গণতন্ত্র ও ধর্মীয় সহনশীলতা সমাচার
jugantor
শতফুল ফুটতে দাও
গণতন্ত্র ও ধর্মীয় সহনশীলতা সমাচার

  ড. মাহবুব উল্লাহ্  

২১ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং তৎপরবর্তীকালে ক্ষমতা হস্তান্তরের মুহূর্ত পর্যন্ত সময় কাটছে বড় ধরনের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাচনের ফলাফল মানতে চাননি এবং নির্বাচনের ঘোষিত ফলাফলের বিরুদ্ধে বেশ কিছু আদালতে মামলা করেছেন। কোনো আদালতই ট্রাম্পের আবেদন গ্রহণ করতে রাজি হয়নি।

এর পাশাপাশি সহিংসতার পারদ ঊর্ধ্বগামী হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা হস্তান্তরে নিমরাজি হলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন না। তিনি ফ্লোরিডায় অবকাশ যাপনের জন্য পামবিচে যে প্রাসাদোপম বাড়ি বানিয়েছেন সেখানে এ সময় অবস্থান করবেন বলে জানিয়ে দিয়েছেন।

বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করতে গিয়ে অনেকেই বলেন, এ দেশের দুই প্রধান নেত্রীর মধ্যে মুখ দেখাদেখির কালচার নেই। বাংলাদেশে এমনটি হতেই পারে। কারণ বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অনুন্নত এবং সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চার ঐতিহ্য এখানে গড়ে ওঠেনি।

ট্রাম্প ৮ কোটিরও বেশি সাধারণ ভোটারের ভোট পেয়েছেন। এতেই বোঝা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের একটি বিরাট অংশ ট্রাম্পের উগ্র মতবাদে বিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন। মার্কিন সমাজ এখন কঠিন মেরুকরণের মধ্য দিয়ে চলেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এ মেরুকরণের মূল বৈশিষ্ট্য হলো হোয়াইট সুপ্রিমেসিস্ট চিন্তা-ভাবনার উত্থান। অবস্থা অত্যন্ত বিপজ্জনক।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শ্বেতাঙ্গ নাগরিকদের অনেকেই মনে করেন তারা নানা বর্ণের অশ্বেতাঙ্গদের চেয়ে সবদিক থেকে শ্রেষ্ঠ। এর পরিণতি হবে সাদা ও কালো মানুষদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিও-পপুলিজমের রাজনীতি গভীরভাবে দানা বেঁধেছে। এর ফলে বর্ণবাদ থেকে শুরু করে ধর্মভিত্তিক পরিচয় চর্চাকারীদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘাতের সৃষ্টি হবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কালো মানুষরা তাদের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচুর লড়াই-সংগ্রাম করেছে। এত বছরের লড়াই-সংগ্রামের পর যদি দেখা যায় ভেদরেখাটি আরও তীব্র এবং অমোচনীয় হয়ে উঠেছে, তাহলে বুঝতে হবে যে গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে চেয়েছে তা কার্যত নিরর্থক হতে চলেছে।

বস্তুত মার্কিন সভ্যতা বলে তেমন কিছু গড়ে ওঠেনি। অথচ দেশটি বিশ্ব মোড়লের আসনে আসীন। মনে হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর এক নম্বর শক্তি হিসাবে তার আসনটি আর ধরে রাখতে পারবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ অর্জন হলো তার প্রযুক্তি। প্রযুক্তি ছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনেক জ্ঞানী-গুণী এবং দার্শনিক মানুষ আছেন।

তারা শিল্প, সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস ও সমাজ বিশ্লেষণে অনন্য অবদান রেখে চলেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন অন্য দেশে সৈন্য পাঠিয়ে আগ্রাসন চালায় তখন ব্যথিত হই। আবার যখন তার শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতবর্গের রচিত গ্রন্থাবলি পাঠ করে নিজেকে উন্নতমানের জ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত করতে সক্ষম হই তখন এক ধরনের স্বর্গীয় আনন্দ অনুভব করি। প্রযুক্তি এবং উন্নতমানের ধ্যান-ধারণার চর্চা সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি সভ্যতায় পরিণত হতে পারেনি। এ ব্যর্থতা নিহিত আছে মার্কিন সমাজের বহুবিধ ফাটলের মধ্যে।

ট্রাম্পপন্থিরা সশস্ত্র বিক্ষোভের চেষ্টা করবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে ওয়াশিংটনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ২০ হাজার ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করা হয়েছে। এরা শক্তিশালী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। যদি ট্রাম্পন্থিরা সশস্ত্র মিছিল করার প্রয়াস পায় তাহলে রক্তাক্ত সংঘর্ষের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমাদের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ পরিস্থিতি থেকে শিক্ষণীয় বিষয় হলো, কৃত্রিম বন্ধনে আবদ্ধ একটি জনগোষ্ঠী না পারে তাদের অর্জনগুলো ধরে রাখতে, না পারে একটি সভ্যতা গড়ে তুলতে।

আমরা দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ। আমাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি বহু পুরনো। এখানে এক সময় বৈদিক সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। এ সভ্যতার মূল্যবোধগুলো এসেছে বিভিন্ন বেদের শিক্ষা থেকে। দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশে হরপ্পা মহেঞ্জোদারোর মতো সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। মুঘলরা উন্নতমানের সমরাস্ত্র তৈরিতে মনোযোগ দেয়নি। তারা সমুদ্রের ওপর প্রভাব বজায় রাখার জন্য শক্তিশালী নৌবহরও গড়ে তোলেনি।

তবে বাস্তুকলায় প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে। এমনকি চিকিৎসা শাস্ত্রেও দক্ষিণ এশিয়ার অবদান কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়। এসব সত্ত্বেও এ অঞ্চলে ইংরেজ শাসকদের ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাস পর্যালোচনা না করে আমরা যদি ১৯০০ সাল থেকে এ অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর দিকে তাকাই, তাহলে বুঝতে পারব আমাদের সমস্যার মূলে কী আছে। ১৯০০ সালের দিকে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের প্রায় সবখানে কিছু না কিছু মুসলিম জনগোষ্ঠী ছিল। তারা আঞ্চলিক সমাজের অচ্ছেদ্য গোষ্ঠী হিসেবে বিরাজ করত।

এ জনগোষ্ঠী বিভিন্ন লোকালয়ে নৃ-তাত্ত্বিক ভিত্তিতে সংগঠিত ছিল। তাদের ছিল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় নেতৃত্ব। এরা যথেষ্ট সম্মান ও গুরুত্ব অর্জন করেছিলেন। মুসলিম সমাজের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল এর ইসলামভিত্তিক পরিচিতি। মুসলমানরা নিজেদের উম্মাহর অন্তর্গত মনে করত।

তারা স্থানীয়ভাবে ধর্মকর্ম করলেও ধর্মতাত্ত্বিকভাবে সব মুসলমানকে একটি আধ্যাত্মিক সম্প্রদায় বলে মনে করত। মুসলিম পর্যটকরা তৎকালে এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশেই গেছে। এদের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন এবং বিক্ষিপ্ত মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি যোগাযোগ সৃষ্টি হয়। এমনকি বাঙালি কৃষকরা যখন নতুন জায়গায় গিয়ে আবাসস্থল প্রতিষ্ঠিত করেছে, তখন এর ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সামাজিক সমষ্টিগত পরিবর্তন এসেছে।

ইতিহাসের বিচারে দক্ষিণ এশিয়া বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বেরই অংশ ছিল। আফ্রিকা থেকে ফিলিপাইন পর্যন্ত অগণিত রাজনৈতিক এলাকায় মুসলিম সমাজ বিকশিত হয় এবং ছড়িয়ে পড়ে। অষ্টম শতাব্দীতে মুসলিম আরবরা কেরালার উপকূলে বসতি গড়ে তোলে। আরব বণিকরা ভারত মহাসাগরের তীরবর্তী অঞ্চলে অনেক বসতি গড়ে তোলে।

