স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছেন তিনি
jugantor
স্মরণ
স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছেন তিনি

  আসিফ কবীর  

৩০ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শেখ রাজিয়া নাসের ১৬ নভেম্বর ইন্তেকাল করেছেন। তিনি আমার হোমটাউন খুলনার একজন অভিভাবক স্থানীয় মানুষ। আমার জীবনে বুঝতে শেখার পর থেকে প্রায় পৌনে চার দশকের স্মৃতি আছে তাকে ঘিরে। আমাদের কাছে পরিচিত ছিলেন ডলিবু’ নামে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের চরম দুঃসময়ে তিনি অভিভাবকের মতো অনেককে সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। সাহস, মনোবল ও আত্মবিশ্বাস গঠনে স্মর্তব্য ভূমিকা রেখেছেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরিবারের প্রায় সব সদস্যসহ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়। ১৫ আগস্টের কালরাতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে অবস্থানকালে ঘাতকের বুলেটে প্রাণপাত হয় রাজিয়া নাসেরের স্বামী বঙ্গবন্ধুর সহোদর শেখ আবু নাসেরের। রাজিয়া নাসের সে মুহূর্তে সন্তানসম্ভবা। জাতির পিতার পরিবার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি এ মরণঘাতী আঘাতে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েন ডলিবু’ ও তার সন্তানরা। তখন চলার মতো ব্যবস্থা নেই, প্রায় সবাই মুখ ফিরিয়ে থাকে, সন্তানদের স্কুলে পড়াশোনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। চরম সংকটের মাঝেও ভেঙে না পড়ে তিনি জীবন সংগ্রামে জয়ী হতে ব্রতী হয়েছেন। শুধু একা নয়, খুলনার বিপন্ন আওয়ামী লীগারদের জীবন সংগ্রামে উত্তীর্ণ করার দায়িত্ব নীরবে পালন করেছেন।

আমার আট-নয় বছর বয়সে তার কাছে শুনেছিলাম মুক্তিযোদ্ধা শেখ আবু নাসেরের ১৫ আগস্ট জাতির পিতার পরিবারের অপরাপর সদস্যদের সঙ্গে বত্রিশ নম্বর বাড়িতে শাহাদাতবরণের পূর্বাপর ঘটনাটি; যা সিনেমাটিক ঘটনার মতোই এক ট্র্যাজেডি। শেখ আবু নাসের ১৪ আগস্ট ১৯৭৫ যশোহর হয়ে খুলনা যাওয়ার জন্য তেজগাঁও বিমানবন্দরে চলে আসেন। বিমানে ওঠার অপেক্ষারত অবস্থায় বঙ্গবন্ধু খবর পাঠিয়ে তাকে আবার ফিরে আসতে বলেন আরও কয়েকদিন থেকে যাওয়ার জন্য। স্মৃতি থেকে যতটা মনে করতে পারি ঘটনাটি ছিল এমনই। ওই রাতেই ঘাতকরা হত্যাযজ্ঞ চালায় জাতির পিতার ঐতিহাসিক বাড়িতে।

বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) শেখ আমান হাসান ছিলেন ডলিবু’র জ্যেষ্ঠ সন্তান শেখ হেলাল উদ্দীন এমপি’র ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের ক্লাসমেট। তার কাছে শোনার সুযোগ হয়েছিল পঁচাত্তরের পনের আগস্ট শেখ হেলালের জন্য কেমন ছিল। ওইদিন সকালে প্রাতঃরাশের পর অন্যদিনের মতো ক্লাসে যাওয়ার জন্য একাডেমি ব্লকে না যেয়ে সব ক্যাডেটকে হাউসে পাঠানো হয়। এরপর ক্লাসে যাওয়ার ঘণ্টা আর বাজছিল না। ... ঢাকায় সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জের ধরে তৎকালীন মেডিকেল অফিসার দশম শ্রেণির বালক ক্যাডেট হেলালকে হত্যার চেষ্টা হয়, যা প্রিন্সিপল ক্যাপ্টেন (অব.) করিমুদ্দিন আহমেদের কঠোর হস্তক্ষেপে ঘটতে পারেনি। পনের-ষোল বছরের একজন শিশুকে হত্যার ইচ্ছা দশ বছরের শিশু শেখ রাসেলের বুক বুলেটে বিদীর্ণ হওয়ারই ধারাবাহিকতা ছিল। যশোরে অবস্থানকারী ঘাতক চক্রের দোসরদের পক্ষ থেকেও ফোনে চাপ দেয়া হয় ক্যাডেট হেলালকে তাদের হাতে তুলে দেয়ার জন্য। অধ্যক্ষ করিমুদ্দিন সেদিন দৃঢ়ভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন, আমি সব ছাত্রের কাস্টোডিয়ান। এ অন্যায় আমি কিছুতেই বরদাশত করব না। রক্ষা পান শেখ হেলাল। ডলিবু’র পরিবারের ১৯৭৫-পরবর্তী বৈরী অবস্থায় জীবন সংগ্রামের অনেক ঘটনার একটি মাত্র হল ক্যাডেট শেখ হেলালকে হত্যাচেষ্টা। এ রকম অগণন জীবনঝুঁকি ও প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে যাপিত জীবন কেটেছে তার।

ওয়ান-ইলেভেন-পরবর্তী দুই বছর আমি মাঝেমধ্যেই ঢাকা ও খুলনায় ডলিবু’র সঙ্গে দেখা করেছি। প্রসঙ্গক্রমে তিনি আমাকে বলেন : ‘এখন ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া অসুস্থ, তাই চুপচাপ। সে ভারতে মোরারজি দেশাইকে হাইকোর্ট দেখায় ছাড়া লোক।’ ইন্দিরা গান্ধীর শাসনাবসানের পর (১৯৭৭) মোরারজি দেশাই প্রধানমন্ত্রী হয়ে বিদ্বেষবশত তার পূর্বসূরির গৃহীত সিদ্ধান্তের প্রতি বৈরী হয়ে ভারতে কর্মরত বিদেশি বিজ্ঞানী ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়ার কর কর্তনের হিসাব তলব করেন। এর জবাবে ছোটখাটো আইনের প্রতিও বরাবরের শ্রদ্ধাশীল ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া তার প্রদত্ত যথাযথ করের বিপরীতে পাওয়া প্রত্যয়নপত্র সহকারে প্রতি উত্তর করেন।

একবার দেখা হল যখন তিনি সজনে ডাঁটা রান্না করছিলেন। গুলশান-১-এর ভাড়া বাড়িতে। সিঙ্গাপুর থেকে চিকিৎসা শেষ করে ফিরেছেন। সজনে ডাঁটার দিকে দেখিয়ে বললেন, সিঙ্গাপুরে দুই-তিনটির প্যাকেট বিক্রি হয় সে দেশীয় এক ডলার দামে। বিদেশে কৃষিপণ্য পাঠানোর ব্যবস্থা করা গেলে কত যে লাভ!

১৯৯৭ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম আমলে তার কাছে গল্প শুনেছি আমাদের প্রধানমন্ত্রী মাথার কাছে দু’তিনটি ফোন রেখে প্রায় জেগে রাত পার করেন। কখন-কোথায় কী অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। ... গঙ্গা-যমুনা নামে তখনকার লেটেস্ট শাড়ি তিনি পছন্দ করেন, পরিধান করেন।

তিনি খুলনার ষষ্ঠ ও সপ্তম দশকের ছাত্রনেতাদের অনেককেই চিনতেন। তাদের জন্য রাজনীতি ও সরকারে ভালো কিছু করা বা উজ্জ্বলভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করতেন।

১৯৯৪ সালে দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত প্রথম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে খুলনায় মাহাবুবুল আলম হিরণের মনোনয়ন লাভে তার অগ্রগণ্য ভূমিকা ছিল। দলীয় প্রতীকবিহীন সেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কেসিসির আওয়ামী লীগসমর্থিত মেয়র প্রার্থীর প্রতীক ছিল চেয়ার।

খুলনার শেরে বাংলা রোডের তাদের বাড়িতে ’৮৩ কী ’৮৪ সালে খুব কাছ থেকে আওয়ামী লীগ সভাপতিকে দেখার সুযোগ হয়। আমার মা কবি-সাংবাদিক আক্তার জাহান রুমার এক বছরের অগ্রজ-অগ্রজা ছিলেন শহীদ শেখ কামাল ও সুলতানা কামাল। তিনি ১৯৭৮ সালে তাদের নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন। ডলিবু’র সৌজন্য আমার মা নির্বাসন থেকে সদ্য দেশে ফেরা শেখ হাসিনাকে তাদের হারানোর কষ্ট ব্যক্ত ও সমব্যথী হওয়ার সুযোগও সেদিন হয়তো পেয়েছিলেন। ১৯৮৪ সালেই দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারে আমার মা’র মৃত্যু হয়।

ডলিবু’ দায়িত্বসচেতন ও শানিত কর্তব্যবোধসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। তার এক ফিকে হয়ে আসা সম্পর্কের আত্মীয়ার মৃত্যু হয় ২০০৬ সালে। পরিবারের কারও কারও বিরূপতা থাকলেও তিনি তার রুহের মাগফিরাত কামনায় মিলাদ-দোয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন সবকিছু অগ্রাহ্য করে। আমরা তো বর্তমান ও বিদ্যমান সম্পর্ক দ্বারাই প্রভাবিত হয়ে বেশিরভাগ কাজ করি। কেবল ঔচিত্যের বিবেচনায় অনেকটা ঝামেলাপূর্ণ উদ্যোগ নেই ক’জনা!

অষ্টম দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত আমার তেমন স্মৃতি নেই। এরপর থেকে আমাদের পরিবারের জন্য তার অবদানের উল্লেখ থেকে অপরাপর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অনুবর্তী পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধের ধারণা পাওয়া যাবে। আমার পিতা হুমায়ূন কবীর বালু ২০০৪ সালের ২৭ জুন বোমা হামলায় নিহত ও আমি আহত হই। ঢাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য আসার সংবাদ পেয়ে তিনি ছুটে আসেন। তখনও তার শারীরিক অবস্থা বার্ধক্যজনিত কারণে খুব বেশি বাইরে বের হওয়ার মতো নয়। ১৯৯৫ সালে আমার পিতার একটি রোড অ্যাক্সিডেন্ট হয়। তিনি একইভাবে তখনও দেখতে আসেন। ১৯৯৯ সালে সংবাদ প্রকাশ করায় একদল বিরূপ হয়ে আমাদের বাড়ি-অফিস ঘেরাও করে। অবরুদ্ধ করে রাখা হয় সবাইকে। তিনি ততদিনে ঢাকায় প্রায় স্থায়ী হয়ে গেছেন। ঢাকা থেকে ফোন করে খোঁজখবর নেন, সহানুভূতি প্রকাশ করেন। সাহস দেন আমার বাবাকে।

তিনি অত্যন্ত প্রখর রাজনৈতিকবোধসম্পন্ন, ইতিহাসবেত্তা, ব্যবস্থাপনা দক্ষ, আধুনিকমনস্ক মানুষ ছিলেন। অর্থনীতি ও সমসাময়িক বিষয়জ্ঞান ছিল প্রশংসনীয়। শেষ বয়সেও (আশি ঊর্ধ্ব) অনেক টেলিফোন ও মোবাইল নম্বর মুখস্থ রাখতে পারতেন। সাল-তারিখ স্মরণ রাখা ও স্মৃতিশক্তি ছিল দারুণ। তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা খুলনা থেকে ১৯৯৬ সালে চলে গিয়ে ঢাকায় স্থায়ী হন। তখন থেকে এ বছর পর্যন্ত সুধা সদন, গুলশান-১, ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে গুলশান-২, এরপর বনানীর সিতারা, জাতিসংঘ রোড, বারিধারায় যেখানে যেখানে থেকেছেন, সবখানেই তার সঙ্গে দেখা করতে গেছি। আমাদের এবং তাদের পরিবারের অনেক দুঃসময়ে, স্বস্তিদায়ক সময়েও। আওয়ামী লীগ ও দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনাকে যখন কঠিন বাস্তবতা অতিক্রমণ করতে হচ্ছে, তখনও তাকে দেখেছি আত্মবিশ্বাসী, আশাবাদী, পরিবর্তনের নিশ্চয়তায় প্রত্যয়ী। আরও পরে তার আত্মবিশ্বাসকেই জয়ী হতে দেখেছি।

তার কৃতজ্ঞতাবোধও প্রবল। পঁচাত্তর-পরবর্তী ক্রান্তিকালে যারাই পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদের প্রত্যেককে আমৃত্যু স্মরণ রেখেছেন। এ বোধ একইভাবে সঞ্চারিত হয়েছে তার সন্তানদের মাঝেও। কৃতজ্ঞতা স্বীকারের এ অনুপম গুণটির প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে বিষয়টির অনুল্লেখে তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ অসম্পূর্ণ থেকে যেত।

আমার মনে তার বিলাসবহুল নয়, অথচ রুচিশীল পরিপাটি খুলনার বাড়িটির ছবি অম্লান রয়ে গেছে। চীনা পোরসেলিনের পটারি, দেয়ালে অস্টিন গাড়ির বিবর্তন পরিক্রমার পেন্সিল স্কেচ ফ্রেম করা, প্রশস্ত বারান্দা, ফ্লোরে সাদা-কালো ডায়মন্ড কাট মোজাইক নকশা বত্রিশ নম্বরের বারান্দার অনুরূপ। ডলিবু’র বাড়িতে একাধিক সেন্টার টেবিলে শিল্পী রাশার তৈরি জাতির পিতার আবক্ষ ভাস্কর্য সাজানো ছিল। আর শোনা যেত বাইরে থেকে আসা পোষা রাজহাঁসের জোর আওয়াজ। মুরুব্বিরা বলতেন রাজরক্ত যাদের, তাদের কাছাকাছিই রাজহাঁস এত উচ্চকণ্ঠ হয়। আওয়ামী লীগ যখন রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে প্রায় অনতিক্রম্য দূরত্বে, তখন পাগলপরা সমর্থকরা এভাবেই নানা লৌকিকতায় মানসিক শক্তি পেয়েছেন।

আসিফ কবীর : জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির মিডিয়া স্পেশালিস্ট

স্মরণ

স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছেন তিনি

 আসিফ কবীর 
৩০ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শেখ রাজিয়া নাসের ১৬ নভেম্বর ইন্তেকাল করেছেন। তিনি আমার হোমটাউন খুলনার একজন অভিভাবক স্থানীয় মানুষ। আমার জীবনে বুঝতে শেখার পর থেকে প্রায় পৌনে চার দশকের স্মৃতি আছে তাকে ঘিরে। আমাদের কাছে পরিচিত ছিলেন ডলিবু’ নামে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের চরম দুঃসময়ে তিনি অভিভাবকের মতো অনেককে সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। সাহস, মনোবল ও আত্মবিশ্বাস গঠনে স্মর্তব্য ভূমিকা রেখেছেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরিবারের প্রায় সব সদস্যসহ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়। ১৫ আগস্টের কালরাতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে অবস্থানকালে ঘাতকের বুলেটে প্রাণপাত হয় রাজিয়া নাসেরের স্বামী বঙ্গবন্ধুর সহোদর শেখ আবু নাসেরের। রাজিয়া নাসের সে মুহূর্তে সন্তানসম্ভবা। জাতির পিতার পরিবার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি এ মরণঘাতী আঘাতে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েন ডলিবু’ ও তার সন্তানরা। তখন চলার মতো ব্যবস্থা নেই, প্রায় সবাই মুখ ফিরিয়ে থাকে, সন্তানদের স্কুলে পড়াশোনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। চরম সংকটের মাঝেও ভেঙে না পড়ে তিনি জীবন সংগ্রামে জয়ী হতে ব্রতী হয়েছেন। শুধু একা নয়, খুলনার বিপন্ন আওয়ামী লীগারদের জীবন সংগ্রামে উত্তীর্ণ করার দায়িত্ব নীরবে পালন করেছেন।

আমার আট-নয় বছর বয়সে তার কাছে শুনেছিলাম মুক্তিযোদ্ধা শেখ আবু নাসেরের ১৫ আগস্ট জাতির পিতার পরিবারের অপরাপর সদস্যদের সঙ্গে বত্রিশ নম্বর বাড়িতে শাহাদাতবরণের পূর্বাপর ঘটনাটি; যা সিনেমাটিক ঘটনার মতোই এক ট্র্যাজেডি। শেখ আবু নাসের ১৪ আগস্ট ১৯৭৫ যশোহর হয়ে খুলনা যাওয়ার জন্য তেজগাঁও বিমানবন্দরে চলে আসেন। বিমানে ওঠার অপেক্ষারত অবস্থায় বঙ্গবন্ধু খবর পাঠিয়ে তাকে আবার ফিরে আসতে বলেন আরও কয়েকদিন থেকে যাওয়ার জন্য। স্মৃতি থেকে যতটা মনে করতে পারি ঘটনাটি ছিল এমনই। ওই রাতেই ঘাতকরা হত্যাযজ্ঞ চালায় জাতির পিতার ঐতিহাসিক বাড়িতে।

বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) শেখ আমান হাসান ছিলেন ডলিবু’র জ্যেষ্ঠ সন্তান শেখ হেলাল উদ্দীন এমপি’র ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের ক্লাসমেট। তার কাছে শোনার সুযোগ হয়েছিল পঁচাত্তরের পনের আগস্ট শেখ হেলালের জন্য কেমন ছিল। ওইদিন সকালে প্রাতঃরাশের পর অন্যদিনের মতো ক্লাসে যাওয়ার জন্য একাডেমি ব্লকে না যেয়ে সব ক্যাডেটকে হাউসে পাঠানো হয়। এরপর ক্লাসে যাওয়ার ঘণ্টা আর বাজছিল না। ... ঢাকায় সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জের ধরে তৎকালীন মেডিকেল অফিসার দশম শ্রেণির বালক ক্যাডেট হেলালকে হত্যার চেষ্টা হয়, যা প্রিন্সিপল ক্যাপ্টেন (অব.) করিমুদ্দিন আহমেদের কঠোর হস্তক্ষেপে ঘটতে পারেনি। পনের-ষোল বছরের একজন শিশুকে হত্যার ইচ্ছা দশ বছরের শিশু শেখ রাসেলের বুক বুলেটে বিদীর্ণ হওয়ারই ধারাবাহিকতা ছিল। যশোরে অবস্থানকারী ঘাতক চক্রের দোসরদের পক্ষ থেকেও ফোনে চাপ দেয়া হয় ক্যাডেট হেলালকে তাদের হাতে তুলে দেয়ার জন্য। অধ্যক্ষ করিমুদ্দিন সেদিন দৃঢ়ভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন, আমি সব ছাত্রের কাস্টোডিয়ান। এ অন্যায় আমি কিছুতেই বরদাশত করব না। রক্ষা পান শেখ হেলাল। ডলিবু’র পরিবারের ১৯৭৫-পরবর্তী বৈরী অবস্থায় জীবন সংগ্রামের অনেক ঘটনার একটি মাত্র হল ক্যাডেট শেখ হেলালকে হত্যাচেষ্টা। এ রকম অগণন জীবনঝুঁকি ও প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে যাপিত জীবন কেটেছে তার।

ওয়ান-ইলেভেন-পরবর্তী দুই বছর আমি মাঝেমধ্যেই ঢাকা ও খুলনায় ডলিবু’র সঙ্গে দেখা করেছি। প্রসঙ্গক্রমে তিনি আমাকে বলেন : ‘এখন ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া অসুস্থ, তাই চুপচাপ। সে ভারতে মোরারজি দেশাইকে হাইকোর্ট দেখায় ছাড়া লোক।’ ইন্দিরা গান্ধীর শাসনাবসানের পর (১৯৭৭) মোরারজি দেশাই প্রধানমন্ত্রী হয়ে বিদ্বেষবশত তার পূর্বসূরির গৃহীত সিদ্ধান্তের প্রতি বৈরী হয়ে ভারতে কর্মরত বিদেশি বিজ্ঞানী ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়ার কর কর্তনের হিসাব তলব করেন। এর জবাবে ছোটখাটো আইনের প্রতিও বরাবরের শ্রদ্ধাশীল ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া তার প্রদত্ত যথাযথ করের বিপরীতে পাওয়া প্রত্যয়নপত্র সহকারে প্রতি উত্তর করেন।

