বাঙালির সামাজিক উৎসব

  আবুল মোমেন ১৪ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলা নববর্ষ অবশেষে বাঙালির উৎসবে পরিণত হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক বাঙালির সামাজিক উৎসব হিসেবে ইদানীং ব্যাপকভাবে উদ্যাপিত হচ্ছে পহেলা বৈশাখ। ধীরে ধীরে এ উৎসব শহর ছাপিয়ে গ্রামেও ছড়িয়েছে। এককালের নাগরিক মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক এ উৎসব বর্তমানে অরাজনৈতিক সামাজিক উৎসবে রূপ নিয়েছে।

আমাদের দেশে সব বাঙালির যৌথভাবে পালনের মতো কোনো সামাজিক উৎসব ছিল না। দুই ঈদ কিংবা দুর্গাপূজা হল ধর্মীয় উৎসব- মুসলমান ও হিন্দু সীমিতভাবে এ সময়ে পরস্পরের সঙ্গে লৌকিকতা বা সৌহার্দ্য বিনিময় করলেও তা কখনও ধর্মীয় গণ্ডি ভাঙতে পারেনি, পারার কথাও নয়।

তবুও একুশে ঠিক আনন্দ-উৎসবের দিন নয়- এদিনটি জাতীয় জীবনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অসাম্প্রদায়িক বাঙালির করণীয় নির্ধারণের দিন। জাতীয় প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব পালন ও দায়বদ্ধতার মতো সিরিয়াস বিষয় এখানে বিবেচ্য। তাই হয়তো উৎসবের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দুটি দিক এখানে উপেক্ষিত- নতুন পোশাক ও উন্নত খাওয়া-দাওয়া। তাছাড়া প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকা এবং সামাজিক পরিমণ্ডল ছাড়াও পারিবারিক পরিমণ্ডলে উদ্যাপনের বিশেষ সুযোগ নেই একুশের এদিনটি। এটা সবসময়ই গণঅনুষ্ঠানের মাধ্যমে কিছু বক্তব্যসহ জাতীয় প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক সচেতনতার প্রকাশ ঘটিয়েই পালন করা সম্ভব।

পহেলা বৈশাখ কিন্তু কোনো অনুষ্ঠানে যুক্ত না থেকেও আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করা যায়। বাড়িতেই নতুন পোশাক ও ভালো খাওয়ার ব্যবস্থা করেই তা সম্ভব।

এ বছর পহেলা বৈশাখে আশা করা যায় রীতিমতো অনুষ্ঠানের জোয়ার বইবে। অথচ একসময় বছরের শেষদিন চৈত্রসংক্রান্তি আর বাংলা নববর্ষ শহরাঞ্চলে কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেই ছিল সীমাবদ্ধ। ছায়ানট যখন আইয়ুবের সামরিক শাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রমনার বটমূলে নববর্ষ উদ্যাপন শুরু করেছে গত শতকের ছয়ের দশকের গোড়ায়, তখন সারা দেশে এটিই ছিল বাংলা বর্ষবরণের উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান। হয়তো এর বাইরে কোনো কোনো জেলা শহরে ছোটখাটো অনুষ্ঠান হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু মানুষ নববর্ষ উদ্যাপন ও উপভোগ করেছে, অংশ নিয়েছে এবং অনুপ্রাণিত হয়েছে ছায়ানটের অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই। দেশের অনেক জায়গায় এটিকে অনুসরণ করে নববর্ষে প্রভাতি সঙ্গীতানুষ্ঠান চালু হয়।

এখন বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের জন্য দু’দিনব্যাপী অনুষ্ঠান চালু হয়েছে। কোথাও কোথাও সপ্তাহব্যাপী দেশীয় পণ্যের মেলাও চালু হচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে সরকারের আগ্রহে ও নির্দেশে প্রত্যেক জেলায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে, শিল্পকলা একাডেমি ও শিশু একাডেমিতে অনুষ্ঠান আয়োজিত হচ্ছে। এ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও বর্ষবরণের অনুষ্ঠান হয়েছে, সম্ভবত সরকারি নির্দেশনার ফলেই। এক্ষেত্রে অবশ্য আমি একটি কথা বলতে চাইব। যেহেতু এটি হল সামাজিক উৎসব, তাই এ উৎসবটি শিক্ষক ও ছাত্রদের পারিবারিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে অংশ নিয়ে উদ্যাপনেরও সুযোগ দেয়া উচিত। একুশে ফেব্রুয়ারি, ছাব্বিশে মার্চ বা ষোলোই ডিসেম্বরের সঙ্গে পহেলা বৈশাখের চরিত্রগত পার্থক্য আছে। একুশে হল বাংলাদেশ রাষ্ট্র বিনির্মাণের এক অফুরন্ত প্রেরণার উৎস, আর বাকি দুটি হল আমাদের রাষ্ট্র অর্জনের সঙ্গে সম্পৃক্ত দিন। ফলে এগুলো সরকারি নির্দেশে রাষ্ট্রীয়-জাতীয় দিবস হিসেবে পালিত হতে পারে। পতাকা উত্তোলন থেকে নানা আনুষ্ঠানিকতার বাধ্যবাধকতায় এগুলো একটু ফরমাল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালনের দিন। কিন্তু যেটি সামাজিক উৎসব সেটি সমাজ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই পালন করবে। রাষ্ট্র ও সরকারের দায়িত্ব হবে যাতে আপামর মানুষ শান্তিতে আনন্দে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উৎসব পালন করতে পারে তার ব্যবস্থা করা। কিন্তু নির্দেশনা দেয়ার দরকার নেই, প্রেরণা ও উৎসাহ দেয়াই বাঞ্ছনীয়। বিষয়টি আশা করি সরকার খেয়াল করবে।

উৎসবের প্রসঙ্গে এবার আরেকটি দিকে আলোচনাটা করতে চাই।

প্রশ্নটা হল, আমরা তো বলছি উৎসব, বলছি বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক সর্বজনীন উৎসব। উৎসব কেবল ভোগ-বিলাসে হইচইয়ের মধ্যেই কাটিয়ে দিচ্ছি না তো? সারাটা দিন মাইকে মাইকে গীতকলরব, বাদ্যগীতসহ শোভাযাত্রা, পথে পথে ভিড়-জনসমুদ্র, দিন শেষে ক্লান্তিই কি থাকল অবশেষ?

বছরের এ শুরুর দিনটি নানা আনন্দ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হোক। কিন্তু প্রভাতি অনুষ্ঠানটি হোক সুপরিকল্পিতভাবে। সারা বছরের জন্য মন ও মস্তিষ্ক কিছু কিছু রসদ পাক সে অনুষ্ঠানে। উৎসব সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে আমরা একটা দিকনির্দেশনা পেতে পারি, তার লেখা থেকে এ বিষয়ে জানতে পারি।

‘মানুষের উৎসব কবে? মানুষ যেদিন আপনার মনুষ্যত্বের শক্তি বিশেষভাবে স্মরণ করে, বিশেষভাবে উপলব্ধি করে, সেই দিন।’

এ প্রতিপাদ্য আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন তিনি এভাবে- ‘যেদিন আমরা আপনাদিগকে প্রাত্যহিক প্রয়োজনের দ্বারা চালিত করি, সেদিন না- যেদিন আমরা আপনাদিগকে সাংসারিক সুখ-দুঃখের দ্বারা ক্ষুব্ধ করি, সেদিন না- যেদিন প্রাকৃতিক নিয়ম পরম্পরার হস্তে আপনাদিগকে ক্রীড়াপুত্তলির মতো ক্ষুদ্র ও জড়ভাবে অনুভব করি, সেদিন আমাদের উৎসবের দিন নহে; সেদিন তো আমরা জড়ের মতো উদ্ভিদের মতো সাধারণ জন্তুর মতো- সেদিন তো আমরা আমাদের নিজের মধ্যে সর্বজয়ী মানবশক্তি উপলব্ধি করি না- সেদিন আমাদের আনন্দ কিসের? সেদিন আমরা গৃহে অবরুদ্ধ, সেদিন আমরা কর্মে ক্লিষ্ট- সেদিন আমরা উজ্জ্বলভাবে আপনাকে ভূষিত করি না- সেদিন আমরা উদারভাবে কাহাকেও আহ্বান করি না- সেদিন আমাদের ঘরে সংসারচক্রের ঘর্ঘরধ্বনি শোনা যায়, কিন্তু সংগীত শোনা যায় না।’

আরও স্পষ্টভাবে কথাটা এরকম- ‘প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র দীন একাকী- কিন্তু উৎসবের দিনে মানুষ বৃহৎ, সেদিন সে সমস্ত মানুষের সঙ্গে একত্র হইয়া বৃহৎ, সেদিন সে সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করিয়া মহৎ।’ এদিন আমরা ব্যক্তিবিশেষ নই, মানুষ হিসেবেই নিজেকে জেনে ও সেভাবে প্রকাশ করে ধন্য হই।

রবীন্দ্রনাথের এ ভাবাদর্শিক পথনির্দেশের সূত্রে আমরা বলতে পারি, নববর্ষের উৎসবের ভাবাদর্শের মধ্যে থাকবে দেশ ও জাতির জন্য, বিশ্ব ও মানবতার জন্য কল্যাণ কামনা ও আত্মনিবেদনের অঙ্গীকার; মহৎ আদর্শ ও উচ্চভাবে ত্যাগের উদ্দীপনায় শ্রীময় ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার কাজে ব্রতী হওয়ার অঙ্গীকার। ফলে অনুষ্ঠানের একটা পরিকল্পনা তৈরি করতে পারি আমরা। প্রভাতি সমাবেশ হবে এদিন, রমনার বটমূলে যেমন ছায়ানটের আয়োজনে হয়ে থাকে- ছোট-বড় যত বেশি সম্ভব সারা দেশে সর্বত্র। তাতে কোনো সর্বমান্য শ্রদ্ধেয় বয়স্কজন- নারী বা পুরুষ, হিন্দু বা মুসলমান বা বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান বা ধর্ম বিষয়ে মুক্ত ব্যক্তি- সমাগতদের উদ্দেশ্যে মূল ভাবাদর্শের আলোকে আশীর্বচন উচ্চারণ করবেন। এতে সমস্যা দেখা দিলে উদ্যোক্তাদের সর্বসম্মতিতে লিখিতভাবে নববর্ষের ঘোষণা পাঠ হতে পারে। তারপর নৃত্য ও বাদ্যসহ সঙ্গীত ও আবৃত্তির অনুষ্ঠান। এরপর রাঁখিবন্ধন হলে কেমন হয়? বঙ্গভঙ্গের আদলে শুধু হিন্দু-মুসলিমে নয়, নারী-পুরুষে, ধনী-দরিদ্রে, ছোট-বড়তে, হিন্দু-মুসলিমে, শহুরে-গ্রাম্যে এবং যে কোনো রকম বিন্যাসে (অর্থাৎ নারীতে-নারীতে, মুসলিমে-মুসলিমে, ধনীতে-ধনীতে ইত্যাদি) রাঁখিবন্ধন হবে। ইতিহাসের এখনকার দাবি ও চাহিদা এরকমই। শোভাযাত্রায় তারপর যোগ দেয়া যায়, কিংবা শোভাযাত্রা থেকে দিনের সব কার্যক্রম শুরু হতে পারে। তারপরেই শেষ? না, নববর্ষে শুভেচ্ছা বিনিময় ও জ্ঞাপনের রেওয়াজটা অনুষ্ঠানস্থল থেকে বাড়ি পর্যন্ত আসুক। ছোটরা বড়দের ফুল দেবে, বড়রা ছোটদের বই দেবে, বয়স্ক সমবয়সীরা ফুল/বই বিনিময় করবে- মোটকথা, উপহার বিনিময় ও প্রীতি সম্ভাষণ চলবে। আর বাড়ি পর্যন্ত আসা-যাওয়ার প্রথা শুরু হলে মিষ্টিমুখ, বিশেষ খাবারের আয়োজন স্বভাবতই চলে আসবে।

তখন অসাম্প্রদায়িক সামাজিক উৎসব সত্যিকারের রূপ পাবে, সংসারের মাটিতে শিকড়বদ্ধ হবে এবং জীবনকে শিল্প ও সংস্কৃতির রসদ জোগাবে। উৎসবের আবহে জীবন আনন্দময় হবে, মুক্তি ও বিকাশের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে।

গত বছর থেকে পহেলা বৈশাখে সেই লক্ষণ দেখতে পেয়ে মন কিছুটা আশ্বস্ত হয়, আবার খানিকটা এগিয়ে বারবার পিছিয়ে পড়ার যে ইতিহাস আছে আমাদের, তা মনে পড়লে শঙ্কিত না হয়ে পারি না। এভাবে প্রতিবছর পালিত হলে বাংলা নববর্ষ আমাদের সাংস্কৃতিক মুক্তির পথ তৈরি করে দিতে পারে।

আবুল মোমেন : কবি, সাংবাদিক, কলাম লেখক

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত