সিএমএইচে এত আস্থা কেন
jugantor
সিএমএইচে এত আস্থা কেন

  ড. একে এম মাকসুদুল হক  

২৮ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বরেণ্য অর্থনীতিবিদ ড. রেহমান সোবহান দাবি তুলেছেন সিএমএইচের মতো আরও ১০টি হাসপাতাল দেশব্যাপী গড়ে তোলার জন্য। করোনা মহামারীর বদৌলতে স্বাস্থ্য খাতের এ ভঙ্গুর চেহারা উন্মোচিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের এ প্রবীণ বিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব যৌক্তিক প্রয়োজনটি তুলে ধরেছেন। আসলে মাত্র দশটি নয়, দেশের প্রতিটি জেলা সদরে ‘সিএমএইচ’ মানের একটি করে হাসপাতাল স্থাপন হওয়া প্রত্যেক নাগরিকের প্রাণের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা এবং সংশ্লিষ্ট অসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সাধারণত সিএমএইচে স্বাস্থ্যসেবা পেয়ে থাকেন। আর উচ্চবিত্ত ও ভিআইপিরা চিকিৎসার জন্য বিদেশের উন্নত হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। তবে বর্তমান করোনা মহামারীতে বিদেশ ভ্রমণ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ায় তারা সিএমএইচের ওপর আস্থা স্থাপন করছেন দেখা যাচ্ছে।

করোনা আক্রান্ত হয়ে তাদের অনেকেই সিএমএইচে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেছেন। সিএমএইচের দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং ডাক্তার ও চিকিৎসাকর্মীদের নিবেদিতপ্রাণ সেবাই মূলত চিকিৎসা খাতে ‘সিএমএইচের এ সম্মানজনক আস্থা সৃষ্টির কারণ।

সেনাবাহিনীর এএমসি বা আর্মি মেডিকেল কোরের অফিসার, জেসিও এবং অন্যান্য পদবির সৈনিকরা সিএমএইচ পরিচালনা করে থাকেন। অফিসাররা দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে সরাসরি ক্যাপ্টেন পদবিতে যোগদান করে মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। আর সৈনিকরা এসএসসি পাস করে যোগদান করে এক বছরের মৌলিক সামরিক এবং স্বাস্থ্যসেবার প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন।

এএমসি কোরের অফিসার ও সৈনিকরা মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষে সেনাবাহিনীর স্বাস্থ্য পেশায় যোগদান করার পর ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে থাকেন। সশস্ত্র বাহিনীর চাহিদা সামনে রেখে এ প্রশিক্ষণ ও উচ্চতর ডিগ্রিসহ সার্বিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে দেশের অন্যান্য স্বনামধন্য স্বাস্থ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় তাদের প্রশিক্ষণ করানো হয়। এভাবে বিজ্ঞ ডাক্তার তৈরির পাশাপাশি স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনা এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় তাদের দক্ষ করে গড়ে তোলা হয়।

এ ছাড়াও প্রতিবছর এ ডাক্তার ও চিকিৎসাকর্মীরা শীতকালীন যৌথ প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ফিল্ড হসপিটাল স্থাপনের অভিজ্ঞতা অর্জন করে থাকেন। এভাবে সেনাবাহিনী একটি দক্ষ চিকিৎসক এবং চিকিৎসা-ব্যবস্থাপক দল গড়ে তুলছে প্রতিনিয়ত।

সিএমএইচকে অনন্য করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ একটি বড় উপাদান। মূল নেতৃত্বে থাকেন সেনাপ্রধান। একটি সুশৃঙ্খল চেইনের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর স্বাস্থ্য খাতের তৃণমূল পর্যন্ত সেনাপ্রধানের নেতৃত্ব বাস্তবায়িত হয়। এ নেতৃত্বের আলোকে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একটি পেশাদার স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সফলতার ক্ষেত্রে পূর্বপরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য হুমকির বিভিন্ন বাঁকে বাঁকে সময়োচিত পরিকল্পনার মাধ্যমে সেনাসদর থেকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়া হয়ে থাকে। করোনা মহামারীর পূর্ব সতর্কতা পেয়েই তারা এটি মোকাবেলার প্রস্তুতি নিতে থাকে। ফলে করোনার ঢেউ বাংলাদেশে আঘাত করার সঙ্গে সঙ্গে সিএমএইচ যথার্থ প্রস্তুতির সঙ্গেই ‘কোভিড-১৯’ রোগী ব্যবস্থাপনার কাজে নেমে যায় এবং সফলতার সঙ্গে দেশবাসীর আস্থা অর্জনে সমর্থ হয়।

সঠিক সমন্বয় ছাড়া জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো সম্ভব নয়। এ সমন্বয়ের ব্যাপারে সেনাবাহিনী অত্যন্ত দক্ষ। একটি সফল চিকিৎসাব্যবস্থা পরিচালনার জন্য সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে সমন্বয় ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। নেতৃত্ব, লজিস্টিসিয়ান, চিকিৎসক, সেবাকর্মী, রোগী ইত্যাদি সব সেবাপ্রদানকারী ও সেবাগ্রহণকারীর মাঝে একটি সুষম সমন্বয় ব্যবস্থার চর্চাই সিএমএইচের সফলতার বড় নিয়ামক।

মেডিকেল কোরের সদস্যের মাঝে কমিটমেন্ট ও পেশাদারিত্ব একটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য। একজন ডাক্তার ও সেবাকর্মী নাওয়া-খাওয়া ভুলে গিয়ে রোগীর সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। তাদের আন্তরিকতায় রোগী এমনিতেই মানসিকভাবে শক্তিশালী হয়ে পড়ে। স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত সেনাসদস্যদের ব্যক্তিগত সততা সিএমএইচের সফলতাকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সিএমএইচের সার্বিক কার্যক্রম প্রক্রিয়া একটি সততানির্ভর ঐতিহ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। প্রত্যেক ডাক্তার ও কর্মী সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে চিকিৎসাদান থেকে শুরু করে ওষুধপত্র ক্রয় ও বিতরণ সব ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতার একটি প্রক্রিয়া ক্রিয়াশীল থাকে।

ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যক্তিগত দেশপ্রেম সিএমএইচের সফলতার আরও একটি বড় কারণ। সেনাসদস্যদের মৌলিক প্রশিক্ষণের সময়ই এ দেশপ্রেমকে তাদের হৃদয়ে প্রোথিত করে দেয়া হয়। এ দেশপ্রেমকে সব সদস্য সারা জীবন লালন করে থাকেন এবং জাতির বিভিন্ন বিপর্যয়ের সময় সেনাবাহিনীর পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবকরা এগিয়ে আসেন মানবতার সেবায়। শীতকালীন প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য সময় তারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গরিব-দুঃখীদের বিনা পারিশ্রমিকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকেন।

জবাবদিহিতার চর্চা কোনো প্রতিষ্ঠানকে শীর্ষে নিয়ে যাওয়ার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। জবাবদিহিতা সশস্ত্র বাহিনীর অন্তর্নিহিত সংস্কৃতি। এখানে তৃণমূলের ব্যক্তি থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ নেতৃত্ব পর্যন্ত জবাবদিহিতার আওতায় রয়েছেন। প্রত্যেক সদস্যকে তার কাজ ও দায়িত্বের জন্য জবাবদিহি করতে হয়। সিএমএইচে কর্মরত প্রত্যেক সদস্যের নিজ নিজ দায়িত্ব রয়েছে। রয়েছে সেই দায়িত্বানুযায়ী জবাবদিহিতার ব্যবস্থা।

প্রত্যেক ব্যক্তি-রোগী থেকে শুরু করে কেবিন, ওয়ার্ড, লজিস্টিক সরবরাহ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা তথা সব বিষয়েই সুনির্ধারিত দায়িত্বপূর্ণ সদস্য রয়েছেন। এ জবাবদিহিতার সংস্কৃতি একটি সুন্দর ও স্বয়ংক্রিয় দায়িত্ব-কর্তব্য পালনের আবহ তৈরি করে রেখেছে প্রতিটি সিএমএইচে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেডিকেল কোরের সূর্যসন্তানরা স্বাধীনতার প্রথম লগ্নেই জীবন দিয়েছিলেন দেশের মাটি ও মানুষের জন্য। ১৩৭ জন শহীদ স্বাস্থ্য সৈনিকের অগ্রজ ছিলেন শহীদ লে. কর্নেল এএফ জিয়াউর রহমান ও শহীদ লে. কর্নেল আবদুল হাই। তারা তাদের সরকারি গাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানোর বীরত্ব দেখিয়ে ঘাতক বাহিনীর আঘাতে প্রথম শহীদ হয়েছিলেন। ওইসব অকুতোভয় স্বাস্থ্যসৈনিকের উত্তরসূরি আজকের সিএমএইচ পরিচালনকারী স্বাস্থ্যসৈনিকরা বর্তমান করোনাযুদ্ধে সম্মুখ সারিতে থেকে পুরো জাতির আশার আলো জ্বালিয়ে রাখছেন।

অন্যদিকে যেসব ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মী অসামরিক পরিমণ্ডলে কাজ করছেন তাদেরও যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সমৃদ্ধ ভাণ্ডার রয়েছে। তাদের পেশাদারিত্ব ও দেশপ্রেমের কোনো অভাব নেই। মূলত তারাই দেশের সার্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধরে রেখেছেন। করোনাযুদ্ধে তারাই বেশি শাহাদতবরণ (৫৫ জন) করেছেন। কিন্তু আমরা তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছি।

স্বাস্থ্য খাতের অদূরদর্শী নেতৃত্ব, দৃশ্যমান সমন্বয়হীনতা, জবাবদিহিতার অভাব এবং আকণ্ঠ নিমজ্জিত দুর্নীতির কারণে আমরা এসব বিশ্বমানের চিকিৎসকের সেবা নিতে ব্যর্থ হয়েছি। তদুপরি ব্যক্তিগত সুরক্ষায় সামগ্রীর অভাব এবং ত্রুটিপূর্ণ সামগ্রীর কারণে তারা আজ জীবন দিচ্ছেন কাতারে কাতারে। অদক্ষ নেতৃত্ব এবং দুর্নীতির কারণে আমরা স্বাস্থ্য কাঠামোকে টেকসই করে তুলতে পারিনি। পাবলিক খাতের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জরাজীর্ণ রূপ আমরা দেখেছি।

প্রাইভেট খাতে মোটামুটি ভালো হলেও সাধারণের আয়ত্তের বাইরেই থেকে যায় সেই সেবা। তদুপরি এ করোনাকালে সেই প্রাইভেট খাতের ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। তাই মানুষের আগ্রহ বেড়েছে সিএমএইচের প্রতি।

এখন কথা হল, কেন আমরা অসামরিক হাসপাতালগুলোকে সিএমএইচ মানের করতে পারলাম না? অনেক উচ্চশিক্ষিত ও গুণী ডাক্তার থাকা সত্ত্বেও কেন একটি হাসপাতালও আমরা উচ্চ মানের করতে পারলাম না? অথচ প্রতিটি জেলা সদর এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হওয়া উচিত ছিল সিএমএইচের চেয়ে মানসম্পন্ন, যেখানে উঁচু মানের ডাক্তারের ঘাটতি নেই। আজ আমাদের নিজেদের সেই প্রশ্ন করতে হবে।

এর মূল কারণ হল, আমাদের রাজনৈতিক অর্থনীতির অশুভ প্রভাব। অবাধ ও আকণ্ঠ নিমজ্জিত দুর্নীতি এর মূলে। আর এ দুর্নীতিকে অবাধ করার সুযোগ করে দিয়েছে জবাবদিহিতার অভাব আর অসততার সংস্কৃতি। নেতৃত্বের দুর্বলতার কারণে বাসা বেঁধেছে নিয়ন্ত্রণহীনতা, স্বেচ্ছাচারিতা আর অপেশাদারিত্ব। সরাসরি কোনো চিকিৎসাকর্মী এর জন্য দায়ী নয়। এর দায় হল চিকিৎসাসেবার নেপথ্যের স্টেকহোল্ডারদের।

একটা অশুভ চক্র এ খাতে সদা সক্রিয় রয়েছে। সরকারি হাসপাতাল উন্নত হলে বেসরকারিগুলো লোকসানে পড়বে। আবার চিকিৎসাসেবার চেয়ে চিকিৎসাসামগ্রীর দিকে আগ্রহ বেশি পরিলক্ষিত হয়। চিকিৎসা খাত পরিচালনার জন্য যোগ্যতার চেয়ে ব্যক্তিগত পছন্দ ও স্বার্থের প্রাধান্য জবাবদিহিতাকে আরও অবহেলিত করে তুলেছে। সব মিলে সরকারি হাসপাতালগুলোয় একটি পেশাদারি সংস্কৃতি গড়ে উঠতে দেয়া হয়নি যুগ যুগ ধরে। টিআইবির গবেষণায় বলা হয়েছে, ‘দীর্ঘদিনের অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা, সুশাসনের ঘাটতি ও অপ্রতুল বাজেট বরাদ্দের কারণে স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা গভীরভাবে ফুটে উঠেছে।’

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোনো ম্যাজিক বুলেটের প্রয়োজন নেই। যারা দুর্নীতি করেন, তারা কর্তৃপক্ষের জানা-শোনার বাইরে নন।’

টিআইবি জানিয়েছে, সরকার ১৪ জুন পর্যন্ত ২৩ লাখ পিপিই বিতরণ করেছে। সেই হিসাবে দেশে কর্মরত ৭৫ হাজার স্বাস্থ্যকর্মীর প্রত্যেকের অন্তত ৩০ সেট পিপিই পাওয়ার কথা। কিন্তু অনেক স্বাস্থ্যকর্মী একটিও পিপিই পাননি। আর এ পিপিইর একটি বড় অংশ ছিল নকল ও নিম্নমানের। ফলে এক হাজার ডাক্তারসহ প্রায় পাঁচ হাজার চিকিৎসাকর্মী কোভিডে আক্রান্ত হয়েছেন এবং মৃত্যবরণ করেছেন প্রায় ১০০ জন।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ইহতেশামুল হক চৌধুরী বলেছেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে যথেষ্ট প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। সেখানে নেতৃত্বের অদক্ষতা যেমন ছিল, তেমনি ছিল নানা রকম অব্যবস্থাপনা। আর দুর্নীতির পুরনো অভিযোগ তো আছেই। তার মতে, পছন্দের লোক হিসেবে ন্যূনতম প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা না থাকা অধ্যাপকদের স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

এ ছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গত কয়েক বছর হাসপাতালগুলোয় বিভিন্ন কেনাকাটা ও অবকাঠামোগত নির্মাণ নিয়ে ব্যস্ত ছিল। তিনি জানিয়েছেন, বেশিরভাগ কেনাকাটা ওপর থেকে নিচে যায়। অর্থাৎ, ঠিকাদার মেডিকেল কলেজকে গিয়ে বলে, অমুক যন্ত্রপাতি কিনতে হবে, অধিদফতরে তালিকা পাঠান; না পাঠালে মন্ত্রণালয় ফোন করে তালিকা চায়। মন্ত্রণালয় ও ঠিকাদারের কথা না শুনলে বদলি বা সাময়িক বরখাস্ত।

দিনশেষে বলতে হয়, প্রশাসনিক অদক্ষতা, জবাবদিহিহীনতা, দুর্বল নেতৃত্ব, নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং অবাধ দুর্নীতির কারণেই আজও আমরা উন্নতমানের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ও হাসপাতাল গড়ে তুলতে পারিনি। কাজেই আত্মসমালোচনার মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতের প্রকাশিত ও আলোচিত ঘটনাগুলোর তদন্তপূর্বক এর মৌলিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাহলে সহজেই ১০টি নয়, ৬৪টি সিএমএইচ মানের হাসপাতাল স্থাপন করা সম্ভব হবে প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমিতে ইনশাআল্লাহ।

ড. একেএম মাকসুদুল হক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক

[email protected]

সিএমএইচে এত আস্থা কেন

 ড. একে এম মাকসুদুল হক 
২৮ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বরেণ্য অর্থনীতিবিদ ড. রেহমান সোবহান দাবি তুলেছেন সিএমএইচের মতো আরও ১০টি হাসপাতাল দেশব্যাপী গড়ে তোলার জন্য। করোনা মহামারীর বদৌলতে স্বাস্থ্য খাতের এ ভঙ্গুর চেহারা উন্মোচিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের এ প্রবীণ বিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব যৌক্তিক প্রয়োজনটি তুলে ধরেছেন। আসলে মাত্র দশটি নয়, দেশের প্রতিটি জেলা সদরে ‘সিএমএইচ’ মানের একটি করে হাসপাতাল স্থাপন হওয়া প্রত্যেক নাগরিকের প্রাণের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা এবং সংশ্লিষ্ট অসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সাধারণত সিএমএইচে স্বাস্থ্যসেবা পেয়ে থাকেন। আর উচ্চবিত্ত ও ভিআইপিরা চিকিৎসার জন্য বিদেশের উন্নত হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। তবে বর্তমান করোনা মহামারীতে বিদেশ ভ্রমণ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ায় তারা সিএমএইচের ওপর আস্থা স্থাপন করছেন দেখা যাচ্ছে।

করোনা আক্রান্ত হয়ে তাদের অনেকেই সিএমএইচে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেছেন। সিএমএইচের দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং ডাক্তার ও চিকিৎসাকর্মীদের নিবেদিতপ্রাণ সেবাই মূলত চিকিৎসা খাতে ‘সিএমএইচের এ সম্মানজনক আস্থা সৃষ্টির কারণ।

সেনাবাহিনীর এএমসি বা আর্মি মেডিকেল কোরের অফিসার, জেসিও এবং অন্যান্য পদবির সৈনিকরা সিএমএইচ পরিচালনা করে থাকেন। অফিসাররা দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে সরাসরি ক্যাপ্টেন পদবিতে যোগদান করে মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। আর সৈনিকরা এসএসসি পাস করে যোগদান করে এক বছরের মৌলিক সামরিক এবং স্বাস্থ্যসেবার প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন।

এএমসি কোরের অফিসার ও সৈনিকরা মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষে সেনাবাহিনীর স্বাস্থ্য পেশায় যোগদান করার পর ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে থাকেন। সশস্ত্র বাহিনীর চাহিদা সামনে রেখে এ প্রশিক্ষণ ও উচ্চতর ডিগ্রিসহ সার্বিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে দেশের অন্যান্য স্বনামধন্য স্বাস্থ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় তাদের প্রশিক্ষণ করানো হয়। এভাবে বিজ্ঞ ডাক্তার তৈরির পাশাপাশি স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনা এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় তাদের দক্ষ করে গড়ে তোলা হয়।

এ ছাড়াও প্রতিবছর এ ডাক্তার ও চিকিৎসাকর্মীরা শীতকালীন যৌথ প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ফিল্ড হসপিটাল স্থাপনের অভিজ্ঞতা অর্জন করে থাকেন। এভাবে সেনাবাহিনী একটি দক্ষ চিকিৎসক এবং চিকিৎসা-ব্যবস্থাপক দল গড়ে তুলছে প্রতিনিয়ত।

সিএমএইচকে অনন্য করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ একটি বড় উপাদান। মূল নেতৃত্বে থাকেন সেনাপ্রধান। একটি সুশৃঙ্খল চেইনের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর স্বাস্থ্য খাতের তৃণমূল পর্যন্ত সেনাপ্রধানের নেতৃত্ব বাস্তবায়িত হয়। এ নেতৃত্বের আলোকে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একটি পেশাদার স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সফলতার ক্ষেত্রে পূর্বপরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য হুমকির বিভিন্ন বাঁকে বাঁকে সময়োচিত পরিকল্পনার মাধ্যমে সেনাসদর থেকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়া হয়ে থাকে। করোনা মহামারীর পূর্ব সতর্কতা পেয়েই তারা এটি মোকাবেলার প্রস্তুতি নিতে থাকে। ফলে করোনার ঢেউ বাংলাদেশে আঘাত করার সঙ্গে সঙ্গে সিএমএইচ যথার্থ প্রস্তুতির সঙ্গেই ‘কোভিড-১৯’ রোগী ব্যবস্থাপনার কাজে নেমে যায় এবং সফলতার সঙ্গে দেশবাসীর আস্থা অর্জনে সমর্থ হয়।

সঠিক সমন্বয় ছাড়া জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো সম্ভব নয়। এ সমন্বয়ের ব্যাপারে সেনাবাহিনী অত্যন্ত দক্ষ। একটি সফল চিকিৎসাব্যবস্থা পরিচালনার জন্য সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে সমন্বয় ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। নেতৃত্ব, লজিস্টিসিয়ান, চিকিৎসক, সেবাকর্মী, রোগী ইত্যাদি সব সেবাপ্রদানকারী ও সেবাগ্রহণকারীর মাঝে একটি সুষম সমন্বয় ব্যবস্থার চর্চাই সিএমএইচের সফলতার বড় নিয়ামক।

মেডিকেল কোরের সদস্যের মাঝে কমিটমেন্ট ও পেশাদারিত্ব একটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য। একজন ডাক্তার ও সেবাকর্মী নাওয়া-খাওয়া ভুলে গিয়ে রোগীর সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। তাদের আন্তরিকতায় রোগী এমনিতেই মানসিকভাবে শক্তিশালী হয়ে পড়ে। স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত সেনাসদস্যদের ব্যক্তিগত সততা সিএমএইচের সফলতাকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সিএমএইচের সার্বিক কার্যক্রম প্রক্রিয়া একটি সততানির্ভর ঐতিহ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। প্রত্যেক ডাক্তার ও কর্মী সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে চিকিৎসাদান থেকে শুরু করে ওষুধপত্র ক্রয় ও বিতরণ সব ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতার একটি প্রক্রিয়া ক্রিয়াশীল থাকে।

ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যক্তিগত দেশপ্রেম সিএমএইচের সফলতার আরও একটি বড় কারণ। সেনাসদস্যদের মৌলিক প্রশিক্ষণের সময়ই এ দেশপ্রেমকে তাদের হৃদয়ে প্রোথিত করে দেয়া হয়। এ দেশপ্রেমকে সব সদস্য সারা জীবন লালন করে থাকেন এবং জাতির বিভিন্ন বিপর্যয়ের সময় সেনাবাহিনীর পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবকরা এগিয়ে আসেন মানবতার সেবায়। শীতকালীন প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য সময় তারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গরিব-দুঃখীদের বিনা পারিশ্রমিকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকেন।

জবাবদিহিতার চর্চা কোনো প্রতিষ্ঠানকে শীর্ষে নিয়ে যাওয়ার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। জবাবদিহিতা সশস্ত্র বাহিনীর অন্তর্নিহিত সংস্কৃতি। এখানে তৃণমূলের ব্যক্তি থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ নেতৃত্ব পর্যন্ত জবাবদিহিতার আওতায় রয়েছেন। প্রত্যেক সদস্যকে তার কাজ ও দায়িত্বের জন্য জবাবদিহি করতে হয়। সিএমএইচে কর্মরত প্রত্যেক সদস্যের নিজ নিজ দায়িত্ব রয়েছে। রয়েছে সেই দায়িত্বানুযায়ী জবাবদিহিতার ব্যবস্থা।

প্রত্যেক ব্যক্তি-রোগী থেকে শুরু করে কেবিন, ওয়ার্ড, লজিস্টিক সরবরাহ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা তথা সব বিষয়েই সুনির্ধারিত দায়িত্বপূর্ণ সদস্য রয়েছেন। এ জবাবদিহিতার সংস্কৃতি একটি সুন্দর ও স্বয়ংক্রিয় দায়িত্ব-কর্তব্য পালনের আবহ তৈরি করে রেখেছে প্রতিটি সিএমএইচে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেডিকেল কোরের সূর্যসন্তানরা স্বাধীনতার প্রথম লগ্নেই জীবন দিয়েছিলেন দেশের মাটি ও মানুষের জন্য। ১৩৭ জন শহীদ স্বাস্থ্য সৈনিকের অগ্রজ ছিলেন শহীদ লে. কর্নেল এএফ জিয়াউর রহমান ও শহীদ লে. কর্নেল আবদুল হাই। তারা তাদের সরকারি গাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানোর বীরত্ব দেখিয়ে ঘাতক বাহিনীর আঘাতে প্রথম শহীদ হয়েছিলেন। ওইসব অকুতোভয় স্বাস্থ্যসৈনিকের উত্তরসূরি আজকের সিএমএইচ পরিচালনকারী স্বাস্থ্যসৈনিকরা বর্তমান করোনাযুদ্ধে সম্মুখ সারিতে থেকে পুরো জাতির আশার আলো জ্বালিয়ে রাখছেন।

অন্যদিকে যেসব ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মী অসামরিক পরিমণ্ডলে কাজ করছেন তাদেরও যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সমৃদ্ধ ভাণ্ডার রয়েছে। তাদের পেশাদারিত্ব ও দেশপ্রেমের কোনো অভাব নেই। মূলত তারাই দেশের সার্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধরে রেখেছেন। করোনাযুদ্ধে তারাই বেশি শাহাদতবরণ (৫৫ জন) করেছেন। কিন্তু আমরা তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছি।

স্বাস্থ্য খাতের অদূরদর্শী নেতৃত্ব, দৃশ্যমান সমন্বয়হীনতা, জবাবদিহিতার অভাব এবং আকণ্ঠ নিমজ্জিত দুর্নীতির কারণে আমরা এসব বিশ্বমানের চিকিৎসকের সেবা নিতে ব্যর্থ হয়েছি। তদুপরি ব্যক্তিগত সুরক্ষায় সামগ্রীর অভাব এবং ত্রুটিপূর্ণ সামগ্রীর কারণে তারা আজ জীবন দিচ্ছেন কাতারে কাতারে। অদক্ষ নেতৃত্ব এবং দুর্নীতির কারণে আমরা স্বাস্থ্য কাঠামোকে টেকসই করে তুলতে পারিনি। পাবলিক খাতের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জরাজীর্ণ রূপ আমরা দেখেছি।

প্রাইভেট খাতে মোটামুটি ভালো হলেও সাধারণের আয়ত্তের বাইরেই থেকে যায় সেই সেবা। তদুপরি এ করোনাকালে সেই প্রাইভেট খাতের ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। তাই মানুষের আগ্রহ বেড়েছে সিএমএইচের প্রতি।

এখন কথা হল, কেন আমরা অসামরিক হাসপাতালগুলোকে সিএমএইচ মানের করতে পারলাম না? অনেক উচ্চশিক্ষিত ও গুণী ডাক্তার থাকা সত্ত্বেও কেন একটি হাসপাতালও আমরা উচ্চ মানের করতে পারলাম না? অথচ প্রতিটি জেলা সদর এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হওয়া উচিত ছিল সিএমএইচের চেয়ে মানসম্পন্ন, যেখানে উঁচু মানের ডাক্তারের ঘাটতি নেই। আজ আমাদের নিজেদের সেই প্রশ্ন করতে হবে।

এর মূল কারণ হল, আমাদের রাজনৈতিক অর্থনীতির অশুভ প্রভাব। অবাধ ও আকণ্ঠ নিমজ্জিত দুর্নীতি এর মূলে। আর এ দুর্নীতিকে অবাধ করার সুযোগ করে দিয়েছে জবাবদিহিতার অভাব আর অসততার সংস্কৃতি। নেতৃত্বের দুর্বলতার কারণে বাসা বেঁধেছে নিয়ন্ত্রণহীনতা, স্বেচ্ছাচারিতা আর অপেশাদারিত্ব। সরাসরি কোনো চিকিৎসাকর্মী এর জন্য দায়ী নয়। এর দায় হল চিকিৎসাসেবার নেপথ্যের স্টেকহোল্ডারদের।

একটা অশুভ চক্র এ খাতে সদা সক্রিয় রয়েছে। সরকারি হাসপাতাল উন্নত হলে বেসরকারিগুলো লোকসানে পড়বে। আবার চিকিৎসাসেবার চেয়ে চিকিৎসাসামগ্রীর দিকে আগ্রহ বেশি পরিলক্ষিত হয়। চিকিৎসা খাত পরিচালনার জন্য যোগ্যতার চেয়ে ব্যক্তিগত পছন্দ ও স্বার্থের প্রাধান্য জবাবদিহিতাকে আরও অবহেলিত করে তুলেছে। সব মিলে সরকারি হাসপাতালগুলোয় একটি পেশাদারি সংস্কৃতি গড়ে উঠতে দেয়া হয়নি যুগ যুগ ধরে। টিআইবির গবেষণায় বলা হয়েছে, ‘দীর্ঘদিনের অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা, সুশাসনের ঘাটতি ও অপ্রতুল বাজেট বরাদ্দের কারণে স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা গভীরভাবে ফুটে উঠেছে।’

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোনো ম্যাজিক বুলেটের প্রয়োজন নেই। যারা দুর্নীতি করেন, তারা কর্তৃপক্ষের জানা-শোনার বাইরে নন।’

টিআইবি জানিয়েছে, সরকার ১৪ জুন পর্যন্ত ২৩ লাখ পিপিই বিতরণ করেছে। সেই হিসাবে দেশে কর্মরত ৭৫ হাজার স্বাস্থ্যকর্মীর প্রত্যেকের অন্তত ৩০ সেট পিপিই পাওয়ার কথা। কিন্তু অনেক স্বাস্থ্যকর্মী একটিও পিপিই পাননি। আর এ পিপিইর একটি বড় অংশ ছিল নকল ও নিম্নমানের। ফলে এক হাজার ডাক্তারসহ প্রায় পাঁচ হাজার চিকিৎসাকর্মী কোভিডে আক্রান্ত হয়েছেন এবং মৃত্যবরণ করেছেন প্রায় ১০০ জন।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ইহতেশামুল হক চৌধুরী বলেছেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে যথেষ্ট প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। সেখানে নেতৃত্বের অদক্ষতা যেমন ছিল, তেমনি ছিল নানা রকম অব্যবস্থাপনা। আর দুর্নীতির পুরনো অভিযোগ তো আছেই। তার মতে, পছন্দের লোক হিসেবে ন্যূনতম প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা না থাকা অধ্যাপকদের স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

এ ছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গত কয়েক বছর হাসপাতালগুলোয় বিভিন্ন কেনাকাটা ও অবকাঠামোগত নির্মাণ নিয়ে ব্যস্ত ছিল। তিনি জানিয়েছেন, বেশিরভাগ কেনাকাটা ওপর থেকে নিচে যায়। অর্থাৎ, ঠিকাদার মেডিকেল কলেজকে গিয়ে বলে, অমুক যন্ত্রপাতি কিনতে হবে, অধিদফতরে তালিকা পাঠান; না পাঠালে মন্ত্রণালয় ফোন করে তালিকা চায়। মন্ত্রণালয় ও ঠিকাদারের কথা না শুনলে বদলি বা সাময়িক বরখাস্ত।

দিনশেষে বলতে হয়, প্রশাসনিক অদক্ষতা, জবাবদিহিহীনতা, দুর্বল নেতৃত্ব, নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং অবাধ দুর্নীতির কারণেই আজও আমরা উন্নতমানের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ও হাসপাতাল গড়ে তুলতে পারিনি। কাজেই আত্মসমালোচনার মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতের প্রকাশিত ও আলোচিত ঘটনাগুলোর তদন্তপূর্বক এর মৌলিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাহলে সহজেই ১০টি নয়, ৬৪টি সিএমএইচ মানের হাসপাতাল স্থাপন করা সম্ভব হবে প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমিতে ইনশাআল্লাহ।

ড. একেএম মাকসুদুল হক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক

[email protected]