জাপানে করোনার চেয়ে আত্মহত্যায় মৃত্যু বেশি!
jugantor
শতফুল ফুটতে দাও
জাপানে করোনার চেয়ে আত্মহত্যায় মৃত্যু বেশি!

  ড. মাহবুব উল্লাহ্  

০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষ তার জীবনকে ভালোবাসে। পৃথিবীর মায়া সে ত্যাগ করতে চায় না। সে কারণেই হয়তো রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে।’ জীবনকে একটু সুখকর করার জন্য মানুষ তার আয় বাড়াতে চায়। সে আত্মীয়স্বজন, প্রিয়জন ও বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে জীবনের অর্থ খুঁজে পায়।

পৃথিবীতে এখন সব কিছুকে অর্থ মূল্যে বিচার করা হয়। যেসব জিনিস টাকার বিনিময়ে বিক্রি হয় তাকে বলা হয় পণ্য (Commodity)। অবাক বিস্ময়ের ব্যাপার হল, জীবনের বহুমুখী আকর্ষণ সত্ত্বেও কিছু মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। ধর্মে আত্মহত্যাকে মহাপাপ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। সম্ভবত এ কারণে যে, মানুষ মানুষকে সৃষ্টি করেনি।

মানুষকে সৃষ্টি করেছেন সৃষ্টিকর্তা। যেহেতু মানুষ সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির মতো আরেকটি জীবন্ত মানুষ সৃষ্টি করতে পারবে না, সেহেতু একদিকে যেমন নরহত্যা মহাপাপ, অন্যদিকে আত্মহত্যাকেও মহাপাপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

জাপানে গত অক্টোবরে আত্মহত্যা করেছেন ২ হাজার ১৫৩ জন। আর করোনায় গত শুক্রবার পর্যন্ত মারা গেছেন ২ হাজার ৮৭ জন। স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে, করোনার থাবায় যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে তার চেয়ে মানুষ নিজে তার জীবনের সমাপ্তি ঘটিয়েছে আরও বেশি। জাপান একটি উন্নত দেশ। ভদ্রতা ও শিষ্টাচারে জাপানি নাগরিকরা বিশ্ব সমাজে ঈর্ষণীয় প্রশংসা অর্জন করেছে।

সামষ্টিক পর্যায়ে বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আণবিক বোমার বিস্ফোরণে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু সত্ত্বেও জাপান আবার উঠে দাঁড়িয়েছে। এ দাঁড়ানো যেনতেন দাঁড়ানো নয়। প্রযুক্তি ও শিল্পের ক্ষেত্রে জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে সবচেয়ে উন্নত এশীয় রাষ্ট্রের মর্যাদা অর্জন করেছে। জাপান একটি রাজতান্ত্রিক দেশ।

রাজাকে জাপানি জনগণ দেবতুল্য মনে করে। এ রাজা এমন যে তিনি খুব একটা জনসম্মুখে আসেন না। আমি সম্রাট হিরোহিতোর কথা বলছি। তিনি দীর্ঘজীবী ছিলেন। হিরাশিমা ও নাগাসাকিতে আণবিক বোমার ধ্বংসযজ্ঞ ঘটার পরপরই জাপান বেতার থেকে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেন। আত্মসমর্পণের পর জাপানের ইতিহাস নতুন বাঁকের মধ্যে গিয়ে পড়ল। এখন জাপানে যে সংবিধান কার্যকর, সেটির খসড়া প্রণয়ন করেছিলেন একজন মার্কিন জেনারেল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অগ্রাভিযানে চীনের বিরাট অংশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উল্লেখযোগ্য অংশ জাপান দখল করতে সক্ষম হয়। জাপানি বোমারু বিমানগুলো কলকাতা ও চট্টগ্রামে বোমাবর্ষণ করে। এ পরিস্থিতিতে ভারতবর্ষের ঔপনিবেশিক শাসকরা জাপানের অগ্রাভিযান প্রতিহত করার জন্য এমন সব ব্যবস্থা গ্রহণ করল যার ফলে বঙ্গদেশের ৩৫ লাখ লোক দুর্ভিক্ষে মৃত্যুবরণ করল।

ব্রিটিশ সরকার বঙ্গদেশের নদ-নদীগুলোতে পরিবহনের মাধ্যম নৌকাগুলো ডুবিয়ে দিল। জাপানি সৈন্যরা যাতে নৌকা ব্যবহার করে বঙ্গদেশ দখলে না নিতে পারে সে জন্যই এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। এ অবস্থার ফলে বঙ্গদেশের ভেতরে খাদ্যশস্য পরিবহন অসম্ভব হয়ে পড়ল। উদ্বৃত্ত অঞ্চলের খাদ্যশস্য ঘাটতি এলাকায় যেতে পারছিল না। কলকাতার মতো শহরেও দারুণ খাদ্য ঘাটতি হয়েছিল।

এ ছাড়া জাপানি সৈন্যরা যাতে খাদ্যশস্য না পায় তার জন্য সরকারিভাবে কৃষকদের কাছ থেকে খাদ্যশস্য সংগ্রহ করে দখলে নেয়া হয়েছিল। প্রধানত এ দুটি কারণে ১৯৪৩-এর মন্বন্তর অবধারিত হয়ে পড়ে। খাদ্যাভাবে দরিদ্র মানুষ মৃত্যুবরণ করে। খাদ্যশস্যের মূল্য দরিদ্র মানুষের ক্রয় সীমানার বাইরে চলে যায়। অনেকে মনে করেন, মানুষ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রতিরোধের পথে হাঁটার চিন্তা করে। কিন্তু এ ধারণা সত্য নয়।

চক্ষু কোটরাগত, হাড় জিরজিরে মানুষের পক্ষে আন্দোলন করা সম্ভব হয় না। বিপ্লব বলি, আন্দোলন বলি কিংবা প্রতিরোধ বলি এগুলো সম্ভব হয় আপেক্ষিকভাবে অর্থনৈতিক অবস্থা সাধারণ মানুষের জন্য সহনীয় থাকলে।

শুরুতেই বলা হয়েছে, এক মাসে যতসংখ্যক জাপানি নাগরিক আত্মহত্যা করেছে তার তুলনায় কয়েক মাসব্যাপী করোনা সংক্রমণ অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও তার সংখ্যা অনেক কম। জাপানের মতো দেশে যেখানে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত সেখানে কেন আত্মহত্যার মতো দুঃখজনক ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশের একটি পত্রিকায় কেস স্টাডির মাধ্যমে এর ব্যাখ্যা খোঁজা হয়েছে।

এরিকো কোবায়শি নামের এক জাপানি নারী ৪ বার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। প্রথমবার চেষ্টা করেছিলেন ২২ বছর বয়সে। ওই সময় তিনি রাজধানী টোকিওর একটি প্রকাশনা সংস্থায় চাকরি করতেন। কিন্তু যে বেতন তিনি পেতেন তাতে তিনি তার সব খরচ মেটাতে পারছিলেন না। ফলে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। এর ফলে তাকে হাসপাতালে তিন দিন অবচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে হয়।

কোবায়শির বয়স এখন ৪৩ বছর, সে সময়কার পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেন, ‘আমি তখন বেশ দরিদ্র ছিলাম।’ জীবনে চারবার আত্মহত্যার চেষ্টা এবং মানসিক অবস্থা নিয়ে তিনি একটি বইও লিখেছেন। এখানেই হল জাপানিদের শ্রেষ্ঠত্ব। চরম অর্থ কষ্টের মধ্যেও জীবনের রূপ কেমন হতে পারে তার ছবি তিনি এঁকেছেন এ বইটিতে। পরবর্তীকালে তার আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটে। একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় থিতু হন।

কিন্তু করোনা মহামারী তাকে আগের অবস্থায় নিয়ে গেছে। তাকে নিয়োগকারী সংস্থা তার বেতন কমিয়ে দিয়েছে। তিনি কোনো আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন না। সামনে শুধু সংকটই দেখতে পাচ্ছেন। হয়তো আবার আগের দশা হবে।

সিএনএনের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, জাপানে কোবায়শির মতো অবস্থা অনেকেরই। ফলে দেশটিতে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে। এ করোনাকালে যত মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে তার তুলনায় মাত্র এক মাসে আরও বেশি মানুষ নিজেই নিজের জীবনের অবসান ঘটিয়েছেন।

রোগের মহামারীতে কেবল শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে না, মানসিক স্বাস্থ্য সংকটও সৃষ্টি হয়। করোনা মহামারীর ফলে বিশ্বজুড়ে বেকারের সংখ্যা এবং মানসিক অসুস্থতা বেড়েছে। জাপানে বেড়েছে আত্মহত্যা। করোনার জন্য বিশ্বজুড়ে যা ঘটেছে জাপানেও অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে। জাপানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত তথ্যে এ ব্যাপারে জানা যায়।

দেশ ও সমাজের অবস্থা সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে বিশ্বের সব দেশের অগ্রাধিকার এক রকম নয়। জাপানে আত্মহত্যার তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হয়। আমাদের বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে আত্মহত্যার তথ্য প্রকাশ করা হয় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আত্মহত্যার তথ্য প্রকাশ করা হয় বেশ বিলম্বে। যুক্তরাষ্ট্রে এ সংক্রান্ত তথ্য সর্বশেষ ২০১৮ সালে প্রকাশ করা হয়েছিল।

জাপানের টোকিওর ওয়াসেদা ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক মিচিকো উয়েদা আত্মহত্যা নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি জানিয়েছেন, অন্যান্য দেশের তুলনায় জাপানে করোনার প্রভাব কম পড়েছে। এরপরও এখানে আত্মহত্যার সংখ্যা বাড়ছেই।

জাপানে আত্মহত্যার কারণগুলো বেশ জটিল। সেখানে মানসিক চাপ বাড়ার কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা অন্যতম। জাপানের মতো উন্নত পুঁজিবাদী দেশে যখন মানুষকে বেশি সময় ধরে কাজ করতে হয়, তখন বুঝতে হবে হয় সেখানে কাজ করার মানুষের ঘাটতি আছে, অথবা পুঁজিপতিরা দীর্ঘ সময় কাজ করাতে বাধ্য করে যাতে মুনাফা বেশি হয়।

বেশি সময় ধরে শ্রমজীবীদের কাজ করার কারণ জাপানের জনমিতিক (Demographic) কাঠামোর মধ্যে নিহিত। জাপানের জনসংখ্যা কাঠামোতে বিশাল পরিবর্তন এসেছে। সেখানে বয়োবৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেছে। এ জনগোষ্ঠী কাজ করতে সক্ষম নয়, কিন্তু তাদের বেঁচে থাকার আয়োজনে অনেক অর্থ ব্যয় হয়। অন্যদিকে কাজ করতে সক্ষম বয়সের মানুষের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কমে গেছে।

জাপানে বয়োবৃদ্ধ লোকদের বাঁচিয়ে রাখতে অনেক অর্থ ব্যয় হয়। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সঙ্গত কারণেই এরা জাপানের অর্থনীতিতে কোনো অবদান রাখতে পারে না। জাপানে বৃদ্ধাশ্রমের ব্যাপক ব্যাপ্তির সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হওয়ার পেছনে দীর্ঘ সময় কাজ করার বাধ্যবাধকতা খুবই ক্রিয়াশীল। দীর্ঘ সময় কাজ করার পর আত্মীয়স্বজনের খোঁজ রাখার ফুরসত মিলে না। করোনা মহামারী প্রতিরোধের লক্ষ্যে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে বলা হচ্ছে।

জাপানের জনমিতিক বিন্যাস স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সামাজিক বিচ্ছিন্নতার অবস্থা সৃষ্টি করেছে। সে কারণে হয়তো করোনায় অনেক মানুষ সংক্রমিত হয়নি। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার অবস্থা জাপানের অনুরূপ নয়। এ অঞ্চলে তরুণদের সংখ্যা বৃদ্ধদের তুলনায় অনেক বেশি। করোনাকালে বহুবিধ কর্মকাণ্ডে শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে। কোনো কোনো কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

ঢাকা শহর ছেড়ে অনেকে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে। বাংলাদেশে গ্রামের সঙ্গে শহর-নগরের বিচ্ছিন্নতা খুব একটা বৃদ্ধি পায়নি। এখনও এখানে শহরের অভিবাসনকারীরা গ্রামে ফিরে গিয়ে আপনজনদের সঙ্গে জীবনসামগ্রী ভাগ করে ভোগ করতে পারে। কাঠামোগতভাবে এটাই বাংলাদেশের সৌন্দর্য। তবে বাংলাদেশে চিরকাল এ রকম অবস্থা থাকবে না। তার জন্য যে প্রস্তুতির দরকার তা হচ্ছে না। কিন্তু সোশ্যাল ডিনামিকস থেমে থাকবে না।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

শতফুল ফুটতে দাও

জাপানে করোনার চেয়ে আত্মহত্যায় মৃত্যু বেশি!

