শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেমন অভিভাবক চাই
jugantor
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেমন অভিভাবক চাই

  বিমল সরকার  

২১ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানে গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটি, গভর্নিং বডি মানে সভাপতি আর সভাপতি মানে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা-আতঙ্ক। এই হল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা! হ্যাঁ, দিন দিন ধারণাটি আজকাল অনেকটা এমনই হয়ে গেছে। গত দু’-তিন দশক ধরে এ সবকিছু আমাদের দেশে খুবই আলোচনার বিষয়। মামলা-মোকদ্দমা, শোকজ-বরখাস্ত, অনিয়ম-অব্যবস্থা-লুটপাট-দুর্নীতি, হিংসা-বিদ্বেষ-রেষারেষি, অযাচিত হস্তক্ষেপ- সবকিছুর মূলে গভর্নিং বডি কিংবা সভাপতি। কেবল সাধারণ্যে নয়, সরকারি মহল, এমনকি কখনও কখনও জাতীয় সংসদেও এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়।

সব প্রতিষ্ঠান যেমন একরকম নয়, তেমনি ব্যক্তির মাঝেও ভিন্নতা রয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে যেন একাকার, অনেকটা ‘সব শেয়ালের এক রা’। ব্যতিক্রম অবশ্য আছে, তবে তা খুবই সামান্য। এমনই ব্যতিক্রমী একজন ব্যক্তিকে ঘিরে আমার সামান্য অভিজ্ঞতা নিয়ে আজকের নিবন্ধটি লেখা।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে বিভিন্ন ব্যক্তির (হতে পারেন তিনি রাজনৈতিক দলের নেতা, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা) দায়িত্ব পালন বিষয়ে নানা অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সুযোগ হয় স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় কর্মরত অগণিত শিক্ষকের। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকলেও বাইরের ব্যক্তিরাও এসব ব্যাপারে একেবারে অজ্ঞ নন, কম আর বেশি জানা, শোনা ও দেখার অভিজ্ঞতা রয়েছে বোধকরি সবার। ভালো কোনো অভিজ্ঞতা-স্মৃতি সবার মনের মাঝেই আনন্দ সঞ্চার করে, উৎসাহ জোগায়; আর মন্দ কিছু হলে প্রতিনিয়ত ভাবায়, ভেতরে কুরে কুরে খায়। লোভ-লালসা, অহমিকা-আত্মম্ভরিতা এবং অজ্ঞতা-কূপমণ্ডূকতা আজ আমাদের এমনভাবে পেয়ে বসেছে যে, এসব নিয়ে ভাবলে কখনও কখনও বাকরুদ্ধ হয়ে আসে।

ষাটের দশকের মাঝামাঝি আমাদের দেশে (সাবেক পূর্ব পাকিস্তান) ছিল চারটি বিভাগ আর জেলা ছিল মোট ১৭টি। এ ১৭টির মধ্যে ঢাকা বিভাগের অধীনে ময়মনসিংহ একটি প্রসিদ্ধ জেলা (স্থাপিত ১৭৮৫ খ্রিস্টাব্দ)। এখনকার টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, জামালপুর ও শেরপুর তখন মহকুমা হিসেবে ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্ভুক্ত। বলাই হতো, ‘হাওর-জঙ্গল-মোষের শিং / এই তিনে ময়মনসিং’। আয়তন-পরিধি-জনসংখ্যার দিক দিয়ে ময়মনসিংহ জেলা মানে বিরাট কিছু, যেন একটি দেশ-রাষ্ট্র। বিশ্বে এমন ডজন ডজন স্বাধীন রাষ্ট্র রয়েছে, যা আয়তন বা জনসংখ্যার দিক দিয়ে বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার সমান বা কাছাকাছি নয়।

ওই সময়ে (ষাটের দশকে) ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক ছিলেন এম আনিসুজ্জামান নামে জাঁদরেল একজন সিএসপি অফিসার। প্রশাসন বিভাগে দক্ষ একজন প্রশাসক হিসেবে খুবই সুনাম ছিল তার। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর দেশের দক্ষিণাঞ্চলে আছড়ে পড়া প্রলয়ঙ্করী সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের সময় এম আনিসুজ্জামান ছিলেন ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়টি এমনিতেই ছিল টালমাটাল এবং খুবই উত্তপ্ত। ক’দিন পরই নির্বাচন। ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনকে ঘিরে জনমনে নতুন করে আশা-আকাক্সক্ষার সঞ্চার হয়েছে, দেশব্যাপী দেখা দিয়েছে ব্যাপক গণজাগরণ। আকস্মিক ১৪ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় এলাকার অন্তত ১০ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে চার সদস্যবিশিষ্ট একটি ত্রাণ কমিটি গঠন করা হয়, যার প্রধান ছিলেন ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার উল্লিখিত এম আনিসুজ্জামান। আশির দশকের দ্বিতীয়ার্ধে কৃষি সচিব থাকাকালে তিনি সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন গঠিত দেশের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের (১৯৯০-১৯৯১) একজন উপদেষ্টা হিসেবে তিনি গুরুদায়িত্ব পালন করেন এবং নতুন করে আলোচনায় আসেন।

একই কলেজে আমার ৩৬ বছরের শিক্ষকতার জীবনে (১৯৮৪-২০১৯) একবারই আমি শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি এবং সফলকাম হই। ওই সময়টিতে (১৯৯০-১৯৯১) কলেজ পরিচালনা পরিষদের সভাপতি করা হয় এম আনিসুজ্জামানকে। সুদীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য সরকারি চাকরিজীবন শেষে আনিসুজ্জামান তখন সবে অবসর নিয়েছেন। তিনি ছিলেন দেশের বিশিষ্ট শিল্পপতি ইসলাম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ জহুরুল ইসলামের খুবই আস্থা ও প্রিয়ভাজন। আনিসুজ্জামানকে উত্তরা ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। দীর্ঘদিন পর আমাদের কলেজে বিএসসি কোর্স খোলা ও ডিগ্রি পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনসহ বেশকিছু পরিবর্তন হয় এ সময়েই।

পরিচালনা পরিষদের সভায় এবং অন্য সময় বেশ ক’বার আনিসুজ্জামানের সঙ্গে আমার দেখা হয়। একাধিকবার কলেজের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাগজ-নথি নিয়ে উত্তরা ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ে যাই তার স্বাক্ষর (সভাপতি) আনতে। প্রতিবার শত ব্যস্ততার মাঝেও তার পিএসের সহযোগিতায় খুব কম সময়ের মধ্যেই সভাপতির দেখা পাই এবং দরকারি কাজ সম্পন্ন করে আসি। কলেজের কোনো ফাইল বা কাগজপত্র নিয়ে সামনে যাওয়া মাত্র তিনি হাতটি বাড়িয়ে দেন অর্থাৎ একটি কলম চাই। বোধকরি উপযুক্ত স্থানে অধ্যক্ষের স্বাক্ষরটি রয়েছে কিনা তা তিনি নিশ্চিত হয়ে নিমেষে স্বাক্ষর করে সবাইকে বিদায় জানান। খুবই অল্প অভিজ্ঞতায় তার সম্পর্কে আমার মনে একটি ভালো ধারণা বদ্ধমূল হয়- তিনি শিক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষকতা পেশা ও শিক্ষক সম্পর্কে বেশ ভিন্ন একটি মনোভাব পোষণ করেন। ঠিক এমনই অভিজ্ঞতার কথা শুনেছি আমার আরও দু’-একজন সহকর্মীর মুখ থেকেও।

আনিসুজ্জামানকে ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে রাখার আরও একটি বড় কারণ- ৩৬ বছরের শিক্ষকতা জীবনে কেবল একবার এবং তার সময়টিতেই আমি শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি (এর আগে বা পরে আর কখনও না)। সামনাসামনি বসে তার মতো একজন দক্ষ, অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ ব্যক্তিকে দেখা ও জানার খানিকটা হলেও সুযোগ হয় আমার।

সময় সময় প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষক-কর্মচারীদের কাগজ-নথিতে, এমনকি মাসিক বেতন-ভাতাদি উত্তোলনে সভাপতির স্বাক্ষরের দরকার পড়ে। এ নিয়ে প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া অস্বস্তি-বিড়ম্বনার কথা সহজে বলে শেষ করা যাবে না। এ সবকিছু মনে হলে আনিসুজ্জামান সাহেবের চেহারাটা আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। অত্যন্ত কড়া অথচ বিনয়ী। আহা, প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানে এমন অযথা নাক না-গলানো অভিভাবকত্ব যদি থাকত!

খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, বয়সের ভারে ন্যুব্জ ব্যক্তিটি গুলশানের বাড়িতে বাস করছেন। বোধকরি তার কাজের মাঝেই এম আনিসুজ্জামান শ্রদ্ধার আসনে সমাদৃত হয়ে থাকবেন।

বিমল সরকার : অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেমন অভিভাবক চাই

 বিমল সরকার 
২১ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
ফাইল ছবি

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানে গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটি, গভর্নিং বডি মানে সভাপতি আর সভাপতি মানে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা-আতঙ্ক। এই হল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা! হ্যাঁ, দিন দিন ধারণাটি আজকাল অনেকটা এমনই হয়ে গেছে। গত দু’-তিন দশক ধরে এ সবকিছু আমাদের দেশে খুবই আলোচনার বিষয়। মামলা-মোকদ্দমা, শোকজ-বরখাস্ত, অনিয়ম-অব্যবস্থা-লুটপাট-দুর্নীতি, হিংসা-বিদ্বেষ-রেষারেষি, অযাচিত হস্তক্ষেপ- সবকিছুর মূলে গভর্নিং বডি কিংবা সভাপতি। কেবল সাধারণ্যে নয়, সরকারি মহল, এমনকি কখনও কখনও জাতীয় সংসদেও এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়।

সব প্রতিষ্ঠান যেমন একরকম নয়, তেমনি ব্যক্তির মাঝেও ভিন্নতা রয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে যেন একাকার, অনেকটা ‘সব শেয়ালের এক রা’। ব্যতিক্রম অবশ্য আছে, তবে তা খুবই সামান্য। এমনই ব্যতিক্রমী একজন ব্যক্তিকে ঘিরে আমার সামান্য অভিজ্ঞতা নিয়ে আজকের নিবন্ধটি লেখা।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে বিভিন্ন ব্যক্তির (হতে পারেন তিনি রাজনৈতিক দলের নেতা, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা) দায়িত্ব পালন বিষয়ে নানা অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সুযোগ হয় স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় কর্মরত অগণিত শিক্ষকের। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকলেও বাইরের ব্যক্তিরাও এসব ব্যাপারে একেবারে অজ্ঞ নন, কম আর বেশি জানা, শোনা ও দেখার অভিজ্ঞতা রয়েছে বোধকরি সবার। ভালো কোনো অভিজ্ঞতা-স্মৃতি সবার মনের মাঝেই আনন্দ সঞ্চার করে, উৎসাহ জোগায়; আর মন্দ কিছু হলে প্রতিনিয়ত ভাবায়, ভেতরে কুরে কুরে খায়। লোভ-লালসা, অহমিকা-আত্মম্ভরিতা এবং অজ্ঞতা-কূপমণ্ডূকতা আজ আমাদের এমনভাবে পেয়ে বসেছে যে, এসব নিয়ে ভাবলে কখনও কখনও বাকরুদ্ধ হয়ে আসে।

ষাটের দশকের মাঝামাঝি আমাদের দেশে (সাবেক পূর্ব পাকিস্তান) ছিল চারটি বিভাগ আর জেলা ছিল মোট ১৭টি। এ ১৭টির মধ্যে ঢাকা বিভাগের অধীনে ময়মনসিংহ একটি প্রসিদ্ধ জেলা (স্থাপিত ১৭৮৫ খ্রিস্টাব্দ)। এখনকার টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, জামালপুর ও শেরপুর তখন মহকুমা হিসেবে ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্ভুক্ত। বলাই হতো, ‘হাওর-জঙ্গল-মোষের শিং / এই তিনে ময়মনসিং’। আয়তন-পরিধি-জনসংখ্যার দিক দিয়ে ময়মনসিংহ জেলা মানে বিরাট কিছু, যেন একটি দেশ-রাষ্ট্র। বিশ্বে এমন ডজন ডজন স্বাধীন রাষ্ট্র রয়েছে, যা আয়তন বা জনসংখ্যার দিক দিয়ে বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার সমান বা কাছাকাছি নয়।

ওই সময়ে (ষাটের দশকে) ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক ছিলেন এম আনিসুজ্জামান নামে জাঁদরেল একজন সিএসপি অফিসার। প্রশাসন বিভাগে দক্ষ একজন প্রশাসক হিসেবে খুবই সুনাম ছিল তার। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর দেশের দক্ষিণাঞ্চলে আছড়ে পড়া প্রলয়ঙ্করী সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের সময় এম আনিসুজ্জামান ছিলেন ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়টি এমনিতেই ছিল টালমাটাল এবং খুবই উত্তপ্ত। ক’দিন পরই নির্বাচন। ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনকে ঘিরে জনমনে নতুন করে আশা-আকাক্সক্ষার সঞ্চার হয়েছে, দেশব্যাপী দেখা দিয়েছে ব্যাপক গণজাগরণ। আকস্মিক ১৪ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় এলাকার অন্তত ১০ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে চার সদস্যবিশিষ্ট একটি ত্রাণ কমিটি গঠন করা হয়, যার প্রধান ছিলেন ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার উল্লিখিত এম আনিসুজ্জামান। আশির দশকের দ্বিতীয়ার্ধে কৃষি সচিব থাকাকালে তিনি সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন গঠিত দেশের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের (১৯৯০-১৯৯১) একজন উপদেষ্টা হিসেবে তিনি গুরুদায়িত্ব পালন করেন এবং নতুন করে আলোচনায় আসেন।

