শিক্ষা ও শিক্ষকের বেদনা
jugantor
জাতীয় শিক্ষক দিবস
শিক্ষা ও শিক্ষকের বেদনা

  অমিত রায় চৌধুরী  

১৯ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষায় বৈষম্য নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। গ্রাম-শহর, ধনী-দরিদ্র, সুবিধাভোগী-সুবিধাবঞ্চিত-বিভিন্ন প্যারামিটারে এ অসাম্য নানা হতাশা তৈরি করেছে। একটি স্বাধীন জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন আকাক্সক্ষা মানসম্মত শিক্ষাকে আশ্রয় করেই বেড়ে উঠবে-তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ এ কাজটা করেই ঈর্ষণীয় সাফল্যের নজির গড়েছে।

জাপান, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া বা চীন-সবখানেই রাষ্ট্রীয় চরিত্রের বিভিন্নতাকে আমলে না নিয়ে শিক্ষার বিস্তারকে নিষ্ঠা, যুক্তি ও দেশপ্রেমের মন্ত্রে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। ’৭৫-এ জাতির পিতার মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড অনেক পরিকল্পনাকে তছনছ করে দেয়। জাতি গঠনের দর্শন, নীতি ও লক্ষ্য কক্ষচ্যুত হয়ে পড়ে।

একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন পর্যুদস্ত হয়। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন নেতৃত্বের বিভ্রান্তি, আদর্শহীনতা ও সুবিধাবাদ রাষ্ট্রের নীতিতে প্রতিফলিত হতে থাকে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সবচেয়ে দুরবস্থার মুখে পড়ে শিক্ষা। বহুধাবিভক্ত শিক্ষায় জনমানস বিভাজিত হয়ে যায়। দীর্ঘদিনের লালিত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধগুলো আক্রান্ত হতে শুরু করে।

তবে যে বিষয়ে কোনো তর্ক নেই তা হলো-এ সরকার শিক্ষা নিয়ে অনেক ভাবনা-চিন্তা করেছে। পরিবর্তন, পরিশীলন, পরিমার্জন হয়েছে। এমনকি ব্যবস্থার খোল নলচে পালটে ফেলার চেষ্টা হয়েছে; গবেষণা হয়েছে। বিভিন্ন উপভোক্তার মতামতও নেওয়া হয়েছে। শিক্ষানীতি, শিক্ষা আইন হয়েছে। কারিকুলাম বারবার বদলেছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে।

কোচিং বাণিজ্যের বিস্তার রোধ, সৃজনশীল পদ্ধতি প্রণয়ন, আইসিটি শিক্ষা চালু, পরীক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন, ভর্তিতে লটারি, এমপিওভুক্তি, কারিগরি শিক্ষার বিস্তার, নতুন নতুন সাধারণ ও বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা-সর্বত্রই বেশকিছু উদ্ভাবনী উদ্যোগ সবার নজর কেড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ কোনো সেশনজট নেই। বিসিএস পরীক্ষা নিয়মিত হচ্ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার জন্য নিবন্ধন কার্যকর হওয়ায় শিক্ষা বাণিজ্য কমেছে। ভালো ছেলেমেয়েরা জায়গা পেতে শুরু করেছে। এসডিজি অভীষ্ট অর্জনে শিক্ষাই আজ গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সব নাগরিকের জন্য মানসম্মত শিক্ষার অঙ্গীকার ছিল। বঙ্গবন্ধু সে লক্ষ্যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ’৭৫-পরবর্তী ইতিহাস আমরা জানি। শিক্ষায় বৈষম্য এসেছে ক্রমে ক্রমে। সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিভক্তি তৈরি হয়েছে। শিক্ষার মান ক্রমেই নিুগামী হয়েছে; যার মাশুল আমাদের এখনো গুনতে হচ্ছে। আর করোনাকালে শিক্ষার ওপর যে আঘাত এসেছে, তা অকল্পনীয়। শিক্ষার্থীর মনোজগৎও এ অভিঘাত থেকে মুক্তি পায়নি।

এমন অবস্থায় বৈষম্যের প্রশ্নটি আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কারিকুলাম পরিমার্জন, পরীক্ষা পদ্ধতি, মূল্যায়ন কাঠামোর সংস্কার, প্রযুক্তি অভিযোজন ও উপবৃত্তি বেষ্টনীকে প্রসারিত করা-সব বিষয়ই আজ গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে শিক্ষাকে যুগোপযোগী করার সব কৌশল তখনই সার্থক হবে, যখন শিক্ষক হবে যোগ্য, প্রস্তুত ও নিবেদিত। তবে এ কথা ধ্রুব সত্য-কোনো পেশায় বৈষম্যের ধারণা দৃঢ়মূল হলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে। শিক্ষকতা, বিশেষ করে কলেজ পর্যায়ে কর্মরত শিক্ষকদের মধ্যে বিদ্যমান পেশাগত বৈষম্য নিয়ে আজকের আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখতে চাই।

জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত এ জাতিরাষ্ট্রে শিক্ষা নাগরিকের মৌলিক অধিকার। সব নাগরিকের কাছে এ সেবা পৌঁছে দেওয়া রাষ্ট্রের দায়। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মূলধারা হবে রাষ্ট্রায়ত্ত-এটাই মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার। দেশের সব শিশু একইভাবে বেড়ে উঠবে। দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি প্রযুক্তি দক্ষতায় সমৃদ্ধ হবে। রাষ্ট্র তাকে মদত দেবে। যদিও এ কথা সবাই স্বীকার করবে-ঔপনিবেশিক কিংবা পাকিস্তান আমলে সামন্ত শ্রেণির পরিচর্যায় গড়ে ওঠা শিক্ষারও একটা মান ছিল।

ব্রিটিশ আমলে উচ্চমধ্যবিত্তের নাগালে থাকা শিক্ষার ব্যাবসাবান্ধব চরিত্রের কারণে দুর্নাম থাকলেও সে সময় অনেক কৃতী শিক্ষক শিক্ষাকে ব্রত হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। উচ্চশিক্ষিত এ নির্লোভ শিক্ষকরা ছাত্রছাত্রীদের জন্য জীবন উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত ছিলেন। তবে এ শিক্ষার উপভোক্তা সাধারণ কৃষক-শ্রমিক বা প্রান্তজন খুব বেশি ছিল না।

বঙ্গবন্ধু ড. কুদরাত-এ খুদা শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন। প্রাইমারি শিক্ষার দায়িত্ব নিয়েছিল রাষ্ট্র। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে পর্যায়ক্রমে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যেত। ’৭৫-পরবর্তী সময়ে শুধু শিক্ষাক্রমে বিভক্তি আসেনি, শিক্ষাকে জাতীয়করণ না করে জেলা সদরে একটি করে প্রতিষ্ঠান সরকারি করে শিক্ষায় বিভাজনের নতুন ধারার উদ্বোধন করা হয়েছিল। ফলে মুক্তবুদ্ধির চারণ ক্ষেত্রগুলোয় শুধু রাষ্ট্রের অনুগত কর্মচারী সৃষ্টি করা হয়নি, সবাই হয়তো একমত হবেন-এ সরকারীকরণের ফলে এ প্রতিষ্ঠানগুলো তার স্ব স্ব বৈশিষ্ট্য, সুনাম ও ঐতিহ্য হারিয়ে বসেছিল।

একদিকে অপরিকল্পিতভাবে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি ও এমপিওভুক্তির নামে শিক্ষা বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত খুলে দেওয়া হলো; মেধাহীন, অযোগ্য ও অপ্রস্তুত শিক্ষক পবিত্র শিক্ষাঙ্গন দখল করতে লাগল। অন্যদিকে সরকারীকরণের ধারা অব্যাহত থাকার ফলে শিক্ষা পেশায় বিভক্তি আরও তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠল।

সমমান, সমান যোগ্যতা ও একইরকম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পাশাপাশি দুজন শিক্ষকের ভিন্নরকম সুবিধা লাভের সুযোগ কখনো একটি ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্রব্যবস্থায় যৌক্তিক হতে পারে না। অন্যদিকে শিক্ষকদের অফিসার হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা অশিক্ষকসুলভ অনৈতিক চর্চায় অপরিচিত ও নতুন উপসর্গ যোগ করল।

বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থায়; বিশেষ করে কলেজ পর্যায়ে যেসব যুক্তিহীন, হাস্যকর বৈষম্য আজও টিকে আছে, তার মধ্যে সহকারী অধ্যাপক হওয়ার জন্য অনুপাত প্রথা অন্যতম। এ নিয়মটি শুধু যুক্তিবিবর্জিতই নয়, শিক্ষকতায় যুক্ত বৃহত্তর একটা অংশকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার শামিল। গ্রামীণ শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি এখান থেকে আঁচ করা সহজ। বেসরকারি কলেজে শিক্ষকতার প্রথম ধাপ প্রভাষক। সহকারী অধ্যাপকের ওপর এখানে পদোন্নতির কোনো সুযোগ নেই।

