প্রয়োজন দক্ষ জনবলের সর্বোচ্চ ব্যবহার
jugantor
করোনার টিকা কার্যক্রম
প্রয়োজন দক্ষ জনবলের সর্বোচ্চ ব্যবহার

  খছরু চৌধুরী  

২২ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ওপর লিখতে গিয়ে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার দুটি পঙ্ক্তি মনে পড়ে গেল- ‘বন্ধু গো, আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে/দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে ক’ই মুখে।’

জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় রোগ প্রতিরোধের বিভ্রান্তিমূলক কর্মপদ্ধতি দেখে-দেখে কবি নজরুলের মতো আমারও মনের অবস্থা একই জায়গায় এসে ঠেকেছে।

সার্বিক ব্যবস্থাপনায় নানা অসংগতি, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, বিভ্রান্তি ও দুর্নীতি এতটাই জেঁকে বসেছে যে কোনটা লিখব আর কোনটা লিখব না- সেটিও যেন নির্বাচন করা মুশকিল হয়ে পড়েছে।

যে কোনো রাষ্ট্রীয় কাজের একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে। সেই লক্ষ্যের দিকে কাজটিকে এগিয়ে নিতে হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপকদের একটি বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা সমীচীন। আমাদের দেশের ব্যবস্থাপকরা সেই মহৎ ধারণা কতটুকু ধারণ ও লালন করেন সেটা আমি ঠিক বুঝতে না পারলেও যেটি বুঝি তা হলো, উল্লিখিত কাজগুলো যে আদর্শ, চিন্তা ও কর্মপদ্ধতিগত ঐক্যের ভিত্তিতে হচ্ছে না- তা তো দিবালোকের আলোর মতো স্পষ্ট। আদর্শটা হলো সুনির্দিষ্টভাবে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আদর্শ। চিন্তাটা হলো জনগণের সার্বিক জনকল্যাণ সাধনের পথে মানুষের মুক্তি। ঐক্যের ভিত্তিটা হবে সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য জনমুখী কর্মপরিকল্পনা। ১৯৭৫-পরবর্তী সময় থেকে দেশের জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার কর্মপদ্ধতিতে না আছে মুক্তির আদর্শ, না আছে চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকে গৃহীত কোনো কর্মপন্থা। রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে-বাইরে রয়েছে চিকিৎসাসেবা বাণিজ্যের জয়জয়কার।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের কাজের ধারায় অসুখ-বিসুখ নিয়ে গবেষণা, অসুখের প্রতিরোধ ও চিকিৎসাবিষয়ক আলোচনা-পর্যালোচনায় সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে অসুখের প্রতিরোধ কর্মে। এমন অনেক দেশ রয়েছে যারা রোগের প্রতিরোধ কর্মে সফলতার দরুন স্থানীয় পর্যায়ের চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দিচ্ছে।

আমাদের স্বাধীন দেশেও ‘চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’ নীতির আলোকে বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭৩ সালে জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থাপনা ও কর্মপরিকল্পনা ঢেলে সাজিয়েছিলেন।

কিন্তু ১৯৭৫ সালের মহাট্র্যাজেডির পর বাংলার জনগণের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় রোগ প্রতিরোধের কর্মপন্থাকে সূক্ষ্ম-কৌশলে কারচুপি করা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। যার ফলে দেশে ভেজাল খাদ্যের মাধ্যমে সৃষ্ট দু’শর অধিক রোগের বিস্তার ঘটেছে, সংক্রামক-অসংক্রামক রোগবালাইও বহুগুণ বেড়ে গেছে, ব্যাঙের ছাতার মতো রাস্তার আশপাশে গড়ে উঠেছে চিকিৎসাসেবার নামে মানহীন চিকিৎসা বাণিজ্যের দোকান।

মহান মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত সংবিধান, জনস্বাস্থ্যবিষয়ক আইনবিধি ও জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি উপেক্ষা (ক্ষেত্রবিশেষে লঙ্ঘন করে) করে চিকিৎসাসেবার নামে চিকিৎসা বাণিজ্যের প্রকাশ্য ও গোপন আশকারায় রয়েছে স্বয়ং রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের অধীনস্থ স্বাস্থ্য-প্রশাসনের আমলাতন্ত্র ও তাদের গৃহীত (অপ) কৌশলের কর্মসূচি।

জনস্বাস্থ্যের রোগ-প্রতিরোধী কর্মধারায় বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে নিয়োজিত ২৬ হাজার ৫০০ স্বাস্থ্য-জনবল কাজ করেন ডিজিএইচএসের অধীনে। এদের মধ্যে রোগ-প্রতিরোধী কাজে রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যয়-বিনিয়োগে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য জনবলের নাম স্যানিটারি ইন্সপেক্টর। যাদের মৌলিক কর্মপরিধিতে রয়েছে মহামারি রোগের নিয়ন্ত্রণ, স্যানিটেশন ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়ন এবং খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।

কিন্তু রাষ্ট্রের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ওপর বেসরকারি চিকিৎসা বণিকদের একচেটিয়া আধিপত্য থাকায় ১৯৭৩-পরবর্তী সময়ে জনগণের বর্ধিত সংখ্যার অনুপাতে কিংবা জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির আলোকে স্যানিটারি ইন্সপেক্টরের একটি পদও বাড়ানো হয়নি। উপরন্তু এ বৈশ্বিক অতিমারির সময়েও স্যানিটারি ইন্সপেক্টরশিপ ডিপ্লোমা ডিগ্রির সনদ অর্জনকারী ২৬২০ জন দক্ষ স্বাস্থ্য জনবলকে সুনির্দিষ্ট করে দায়িত্ব দিয়ে কাজে লাগানো হয়নি।

কেন এমন হচ্ছে বা কী কারণে রোগ প্রতিরোধের জনবলকে প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে জনস্বার্থে কাজে লাগানো হয় না- এ প্রশ্নের উত্তর অনেকের কাছে গোলকধাঁধার মতো হলেও যারা দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার কর্মকৌশল বোঝেন, চিকিৎসা বাণিজ্যের সূত্র বুঝতে সক্ষম- তাদের কাছে খুব সোজা।

সহজ সমীকরণটা হলো এই যে, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার অধীনে রোগ-প্রতিরোধী জনবল ও কার্যক্রম বাড়ালে রোগের বিস্তার হ্রাস পাবে, অনেক ধরনের সংক্রামক-অসংক্রামক ও খাদ্য মাধ্যমে সৃষ্ট রোগ শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। রোগের শূন্যতা মানে চিকিৎসা বাণিজ্যের বাজারে মন্দা।

সুতরাং চিকিৎসা বিজ্ঞান, স্বাস্থ্যবিষয়ক আইনকানুন বা স্বাস্থ্য সুরক্ষার জাতীয় নীতিমালায় যা-ই নির্দেশনা থাকুক, অসুখের বিস্তার রোধ করার মতো কার্যকর কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করা এ আমলাতন্ত্রের দ্বারা কখনই সম্ভব নয়।

দেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলে রোগ প্রতিরোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততায় ১২০ হাজার টিকাদান কেন্দ্র থেকে সপ্তাহে ২ দিন নিয়মিত টিকা গ্রহণ করে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সি নারী এবং ১ দিন থেকে ১৮ মাস বয়সের শিশুরা। কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করেন স্বাস্থ্য সহকারী, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক, স্বাস্থ্য পরিদর্শক, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট-ইপিআই। সম্প্রসারিত টিকাদান কার্যক্রমের শুরু থেকে আজ অবধি কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা সংঘটনের খবর পাওয়া যায়নি।

হঠাৎ করে কী এমন বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা ডিজিএইচএসের মাথায় চেপে বসল যে, উল্লিখিত কেন্দ্রগুলো বাদ দিয়ে করোনাভাইরাস প্রতিরোধী ভ্যাকসিন প্রদানের কাজটি ভোটকেন্দ্রের আদলে সম্পাদন করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল? জানি, সংশ্লিষ্ট কাজের ব্যবস্থাপকরা সহজেই বলে বসবেন, সরকারের সক্ষমতার অভাব।

একটি বিষয়ে আমাদের স্পষ্ট জ্ঞান থাকা চাই- সরকারের সক্ষমতা এবং ব্যবস্থাপকদের ব্যর্থতা কিন্তু এক বিষয় নয়। দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরু থেকে এ পর্যন্ত যেটা দেখা গেছে তা হলো, রোগ প্রতিরোধের জনবলের ভীষণ অপর্যাপ্ততা সত্ত্বেও যা আছে- এ স্বল্পসংখ্যক দক্ষ জনবলেরও সর্বোচ্চ ব্যবহার ব্যবস্থাপকরা নিশ্চিত করতে পারেননি বা নিশ্চিত করাতে মনোযোগ ছিল না।

তাহলে এ আলোচনা থেকে আমরা কি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি না যে, সরকারের সক্ষমতা আছে, কিন্তু কর্মপরিকল্পনা ও কর্মপন্থা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি অথবা ইচ্ছাকৃত বিভ্রান্তি রয়েছে? কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন প্রদানে দীর্ঘসূত্রতার নীতির কারণে সরকার বেসরকারি পর্যায়ে ভ্যাকসিন প্রদানের অনুমতি দেবে এবং আর্থিকভাবে মোটামুটি সক্ষম পরিবারের সবাই জীবন বাঁচানোর প্রয়োজন থেকেই কিনে টিকা নিতে বাধ্য হবেন। জয় শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা বণিকদেরই হবে! তা হোক।

রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য প্রশাসনের আমলাতন্ত্র যেখানে সব ধরনের কৌশল খাটিয়ে চিকিৎসা বাণিজ্যের সহায়ক ভূমিকা পালন করে, সেখানে জনগণের জয়ের সম্ভাবনা নেই বলেই অনুমিত। কিন্তু সারা দেশে ভোটকেন্দ্রের আদলে ৭৩৪৪টি টিকাদান কেন্দ্রের মাধ্যমে টিকাদানের এ অভিনব পদ্ধতি নিয়ে আমার একটি প্রশ্ন আছে।

সেটি হলো, প্রশাসন সতর্ক থাকার পরও দেশের ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোট নিয়ে এখনো কাড়াকাড়ি, মারামারির সংস্কৃতি আছে, কারও কারও প্রাণও যায়! তবে কি করোনার টিকা নিয়ে এ রকম কিছু ঘটবে?

করোনাভাইরাস প্রতিরোধের টিকা নিয়ে ডিজিএইচএসের সব আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে শুধু এটুকুই বলব, সব বিভ্রান্তিমূলক চিন্তা বাদ দিয়ে রোগ-প্রতিরোধী টিকাদানের জনবলের ওপর শতভাগ ভরসা রাখুন। দ্য ভ্যাকসিনেশ অ্যাক্ট-১৮৮০, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ এবং জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি-২০১১-এ প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।

এবং মনে রাখুন, বহির্বিশ্বে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সুনাম বাড়িয়ে দিয়েছে এ টিকাদানের স্বাস্থ্য জনবল। স্বাস্থ্য বিভাগের সব পুরস্কার অর্জনে এদের কাজের অবদানই অগ্রগণ্য। আপনারা টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার চিকিৎসা ও টেকনোলজির সাপোর্ট দিন; টিকাদানের স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রত্যাশিত কাজ দেবে।

খছরু চৌধুরী : স্বাস্থ্য প্রযুক্তিবিদ ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক কলামিস্ট

করোনার টিকা কার্যক্রম

প্রয়োজন দক্ষ জনবলের সর্বোচ্চ ব্যবহার

 খছরু চৌধুরী 
২২ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ওপর লিখতে গিয়ে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার দুটি পঙ্ক্তি মনে পড়ে গেল- ‘বন্ধু গো, আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে/দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে ক’ই মুখে।’

জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় রোগ প্রতিরোধের বিভ্রান্তিমূলক কর্মপদ্ধতি দেখে-দেখে কবি নজরুলের মতো আমারও মনের অবস্থা একই জায়গায় এসে ঠেকেছে।

সার্বিক ব্যবস্থাপনায় নানা অসংগতি, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, বিভ্রান্তি ও দুর্নীতি এতটাই জেঁকে বসেছে যে কোনটা লিখব আর কোনটা লিখব না- সেটিও যেন নির্বাচন করা মুশকিল হয়ে পড়েছে।

যে কোনো রাষ্ট্রীয় কাজের একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে। সেই লক্ষ্যের দিকে কাজটিকে এগিয়ে নিতে হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপকদের একটি বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা সমীচীন। আমাদের দেশের ব্যবস্থাপকরা সেই মহৎ ধারণা কতটুকু ধারণ ও লালন করেন সেটা আমি ঠিক বুঝতে না পারলেও যেটি বুঝি তা হলো, উল্লিখিত কাজগুলো যে আদর্শ, চিন্তা ও কর্মপদ্ধতিগত ঐক্যের ভিত্তিতে হচ্ছে না- তা তো দিবালোকের আলোর মতো স্পষ্ট। আদর্শটা হলো সুনির্দিষ্টভাবে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আদর্শ। চিন্তাটা হলো জনগণের সার্বিক জনকল্যাণ সাধনের পথে মানুষের মুক্তি। ঐক্যের ভিত্তিটা হবে সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য জনমুখী কর্মপরিকল্পনা। ১৯৭৫-পরবর্তী সময় থেকে দেশের জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার কর্মপদ্ধতিতে না আছে মুক্তির আদর্শ, না আছে চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকে গৃহীত কোনো কর্মপন্থা। রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে-বাইরে রয়েছে চিকিৎসাসেবা বাণিজ্যের জয়জয়কার।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের কাজের ধারায় অসুখ-বিসুখ নিয়ে গবেষণা, অসুখের প্রতিরোধ ও চিকিৎসাবিষয়ক আলোচনা-পর্যালোচনায় সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে অসুখের প্রতিরোধ কর্মে। এমন অনেক দেশ রয়েছে যারা রোগের প্রতিরোধ কর্মে সফলতার দরুন স্থানীয় পর্যায়ের চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দিচ্ছে।

আমাদের স্বাধীন দেশেও ‘চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’ নীতির আলোকে বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭৩ সালে জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থাপনা ও কর্মপরিকল্পনা ঢেলে সাজিয়েছিলেন।

কিন্তু ১৯৭৫ সালের মহাট্র্যাজেডির পর বাংলার জনগণের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় রোগ প্রতিরোধের কর্মপন্থাকে সূক্ষ্ম-কৌশলে কারচুপি করা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। যার ফলে দেশে ভেজাল খাদ্যের মাধ্যমে সৃষ্ট দু’শর অধিক রোগের বিস্তার ঘটেছে, সংক্রামক-অসংক্রামক রোগবালাইও বহুগুণ বেড়ে গেছে, ব্যাঙের ছাতার মতো রাস্তার আশপাশে গড়ে উঠেছে চিকিৎসাসেবার নামে মানহীন চিকিৎসা বাণিজ্যের দোকান।

মহান মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত সংবিধান, জনস্বাস্থ্যবিষয়ক আইনবিধি ও জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি উপেক্ষা (ক্ষেত্রবিশেষে লঙ্ঘন করে) করে চিকিৎসাসেবার নামে চিকিৎসা বাণিজ্যের প্রকাশ্য ও গোপন আশকারায় রয়েছে স্বয়ং রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের অধীনস্থ স্বাস্থ্য-প্রশাসনের আমলাতন্ত্র ও তাদের গৃহীত (অপ) কৌশলের কর্মসূচি।

জনস্বাস্থ্যের রোগ-প্রতিরোধী কর্মধারায় বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে নিয়োজিত ২৬ হাজার ৫০০ স্বাস্থ্য-জনবল কাজ করেন ডিজিএইচএসের অধীনে। এদের মধ্যে রোগ-প্রতিরোধী কাজে রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যয়-বিনিয়োগে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য জনবলের নাম স্যানিটারি ইন্সপেক্টর। যাদের মৌলিক কর্মপরিধিতে রয়েছে মহামারি রোগের নিয়ন্ত্রণ, স্যানিটেশন ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়ন এবং খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।

কিন্তু রাষ্ট্রের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ওপর বেসরকারি চিকিৎসা বণিকদের একচেটিয়া আধিপত্য থাকায় ১৯৭৩-পরবর্তী সময়ে জনগণের বর্ধিত সংখ্যার অনুপাতে কিংবা জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির আলোকে স্যানিটারি ইন্সপেক্টরের একটি পদও বাড়ানো হয়নি। উপরন্তু এ বৈশ্বিক অতিমারির সময়েও স্যানিটারি ইন্সপেক্টরশিপ ডিপ্লোমা ডিগ্রির সনদ অর্জনকারী ২৬২০ জন দক্ষ স্বাস্থ্য জনবলকে সুনির্দিষ্ট করে দায়িত্ব দিয়ে কাজে লাগানো হয়নি।

কেন এমন হচ্ছে বা কী কারণে রোগ প্রতিরোধের জনবলকে প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে জনস্বার্থে কাজে লাগানো হয় না- এ প্রশ্নের উত্তর অনেকের কাছে গোলকধাঁধার মতো হলেও যারা দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার কর্মকৌশল বোঝেন, চিকিৎসা বাণিজ্যের সূত্র বুঝতে সক্ষম- তাদের কাছে খুব সোজা।

সহজ সমীকরণটা হলো এই যে, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার অধীনে রোগ-প্রতিরোধী জনবল ও কার্যক্রম বাড়ালে রোগের বিস্তার হ্রাস পাবে, অনেক ধরনের সংক্রামক-অসংক্রামক ও খাদ্য মাধ্যমে সৃষ্ট রোগ শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। রোগের শূন্যতা মানে চিকিৎসা বাণিজ্যের বাজারে মন্দা।

সুতরাং চিকিৎসা বিজ্ঞান, স্বাস্থ্যবিষয়ক আইনকানুন বা স্বাস্থ্য সুরক্ষার জাতীয় নীতিমালায় যা-ই নির্দেশনা থাকুক, অসুখের বিস্তার রোধ করার মতো কার্যকর কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করা এ আমলাতন্ত্রের দ্বারা কখনই সম্ভব নয়।

দেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলে রোগ প্রতিরোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততায় ১২০ হাজার টিকাদান কেন্দ্র থেকে সপ্তাহে ২ দিন নিয়মিত টিকা গ্রহণ করে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সি নারী এবং ১ দিন থেকে ১৮ মাস বয়সের শিশুরা। কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করেন স্বাস্থ্য সহকারী, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক, স্বাস্থ্য পরিদর্শক, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট-ইপিআই। সম্প্রসারিত টিকাদান কার্যক্রমের শুরু থেকে আজ অবধি কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা সংঘটনের খবর পাওয়া যায়নি।

হঠাৎ করে কী এমন বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা ডিজিএইচএসের মাথায় চেপে বসল যে, উল্লিখিত কেন্দ্রগুলো বাদ দিয়ে করোনাভাইরাস প্রতিরোধী ভ্যাকসিন প্রদানের কাজটি ভোটকেন্দ্রের আদলে সম্পাদন করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল? জানি, সংশ্লিষ্ট কাজের ব্যবস্থাপকরা সহজেই বলে বসবেন, সরকারের সক্ষমতার অভাব।

একটি বিষয়ে আমাদের স্পষ্ট জ্ঞান থাকা চাই- সরকারের সক্ষমতা এবং ব্যবস্থাপকদের ব্যর্থতা কিন্তু এক বিষয় নয়। দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরু থেকে এ পর্যন্ত যেটা দেখা গেছে তা হলো, রোগ প্রতিরোধের জনবলের ভীষণ অপর্যাপ্ততা সত্ত্বেও যা আছে- এ স্বল্পসংখ্যক দক্ষ জনবলেরও সর্বোচ্চ ব্যবহার ব্যবস্থাপকরা নিশ্চিত করতে পারেননি বা নিশ্চিত করাতে মনোযোগ ছিল না।

তাহলে এ আলোচনা থেকে আমরা কি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি না যে, সরকারের সক্ষমতা আছে, কিন্তু কর্মপরিকল্পনা ও কর্মপন্থা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি অথবা ইচ্ছাকৃত বিভ্রান্তি রয়েছে? কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন প্রদানে দীর্ঘসূত্রতার নীতির কারণে সরকার বেসরকারি পর্যায়ে ভ্যাকসিন প্রদানের অনুমতি দেবে এবং আর্থিকভাবে মোটামুটি সক্ষম পরিবারের সবাই জীবন বাঁচানোর প্রয়োজন থেকেই কিনে টিকা নিতে বাধ্য হবেন। জয় শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা বণিকদেরই হবে! তা হোক।

রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য প্রশাসনের আমলাতন্ত্র যেখানে সব ধরনের কৌশল খাটিয়ে চিকিৎসা বাণিজ্যের সহায়ক ভূমিকা পালন করে, সেখানে জনগণের জয়ের সম্ভাবনা নেই বলেই অনুমিত। কিন্তু সারা দেশে ভোটকেন্দ্রের আদলে ৭৩৪৪টি টিকাদান কেন্দ্রের মাধ্যমে টিকাদানের এ অভিনব পদ্ধতি নিয়ে আমার একটি প্রশ্ন আছে।

সেটি হলো, প্রশাসন সতর্ক থাকার পরও দেশের ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোট নিয়ে এখনো কাড়াকাড়ি, মারামারির সংস্কৃতি আছে, কারও কারও প্রাণও যায়! তবে কি করোনার টিকা নিয়ে এ রকম কিছু ঘটবে?

করোনাভাইরাস প্রতিরোধের টিকা নিয়ে ডিজিএইচএসের সব আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে শুধু এটুকুই বলব, সব বিভ্রান্তিমূলক চিন্তা বাদ দিয়ে রোগ-প্রতিরোধী টিকাদানের জনবলের ওপর শতভাগ ভরসা রাখুন। দ্য ভ্যাকসিনেশ অ্যাক্ট-১৮৮০, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ এবং জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি-২০১১-এ প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।

এবং মনে রাখুন, বহির্বিশ্বে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সুনাম বাড়িয়ে দিয়েছে এ টিকাদানের স্বাস্থ্য জনবল। স্বাস্থ্য বিভাগের সব পুরস্কার অর্জনে এদের কাজের অবদানই অগ্রগণ্য। আপনারা টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার চিকিৎসা ও টেকনোলজির সাপোর্ট দিন; টিকাদানের স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রত্যাশিত কাজ দেবে।

খছরু চৌধুরী : স্বাস্থ্য প্রযুক্তিবিদ ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক কলামিস্ট