চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেই এগোচ্ছেন জো বাইডেন
jugantor
জো বাইডেনের অভিষেক
চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেই এগোচ্ছেন জো বাইডেন

  আতাহার খান  

২০ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধান, তার পরই যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন জো বাইডেন। রোদমাখা দুপুরে বাইবেল হাতে মাত্র ৩৫ শব্দের শপথ বাক্যের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেবেন তিনি। তার বয়স এখন ৭৮ বছর।

করোনা মহামারি আর ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে হামলার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ৪৬তম মার্কিন প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠানে মার্কিনিদের সরাসরি যোগদানে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।

জো বাইডেনের শপথ অনুষ্ঠানে সমর্থকদের ঘরে বসে ভার্চুয়ালি যোগ দেওয়ার জন্য টিকিট দেওয়া হচ্ছে। আইনপ্রণেতারা শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে নিজ নিজ এলাকার ২০০ সমর্থককে ব্যক্তিগত আমন্ত্রণ জানাতে পারেন। এবার তারা মাত্র দুজনের জন্য আমন্ত্রণপত্র পাচ্ছেন। সারা দেশেই কড়াকড়ি ব্যবস্থা।

৫০টি অঙ্গরাজ্যে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ওয়াশিংটন ডিসি এখন সেনা টহলের নগরীতে পরিণত। ২১ হাজারের বেশি ন্যাশনাল গার্ড আর আটটি অঙ্গরাজ্য থেকে আনা পুলিশের নজরদারি চলছে ওয়াশিংটনজুড়ে। বলা যায়, বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছে পুরো দেশে। গত ১৫০ বছরের ইতিহাসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো এত খারাপ অবস্থায় দেশকে রেখে যাননি আর কোনো প্রেসিডেন্ট।

আসলেই ডোনাল্ড ট্রাম্প গত চার বছরে রাজনীতিতে সৃষ্টি করেন স্পষ্ট বিভেদ। চারদিক ছড়িয়ে দেন সহিংসতা, সাম্প্রদায়িক চিন্তাভাবনা আর সাদা-কালোর মধ্যে তীব্র বর্ণবৈষম্য।

তার ওপর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অন্যায়ভাবে হানেন আঘাত। সবশেষে ক্যাপিটল হিলে সশস্ত্র হামলার উসকানিদাতা হিসাবে তিনি আমেরিকার ইতিহাসে কলঙ্কের কালো কালি লেপে দিয়েছেন। যে রাষ্ট্র গোটা দুনিয়ায় গণতন্ত্রের কথা বলে বেড়ায়, সেই দেশের আইনসভায় হানাদারদের বেপরোয়া আক্রমণের ঘটনা বিশ্বব্যাপী রীতিমতো বিপুল উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

একইসঙ্গে সৃষ্টি করে ভয় ও উদ্বেগ। প্রশ্ন উঠতে পারে, এ আক্রমণ কি ছিল আকস্মিক, না পরিকল্পিত? এর উত্তরের জন্য হয়তো আমাদের আরও কিছুদিন, অন্তত তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে কারও কারও অভিমত, ক্যাপিটলে হামলার ঘটনার পেছনে ছিল পরিষ্কার উসকানি ও পরিকল্পিত প্রস্তুতি। তার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল হিংসা, বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা আর স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা।

ক্যাপিটল হিলে এ তাণ্ডব চালানোর পর থেকে গোটা বিশ্বের অভিযোগ ওঠে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে। শুধু এ কারণে তিনি এক ভিডিও বার্তায় নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে রাজি হয়েছেন, এটা মনে করার কোনো যুক্তি নেই। প্রকৃত কারণ হলো, হাউজের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির হুঁশিয়ারি।

তিনি রাখঢাক না-করেই বলেন, ক্যাপিটলে হামলার পর ট্রাম্প নিজ থেকে ইস্তফা না দিলে তাকে ইমপিচ করা হবে। প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের শেষ মুহূর্তে এসে বরখাস্ত হওয়ার ঝামেলা এড়ানোর জন্যই হয়তো ট্রাম্প ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘোষণা দিয়েছেন। অনেকটা অনন্যোপায় হয়েই এ হামলা নিয়ে মুখ খোলেন আমেরিকার বিদায়ী প্রেসিডেন্ট।

৩ মিনিটের একটু কম সময়ের ওই ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প বলেন, ‘আমার এখন লক্ষ্য ক্ষমতা হস্তান্তর। ২০ জানুয়ারি নতুন প্রশাসন কাজ শুরু করবে। তার আগে আমি সবকিছু বুঝিয়ে দিতে চাই।’

