চিন্তার শক্তিতে বদলে যাক মানুষ
jugantor
চিন্তার শক্তিতে বদলে যাক মানুষ

  ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী  

০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষকে নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে; এখনও হচ্ছে। এ পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফল থেকে মানুষের স্বরূপ বের করার প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। যদিও কাজটা অনেক জটিল। কারণ একজন মানুষ আরেকজন থেকে ভিন্ন ধাঁচের।

এ ভিন্নতা মানুষের ব্যক্তিত্বের মধ্যেও ভিন্নতা তৈরি করে। এর ফলে সব মানুষ একইভাবে ভাবতে পারে না। চিন্তার গুণগত মানও একই স্তরের হয় না। আবার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তারও পরিবর্তন ঘটে।

অনেকের কাছে চাকাকে একটি সাধারণ বিষয় মনে হতে পারে। কিন্তু চাকা আবিষ্কার পৃথিবীর যুগান্তকারী সৃষ্টিগুলোর অন্যতম। মানুষের মন্থর জীবনকে গতিশীল করার মাধ্যমে সভ্যতাকে এগিয়ে নিতে চাকা টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করেছে। মানুষের ছোট ছোট ভাবনা থেকেই চাকা আবিষ্কারের ধারণা এসেছে। যে কোনো সৃষ্টির ক্ষেত্রেই সাধারণ একটা চিন্তা বড় ধরনের ভাবনার জন্ম দেয়।

সাধারণ বলছি এ কারণে যে, একটা চিন্তাকে নিছক রূপকথা কিংবা অবাস্তব মনে হতে পারে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, উপহাস করা চিন্তাগুলোই একসময় পৃথিবীর অগ্রগতিতে ভূমিকা রেখেছে। চিন্তা যাই হোক, সেখানে যদি ঘুমন্ত একটা স্বপ্ন থাকে তবে তা মানবসভ্যতার মহামূল্যবান সম্পদও হতে পারে। চিন্তারও চিন্তা থাকে। মানুষ যখন একটি বিষয়ে ভাবে তখন সেখান থেকে অনেক ভাবনা বের হয়ে আসতে পারে।

তখন মানুষ নিজের মধ্যে ভাবনার বহুমাত্রিকতা সৃষ্টিতে সক্ষম হয়। যেমন, একজন বিজ্ঞানী চিন্তা থেকে চিন্তা সৃষ্টি করে অনেক আবিষ্কারের জন্ম দেন। একজন লেখক চিন্তা থেকে কল্পনা সৃষ্টি করে একটার পর একটা সাহিত্য রচনা করে যান। একইভাবে একজন দার্শনিক তার নিজের দর্শনের চিন্তা থেকে অনেক চিন্তার জন্ম দিয়ে দর্শন থেকে দর্শন বের করে আনেন।

চিন্তার এ শক্তি অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা, মনস্তত্ত্ব, নেতৃত্ব, মানবিক মূল্যবোধ ও উন্নয়নসহ সব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা সম্ভব। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বিভিন্ন সময়ে চিন্তার আদান-প্রদান করেছেন। এ চিন্তায় সাহিত্য বিজ্ঞানকে ও বিজ্ঞান সাহিত্যকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

রবীন্দ্রনাথ ও আইনস্টাইনের মধ্যে যখন প্রথম যোগাযোগ ঘটল তখন রবীন্দ্রনাথ সাক্ষাৎ শেষে বেরিয়ে আসার পর সাংবাদিকরা তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘এইমাত্র আপনি একজন বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীর সঙ্গে কথা বললেন, আপনার প্রতিক্রিয়া কী?’

রবীন্দ্রনাথ উত্তর দিলেন, ‘আমি তো একজন বিশ্বখ্যাত কবির সঙ্গে কথা বললাম।’ এরপর সাংবাদিকরা আইনস্টাইনের সঙ্গে আলাপ প্রসঙ্গে বললেন, ‘আপনি একজন বিশ্বকবির সঙ্গে কথা বললেন, আপনার প্রতিক্রিয়া কী?’ আইনস্টাইন উত্তর দিলেন, ‘আমি কবির সঙ্গে কথা বলিনি, আমি একজন বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীর সঙ্গে কথা বলেছি।’

চিন্তার বড়ত্ব ও উদারতা এখানেই- যা দেখা যায় না, উপলব্ধি করা যায় না; কিন্তু ঘটে যায় অভূতপূর্বভাবে। ভাবনা অনেক দূরের ভবিষ্যৎকে দেখতে পায়; যা কেউ আগে ভাবেনি সে ভাবনা মানুষের ভেতর তৈরি করে। বর্তমান সময়ের গবেষকরা বলছেন, লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির ভাবনা তার সময়ের চেয়ে কয়েকশ’ বছর এগিয়ে ছিল। তিনি নিজের ভাবনাগুলো নোটবুকে লিখে রাখতেন। সে লেখাতেও ছিল অদ্ভুত ভাবনার প্রতিফলন।

উল্টোভাবে ইতালির ভাষায় লেখা ভাবনাগুলোর পাঠোদ্ধার করতে প্রয়োজন হতো আয়নার। ১৫ এপ্রিল ১৪৫২ ইতালিতে জন্ম নেয়া এ মানুষটি ভাবনার বৈচিত্র্যে বহুমাত্রিক প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। প্রায় সাড়ে পাঁচশ’ বছর আগে রোবটের ধারণা মানুষকে দিতে পেরেছেন। তবে আধুনিককালে আমরা রোবট বলতে যা বুঝি, লিওনার্দোর রোবট ঠিক তেমন ছিল না।

তবে নিজে নিজে কাজ করতে পারে এমন একটি যন্ত্র তিনি তৈরি করেছিলেন, যার নাম রেখেছিলেন অটোম্যাটন। কোনো মানুষের সাহায্য ছাড়াই এটি নিজে নিজে চলাফেরা করতে পারত। ১৪৯০ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভিঞ্চি রোবট বানাতে সক্ষম হন, যার নাম দেয়া হয়েছিল মেকানিকালনাইট। এটি নিজে নিজে উঠতে ও বসতে পারত এবং নিজের হাত নাড়াচাড়া করতে পারত।

চিন্তার বাস্তবায়নে ভাবনার প্রকৃত সাফল্য নিহিত থাকে। ভাবনা ইতিবাচক ও নেতিবাচক হতে পারে। তবে সবসময় ইতিবাচক ভাবনা মানুষকে এগিয়ে নেয়। এমন কিছু ভাবনা থাকে যা মৌলিক ভাবনার অন্তর্গত। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ও রিচার্ড এইচ থ্যালার অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে মানবিক উন্নয়নের বিষয়টি বিবেচনায় এনেছেন। মানবিক উন্নয়ন এখানে একটি মৌলিক চিন্তা। যদিও এ দু’জন অর্থনীতিবিদের ভাবনার মধ্যে ভিন্নতা আছে; কিন্তু লক্ষ্য অভিন্ন।

অমর্ত্য সেন মানবিক উন্নয়ন বলতে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিতকরণ এবং সমাজে ধনী ও দরিদ্রের বৈষম্য কমিয়ে আনার কথা বলেছেন। অন্যদিকে রিচার্ড এইচ থ্যালার অর্থনীতির একটি বিশেষ নিয়ন্ত্রক উপাদান হিসেবে ‘নাজিং’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। যার বাংলা অর্থ হচ্ছে ‘আলতো ছোঁয়া’। এই ‘আলতো ছোঁয়া’ বলতে তিনি সম্ভবত মানুষের মনকে বুঝিয়েছেন। কারণ মানুষের মনকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তার আচরণকে প্রভাবান্বিত করা সম্ভব।

আর এটি যদি ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করা যায় তবে অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি ইতিবাচকভাবে প্রভাবান্বিত হয়। ফলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রের উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়। মেধাবী মানুষ গড়ে তোলার জন্য ভাবনার ইতিবাচক চর্চার প্রয়োজন রয়েছে। এখানে ভাবনায় ডুবে থাকাকে বোঝানো হচ্ছে না; বরং ভাবনা চর্চার উপাদানগুলো চিহ্নিত করে তা কীভাবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের মনস্তাত্ত্বিক আচরণের সঙ্গে যুক্ত করা যায় তা বোঝানো হয়েছে। যেমন, মানুষ যখন একটি বই পড়বে তখন সে বইয়ের পাতার কালো অক্ষরগুলোকে ভাবনার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করবে।

একটি ভালো বই মানুষের মধ্যে অনেক নতুন ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে। একইভাবে মানুষ যখন প্রকৃতিকে দেখবে তখন সেখান থেকে সে ভাবনার ভিন্ন ভিন্ন উপাদানকে চিহ্নিত করবে। যেমন, একটি গাছ মানুষের মধ্যে বহুমাত্রিক ভাবনা তৈরি করে মানুষকে সৃষ্টির পথ দেখিয়ে দিতে পারে। ঠিক তেমনি সমুদ্র, নদী, আকাশ, পাহাড়সহ সবকিছুতেই ভাবনা সৃষ্টির অনেক হিডেন মৌলিক উপাদান আছে; যা ভাবনাকে গড়ার মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

মানুষ সবসময় চিন্তার একটি মৌলিক উপাদান। মানুষের মন থাকায় ও সেটি ব্যক্তিত্বের ভিন্নতার কারণে ভিন্ন ভিন্ন ধারার হওয়ায় তাকে বিশ্লেষণ করাটাও জটিল। সময়ের মতো অনেক উপাদান মানুষের আচরণ ও মূল্যবোধকে প্রভাবিত করে। মনস্তত্ত্ববিদরা তাদের গবেষণার দ্বারা মানুষের এ পরিবর্তনকে পর্যবেক্ষণ করে তা ইতিবাচকভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। তবে তা সব মানুষের ওপর প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না।

এ কারণে মানুষকে মানুষ নিয়ে ভাবতে হবে। সমাজ সংস্কারকরা মনোবিদ ছিলেন না; কিন্তু তারা তাদের চিন্তার মাধ্যমে মানুষের মনকে প্রভাবিত করে নেতিবাচক মনোভাবের পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। সারা পৃথিবীর মানবিক সংকটের এ সময়ে মানুষের চিন্তা দ্বারা মানুষ আলোকিত হবে। পৃথিবীর সব পরিবর্তন প্রভাবিত হবে। চিন্তা তার শক্তিতে বদলে দেবে মানুষকে। তবেই মানুষ ক্রমাগত চিন্তা দ্বারা তাড়িত হয়ে মানুষ হয়ে উঠবে।

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী : অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

[email protected]

চিন্তার শক্তিতে বদলে যাক মানুষ

 ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী 
০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষকে নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে; এখনও হচ্ছে। এ পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফল থেকে মানুষের স্বরূপ বের করার প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। যদিও কাজটা অনেক জটিল। কারণ একজন মানুষ আরেকজন থেকে ভিন্ন ধাঁচের।

এ ভিন্নতা মানুষের ব্যক্তিত্বের মধ্যেও ভিন্নতা তৈরি করে। এর ফলে সব মানুষ একইভাবে ভাবতে পারে না। চিন্তার গুণগত মানও একই স্তরের হয় না। আবার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তারও পরিবর্তন ঘটে।

অনেকের কাছে চাকাকে একটি সাধারণ বিষয় মনে হতে পারে। কিন্তু চাকা আবিষ্কার পৃথিবীর যুগান্তকারী সৃষ্টিগুলোর অন্যতম। মানুষের মন্থর জীবনকে গতিশীল করার মাধ্যমে সভ্যতাকে এগিয়ে নিতে চাকা টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করেছে। মানুষের ছোট ছোট ভাবনা থেকেই চাকা আবিষ্কারের ধারণা এসেছে। যে কোনো সৃষ্টির ক্ষেত্রেই সাধারণ একটা চিন্তা বড় ধরনের ভাবনার জন্ম দেয়।

সাধারণ বলছি এ কারণে যে, একটা চিন্তাকে নিছক রূপকথা কিংবা অবাস্তব মনে হতে পারে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, উপহাস করা চিন্তাগুলোই একসময় পৃথিবীর অগ্রগতিতে ভূমিকা রেখেছে। চিন্তা যাই হোক, সেখানে যদি ঘুমন্ত একটা স্বপ্ন থাকে তবে তা মানবসভ্যতার মহামূল্যবান সম্পদও হতে পারে। চিন্তারও চিন্তা থাকে। মানুষ যখন একটি বিষয়ে ভাবে তখন সেখান থেকে অনেক ভাবনা বের হয়ে আসতে পারে।

তখন মানুষ নিজের মধ্যে ভাবনার বহুমাত্রিকতা সৃষ্টিতে সক্ষম হয়। যেমন, একজন বিজ্ঞানী চিন্তা থেকে চিন্তা সৃষ্টি করে অনেক আবিষ্কারের জন্ম দেন। একজন লেখক চিন্তা থেকে কল্পনা সৃষ্টি করে একটার পর একটা সাহিত্য রচনা করে যান। একইভাবে একজন দার্শনিক তার নিজের দর্শনের চিন্তা থেকে অনেক চিন্তার জন্ম দিয়ে দর্শন থেকে দর্শন বের করে আনেন।

চিন্তার এ শক্তি অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা, মনস্তত্ত্ব, নেতৃত্ব, মানবিক মূল্যবোধ ও উন্নয়নসহ সব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা সম্ভব। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বিভিন্ন সময়ে চিন্তার আদান-প্রদান করেছেন। এ চিন্তায় সাহিত্য বিজ্ঞানকে ও বিজ্ঞান সাহিত্যকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

রবীন্দ্রনাথ ও আইনস্টাইনের মধ্যে যখন প্রথম যোগাযোগ ঘটল তখন রবীন্দ্রনাথ সাক্ষাৎ শেষে বেরিয়ে আসার পর সাংবাদিকরা তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘এইমাত্র আপনি একজন বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীর সঙ্গে কথা বললেন, আপনার প্রতিক্রিয়া কী?’

রবীন্দ্রনাথ উত্তর দিলেন, ‘আমি তো একজন বিশ্বখ্যাত কবির সঙ্গে কথা বললাম।’ এরপর সাংবাদিকরা আইনস্টাইনের সঙ্গে আলাপ প্রসঙ্গে বললেন, ‘আপনি একজন বিশ্বকবির সঙ্গে কথা বললেন, আপনার প্রতিক্রিয়া কী?’ আইনস্টাইন উত্তর দিলেন, ‘আমি কবির সঙ্গে কথা বলিনি, আমি একজন বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীর সঙ্গে কথা বলেছি।’

চিন্তার বড়ত্ব ও উদারতা এখানেই- যা দেখা যায় না, উপলব্ধি করা যায় না; কিন্তু ঘটে যায় অভূতপূর্বভাবে। ভাবনা অনেক দূরের ভবিষ্যৎকে দেখতে পায়; যা কেউ আগে ভাবেনি সে ভাবনা মানুষের ভেতর তৈরি করে। বর্তমান সময়ের গবেষকরা বলছেন, লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির ভাবনা তার সময়ের চেয়ে কয়েকশ’ বছর এগিয়ে ছিল। তিনি নিজের ভাবনাগুলো নোটবুকে লিখে রাখতেন। সে লেখাতেও ছিল অদ্ভুত ভাবনার প্রতিফলন।

উল্টোভাবে ইতালির ভাষায় লেখা ভাবনাগুলোর পাঠোদ্ধার করতে প্রয়োজন হতো আয়নার। ১৫ এপ্রিল ১৪৫২ ইতালিতে জন্ম নেয়া এ মানুষটি ভাবনার বৈচিত্র্যে বহুমাত্রিক প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। প্রায় সাড়ে পাঁচশ’ বছর আগে রোবটের ধারণা মানুষকে দিতে পেরেছেন। তবে আধুনিককালে আমরা রোবট বলতে যা বুঝি, লিওনার্দোর রোবট ঠিক তেমন ছিল না।

তবে নিজে নিজে কাজ করতে পারে এমন একটি যন্ত্র তিনি তৈরি করেছিলেন, যার নাম রেখেছিলেন অটোম্যাটন। কোনো মানুষের সাহায্য ছাড়াই এটি নিজে নিজে চলাফেরা করতে পারত। ১৪৯০ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভিঞ্চি রোবট বানাতে সক্ষম হন, যার নাম দেয়া হয়েছিল মেকানিকালনাইট। এটি নিজে নিজে উঠতে ও বসতে পারত এবং নিজের হাত নাড়াচাড়া করতে পারত।

চিন্তার বাস্তবায়নে ভাবনার প্রকৃত সাফল্য নিহিত থাকে। ভাবনা ইতিবাচক ও নেতিবাচক হতে পারে। তবে সবসময় ইতিবাচক ভাবনা মানুষকে এগিয়ে নেয়। এমন কিছু ভাবনা থাকে যা মৌলিক ভাবনার অন্তর্গত। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ও রিচার্ড এইচ থ্যালার অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে মানবিক উন্নয়নের বিষয়টি বিবেচনায় এনেছেন। মানবিক উন্নয়ন এখানে একটি মৌলিক চিন্তা। যদিও এ দু’জন অর্থনীতিবিদের ভাবনার মধ্যে ভিন্নতা আছে; কিন্তু লক্ষ্য অভিন্ন।

অমর্ত্য সেন মানবিক উন্নয়ন বলতে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিতকরণ এবং সমাজে ধনী ও দরিদ্রের বৈষম্য কমিয়ে আনার কথা বলেছেন। অন্যদিকে রিচার্ড এইচ থ্যালার অর্থনীতির একটি বিশেষ নিয়ন্ত্রক উপাদান হিসেবে ‘নাজিং’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। যার বাংলা অর্থ হচ্ছে ‘আলতো ছোঁয়া’। এই ‘আলতো ছোঁয়া’ বলতে তিনি সম্ভবত মানুষের মনকে বুঝিয়েছেন। কারণ মানুষের মনকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তার আচরণকে প্রভাবান্বিত করা সম্ভব।

আর এটি যদি ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করা যায় তবে অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি ইতিবাচকভাবে প্রভাবান্বিত হয়। ফলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রের উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়। মেধাবী মানুষ গড়ে তোলার জন্য ভাবনার ইতিবাচক চর্চার প্রয়োজন রয়েছে। এখানে ভাবনায় ডুবে থাকাকে বোঝানো হচ্ছে না; বরং ভাবনা চর্চার উপাদানগুলো চিহ্নিত করে তা কীভাবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের মনস্তাত্ত্বিক আচরণের সঙ্গে যুক্ত করা যায় তা বোঝানো হয়েছে। যেমন, মানুষ যখন একটি বই পড়বে তখন সে বইয়ের পাতার কালো অক্ষরগুলোকে ভাবনার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করবে।

একটি ভালো বই মানুষের মধ্যে অনেক নতুন ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে। একইভাবে মানুষ যখন প্রকৃতিকে দেখবে তখন সেখান থেকে সে ভাবনার ভিন্ন ভিন্ন উপাদানকে চিহ্নিত করবে। যেমন, একটি গাছ মানুষের মধ্যে বহুমাত্রিক ভাবনা তৈরি করে মানুষকে সৃষ্টির পথ দেখিয়ে দিতে পারে। ঠিক তেমনি সমুদ্র, নদী, আকাশ, পাহাড়সহ সবকিছুতেই ভাবনা সৃষ্টির অনেক হিডেন মৌলিক উপাদান আছে; যা ভাবনাকে গড়ার মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

মানুষ সবসময় চিন্তার একটি মৌলিক উপাদান। মানুষের মন থাকায় ও সেটি ব্যক্তিত্বের ভিন্নতার কারণে ভিন্ন ভিন্ন ধারার হওয়ায় তাকে বিশ্লেষণ করাটাও জটিল। সময়ের মতো অনেক উপাদান মানুষের আচরণ ও মূল্যবোধকে প্রভাবিত করে। মনস্তত্ত্ববিদরা তাদের গবেষণার দ্বারা মানুষের এ পরিবর্তনকে পর্যবেক্ষণ করে তা ইতিবাচকভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। তবে তা সব মানুষের ওপর প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না।

এ কারণে মানুষকে মানুষ নিয়ে ভাবতে হবে। সমাজ সংস্কারকরা মনোবিদ ছিলেন না; কিন্তু তারা তাদের চিন্তার মাধ্যমে মানুষের মনকে প্রভাবিত করে নেতিবাচক মনোভাবের পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। সারা পৃথিবীর মানবিক সংকটের এ সময়ে মানুষের চিন্তা দ্বারা মানুষ আলোকিত হবে। পৃথিবীর সব পরিবর্তন প্রভাবিত হবে। চিন্তা তার শক্তিতে বদলে দেবে মানুষকে। তবেই মানুষ ক্রমাগত চিন্তা দ্বারা তাড়িত হয়ে মানুষ হয়ে উঠবে।

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী : অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

[email protected]