করোনা, তোকে আমি অভিশাপ দিচ্ছি
jugantor
জাত নিমের পাতা
করোনা, তোকে আমি অভিশাপ দিচ্ছি

  মাহবুব কামাল  

২৮ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কবে যেন লিখেছিলাম, তুমি এই ভেবে গর্ব করো না যে, তুমি মেয়েদের চিনেছ। কারণ, আরেকটি মেয়ে তোমাকে এর চেয়ে বেশি কষ্ট দিতে পারে। সা’দত হুসাইনের মৃত্যুর পর যে কষ্টটা পেয়েছিলাম, তার চেয়ে বেশি কষ্ট যে আর কখনও পাব, ভাবিনি। মুনীর ভাইয়ের (খন্দকার মুনীরুজ্জামান) মৃত্যু বুঝিয়ে দিল কষ্ট কাকে বলে। কিছু কিছু কষ্ট থাকে, যা প্রকাশে চোখের জল যথেষ্ট নয়। মুনীর ভাইয়ের মৃত্যু-সংবাদে দুই চোখ থেকে দু’ফোঁটা পানি যে গড়িয়ে পড়েছে, কষ্টের স্বরূপ বোঝাতে তা ব্যর্থ হয়েছে।

এরপর যে প্রায় ঘণ্টা দুয়েক নির্বাক হয়ে থাকলাম, সেটাও কষ্টের কোনো প্রতিরূপ নয়। মানুষের মস্তিষ্ক এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের চেয়েও রহস্যময়। মস্তিষ্কজাত অনুভূতিরও প্রকারভেদ অসীম। এত অসংখ্য প্রকারের অনুভূতিকে বোঝানোর মতো পর্যাপ্ত শব্দ আমাদের অভিধানগুলোয় নেই। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও কি পেরেছেন আমাদের সব অনুভূতিকে ঠিকঠাকমতো শব্দে বা বাক্যে রূপ দিতে? মুনীর ভাইয়ের মৃত্যুতে আমার যে অনুভূতি হয়েছে, অন্তত বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় তা বোঝানোর মতো শব্দ আমি পাইনি এখনও।

হবেই বা না কেন? ঘনিষ্ঠতা তো অনেকের সঙ্গেই হয়; কিন্তু উচ্চমার্গের রসিকতা বিনিময় হয় যার সঙ্গে, তিনিই বোধহয় ঘনিষ্ঠতম। মুনীর ভাই ও আমি-দু’জনই এক সময় দুটি আলাদা প্লাটফর্মে কমিউনিস্ট ধারার রাজনীতি করতাম এবং দু’জনই একটা সময় ভিন্ন চিন্তা ধারণ করেছি। বলা যায়, দু’জনই হয়ে পড়েছি লিবারেল ডেমোক্রেট। তো কমিউনিজমকে ক্রিটিক্যালি দেখতে গিয়ে আমরা চুটকি ধরনের রসিকতা করতাম।

যেমন, আমি একবার তাকে বললাম, সমাজতন্ত্র হচ্ছে গণতন্ত্রে পৌঁছানোর দীর্ঘতম পথ! এই রসিকতা সবার পক্ষে অ্যাপ্রিশিয়েট করা সম্ভব নয়। কিন্তু মুনীর ভাই হেসে খুন। তিনিও কি কম যান! সঙ্গে সঙ্গে বললেন, পুঁজিবাদী সমাজে মানুষ মানুষকে শোষণ করে, আর সমাজতান্ত্রিক সমাজে ঘটে ঠিক উল্টোটা। পাঠক বুঝলেন তো, সমাজতন্ত্র নিয়ে কত উচ্চমার্গের রসিকতা এটা। মানুষ মানুষকে শোষণ করে, এর উল্টোটাও কিন্তু মানুষ মানুষকে শোষণ করে।

মুনীর ভাইকে এক কথায় অ্যাটম বোমার সঙ্গে তুলনা করা চলে। ছোটখাটো একজন মানুষ, অথচ কী অসম্ভব শক্তিই না ধারণ করতেন তিনি। এই শক্তি আর কিছুই নয়; আধুনিকতার, বিজ্ঞানমনস্কতার। তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৯৪ সালে, আমি সাপ্তাহিক যায়যায়দিনে যোগ দেয়ার পর। একই রুমে আমরা তিনজন বসতাম: আমি, বিভুদা (বিভুরঞ্জন সরকার) ও মুনীর ভাই। প্রথম দর্শনে তাকে এমন কিছুই মনে হয়নি-সাদামাটা, বলা চলে আনইম্প্রেসিভ। কিন্তু তিনি একটু একটু করে যখন নিজেকে খুলে ধরলেন, একপর্যায়ে মনে হল, তিনি যথার্থ অর্থেই একজন স্মার্ট লোক।

স্মার্ট তো আর গাড়ি ড্রাইভ করলেই হওয়া যায় না, হওয়া যায় না ফ্যাশনেবল ড্রেসেও কিংবা ইংরেজি বলতে পারলেই। প্রকৃত স্মার্ট তিনিই, যিনি কোনো জটিল বিষয়ে, সেটা রাজনৈতিক ইস্যু কিংবা বিশ্ব-পরিস্থিতি, বিশ্লেষণধর্মী মতামত দিতে পারেন। মুনীর ভাই শুধু এটা পারতেনই না, তার বিশ্লেষণে থাকত মনমাতানো সেন্স অব হিউমারও।

যায়যায়দিনে তিনি রিপোর্টিংভিত্তিক কাভার স্টোরি লিখতেন। এক সময় রাজনীতি করার কারণে তার মধ্যে যে রাজনীতিমনস্কতার জন্ম হয়েছিল, সাংবাদিকতায় সেই মনস্কতা যোগ হওয়ায় তৈরি হয়েছিল এক অসাধারণ প্রতিভা। উপরন্তু, ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের প্রতি তার ছিল প্রচণ্ড ঝোঁক। যে ইস্যুতেই হাত দিয়েছেন, সোনা ফলেছে। ’৯৪ সালে মাগুরা-২ উপনির্বাচন নিয়ে সরেজমিন ঘুরে তিনি যে কাভার স্টোরি রচনা করেছিলেন, তাতে মনে হয়েছিল দুই চোখে নয়, তিনি শত-সহস্র চোখে দেখেছিলেন পুরো নির্বাচনী এলাকা।

স্টোরিটির একেকটি প্যারাগ্রাফ ছিল যেন একেকটি ছবি। কারচুপির সেই নির্বাচন এমনভাবে উঠে এসেছিল যে, তা আওয়ামী লীগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকে আরও জোরালো করেছিল। আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রদর্শন করেছিল যায়যায়দিনের সেই সংখ্যাটি। মুনীর ভাই টেবিল-মেড রিপোর্টিংয়ের ধার ধারতেন না, ছুটে যেতেন স্পটে, কথা বলতেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে। বলতেন, রিপোর্টিংয়ে বিশেষজ্ঞ মতামতের চেয়ে সাধারণ মানুষের বক্তব্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যে লেখায় হিউম্যান টাচ নেই, সেটা কোনো লেখাই নয়।

শুধু কী মাগুরা-২ উপনির্বাচন, ইয়াসমিন হত্যার পর তিনি ছুটে গেছেন দিনাজপুর, দহগ্রাম-আঙ্গরপোতাবাসীর জীবনালেখ্য তুলে আনতে গেছেন সেখানে, চিংড়ির ঘের নিয়ে এক কাভার স্টোরির জন্য ছুটে গেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকায়। একবার চাল সংকট নিয়ে কাভার স্টোরি তৈরির আগে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কার কার সঙ্গে কথা বলবেন। তিনি স্বভাবসুলভ হাসিতে উত্তর দিয়েছিলেন: না, আমি কোনো অর্থনীতিবিদ বা বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলব না, আমি কথা বলব চালের আড়তদারদের সঙ্গে, চাল পরিবহন করে যে ট্রাক, তার ড্রাইভারের সঙ্গে, চাল উৎপাদনকারীদের সঙ্গে, খুচরা দোকানদারের সঙ্গে, সর্বোপরি গৃহিণীদের সঙ্গে।

একটা বয়সে মানুষের জীবন মানে অসংখ্য স্মৃতির সমষ্টিমাত্র। আমি সেই বয়সে এসে গেছি। তবে কিছু কিছু স্মৃতি থাকে, যেগুলোকে বলা হয় Core memory; এসব স্মৃতি মানুষ কখনও ভোলে না। যেমন, নৌকা ভ্রমণের স্মৃতি (যদি থাকে), দাদা-দাদি বা নানা-নানির আদর, নিজের বিয়ে অনুষ্ঠানের স্মৃতি ইত্যাদি। কিন্তু মুনীর ভাইয়ের কোনো স্মৃতিই যেন ভোলার নয়। যায়যায়দিনে চাকরি করার সময় আমি থাকতাম মিরপুরে। সন্ধ্যায় অফিস থেকে যখন স্কুটারে যাত্রা করব, মুনীর ভাইকে একদিন বললাম: চলেন আপনাকে নামিয়ে দেব। তিনি বললেন: না থাক, আমি হেঁটে যাব। হাঁটা যে শরীরের জন্য কত উপকারী, তখন এই জ্ঞান ছিল না আমার। তাই হয়তো ভেবেছিলাম, এটা কি মুনীর ভাইয়ের অন্যের উপকার না নেয়ার অহংকার? এই ভুল ভাঙতে অনেক সময় লেগেছে আমার। আসলে মুনীর ভাই ছিলেন আগাপাশতলা এক নিরহংকার মানুষ।

কমিউনিস্ট পার্টিতে থাকার সময় ট্রেড ইউনিয়ন করতে গিয়ে শ্রমিক-শ্রেণি নিয়েই ছিল তার কারবার। প্রো-পিপল হবেন না তো কী! মুনীর ভাই তার বাসার জন্য একটি কাজের ছেলে জোগাড় করে দিতে বললেন একদিন। আমি পড়ি কী মরি, পাটগ্রাম ছুটে গিয়ে ১২/১৩ বছরের একটি ছেলেকে দিলাম তার হাতে তুলে। পরে সেই ছেলেটির কাছে শুনেছি, মুনীর ভাই ও ভাবি তাকে নিজের সন্তানের মতো আদর করতেন।

আমি এক কলামে লিখেছিলাম: It is better to be human than to be famous-বিখ্যাত হওয়ার চেয়ে মানবিক থাকা অনেক ভালো। মুনীর ভাই যথার্থই ছিলেন মানবিক; তিনি বিখ্যাত হতে চাননি; কিন্তু কেমন করে যেন বিখ্যাত হয়ে গেলেন। কী এমন ছিল তার যে তিনি বিখ্যাত হয়ে গেলেন? স্পষ্টবাদিতা? দলতন্ত্রের যুগে দলবাজি থেকে দূরে থাকা? কলমকে নির্ভীক করে তোলা? হ্যাঁ, এ দেশে রাজনীতি করতে হলে দলতন্ত্র করতেই হয় বলে রাজনীতিটা ছেড়ে শুধু রাজনীতিমনস্কতা নিয়ে বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন তিনি। এই রাজনীতিমনস্কতা কোনো দলের কাছে বন্ধক রাখেননি।

’৯৬-এর শেষদিকে আমরা তিনজনই যখন আর যায়যায়দিনে নেই, বিভুদা ও আমি মিলে প্রকাশ করলাম সাপ্তাহিক চলতিপত্র আর মুনীর ভাই যোগ দিলেন দৈনিক সংবাদে। মুনীর ভাই সংবাদের দায়িত্ব পালন করা ছাড়াও চলতিপত্রে কন্ট্রিবিউট করতেন। কত আনন্দমুখরই না ছিল দিনগুলো! ইংরেজিতে বললে: Those were the days! Sweet days!

মুনীর ভাই আমৃত্যু যে জিনিসটি ধরে রেখেছিলেন, সেটা হল তারুণ্য। বয়স তার কাছে ছিল সংখ্যা মাত্র। পরিণত বয়সেও যেভাবে কথা বলতেন, মনে হতো এক টগবগে যুবক। এমন একজন জীবন্ত (ষরাবষু) মানুষ পেতে হলে সমাজে বিস্তর মেশামেশি করতে হবে। হ্যাঁ, বলতেই হবে, তিনি ছিলেন সব সময়ই এক শিক্ষিত যুবক, যার ছিল না হিংসা অথবা ঈর্ষা, ছিল ক্রোধ এবং সেই ক্রোধ অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

৭৪ ওভারের এক ইনিংসে আর কত খেলা যায়! ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং-যা খেলেছেন যথেষ্ট। ইতিহাসসচেতনতা ও পলিটিক্যাল মাইন্ড ছাড়া একজন মানুষ আধুনিক হতে পারে না। মুনীর ভাইয়ের দুটোই ছিল পূর্ণ মাত্রায়। কমিউনিস্ট ধারার রাজনীতি করার সময় মার্কসীয় ইতিহাসের আলোকে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে এই সমাজটাকে নতুন ছাঁচে গড়তে চেয়েছিলেন আর সাংবাদিক জীবনে পাঠকের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন সমাজের অসঙ্গতি, বুঝিয়েছেন রাজনীতির মারপ্যাঁচ।

টিভি চ্যানেলগুলোর টকশোয় মুনীর ভাইকে যে বেশি বেশি ডাকা হতো, তার অন্যতম কারণ বুঝি ছিল তার দলতন্ত্রহীনতা। অধিকাংশ টকারের চেহারা দেখলেই আগাম বোঝা যায় কোন প্রশ্নের উত্তরে তারা কী বলবেন। প্রি-অকিউপাইড হলে যা হয়। কিন্তু মুনীর ভাই, বিশেষত রাজনৈতিক প্রশ্নের কী উত্তর দেবেন-আগে থেকে বোঝা যেত না। বোধকরি একজন বক্তা হিসেবে এটাই ছিল তার সার্থকতা।

নিরপেক্ষতা বলতে তিনি বুঝতেন সত্যের পক্ষাবলম্বন। প্রচলিত ধারার রাজনীতির প্রতি ছিল তার চরম বিরক্তি, তবে এই বিরক্তি প্রকাশে ছিল না কোনো হঠকারিতা কিংবা অশালীন আচরণ। প্রতিপক্ষের প্রতি this far and not further-এই নীতি মেনে চলতেন তিনি। পরিমিতিবোধ তাকে করে তুলেছিল এক বিশিষ্ট ভদ্রলোক।

একবার খুব মজা হয়েছিল। ‘দেশ’ টেলিভিশনের এক টকশোয় সঞ্চালক ছিলেন মুনীর ভাই আর আলোচক ছিলাম আমি ও বিভুদা। তখন মনে হয়েছিল, আমরা বোধহয় যায়যায়দিনের সেই রুমটায় বসে আছি। আমি বক্তব্যের শুরুতেই বললাম, এখন যদি কানেকটিভিটিতে শফিক রেহমানকে যুক্ত করা যায়, তাহলে তো ষোলোকলা পূর্ণ হয়ে যায়। দু’জনেই হেসে দিলেন। আজ মুনীর ভাই মাটির নিচে, শফিক রেহমান লন্ডনে নির্বাসিত জীবনে, বিভুদা অসুস্থ। আচ্ছা সময় কেন এত বহমান, ব্যাটা এক জায়গায় স্থির থাকতে পারে না?

মুনীর ভাই সম্পর্কে বেশি বেশি বিশেষণ ব্যবহার করব না। আসলে বিশেষণ দিয়ে কোনো বস্তু বা পরিস্থিতিকে ঠিকঠাক বোঝা যায় না। যেমন, মেয়েটি খুব সুন্দর। এই ‘সুন্দর’ বিশেষণ দিয়ে মেয়েটির সৌন্দর্যের কিছুই বোঝা যাবে না। সে যেসব কারণে সুন্দর, সেগুলো ফুটিয়ে তুলতে পারলেই তার সৌন্দর্যটা উপলব্ধি করা যাবে, তখন আর আলাদাভাবে সুন্দর বলার দরকার হবে না। এই সূত্রে মুনীর ভাই ‘এক সুন্দর ব্যক্তিত্ব’ না বলে তার একটি বিশেষ দিক বলব, তাতে যদি কারও কাছে তাকে সুন্দর মনে হয়, তো হবে। হ্যাঁ, প্লেইন লিভিং অ্যান্ড হাই থিংকিংই ছিল তার জীবনের মটো। অনেক ক্ষেত্রে জ্ঞান মানে তা একইসঙ্গে বিনোদনও বটে। মুনীর ভাইয়ের হাই থিংকিং আমাকে দিয়েছে দুটোই।

মুনীর ভাইয়ের দৈহিক গঠন যা, তাতে তিনি অনায়াসে আরও কয়েক বছর বেঁচে থাকতে পারতেন। করোনা তা হতে দিল না। এই নিষ্ঠুরতার কোনো ক্ষমা নেই। করোনাভাইরাস যদি দৃশ্যমান কেউ হতো, হত্যার বদলা হত্যা নিতে পারতাম। কিন্তু সে যে অদৃশ্য! মনের ঝাল মেটানোর তাই একটাই উপায় আছে। হ্যাঁ, করোনা, তোকে আমি অভিশাপ দিচ্ছি। এতে যদি আমার প্রাণটাও কেড়ে নিতে চাস, তো নে।

মাহবুব কামাল : সাংবাদিক

[email protected]

জাত নিমের পাতা

করোনা, তোকে আমি অভিশাপ দিচ্ছি

 মাহবুব কামাল 
২৮ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কবে যেন লিখেছিলাম, তুমি এই ভেবে গর্ব করো না যে, তুমি মেয়েদের চিনেছ। কারণ, আরেকটি মেয়ে তোমাকে এর চেয়ে বেশি কষ্ট দিতে পারে। সা’দত হুসাইনের মৃত্যুর পর যে কষ্টটা পেয়েছিলাম, তার চেয়ে বেশি কষ্ট যে আর কখনও পাব, ভাবিনি। মুনীর ভাইয়ের (খন্দকার মুনীরুজ্জামান) মৃত্যু বুঝিয়ে দিল কষ্ট কাকে বলে। কিছু কিছু কষ্ট থাকে, যা প্রকাশে চোখের জল যথেষ্ট নয়। মুনীর ভাইয়ের মৃত্যু-সংবাদে দুই চোখ থেকে দু’ফোঁটা পানি যে গড়িয়ে পড়েছে, কষ্টের স্বরূপ বোঝাতে তা ব্যর্থ হয়েছে।

এরপর যে প্রায় ঘণ্টা দুয়েক নির্বাক হয়ে থাকলাম, সেটাও কষ্টের কোনো প্রতিরূপ নয়। মানুষের মস্তিষ্ক এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের চেয়েও রহস্যময়। মস্তিষ্কজাত অনুভূতিরও প্রকারভেদ অসীম। এত অসংখ্য প্রকারের অনুভূতিকে বোঝানোর মতো পর্যাপ্ত শব্দ আমাদের অভিধানগুলোয় নেই। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও কি পেরেছেন আমাদের সব অনুভূতিকে ঠিকঠাকমতো শব্দে বা বাক্যে রূপ দিতে? মুনীর ভাইয়ের মৃত্যুতে আমার যে অনুভূতি হয়েছে, অন্তত বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় তা বোঝানোর মতো শব্দ আমি পাইনি এখনও।

হবেই বা না কেন? ঘনিষ্ঠতা তো অনেকের সঙ্গেই হয়; কিন্তু উচ্চমার্গের রসিকতা বিনিময় হয় যার সঙ্গে, তিনিই বোধহয় ঘনিষ্ঠতম। মুনীর ভাই ও আমি-দু’জনই এক সময় দুটি আলাদা প্লাটফর্মে কমিউনিস্ট ধারার রাজনীতি করতাম এবং দু’জনই একটা সময় ভিন্ন চিন্তা ধারণ করেছি। বলা যায়, দু’জনই হয়ে পড়েছি লিবারেল ডেমোক্রেট। তো কমিউনিজমকে ক্রিটিক্যালি দেখতে গিয়ে আমরা চুটকি ধরনের রসিকতা করতাম।

যেমন, আমি একবার তাকে বললাম, সমাজতন্ত্র হচ্ছে গণতন্ত্রে পৌঁছানোর দীর্ঘতম পথ! এই রসিকতা সবার পক্ষে অ্যাপ্রিশিয়েট করা সম্ভব নয়। কিন্তু মুনীর ভাই হেসে খুন। তিনিও কি কম যান! সঙ্গে সঙ্গে বললেন, পুঁজিবাদী সমাজে মানুষ মানুষকে শোষণ করে, আর সমাজতান্ত্রিক সমাজে ঘটে ঠিক উল্টোটা। পাঠক বুঝলেন তো, সমাজতন্ত্র নিয়ে কত উচ্চমার্গের রসিকতা এটা। মানুষ মানুষকে শোষণ করে, এর উল্টোটাও কিন্তু মানুষ মানুষকে শোষণ করে।

মুনীর ভাইকে এক কথায় অ্যাটম বোমার সঙ্গে তুলনা করা চলে। ছোটখাটো একজন মানুষ, অথচ কী অসম্ভব শক্তিই না ধারণ করতেন তিনি। এই শক্তি আর কিছুই নয়; আধুনিকতার, বিজ্ঞানমনস্কতার। তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৯৪ সালে, আমি সাপ্তাহিক যায়যায়দিনে যোগ দেয়ার পর। একই রুমে আমরা তিনজন বসতাম: আমি, বিভুদা (বিভুরঞ্জন সরকার) ও মুনীর ভাই। প্রথম দর্শনে তাকে এমন কিছুই মনে হয়নি-সাদামাটা, বলা চলে আনইম্প্রেসিভ। কিন্তু তিনি একটু একটু করে যখন নিজেকে খুলে ধরলেন, একপর্যায়ে মনে হল, তিনি যথার্থ অর্থেই একজন স্মার্ট লোক।

স্মার্ট তো আর গাড়ি ড্রাইভ করলেই হওয়া যায় না, হওয়া যায় না ফ্যাশনেবল ড্রেসেও কিংবা ইংরেজি বলতে পারলেই। প্রকৃত স্মার্ট তিনিই, যিনি কোনো জটিল বিষয়ে, সেটা রাজনৈতিক ইস্যু কিংবা বিশ্ব-পরিস্থিতি, বিশ্লেষণধর্মী মতামত দিতে পারেন। মুনীর ভাই শুধু এটা পারতেনই না, তার বিশ্লেষণে থাকত মনমাতানো সেন্স অব হিউমারও।

যায়যায়দিনে তিনি রিপোর্টিংভিত্তিক কাভার স্টোরি লিখতেন। এক সময় রাজনীতি করার কারণে তার মধ্যে যে রাজনীতিমনস্কতার জন্ম হয়েছিল, সাংবাদিকতায় সেই মনস্কতা যোগ হওয়ায় তৈরি হয়েছিল এক অসাধারণ প্রতিভা। উপরন্তু, ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের প্রতি তার ছিল প্রচণ্ড ঝোঁক। যে ইস্যুতেই হাত দিয়েছেন, সোনা ফলেছে। ’৯৪ সালে মাগুরা-২ উপনির্বাচন নিয়ে সরেজমিন ঘুরে তিনি যে কাভার স্টোরি রচনা করেছিলেন, তাতে মনে হয়েছিল দুই চোখে নয়, তিনি শত-সহস্র চোখে দেখেছিলেন পুরো নির্বাচনী এলাকা।

স্টোরিটির একেকটি প্যারাগ্রাফ ছিল যেন একেকটি ছবি। কারচুপির সেই নির্বাচন এমনভাবে উঠে এসেছিল যে, তা আওয়ামী লীগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকে আরও জোরালো করেছিল। আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রদর্শন করেছিল যায়যায়দিনের সেই সংখ্যাটি। মুনীর ভাই টেবিল-মেড রিপোর্টিংয়ের ধার ধারতেন না, ছুটে যেতেন স্পটে, কথা বলতেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে। বলতেন, রিপোর্টিংয়ে বিশেষজ্ঞ মতামতের চেয়ে সাধারণ মানুষের বক্তব্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যে লেখায় হিউম্যান টাচ নেই, সেটা কোনো লেখাই নয়।

শুধু কী মাগুরা-২ উপনির্বাচন, ইয়াসমিন হত্যার পর তিনি ছুটে গেছেন দিনাজপুর, দহগ্রাম-আঙ্গরপোতাবাসীর জীবনালেখ্য তুলে আনতে গেছেন সেখানে, চিংড়ির ঘের নিয়ে এক কাভার স্টোরির জন্য ছুটে গেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকায়। একবার চাল সংকট নিয়ে কাভার স্টোরি তৈরির আগে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কার কার সঙ্গে কথা বলবেন। তিনি স্বভাবসুলভ হাসিতে উত্তর দিয়েছিলেন: না, আমি কোনো অর্থনীতিবিদ বা বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলব না, আমি কথা বলব চালের আড়তদারদের সঙ্গে, চাল পরিবহন করে যে ট্রাক, তার ড্রাইভারের সঙ্গে, চাল উৎপাদনকারীদের সঙ্গে, খুচরা দোকানদারের সঙ্গে, সর্বোপরি গৃহিণীদের সঙ্গে।

একটা বয়সে মানুষের জীবন মানে অসংখ্য স্মৃতির সমষ্টিমাত্র। আমি সেই বয়সে এসে গেছি। তবে কিছু কিছু স্মৃতি থাকে, যেগুলোকে বলা হয় Core memory; এসব স্মৃতি মানুষ কখনও ভোলে না। যেমন, নৌকা ভ্রমণের স্মৃতি (যদি থাকে), দাদা-দাদি বা নানা-নানির আদর, নিজের বিয়ে অনুষ্ঠানের স্মৃতি ইত্যাদি। কিন্তু মুনীর ভাইয়ের কোনো স্মৃতিই যেন ভোলার নয়। যায়যায়দিনে চাকরি করার সময় আমি থাকতাম মিরপুরে। সন্ধ্যায় অফিস থেকে যখন স্কুটারে যাত্রা করব, মুনীর ভাইকে একদিন বললাম: চলেন আপনাকে নামিয়ে দেব। তিনি বললেন: না থাক, আমি হেঁটে যাব। হাঁটা যে শরীরের জন্য কত উপকারী, তখন এই জ্ঞান ছিল না আমার। তাই হয়তো ভেবেছিলাম, এটা কি মুনীর ভাইয়ের অন্যের উপকার না নেয়ার অহংকার? এই ভুল ভাঙতে অনেক সময় লেগেছে আমার। আসলে মুনীর ভাই ছিলেন আগাপাশতলা এক নিরহংকার মানুষ।

কমিউনিস্ট পার্টিতে থাকার সময় ট্রেড ইউনিয়ন করতে গিয়ে শ্রমিক-শ্রেণি নিয়েই ছিল তার কারবার। প্রো-পিপল হবেন না তো কী! মুনীর ভাই তার বাসার জন্য একটি কাজের ছেলে জোগাড় করে দিতে বললেন একদিন। আমি পড়ি কী মরি, পাটগ্রাম ছুটে গিয়ে ১২/১৩ বছরের একটি ছেলেকে দিলাম তার হাতে তুলে। পরে সেই ছেলেটির কাছে শুনেছি, মুনীর ভাই ও ভাবি তাকে নিজের সন্তানের মতো আদর করতেন।

আমি এক কলামে লিখেছিলাম: It is better to be human than to be famous-বিখ্যাত হওয়ার চেয়ে মানবিক থাকা অনেক ভালো। মুনীর ভাই যথার্থই ছিলেন মানবিক; তিনি বিখ্যাত হতে চাননি; কিন্তু কেমন করে যেন বিখ্যাত হয়ে গেলেন। কী এমন ছিল তার যে তিনি বিখ্যাত হয়ে গেলেন? স্পষ্টবাদিতা? দলতন্ত্রের যুগে দলবাজি থেকে দূরে থাকা? কলমকে নির্ভীক করে তোলা? হ্যাঁ, এ দেশে রাজনীতি করতে হলে দলতন্ত্র করতেই হয় বলে রাজনীতিটা ছেড়ে শুধু রাজনীতিমনস্কতা নিয়ে বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন তিনি। এই রাজনীতিমনস্কতা কোনো দলের কাছে বন্ধক রাখেননি।

’৯৬-এর শেষদিকে আমরা তিনজনই যখন আর যায়যায়দিনে নেই, বিভুদা ও আমি মিলে প্রকাশ করলাম সাপ্তাহিক চলতিপত্র আর মুনীর ভাই যোগ দিলেন দৈনিক সংবাদে। মুনীর ভাই সংবাদের দায়িত্ব পালন করা ছাড়াও চলতিপত্রে কন্ট্রিবিউট করতেন। কত আনন্দমুখরই না ছিল দিনগুলো! ইংরেজিতে বললে: Those were the days! Sweet days!

মুনীর ভাই আমৃত্যু যে জিনিসটি ধরে রেখেছিলেন, সেটা হল তারুণ্য। বয়স তার কাছে ছিল সংখ্যা মাত্র। পরিণত বয়সেও যেভাবে কথা বলতেন, মনে হতো এক টগবগে যুবক। এমন একজন জীবন্ত (ষরাবষু) মানুষ পেতে হলে সমাজে বিস্তর মেশামেশি করতে হবে। হ্যাঁ, বলতেই হবে, তিনি ছিলেন সব সময়ই এক শিক্ষিত যুবক, যার ছিল না হিংসা অথবা ঈর্ষা, ছিল ক্রোধ এবং সেই ক্রোধ অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

৭৪ ওভারের এক ইনিংসে আর কত খেলা যায়! ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং-যা খেলেছেন যথেষ্ট। ইতিহাসসচেতনতা ও পলিটিক্যাল মাইন্ড ছাড়া একজন মানুষ আধুনিক হতে পারে না। মুনীর ভাইয়ের দুটোই ছিল পূর্ণ মাত্রায়। কমিউনিস্ট ধারার রাজনীতি করার সময় মার্কসীয় ইতিহাসের আলোকে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে এই সমাজটাকে নতুন ছাঁচে গড়তে চেয়েছিলেন আর সাংবাদিক জীবনে পাঠকের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন সমাজের অসঙ্গতি, বুঝিয়েছেন রাজনীতির মারপ্যাঁচ।

টিভি চ্যানেলগুলোর টকশোয় মুনীর ভাইকে যে বেশি বেশি ডাকা হতো, তার অন্যতম কারণ বুঝি ছিল তার দলতন্ত্রহীনতা। অধিকাংশ টকারের চেহারা দেখলেই আগাম বোঝা যায় কোন প্রশ্নের উত্তরে তারা কী বলবেন। প্রি-অকিউপাইড হলে যা হয়। কিন্তু মুনীর ভাই, বিশেষত রাজনৈতিক প্রশ্নের কী উত্তর দেবেন-আগে থেকে বোঝা যেত না। বোধকরি একজন বক্তা হিসেবে এটাই ছিল তার সার্থকতা।

নিরপেক্ষতা বলতে তিনি বুঝতেন সত্যের পক্ষাবলম্বন। প্রচলিত ধারার রাজনীতির প্রতি ছিল তার চরম বিরক্তি, তবে এই বিরক্তি প্রকাশে ছিল না কোনো হঠকারিতা কিংবা অশালীন আচরণ। প্রতিপক্ষের প্রতি this far and not further-এই নীতি মেনে চলতেন তিনি। পরিমিতিবোধ তাকে করে তুলেছিল এক বিশিষ্ট ভদ্রলোক।

একবার খুব মজা হয়েছিল। ‘দেশ’ টেলিভিশনের এক টকশোয় সঞ্চালক ছিলেন মুনীর ভাই আর আলোচক ছিলাম আমি ও বিভুদা। তখন মনে হয়েছিল, আমরা বোধহয় যায়যায়দিনের সেই রুমটায় বসে আছি। আমি বক্তব্যের শুরুতেই বললাম, এখন যদি কানেকটিভিটিতে শফিক রেহমানকে যুক্ত করা যায়, তাহলে তো ষোলোকলা পূর্ণ হয়ে যায়। দু’জনেই হেসে দিলেন। আজ মুনীর ভাই মাটির নিচে, শফিক রেহমান লন্ডনে নির্বাসিত জীবনে, বিভুদা অসুস্থ। আচ্ছা সময় কেন এত বহমান, ব্যাটা এক জায়গায় স্থির থাকতে পারে না?

মুনীর ভাই সম্পর্কে বেশি বেশি বিশেষণ ব্যবহার করব না। আসলে বিশেষণ দিয়ে কোনো বস্তু বা পরিস্থিতিকে ঠিকঠাক বোঝা যায় না। যেমন, মেয়েটি খুব সুন্দর। এই ‘সুন্দর’ বিশেষণ দিয়ে মেয়েটির সৌন্দর্যের কিছুই বোঝা যাবে না। সে যেসব কারণে সুন্দর, সেগুলো ফুটিয়ে তুলতে পারলেই তার সৌন্দর্যটা উপলব্ধি করা যাবে, তখন আর আলাদাভাবে সুন্দর বলার দরকার হবে না। এই সূত্রে মুনীর ভাই ‘এক সুন্দর ব্যক্তিত্ব’ না বলে তার একটি বিশেষ দিক বলব, তাতে যদি কারও কাছে তাকে সুন্দর মনে হয়, তো হবে। হ্যাঁ, প্লেইন লিভিং অ্যান্ড হাই থিংকিংই ছিল তার জীবনের মটো। অনেক ক্ষেত্রে জ্ঞান মানে তা একইসঙ্গে বিনোদনও বটে। মুনীর ভাইয়ের হাই থিংকিং আমাকে দিয়েছে দুটোই।

মুনীর ভাইয়ের দৈহিক গঠন যা, তাতে তিনি অনায়াসে আরও কয়েক বছর বেঁচে থাকতে পারতেন। করোনা তা হতে দিল না। এই নিষ্ঠুরতার কোনো ক্ষমা নেই। করোনাভাইরাস যদি দৃশ্যমান কেউ হতো, হত্যার বদলা হত্যা নিতে পারতাম। কিন্তু সে যে অদৃশ্য! মনের ঝাল মেটানোর তাই একটাই উপায় আছে। হ্যাঁ, করোনা, তোকে আমি অভিশাপ দিচ্ছি। এতে যদি আমার প্রাণটাও কেড়ে নিতে চাস, তো নে।

মাহবুব কামাল : সাংবাদিক

[email protected]