বিশুদ্ধ পানির ব্যাপারে সতর্কতা জরুরি
jugantor
বিশুদ্ধ পানির ব্যাপারে সতর্কতা জরুরি

  মীর আব্দুল আলীম  

২১ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশুদ্ধ পানির প্রাপ্যতা মানবাধিকারের অংশ। দেশের মানুষ সে অধিকার কতটা ভোগ করছে? বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আর্সেনিক দূষণ আক্রান্ত মানুষের বসবাস বাংলাদেশে। অগ্রগতি সত্ত্বেও এক কোটি ৯৪ লাখ মানুষ এখনো সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণে থাকা আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করছে।

এছাড়া পানিতে ম্যাঙ্গানিজ, ক্লোরাইড ও লৌহদূষণের কারণেও খাওয়ার পানির মান খারাপ থাকে। বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ পানির উৎসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মানের চেয়ে বেশি মাত্রায় ম্যাঙ্গানিজের উপস্থিতি পাওয়া যায়।

পাহাড়ি এলাকা, শহরের বস্তি, দ্বীপাঞ্চল, উপকূলীয় ও জলাভূমিতে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। এসব জায়গায় বিশ্বাসযোগ্য পানির উৎস পাওয়া কঠিন। সারা দেশের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও হাইজিনের অবস্থা ভালো না হওয়ায় সেগুলো থেকেও জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয় এবং তা নবজাতক ও মাতৃমৃত্যু হার কমানোর অগ্রগতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশে ২০১৫ সালে যত নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে, তার প্রায় ২০ শতাংশই হয়েছে জীবাণু সংক্রমণের কারণে।

প্রতি পাঁচটি পরিবারের মধ্যে দুটি অর্থাৎ বাংলাদেশের ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া দূষিত উৎসের পানি পান করে। আবার ঘরের কল বা টিউবওয়েলের আশপাশ পরিষ্কার না থাকায় বিভিন্ন অণুজীবযুক্ত পানি পানকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৯ কোটি ৯০ লাখ।

এছাড়া ঘনঘন বন্যা, ভূমিধস ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেও পানির উৎস দূষিত হয়ে পড়ে। বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে শৌচাগার উপচে ময়লা ছড়িয়ে পানির উৎস দূষিত হয়ে পড়ে। শিল্পবর্জ্য, সেচের জন্য অতিরিক্ত পানি উত্তোলন এবং জমিতে লবণাক্ততার কারণে সৃষ্ট পরিবেশ দূষণও বাংলাদেশে পানির গুণগত মানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এ অবস্থায় বিশুদ্ধ পানির সংকট কাটছে না, বরং দিন দিন ভয়াবহ হচ্ছে। বাংলাদেশ, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় পানি সংকট অত্যন্ত প্রকট। ওয়াসা এমডির দাবি ‘বর্তমানে ঢাকা ওয়াসা ২২৫ কোটি লিটার পানি প্রতিদিন সরবরাহ করছে। এর বিপরীতে ২০০ থেকে ২১০ কোটি লিটার পানির চাহিদা রয়েছে।

তাহলে রাজধানীতে বিশুদ্ধ পানির এত অভাব কেন? ওয়াসার দাবি, তাদের সরবরাহ করা পানি শতভাগ বিশুদ্ধ। অথচ একটি গবেষণা প্রতিবেদনে জানা যায়, ঢাকা ওয়াসার ৯১ শতাংশ গ্রাহকই পানি ফুটিয়ে পান করেন। তাতেও পানি দুর্গন্ধমুক্ত ও সুপেয় হচ্ছে না। আর বাসাবাড়িতে এ পানি ফোটাতে বছরে পোড়াতে হয় ৩৬ কোটি ৫৭ লাখ ৩৭ হাজার ঘনমিটার গ্যাস, যার আর্থিক মূল্য ৩৩২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।

ঢাকা ওয়াসার পানি দূষিত হওয়ার অনেক কারণের মধ্যে ৪টি প্রধান কারণ বলা যেতে পারে- ১. ভূগর্ভস্থ পানি ছাড়া নদী থেকে সরবরাহ করা পানি সঠিক উপায়ে শোধন না করা ও পানির জলাধারগুলো রক্ষণাবেক্ষণ না করা; তদুপরি শোধনাগারে পানি শোধনের সময় সঠিক পরিমাণে শোধন কেমিক্যাল না দেওয়া ২. পর্যাপ্ত দূরত্ব রক্ষা না করে সমান্তরালে পানির লাইন ও পয়ঃনিষ্কাশন লাইন স্থাপন, নাগরিক সচেতনতার অভাব এবং ওভারহেড ট্যাঙ্ক নিয়মিত পরিষ্কার না করা।

ঢাকা শহরের বহু পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন লাইন যুগ প্রাচীন। সেই কবে স্থাপন করা হয়েছে। এরপর জোড়াতালি ছাড়া কার্যত কিছু করা হয়নি। তদুপরি অনেক ক্ষেত্রে লাইনগুলো গায়ে গায়ে লাগানো। ফলে কোনো কারণে দুটি লাইনের কোনো একটি অংশ ফেটে বা ভেঙে গেলে খাবার পানির সঙ্গে ময়লা-আবর্জনা মিশে যায় ৩. অনেক সময় রাস্তার পাশের বাসিন্দা পানি বা স্যুয়ারেজ লাইন নেওয়ার জন্য লোক নিয়োগ করেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা থাকে অদক্ষ। ফলে কোদাল চালাতে গিয়েও পাইপ ফেটে যায়।

খাবার পানির সঙ্গে ময়লা মিশ্রিত হওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয় ৪. ওভারহেড ট্যাঙ্ক নিয়মিত পরিষ্কার না করাও পানি দূষিত হয়ে পড়ার জন্য কম দায়ী নয়। এর ফলে ট্যাঙ্কে শুধু শেওলা জমা হয় না, ইঁদুর-বিড়াল পড়ে ও পচে-গলে পানি দূষিত ও দুর্গন্ধযুক্ত করে। কী গরম, কী শীত- সারাক্ষণই মনে হয়, গলাটা যদি একটু ভেজানো যেত। কিন্তু তখনই বিপত্তি। যেখানে সেখানের পানি দিয়ে তো আর তৃষ্ণা মেটানো যায় না। পানি বিশুদ্ধ না হলে রয়েছে নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার ভয়। আর গরমে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব যে সবচেয়ে বেশি, তা সবারই জানা।

নিজের স্বাস্থ্য রক্ষার খাতিরে দূষিত পানি পান না করে পানির বিশুদ্ধতা রক্ষার সর্বাত্মক চেষ্টা করা দরকার সবার। এ ব্যাপারে ঢাকা ওয়াসার করণীয় সবচেয়ে বেশি। সার্বিকভাবে ঢাকা শহরের পানি সংকট নিয়ে শিগগিরই কোনো উদ্যোগ না নিলে তা আস্তে আস্তে ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। কথায় আছে, দেওয়ালে পিঠ না ঠেকলে আমরা সচেতন হই না।

ঢাকার পানি সমস্যার সঙ্গে ওয়াসা তথা সরকারের উদাসীনতা দেখে কিন্তু তারই প্রমাণ মেলে। কিন্তু আমরা চাই জীবনরক্ষাকারী বিশুদ্ধ পানি সমস্যার সঠিক সমাধান। পানি সংকট না মিটলে কেবল নগরবাসীই অসুস্থ হয়ে পড়বে না, সমস্যায় পড়বে সরকারও। বাংলাদেশে বিশুদ্ধ পানির সংকটের কারণ বিবিধ। কিন্তু প্রায় সব কারণই মানুষের তৈরি। কারণগুলো হচ্ছে-

১. বাংলাদেশের জনবিস্ফোরণ এ সমস্যার অন্যতম কারণ। প্রতি বছর বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ২.০৭ শতাংশ। বছর বছর এ বিপুল হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকলেও পানিসম্পদ কিন্তু একই থাকছে। ফলে অদূর ভবিষ্যতে প্রচুর মানুষ বিশুদ্ধ পানির অভাবে পড়বে।

২. সাধারণ মানুষের দায়িত্বহীনতাও পানি সমস্যার অন্যতম কারণ। এ ভোগবাদী সমাজে সবাই কেবল নিজের স্বার্থ দেখে। আগামী প্রজন্মের দিকে নজর না দিয়ে নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য পানির ব্যাপারে হয় অমিতব্যয়ী। ফলে পানিসম্পদ আজ খাদের কিনারে এসে পৌঁছেছে।

৩. দ্রুত নগরায়ণও পানি সংকটের অন্যতম কারণ। কোনো নগরে একসঙ্গে বহু লোক বসবাস করায় সেই অঞ্চলের সীমিত পানির ভান্ডারে টান পড়ে। ফলে পানি সমস্যা দেখা দেয়।

৪. দেশে পাম্পের সাহায্যে ভূগর্ভের পানি ব্যবহার করে জমিতে ব্যবহার করাও অন্যতম কারণ।

এখনই বিশুদ্ধ পানির ব্যাপারে বিশেষ সতর্ক হতে হবে সরকারকে। এজন্য বিশুদ্ধ পানির উৎসস্থল নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয় রক্ষায় কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে। বেশি করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি বাড়িতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহৃত পানি পুনঃব্যবহারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

শিল্প-কারখানা, পয়ঃবর্জ্য, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আবর্জনা প্রক্রিয়াজাতকরণ স্থাপনার বর্জ্য নদী বা জলাশয়ে ফেলা বন্ধ করতে হবে। শিল্প-কারখানায় ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (ইটিপি) বাধ্যতামূলক করতে হবে। পানি ব্যবহারে সংযমী হতে জনসাধারণকে উৎসাহী করতে হবে। ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার হ্রাস করা এবং ভূপৃষ্ঠের পানি ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রয়োজনী পরিকল্পনা ও নীতি প্রণয়ন করতে হবে।

পুকুর, দীঘি, খাল-বিল-নদীসহ যে কোনো জলাশয় ভরাট বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পানি পরিশোধনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ ও অবিলম্বে নদীদূষণের প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে।

মীর আব্দুল আলীম : সাংবাদিক, কলামিস্ট

বিশুদ্ধ পানির ব্যাপারে সতর্কতা জরুরি

 মীর আব্দুল আলীম 
২১ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশুদ্ধ পানির প্রাপ্যতা মানবাধিকারের অংশ। দেশের মানুষ সে অধিকার কতটা ভোগ করছে? বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আর্সেনিক দূষণ আক্রান্ত মানুষের বসবাস বাংলাদেশে। অগ্রগতি সত্ত্বেও এক কোটি ৯৪ লাখ মানুষ এখনো সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণে থাকা আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করছে।

এছাড়া পানিতে ম্যাঙ্গানিজ, ক্লোরাইড ও লৌহদূষণের কারণেও খাওয়ার পানির মান খারাপ থাকে। বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ পানির উৎসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মানের চেয়ে বেশি মাত্রায় ম্যাঙ্গানিজের উপস্থিতি পাওয়া যায়।

পাহাড়ি এলাকা, শহরের বস্তি, দ্বীপাঞ্চল, উপকূলীয় ও জলাভূমিতে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। এসব জায়গায় বিশ্বাসযোগ্য পানির উৎস পাওয়া কঠিন। সারা দেশের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও হাইজিনের অবস্থা ভালো না হওয়ায় সেগুলো থেকেও জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয় এবং তা নবজাতক ও মাতৃমৃত্যু হার কমানোর অগ্রগতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশে ২০১৫ সালে যত নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে, তার প্রায় ২০ শতাংশই হয়েছে জীবাণু সংক্রমণের কারণে।

প্রতি পাঁচটি পরিবারের মধ্যে দুটি অর্থাৎ বাংলাদেশের ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া দূষিত উৎসের পানি পান করে। আবার ঘরের কল বা টিউবওয়েলের আশপাশ পরিষ্কার না থাকায় বিভিন্ন অণুজীবযুক্ত পানি পানকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৯ কোটি ৯০ লাখ।

এছাড়া ঘনঘন বন্যা, ভূমিধস ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেও পানির উৎস দূষিত হয়ে পড়ে। বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে শৌচাগার উপচে ময়লা ছড়িয়ে পানির উৎস দূষিত হয়ে পড়ে। শিল্পবর্জ্য, সেচের জন্য অতিরিক্ত পানি উত্তোলন এবং জমিতে লবণাক্ততার কারণে সৃষ্ট পরিবেশ দূষণও বাংলাদেশে পানির গুণগত মানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এ অবস্থায় বিশুদ্ধ পানির সংকট কাটছে না, বরং দিন দিন ভয়াবহ হচ্ছে। বাংলাদেশ, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় পানি সংকট অত্যন্ত প্রকট। ওয়াসা এমডির দাবি ‘বর্তমানে ঢাকা ওয়াসা ২২৫ কোটি লিটার পানি প্রতিদিন সরবরাহ করছে। এর বিপরীতে ২০০ থেকে ২১০ কোটি লিটার পানির চাহিদা রয়েছে।

তাহলে রাজধানীতে বিশুদ্ধ পানির এত অভাব কেন? ওয়াসার দাবি, তাদের সরবরাহ করা পানি শতভাগ বিশুদ্ধ। অথচ একটি গবেষণা প্রতিবেদনে জানা যায়, ঢাকা ওয়াসার ৯১ শতাংশ গ্রাহকই পানি ফুটিয়ে পান করেন। তাতেও পানি দুর্গন্ধমুক্ত ও সুপেয় হচ্ছে না। আর বাসাবাড়িতে এ পানি ফোটাতে বছরে পোড়াতে হয় ৩৬ কোটি ৫৭ লাখ ৩৭ হাজার ঘনমিটার গ্যাস, যার আর্থিক মূল্য ৩৩২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।

ঢাকা ওয়াসার পানি দূষিত হওয়ার অনেক কারণের মধ্যে ৪টি প্রধান কারণ বলা যেতে পারে- ১. ভূগর্ভস্থ পানি ছাড়া নদী থেকে সরবরাহ করা পানি সঠিক উপায়ে শোধন না করা ও পানির জলাধারগুলো রক্ষণাবেক্ষণ না করা; তদুপরি শোধনাগারে পানি শোধনের সময় সঠিক পরিমাণে শোধন কেমিক্যাল না দেওয়া ২. পর্যাপ্ত দূরত্ব রক্ষা না করে সমান্তরালে পানির লাইন ও পয়ঃনিষ্কাশন লাইন স্থাপন, নাগরিক সচেতনতার অভাব এবং ওভারহেড ট্যাঙ্ক নিয়মিত পরিষ্কার না করা।

ঢাকা শহরের বহু পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন লাইন যুগ প্রাচীন। সেই কবে স্থাপন করা হয়েছে। এরপর জোড়াতালি ছাড়া কার্যত কিছু করা হয়নি। তদুপরি অনেক ক্ষেত্রে লাইনগুলো গায়ে গায়ে লাগানো। ফলে কোনো কারণে দুটি লাইনের কোনো একটি অংশ ফেটে বা ভেঙে গেলে খাবার পানির সঙ্গে ময়লা-আবর্জনা মিশে যায় ৩. অনেক সময় রাস্তার পাশের বাসিন্দা পানি বা স্যুয়ারেজ লাইন নেওয়ার জন্য লোক নিয়োগ করেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা থাকে অদক্ষ। ফলে কোদাল চালাতে গিয়েও পাইপ ফেটে যায়।

খাবার পানির সঙ্গে ময়লা মিশ্রিত হওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয় ৪. ওভারহেড ট্যাঙ্ক নিয়মিত পরিষ্কার না করাও পানি দূষিত হয়ে পড়ার জন্য কম দায়ী নয়। এর ফলে ট্যাঙ্কে শুধু শেওলা জমা হয় না, ইঁদুর-বিড়াল পড়ে ও পচে-গলে পানি দূষিত ও দুর্গন্ধযুক্ত করে। কী গরম, কী শীত- সারাক্ষণই মনে হয়, গলাটা যদি একটু ভেজানো যেত। কিন্তু তখনই বিপত্তি। যেখানে সেখানের পানি দিয়ে তো আর তৃষ্ণা মেটানো যায় না। পানি বিশুদ্ধ না হলে রয়েছে নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার ভয়। আর গরমে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব যে সবচেয়ে বেশি, তা সবারই জানা।

নিজের স্বাস্থ্য রক্ষার খাতিরে দূষিত পানি পান না করে পানির বিশুদ্ধতা রক্ষার সর্বাত্মক চেষ্টা করা দরকার সবার। এ ব্যাপারে ঢাকা ওয়াসার করণীয় সবচেয়ে বেশি। সার্বিকভাবে ঢাকা শহরের পানি সংকট নিয়ে শিগগিরই কোনো উদ্যোগ না নিলে তা আস্তে আস্তে ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। কথায় আছে, দেওয়ালে পিঠ না ঠেকলে আমরা সচেতন হই না।

ঢাকার পানি সমস্যার সঙ্গে ওয়াসা তথা সরকারের উদাসীনতা দেখে কিন্তু তারই প্রমাণ মেলে। কিন্তু আমরা চাই জীবনরক্ষাকারী বিশুদ্ধ পানি সমস্যার সঠিক সমাধান। পানি সংকট না মিটলে কেবল নগরবাসীই অসুস্থ হয়ে পড়বে না, সমস্যায় পড়বে সরকারও। বাংলাদেশে বিশুদ্ধ পানির সংকটের কারণ বিবিধ। কিন্তু প্রায় সব কারণই মানুষের তৈরি। কারণগুলো হচ্ছে-

১. বাংলাদেশের জনবিস্ফোরণ এ সমস্যার অন্যতম কারণ। প্রতি বছর বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ২.০৭ শতাংশ। বছর বছর এ বিপুল হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকলেও পানিসম্পদ কিন্তু একই থাকছে। ফলে অদূর ভবিষ্যতে প্রচুর মানুষ বিশুদ্ধ পানির অভাবে পড়বে।

২. সাধারণ মানুষের দায়িত্বহীনতাও পানি সমস্যার অন্যতম কারণ। এ ভোগবাদী সমাজে সবাই কেবল নিজের স্বার্থ দেখে। আগামী প্রজন্মের দিকে নজর না দিয়ে নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য পানির ব্যাপারে হয় অমিতব্যয়ী। ফলে পানিসম্পদ আজ খাদের কিনারে এসে পৌঁছেছে।

৩. দ্রুত নগরায়ণও পানি সংকটের অন্যতম কারণ। কোনো নগরে একসঙ্গে বহু লোক বসবাস করায় সেই অঞ্চলের সীমিত পানির ভান্ডারে টান পড়ে। ফলে পানি সমস্যা দেখা দেয়।

৪. দেশে পাম্পের সাহায্যে ভূগর্ভের পানি ব্যবহার করে জমিতে ব্যবহার করাও অন্যতম কারণ।

এখনই বিশুদ্ধ পানির ব্যাপারে বিশেষ সতর্ক হতে হবে সরকারকে। এজন্য বিশুদ্ধ পানির উৎসস্থল নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয় রক্ষায় কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে। বেশি করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি বাড়িতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহৃত পানি পুনঃব্যবহারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

শিল্প-কারখানা, পয়ঃবর্জ্য, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আবর্জনা প্রক্রিয়াজাতকরণ স্থাপনার বর্জ্য নদী বা জলাশয়ে ফেলা বন্ধ করতে হবে। শিল্প-কারখানায় ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (ইটিপি) বাধ্যতামূলক করতে হবে। পানি ব্যবহারে সংযমী হতে জনসাধারণকে উৎসাহী করতে হবে। ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার হ্রাস করা এবং ভূপৃষ্ঠের পানি ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রয়োজনী পরিকল্পনা ও নীতি প্রণয়ন করতে হবে।

পুকুর, দীঘি, খাল-বিল-নদীসহ যে কোনো জলাশয় ভরাট বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পানি পরিশোধনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ ও অবিলম্বে নদীদূষণের প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে।

মীর আব্দুল আলীম : সাংবাদিক, কলামিস্ট