স্মরণ

প্রতিভার ঝরে যাওয়া

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  দিল মনোয়ারা মনু

প্রয়াত সাহসী বৈমানিক ফারিয়া লারা

আজ ফারিয়া লারার জন্মদিন। মৃত্যুর মাত্র পনেরো মিনিট আগে এই সাহসী বৈমানিক ইমার্জেন্সি কল দিয়ে কন্ট্রোলকে জানিয়েছিলেন ‘আমি আর কয়েক মিনিট বেঁচে আছি এই পৃথিবীতে’। এরপরই বিছিন্ন হয়ে যায় তার সঙ্গে সব যোগাযোগ।

রাজেন্দ্রপুরের যে জমিতে লারা একসময় কটেজ বানানোর স্বপ্ন দেখেছিল, সেই জমিতেই তাকে জীবনের শেষ আশ্রয় নিতে হল। ফারিয়া লারা হতে পারতেন দক্ষ শিক্ষক, গবেষক কিংবা সাংবাদিক, কিন্তু না, তিনি বেছে নিলেন এক চ্যালেঞ্জিং পেশা বৈমানিক। লারা আকাশ জয় করতে চেয়েছিলেন।

দুর্ঘটনা তাকে কেড়ে নিয়েছে ঠিকই; কিন্তু কেড়ে নিতে পারেনি তার স্বপ্ন, তার প্রত্যয় এবং সাহসকে। আগামীদিনে এবং এখন যারা আকাশ জয় করতে চাইবে তারা ওর মাঝেই খুঁজে পাবে সেই শক্তি, সেই প্রেরণা, স্বপ্ন আর সাহস। তাই আমরা অহংকারের সঙ্গে বলতে পারি ফারিয়া লারা একটি সাহস, একটি প্রত্যয়ের নাম। জীবনযুদ্ধে অসম্ভব আÍপ্রত্যয়ী কেবলই শুরু হওয়া জীবনে এ মানুষটির লড়াই ছিল সমাজে হাজার বছরের বিরাজমান বৈষম্যের বিরুদ্ধে।

অসম্ভব প্রাণবন্ত মেয়ে এই লারা। ছোটবেলা থেকেই চমৎকার ছবি আঁকত। জাতীয়, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে পুরস্কৃত হতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করার সময়ই আবৃত্তি, বিতর্ক, উপস্থাপনা করে ব্যাপক প্রশংসিত হন। লিও ক্লারের সদস্য হিসেবে পৃথিবীর বহু দেশ ঘোরেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স, এমএ করার সময় থেকে সাংবাদিকতা এবং লেখালেখিও শুরু করেছিলেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গবেষণা, অনুবাদক ও দোভাষীর কাজও করেছেন।

একটি পত্রিকার সহযোগী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন কিছু সময়। কিন্তু মন বসলো না ঠিক কোথাও। এসব ক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় রাখলেও এক সময় বৈমানিক হওয়ার ইচ্ছাটাই তাকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। এ পেশার প্রশিক্ষণ চলাকালীন প্রতিটি পরীক্ষায়ই চমৎকার ফলাফল করেছিলেন। ছাড়পত্র নেয়ার শেষ মুহূর্তেই ঘটে গেল সেই নিদারুণ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। আরাধ্য লক্ষ্যে আর তার পৌঁছানো হল না।

দু’শ ঘণ্টা বিমান চালিয়ে অর্জন করেছিলেন তিনি কমার্শিয়াল পাইলটের লাইসেন্স। ইচ্ছা ছিল পাইলট থেকে ইনস্ট্রাক্টর হবেন। মেয়ে বৈমানিক তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।

মা-বাবা অন্তঃপ্রাণ লারা মাকে নিয়ে উড়ে বেরিয়েছে বহু জায়গায়। সাভার স্মৃতিসৌধের ওপর দিয়ে উড়ে বেড়াতে বেড়াতে মাকে বলেছেন, মা দেখ চূড়ার প্রতিটি ধাপে কত ডাইমেনশন। যা নিচ থেকে একেবারেই দেখা যায় না।

নদীর প্রতি মায়ের বিশেষ দুর্বলতা রয়েছে বলে তিনি মাকে দেখিয়েছিলেন ওপর থেকে শীতলক্ষ্যা নদীর অপার সৌন্দর্য, মীজানুর রহমান সম্পাদিত পত্রিকার নদীবিষয়ক সংখ্যায় সেই নদীর অপরূপ সৌন্দর্য বর্ণনা করেছেন মা সেলিনা হোসেন।

পিস কোরে চাকরি হওয়ার পর বাবাকে গলায় জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বলেছিলেন- গ্রামে গড়ে তোলা তোমার স্কুল-কলেজে এবার থেকে আমিও আর্থিক সাহায্য করব। ফারিয়া মাকে প্রায়ই বলত, তোমার অন্য ছেলেমেয়েরা বিদেশে থাকবে, আমিই তোমায় দেখব, যেখানেই যাই আবার তোমার কাছে ফিরে আসব। ফিরে এসেছিল; কিন্তু সে ফেরা যে এত মর্মন্তুদ হবে কেউ কি জানত?

হ্যাঁ লারা শুয়ে আছেন রাজেন্দ্রপুরে। আর সেখানে লারার স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য লড়াই করে চলেছেন মা সেলিনা হোসেন। গড়ে তুলেছেন লারা ফাউন্ডেশন। বরগুনার বামনায়ও এই প্রতিষ্ঠান কাজ করেছে প্রান্তিক নারী শিশুর আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে। প্

রতিষ্ঠিত হয়েছেন স্কুল-কলেজ এবং ছাত্রী ও কর্মজীবী নারীদের জন্য হোস্টেল। এমনি সব মহৎ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে প্রত্যন্ত গ্রামটিকে আলোকিত করার কাজ করে চলেছে লারা ফাউন্ডেশন। মা ‘বইপত্র’ অনুষ্ঠানের জন্য টান মরিসনের বই পড়ে শেষ করে উঠতে পারছিলেন না বলে ফারিয়া তাকে বইয়ের শেষ অংশ গল্পের মতো করে পড়ে শুনিয়েছিলেন, ঠিক যেমন করে বর্ণনা করে শুনিয়েছিলেন, এক সময় অরুন্ধুতী রায়ের ‘দি গডস অব স্মল থিংকস’-এর বিতর্কিত পর্বটি। সেক্সের সঙ্গে নেচারের ঘনিষ্ঠ সংযোগকে ভিন্ন ধাঁচে এমন চমৎকার বিশ্লেষণ করেছিলেন যে মা সেলিনা হোসেন চমৎকৃত হয়েছিলেন। আধুনিক সাহিত্য, প্রজন্মের দুঃখ, হতাশা, সংগ্রামের খবর সেই মেয়েটির কাছ থেকে তিনি জানতে পারতেন।

এ মেয়েটিকে হারিয়ে তাই তিনি শুধুই মেয়েই নয়, পরম বন্ধুকেও হারিয়েছেন। আমরা হারিয়েছি লারাকে। জানি লারা ফিরবে না আর কোনোদিন। কিন্তু বিশ্বাস করি তিনি বেঁচে থাকবেন তার স্বপ্ন ও আকাশচারী অদম্য সাহসের মধ্যে। অনন্য লারার জন্মদিন ফিরে ফিরে আসবে আমাদের মধ্যে।

দিল মনোয়ারা মনু : লেখক ও সাংবাদিক