অথচ কাজের ক্ষেত্রে একজন প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপকের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। পাঠদান, পরীক্ষা গ্রহণ, মূল্যায়ন বা ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত কাজের প্রকৃতি সবার জন্য সমান। কিন্তু গুটিকয়েক সহকারী অধ্যাপক ছাড়া অবশিষ্ট প্রভাষকরা যোগ্য, অভিজ্ঞ, মেধাবী ও দক্ষ হওয়া সত্ত্বেও সহকারী অধ্যাপক হতে পারেন না। ফলে উপাধ্যক্ষ বা অধ্যক্ষ পদেও তাদের পদোন্নতির সুযোগ রুদ্ধ। এ নীতি শুধু বৈষম্যমূলক ও অমানবিক নয়, সংবিধানের মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

অন্যদিকে সরকারি কলেজে একজন প্রভাষকের অধ্যাপক পর্যন্ত পদোন্নতির সুযোগ বিদ্যমান। মনে রাখতে হবে, সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে আট বছরের অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট; অথচ অনুপাত প্রথায় কয়েকজন ভাগ্যবান ব্যক্তি জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে এ সুবিধা ভোগ করেন। যেখানে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের গুরুত্ব, পেশাগত উৎকর্ষ এমনকি তার পূর্ববর্তী কোনো পরীক্ষার ফলাফলও আমলযোগ্য নয়। কোনো প্রকাশনা, মেধা বা দক্ষতা এ পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখে না, পদোন্নতির পরও চাকরির প্রকৃতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন আসে না।

তিনি যত মেধাবী বা অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বা তার অধীত বিষয়ের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে যত অপরিহার্যই হোক না কেন, তিনি অনুপাতের ছকে যদি নিজেকে মেলাতে না পারেন তবে বিশ-ত্রিশ বছর চাকরির পর; এমনকি চাকরি শেষেও সহকারী অধ্যাপক হতে পারেন না। ফলে তিনি শুধু আর্থিকভাবেই অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়েন না, সামাজিকভাবেও তিনি মারাত্মক অমর্যাদার সম্মুখীন হন।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা অনেক মেধাবী ছাত্রছাত্রীকে দেখেছি, যারা এসব কারণে বেসরকারি কলেজে শিক্ষকতায় ভীষণভাবে অনাগ্রহী। তারা মনে করে, এখানে তাদের মেধা, একাডেমিক যোগ্যতা প্রমাণ করার সুযোগ খুবই কম। অন্য কথায় তাদের দক্ষতা ও প্রতিভার মূল্যায়নের কোনো সুযোগ এখানে নেই। এটি শুধু বৈষম্যই নয়, মেধার অপরিসীম অপচয় ও বৃহত্তর শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি রাষ্ট্রের অবহেলার একটি দৃষ্টান্ত। মেধাবী ছাত্রদের প্রচলিত ব্যবস্থায় পরাজয়ের কাহিনি নতুন নয়।

আমরা বিজ্ঞান বিভাগের সর্বোচ্চ মেধাবীদের ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার না হতে পারায় যেভাবে অপচয় ও অনিশ্চয়তায় ভেসে যেতে দেখি, তা বেসরকারি কলেজের মেধাবী শিক্ষকদের এ দুরবস্থার সঙ্গেই শুধু তুলনীয়। সম্প্রতি সরকার এ অনুপাত প্রথা পরিমার্জন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

অবশ্যই সেটি প্রশংসনীয় এ কারণে যে, বিষয়টির প্রতি দেরিতে হলেও অন্তত মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে তা যথেষ্ট নয়। মনে করি, একই যোগ্যতাসম্পন্ন সব শিক্ষক-যারা ডিগ্রি, ইন্টারমিডিয়েট, কারিগরি বা মাদ্রাসা যেখানেই কাজ করুন না কেন; সহকারী অধ্যাপক বা পরবর্তী পদোন্নতির সব সুযোগ তাদেরও থাকা উচিত। প্রয়োজনে মেধা যাচাইয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

তবে যে কথা বলাটা ভীষণ জরুরি তা হলো, শিক্ষাকে জাতীয়করণ করে পেশায় বৈষম্য লাঘবের সুযোগ তৈরি করার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত। একই দেশে, একই রকম শিক্ষাব্যবস্থা ও সুযোগ থাকাটা বাঞ্ছনীয়। আর যতদিন তা না হচ্ছে, ততদিন পেশায় বিদ্যমান সবরকম অবৈজ্ঞানিক বৈষম্য দূর করে শক্তিশালী মনিটরিং কাঠামো তৈরি করতে হবে।