একবার দেখা হল যখন তিনি সজনে ডাঁটা রান্না করছিলেন। গুলশান-১-এর ভাড়া বাড়িতে। সিঙ্গাপুর থেকে চিকিৎসা শেষ করে ফিরেছেন। সজনে ডাঁটার দিকে দেখিয়ে বললেন, সিঙ্গাপুরে দুই-তিনটির প্যাকেট বিক্রি হয় সে দেশীয় এক ডলার দামে। বিদেশে কৃষিপণ্য পাঠানোর ব্যবস্থা করা গেলে কত যে লাভ!

১৯৯৭ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম আমলে তার কাছে গল্প শুনেছি আমাদের প্রধানমন্ত্রী মাথার কাছে দু’তিনটি ফোন রেখে প্রায় জেগে রাত পার করেন। কখন-কোথায় কী অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। ... গঙ্গা-যমুনা নামে তখনকার লেটেস্ট শাড়ি তিনি পছন্দ করেন, পরিধান করেন।

তিনি খুলনার ষষ্ঠ ও সপ্তম দশকের ছাত্রনেতাদের অনেককেই চিনতেন। তাদের জন্য রাজনীতি ও সরকারে ভালো কিছু করা বা উজ্জ্বলভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করতেন।

১৯৯৪ সালে দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত প্রথম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে খুলনায় মাহাবুবুল আলম হিরণের মনোনয়ন লাভে তার অগ্রগণ্য ভূমিকা ছিল। দলীয় প্রতীকবিহীন সেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কেসিসির আওয়ামী লীগসমর্থিত মেয়র প্রার্থীর প্রতীক ছিল চেয়ার।

খুলনার শেরে বাংলা রোডের তাদের বাড়িতে ’৮৩ কী ’৮৪ সালে খুব কাছ থেকে আওয়ামী লীগ সভাপতিকে দেখার সুযোগ হয়। আমার মা কবি-সাংবাদিক আক্তার জাহান রুমার এক বছরের অগ্রজ-অগ্রজা ছিলেন শহীদ শেখ কামাল ও সুলতানা কামাল। তিনি ১৯৭৮ সালে তাদের নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন। ডলিবু’র সৌজন্য আমার মা নির্বাসন থেকে সদ্য দেশে ফেরা শেখ হাসিনাকে তাদের হারানোর কষ্ট ব্যক্ত ও সমব্যথী হওয়ার সুযোগও সেদিন হয়তো পেয়েছিলেন। ১৯৮৪ সালেই দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারে আমার মা’র মৃত্যু হয়।

ডলিবু’ দায়িত্বসচেতন ও শানিত কর্তব্যবোধসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। তার এক ফিকে হয়ে আসা সম্পর্কের আত্মীয়ার মৃত্যু হয় ২০০৬ সালে। পরিবারের কারও কারও বিরূপতা থাকলেও তিনি তার রুহের মাগফিরাত কামনায় মিলাদ-দোয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন সবকিছু অগ্রাহ্য করে। আমরা তো বর্তমান ও বিদ্যমান সম্পর্ক দ্বারাই প্রভাবিত হয়ে বেশিরভাগ কাজ করি। কেবল ঔচিত্যের বিবেচনায় অনেকটা ঝামেলাপূর্ণ উদ্যোগ নেই ক’জনা!

অষ্টম দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত আমার তেমন স্মৃতি নেই। এরপর থেকে আমাদের পরিবারের জন্য তার অবদানের উল্লেখ থেকে অপরাপর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অনুবর্তী পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধের ধারণা পাওয়া যাবে। আমার পিতা হুমায়ূন কবীর বালু ২০০৪ সালের ২৭ জুন বোমা হামলায় নিহত ও আমি আহত হই। ঢাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য আসার সংবাদ পেয়ে তিনি ছুটে আসেন। তখনও তার শারীরিক অবস্থা বার্ধক্যজনিত কারণে খুব বেশি বাইরে বের হওয়ার মতো নয়। ১৯৯৫ সালে আমার পিতার একটি রোড অ্যাক্সিডেন্ট হয়। তিনি একইভাবে তখনও দেখতে আসেন। ১৯৯৯ সালে সংবাদ প্রকাশ করায় একদল বিরূপ হয়ে আমাদের বাড়ি-অফিস ঘেরাও করে। অবরুদ্ধ করে রাখা হয় সবাইকে। তিনি ততদিনে ঢাকায় প্রায় স্থায়ী হয়ে গেছেন। ঢাকা থেকে ফোন করে খোঁজখবর নেন, সহানুভূতি প্রকাশ করেন। সাহস দেন আমার বাবাকে।