এগুলোর বিস্তৃতি ছিল জানজিবার থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত। ১৩০০ সালের পর তুর্কি, আফগান এবং পার্শিয়ান পরিব্রাজকরা ভারতে আসে। তারা বসতি স্থাপনের জন্য শহর ও নগরগুলোকে বেছে নেয়। পর্যটকদের ধর্ম প্রচার এবং স্থানীয়ভাবে ধর্মান্তকরণের ফলে আফগানিস্তান, বেলুচিস্তান, সিন্ধু, পাঞ্জাব এবং বাংলায় বিশালসংখ্যক মুসলিম জনগোষ্ঠী গড়ে ওঠে। মুঘল আমলে ভারত উপমহাদেশে বিভিন্ন শহরে মুসলিম সমাজ বিস্তার লাভ করে।

১৯০০ সাল পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে পশু পালন এবং কৃষির ওপর মুসলিম সমাজগুলো নির্ভরশীল ছিল। বেলুচিস্তান, সিন্ধু, আফগানিস্তান এবং পাঞ্জাবে পশু পালনকারী এবং কৃষির ওপর নির্ভরশীল মুসলমানদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। একই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল আমাদের পূর্ব বাংলায়।

শহুরে মুসলিম সম্প্রদায়গুলো গড়ে উঠেছিল বণিকবৃত্তি, সাহিত্য সাধক, অভিজাতবৃন্দ এবং কারুকলার চর্চাকারীদের দিয়ে। বলতে গেলে গঙ্গার সমভূমি অঞ্চল, দাক্ষিণাত্য, সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চল এবং শ্রীলংকায় একই ঘটনা ঘটেছিল। এসব এলাকায় মুসলিম সমাজগুলোর ইতিহাস ছিল পৃথক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।

স্থানীয়ভাবে নৃ-তাত্ত্বিক সংস্কৃতির সঙ্গে ধর্মের যোগাযোগ ছিল অনেকটাই হালকা। দৃষ্টান্ত হিসাবে বলা যায়, শ্রীলংকার মুসলমানদের বেশিরভাগই তামিল ভাষায় কথা বলে। শ্রীলংকার তামিল এবং ভারতের তামিলরা ঐতিহাসিকভাবে নিজেদের পরিচয় দিত তামিল হিসাবে।

মুসলমান তামিল লেখকরা তামিল সাহিত্যে অনেক অবদান রেখেছে। তামিলনাড়ুর মুসলমানরা নামকরা তামিল জাতীয়তাবাদীতে পরিণত হয় দ্বাদশ শতাব্দীতে। একই ধারায় নৃ-তাত্ত্বিক এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ সর্বত্রই মুসলিম সত্তা ও পরিচয়কে একই রূপে গড়ে তুলেছে।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্য দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সমাজের জন্য একটি নতুন সরকারি পরিবেশ সৃষ্টি করে। সরকারিভাবে মুসলমানদের একটি একক ধর্মীয় গোষ্ঠী হিসাবে শ্রেণিকরণ করা হয়। ভারতীয় মুসলমানরা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলিষ্ঠভাবে জানান দিতে শুরু করে যে, মুসলমানরা হলো ভিন্ন ধরনের ভারতীয়। মুসলিম সমাজ একটি ভিন্ন ধরনের দেশীয় সমাজ হিসাবে রূপান্তরিত হতে শুরু করল। এই যে পার্থক্য তা বিভিন্ন অর্থে পরিস্ফুট হতে থাকল।

১৮৫৭-এর বিদ্রোহের পর সাম্রাজ্যবাদী কর্তৃপক্ষের জন্য মুসলিম পরিচয় একটি ভয়ের উৎস হিসাবে দাঁড়িয়ে গেল। ১৮৭১ সালে মুসলিম জনগোষ্ঠী একটি একক জনগোষ্ঠীতে পরিণত হলো। লর্ড ম্যায়ো, ডব্লিউডব্লিউ হান্টারের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করেন।

এর উদ্দেশ্য ছিল জনগোষ্ঠী হিসাবে মুসলমানরা শাসকদের জন্য কতটা বিপজ্জনক তা নির্ণয় করা। বঙ্গদেশে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কিছু ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখলেন যার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেল বাঙালি মুসলমানরা বাঙালি হিন্দুদের জন্য কত বড় বিপদ হতে পারে। পাঞ্জাবে আর্যসমাজ সব মুসলমানকে হিন্দুর দেশে বিদেশি হিসাবে চিহ্নিত করল।

মুসলিম সম্প্রদায় তাদের সামাজিক পরিমণ্ডলে পৃথক সত্তার অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে শুরু করল। সরকারি দলিলপত্রে তারা চিহ্নিত হলো ভিন্ন ধরনের ভারতীয় হিসাবে। ফলে গণকর্মকাণ্ডে মুসলমানদের একটি ভিন্ন পরিচয় দাঁড়িয়ে গেল। মুসলমানদের মধ্যে যারা সরকারের কাছে নানা দাবি দাওয়া নিয়ে দরখাস্ত পেশ করত, এসব দরখাস্তের মাধ্যমে তারা তাদের একক ও অভিন্ন পরিচয়ও তুলে ধরত।

এসব দলিল দস্তাবেজে স্থানীয় পরিমণ্ডলে তাদের সামাজিক বৈশিষ্ট্যের কোনো প্রতিফলন থাকত না। এর ফলে ধর্ম প্রচারক, সুফি পণ্ডিতবর্গ, মিশনারি, আধ্যাত্মবাদী, কবি এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মী, এমনকি পেশাদার রাজনীতিবিদরা মুসলিম সম্প্রদায়ের ইস্যুগুলো ইসলামি বাগধারায় তুলে ধরত।

মুসলমান সম্প্রদায়ের অভিন্ন সমস্যা তুলে ধরতে গিয়ে যেভাবে মুসলিম বাগধারা ব্যবহৃত হতো, তাতে পরিষ্কার হয়ে গেল যে মুসলমানরা তাদের সমস্যা চিত্রিত করতে এমন সব শব্দ ব্যবহার করত যেগুলো আঞ্চলিক পরিমণ্ডল থেকে আসেনি। বাংলাদেশে এখন ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী এবং তাদের বিরোধীদের দ্বন্দ্ব তীব্র হয়ে উঠেছে।

এ দুটি পরস্পরবিরোধী মতবাদে বিশ্বাসীরা একে অপরকে সহ্য করতে চায় না। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা মূলত তাদের কর্মকাণ্ড শহরাঞ্চলগুলোতে চালায়। তারা প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার আশ্রয় গ্রহণ করে। অন্যদিকে ওয়াজ দাওয়াত নামক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাদের মতবাদ তুলে ধরে। এসব কর্মকাণ্ডে লোক সমাগমও হয় প্রচুর।

দাওয়াতি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত মাওলানা সাহেবরা বেশ কিছু শব্দ ব্যবহার করেন যেগুলো বাংলায় সচরাচর ব্যবহৃত হয় না। তবে ব্যবহার করতে করতে এসব শব্দগুচ্ছ এবং বাগধারা বাংলা অভিধানে একদিন অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। ঔপনিবেশিক শাসন মুসলমানদের দক্ষিণ এশিয়ায় এক সুরে কথা বলতে উৎসাহিত করে।

এখন সরাসরি উপনিবেশবাদ নেই, কিন্তু মুসলিম সমাজ দ্বিভক্ত হয়ে পড়ছে। এর ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য বৃদ্ধি পাবে। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা পাশ্চাত্যের রেনেসাঁস থেকে তাদের প্রেরণা পান। তারা একটু যত্নবান হলে দেখতে পেতেন প্রাচ্যের সহনশীলতাবোধের দৃষ্টান্ত কম উজ্জ্বল নয়।

পাশ্চাত্যে রোমান ক্যাথলিক চার্চ জনগণ, এমনকি রাজাকে নিয়ন্ত্রণ করত। সে কারণেই রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা করার দাবি উঠেছিল। কিন্তু প্রাচ্যে রাজা-বাদশা অথবা রাষ্ট্রের ওপর ধর্ম প্রচারকরা যুগে যুগে নির্ভরশীর ছিলেন। এখানে কখনো চার্চের মতো দোর্দণ্ড প্রতাপশালী প্রতিষ্ঠান ছিল না, যে প্রতিষ্ঠান অত্যাচার ও ইনকুইজিশনের আশ্রয় নিয়েছিল।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