ক্ষমতা হস্তান্তরের এ স্বীকারোক্তির আগে ক্যাপিটলের চাপ ছিল ট্রাম্পের ওপর। বিভিন্ন মহল থেকে তাকে ইমপিচমেন্টের দাবিও তোলা হচ্ছিল। ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়ায় নিযুক্ত আমেরিকার অ্যাটর্নি জেনারেল মাইকেল শেরউইন ইতোমধ্যেই ক্যাপিটল হামলার ঘটনা নিয়ে ১৫টি মামলা দায়ের করেন উন্মত্ত ট্রাম্প সমর্থকদের বিরুদ্ধে।

তিনি বলেন, ‘হামলাকারীদের বিরুদ্ধে যতসংখ্যক মামলা করা যায় আমরা করব।’ ক্যাপিটলে হামলার পর ডেমোক্র্যাটরা ছাড়াও কোনো কোনো রিপাবলিকানও ট্রাম্পের ইমপিচমেন্টের কথা তোলেন। ট্রাম্পকে ক্ষমতা থেকে সরাতে হলে সংবিধানের ২৫তম সংশোধনীর সাহায্য নিতে হবে। তাই ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের প্রতি ডেমোক্র্যাট নেতারা তো বটেই, কিছু রিপাবলিকান নেতাও ট্রাম্পকে ইমপিচ করার আহ্বান জানান।

ক্রমবর্ধমান চাপ থাকায় দ্বিতীয়বারের মতো অভিশংসিত হলেন ট্রাম্প। মার্কিন কংগ্রেসের নিুকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসন প্রস্তাবের পক্ষে ভোট পড়ে ২৩২টি আর বিপক্ষে ১৯৭টি। বিস্ময়কর মনে হলেও সত্য, রিপাবলিকান পার্টির ১০ সদস্য অভিশংসন প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন।

প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হওয়ায় ট্রাম্পের বিচার শুরু হবে সিনেটে। সেখানে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে প্রস্তাব গৃহীত হলে ট্রাম্প ভবিষ্যতে নির্বাচনে অংশ তো নিতে পারবেনই না, এমনকি সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসাবে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাও হারাবেন।

তবে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের রিপাবলিকান নেতা মিচ ম্যাককনেল দলীয় সিনেটারদের কাছে পাঠানো এক নথিতে উল্লেখ করেন, নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের দায়িত্ব গ্রহণের আগে ট্রাম্পের বিচার করা সম্ভব নয়। নিউইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়, ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তিনি স্বীকার করেন, ট্রাম্প যা করেছেন তা অভিশংসনের যোগ্য।

আসলে ট্রাম্প হলেন আপাদমস্তক বর্ণবাদী এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর প্রতি অসহিষ্ণু এক ব্যক্তি। এক এক সময়ে এক এক ধরনের কথা বলেন। তার শেষ কথা হল, তিনি অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন না। অভিশংসিত হওয়ায় তিনি তার অবস্থান পাল্টেছেন। ইতোমধ্যে বেশ ক’টি রাজ্যে ট্রাম্প সমর্থকরা হাঙামা করেছে। অনেকে মনে করছেন, এর পেছনে নিশ্চয়ই ট্রাম্পের মদদ আছে।

এ ধারণা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অত্যন্ত আক্রমণাত্মক আচরণ ট্রাম্পের। তা না হলে গণতন্ত্রের ২০০ বছরের ঐতিহ্য নিয়ে গর্বিত যুক্তরাষ্ট্রের মাথা বিশ্ববাসীর সামনে এভাবে তিনি নত করিয়ে দিতে পারতেন না। খুবই উচ্ছৃঙ্খল ও খামখেয়ালি মানুষ ট্রাম্প।

এক সময়ে তো রেসলিংয়ের রিংয়ের পাশে প্রায়ই হাঙামায় জড়িয়ে পড়তেন তিনি। তার এই উচ্ছৃঙ্খলতা ছেলেবেলাতেও দেখা গেছে। নানা অপরাধ করে বেড়িয়েছেন তিনি। কলেজে ভর্তি হওয়া নিয়েও তার বিরুদ্ধে আছে মস্ত বড় এক ‘কিন্তু’। পরবর্তী সময়ে ব্যবসায়ী ট্রাম্পকে কর ফাঁকি দেওয়ার মতো অপরাধের সঙ্গেও জড়িত থাকতে দেখা গেছে।

মানতেই হবে, এই নিন্দিত মানসিকতা কাজে লাগিয়ে বিভাজনের বিদ্বেষ ছড়িয়ে পুরো জাতিকে দ্বিধাবিভক্ত করার উন্মত্ত খেলায় মেতে ছিলেন ট্রাম্প। খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই সে সময়ে উদার গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদী সমাজ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়।

যেখানে বর্ণবিভাজনের পর্ব পার হয়ে একটা স্বচ্ছ-সুন্দর পরিবেশ তৈরির প্রশংসিত উদাহরণ তৈরি করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সেখানে ছড়িয়ে দেওয়া হয় জাতিগত বিভেদের দাহ এবং তা মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে চারদিক। ক্ষমতা হাতে পেয়ে ট্রাম্প কী-না করেছেন।

তার বর্ণবাদী, ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক ও আক্রমণাত্মক অরাজনৈতিক কথাগুলো বলতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ও নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর হানে মারাত্মক আঘাত। ট্রাম্পের পক্ষের লোকজন এতটাই সহিংস হয়ে ওঠে যে তারা মিসিসিপি রাজ্যে কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত এলাকার একটি গির্জা ও অসংখ্য বাড়িঘরে আগুন পর্যন্ত ধরিয়ে দেয়।

ট্রাম্পের এসব কর্মকাণ্ড আর কথাবার্তা আপাতদৃষ্টিতে এক বেয়াকুবের অসংলগ্ন আচরণ বলে মনে হতে পারে। এ নিয়ে হয়তো অস্থিরতা ও উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। কিন্তু বিষয়টি এভাবে সরলীকরণের অর্থ হলো ট্রাম্পের মূল উদ্দেশ্য আড়াল করা। আমাদের মনে রাখতে হবে, এসব প্রশ্ন তারাই বেশি তুলেছেন যারা ডেমোক্র্যাট, সমাজতন্ত্র ও উদারনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর সমর্থক।

ট্রাম্পের উগ্র কথাবার্তা আর নোংরা জাত্যাভিমান ছড়ানোর পেছনে বিশেষ একটি পরিকল্পনা সক্রিয় ছিল। সেটি হল তিনি সচেতনভাবেই চেয়েছেন, মার্কিনিদের মধ্যে শ্বেতাঙ্গ ও অশ্বেতাঙ্গ বিভেদরেখা, বর্ণবিভাজনের গণ্ডি পরিষ্কার রূপ নিয়ে বিকশিত হোক। জাতিগত বিতৃষ্ণা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন ট্রাম্প। প্রায় ৭০ শতাংশ সাদা মানুষ ছিল তার লক্ষ্য। তিনি মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন জাতিগত নিপীড়নের মধ্য দিয়ে সাদাদের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। মানুষকে উসকিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তার জুড়ি মেলা সত্যিই ভার।

বাইডেনের কাছে সুস্পষ্ট ব্যবধানে পরাজিত হওয়ার পরও জনগণের ম্যান্ডেড না মানার মধ্য দিয়ে ট্রাম্প কার্যত তার উৎকট জবরদস্তি মানসিকতাকেই বড় করে তুলে ধরেছেন। শেষ অবধি তিনি নিজেকে এমন এক চরম জায়গায় নিয়ে গেছেন, যেখানে অর্থাৎ হোয়াইট হাউসে দাঁড়িয়ে তার পক্ষে সম্ভব হয়েছে আপন ‘সমর্থক’ বাহিনীকে ক্যাপিটল হিলে আক্রমণে প্ররোচিত করা। ৬ জানুয়ারির উন্মাতাল লঙ্কাকাণ্ডই তার প্রমাণ।

যে বিষাক্ত বিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছে মার্কিনিদের ভেতরে; বাইডেনের আনুষ্ঠানিক অভিষেকে এবং সেই অভিষেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘স্বীকৃতি’দানের মধ্য দিয়ে তার সমাপ্তি ঘটবে, এটা আশা করা কোনোমতেই ঠিক হবে না। সমাজের ভেতরে, বিশেষ করে শেতাঙ্গদের একটা বড় অংশের মানসিকতায় ট্রাম্প বিভাজনের বীজ বপণ করে গেছেন। এ গভীর ও জটিল রোগ সারানোর দায়িত্ব বহন করতে হবে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে এবং কংগ্রেসের দুই সভায় চালকের আসনে অধিষ্ঠিত ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধিদের।

এটি একটি কঠিন পরীক্ষা। এর চেয়ে আরও বড় পরীক্ষার মুখোমুখি এখন রিপাবলিকান পার্টি। এ দলের অনেক নেতাই ট্রাম্প ও তার বাহিনীর আচরণে তীব্র প্রতিবাদমুখর। তারা জানেন, ট্রাম্পের এ স্বৈরাচারী মনোভাবকে উৎখাত করতে না পারলে নিজ নিজ এলাকার ভোটারদের কাছে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি তো হতেই হবে, এমনকি তাদের আস্থা হারানোর ঝুঁকিও দেখা দিতে পারে।

তাই রিপাবলিকান পার্টির কোনো কোনো নেতা ট্রাম্পের দেখানো অসহিষ্ণু ও হিংস বিদ্বেষের পথ থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছেন এবং গণতান্ত্রিক আমেরিকার ভবিষ্যৎ সুস্থ ও সুন্দর করার লক্ষ্যে গণতন্ত্রের পক্ষে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছেন।

তবে এ কথা মানতেই হবে, ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার শিবিরের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমাগত লড়াই, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ ছিল সত্যিই প্রশংসনীয়। তাই মার্কিন সমাজদেহে যে বিষবৃক্ষ রোপিত হয়েছে, সেই অতিবিভাজনের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে ২০ জানুয়ারি থেকে খুব সতর্কভাবে পা ফেলে লক্ষ্যাভিমুখে এগিয়ে যেতে হবে জো বাইডেনকে।

সন্দেহ নেই, জো বাইডেন খুবই সতর্ক। এ জন্য তাকে বেছে নিতে হয়েছে নতুন এক পথ। তার মন্ত্র হল দ্বিখণ্ডিত নয়, ঐক্যবদ্ধ দেশ ও জাতি চাই। কোভিডোত্তর পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য দরকার এই ঐক্য। হাউস ও সিনেটের বিভেদে গত চার বছর বারবার থেমে গেছে আমেরিকার অর্থনীতির চাকা। শুধু প্রথাগত রাজনৈতিক আদর্শ দিয়ে এ অর্থনীতি সচল রাখা সম্ভব নয়। এ জন্য করপোরেট আমেরিকারও সাহায্য প্রয়োজন। এ ছাড়া বাইডেনের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি বা লিঙ্গভিত্তিক পারিশ্রমিক-বৈষম্যের অবসান।

মহিলা ও তরুণদের নিয়ে বাইডেনের আশা আরও বেশি। সমাজের এ দু’অংশের স্বার্থের কথা ভেবে তাকে দিতে হয়েছে দুই বিলিয়ন ডলারের এক ‘গ্রিন নিউ ডিল’ ঘোষণা। সে টাকা করপোরেট আমেরিকাকে না রাগিয়ে কীভাবে তোলা যায়, তা এখনো স্পষ্ট নয়- আর সে প্রশ্ন তুলতেও উৎসাহী নন শিক্ষিত, উদারপন্থী আমজনতা। তবে বিষয়টি নিয়ে তাকে সতর্কভাবে এগিয়ে যেতে হবে।

তার সামনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল জীবাশ্ম জ্বালানি। নির্বাচনী প্রচারণার সময় সর্বশেষ টিভি-বিতর্কে জো বাইডেন মুখ-ফসকে বলে ফেলেছিলেন, নির্বাচিত হলে তার প্রশাসন জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসবে এবং সৌরশক্তি ও বাতাসে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের দিকে মনোযোগ দেবে। কথাটা বলার পর তিনি বুঝতে পেরেছেন এটা বলা তার ঠিক হয়নি। কারণ পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় দুই কোটি মানুষের রুজি-রুটি হুমকিকবলিত হয়ে পড়বে। তাই তিনি বিতর্ক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, নির্বাচিত হলে তার প্রশাসন তেল-গ্যাসের ব্যবহার বন্ধ করবে না। প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যাপারেও তাকে সত্যিই বিকল্প পথ খুঁজে বের করতে হবে।

আমরা জানি, প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এখন আশা করা যায়, সে অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের ১৮৭টি দেশের সঙ্গে একমত হয়ে প্যারিসে যে জলবায়ু চুক্তি করেছিল, সেখানে আবার ফিরে আসবে দেশটি। চুক্তিতে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলা ছিল।

হ্যাঁ, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে জো বাইডেনকে সতর্কভাবে পা ফেলতে হবে মাটিতে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সংকটময় রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিভক্ত জাতিকে ঐক্যের অমিয় বাণী শোনানোর প্রস্তুতি নিয়েছেন তিনি। তার এ আহ্বানের সময় তার পাশে উপস্থিত থাকবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এবং সাবেক প্রেসিডেন্টদের মধ্যে বারাক ওবামা, জর্জ বুশ এবং বিল ক্লিনটন। জো বাইডেনের ঐক্যের আহ্বান কতটা কার্যকর হবে, তা আগামী দিনগুলোই বলে দেবে।