শিক্ষকদের নিয়মিত লেখাপড়া, গবেষণা, সেমিনার, সিম্পোজিয়ামে অংশ নিতে হবে। সম্প্রতি মাউশি থেকে এমন একটি উদ্যোগ চোখে পড়ছে। প্রযুক্তি, ভাষা ও বিজ্ঞানে আরও বেশি কার্যকর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থবহ এসব প্রশাসনিক ব্যবস্থা শিক্ষককে ক্লাসরুমে প্রাসঙ্গিক ও জীবন্ত করে রাখবে। শিক্ষকের পদোন্নতিও তার এসব অর্জনের ওপর ভিত্তি করে হতে পারে। জীবনের একটা বড় সময় প্রধান পরীক্ষক হিসাবে দেখেছি-উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য শিক্ষককে এক মাস সময় দিলেও কাজ হয় না।

একটি নির্দিষ্টসংখ্যক শিক্ষক প্রদত্ত সময়ের শেষ অংশে তড়িঘড়ি করে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে থাকেন। যারা যথেষ্ট সততার সঙ্গে পেশা জীবনে দায়িত্ব পালন করেননি, তাদের বেতন বৃদ্ধি বা সময় বৃদ্ধি করে শ্রেণিপাঠদান বা উত্তরপত্র মূল্যায়নে গুণগত পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়নি। অভিজ্ঞতা বলে, ঢালাওভাবে বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করলেই শিক্ষার মানে পরিবর্তন হয় না; বরং দেশের গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করে এক ও অভিন্ন কাঠামোর আওতায় এনে নিশ্ছিদ্র জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা সরকার রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে এসে শিক্ষকদের নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হতে বেতন উত্তোলনের ব্যবস্থা করে। বেসরকারি শিক্ষকতায় এ উদ্যোগ ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। অতি সম্প্রতি ইএফটির মাধ্যমে সরাসরি শিক্ষকের ব্যাংক হিসাবে বেতন-ভাতা জমা করার যে সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছে তা যুগান্তকারী। শিক্ষকরা অনেক অহেতুক হয়রানি ও ভোগান্তি থেকে মুক্তি পাবে বলে আশা করা যায়। ছাত্রছাত্রীদের ভর্তির ক্ষেত্রে লটারির যে ব্যবস্থা করা হয়েছে তা সত্যিই একটি বড় পদক্ষেপ।

সরকারের এ দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে বৈষম্য নিরসনে সদিচ্ছার প্রমাণ মেলে। কিন্তু শুধু শিক্ষার্থীই নয়, এ নীতির বাস্তবায়ন চাই শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও। ভালো ও সফল শিক্ষকদের লটারির মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে পারলে মেধার সুষ্ঠু বণ্টন সম্ভব হবে। গ্রাম-শহরের মাঝে বৈষম্য ঘুচতে শুরু করবে। দেখা যাচ্ছে, জনমানসে লেখাপড়া করানোর একটা চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে-নিঃসন্দেহে এটা শুভ লক্ষণ। আমরা জনমিতির লভ্যাংশ ভোগ করছি।

সবচেয়ে আশার জায়গা-প্রত্যন্ত মফস্সলে কোনো প্রান্তজন, এমনকি একজন অসহায় নারীও তার সন্তানের মানসম্মত শিক্ষার জন্য সবকিছু উজাড় করতে প্রস্তুত। এ অবস্থাটা নিঃসন্দেহে একটা বড় সামাজিক পুঁজি। আর দুভার্গ্যরে বিষয় হলো, মেধাবী তরুণরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে অনাগ্রহী। ভেবে দেখতে হবে, কেন এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষায় উপযুক্ত বিনিয়োগ ও যথেষ্ট মনোযোগ ছাড়া এ অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়।

দেশের অর্থনীতির আকার, মানব উন্নয়নের সূচক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা-সব মানদণ্ডেই দেশ এখন অনেক এগিয়ে। এ উন্নয়নকে টেকসই ও সমকালীন করতে অবশ্যই বৈষম্যের উৎসগুলো চিহ্নিত করে তা নিরসনের উদ্যোগ নিতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব দেশের শিক্ষাকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়াই হবে সময়ের শ্রেষ্ঠ অগ্রাধিকার।

অমিত রায় চৌধুরী : সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ

principalffmmc@gmail.com

জাতীয় শিক্ষক দিবস

শিক্ষা ও শিক্ষকের বেদনা

 অমিত রায় চৌধুরী 
১৯ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষায় বৈষম্য নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। গ্রাম-শহর, ধনী-দরিদ্র, সুবিধাভোগী-সুবিধাবঞ্চিত-বিভিন্ন প্যারামিটারে এ অসাম্য নানা হতাশা তৈরি করেছে। একটি স্বাধীন জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন আকাক্সক্ষা মানসম্মত শিক্ষাকে আশ্রয় করেই বেড়ে উঠবে-তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ এ কাজটা করেই ঈর্ষণীয় সাফল্যের নজির গড়েছে।

জাপান, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া বা চীন-সবখানেই রাষ্ট্রীয় চরিত্রের বিভিন্নতাকে আমলে না নিয়ে শিক্ষার বিস্তারকে নিষ্ঠা, যুক্তি ও দেশপ্রেমের মন্ত্রে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। ’৭৫-এ জাতির পিতার মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড অনেক পরিকল্পনাকে তছনছ করে দেয়। জাতি গঠনের দর্শন, নীতি ও লক্ষ্য কক্ষচ্যুত হয়ে পড়ে।

একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন পর্যুদস্ত হয়। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন নেতৃত্বের বিভ্রান্তি, আদর্শহীনতা ও সুবিধাবাদ রাষ্ট্রের নীতিতে প্রতিফলিত হতে থাকে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সবচেয়ে দুরবস্থার মুখে পড়ে শিক্ষা। বহুধাবিভক্ত শিক্ষায় জনমানস বিভাজিত হয়ে যায়। দীর্ঘদিনের লালিত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধগুলো আক্রান্ত হতে শুরু করে।

তবে যে বিষয়ে কোনো তর্ক নেই তা হলো-এ সরকার শিক্ষা নিয়ে অনেক ভাবনা-চিন্তা করেছে। পরিবর্তন, পরিশীলন, পরিমার্জন হয়েছে। এমনকি ব্যবস্থার খোল নলচে পালটে ফেলার চেষ্টা হয়েছে; গবেষণা হয়েছে। বিভিন্ন উপভোক্তার মতামতও নেওয়া হয়েছে। শিক্ষানীতি, শিক্ষা আইন হয়েছে। কারিকুলাম বারবার বদলেছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে।

কোচিং বাণিজ্যের বিস্তার রোধ, সৃজনশীল পদ্ধতি প্রণয়ন, আইসিটি শিক্ষা চালু, পরীক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন, ভর্তিতে লটারি, এমপিওভুক্তি, কারিগরি শিক্ষার বিস্তার, নতুন নতুন সাধারণ ও বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা-সর্বত্রই বেশকিছু উদ্ভাবনী উদ্যোগ সবার নজর কেড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ কোনো সেশনজট নেই। বিসিএস পরীক্ষা নিয়মিত হচ্ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার জন্য নিবন্ধন কার্যকর হওয়ায় শিক্ষা বাণিজ্য কমেছে। ভালো ছেলেমেয়েরা জায়গা পেতে শুরু করেছে। এসডিজি অভীষ্ট অর্জনে শিক্ষাই আজ গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সব নাগরিকের জন্য মানসম্মত শিক্ষার অঙ্গীকার ছিল। বঙ্গবন্ধু সে লক্ষ্যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ’৭৫-পরবর্তী ইতিহাস আমরা জানি। শিক্ষায় বৈষম্য এসেছে ক্রমে ক্রমে। সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিভক্তি তৈরি হয়েছে। শিক্ষার মান ক্রমেই নিুগামী হয়েছে; যার মাশুল আমাদের এখনো গুনতে হচ্ছে। আর করোনাকালে শিক্ষার ওপর যে আঘাত এসেছে, তা অকল্পনীয়। শিক্ষার্থীর মনোজগৎও এ অভিঘাত থেকে মুক্তি পায়নি।

এমন অবস্থায় বৈষম্যের প্রশ্নটি আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কারিকুলাম পরিমার্জন, পরীক্ষা পদ্ধতি, মূল্যায়ন কাঠামোর সংস্কার, প্রযুক্তি অভিযোজন ও উপবৃত্তি বেষ্টনীকে প্রসারিত করা-সব বিষয়ই আজ গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে শিক্ষাকে যুগোপযোগী করার সব কৌশল তখনই সার্থক হবে, যখন শিক্ষক হবে যোগ্য, প্রস্তুত ও নিবেদিত। তবে এ কথা ধ্রুব সত্য-কোনো পেশায় বৈষম্যের ধারণা দৃঢ়মূল হলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে। শিক্ষকতা, বিশেষ করে কলেজ পর্যায়ে কর্মরত শিক্ষকদের মধ্যে বিদ্যমান পেশাগত বৈষম্য নিয়ে আজকের আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখতে চাই।

জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত এ জাতিরাষ্ট্রে শিক্ষা নাগরিকের মৌলিক অধিকার। সব নাগরিকের কাছে এ সেবা পৌঁছে দেওয়া রাষ্ট্রের দায়। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মূলধারা হবে রাষ্ট্রায়ত্ত-এটাই মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার। দেশের সব শিশু একইভাবে বেড়ে উঠবে। দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি প্রযুক্তি দক্ষতায় সমৃদ্ধ হবে। রাষ্ট্র তাকে মদত দেবে। যদিও এ কথা সবাই স্বীকার করবে-ঔপনিবেশিক কিংবা পাকিস্তান আমলে সামন্ত শ্রেণির পরিচর্যায় গড়ে ওঠা শিক্ষারও একটা মান ছিল।

ব্রিটিশ আমলে উচ্চমধ্যবিত্তের নাগালে থাকা শিক্ষার ব্যাবসাবান্ধব চরিত্রের কারণে দুর্নাম থাকলেও সে সময় অনেক কৃতী শিক্ষক শিক্ষাকে ব্রত হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। উচ্চশিক্ষিত এ নির্লোভ শিক্ষকরা ছাত্রছাত্রীদের জন্য জীবন উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত ছিলেন। তবে এ শিক্ষার উপভোক্তা সাধারণ কৃষক-শ্রমিক বা প্রান্তজন খুব বেশি ছিল না।

বঙ্গবন্ধু ড. কুদরাত-এ খুদা শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন। প্রাইমারি শিক্ষার দায়িত্ব নিয়েছিল রাষ্ট্র। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে পর্যায়ক্রমে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যেত। ’৭৫-পরবর্তী সময়ে শুধু শিক্ষাক্রমে বিভক্তি আসেনি, শিক্ষাকে জাতীয়করণ না করে জেলা সদরে একটি করে প্রতিষ্ঠান সরকারি করে শিক্ষায় বিভাজনের নতুন ধারার উদ্বোধন করা হয়েছিল। ফলে মুক্তবুদ্ধির চারণ ক্ষেত্রগুলোয় শুধু রাষ্ট্রের অনুগত কর্মচারী সৃষ্টি করা হয়নি, সবাই হয়তো একমত হবেন-এ সরকারীকরণের ফলে এ প্রতিষ্ঠানগুলো তার স্ব স্ব বৈশিষ্ট্য, সুনাম ও ঐতিহ্য হারিয়ে বসেছিল।

একদিকে অপরিকল্পিতভাবে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি ও এমপিওভুক্তির নামে শিক্ষা বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত খুলে দেওয়া হলো; মেধাহীন, অযোগ্য ও অপ্রস্তুত শিক্ষক পবিত্র শিক্ষাঙ্গন দখল করতে লাগল। অন্যদিকে সরকারীকরণের ধারা অব্যাহত থাকার ফলে শিক্ষা পেশায় বিভক্তি আরও তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠল।

সমমান, সমান যোগ্যতা ও একইরকম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পাশাপাশি দুজন শিক্ষকের ভিন্নরকম সুবিধা লাভের সুযোগ কখনো একটি ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্রব্যবস্থায় যৌক্তিক হতে পারে না। অন্যদিকে শিক্ষকদের অফিসার হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা অশিক্ষকসুলভ অনৈতিক চর্চায় অপরিচিত ও নতুন উপসর্গ যোগ করল।

বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থায়; বিশেষ করে কলেজ পর্যায়ে যেসব যুক্তিহীন, হাস্যকর বৈষম্য আজও টিকে আছে, তার মধ্যে সহকারী অধ্যাপক হওয়ার জন্য অনুপাত প্রথা অন্যতম। এ নিয়মটি শুধু যুক্তিবিবর্জিতই নয়, শিক্ষকতায় যুক্ত বৃহত্তর একটা অংশকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার শামিল। গ্রামীণ শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি এখান থেকে আঁচ করা সহজ। বেসরকারি কলেজে শিক্ষকতার প্রথম ধাপ প্রভাষক। সহকারী অধ্যাপকের ওপর এখানে পদোন্নতির কোনো সুযোগ নেই।

অথচ কাজের ক্ষেত্রে একজন প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপকের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। পাঠদান, পরীক্ষা গ্রহণ, মূল্যায়ন বা ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত কাজের প্রকৃতি সবার জন্য সমান। কিন্তু গুটিকয়েক সহকারী অধ্যাপক ছাড়া অবশিষ্ট প্রভাষকরা যোগ্য, অভিজ্ঞ, মেধাবী ও দক্ষ হওয়া সত্ত্বেও সহকারী অধ্যাপক হতে পারেন না। ফলে উপাধ্যক্ষ বা অধ্যক্ষ পদেও তাদের পদোন্নতির সুযোগ রুদ্ধ। এ নীতি শুধু বৈষম্যমূলক ও অমানবিক নয়, সংবিধানের মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

অন্যদিকে সরকারি কলেজে একজন প্রভাষকের অধ্যাপক পর্যন্ত পদোন্নতির সুযোগ বিদ্যমান। মনে রাখতে হবে, সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে আট বছরের অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট; অথচ অনুপাত প্রথায় কয়েকজন ভাগ্যবান ব্যক্তি জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে এ সুবিধা ভোগ করেন। যেখানে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের গুরুত্ব, পেশাগত উৎকর্ষ এমনকি তার পূর্ববর্তী কোনো পরীক্ষার ফলাফলও আমলযোগ্য নয়। কোনো প্রকাশনা, মেধা বা দক্ষতা এ পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখে না, পদোন্নতির পরও চাকরির প্রকৃতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন আসে না।

তিনি যত মেধাবী বা অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বা তার অধীত বিষয়ের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে যত অপরিহার্যই হোক না কেন, তিনি অনুপাতের ছকে যদি নিজেকে মেলাতে না পারেন তবে বিশ-ত্রিশ বছর চাকরির পর; এমনকি চাকরি শেষেও সহকারী অধ্যাপক হতে পারেন না। ফলে তিনি শুধু আর্থিকভাবেই অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়েন না, সামাজিকভাবেও তিনি মারাত্মক অমর্যাদার সম্মুখীন হন।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা অনেক মেধাবী ছাত্রছাত্রীকে দেখেছি, যারা এসব কারণে বেসরকারি কলেজে শিক্ষকতায় ভীষণভাবে অনাগ্রহী। তারা মনে করে, এখানে তাদের মেধা, একাডেমিক যোগ্যতা প্রমাণ করার সুযোগ খুবই কম। অন্য কথায় তাদের দক্ষতা ও প্রতিভার মূল্যায়নের কোনো সুযোগ এখানে নেই। এটি শুধু বৈষম্যই নয়, মেধার অপরিসীম অপচয় ও বৃহত্তর শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি রাষ্ট্রের অবহেলার একটি দৃষ্টান্ত। মেধাবী ছাত্রদের প্রচলিত ব্যবস্থায় পরাজয়ের কাহিনি নতুন নয়।

আমরা বিজ্ঞান বিভাগের সর্বোচ্চ মেধাবীদের ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার না হতে পারায় যেভাবে অপচয় ও অনিশ্চয়তায় ভেসে যেতে দেখি, তা বেসরকারি কলেজের মেধাবী শিক্ষকদের এ দুরবস্থার সঙ্গেই শুধু তুলনীয়। সম্প্রতি সরকার এ অনুপাত প্রথা পরিমার্জন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

অবশ্যই সেটি প্রশংসনীয় এ কারণে যে, বিষয়টির প্রতি দেরিতে হলেও অন্তত মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে তা যথেষ্ট নয়। মনে করি, একই যোগ্যতাসম্পন্ন সব শিক্ষক-যারা ডিগ্রি, ইন্টারমিডিয়েট, কারিগরি বা মাদ্রাসা যেখানেই কাজ করুন না কেন; সহকারী অধ্যাপক বা পরবর্তী পদোন্নতির সব সুযোগ তাদেরও থাকা উচিত। প্রয়োজনে মেধা যাচাইয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

তবে যে কথা বলাটা ভীষণ জরুরি তা হলো, শিক্ষাকে জাতীয়করণ করে পেশায় বৈষম্য লাঘবের সুযোগ তৈরি করার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত। একই দেশে, একই রকম শিক্ষাব্যবস্থা ও সুযোগ থাকাটা বাঞ্ছনীয়। আর যতদিন তা না হচ্ছে, ততদিন পেশায় বিদ্যমান সবরকম অবৈজ্ঞানিক বৈষম্য দূর করে শক্তিশালী মনিটরিং কাঠামো তৈরি করতে হবে।

শিক্ষকদের নিয়মিত লেখাপড়া, গবেষণা, সেমিনার, সিম্পোজিয়ামে অংশ নিতে হবে। সম্প্রতি মাউশি থেকে এমন একটি উদ্যোগ চোখে পড়ছে। প্রযুক্তি, ভাষা ও বিজ্ঞানে আরও বেশি কার্যকর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থবহ এসব প্রশাসনিক ব্যবস্থা শিক্ষককে ক্লাসরুমে প্রাসঙ্গিক ও জীবন্ত করে রাখবে। শিক্ষকের পদোন্নতিও তার এসব অর্জনের ওপর ভিত্তি করে হতে পারে। জীবনের একটা বড় সময় প্রধান পরীক্ষক হিসাবে দেখেছি-উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য শিক্ষককে এক মাস সময় দিলেও কাজ হয় না।

একটি নির্দিষ্টসংখ্যক শিক্ষক প্রদত্ত সময়ের শেষ অংশে তড়িঘড়ি করে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে থাকেন। যারা যথেষ্ট সততার সঙ্গে পেশা জীবনে দায়িত্ব পালন করেননি, তাদের বেতন বৃদ্ধি বা সময় বৃদ্ধি করে শ্রেণিপাঠদান বা উত্তরপত্র মূল্যায়নে গুণগত পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়নি। অভিজ্ঞতা বলে, ঢালাওভাবে বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করলেই শিক্ষার মানে পরিবর্তন হয় না; বরং দেশের গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করে এক ও অভিন্ন কাঠামোর আওতায় এনে নিশ্ছিদ্র জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা সরকার রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে এসে শিক্ষকদের নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হতে বেতন উত্তোলনের ব্যবস্থা করে। বেসরকারি শিক্ষকতায় এ উদ্যোগ ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। অতি সম্প্রতি ইএফটির মাধ্যমে সরাসরি শিক্ষকের ব্যাংক হিসাবে বেতন-ভাতা জমা করার যে সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছে তা যুগান্তকারী। শিক্ষকরা অনেক অহেতুক হয়রানি ও ভোগান্তি থেকে মুক্তি পাবে বলে আশা করা যায়। ছাত্রছাত্রীদের ভর্তির ক্ষেত্রে লটারির যে ব্যবস্থা করা হয়েছে তা সত্যিই একটি বড় পদক্ষেপ।

সরকারের এ দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে বৈষম্য নিরসনে সদিচ্ছার প্রমাণ মেলে। কিন্তু শুধু শিক্ষার্থীই নয়, এ নীতির বাস্তবায়ন চাই শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও। ভালো ও সফল শিক্ষকদের লটারির মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে পারলে মেধার সুষ্ঠু বণ্টন সম্ভব হবে। গ্রাম-শহরের মাঝে বৈষম্য ঘুচতে শুরু করবে। দেখা যাচ্ছে, জনমানসে লেখাপড়া করানোর একটা চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে-নিঃসন্দেহে এটা শুভ লক্ষণ। আমরা জনমিতির লভ্যাংশ ভোগ করছি।

সবচেয়ে আশার জায়গা-প্রত্যন্ত মফস্সলে কোনো প্রান্তজন, এমনকি একজন অসহায় নারীও তার সন্তানের মানসম্মত শিক্ষার জন্য সবকিছু উজাড় করতে প্রস্তুত। এ অবস্থাটা নিঃসন্দেহে একটা বড় সামাজিক পুঁজি। আর দুভার্গ্যরে বিষয় হলো, মেধাবী তরুণরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে অনাগ্রহী। ভেবে দেখতে হবে, কেন এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষায় উপযুক্ত বিনিয়োগ ও যথেষ্ট মনোযোগ ছাড়া এ অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়।

দেশের অর্থনীতির আকার, মানব উন্নয়নের সূচক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা-সব মানদণ্ডেই দেশ এখন অনেক এগিয়ে। এ উন্নয়নকে টেকসই ও সমকালীন করতে অবশ্যই বৈষম্যের উৎসগুলো চিহ্নিত করে তা নিরসনের উদ্যোগ নিতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব দেশের শিক্ষাকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়াই হবে সময়ের শ্রেষ্ঠ অগ্রাধিকার।

অমিত রায় চৌধুরী : সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ

principalffmmc@gmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন