেই উইপোকার মতো আচরণ করছেন- যাদের মুখটা শক্ত; কিন্তু দেহটা তুলতুলে নরম। তাদের অবহেলা বড় বিপজ্জনক। সবসময় তারা শুধু নিজের জন্য তৎপর, ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত। অবহেলা করে করে যখন আর নিজেকে টানতে পারছেন না, তখন সবাই তাকে নিয়ে ছুটোছুটি শুরু করে দিচ্ছেন। কারও কারও হাসপাতালে যাওয়ার সৌভাগ্য হয় না। আইসিইউতে নিয়ে যেতে যেতেই মহাবিপদ ঘনিয়ে আসছে কারও কারও জীবনে। দেখতে দেখতে এভাবেই আমাদের দেশেও কোভিড-১৯ দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে হাজির হয়ে পড়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্বের অনেকের কাছে নানা কারণে মডেল। কিন্তু তাদের করোনার মডেল সারা বিশ্বের মানুষের কাছে বিরক্তি সৃষ্টি করেছে; যা বর্তমানে ঘৃণাও তৈরি করে ফেলেছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে চরম অবহেলার কারণে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু উভয় ক্ষেত্রেই তাদের অবস্থান শীর্ষে। পাশাপাশি পুলিশ কর্তৃক কৃষ্ণাঙ্গ হত্যার বিরুদ্ধে আন্দোলন, করোনা মহামারীতে মৃত্যু ইত্যাদি উপেক্ষা করে নির্বাচন, নির্বাচন-পরবর্তী একগুঁয়েমি কথাবার্তা তাদের গণতন্ত্রের ঐতিহ্য ও আভিজাত্যকে ম্লান করে দিয়েছে- সেটাও তারা বুঝতে চাচ্ছেন না। এ কারণে কেউ কেউ আমাদের কাছ থেকে তাদের ভোট গণনা শেখার কথাও বলেছেন!

তবে কে শোনে কার কথা। তোষামোদ ও দোষারোপের দিক দিয়ে কেউ কম যান না। ‘চোরের মায়ের বড় গলা’ প্রবাদটি উপেক্ষা করার মতো নয়। চুরি করতে না পারলে ডাকাতি, সেটা না পারলে প্রতারণা, সেটাও না পারলে কাদা ছোড়াছুড়ি, পারস্পরিক দোষারোপ। এটাই তো ‘তালগাছটা শুধুই আমার’ মতো কিছু স্বার্থপর মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও অলিখিত নিয়ম। অনেকে এটাকে অনিয়মও বলেন। তবে তারা বোধহয় পায়রার কথা অস্বীকার করতে পারবেন না। পায়রা বড় হলে গলা ফুলানোই তার স্বভাব। সেজন্য ভোর হওয়ার আগেও সে ডাকে, গভীর রাতেও হঠাৎ তাদের বাক্বাকুম করে ডাকতে শোনা যায়। অসময়ে তার ডাক শুনে ওঁৎ পেতে থাকা বনবিড়াল আসল কর্মটি করার জন্য দেরি করে না। অনেক সময় বাড়ির পোষা বিড়ালটিও বারবার ডাক শুনে বিরক্ত হয়ে গলাফুলো পায়রার গলা ছিঁড়ে নেয়।

পৃথিবীতে ভালোকে ভালো এবং মন্দকে মন্দ বলা লোকের অভাব বহুদিন আগেই শুরু হয়েছিল। করোনার দুঃসময়ে বহু মানুষের ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা লোপ পেয়েছে। গত ১৯ নভেম্বর ঢাকা থেকে জয়পুরহাটগামী বাসে এক মায়ের সঙ্গে ভ্রমণরত ছেলের হঠাৎ মৃত্যু হলে তার লাশ এবং মাকে রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে বাসটি চলে গেছে। এ মায়ের চোখের পানির বন্যা মুছবে কে?

করোনার প্রথম ঢেউয়ের শুরুতে এ ধরনের কয়েকটি ঘটনা ঘটেছিল। লাশ দাফন করতে নিজের গ্রামের মাটিতে ঠাঁই দেয়া হয়নি অনেক হতভাগাকে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ঘুষ নিয়ে চুপ করে ছিলেন। আট মাস পর আবার অমানবিকতা জেগে উঠল কেন?

এদিকে এখনও কার্যকর ভ্যাকসিনের অপেক্ষায় রয়েছে বিশ্ব। স্পুৎনিক, অক্সফোর্ড, মডার্না, রচে, ফাইজার, সানোফি, আরও কত নাম বহুদিন ধরে শোনা গেলেও দুনিয়ায় সাড়ে তের লাখের বেশি মানুষের প্রাণ সংহার এবং কোটি কোটি মানুষ সংক্রমিত হয়ে নাস্তানাবুদ হলেও মানুষের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও প্রযুক্তি যেন রাজনীতির ডামাডোলের মধ্যে নিপতিত হয়ে শুধু গভীর কান্নার আওয়াজ ছড়িয়ে চলেছে। কয়লা থেকে যেমন ময়লা ঘষে তোলা যায় না, তেমনি এ ব্যাপারে গলাফুলো পায়রাদের অব্যবস্থাপনা যেন মানবতাকে উপহাস করতে মোটেও কুণ্ঠিত হচ্ছে না। আমাদের স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনা যেন বিপুল অর্থে কেনা টিকা ব্যবস্থাপনায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে না পারে এবং একটি সুষম টিকা বণ্টন ও প্রদান ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সবকিছু সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করা যায়, সেদিকে দৃষ্টি বাড়াতে হবে।

আমেরিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য- সব জায়গাতেই আমাদের প্রবাসীরা কাজ করেন। প্রায় সব প্রবাসীর মাঝেই কোভিডভীতি রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বদৌলতে অনেক পরিচিতজনের সঙ্গে প্রায়ই কথা হয়। একজন সেদিন বললেন- ‘আমি বিদেশে এখন একা থাকি। তাই নিরাপত্তাহীনতার কারণে আমার গচ্ছিত সব অর্থ দেশে পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। আমার সহকর্মীরাও সেটা করছেন। সবাই গচ্ছিত অর্থ দেশে পাঠানোর কারণে গত ১২ দিনে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিটেন্স এসেছে। এটি আমাদের প্রবাসী রেমিটেন্স যোদ্ধাদের আপৎকালীন নিরাপত্তার ব্যাপার। আমরা কষ্ট করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে শ্রম বিকিয়ে দেশে ক’টা টাকা পাঠিয়েছি, আর ওরা সেটা প্রচার করে ক্রেডিট নেয়! এর মধ্যে কি বাহাদুরি আছে?’ হয়তো এতে দেশের বড় উপকার হবে। তা নিয়ে দেশে অনেকে গলা ফুলিয়ে বিবৃতি দিচ্ছেন, সংবাদের শিরোনাম হচ্ছেন এবং সেটি বড় হাস্যকর। যদিও এটা তেমন কোনো গোপনীয় বিষয় নয়, তথাপি এ তথ্য জানার পর আন্তর্জাতিক অনলাইন হ্যাকাররা আবারও ব্যাংক চুরিতে নেমে পড়তে পারে! কারণ সবকিছুর প্রচারে শুধু প্রসার হয় না, খারাপ পরিণতিও ডেকে আনতে পারে।

দেশে করোনায় দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে যেমন প্রচার বাড়ানো দরকার, তেমনি গলাফুলো পায়রাদের অতিকথনও নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। যারা মানবতাবাদের কথা বলে নিজেরা এ ধরনের গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে মিডিয়ায় বাহাদুরি প্রদর্শন করে অথবা বাক্সন্ত্রাস করে বেড়ায় তাদেরও সংযত হতে হবে। সবার জন্য আইনের শাসন জরুরি।

সুতরাং অনেক অবহেলা হয়েছে। আর কোনো বাগাড়ম্বর নয়। ‘সবাই অচ্ছুৎ, আমি ভালো’- এই নীতি পরিহার করতে হবে। রাত-বিরেতে অযথা বাকবাকুম করা বিরক্তিকর গলাফুলো পায়রাদের এড়িয়ে চলার অভ্যাস করতে হবে। কোভিড সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সবার আরও বেশি সচেতন হওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে। কোভিড আক্রান্তদের যত্ন নিতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। আমাদের দেশ থেকে কোভিড শিগগিরই পাততাড়ি গুটিয়ে নিরুদ্দেশে যাক, সেই কামনা করি। এ জন্য একটি সুব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সুষম টিকা ক্রয়, বণ্টন ও প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। এর মাধ্যমে জনজীবনে যাতে দ্রুত স্বস্তি ফিরে আসে, সেদিকে নজর বাড়াতে হবে।

ড. মো. ফখরুল ইসলাম : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান

[email protected]

অবহেলা করার সুযোগ নেই

 ড. মো. ফখরুল ইসলাম 
২১ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাসের ব্যাপারে মানুষ দিন দিন যত বেশি অনিয়ম ও অবহেলা প্রদর্শন করছে, ‘কোভিড সাহেব’ তত বেশি খুশি হচ্ছে। কারণ এতে তার অবাধে বংশবিস্তার করার ক্ষেত্র তৈরি হয়ে যাচ্ছে। অনেককে নিয়মের কথা বললে কিছুই শুনতে চান না। অনেকে আবার শুনেই দ্রুত ক্ষেপে ওঠেন অথবা পকেট থেকে মাস্ক বের করে ‘সরি’ বলে পরে নেন। আবার অনেকে এ ব্যাপারে ‘অনেক কিছু বলতে মানা আছে’ বলে মুচকি হেসে পাশ কাটিয়ে চলে যান।

পৃথিবীব্যাপী কোটি কোটি মানুষ করোনার আক্রমণে অসহায় হয়ে পড়েছেন। আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে অনেকে জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে কোনোরকমে দিন পার করে চলেছেন। আবার অনেকেই উইপোকার মতো আচরণ করছেন- যাদের মুখটা শক্ত; কিন্তু দেহটা তুলতুলে নরম। তাদের অবহেলা বড় বিপজ্জনক। সবসময় তারা শুধু নিজের জন্য তৎপর, ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত। অবহেলা করে করে যখন আর নিজেকে টানতে পারছেন না, তখন সবাই তাকে নিয়ে ছুটোছুটি শুরু করে দিচ্ছেন। কারও কারও হাসপাতালে যাওয়ার সৌভাগ্য হয় না। আইসিইউতে নিয়ে যেতে যেতেই মহাবিপদ ঘনিয়ে আসছে কারও কারও জীবনে। দেখতে দেখতে এভাবেই আমাদের দেশেও কোভিড-১৯ দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে হাজির হয়ে পড়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্বের অনেকের কাছে নানা কারণে মডেল। কিন্তু তাদের করোনার মডেল সারা বিশ্বের মানুষের কাছে বিরক্তি সৃষ্টি করেছে; যা বর্তমানে ঘৃণাও তৈরি করে ফেলেছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে চরম অবহেলার কারণে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু উভয় ক্ষেত্রেই তাদের অবস্থান শীর্ষে। পাশাপাশি পুলিশ কর্তৃক কৃষ্ণাঙ্গ হত্যার বিরুদ্ধে আন্দোলন, করোনা মহামারীতে মৃত্যু ইত্যাদি উপেক্ষা করে নির্বাচন, নির্বাচন-পরবর্তী একগুঁয়েমি কথাবার্তা তাদের গণতন্ত্রের ঐতিহ্য ও আভিজাত্যকে ম্লান করে দিয়েছে- সেটাও তারা বুঝতে চাচ্ছেন না। এ কারণে কেউ কেউ আমাদের কাছ থেকে তাদের ভোট গণনা শেখার কথাও বলেছেন!

তবে কে শোনে কার কথা। তোষামোদ ও দোষারোপের দিক দিয়ে কেউ কম যান না। ‘চোরের মায়ের বড় গলা’ প্রবাদটি উপেক্ষা করার মতো নয়। চুরি করতে না পারলে ডাকাতি, সেটা না পারলে প্রতারণা, সেটাও না পারলে কাদা ছোড়াছুড়ি, পারস্পরিক দোষারোপ। এটাই তো ‘তালগাছটা শুধুই আমার’ মতো কিছু স্বার্থপর মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও অলিখিত নিয়ম। অনেকে এটাকে অনিয়মও বলেন। তবে তারা বোধহয় পায়রার কথা অস্বীকার করতে পারবেন না। পায়রা বড় হলে গলা ফুলানোই তার স্বভাব। সেজন্য ভোর হওয়ার আগেও সে ডাকে, গভীর রাতেও হঠাৎ তাদের বাক্বাকুম করে ডাকতে শোনা যায়। অসময়ে তার ডাক শুনে ওঁৎ পেতে থাকা বনবিড়াল আসল কর্মটি করার জন্য দেরি করে না। অনেক সময় বাড়ির পোষা বিড়ালটিও বারবার ডাক শুনে বিরক্ত হয়ে গলাফুলো পায়রার গলা ছিঁড়ে নেয়।

পৃথিবীতে ভালোকে ভালো এবং মন্দকে মন্দ বলা লোকের অভাব বহুদিন আগেই শুরু হয়েছিল। করোনার দুঃসময়ে বহু মানুষের ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা লোপ পেয়েছে। গত ১৯ নভেম্বর ঢাকা থেকে জয়পুরহাটগামী বাসে এক মায়ের সঙ্গে ভ্রমণরত ছেলের হঠাৎ মৃত্যু হলে তার লাশ এবং মাকে রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে বাসটি চলে গেছে। এ মায়ের চোখের পানির বন্যা মুছবে কে?

করোনার প্রথম ঢেউয়ের শুরুতে এ ধরনের কয়েকটি ঘটনা ঘটেছিল। লাশ দাফন করতে নিজের গ্রামের মাটিতে ঠাঁই দেয়া হয়নি অনেক হতভাগাকে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ঘুষ নিয়ে চুপ করে ছিলেন। আট মাস পর আবার অমানবিকতা জেগে উঠল কেন?

এদিকে এখনও কার্যকর ভ্যাকসিনের অপেক্ষায় রয়েছে বিশ্ব। স্পুৎনিক, অক্সফোর্ড, মডার্না, রচে, ফাইজার, সানোফি, আরও কত নাম বহুদিন ধরে শোনা গেলেও দুনিয়ায় সাড়ে তের লাখের বেশি মানুষের প্রাণ সংহার এবং কোটি কোটি মানুষ সংক্রমিত হয়ে নাস্তানাবুদ হলেও মানুষের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও প্রযুক্তি যেন রাজনীতির ডামাডোলের মধ্যে নিপতিত হয়ে শুধু গভীর কান্নার আওয়াজ ছড়িয়ে চলেছে। কয়লা থেকে যেমন ময়লা ঘষে তোলা যায় না, তেমনি এ ব্যাপারে গলাফুলো পায়রাদের অব্যবস্থাপনা যেন মানবতাকে উপহাস করতে মোটেও কুণ্ঠিত হচ্ছে না। আমাদের স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনা যেন বিপুল অর্থে কেনা টিকা ব্যবস্থাপনায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে না পারে এবং একটি সুষম টিকা বণ্টন ও প্রদান ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সবকিছু সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করা যায়, সেদিকে দৃষ্টি বাড়াতে হবে।

আমেরিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য- সব জায়গাতেই আমাদের প্রবাসীরা কাজ করেন। প্রায় সব প্রবাসীর মাঝেই কোভিডভীতি রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বদৌলতে অনেক পরিচিতজনের সঙ্গে প্রায়ই কথা হয়। একজন সেদিন বললেন- ‘আমি বিদেশে এখন একা থাকি। তাই নিরাপত্তাহীনতার কারণে আমার গচ্ছিত সব অর্থ দেশে পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। আমার সহকর্মীরাও সেটা করছেন। সবাই গচ্ছিত অর্থ দেশে পাঠানোর কারণে গত ১২ দিনে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিটেন্স এসেছে। এটি আমাদের প্রবাসী রেমিটেন্স যোদ্ধাদের আপৎকালীন নিরাপত্তার ব্যাপার। আমরা কষ্ট করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে শ্রম বিকিয়ে দেশে ক’টা টাকা পাঠিয়েছি, আর ওরা সেটা প্রচার করে ক্রেডিট নেয়! এর মধ্যে কি বাহাদুরি আছে?’ হয়তো এতে দেশের বড় উপকার হবে। তা নিয়ে দেশে অনেকে গলা ফুলিয়ে বিবৃতি দিচ্ছেন, সংবাদের শিরোনাম হচ্ছেন এবং সেটি বড় হাস্যকর। যদিও এটা তেমন কোনো গোপনীয় বিষয় নয়, তথাপি এ তথ্য জানার পর আন্তর্জাতিক অনলাইন হ্যাকাররা আবারও ব্যাংক চুরিতে নেমে পড়তে পারে! কারণ সবকিছুর প্রচারে শুধু প্রসার হয় না, খারাপ পরিণতিও ডেকে আনতে পারে।

দেশে করোনায় দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে যেমন প্রচার বাড়ানো দরকার, তেমনি গলাফুলো পায়রাদের অতিকথনও নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। যারা মানবতাবাদের কথা বলে নিজেরা এ ধরনের গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে মিডিয়ায় বাহাদুরি প্রদর্শন করে অথবা বাক্সন্ত্রাস করে বেড়ায় তাদেরও সংযত হতে হবে। সবার জন্য আইনের শাসন জরুরি।

সুতরাং অনেক অবহেলা হয়েছে। আর কোনো বাগাড়ম্বর নয়। ‘সবাই অচ্ছুৎ, আমি ভালো’- এই নীতি পরিহার করতে হবে। রাত-বিরেতে অযথা বাকবাকুম করা বিরক্তিকর গলাফুলো পায়রাদের এড়িয়ে চলার অভ্যাস করতে হবে। কোভিড সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সবার আরও বেশি সচেতন হওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে। কোভিড আক্রান্তদের যত্ন নিতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। আমাদের দেশ থেকে কোভিড শিগগিরই পাততাড়ি গুটিয়ে নিরুদ্দেশে যাক, সেই কামনা করি। এ জন্য একটি সুব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সুষম টিকা ক্রয়, বণ্টন ও প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। এর মাধ্যমে জনজীবনে যাতে দ্রুত স্বস্তি ফিরে আসে, সেদিকে নজর বাড়াতে হবে।

ড. মো. ফখরুল ইসলাম : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান

[email protected]