আতাহার খান : সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা, কবি

জো বাইডেনের অভিষেক

চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেই এগোচ্ছেন জো বাইডেন

 আতাহার খান 
২০ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধান, তার পরই যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন জো বাইডেন। রোদমাখা দুপুরে বাইবেল হাতে মাত্র ৩৫ শব্দের শপথ বাক্যের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেবেন তিনি। তার বয়স এখন ৭৮ বছর।

করোনা মহামারি আর ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে হামলার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ৪৬তম মার্কিন প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠানে মার্কিনিদের সরাসরি যোগদানে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।

জো বাইডেনের শপথ অনুষ্ঠানে সমর্থকদের ঘরে বসে ভার্চুয়ালি যোগ দেওয়ার জন্য টিকিট দেওয়া হচ্ছে। আইনপ্রণেতারা শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে নিজ নিজ এলাকার ২০০ সমর্থককে ব্যক্তিগত আমন্ত্রণ জানাতে পারেন। এবার তারা মাত্র দুজনের জন্য আমন্ত্রণপত্র পাচ্ছেন। সারা দেশেই কড়াকড়ি ব্যবস্থা।

৫০টি অঙ্গরাজ্যে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ওয়াশিংটন ডিসি এখন সেনা টহলের নগরীতে পরিণত। ২১ হাজারের বেশি ন্যাশনাল গার্ড আর আটটি অঙ্গরাজ্য থেকে আনা পুলিশের নজরদারি চলছে ওয়াশিংটনজুড়ে। বলা যায়, বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছে পুরো দেশে। গত ১৫০ বছরের ইতিহাসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো এত খারাপ অবস্থায় দেশকে রেখে যাননি আর কোনো প্রেসিডেন্ট।

আসলেই ডোনাল্ড ট্রাম্প গত চার বছরে রাজনীতিতে সৃষ্টি করেন স্পষ্ট বিভেদ। চারদিক ছড়িয়ে দেন সহিংসতা, সাম্প্রদায়িক চিন্তাভাবনা আর সাদা-কালোর মধ্যে তীব্র বর্ণবৈষম্য।

তার ওপর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অন্যায়ভাবে হানেন আঘাত। সবশেষে ক্যাপিটল হিলে সশস্ত্র হামলার উসকানিদাতা হিসাবে তিনি আমেরিকার ইতিহাসে কলঙ্কের কালো কালি লেপে দিয়েছেন। যে রাষ্ট্র গোটা দুনিয়ায় গণতন্ত্রের কথা বলে বেড়ায়, সেই দেশের আইনসভায় হানাদারদের বেপরোয়া আক্রমণের ঘটনা বিশ্বব্যাপী রীতিমতো বিপুল উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

একইসঙ্গে সৃষ্টি করে ভয় ও উদ্বেগ। প্রশ্ন উঠতে পারে, এ আক্রমণ কি ছিল আকস্মিক, না পরিকল্পিত? এর উত্তরের জন্য হয়তো আমাদের আরও কিছুদিন, অন্তত তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে কারও কারও অভিমত, ক্যাপিটলে হামলার ঘটনার পেছনে ছিল পরিষ্কার উসকানি ও পরিকল্পিত প্রস্তুতি। তার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল হিংসা, বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা আর স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা।

ক্যাপিটল হিলে এ তাণ্ডব চালানোর পর থেকে গোটা বিশ্বের অভিযোগ ওঠে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে। শুধু এ কারণে তিনি এক ভিডিও বার্তায় নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে রাজি হয়েছেন, এটা মনে করার কোনো যুক্তি নেই। প্রকৃত কারণ হলো, হাউজের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির হুঁশিয়ারি।

তিনি রাখঢাক না-করেই বলেন, ক্যাপিটলে হামলার পর ট্রাম্প নিজ থেকে ইস্তফা না দিলে তাকে ইমপিচ করা হবে। প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের শেষ মুহূর্তে এসে বরখাস্ত হওয়ার ঝামেলা এড়ানোর জন্যই হয়তো ট্রাম্প ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘোষণা দিয়েছেন। অনেকটা অনন্যোপায় হয়েই এ হামলা নিয়ে মুখ খোলেন আমেরিকার বিদায়ী প্রেসিডেন্ট।

৩ মিনিটের একটু কম সময়ের ওই ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প বলেন, ‘আমার এখন লক্ষ্য ক্ষমতা হস্তান্তর। ২০ জানুয়ারি নতুন প্রশাসন কাজ শুরু করবে। তার আগে আমি সবকিছু বুঝিয়ে দিতে চাই।’

ক্ষমতা হস্তান্তরের এ স্বীকারোক্তির আগে ক্যাপিটলের চাপ ছিল ট্রাম্পের ওপর। বিভিন্ন মহল থেকে তাকে ইমপিচমেন্টের দাবিও তোলা হচ্ছিল। ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়ায় নিযুক্ত আমেরিকার অ্যাটর্নি জেনারেল মাইকেল শেরউইন ইতোমধ্যেই ক্যাপিটল হামলার ঘটনা নিয়ে ১৫টি মামলা দায়ের করেন উন্মত্ত ট্রাম্প সমর্থকদের বিরুদ্ধে।

তিনি বলেন, ‘হামলাকারীদের বিরুদ্ধে যতসংখ্যক মামলা করা যায় আমরা করব।’ ক্যাপিটলে হামলার পর ডেমোক্র্যাটরা ছাড়াও কোনো কোনো রিপাবলিকানও ট্রাম্পের ইমপিচমেন্টের কথা তোলেন। ট্রাম্পকে ক্ষমতা থেকে সরাতে হলে সংবিধানের ২৫তম সংশোধনীর সাহায্য নিতে হবে। তাই ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের প্রতি ডেমোক্র্যাট নেতারা তো বটেই, কিছু রিপাবলিকান নেতাও ট্রাম্পকে ইমপিচ করার আহ্বান জানান।

ক্রমবর্ধমান চাপ থাকায় দ্বিতীয়বারের মতো অভিশংসিত হলেন ট্রাম্প। মার্কিন কংগ্রেসের নিুকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসন প্রস্তাবের পক্ষে ভোট পড়ে ২৩২টি আর বিপক্ষে ১৯৭টি। বিস্ময়কর মনে হলেও সত্য, রিপাবলিকান পার্টির ১০ সদস্য অভিশংসন প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন।

প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হওয়ায় ট্রাম্পের বিচার শুরু হবে সিনেটে। সেখানে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে প্রস্তাব গৃহীত হলে ট্রাম্প ভবিষ্যতে নির্বাচনে অংশ তো নিতে পারবেনই না, এমনকি সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসাবে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাও হারাবেন।

তবে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের রিপাবলিকান নেতা মিচ ম্যাককনেল দলীয় সিনেটারদের কাছে পাঠানো এক নথিতে উল্লেখ করেন, নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের দায়িত্ব গ্রহণের আগে ট্রাম্পের বিচার করা সম্ভব নয়। নিউইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়, ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তিনি স্বীকার করেন, ট্রাম্প যা করেছেন তা অভিশংসনের যোগ্য।

আসলে ট্রাম্প হলেন আপাদমস্তক বর্ণবাদী এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর প্রতি অসহিষ্ণু এক ব্যক্তি। এক এক সময়ে এক এক ধরনের কথা বলেন। তার শেষ কথা হল, তিনি অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন না। অভিশংসিত হওয়ায় তিনি তার অবস্থান পাল্টেছেন। ইতোমধ্যে বেশ ক’টি রাজ্যে ট্রাম্প সমর্থকরা হাঙামা করেছে। অনেকে মনে করছেন, এর পেছনে নিশ্চয়ই ট্রাম্পের মদদ আছে।

এ ধারণা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অত্যন্ত আক্রমণাত্মক আচরণ ট্রাম্পের। তা না হলে গণতন্ত্রের ২০০ বছরের ঐতিহ্য নিয়ে গর্বিত যুক্তরাষ্ট্রের মাথা বিশ্ববাসীর সামনে এভাবে তিনি নত করিয়ে দিতে পারতেন না। খুবই উচ্ছৃঙ্খল ও খামখেয়ালি মানুষ ট্রাম্প।

এক সময়ে তো রেসলিংয়ের রিংয়ের পাশে প্রায়ই হাঙামায় জড়িয়ে পড়তেন তিনি। তার এই উচ্ছৃঙ্খলতা ছেলেবেলাতেও দেখা গেছে। নানা অপরাধ করে বেড়িয়েছেন তিনি। কলেজে ভর্তি হওয়া নিয়েও তার বিরুদ্ধে আছে মস্ত বড় এক ‘কিন্তু’। পরবর্তী সময়ে ব্যবসায়ী ট্রাম্পকে কর ফাঁকি দেওয়ার মতো অপরাধের সঙ্গেও জড়িত থাকতে দেখা গেছে।

মানতেই হবে, এই নিন্দিত মানসিকতা কাজে লাগিয়ে বিভাজনের বিদ্বেষ ছড়িয়ে পুরো জাতিকে দ্বিধাবিভক্ত করার উন্মত্ত খেলায় মেতে ছিলেন ট্রাম্প। খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই সে সময়ে উদার গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদী সমাজ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়।

যেখানে বর্ণবিভাজনের পর্ব পার হয়ে একটা স্বচ্ছ-সুন্দর পরিবেশ তৈরির প্রশংসিত উদাহরণ তৈরি করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সেখানে ছড়িয়ে দেওয়া হয় জাতিগত বিভেদের দাহ এবং তা মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে চারদিক। ক্ষমতা হাতে পেয়ে ট্রাম্প কী-না করেছেন।

তার বর্ণবাদী, ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক ও আক্রমণাত্মক অরাজনৈতিক কথাগুলো বলতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ও নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর হানে মারাত্মক আঘাত। ট্রাম্পের পক্ষের লোকজন এতটাই সহিংস হয়ে ওঠে যে তারা মিসিসিপি রাজ্যে কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত এলাকার একটি গির্জা ও অসংখ্য বাড়িঘরে আগুন পর্যন্ত ধরিয়ে দেয়।

ট্রাম্পের এসব কর্মকাণ্ড আর কথাবার্তা আপাতদৃষ্টিতে এক বেয়াকুবের অসংলগ্ন আচরণ বলে মনে হতে পারে। এ নিয়ে হয়তো অস্থিরতা ও উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। কিন্তু বিষয়টি এভাবে সরলীকরণের অর্থ হলো ট্রাম্পের মূল উদ্দেশ্য আড়াল করা। আমাদের মনে রাখতে হবে, এসব প্রশ্ন তারাই বেশি তুলেছেন যারা ডেমোক্র্যাট, সমাজতন্ত্র ও উদারনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর সমর্থক।

ট্রাম্পের উগ্র কথাবার্তা আর নোংরা জাত্যাভিমান ছড়ানোর পেছনে বিশেষ একটি পরিকল্পনা সক্রিয় ছিল। সেটি হল তিনি সচেতনভাবেই চেয়েছেন, মার্কিনিদের মধ্যে শ্বেতাঙ্গ ও অশ্বেতাঙ্গ বিভেদরেখা, বর্ণবিভাজনের গণ্ডি পরিষ্কার রূপ নিয়ে বিকশিত হোক। জাতিগত বিতৃষ্ণা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন ট্রাম্প। প্রায় ৭০ শতাংশ সাদা মানুষ ছিল তার লক্ষ্য। তিনি মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন জাতিগত নিপীড়নের মধ্য দিয়ে সাদাদের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। মানুষকে উসকিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তার জুড়ি মেলা সত্যিই ভার।

বাইডেনের কাছে সুস্পষ্ট ব্যবধানে পরাজিত হওয়ার পরও জনগণের ম্যান্ডেড না মানার মধ্য দিয়ে ট্রাম্প কার্যত তার উৎকট জবরদস্তি মানসিকতাকেই বড় করে তুলে ধরেছেন। শেষ অবধি তিনি নিজেকে এমন এক চরম জায়গায় নিয়ে গেছেন, যেখানে অর্থাৎ হোয়াইট হাউসে দাঁড়িয়ে তার পক্ষে সম্ভব হয়েছে আপন ‘সমর্থক’ বাহিনীকে ক্যাপিটল হিলে আক্রমণে প্ররোচিত করা। ৬ জানুয়ারির উন্মাতাল লঙ্কাকাণ্ডই তার প্রমাণ।

যে বিষাক্ত বিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছে মার্কিনিদের ভেতরে; বাইডেনের আনুষ্ঠানিক অভিষেকে এবং সেই অভিষেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘স্বীকৃতি’দানের মধ্য দিয়ে তার সমাপ্তি ঘটবে, এটা আশা করা কোনোমতেই ঠিক হবে না। সমাজের ভেতরে, বিশেষ করে শেতাঙ্গদের একটা বড় অংশের মানসিকতায় ট্রাম্প বিভাজনের বীজ বপণ করে গেছেন। এ গভীর ও জটিল রোগ সারানোর দায়িত্ব বহন করতে হবে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে এবং কংগ্রেসের দুই সভায় চালকের আসনে অধিষ্ঠিত ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধিদের।

এটি একটি কঠিন পরীক্ষা। এর চেয়ে আরও বড় পরীক্ষার মুখোমুখি এখন রিপাবলিকান পার্টি। এ দলের অনেক নেতাই ট্রাম্প ও তার বাহিনীর আচরণে তীব্র প্রতিবাদমুখর। তারা জানেন, ট্রাম্পের এ স্বৈরাচারী মনোভাবকে উৎখাত করতে না পারলে নিজ নিজ এলাকার ভোটারদের কাছে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি তো হতেই হবে, এমনকি তাদের আস্থা হারানোর ঝুঁকিও দেখা দিতে পারে।

তাই রিপাবলিকান পার্টির কোনো কোনো নেতা ট্রাম্পের দেখানো অসহিষ্ণু ও হিংস বিদ্বেষের পথ থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছেন এবং গণতান্ত্রিক আমেরিকার ভবিষ্যৎ সুস্থ ও সুন্দর করার লক্ষ্যে গণতন্ত্রের পক্ষে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছেন।

তবে এ কথা মানতেই হবে, ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার শিবিরের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমাগত লড়াই, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ ছিল সত্যিই প্রশংসনীয়। তাই মার্কিন সমাজদেহে যে বিষবৃক্ষ রোপিত হয়েছে, সেই অতিবিভাজনের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে ২০ জানুয়ারি থেকে খুব সতর্কভাবে পা ফেলে লক্ষ্যাভিমুখে এগিয়ে যেতে হবে জো বাইডেনকে।

সন্দেহ নেই, জো বাইডেন খুবই সতর্ক। এ জন্য তাকে বেছে নিতে হয়েছে নতুন এক পথ। তার মন্ত্র হল দ্বিখণ্ডিত নয়, ঐক্যবদ্ধ দেশ ও জাতি চাই। কোভিডোত্তর পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য দরকার এই ঐক্য। হাউস ও সিনেটের বিভেদে গত চার বছর বারবার থেমে গেছে আমেরিকার অর্থনীতির চাকা। শুধু প্রথাগত রাজনৈতিক আদর্শ দিয়ে এ অর্থনীতি সচল রাখা সম্ভব নয়। এ জন্য করপোরেট আমেরিকারও সাহায্য প্রয়োজন। এ ছাড়া বাইডেনের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি বা লিঙ্গভিত্তিক পারিশ্রমিক-বৈষম্যের অবসান।

মহিলা ও তরুণদের নিয়ে বাইডেনের আশা আরও বেশি। সমাজের এ দু’অংশের স্বার্থের কথা ভেবে তাকে দিতে হয়েছে দুই বিলিয়ন ডলারের এক ‘গ্রিন নিউ ডিল’ ঘোষণা। সে টাকা করপোরেট আমেরিকাকে না রাগিয়ে কীভাবে তোলা যায়, তা এখনো স্পষ্ট নয়- আর সে প্রশ্ন তুলতেও উৎসাহী নন শিক্ষিত, উদারপন্থী আমজনতা। তবে বিষয়টি নিয়ে তাকে সতর্কভাবে এগিয়ে যেতে হবে।

তার সামনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল জীবাশ্ম জ্বালানি। নির্বাচনী প্রচারণার সময় সর্বশেষ টিভি-বিতর্কে জো বাইডেন মুখ-ফসকে বলে ফেলেছিলেন, নির্বাচিত হলে তার প্রশাসন জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসবে এবং সৌরশক্তি ও বাতাসে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের দিকে মনোযোগ দেবে। কথাটা বলার পর তিনি বুঝতে পেরেছেন এটা বলা তার ঠিক হয়নি। কারণ পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় দুই কোটি মানুষের রুজি-রুটি হুমকিকবলিত হয়ে পড়বে। তাই তিনি বিতর্ক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, নির্বাচিত হলে তার প্রশাসন তেল-গ্যাসের ব্যবহার বন্ধ করবে না। প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যাপারেও তাকে সত্যিই বিকল্প পথ খুঁজে বের করতে হবে।

আমরা জানি, প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এখন আশা করা যায়, সে অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের ১৮৭টি দেশের সঙ্গে একমত হয়ে প্যারিসে যে জলবায়ু চুক্তি করেছিল, সেখানে আবার ফিরে আসবে দেশটি। চুক্তিতে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলা ছিল।

হ্যাঁ, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে জো বাইডেনকে সতর্কভাবে পা ফেলতে হবে মাটিতে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সংকটময় রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিভক্ত জাতিকে ঐক্যের অমিয় বাণী শোনানোর প্রস্তুতি নিয়েছেন তিনি। তার এ আহ্বানের সময় তার পাশে উপস্থিত থাকবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এবং সাবেক প্রেসিডেন্টদের মধ্যে বারাক ওবামা, জর্জ বুশ এবং বিল ক্লিনটন। জো বাইডেনের ঐক্যের আহ্বান কতটা কার্যকর হবে, তা আগামী দিনগুলোই বলে দেবে।

আতাহার খান : সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা, কবি