 ড. মাহবুব উল্লাহ্ 
০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষ তার জীবনকে ভালোবাসে। পৃথিবীর মায়া সে ত্যাগ করতে চায় না। সে কারণেই হয়তো রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে।’ জীবনকে একটু সুখকর করার জন্য মানুষ তার আয় বাড়াতে চায়। সে আত্মীয়স্বজন, প্রিয়জন ও বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে জীবনের অর্থ খুঁজে পায়।

পৃথিবীতে এখন সব কিছুকে অর্থ মূল্যে বিচার করা হয়। যেসব জিনিস টাকার বিনিময়ে বিক্রি হয় তাকে বলা হয় পণ্য (Commodity)। অবাক বিস্ময়ের ব্যাপার হল, জীবনের বহুমুখী আকর্ষণ সত্ত্বেও কিছু মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। ধর্মে আত্মহত্যাকে মহাপাপ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। সম্ভবত এ কারণে যে, মানুষ মানুষকে সৃষ্টি করেনি।

মানুষকে সৃষ্টি করেছেন সৃষ্টিকর্তা। যেহেতু মানুষ সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির মতো আরেকটি জীবন্ত মানুষ সৃষ্টি করতে পারবে না, সেহেতু একদিকে যেমন নরহত্যা মহাপাপ, অন্যদিকে আত্মহত্যাকেও মহাপাপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

জাপানে গত অক্টোবরে আত্মহত্যা করেছেন ২ হাজার ১৫৩ জন। আর করোনায় গত শুক্রবার পর্যন্ত মারা গেছেন ২ হাজার ৮৭ জন। স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে, করোনার থাবায় যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে তার চেয়ে মানুষ নিজে তার জীবনের সমাপ্তি ঘটিয়েছে আরও বেশি। জাপান একটি উন্নত দেশ। ভদ্রতা ও শিষ্টাচারে জাপানি নাগরিকরা বিশ্ব সমাজে ঈর্ষণীয় প্রশংসা অর্জন করেছে।

সামষ্টিক পর্যায়ে বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আণবিক বোমার বিস্ফোরণে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু সত্ত্বেও জাপান আবার উঠে দাঁড়িয়েছে। এ দাঁড়ানো যেনতেন দাঁড়ানো নয়। প্রযুক্তি ও শিল্পের ক্ষেত্রে জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে সবচেয়ে উন্নত এশীয় রাষ্ট্রের মর্যাদা অর্জন করেছে। জাপান একটি রাজতান্ত্রিক দেশ।

রাজাকে জাপানি জনগণ দেবতুল্য মনে করে। এ রাজা এমন যে তিনি খুব একটা জনসম্মুখে আসেন না। আমি সম্রাট হিরোহিতোর কথা বলছি। তিনি দীর্ঘজীবী ছিলেন। হিরাশিমা ও নাগাসাকিতে আণবিক বোমার ধ্বংসযজ্ঞ ঘটার পরপরই জাপান বেতার থেকে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেন। আত্মসমর্পণের পর জাপানের ইতিহাস নতুন বাঁকের মধ্যে গিয়ে পড়ল। এখন জাপানে যে সংবিধান কার্যকর, সেটির খসড়া প্রণয়ন করেছিলেন একজন মার্কিন জেনারেল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অগ্রাভিযানে চীনের বিরাট অংশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উল্লেখযোগ্য অংশ জাপান দখল করতে সক্ষম হয়। জাপানি বোমারু বিমানগুলো কলকাতা ও চট্টগ্রামে বোমাবর্ষণ করে। এ পরিস্থিতিতে ভারতবর্ষের ঔপনিবেশিক শাসকরা জাপানের অগ্রাভিযান প্রতিহত করার জন্য এমন সব ব্যবস্থা গ্রহণ করল যার ফলে বঙ্গদেশের ৩৫ লাখ লোক দুর্ভিক্ষে মৃত্যুবরণ করল।

ব্রিটিশ সরকার বঙ্গদেশের নদ-নদীগুলোতে পরিবহনের মাধ্যম নৌকাগুলো ডুবিয়ে দিল। জাপানি সৈন্যরা যাতে নৌকা ব্যবহার করে বঙ্গদেশ দখলে না নিতে পারে সে জন্যই এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। এ অবস্থার ফলে বঙ্গদেশের ভেতরে খাদ্যশস্য পরিবহন অসম্ভব হয়ে পড়ল। উদ্বৃত্ত অঞ্চলের খাদ্যশস্য ঘাটতি এলাকায় যেতে পারছিল না। কলকাতার মতো শহরেও দারুণ খাদ্য ঘাটতি হয়েছিল।

এ ছাড়া জাপানি সৈন্যরা যাতে খাদ্যশস্য না পায় তার জন্য সরকারিভাবে কৃষকদের কাছ থেকে খাদ্যশস্য সংগ্রহ করে দখলে নেয়া হয়েছিল। প্রধানত এ দুটি কারণে ১৯৪৩-এর মন্বন্তর অবধারিত হয়ে পড়ে। খাদ্যাভাবে দরিদ্র মানুষ মৃত্যুবরণ করে। খাদ্যশস্যের মূল্য দরিদ্র মানুষের ক্রয় সীমানার বাইরে চলে যায়। অনেকে মনে করেন, মানুষ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রতিরোধের পথে হাঁটার চিন্তা করে। কিন্তু এ ধারণা সত্য নয়।

চক্ষু কোটরাগত, হাড় জিরজিরে মানুষের পক্ষে আন্দোলন করা সম্ভব হয় না। বিপ্লব বলি, আন্দোলন বলি কিংবা প্রতিরোধ বলি এগুলো সম্ভব হয় আপেক্ষিকভাবে অর্থনৈতিক অবস্থা সাধারণ মানুষের জন্য সহনীয় থাকলে।

শুরুতেই বলা হয়েছে, এক মাসে যতসংখ্যক জাপানি নাগরিক আত্মহত্যা করেছে তার তুলনায় কয়েক মাসব্যাপী করোনা সংক্রমণ অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও তার সংখ্যা অনেক কম। জাপানের মতো দেশে যেখানে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত সেখানে কেন আত্মহত্যার মতো দুঃখজনক ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশের একটি পত্রিকায় কেস স্টাডির মাধ্যমে এর ব্যাখ্যা খোঁজা হয়েছে।

এরিকো কোবায়শি নামের এক জাপানি নারী ৪ বার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। প্রথমবার চেষ্টা করেছিলেন ২২ বছর বয়সে। ওই সময় তিনি রাজধানী টোকিওর একটি প্রকাশনা সংস্থায় চাকরি করতেন। কিন্তু যে বেতন তিনি পেতেন তাতে তিনি তার সব খরচ মেটাতে পারছিলেন না। ফলে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। এর ফলে তাকে হাসপাতালে তিন দিন অবচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে হয়।

কোবায়শির বয়স এখন ৪৩ বছর, সে সময়কার পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেন, ‘আমি তখন বেশ দরিদ্র ছিলাম।’ জীবনে চারবার আত্মহত্যার চেষ্টা এবং মানসিক অবস্থা নিয়ে তিনি একটি বইও লিখেছেন। এখানেই হল জাপানিদের শ্রেষ্ঠত্ব। চরম অর্থ কষ্টের মধ্যেও জীবনের রূপ কেমন হতে পারে তার ছবি তিনি এঁকেছেন এ বইটিতে। পরবর্তীকালে তার আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটে। একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় থিতু হন।

কিন্তু করোনা মহামারী তাকে আগের অবস্থায় নিয়ে গেছে। তাকে নিয়োগকারী সংস্থা তার বেতন কমিয়ে দিয়েছে। তিনি কোনো আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন না। সামনে শুধু সংকটই দেখতে পাচ্ছেন। হয়তো আবার আগের দশা হবে।

সিএনএনের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, জাপানে কোবায়শির মতো অবস্থা অনেকেরই। ফলে দেশটিতে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে। এ করোনাকালে যত মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে তার তুলনায় মাত্র এক মাসে আরও বেশি মানুষ নিজেই নিজের জীবনের অবসান ঘটিয়েছেন।

রোগের মহামারীতে কেবল শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে না, মানসিক স্বাস্থ্য সংকটও সৃষ্টি হয়। করোনা মহামারীর ফলে বিশ্বজুড়ে বেকারের সংখ্যা এবং মানসিক অসুস্থতা বেড়েছে। জাপানে বেড়েছে আত্মহত্যা। করোনার জন্য বিশ্বজুড়ে যা ঘটেছে জাপানেও অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে। জাপানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত তথ্যে এ ব্যাপারে জানা যায়।

দেশ ও সমাজের অবস্থা সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে বিশ্বের সব দেশের অগ্রাধিকার এক রকম নয়। জাপানে আত্মহত্যার তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হয়। আমাদের বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে আত্মহত্যার তথ্য প্রকাশ করা হয় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আত্মহত্যার তথ্য প্রকাশ করা হয় বেশ বিলম্বে। যুক্তরাষ্ট্রে এ সংক্রান্ত তথ্য সর্বশেষ ২০১৮ সালে প্রকাশ করা হয়েছিল।

জাপানের টোকিওর ওয়াসেদা ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক মিচিকো উয়েদা আত্মহত্যা নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি জানিয়েছেন, অন্যান্য দেশের তুলনায় জাপানে করোনার প্রভাব কম পড়েছে। এরপরও এখানে আত্মহত্যার সংখ্যা বাড়ছেই।

জাপানে আত্মহত্যার কারণগুলো বেশ জটিল। সেখানে মানসিক চাপ বাড়ার কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা অন্যতম। জাপানের মতো উন্নত পুঁজিবাদী দেশে যখন মানুষকে বেশি সময় ধরে কাজ করতে হয়, তখন বুঝতে হবে হয় সেখানে কাজ করার মানুষের ঘাটতি আছে, অথবা পুঁজিপতিরা দীর্ঘ সময় কাজ করাতে বাধ্য করে যাতে মুনাফা বেশি হয়।

বেশি সময় ধরে শ্রমজীবীদের কাজ করার কারণ জাপানের জনমিতিক (Demographic) কাঠামোর মধ্যে নিহিত। জাপানের জনসংখ্যা কাঠামোতে বিশাল পরিবর্তন এসেছে। সেখানে বয়োবৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেছে। এ জনগোষ্ঠী কাজ করতে সক্ষম নয়, কিন্তু তাদের বেঁচে থাকার আয়োজনে অনেক অর্থ ব্যয় হয়। অন্যদিকে কাজ করতে সক্ষম বয়সের মানুষের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কমে গেছে।

জাপানে বয়োবৃদ্ধ লোকদের বাঁচিয়ে রাখতে অনেক অর্থ ব্যয় হয়। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সঙ্গত কারণেই এরা জাপানের অর্থনীতিতে কোনো অবদান রাখতে পারে না। জাপানে বৃদ্ধাশ্রমের ব্যাপক ব্যাপ্তির সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হওয়ার পেছনে দীর্ঘ সময় কাজ করার বাধ্যবাধকতা খুবই ক্রিয়াশীল। দীর্ঘ সময় কাজ করার পর আত্মীয়স্বজনের খোঁজ রাখার ফুরসত মিলে না। করোনা মহামারী প্রতিরোধের লক্ষ্যে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে বলা হচ্ছে।

জাপানের জনমিতিক বিন্যাস স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সামাজিক বিচ্ছিন্নতার অবস্থা সৃষ্টি করেছে। সে কারণে হয়তো করোনায় অনেক মানুষ সংক্রমিত হয়নি। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার অবস্থা জাপানের অনুরূপ নয়। এ অঞ্চলে তরুণদের সংখ্যা বৃদ্ধদের তুলনায় অনেক বেশি। করোনাকালে বহুবিধ কর্মকাণ্ডে শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে। কোনো কোনো কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

ঢাকা শহর ছেড়ে অনেকে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে। বাংলাদেশে গ্রামের সঙ্গে শহর-নগরের বিচ্ছিন্নতা খুব একটা বৃদ্ধি পায়নি। এখনও এখানে শহরের অভিবাসনকারীরা গ্রামে ফিরে গিয়ে আপনজনদের সঙ্গে জীবনসামগ্রী ভাগ করে ভোগ করতে পারে। কাঠামোগতভাবে এটাই বাংলাদেশের সৌন্দর্য। তবে বাংলাদেশে চিরকাল এ রকম অবস্থা থাকবে না। তার জন্য যে প্রস্তুতির দরকার তা হচ্ছে না। কিন্তু সোশ্যাল ডিনামিকস থেমে থাকবে না।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