একই কলেজে আমার ৩৬ বছরের শিক্ষকতার জীবনে (১৯৮৪-২০১৯) একবারই আমি শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি এবং সফলকাম হই। ওই সময়টিতে (১৯৯০-১৯৯১) কলেজ পরিচালনা পরিষদের সভাপতি করা হয় এম আনিসুজ্জামানকে। সুদীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য সরকারি চাকরিজীবন শেষে আনিসুজ্জামান তখন সবে অবসর নিয়েছেন। তিনি ছিলেন দেশের বিশিষ্ট শিল্পপতি ইসলাম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ জহুরুল ইসলামের খুবই আস্থা ও প্রিয়ভাজন। আনিসুজ্জামানকে উত্তরা ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। দীর্ঘদিন পর আমাদের কলেজে বিএসসি কোর্স খোলা ও ডিগ্রি পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনসহ বেশকিছু পরিবর্তন হয় এ সময়েই।

পরিচালনা পরিষদের সভায় এবং অন্য সময় বেশ ক’বার আনিসুজ্জামানের সঙ্গে আমার দেখা হয়। একাধিকবার কলেজের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাগজ-নথি নিয়ে উত্তরা ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ে যাই তার স্বাক্ষর (সভাপতি) আনতে। প্রতিবার শত ব্যস্ততার মাঝেও তার পিএসের সহযোগিতায় খুব কম সময়ের মধ্যেই সভাপতির দেখা পাই এবং দরকারি কাজ সম্পন্ন করে আসি। কলেজের কোনো ফাইল বা কাগজপত্র নিয়ে সামনে যাওয়া মাত্র তিনি হাতটি বাড়িয়ে দেন অর্থাৎ একটি কলম চাই। বোধকরি উপযুক্ত স্থানে অধ্যক্ষের স্বাক্ষরটি রয়েছে কিনা তা তিনি নিশ্চিত হয়ে নিমেষে স্বাক্ষর করে সবাইকে বিদায় জানান। খুবই অল্প অভিজ্ঞতায় তার সম্পর্কে আমার মনে একটি ভালো ধারণা বদ্ধমূল হয়- তিনি শিক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষকতা পেশা ও শিক্ষক সম্পর্কে বেশ ভিন্ন একটি মনোভাব পোষণ করেন। ঠিক এমনই অভিজ্ঞতার কথা শুনেছি আমার আরও দু’-একজন সহকর্মীর মুখ থেকেও।

আনিসুজ্জামানকে ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে রাখার আরও একটি বড় কারণ- ৩৬ বছরের শিক্ষকতা জীবনে কেবল একবার এবং তার সময়টিতেই আমি শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি (এর আগে বা পরে আর কখনও না)। সামনাসামনি বসে তার মতো একজন দক্ষ, অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ ব্যক্তিকে দেখা ও জানার খানিকটা হলেও সুযোগ হয় আমার।

সময় সময় প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষক-কর্মচারীদের কাগজ-নথিতে, এমনকি মাসিক বেতন-ভাতাদি উত্তোলনে সভাপতির স্বাক্ষরের দরকার পড়ে। এ নিয়ে প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া অস্বস্তি-বিড়ম্বনার কথা সহজে বলে শেষ করা যাবে না। এ সবকিছু মনে হলে আনিসুজ্জামান সাহেবের চেহারাটা আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। অত্যন্ত কড়া অথচ বিনয়ী। আহা, প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানে এমন অযথা নাক না-গলানো অভিভাবকত্ব যদি থাকত!

খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, বয়সের ভারে ন্যুব্জ ব্যক্তিটি গুলশানের বাড়িতে বাস করছেন। বোধকরি তার কাজের মাঝেই এম আনিসুজ্জামান শ্রদ্ধার আসনে সমাদৃত হয়ে থাকবেন।

বিমল সরকার : অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক