চাই সাংস্কৃতিক জাগরণ
jugantor
চাই সাংস্কৃতিক জাগরণ

  সাজেদ ফাতেমী  

২২ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শিরোনামই বলে দেয় এ নিবন্ধের বিষয়বস্তু কী; মোটা দাগে যাকে বলে সাংস্কৃতিক জাগরণ বা সাংস্কৃতিক বিপ্লব। করোনায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়া আমাদের প্রাণের দেশে এ জাগরণ ঘটাতে ব্যবস্থা নেয়ার এখনই সময়। হোক সে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে; যা করার এখনই করতে হবে। যত দ্রুতগতিতে সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে, ততোধিক দ্রুতগতিতে মানুষের সুকুমার বৃত্তিগুলো যেন শুকিয়ে বা মরে যাচ্ছে। এ বৃত্তিগুলোর পুনরুজ্জীবন ঘটাতে দেশব্যাপী সাংস্কৃতিক জাগরণের বিকল্প কমই আছে।

গত সাত মাসের বাংলাদেশের চিত্র শুধু করোনার কারণেই বদলে গেছে অনেকটা। জীবনের স্বাভাবিক গতি কমতে কমতে কারও কারও জীবন একেবারেই থেমে গেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর আকার সংকুচিত হয়ে আসায় চাকরিচ্যুতি এবং বহু ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় ধস নেমে আসায় বহু মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর হাটবাজার, ব্যবসা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এরই মধ্যে খুলে দেয়া হয়েছে। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনও খুলে না দেয়ায় লাখ লাখ শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণী ঘরবন্দি হয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছে। এর পরিণাম কী হচ্ছে? এ বন্দিজীবনের গুমোট দশা থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় শহরগুলোর রাস্তায় বেরিয়ে আসা বহু কিশোর ও তরুণ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে আমরা প্রতিদিনই সেসব খবর পাচ্ছি।

গত ১ নভেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে ‘চট্টগ্রামে বেসামাল কিশোর গ্যাং’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকশিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে- দুই শতাধিক গ্যাংয়ের পাঁচশ’র বেশি সদস্য। তার মধ্যে অর্ধশতাধিক হল কথিত প্রভাবশালী ‘বড় ভাই’। ২ নভেম্বর বার্তা সংস্থা ইউএনবির একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম-‘গাজীপুরে শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করল দুই কিশোর’। উদাহরণ দেয়ার মতো এমন অনেক খবর আমরা প্রতিদিনই দেখছি।

রাজধানীসহ দেশের প্রায় প্রতিটি শহরের সাংস্কৃতিক অঙ্গন একসময় জমজমাট ছিল। নাটক, গান, আবৃত্তি থেকে শুরু করে সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় চর্চা ছিল ব্যাপক। শহরের সেসব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের রেশ ছড়িয়ে পড়ত গ্রামীণ জনপদেও। বিকাল হলেই ছেলেমেয়েরা হয় থিয়েটারের রিহার্সেলে, নয় গানের স্কুলে অথবা শহরের বড় মাঠের কোনায় বসে প্রগতিশীল আড্ডায় মত্ত থাকত। পাশেই বিশাল মাঠে চলত নানা খেলাধুলা। অধিকাংশ সময় বর্ষাকাল বাদে প্রায় প্রতিদিনই শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অডিটোরিয়াম ও মাঠে জমজমাট সব অনুষ্ঠান হতো। বড়জোর ২৫ বছর আগের তরুণদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের এ চিত্র আজ অধিকাংশ শহরের মানুষের কাছে কেবলই স্মৃতি। এখনকার তরুণদের সঙ্গে সেই প্রজন্মের তরুণদের মানসিকতা ও কর্মকাণ্ডের মধ্যে যেন যোজন যোজন মাইলের ব্যবধান তৈরি হয়ে গেছে।

এখনকার তরুণ প্রজন্মের একটি বিরাট অংশ, বিশেষত সীমান্তবর্তী শহরগুলোর তরুণদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ডুবে আছে ভয়ানক মাদকের নেশায়। সেই নেশা একদিকে তাদের ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে তা দেশের সার্বিক পরিবেশ বিপর্যস্ত করে তুলছে। এছাড়া রাজধানীসহ বড় বড় নগরীর তরুণ-তরুণীদের অধিকাংশই মেতে আছে সহজে সবকিছু হাতের নাগালে পেয়ে যাওয়ার ধান্দায়। আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসন ছায়া ফেলেছে তাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তিতে। ফলে নিজেদের জন্য সঠিক পথটি নির্ধারণ করতেও ব্যর্থ হচ্ছে তারা। আর এ কারণে তাদের মনোজগতে নিজস্ব সংস্কৃতির ভিতটুকুও রচিত হচ্ছে না। মাদক কেবল এ তরুণ-তরুণীদের ধ্বংস করে দিচ্ছে তা নয়, এদের পরিবারও ডুবছে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে।

আমাদের দুর্ভাগ্য হল, দেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও এখন সম্পূর্ণরূপে নোংরা রাজনীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এখন ১০০ টাকার একটি কাজ করানোর জন্যও দলীয় কর্মী, পাতিনেতা ও নেতা খোঁজা হয়। যাকে কাজটি দেয়া হচ্ছে, তার চেয়ে বহু যোগ্য মানুষ দলের বাইরে আছে, তা সবার জানা; যিনি বা যারা কিনা প্রকৃত অর্থেই সৎ এবং দেশের জন্য নিবেদিতপ্রাণ মানুষ। সব জানা সত্ত্বেও আমরা ক্রমাগত নিতান্তই ক্ষুদ্র মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছি। এরই অংশ হিসেবে দেশের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের আধার বলে পরিচিত জেলা শিল্পকলা একাডেমিগুলোকেও দলীয়করণের চূড়ান্ত সীমায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ন্যূনতম জ্ঞান নেই-বহু জেলায় এমন মানুষকে বসিয়ে দেয়া হয়েছে শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসারদের মাথার উপর।

শুদ্ধভাবে একটি বাংলা বাক্য বলতে পারে না, লিখতে পারে না-বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ ধরনের মানুষই এখন শিল্পকলা একাডেমিগুলোর নিয়ন্ত্রক! ‘কবিতা’ শব্দটি লিখতে কলম ভেঙে ফেলেন, এমন তথাকথিত কবির নেতৃত্বে চলছে দুই বাংলার অখ্যাত কবিদের কবিতা সম্মেলন! আমার এ কথাগুলো ঢালাও কোনো অভিযোগ নয়। নিজের জেলা শহরের শিল্পকলা একাডেমির ওপর কে বা কারা ছড়ি ঘোরাচ্ছে, তা একটু নিরপেক্ষ মন নিয়ে খোঁজ করলে আমার প্রতিটি কথার প্রমাণ পেয়ে যাবেন যে কেউ। এ নোংরামির দ্রুত অবসান ঘটাতে কার্যকর উদ্যোগ চাই এখনই।

দেশের মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোর অবস্থা খেয়াল করুন। বর্তমানে ৯০টি অনুমোদিত মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র চালু আছে। এছাড়া ভুঁইফোঁড় প্রতিষ্ঠান আছে প্রায় ৫০০। এসব প্রতিষ্ঠানে মাদকাসক্তি নিরাময়ের নামে চলে নোংরা বাণিজ্য। একটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া কোনোটিতেই নারীদের সেবা বা চিকিৎসার পৃথক কোনো ব্যবস্থাও নেই। এক সরকারি হিসাবে বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ নারী। বেশি সহজলভ্য হয়ে পড়ায় মাদক ছড়িয়ে পড়ছে সবখানে।

দেশ থেকে জঙ্গিবাদ নির্মূলে পুলিশ-র‌্যাব-গোয়েন্দারা নানা অভিযান ও গবেষণা চালাচ্ছে। জঙ্গি সংগঠন এবং সেসব সংগঠনের নেতাদের একের পর এক তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই যেন কিছু হচ্ছে না। জামাআ’তুল মুজাহিদীন বা জেএমবি, হরকাতুল জিহাদ বা হুজি, শাহাদৎ আল হিকমা, জাগ্রত মুসলিম জনতা ও হিযবুত তাহরীরকে নিষিদ্ধ করার পরও তাদের কর্মকাণ্ড থেমে নেই। নতুন নতুন সংগঠনের ব্যানারে প্রকাশ্যে আসার চেষ্টা করছে জেএমবি ও হুজির সদস্যরা। ইন্টারনেটের মাধ্যমে কর্মী সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছে।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ জঙ্গিরা ২১ আগস্টের মতো বড় কোনো ধরনের নাশকতা ঘটানোর সুযোগের অপেক্ষায় আছে। তেমনই নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের আভাস পাওয়া যায় ২০১৪ সালের শেষদিকে ধরা পড়া জেএমবির চার সদস্যের স্বীকারোক্তিতে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গকে নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত করে সেখান থেকে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার ছক এঁটেছিল নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাআ’তুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। এর মধ্যে বাংলাদেশের দুই নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে হত্যার পরিকল্পনাও ছিল।

জঙ্গিবাদের বিস্তার, সাংস্কৃতিক বন্ধ্যত্ব, মাদকের আগ্রাসন, দলীয় হানাহানি ও পরিবেশ বিপর্যয়-এ সময়ের তরুণ প্রজন্মের যাবতীয় অগ্রগতি যেন থমকে আছে একটি মাত্র বৃত্তে। এ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার পথ আমরা হয়তো অনেকেই জানি; কিন্তু তরুণ প্রজন্মকে সেই পথে চলতে সঠিক দিকনির্দেশনাটুকু দেয়ার মানুষ খুঁজে পাওয়াই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। নিত্যনতুন সমস্যার স্রোতে তলিয়ে যাচ্ছে পুরনো ও দীর্ঘদিন ধরে বিষফোড়ার মতো জিইয়ে থাকা সমস্যাগুলো।

এ থেকে উত্তরণের বড় উপায় হল, দেশব্যাপী সাংস্কৃতিক জাগরণ তৈরি করা। এক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্মের মাঝে কালচারাল মোটিভেশনের কোনো বিকল্প নেই। আর সেই মোটিভেশনের বড় অস্ত্র হল, সংগীতসহ সামগ্রিক সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের পুনরুজ্জীবন ঘটানো। তাই দেশের তরুণদের বিচরণক্ষেত্র বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজসহ ৬৪টি জেলা শহরের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এখনই জোরদার করা জরুরি হয়ে পড়েছে। আমার প্রস্তাবিত সাংস্কৃতিক কার্যক্রম কোনো বিশেষ দলীয় সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকবে না। এ নিয়ে আমার বিস্তারিত গবেষণা আছে।

আমরা জানি, নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টার মধ্যেই আগুনের লেলিহান শিখা সবকিছু পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। সামগ্রিকভাবে আমরা এখন এক ভয়ংকর রকমের ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি। তরুণ প্রজন্ম হেঁটে চলেছে ভয়াবহ ধ্বংসের দিকে। আর এ ধ্বংসের ফাঁক গলে ঢুকে পড়ছে উগ্র ও জঙ্গিবাদের মতো প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলো। এদের কার্যকলাপ সরকারের সাফল্য ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ম্লান করে দিয়ে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। এসবের মধ্যেই করোনাকালে বেড়ে গেছে কিশোর অপরাধ।

এসব কার্যকলাপের বিরুদ্ধে এখনই রুখে দাঁড়াতে সংগীতসহ সংস্কৃতির সামগ্রিক শক্তি প্রয়োগের বিকল্প কিছু আছে কি?

সাজেদ ফাতেমী : জনসংযোগ পরিচালক, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি

চাই সাংস্কৃতিক জাগরণ

 সাজেদ ফাতেমী 
২২ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শিরোনামই বলে দেয় এ নিবন্ধের বিষয়বস্তু কী; মোটা দাগে যাকে বলে সাংস্কৃতিক জাগরণ বা সাংস্কৃতিক বিপ্লব। করোনায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়া আমাদের প্রাণের দেশে এ জাগরণ ঘটাতে ব্যবস্থা নেয়ার এখনই সময়। হোক সে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে; যা করার এখনই করতে হবে। যত দ্রুতগতিতে সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে, ততোধিক দ্রুতগতিতে মানুষের সুকুমার বৃত্তিগুলো যেন শুকিয়ে বা মরে যাচ্ছে। এ বৃত্তিগুলোর পুনরুজ্জীবন ঘটাতে দেশব্যাপী সাংস্কৃতিক জাগরণের বিকল্প কমই আছে।

গত সাত মাসের বাংলাদেশের চিত্র শুধু করোনার কারণেই বদলে গেছে অনেকটা। জীবনের স্বাভাবিক গতি কমতে কমতে কারও কারও জীবন একেবারেই থেমে গেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর আকার সংকুচিত হয়ে আসায় চাকরিচ্যুতি এবং বহু ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় ধস নেমে আসায় বহু মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর হাটবাজার, ব্যবসা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এরই মধ্যে খুলে দেয়া হয়েছে। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনও খুলে না দেয়ায় লাখ লাখ শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণী ঘরবন্দি হয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছে। এর পরিণাম কী হচ্ছে? এ বন্দিজীবনের গুমোট দশা থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় শহরগুলোর রাস্তায় বেরিয়ে আসা বহু কিশোর ও তরুণ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে আমরা প্রতিদিনই সেসব খবর পাচ্ছি।

গত ১ নভেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে ‘চট্টগ্রামে বেসামাল কিশোর গ্যাং’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকশিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে- দুই শতাধিক গ্যাংয়ের পাঁচশ’র বেশি সদস্য। তার মধ্যে অর্ধশতাধিক হল কথিত প্রভাবশালী ‘বড় ভাই’। ২ নভেম্বর বার্তা সংস্থা ইউএনবির একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম-‘গাজীপুরে শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করল দুই কিশোর’। উদাহরণ দেয়ার মতো এমন অনেক খবর আমরা প্রতিদিনই দেখছি।

রাজধানীসহ দেশের প্রায় প্রতিটি শহরের সাংস্কৃতিক অঙ্গন একসময় জমজমাট ছিল। নাটক, গান, আবৃত্তি থেকে শুরু করে সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় চর্চা ছিল ব্যাপক। শহরের সেসব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের রেশ ছড়িয়ে পড়ত গ্রামীণ জনপদেও। বিকাল হলেই ছেলেমেয়েরা হয় থিয়েটারের রিহার্সেলে, নয় গানের স্কুলে অথবা শহরের বড় মাঠের কোনায় বসে প্রগতিশীল আড্ডায় মত্ত থাকত। পাশেই বিশাল মাঠে চলত নানা খেলাধুলা। অধিকাংশ সময় বর্ষাকাল বাদে প্রায় প্রতিদিনই শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অডিটোরিয়াম ও মাঠে জমজমাট সব অনুষ্ঠান হতো। বড়জোর ২৫ বছর আগের তরুণদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের এ চিত্র আজ অধিকাংশ শহরের মানুষের কাছে কেবলই স্মৃতি। এখনকার তরুণদের সঙ্গে সেই প্রজন্মের তরুণদের মানসিকতা ও কর্মকাণ্ডের মধ্যে যেন যোজন যোজন মাইলের ব্যবধান তৈরি হয়ে গেছে।

এখনকার তরুণ প্রজন্মের একটি বিরাট অংশ, বিশেষত সীমান্তবর্তী শহরগুলোর তরুণদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ডুবে আছে ভয়ানক মাদকের নেশায়। সেই নেশা একদিকে তাদের ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে তা দেশের সার্বিক পরিবেশ বিপর্যস্ত করে তুলছে। এছাড়া রাজধানীসহ বড় বড় নগরীর তরুণ-তরুণীদের অধিকাংশই মেতে আছে সহজে সবকিছু হাতের নাগালে পেয়ে যাওয়ার ধান্দায়। আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসন ছায়া ফেলেছে তাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তিতে। ফলে নিজেদের জন্য সঠিক পথটি নির্ধারণ করতেও ব্যর্থ হচ্ছে তারা। আর এ কারণে তাদের মনোজগতে নিজস্ব সংস্কৃতির ভিতটুকুও রচিত হচ্ছে না। মাদক কেবল এ তরুণ-তরুণীদের ধ্বংস করে দিচ্ছে তা নয়, এদের পরিবারও ডুবছে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে।

আমাদের দুর্ভাগ্য হল, দেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও এখন সম্পূর্ণরূপে নোংরা রাজনীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এখন ১০০ টাকার একটি কাজ করানোর জন্যও দলীয় কর্মী, পাতিনেতা ও নেতা খোঁজা হয়। যাকে কাজটি দেয়া হচ্ছে, তার চেয়ে বহু যোগ্য মানুষ দলের বাইরে আছে, তা সবার জানা; যিনি বা যারা কিনা প্রকৃত অর্থেই সৎ এবং দেশের জন্য নিবেদিতপ্রাণ মানুষ। সব জানা সত্ত্বেও আমরা ক্রমাগত নিতান্তই ক্ষুদ্র মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছি। এরই অংশ হিসেবে দেশের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের আধার বলে পরিচিত জেলা শিল্পকলা একাডেমিগুলোকেও দলীয়করণের চূড়ান্ত সীমায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ন্যূনতম জ্ঞান নেই-বহু জেলায় এমন মানুষকে বসিয়ে দেয়া হয়েছে শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসারদের মাথার উপর।

শুদ্ধভাবে একটি বাংলা বাক্য বলতে পারে না, লিখতে পারে না-বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ ধরনের মানুষই এখন শিল্পকলা একাডেমিগুলোর নিয়ন্ত্রক! ‘কবিতা’ শব্দটি লিখতে কলম ভেঙে ফেলেন, এমন তথাকথিত কবির নেতৃত্বে চলছে দুই বাংলার অখ্যাত কবিদের কবিতা সম্মেলন! আমার এ কথাগুলো ঢালাও কোনো অভিযোগ নয়। নিজের জেলা শহরের শিল্পকলা একাডেমির ওপর কে বা কারা ছড়ি ঘোরাচ্ছে, তা একটু নিরপেক্ষ মন নিয়ে খোঁজ করলে আমার প্রতিটি কথার প্রমাণ পেয়ে যাবেন যে কেউ। এ নোংরামির দ্রুত অবসান ঘটাতে কার্যকর উদ্যোগ চাই এখনই।

দেশের মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোর অবস্থা খেয়াল করুন। বর্তমানে ৯০টি অনুমোদিত মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র চালু আছে। এছাড়া ভুঁইফোঁড় প্রতিষ্ঠান আছে প্রায় ৫০০। এসব প্রতিষ্ঠানে মাদকাসক্তি নিরাময়ের নামে চলে নোংরা বাণিজ্য। একটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া কোনোটিতেই নারীদের সেবা বা চিকিৎসার পৃথক কোনো ব্যবস্থাও নেই। এক সরকারি হিসাবে বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ নারী। বেশি সহজলভ্য হয়ে পড়ায় মাদক ছড়িয়ে পড়ছে সবখানে।

দেশ থেকে জঙ্গিবাদ নির্মূলে পুলিশ-র‌্যাব-গোয়েন্দারা নানা অভিযান ও গবেষণা চালাচ্ছে। জঙ্গি সংগঠন এবং সেসব সংগঠনের নেতাদের একের পর এক তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই যেন কিছু হচ্ছে না। জামাআ’তুল মুজাহিদীন বা জেএমবি, হরকাতুল জিহাদ বা হুজি, শাহাদৎ আল হিকমা, জাগ্রত মুসলিম জনতা ও হিযবুত তাহরীরকে নিষিদ্ধ করার পরও তাদের কর্মকাণ্ড থেমে নেই। নতুন নতুন সংগঠনের ব্যানারে প্রকাশ্যে আসার চেষ্টা করছে জেএমবি ও হুজির সদস্যরা। ইন্টারনেটের মাধ্যমে কর্মী সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছে।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ জঙ্গিরা ২১ আগস্টের মতো বড় কোনো ধরনের নাশকতা ঘটানোর সুযোগের অপেক্ষায় আছে। তেমনই নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের আভাস পাওয়া যায় ২০১৪ সালের শেষদিকে ধরা পড়া জেএমবির চার সদস্যের স্বীকারোক্তিতে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গকে নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত করে সেখান থেকে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার ছক এঁটেছিল নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাআ’তুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। এর মধ্যে বাংলাদেশের দুই নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে হত্যার পরিকল্পনাও ছিল।

জঙ্গিবাদের বিস্তার, সাংস্কৃতিক বন্ধ্যত্ব, মাদকের আগ্রাসন, দলীয় হানাহানি ও পরিবেশ বিপর্যয়-এ সময়ের তরুণ প্রজন্মের যাবতীয় অগ্রগতি যেন থমকে আছে একটি মাত্র বৃত্তে। এ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার পথ আমরা হয়তো অনেকেই জানি; কিন্তু তরুণ প্রজন্মকে সেই পথে চলতে সঠিক দিকনির্দেশনাটুকু দেয়ার মানুষ খুঁজে পাওয়াই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। নিত্যনতুন সমস্যার স্রোতে তলিয়ে যাচ্ছে পুরনো ও দীর্ঘদিন ধরে বিষফোড়ার মতো জিইয়ে থাকা সমস্যাগুলো।

এ থেকে উত্তরণের বড় উপায় হল, দেশব্যাপী সাংস্কৃতিক জাগরণ তৈরি করা। এক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্মের মাঝে কালচারাল মোটিভেশনের কোনো বিকল্প নেই। আর সেই মোটিভেশনের বড় অস্ত্র হল, সংগীতসহ সামগ্রিক সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের পুনরুজ্জীবন ঘটানো। তাই দেশের তরুণদের বিচরণক্ষেত্র বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজসহ ৬৪টি জেলা শহরের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এখনই জোরদার করা জরুরি হয়ে পড়েছে। আমার প্রস্তাবিত সাংস্কৃতিক কার্যক্রম কোনো বিশেষ দলীয় সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকবে না। এ নিয়ে আমার বিস্তারিত গবেষণা আছে।

আমরা জানি, নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টার মধ্যেই আগুনের লেলিহান শিখা সবকিছু পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। সামগ্রিকভাবে আমরা এখন এক ভয়ংকর রকমের ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি। তরুণ প্রজন্ম হেঁটে চলেছে ভয়াবহ ধ্বংসের দিকে। আর এ ধ্বংসের ফাঁক গলে ঢুকে পড়ছে উগ্র ও জঙ্গিবাদের মতো প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলো। এদের কার্যকলাপ সরকারের সাফল্য ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ম্লান করে দিয়ে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। এসবের মধ্যেই করোনাকালে বেড়ে গেছে কিশোর অপরাধ।

এসব কার্যকলাপের বিরুদ্ধে এখনই রুখে দাঁড়াতে সংগীতসহ সংস্কৃতির সামগ্রিক শক্তি প্রয়োগের বিকল্প কিছু আছে কি?

সাজেদ ফাতেমী : জনসংযোগ পরিচালক, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি