ট্রাম্প : বিপদের বিদায়; কিন্তু আপদ কি থেকে গেল?
jugantor
একাত্তরের ঝর্নাতলায়
ট্রাম্প : বিপদের বিদায়; কিন্তু আপদ কি থেকে গেল?

  মহিউদ্দিন আহমদ  

২২ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বুধবার ২০ জানুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এই দেশটির ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ গ্রহণের পর যে ভাষণটি দেন, তার দ্বিতীয় কী তৃতীয় বাক্যটি ছিল- Democracy is fragile, democracy is precious; democracy has prevailed.

বস্তুত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চার বছরের মেয়াদকালে এই প্রেসিডেন্ট গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে একের পর এক যেমন হামলা চালিয়ে গেছেন, তেমনটি দেখা যায় তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে।

গত ৬ জানুয়ারি, ওয়াশিংটন ডিসির পার্লামেন্ট ভবনে ট্রাম্প সমর্থকরা যেমন হামলা চালিয়েছে, পার্লামেন্ট ভবনে ভাঙচুর করেছে তা আমেরিকার ইতিহাসে একটি কলঙ্ক হয়ে থাকবে। এমন হামলা-ভাঙচুর আমাদের মতো দেশগুলোতেই দেখা যায়।

ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিলে এমন উচ্ছৃঙ্খলতা দেখে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির এক সাম্প্রতিক অবসরপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ জুনিয়র যথার্থই মন্তব্য করেছিলেন, এমন দৃশ্য তো ব্যানানা রিপাবলিকগুলোতেই দেখা যায়, প্রকৃত উন্নত সভ্য দেশে নয়।

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসাবে ২০১৭-এর ২০ জানুয়ারিতে শপথ নিলেন; আর তারপর থেকে বিশ্ববিখ্যাত দৈনিক ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ তার প্রথম পৃষ্ঠার মাস্টহেডের ঠিক নিচে ছাপাতে শুরু করল, ‘Democracy Dies in Darkness’

বাইডেনের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান দেখার সময় আমার পাশে বসা স্ত্রী বিলকিসকে বলছিলাম, ট্রাম্প জমানায় ‘ডেমোক্রেসির ওপর বিপদ’, ‘ডেমোক্রেসি ইন ডেঞ্জার’, ‘ডেমোক্রেসি ইন ক্রাইসিস’, ডেমোক্রেসি, ডেমোক্রেসি, কতবার যে শুনেছি গুনলে হয়তো তা সংখ্যায় কয়েক লাখ হবে। ডেমোক্রেসির গুরুত্ব বুঝতে এই প্রসঙ্গে উইনস্টন চার্চিলের একটি উক্তি উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি বলেছিলেন, গণতন্ত্রের অনেক দুর্বলতা আছে; কিন্তু এখন পর্যন্ত গণতন্ত্রের বিকল্প হিসাবে উন্নততর কোনো শাসনব্যবস্থা বের করা যায়নি।

কথাটি সত্য। আমরা দেখি ডেমোক্রেসি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবেন বলে সব রকমের স্বৈরশাসকরাও অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে আইনি বৈধতা এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার জন্য ঘোষণা দিয়ে থাকেন।

আমাদের বয়সি প্রবীণ লোকজনের স্মৃতিতে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রের কথা (Basic Democracy) এখনো জ্বলজ্বল করে। বাংলাদেশেও জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং জেনারেল এরশাদও ক্ষমতা গ্রহণ করে গণতন্ত্রের পথে দেশকে ফিরিয়ে আনবেন বলে বারবার ঘোষণা দিয়েছেন।

ইন্দোনেশিয়ার জাতির পিতা সুকর্নোও ‘গাইডেড ডেমোক্রেসির’ কথা বলেছিলেন বলে মনে পড়ে। কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার মানুষজন সুকর্নো থেকে জেনারেল সুহার্তো পর্যন্ত গণতন্ত্রের এমন বিকৃত রূপকে মেনে নেয়নি, তারা চুপ থেকেছে।

বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট উইদোদোর আমলে প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে। বস্তুত ইন্দোনেশিয়াই এখন একমাত্র মুসলমানপ্রধান দেশ, যেখানে প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা দেখা যায়।

এই প্রসঙ্গে আমাদের দেশের কথা একটু উল্লেখ করি। ‘ডেমোক্রেসি বনাম উন্নয়ন’-কোনটি অগ্রাধিকার পাবে, এমন একটি হালকা বিতর্ক আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো এবং পত্র-পত্রিকায় হঠাৎ হঠাৎ দেখি।

আমি এমন বিতর্কে আমোদ পাই। কারণ, আমি যখন দেখি হংকং-এর লোকজনের এত উন্নত জীবন সত্ত্বেও তারা পূর্ণ গণতন্ত্রের পক্ষে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। তারপর আমাদের দেশের লক্ষ লক্ষ লোক গণতন্ত্রবিহীন আরব দেশগুলোতে কাজ করে যাচ্ছে।

কিন্তু তাদের কেউ এসব দেশে স্থায়ীভাবে নাগরিকত্ব নিয়ে থাকতে চায় না। তারা পাড়ি জমাতে চেষ্টা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডায়, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং ইউরোপের গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে। গণতন্ত্রের এমনই আকর্ষণ।

দুই.

সেই ৬০ বছর আগে, ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম, আর সেই বছরের ২০ জানুয়ারি আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নিলেন জজ ফিটজেরাল্ড কেনেডি। তিনি পরাজিত করেছিরেন রিচার্ড নিক্সনকে। কেনেডি ছিলেন ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী, আর নিক্সন ছিলেন রিপাবলিকান পার্টির।

এইবার যেমন ডেমোক্রেট প্রেসিডেন্টের বিপরীতে রিপাবলিকান ডেনাল্ড ট্রাম্প। ১৯৬০-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিক্সন পরাজিত হলেও ১৯৬৮ সালের নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট পদে একবার পরাজিত প্রার্থী আবার পরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন, এমন উদাহরণ বোধহয় একমাত্র নিক্সনই।

তবে নিক্সনও শেষ রক্ষা করতে পারেননি। ১৯৭২-এ দ্বিতীয় টার্মের জন্য প্রার্থী হয়ে আবার জিতলেন, কিন্তু বিজয় অর্জন করতে তিনি যে কেলেঙ্কারি করলেন তা ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি হিসাবে সারা বিশ্বে নিন্দিত। নিক্সন যখন দেখলেন, তার বিরুদ্ধে ‘ইমপিচমেন্ট’ অভিশংসন প্রায় নিশ্চিত, তখন তিনি পদত্যাগ করে বাঁচলেন।

কিন্তু তার প্রায় ৪৮ বছর পর, ডোনাল্ড ট্রাম্প সে আত্মসম্মানবোধ দেখাতে পারলেন না। তাকে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে দু-দুবার ইমপিচ করা হলো। এমন উদাহরণও দ্বিতীয় নেই। এখন তার বিরুদ্ধে মার্কিন সিনেটে ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ আনার প্রস্তুতি চলছে।

বলছিলাম জন কেনেডির কথা। তরুণ বয়সি আমাদের অনেকেই কেনেডিকে ‘রোল মডেল’ হিসাবে গ্রহণ করলাম। কেনেডি আগের সব আমেরিকান প্রেসিডেন্টের চাইতে কম বয়সি, মাত্র ৪৩ তখন, দেখতে দারুণ হ্যান্ডসাম, সুন্দরী বউ ঘরে, জ্যাকি কেনেডি, প্রজাপতির মতো ছোট দুটি শিশু, জন জুনিয়র এবং ক্যারোলিন কেনেডি। তার বাবা জোসেফ কেনেডি যুক্তরাজ্যে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ছিলেন, ছিলেন আমেরিকার ধনাঢ্য ব্যক্তিদের একজন।

জন কেনেডি ‘ফিলান্ডারার’ও (Philanderer) ছিলেন। দুনিয়ার সবচাইতে সুন্দরী নারী ও অভিনেত্রীদের একজন, ম্যারিলিন মনরো হোয়াইট হাউজে কেনেডির সঙ্গে রাত কাটাতেন, এমন কথাবার্তাও তখন আমরা শুনেছি। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুকর্নোর চার সরকারি স্ত্রী ছিল। তারপরও ১৯৬৪ বা তেমন কোনো একসময় ভারত সফরকালে নতুন দিল্লিতে অবস্থানকালে রাতের শয্যাসঙ্গী হিসাবে সুন্দরী মহিলা চেয়েছিলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিফ অব প্রটোকল দৌড়ে ছুটে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর কাছে নির্দেশনা চেয়ে।

নেহেরু তখন বলেছিলেন, এই লোক তো কয়েকদিনের মধ্যে জাকার্তায় ফিরে গিয়ে কয়েকটি বউ পাবে; আর কয়েকটি দিন সে অপেক্ষা করতে পারছে না? কাহিনিটি পড়েছি ভারতের এক বিখ্যাত সাংবাদিক, পরে হাইকমিশনার প্রেম ভাটিয়ার ‘অল মাই ইয়েস্টার ইয়ারস’ (All my yester years) বইতে।

কেনেডির প্রতি আমাদের আকর্ষণের আরও কারণ ছিল- কেনেডি গুণী, সংস্কৃতিবান এবং পণ্ডিত ব্যক্তিদের গুরুত্ব দিতেন, সম্মান জানাতেন। এই প্রসঙ্গে এখনো আবছা আবছা মনে পড়ে, আমাদের শিক্ষক রেহমান সোবহানের কিছু কথা। তিনি বলেছিলেন, কেনেডি প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি এবং এমআইটি’র অধ্যাপকদের আনাগোনা হোয়াইট হাউজে এত বেড়ে গেল যে, হোয়াইট হাউজের করিডোরে তাদের মাঝে মাঝে ধাক্কাধাক্কির অবস্থা। কেনেডি মাঝে মাঝে হোয়াইট হাউজে সংগীতানুষ্ঠানেরও আয়োজন করতেন। জ্যাকি কেনেডির অনুরোধে মোনালিসার পেইন্টিংটিও বোধহয় একবার আমেরিকায় নিয়ে গিয়ে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

জন কেনেডি সম্পর্কে এত কিছু বলার কারণ হলো, তরুণ বয়সে তার প্রতি যেমন আকৃষ্ট হয়েছিলাম, এখন এই প্রবীণ বয়সে জো বাইডেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় তেমন উদ্দীপ্ত, উজ্জীবিতবোধ করছি। তারা দুজনই ডেমোক্রেটিক পার্টির, কিন্তু একজন ছিলেন কনিষ্ঠতম প্রেসিডেন্ট, আর জো বাইডেন হচ্ছেন ৭৮ বছর বয়সী আমেরিকার প্রবীণতম কাণ্ডারি।

রিপাবলিকান পার্টির তুলনায় ডেমোক্রেটিক পার্টি অনেক উদার, মানুষে মানুষে সমতায় বিশ্বাসী। এই কারণে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতি আমার দুর্বলতা এবং সমর্থন। কেনেডিকে হত্যার পর তার ভাইস প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করে আমেরিকার কালোদের ভোটাধিকার আইনে সই দিলেন। আর তারপরের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন আমাদের ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিলেন, যখন আমরা ’৭০-এর নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের বাস্তবায়ন চাইছিলাম। এই এক কারণেই তো রিপাবলিকান পার্টির প্রতি আমাদের ডিজলাইকিং, অপছন্দ থাকার কথা।

ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন ২০০০ সালে, শেখ হাসিনার দাওয়াতে। তিনিই একমাত্র আমেরিকান প্রেসিডেন্ট, যিনি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। আর ডেমোক্রেটিক পার্টির হয়ে প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী এবং পরে দুবার বিজয়ী হয়েছিলেন। বারাক ওবামা দেশটির প্রথম এবং একমাত্র আফ্রিকান-আমেরিকান প্রেসিডেন্ট। আর এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের অপশাসন ‘আইয়ামে জাহেলিয়াতের’ পর প্রেসিডেন্ট হলেন জো বাইডেন, বারাক ওবামার জমানার ভাইস প্রেসিডেন্ট।

ট্রাম্প ও বাইডেনের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির ফারাকটি একটি উদাহরণ থেকে স্পষ্ট হবে। করোনা ক্রাইসিসে সারা দুনিয়া যখন বিপর্যস্ত, শঙ্কিত, তখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে বেরিয়ে এলেন ট্রাম্প। আর তার বিপরীতে শপথ গ্রহণের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে জো বাইডেন এই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা দিলেন। সারা দুনিয়া কিছু স্বস্তিও ফিরে পেল। যে ট্রাম্প করোনা মোকাবিলায় তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিলেন না, সেখানে জো বাইডেন করোনা মোকাবিলাকে এক নম্বর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসাবে শনাক্ত করেছেন। যে চার লাখের বেশি আমেরিকান করোনায় ইতোমধ্যে মারা গেছে, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাতে শপথ গ্রহণের আগের দিন তিনি ওয়াশিংটনের লিংকন মেমোরিয়ালের সামনের পুলে দাঁড়িয়ে তাদের স্মরণ করেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্লোগান ছিল, ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’। আসলে এটি ছিল ‘মেক আমেরিকা হোয়াইট এগেইন’। আমেরিকার নন-হোয়াইটদের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের ঘৃণা-বিদ্বেষ সব সময়ে প্রচ্ছন্ন থাকেনি। আফ্রিকান- আমেরিকান বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর কট্টর হোয়াইটরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, আমেরিকার ব্ল্যাকরা এই বুঝি হোয়াইটদের পদদলিত করে!! ট্রাম্প ‘হোয়াইট’দের এই ভয়-ভীতি, আশঙ্কাকে প্রবলভাবে উসকানি দিয়ে গেছে বছরের পর বছর। বারাক ওবামা আমেরিকাতে জন্মগ্রহণই করেননি, বারাক ওবামা আমেরিকার নাগরিকই নন, এমন অপপ্রচার চালিয়েছে এই উন্মাদটা।

উন্মাদটা অপপ্রচার চালিয়েছে-তার বিজয়কে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে, তার বিজয়কে ডেমোক্রেটরা চুরি করে নিয়ে গেছে। এই লোক উপস্থিত থাকেননি বাইডেনের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে; কিন্তু উপস্থিত থেকেছেন তারই ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এবং রিপাবলিকান পার্টির মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচিত আরেক সাবেক প্রেসিডেন্ট, জর্জ বুশ জুনিয়র, সস্ত্রীক।

উপস্থিত ছিলেন আর দুই ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেন্ট ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে মনোনয়নে নির্বাচিত বিল ক্লিনটন ও বারাক ওবামা। উপস্থিত না থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৫০ বছরের প্রথা, ট্র্যাডিশন ভাঙলেন। অথচ ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট পদে তিনি হিলারি ক্লিনটনকে পরাজিত করে যখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন, তখন হিলারি ক্লিনটন তাকে দ্রুতই প্রথামাফিক অভিনন্দন জানান। এমন কিছুই করেননি ট্রাম্প। বরং হোয়াইট হাউজ শেষবারের মতো ছেড়ে যাওয়ার সময় ২০ জানুয়ারি সকালে যে বক্তৃতাগুলো তিনি দিয়েছেন, তাতে উদ্ধত স্বভাব তিনি জারি রেখেছেন।

ডেমোক্রেটিক পার্টির এবং জো বাইডেনের উদারতা দেখা যায়, তার মন্ত্রিসভা এবং প্রশাসনে নিয়োগপ্রাপ্ত সদস্যদের দিকে তাকালেও। ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের মা ভারতীয়, বাবা জ্যামাইকান। তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্ল্যাক জেনারেল।

তিনি প্রথমবারের মতো একজন রেড ইন্ডিয়ান মহিলাকেও মন্ত্রী পদে নিয়োগ দিয়েছেন। নিয়োগ দিয়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত আরও দশ-বারোজন আমেরিকানকেও। আমাদের বাংলাদেশি আমেরিকানও দু-চারজন আছেন তার প্রশাসনে। তাদের মধ্যে একজন ওসমান সিদ্দিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ওসমান গনীর এক পুত্র। তিনি বিল ক্লিনটনের আমলে ফিজিতে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত ছিলেন, এখন ডেমোক্রেটিক পার্টির একজন সিনিয়র উপদেষ্টা।

জো বাইডেনের ওপর আমাদের আশা-ভরসার আরেক বড় কারণ, আমেরিকাতে এখন যে এক কোটি দশ লাখের মতো অবৈধ অভিবাসী আছেন, তাদের মধ্যে বড় একটি সংখ্যা বাংলাদেশিদের। তাদের প্রতি জো বাইডেনের সরকার নমনীয় হবে এই আশা সবারই।

তিন.

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সারা দুনিয়ার নেতা-নেত্রী যতই সরাসরি বা প্রচ্ছন্নভাবে নিন্দা করুন না কেন, ২০১৬ সালের ৪ নভেম্বর হিলারি ক্লিনটনের বিপরীতে তার বিজয়কে আধা ঘণ্টার মধ্যেই অভিনন্দন জানিয়েছিলেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা; ২০১৭ সালের ২০ জানুয়ারি ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের দিন পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করেননি।

তার অভিনন্দন বার্তায় শেখ হাসিনা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তার স্ত্রী মেলানিয়াকে নিয়ে বাংলাদেশ সফরে আসার দাওয়াতও দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার এমন প্রতিক্রিয়ার কারণ ছিলেন হিলারি ক্লিনটন। শেখ হাসিনা মনে করতেন, বারাক ওবামার প্রথম টার্মের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বেশি বেশি তদবির করছিলেন ড. ইউনূসের পক্ষে।

আমোদের সঙ্গে লক্ষণীয়, আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনার যখন এমন কঠোর প্রতিক্রিয়া তখন আমেরিকার আওয়ামী লীগ নেতারা কিন্তু হিলারির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।

তার প্রধান কারণ ওই অবৈধ অভিবাসী প্রশ্ন। হিলারি ক্লিনটন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে অবৈধ অভিবাসীদের পক্ষে তিনি নমনীয় হবেন, এই প্রত্যাশা তখন এই ১১ মিলিয়ন অবৈধ অভিবাসীর। জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর শেখ হাসিনার অনুসৃত গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন জোরদার হবে বলে ধারণা করি। ২০১৪ সালের পর থেকেই তারা বলে আসছে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ‘ফ্লড’ (Flawed)।

মাস ছয়েক আগে আমেরিকার ১০ জন প্রভাবশালী সিনেটর বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর প্রশ্ন তুলে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পোম্পিওকে চিঠি দিয়েছিলেন। আর মাত্র কয়েক দিন আগে এই পোম্পিও বাংলাদেশে উগ্র জঙ্গি অপতৎপরতার উপস্থিতির উল্লেখ করেছেন। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্রুতই পোম্পিওর এমন উল্লেখের তীব্র প্রতিবাদও জানিয়েছে।

ইতোমধ্যে বাইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে মনোনীত এন্টনি ব্লিংকেন সিনেটে বলেছেন, ‘We are for better positioned to counter threats posed by Russia, Iran and North Koria and to stand up for democracy and human rights.’ এর বিপরীতে ডেমোক্রেসি এবং মানবাধিকারের পক্ষে ট্রাম্পের কোনো আগ্রহ বা এজেন্ডা ছিল না।

চার.

ডোনাল্ড ট্রাম্প বিদায় নিয়েছেন, আর দুনিয়ার মানুষ স্বস্তি ফিরে পেয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পিজম তো বিদায় নেয়নি। ট্রাম্পের উগ্র সমর্থকদের হামলার আশঙ্কায় ওয়াশিংটনে ২৫ হাজার ন্যাশনাল গার্ড এবং সেনাসামন্ত মোতায়েন করে শান্তিশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা হয়েছে। কেউ কেউ ওয়াশিংটনকে বাগদাদের গ্রিন জোনের সঙ্গেও তুলনা করেছেন।

আশঙ্কার সঙ্গে লক্ষ করার বিষয়, ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ৭৪ মিলিয়ন আমেরিকান ভোট দিয়েছে, ট্রাম্পের মতো তাদের অধিকাংশই বিশ্বাস করে তাদের বিজয়কে ছিনতাই করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এদের শান্ত রেখে কাজ চালিয়ে যাওয়া জো বাইডেনের পক্ষে কঠিন হতে পারে মনে করে তিনি যথার্থই তার বিজয়ের পর দুই ধারায় প্রবলভাবে বিভাজিত আমেরিকানদের ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে যাচ্ছেন। প্রত্যাশিতভাবেই তিনি বারবার আমেরিকানদের মধ্যে ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দিয়ে কথা বলেছেন উদ্বোধনী ভাষণে।

কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি সক্রিয় থাকেন, তাহলে তার এসব উগ্র সমর্থককে দমানো কঠিন হতে পারে। তাই ডেমোক্রেটরা চাইছে সিনেটে যদি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত ও পাশ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে তিনি আর কোনো নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না, কোনো সরকারি পদে কাজও করতে পারবেন না।

সিনেটে এই অভিযোগগুলো প্রমাণিত হবে, পাশ হবে, সারা দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষের মতো আমারও এই প্রত্যাশা।

মহিউদ্দিন আহমদ : সাবেক সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়; কলাম লেখক

‘শিউলীতলা’, উত্তরা; বৃহস্পতিবার

একাত্তরের ঝর্নাতলায়

ট্রাম্প : বিপদের বিদায়; কিন্তু আপদ কি থেকে গেল?

 মহিউদ্দিন আহমদ 
২২ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বুধবার ২০ জানুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এই দেশটির ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ গ্রহণের পর যে ভাষণটি দেন, তার দ্বিতীয় কী তৃতীয় বাক্যটি ছিল- Democracy is fragile, democracy is precious; democracy has prevailed.

বস্তুত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চার বছরের মেয়াদকালে এই প্রেসিডেন্ট গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে একের পর এক যেমন হামলা চালিয়ে গেছেন, তেমনটি দেখা যায় তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে।

গত ৬ জানুয়ারি, ওয়াশিংটন ডিসির পার্লামেন্ট ভবনে ট্রাম্প সমর্থকরা যেমন হামলা চালিয়েছে, পার্লামেন্ট ভবনে ভাঙচুর করেছে তা আমেরিকার ইতিহাসে একটি কলঙ্ক হয়ে থাকবে। এমন হামলা-ভাঙচুর আমাদের মতো দেশগুলোতেই দেখা যায়।

ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিলে এমন উচ্ছৃঙ্খলতা দেখে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির এক সাম্প্রতিক অবসরপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ জুনিয়র যথার্থই মন্তব্য করেছিলেন, এমন দৃশ্য তো ব্যানানা রিপাবলিকগুলোতেই দেখা যায়, প্রকৃত উন্নত সভ্য দেশে নয়।

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসাবে ২০১৭-এর ২০ জানুয়ারিতে শপথ নিলেন; আর তারপর থেকে বিশ্ববিখ্যাত দৈনিক ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ তার প্রথম পৃষ্ঠার মাস্টহেডের ঠিক নিচে ছাপাতে শুরু করল, ‘Democracy Dies in Darkness’

বাইডেনের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান দেখার সময় আমার পাশে বসা স্ত্রী বিলকিসকে বলছিলাম, ট্রাম্প জমানায় ‘ডেমোক্রেসির ওপর বিপদ’, ‘ডেমোক্রেসি ইন ডেঞ্জার’, ‘ডেমোক্রেসি ইন ক্রাইসিস’, ডেমোক্রেসি, ডেমোক্রেসি, কতবার যে শুনেছি গুনলে হয়তো তা সংখ্যায় কয়েক লাখ হবে। ডেমোক্রেসির গুরুত্ব বুঝতে এই প্রসঙ্গে উইনস্টন চার্চিলের একটি উক্তি উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি বলেছিলেন, গণতন্ত্রের অনেক দুর্বলতা আছে; কিন্তু এখন পর্যন্ত গণতন্ত্রের বিকল্প হিসাবে উন্নততর কোনো শাসনব্যবস্থা বের করা যায়নি।

কথাটি সত্য। আমরা দেখি ডেমোক্রেসি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবেন বলে সব রকমের স্বৈরশাসকরাও অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে আইনি বৈধতা এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার জন্য ঘোষণা দিয়ে থাকেন।

আমাদের বয়সি প্রবীণ লোকজনের স্মৃতিতে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রের কথা (Basic Democracy) এখনো জ্বলজ্বল করে। বাংলাদেশেও জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং জেনারেল এরশাদও ক্ষমতা গ্রহণ করে গণতন্ত্রের পথে দেশকে ফিরিয়ে আনবেন বলে বারবার ঘোষণা দিয়েছেন।

ইন্দোনেশিয়ার জাতির পিতা সুকর্নোও ‘গাইডেড ডেমোক্রেসির’ কথা বলেছিলেন বলে মনে পড়ে। কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার মানুষজন সুকর্নো থেকে জেনারেল সুহার্তো পর্যন্ত গণতন্ত্রের এমন বিকৃত রূপকে মেনে নেয়নি, তারা চুপ থেকেছে।

বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট উইদোদোর আমলে প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে। বস্তুত ইন্দোনেশিয়াই এখন একমাত্র মুসলমানপ্রধান দেশ, যেখানে প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা দেখা যায়।

এই প্রসঙ্গে আমাদের দেশের কথা একটু উল্লেখ করি। ‘ডেমোক্রেসি বনাম উন্নয়ন’-কোনটি অগ্রাধিকার পাবে, এমন একটি হালকা বিতর্ক আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো এবং পত্র-পত্রিকায় হঠাৎ হঠাৎ দেখি।

আমি এমন বিতর্কে আমোদ পাই। কারণ, আমি যখন দেখি হংকং-এর লোকজনের এত উন্নত জীবন সত্ত্বেও তারা পূর্ণ গণতন্ত্রের পক্ষে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। তারপর আমাদের দেশের লক্ষ লক্ষ লোক গণতন্ত্রবিহীন আরব দেশগুলোতে কাজ করে যাচ্ছে।

কিন্তু তাদের কেউ এসব দেশে স্থায়ীভাবে নাগরিকত্ব নিয়ে থাকতে চায় না। তারা পাড়ি জমাতে চেষ্টা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডায়, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং ইউরোপের গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে। গণতন্ত্রের এমনই আকর্ষণ।

দুই.

সেই ৬০ বছর আগে, ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম, আর সেই বছরের ২০ জানুয়ারি আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নিলেন জজ ফিটজেরাল্ড কেনেডি। তিনি পরাজিত করেছিরেন রিচার্ড নিক্সনকে। কেনেডি ছিলেন ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী, আর নিক্সন ছিলেন রিপাবলিকান পার্টির।

এইবার যেমন ডেমোক্রেট প্রেসিডেন্টের বিপরীতে রিপাবলিকান ডেনাল্ড ট্রাম্প। ১৯৬০-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিক্সন পরাজিত হলেও ১৯৬৮ সালের নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট পদে একবার পরাজিত প্রার্থী আবার পরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন, এমন উদাহরণ বোধহয় একমাত্র নিক্সনই।

তবে নিক্সনও শেষ রক্ষা করতে পারেননি। ১৯৭২-এ দ্বিতীয় টার্মের জন্য প্রার্থী হয়ে আবার জিতলেন, কিন্তু বিজয় অর্জন করতে তিনি যে কেলেঙ্কারি করলেন তা ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি হিসাবে সারা বিশ্বে নিন্দিত। নিক্সন যখন দেখলেন, তার বিরুদ্ধে ‘ইমপিচমেন্ট’ অভিশংসন প্রায় নিশ্চিত, তখন তিনি পদত্যাগ করে বাঁচলেন।

কিন্তু তার প্রায় ৪৮ বছর পর, ডোনাল্ড ট্রাম্প সে আত্মসম্মানবোধ দেখাতে পারলেন না। তাকে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে দু-দুবার ইমপিচ করা হলো। এমন উদাহরণও দ্বিতীয় নেই। এখন তার বিরুদ্ধে মার্কিন সিনেটে ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ আনার প্রস্তুতি চলছে।

বলছিলাম জন কেনেডির কথা। তরুণ বয়সি আমাদের অনেকেই কেনেডিকে ‘রোল মডেল’ হিসাবে গ্রহণ করলাম। কেনেডি আগের সব আমেরিকান প্রেসিডেন্টের চাইতে কম বয়সি, মাত্র ৪৩ তখন, দেখতে দারুণ হ্যান্ডসাম, সুন্দরী বউ ঘরে, জ্যাকি কেনেডি, প্রজাপতির মতো ছোট দুটি শিশু, জন জুনিয়র এবং ক্যারোলিন কেনেডি। তার বাবা জোসেফ কেনেডি যুক্তরাজ্যে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ছিলেন, ছিলেন আমেরিকার ধনাঢ্য ব্যক্তিদের একজন।

জন কেনেডি ‘ফিলান্ডারার’ও (Philanderer) ছিলেন। দুনিয়ার সবচাইতে সুন্দরী নারী ও অভিনেত্রীদের একজন, ম্যারিলিন মনরো হোয়াইট হাউজে কেনেডির সঙ্গে রাত কাটাতেন, এমন কথাবার্তাও তখন আমরা শুনেছি। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুকর্নোর চার সরকারি স্ত্রী ছিল। তারপরও ১৯৬৪ বা তেমন কোনো একসময় ভারত সফরকালে নতুন দিল্লিতে অবস্থানকালে রাতের শয্যাসঙ্গী হিসাবে সুন্দরী মহিলা চেয়েছিলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিফ অব প্রটোকল দৌড়ে ছুটে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর কাছে নির্দেশনা চেয়ে।

নেহেরু তখন বলেছিলেন, এই লোক তো কয়েকদিনের মধ্যে জাকার্তায় ফিরে গিয়ে কয়েকটি বউ পাবে; আর কয়েকটি দিন সে অপেক্ষা করতে পারছে না? কাহিনিটি পড়েছি ভারতের এক বিখ্যাত সাংবাদিক, পরে হাইকমিশনার প্রেম ভাটিয়ার ‘অল মাই ইয়েস্টার ইয়ারস’ (All my yester years) বইতে।

কেনেডির প্রতি আমাদের আকর্ষণের আরও কারণ ছিল- কেনেডি গুণী, সংস্কৃতিবান এবং পণ্ডিত ব্যক্তিদের গুরুত্ব দিতেন, সম্মান জানাতেন। এই প্রসঙ্গে এখনো আবছা আবছা মনে পড়ে, আমাদের শিক্ষক রেহমান সোবহানের কিছু কথা। তিনি বলেছিলেন, কেনেডি প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি এবং এমআইটি’র অধ্যাপকদের আনাগোনা হোয়াইট হাউজে এত বেড়ে গেল যে, হোয়াইট হাউজের করিডোরে তাদের মাঝে মাঝে ধাক্কাধাক্কির অবস্থা। কেনেডি মাঝে মাঝে হোয়াইট হাউজে সংগীতানুষ্ঠানেরও আয়োজন করতেন। জ্যাকি কেনেডির অনুরোধে মোনালিসার পেইন্টিংটিও বোধহয় একবার আমেরিকায় নিয়ে গিয়ে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

জন কেনেডি সম্পর্কে এত কিছু বলার কারণ হলো, তরুণ বয়সে তার প্রতি যেমন আকৃষ্ট হয়েছিলাম, এখন এই প্রবীণ বয়সে জো বাইডেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় তেমন উদ্দীপ্ত, উজ্জীবিতবোধ করছি। তারা দুজনই ডেমোক্রেটিক পার্টির, কিন্তু একজন ছিলেন কনিষ্ঠতম প্রেসিডেন্ট, আর জো বাইডেন হচ্ছেন ৭৮ বছর বয়সী আমেরিকার প্রবীণতম কাণ্ডারি।

রিপাবলিকান পার্টির তুলনায় ডেমোক্রেটিক পার্টি অনেক উদার, মানুষে মানুষে সমতায় বিশ্বাসী। এই কারণে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতি আমার দুর্বলতা এবং সমর্থন। কেনেডিকে হত্যার পর তার ভাইস প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করে আমেরিকার কালোদের ভোটাধিকার আইনে সই দিলেন। আর তারপরের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন আমাদের ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিলেন, যখন আমরা ’৭০-এর নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের বাস্তবায়ন চাইছিলাম। এই এক কারণেই তো রিপাবলিকান পার্টির প্রতি আমাদের ডিজলাইকিং, অপছন্দ থাকার কথা।

ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন ২০০০ সালে, শেখ হাসিনার দাওয়াতে। তিনিই একমাত্র আমেরিকান প্রেসিডেন্ট, যিনি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। আর ডেমোক্রেটিক পার্টির হয়ে প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী এবং পরে দুবার বিজয়ী হয়েছিলেন। বারাক ওবামা দেশটির প্রথম এবং একমাত্র আফ্রিকান-আমেরিকান প্রেসিডেন্ট। আর এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের অপশাসন ‘আইয়ামে জাহেলিয়াতের’ পর প্রেসিডেন্ট হলেন জো বাইডেন, বারাক ওবামার জমানার ভাইস প্রেসিডেন্ট।

ট্রাম্প ও বাইডেনের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির ফারাকটি একটি উদাহরণ থেকে স্পষ্ট হবে। করোনা ক্রাইসিসে সারা দুনিয়া যখন বিপর্যস্ত, শঙ্কিত, তখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে বেরিয়ে এলেন ট্রাম্প। আর তার বিপরীতে শপথ গ্রহণের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে জো বাইডেন এই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা দিলেন। সারা দুনিয়া কিছু স্বস্তিও ফিরে পেল। যে ট্রাম্প করোনা মোকাবিলায় তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিলেন না, সেখানে জো বাইডেন করোনা মোকাবিলাকে এক নম্বর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসাবে শনাক্ত করেছেন। যে চার লাখের বেশি আমেরিকান করোনায় ইতোমধ্যে মারা গেছে, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাতে শপথ গ্রহণের আগের দিন তিনি ওয়াশিংটনের লিংকন মেমোরিয়ালের সামনের পুলে দাঁড়িয়ে তাদের স্মরণ করেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্লোগান ছিল, ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’। আসলে এটি ছিল ‘মেক আমেরিকা হোয়াইট এগেইন’। আমেরিকার নন-হোয়াইটদের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের ঘৃণা-বিদ্বেষ সব সময়ে প্রচ্ছন্ন থাকেনি। আফ্রিকান- আমেরিকান বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর কট্টর হোয়াইটরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, আমেরিকার ব্ল্যাকরা এই বুঝি হোয়াইটদের পদদলিত করে!! ট্রাম্প ‘হোয়াইট’দের এই ভয়-ভীতি, আশঙ্কাকে প্রবলভাবে উসকানি দিয়ে গেছে বছরের পর বছর। বারাক ওবামা আমেরিকাতে জন্মগ্রহণই করেননি, বারাক ওবামা আমেরিকার নাগরিকই নন, এমন অপপ্রচার চালিয়েছে এই উন্মাদটা।

উন্মাদটা অপপ্রচার চালিয়েছে-তার বিজয়কে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে, তার বিজয়কে ডেমোক্রেটরা চুরি করে নিয়ে গেছে। এই লোক উপস্থিত থাকেননি বাইডেনের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে; কিন্তু উপস্থিত থেকেছেন তারই ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এবং রিপাবলিকান পার্টির মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচিত আরেক সাবেক প্রেসিডেন্ট, জর্জ বুশ জুনিয়র, সস্ত্রীক।

উপস্থিত ছিলেন আর দুই ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেন্ট ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে মনোনয়নে নির্বাচিত বিল ক্লিনটন ও বারাক ওবামা। উপস্থিত না থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৫০ বছরের প্রথা, ট্র্যাডিশন ভাঙলেন। অথচ ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট পদে তিনি হিলারি ক্লিনটনকে পরাজিত করে যখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন, তখন হিলারি ক্লিনটন তাকে দ্রুতই প্রথামাফিক অভিনন্দন জানান। এমন কিছুই করেননি ট্রাম্প। বরং হোয়াইট হাউজ শেষবারের মতো ছেড়ে যাওয়ার সময় ২০ জানুয়ারি সকালে যে বক্তৃতাগুলো তিনি দিয়েছেন, তাতে উদ্ধত স্বভাব তিনি জারি রেখেছেন।

ডেমোক্রেটিক পার্টির এবং জো বাইডেনের উদারতা দেখা যায়, তার মন্ত্রিসভা এবং প্রশাসনে নিয়োগপ্রাপ্ত সদস্যদের দিকে তাকালেও। ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের মা ভারতীয়, বাবা জ্যামাইকান। তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্ল্যাক জেনারেল।

তিনি প্রথমবারের মতো একজন রেড ইন্ডিয়ান মহিলাকেও মন্ত্রী পদে নিয়োগ দিয়েছেন। নিয়োগ দিয়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত আরও দশ-বারোজন আমেরিকানকেও। আমাদের বাংলাদেশি আমেরিকানও দু-চারজন আছেন তার প্রশাসনে। তাদের মধ্যে একজন ওসমান সিদ্দিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ওসমান গনীর এক পুত্র। তিনি বিল ক্লিনটনের আমলে ফিজিতে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত ছিলেন, এখন ডেমোক্রেটিক পার্টির একজন সিনিয়র উপদেষ্টা।

জো বাইডেনের ওপর আমাদের আশা-ভরসার আরেক বড় কারণ, আমেরিকাতে এখন যে এক কোটি দশ লাখের মতো অবৈধ অভিবাসী আছেন, তাদের মধ্যে বড় একটি সংখ্যা বাংলাদেশিদের। তাদের প্রতি জো বাইডেনের সরকার নমনীয় হবে এই আশা সবারই।

তিন.

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সারা দুনিয়ার নেতা-নেত্রী যতই সরাসরি বা প্রচ্ছন্নভাবে নিন্দা করুন না কেন, ২০১৬ সালের ৪ নভেম্বর হিলারি ক্লিনটনের বিপরীতে তার বিজয়কে আধা ঘণ্টার মধ্যেই অভিনন্দন জানিয়েছিলেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা; ২০১৭ সালের ২০ জানুয়ারি ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের দিন পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করেননি।

তার অভিনন্দন বার্তায় শেখ হাসিনা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তার স্ত্রী মেলানিয়াকে নিয়ে বাংলাদেশ সফরে আসার দাওয়াতও দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার এমন প্রতিক্রিয়ার কারণ ছিলেন হিলারি ক্লিনটন। শেখ হাসিনা মনে করতেন, বারাক ওবামার প্রথম টার্মের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বেশি বেশি তদবির করছিলেন ড. ইউনূসের পক্ষে।

আমোদের সঙ্গে লক্ষণীয়, আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনার যখন এমন কঠোর প্রতিক্রিয়া তখন আমেরিকার আওয়ামী লীগ নেতারা কিন্তু হিলারির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।

তার প্রধান কারণ ওই অবৈধ অভিবাসী প্রশ্ন। হিলারি ক্লিনটন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে অবৈধ অভিবাসীদের পক্ষে তিনি নমনীয় হবেন, এই প্রত্যাশা তখন এই ১১ মিলিয়ন অবৈধ অভিবাসীর। জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর শেখ হাসিনার অনুসৃত গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন জোরদার হবে বলে ধারণা করি। ২০১৪ সালের পর থেকেই তারা বলে আসছে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ‘ফ্লড’ (Flawed)।

মাস ছয়েক আগে আমেরিকার ১০ জন প্রভাবশালী সিনেটর বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর প্রশ্ন তুলে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পোম্পিওকে চিঠি দিয়েছিলেন। আর মাত্র কয়েক দিন আগে এই পোম্পিও বাংলাদেশে উগ্র জঙ্গি অপতৎপরতার উপস্থিতির উল্লেখ করেছেন। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্রুতই পোম্পিওর এমন উল্লেখের তীব্র প্রতিবাদও জানিয়েছে।

ইতোমধ্যে বাইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে মনোনীত এন্টনি ব্লিংকেন সিনেটে বলেছেন, ‘We are for better positioned to counter threats posed by Russia, Iran and North Koria and to stand up for democracy and human rights.’ এর বিপরীতে ডেমোক্রেসি এবং মানবাধিকারের পক্ষে ট্রাম্পের কোনো আগ্রহ বা এজেন্ডা ছিল না।

চার.

ডোনাল্ড ট্রাম্প বিদায় নিয়েছেন, আর দুনিয়ার মানুষ স্বস্তি ফিরে পেয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পিজম তো বিদায় নেয়নি। ট্রাম্পের উগ্র সমর্থকদের হামলার আশঙ্কায় ওয়াশিংটনে ২৫ হাজার ন্যাশনাল গার্ড এবং সেনাসামন্ত মোতায়েন করে শান্তিশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা হয়েছে। কেউ কেউ ওয়াশিংটনকে বাগদাদের গ্রিন জোনের সঙ্গেও তুলনা করেছেন।

আশঙ্কার সঙ্গে লক্ষ করার বিষয়, ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ৭৪ মিলিয়ন আমেরিকান ভোট দিয়েছে, ট্রাম্পের মতো তাদের অধিকাংশই বিশ্বাস করে তাদের বিজয়কে ছিনতাই করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এদের শান্ত রেখে কাজ চালিয়ে যাওয়া জো বাইডেনের পক্ষে কঠিন হতে পারে মনে করে তিনি যথার্থই তার বিজয়ের পর দুই ধারায় প্রবলভাবে বিভাজিত আমেরিকানদের ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে যাচ্ছেন। প্রত্যাশিতভাবেই তিনি বারবার আমেরিকানদের মধ্যে ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দিয়ে কথা বলেছেন উদ্বোধনী ভাষণে।

কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি সক্রিয় থাকেন, তাহলে তার এসব উগ্র সমর্থককে দমানো কঠিন হতে পারে। তাই ডেমোক্রেটরা চাইছে সিনেটে যদি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত ও পাশ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে তিনি আর কোনো নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না, কোনো সরকারি পদে কাজও করতে পারবেন না।

সিনেটে এই অভিযোগগুলো প্রমাণিত হবে, পাশ হবে, সারা দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষের মতো আমারও এই প্রত্যাশা।

মহিউদ্দিন আহমদ : সাবেক সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়; কলাম লেখক

‘শিউলীতলা’, উত্তরা; বৃহস্পতিবার