তিনি অত্যন্ত প্রখর রাজনৈতিকবোধসম্পন্ন, ইতিহাসবেত্তা, ব্যবস্থাপনা দক্ষ, আধুনিকমনস্ক মানুষ ছিলেন। অর্থনীতি ও সমসাময়িক বিষয়জ্ঞান ছিল প্রশংসনীয়। শেষ বয়সেও (আশি ঊর্ধ্ব) অনেক টেলিফোন ও মোবাইল নম্বর মুখস্থ রাখতে পারতেন। সাল-তারিখ স্মরণ রাখা ও স্মৃতিশক্তি ছিল দারুণ। তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা খুলনা থেকে ১৯৯৬ সালে চলে গিয়ে ঢাকায় স্থায়ী হন। তখন থেকে এ বছর পর্যন্ত সুধা সদন, গুলশান-১, ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে গুলশান-২, এরপর বনানীর সিতারা, জাতিসংঘ রোড, বারিধারায় যেখানে যেখানে থেকেছেন, সবখানেই তার সঙ্গে দেখা করতে গেছি। আমাদের এবং তাদের পরিবারের অনেক দুঃসময়ে, স্বস্তিদায়ক সময়েও। আওয়ামী লীগ ও দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনাকে যখন কঠিন বাস্তবতা অতিক্রমণ করতে হচ্ছে, তখনও তাকে দেখেছি আত্মবিশ্বাসী, আশাবাদী, পরিবর্তনের নিশ্চয়তায় প্রত্যয়ী। আরও পরে তার আত্মবিশ্বাসকেই জয়ী হতে দেখেছি।

তার কৃতজ্ঞতাবোধও প্রবল। পঁচাত্তর-পরবর্তী ক্রান্তিকালে যারাই পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদের প্রত্যেককে আমৃত্যু স্মরণ রেখেছেন। এ বোধ একইভাবে সঞ্চারিত হয়েছে তার সন্তানদের মাঝেও। কৃতজ্ঞতা স্বীকারের এ অনুপম গুণটির প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে বিষয়টির অনুল্লেখে তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ অসম্পূর্ণ থেকে যেত।

আমার মনে তার বিলাসবহুল নয়, অথচ রুচিশীল পরিপাটি খুলনার বাড়িটির ছবি অম্লান রয়ে গেছে। চীনা পোরসেলিনের পটারি, দেয়ালে অস্টিন গাড়ির বিবর্তন পরিক্রমার পেন্সিল স্কেচ ফ্রেম করা, প্রশস্ত বারান্দা, ফ্লোরে সাদা-কালো ডায়মন্ড কাট মোজাইক নকশা বত্রিশ নম্বরের বারান্দার অনুরূপ। ডলিবু’র বাড়িতে একাধিক সেন্টার টেবিলে শিল্পী রাশার তৈরি জাতির পিতার আবক্ষ ভাস্কর্য সাজানো ছিল। আর শোনা যেত বাইরে থেকে আসা পোষা রাজহাঁসের জোর আওয়াজ। মুরুব্বিরা বলতেন রাজরক্ত যাদের, তাদের কাছাকাছিই রাজহাঁস এত উচ্চকণ্ঠ হয়। আওয়ামী লীগ যখন রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে প্রায় অনতিক্রম্য দূরত্বে, তখন পাগলপরা সমর্থকরা এভাবেই নানা লৌকিকতায় মানসিক শক্তি পেয়েছেন।

আসিফ কবীর : জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির মিডিয়া স্পেশালিস্ট