শতফুল ফুটতে দাও

গণতন্ত্র ও ধর্মীয় সহনশীলতা সমাচার

 ড. মাহবুব উল্লাহ্ 
২১ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং তৎপরবর্তীকালে ক্ষমতা হস্তান্তরের মুহূর্ত পর্যন্ত সময় কাটছে বড় ধরনের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাচনের ফলাফল মানতে চাননি এবং নির্বাচনের ঘোষিত ফলাফলের বিরুদ্ধে বেশ কিছু আদালতে মামলা করেছেন। কোনো আদালতই ট্রাম্পের আবেদন গ্রহণ করতে রাজি হয়নি।

এর পাশাপাশি সহিংসতার পারদ ঊর্ধ্বগামী হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা হস্তান্তরে নিমরাজি হলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন না। তিনি ফ্লোরিডায় অবকাশ যাপনের জন্য পামবিচে যে প্রাসাদোপম বাড়ি বানিয়েছেন সেখানে এ সময় অবস্থান করবেন বলে জানিয়ে দিয়েছেন।

বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করতে গিয়ে অনেকেই বলেন, এ দেশের দুই প্রধান নেত্রীর মধ্যে মুখ দেখাদেখির কালচার নেই। বাংলাদেশে এমনটি হতেই পারে। কারণ বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অনুন্নত এবং সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চার ঐতিহ্য এখানে গড়ে ওঠেনি।

ট্রাম্প ৮ কোটিরও বেশি সাধারণ ভোটারের ভোট পেয়েছেন। এতেই বোঝা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের একটি বিরাট অংশ ট্রাম্পের উগ্র মতবাদে বিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন। মার্কিন সমাজ এখন কঠিন মেরুকরণের মধ্য দিয়ে চলেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এ মেরুকরণের মূল বৈশিষ্ট্য হলো হোয়াইট সুপ্রিমেসিস্ট চিন্তা-ভাবনার উত্থান। অবস্থা অত্যন্ত বিপজ্জনক।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শ্বেতাঙ্গ নাগরিকদের অনেকেই মনে করেন তারা নানা বর্ণের অশ্বেতাঙ্গদের চেয়ে সবদিক থেকে শ্রেষ্ঠ। এর পরিণতি হবে সাদা ও কালো মানুষদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিও-পপুলিজমের রাজনীতি গভীরভাবে দানা বেঁধেছে। এর ফলে বর্ণবাদ থেকে শুরু করে ধর্মভিত্তিক পরিচয় চর্চাকারীদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘাতের সৃষ্টি হবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কালো মানুষরা তাদের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচুর লড়াই-সংগ্রাম করেছে। এত বছরের লড়াই-সংগ্রামের পর যদি দেখা যায় ভেদরেখাটি আরও তীব্র এবং অমোচনীয় হয়ে উঠেছে, তাহলে বুঝতে হবে যে গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে চেয়েছে তা কার্যত নিরর্থক হতে চলেছে।

বস্তুত মার্কিন সভ্যতা বলে তেমন কিছু গড়ে ওঠেনি। অথচ দেশটি বিশ্ব মোড়লের আসনে আসীন। মনে হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর এক নম্বর শক্তি হিসাবে তার আসনটি আর ধরে রাখতে পারবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ অর্জন হলো তার প্রযুক্তি। প্রযুক্তি ছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনেক জ্ঞানী-গুণী এবং দার্শনিক মানুষ আছেন।

তারা শিল্প, সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস ও সমাজ বিশ্লেষণে অনন্য অবদান রেখে চলেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন অন্য দেশে সৈন্য পাঠিয়ে আগ্রাসন চালায় তখন ব্যথিত হই। আবার যখন তার শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতবর্গের রচিত গ্রন্থাবলি পাঠ করে নিজেকে উন্নতমানের জ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত করতে সক্ষম হই তখন এক ধরনের স্বর্গীয় আনন্দ অনুভব করি। প্রযুক্তি এবং উন্নতমানের ধ্যান-ধারণার চর্চা সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি সভ্যতায় পরিণত হতে পারেনি। এ ব্যর্থতা নিহিত আছে মার্কিন সমাজের বহুবিধ ফাটলের মধ্যে।

ট্রাম্পপন্থিরা সশস্ত্র বিক্ষোভের চেষ্টা করবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে ওয়াশিংটনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ২০ হাজার ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করা হয়েছে। এরা শক্তিশালী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। যদি ট্রাম্পন্থিরা সশস্ত্র মিছিল করার প্রয়াস পায় তাহলে রক্তাক্ত সংঘর্ষের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমাদের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ পরিস্থিতি থেকে শিক্ষণীয় বিষয় হলো, কৃত্রিম বন্ধনে আবদ্ধ একটি জনগোষ্ঠী না পারে তাদের অর্জনগুলো ধরে রাখতে, না পারে একটি সভ্যতা গড়ে তুলতে।

আমরা দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ। আমাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি বহু পুরনো। এখানে এক সময় বৈদিক সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। এ সভ্যতার মূল্যবোধগুলো এসেছে বিভিন্ন বেদের শিক্ষা থেকে। দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশে হরপ্পা মহেঞ্জোদারোর মতো সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। মুঘলরা উন্নতমানের সমরাস্ত্র তৈরিতে মনোযোগ দেয়নি। তারা সমুদ্রের ওপর প্রভাব বজায় রাখার জন্য শক্তিশালী নৌবহরও গড়ে তোলেনি।

তবে বাস্তুকলায় প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে। এমনকি চিকিৎসা শাস্ত্রেও দক্ষিণ এশিয়ার অবদান কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়। এসব সত্ত্বেও এ অঞ্চলে ইংরেজ শাসকদের ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাস পর্যালোচনা না করে আমরা যদি ১৯০০ সাল থেকে এ অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর দিকে তাকাই, তাহলে বুঝতে পারব আমাদের সমস্যার মূলে কী আছে। ১৯০০ সালের দিকে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের প্রায় সবখানে কিছু না কিছু মুসলিম জনগোষ্ঠী ছিল। তারা আঞ্চলিক সমাজের অচ্ছেদ্য গোষ্ঠী হিসেবে বিরাজ করত।

এ জনগোষ্ঠী বিভিন্ন লোকালয়ে নৃ-তাত্ত্বিক ভিত্তিতে সংগঠিত ছিল। তাদের ছিল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় নেতৃত্ব। এরা যথেষ্ট সম্মান ও গুরুত্ব অর্জন করেছিলেন। মুসলিম সমাজের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল এর ইসলামভিত্তিক পরিচিতি। মুসলমানরা নিজেদের উম্মাহর অন্তর্গত মনে করত।

তারা স্থানীয়ভাবে ধর্মকর্ম করলেও ধর্মতাত্ত্বিকভাবে সব মুসলমানকে একটি আধ্যাত্মিক সম্প্রদায় বলে মনে করত। মুসলিম পর্যটকরা তৎকালে এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশেই গেছে। এদের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন এবং বিক্ষিপ্ত মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি যোগাযোগ সৃষ্টি হয়। এমনকি বাঙালি কৃষকরা যখন নতুন জায়গায় গিয়ে আবাসস্থল প্রতিষ্ঠিত করেছে, তখন এর ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সামাজিক সমষ্টিগত পরিবর্তন এসেছে।

ইতিহাসের বিচারে দক্ষিণ এশিয়া বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বেরই অংশ ছিল। আফ্রিকা থেকে ফিলিপাইন পর্যন্ত অগণিত রাজনৈতিক এলাকায় মুসলিম সমাজ বিকশিত হয় এবং ছড়িয়ে পড়ে। অষ্টম শতাব্দীতে মুসলিম আরবরা কেরালার উপকূলে বসতি গড়ে তোলে। আরব বণিকরা ভারত মহাসাগরের তীরবর্তী অঞ্চলে অনেক বসতি গড়ে তোলে।

এগুলোর বিস্তৃতি ছিল জানজিবার থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত। ১৩০০ সালের পর তুর্কি, আফগান এবং পার্শিয়ান পরিব্রাজকরা ভারতে আসে। তারা বসতি স্থাপনের জন্য শহর ও নগরগুলোকে বেছে নেয়। পর্যটকদের ধর্ম প্রচার এবং স্থানীয়ভাবে ধর্মান্তকরণের ফলে আফগানিস্তান, বেলুচিস্তান, সিন্ধু, পাঞ্জাব এবং বাংলায় বিশালসংখ্যক মুসলিম জনগোষ্ঠী গড়ে ওঠে। মুঘল আমলে ভারত উপমহাদেশে বিভিন্ন শহরে মুসলিম সমাজ বিস্তার লাভ করে।

১৯০০ সাল পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে পশু পালন এবং কৃষির ওপর মুসলিম সমাজগুলো নির্ভরশীল ছিল। বেলুচিস্তান, সিন্ধু, আফগানিস্তান এবং পাঞ্জাবে পশু পালনকারী এবং কৃষির ওপর নির্ভরশীল মুসলমানদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। একই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল আমাদের পূর্ব বাংলায়।

শহুরে মুসলিম সম্প্রদায়গুলো গড়ে উঠেছিল বণিকবৃত্তি, সাহিত্য সাধক, অভিজাতবৃন্দ এবং কারুকলার চর্চাকারীদের দিয়ে। বলতে গেলে গঙ্গার সমভূমি অঞ্চল, দাক্ষিণাত্য, সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চল এবং শ্রীলংকায় একই ঘটনা ঘটেছিল। এসব এলাকায় মুসলিম সমাজগুলোর ইতিহাস ছিল পৃথক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।

স্থানীয়ভাবে নৃ-তাত্ত্বিক সংস্কৃতির সঙ্গে ধর্মের যোগাযোগ ছিল অনেকটাই হালকা। দৃষ্টান্ত হিসাবে বলা যায়, শ্রীলংকার মুসলমানদের বেশিরভাগই তামিল ভাষায় কথা বলে। শ্রীলংকার তামিল এবং ভারতের তামিলরা ঐতিহাসিকভাবে নিজেদের পরিচয় দিত তামিল হিসাবে।

মুসলমান তামিল লেখকরা তামিল সাহিত্যে অনেক অবদান রেখেছে। তামিলনাড়ুর মুসলমানরা নামকরা তামিল জাতীয়তাবাদীতে পরিণত হয় দ্বাদশ শতাব্দীতে। একই ধারায় নৃ-তাত্ত্বিক এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ সর্বত্রই মুসলিম সত্তা ও পরিচয়কে একই রূপে গড়ে তুলেছে।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্য দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সমাজের জন্য একটি নতুন সরকারি পরিবেশ সৃষ্টি করে। সরকারিভাবে মুসলমানদের একটি একক ধর্মীয় গোষ্ঠী হিসাবে শ্রেণিকরণ করা হয়। ভারতীয় মুসলমানরা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলিষ্ঠভাবে জানান দিতে শুরু করে যে, মুসলমানরা হলো ভিন্ন ধরনের ভারতীয়। মুসলিম সমাজ একটি ভিন্ন ধরনের দেশীয় সমাজ হিসাবে রূপান্তরিত হতে শুরু করল। এই যে পার্থক্য তা বিভিন্ন অর্থে পরিস্ফুট হতে থাকল।

১৮৫৭-এর বিদ্রোহের পর সাম্রাজ্যবাদী কর্তৃপক্ষের জন্য মুসলিম পরিচয় একটি ভয়ের উৎস হিসাবে দাঁড়িয়ে গেল। ১৮৭১ সালে মুসলিম জনগোষ্ঠী একটি একক জনগোষ্ঠীতে পরিণত হলো। লর্ড ম্যায়ো, ডব্লিউডব্লিউ হান্টারের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করেন।

এর উদ্দেশ্য ছিল জনগোষ্ঠী হিসাবে মুসলমানরা শাসকদের জন্য কতটা বিপজ্জনক তা নির্ণয় করা। বঙ্গদেশে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কিছু ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখলেন যার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেল বাঙালি মুসলমানরা বাঙালি হিন্দুদের জন্য কত বড় বিপদ হতে পারে। পাঞ্জাবে আর্যসমাজ সব মুসলমানকে হিন্দুর দেশে বিদেশি হিসাবে চিহ্নিত করল।

মুসলিম সম্প্রদায় তাদের সামাজিক পরিমণ্ডলে পৃথক সত্তার অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে শুরু করল। সরকারি দলিলপত্রে তারা চিহ্নিত হলো ভিন্ন ধরনের ভারতীয় হিসাবে। ফলে গণকর্মকাণ্ডে মুসলমানদের একটি ভিন্ন পরিচয় দাঁড়িয়ে গেল। মুসলমানদের মধ্যে যারা সরকারের কাছে নানা দাবি দাওয়া নিয়ে দরখাস্ত পেশ করত, এসব দরখাস্তের মাধ্যমে তারা তাদের একক ও অভিন্ন পরিচয়ও তুলে ধরত।

এসব দলিল দস্তাবেজে স্থানীয় পরিমণ্ডলে তাদের সামাজিক বৈশিষ্ট্যের কোনো প্রতিফলন থাকত না। এর ফলে ধর্ম প্রচারক, সুফি পণ্ডিতবর্গ, মিশনারি, আধ্যাত্মবাদী, কবি এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মী, এমনকি পেশাদার রাজনীতিবিদরা মুসলিম সম্প্রদায়ের ইস্যুগুলো ইসলামি বাগধারায় তুলে ধরত।

মুসলমান সম্প্রদায়ের অভিন্ন সমস্যা তুলে ধরতে গিয়ে যেভাবে মুসলিম বাগধারা ব্যবহৃত হতো, তাতে পরিষ্কার হয়ে গেল যে মুসলমানরা তাদের সমস্যা চিত্রিত করতে এমন সব শব্দ ব্যবহার করত যেগুলো আঞ্চলিক পরিমণ্ডল থেকে আসেনি। বাংলাদেশে এখন ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী এবং তাদের বিরোধীদের দ্বন্দ্ব তীব্র হয়ে উঠেছে।

এ দুটি পরস্পরবিরোধী মতবাদে বিশ্বাসীরা একে অপরকে সহ্য করতে চায় না। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা মূলত তাদের কর্মকাণ্ড শহরাঞ্চলগুলোতে চালায়। তারা প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার আশ্রয় গ্রহণ করে। অন্যদিকে ওয়াজ দাওয়াত নামক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাদের মতবাদ তুলে ধরে। এসব কর্মকাণ্ডে লোক সমাগমও হয় প্রচুর।

দাওয়াতি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত মাওলানা সাহেবরা বেশ কিছু শব্দ ব্যবহার করেন যেগুলো বাংলায় সচরাচর ব্যবহৃত হয় না। তবে ব্যবহার করতে করতে এসব শব্দগুচ্ছ এবং বাগধারা বাংলা অভিধানে একদিন অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। ঔপনিবেশিক শাসন মুসলমানদের দক্ষিণ এশিয়ায় এক সুরে কথা বলতে উৎসাহিত করে।

এখন সরাসরি উপনিবেশবাদ নেই, কিন্তু মুসলিম সমাজ দ্বিভক্ত হয়ে পড়ছে। এর ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য বৃদ্ধি পাবে। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা পাশ্চাত্যের রেনেসাঁস থেকে তাদের প্রেরণা পান। তারা একটু যত্নবান হলে দেখতে পেতেন প্রাচ্যের সহনশীলতাবোধের দৃষ্টান্ত কম উজ্জ্বল নয়।

পাশ্চাত্যে রোমান ক্যাথলিক চার্চ জনগণ, এমনকি রাজাকে নিয়ন্ত্রণ করত। সে কারণেই রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা করার দাবি উঠেছিল। কিন্তু প্রাচ্যে রাজা-বাদশা অথবা রাষ্ট্রের ওপর ধর্ম প্রচারকরা যুগে যুগে নির্ভরশীর ছিলেন। এখানে কখনো চার্চের মতো দোর্দণ্ড প্রতাপশালী প্রতিষ্ঠান ছিল না, যে প্রতিষ্ঠান অত্যাচার ও ইনকুইজিশনের আশ্রয় নিয়েছিল।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