প্রণোদনায় অনিয়ম বন্ধ হওয়া দরকার
jugantor
প্রণোদনায় অনিয়ম বন্ধ হওয়া দরকার
নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি

  ড. আর এম দেবনাথ  

২৩ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

একটি কাগজে খবরের একটি শিরোনাম হচ্ছে ‘তেলের দাম নয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ’। তেল মানে ভোজ্য তেল-সয়াবিন। খবরটিতে বলা হয়েছে, কোম্পানিভেদে পাঁচ লিটারের এক বোতল সয়াবিন তেলের মূল্য এখন ৬৫৫ থেকে ৬৬৫ টাকা। বড় তিনটি কোম্পানির বাধা দর থেকে দেখা যায়, প্রতি লিটার সয়াবিনের দাম দুই থেকে চার টাকা বেড়েছে। উল্লেখ্য, শুধু সয়াবিন তেল নয়; খোলাবাজারে চালের দাম বেড়ে চলেছে, অথচ এখন চালের মৌসুম। আমন ধানের মৌসুম। কৃষকের ঘরে ঘরে চাল। বাজারে চিনি, মসলাপাতি থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দামই ঊর্ধ্বমুখী। এমনকি শীত মৌসুমের সবজির দাম উঁচুতে উঠে আর নড়ছে না। অথচ লোকের আয় নেই, আয় কমেছে। বাড়িওয়ালাদের ভাড়াটিয়ারা ঠিকমতো বাড়িভাড়া পরিশোধ করতে পারছে না। ব্যাংকসুদের আয় সর্বনিুে। চাকরিচ্যুত অনেক মানুষ। ব্যাবসাচ্যুত হাজার হাজার লোক। পেশাজীবীদের কাজে এখনো গতি আসেনি। অথচ জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে কোনো কারণ ছাড়াই। এক কেজি চিনির দাম পাঁচ টাকা বাড়লে মধ্যবিত্তের মাসিক খরচ বাড়ে কমপক্ষে ১৫ টাকা-মাসিক ভোগ তিন কেজি ধরে। চাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর দামের হিসাব করলে মাসিক বাড়তি খরচ কত হয় তা সহজেই অনুমেয়। অথচ দেশে এখনো অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে। মানুষ এমনিতেই কষ্টে আছে। এর মধ্যে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী ভোক্তাদের পেয়ে বসেছে। ভোক্তারা অসহায়। মনে হচ্ছে, এ অসহায়ত্ব আগামী দিনে আরও বাড়বে। এ কথা আমি বলছি না; বলছে বাংলাদেশের ব্যাংক। তারা বলছে, আগামীতে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে, বাড়বে।

কাগজে দেখলাম, বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘বার্ষিক রিপোর্ট ২০১৯-২০’ প্রকাশিত হয়েছে। এটা সব সময়ই অর্থবছর শেষ হওয়ার ৬-৭ মাস পর প্রকাশিত হয়। গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এতে বছরের হিসাব যেমন থাকে, তেমনি থাকে কিছু ভবিষ্যদ্বাণী। অবশ্যই অর্থনীতির ওপর। রিপোর্ট অনুযায়ী চার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি উদ্ধারে ধীরগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ চারটি কারণ হচ্ছে : বৈদেশিক বাণিজ্যে স্থবিরতা, বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধ। বলা বাহুল্য, এসব কাগজের রিপোর্ট। আমি বার্ষিক রিপোর্টটি এখনো পড়িনি। তবু রিপোর্ট থেকে মনে হয়, আগামী দিনে মূল্যস্ফীতি বাড়বে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে। বলা হচ্ছে, ‘করোনার প্রভাব মোকাবিলায় প্রণোদনা প্যাকেজের মাধ্যমে বাজারে টাকার জোগান বাড়ানো হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। এ চাপ মোকাবিলায় কঠোর তদারকি করতে হবে। যাতে বাজারে ছাড়া টাকার ব্যবহার যথাযথ হয়। একইসঙ্গে উৎপাদন, চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।’ (যুগান্তর ২০.১.২১)। এ বছর (২০২০-২১) মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে, এ হার বছর শেষে ৫ থেকে ৫ দশমিক ৯ শতাংশের মধ্যে থাকতে পারে।

সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনটি পাঠ করে মনেই হচ্ছে ‘প্রণোদনা প্যাকেজটি’ মূল্যস্ফীতি উসকে দিতে পারে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে; যদি না ওই টাকার যথাযথ ব্যবহার হয়। প্রশ্ন, কত টাকার প্রণোদনা যে, ওই টাকা মূল্যস্ফীতির জন্ম দিতে পারে। তথ্যে দেখা যায় ‘করোনা-১৯’ শুরু হওয়ার পর সরকার দেশের অর্থনীতিকে চাঙা করতে সর্বমোট এক লাখ ২১ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এ প্রণোদনা বড়, মাঝারি ও ছোট শিল্পের জন্য। তাদের ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অর্থ সরবরাহ করাই এর উদ্দেশ্য। এ প্রণোদনার সিংহভাগই ব্যাংক ঋণ এবং সেই ঋণ সহজলভ্য ও কম সুদে অর্থাৎ ভর্তুকিতে। সুদের অর্ধেক দেবে সরকার। বাকি অর্ধেক দেবে ব্যবসায়ীরা। প্রণোদনার টাকা বণ্টনে ছোটরা বঞ্চিত এবং অবহেলিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে সরকার কয়েকদিন আগে ক্ষুদ্রদের জন্য একটি বিশেষ ‘প্রণোদনা প্যাকেজ’ ঘোষণা করেছে। এর পরিমাণ দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকা। ক্ষুদ্র, মাঝারি ও ছোটদের পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনতেই এ নতুন প্যাকেজ। দেখা যাচ্ছে, প্যাকেজটি দুভাগে বিভক্ত। এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা শিল্পের জন্য আর বাকি এক হাজার ২০০ কোটি টাকা সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয়ের জন্য। সুরক্ষার টাকা খরচ হবে ২০২১-২২ অর্থবছরে। এটা পাবে দরিদ্র-বয়স্ক লোকজন, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা নারীরা। বলা বাহুল্য, এরা ভাতা পাচ্ছে, এর আওতা বাড়ানো হবে মাত্র।

আলোচনার মূলে ‘প্রণোদনা কর্মসূচি’ নয়। মূলে হচ্ছে প্রণোদনার টাকা সদ্ব্যবহার। বাংলাদেশ ব্যাংক এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছে। তারা বলেছে, টাকার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত না করতে পারলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। আর তা হলে জনদুর্ভোগ বাড়বে, বলাই বাহুল্য। ঋণের যথাযথ ব্যবহার, সরকারি ব্যয়ের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে কথা আজকের নয়। সরকারি ব্যয়ের টাকা যথাযথভাবে খরচ হয় না। খরচের গুণগত মান খুবই খারাপ। এক টাকার কাজ সরকার দুই টাকা, তিন টাকায় করে। ফলে আমাদের বাজেটের আকার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদি এক টাকার কাজ এক টাকাতেই করা যেত, তাহলে আমাদের অল্প পরিমাণের বাজেট দিয়েই বেশি কাজ করা যেত। কিন্তু দুর্নীতি ও অনিয়ম আমাদের বাজেট বড় করে দিচ্ছে। এ ব্যাপারে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান কী বলেন, তা দেখা যাক। তিনি বলেন, ‘প্রকল্পে দলগত দুর্নীতি হচ্ছে। সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি নিয়ে এক ধরনের জোয়ার উঠে গেছে। প্রকল্পের কেনাকাটায় দলগত (টিমওয়ার্ক) দুর্নীতি হয় বলে আমার ধারণা, তবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে দুর্নীতি বেশি হয়।’ তিনি অন্যত্র বলছেন, ‘এবার আমরা উন্নয়ন বাজেট দিচ্ছি দুই লাখ দুই হাজার কোটি টাকার; ১৯৭৩ সালে যেটি ছিল মাত্র ৫০০ কোটি টাকার। ...এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, আমাদের পূর্বপুরুষরা এত টাকা দেখেনি।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘এখন একটু আয়-উন্নতি হয়েছে। টাকার প্রবাহ বেড়েছে। লোভ-লালসা বেড়েছে।’

পরিকল্পনামন্ত্রী খুব সহজভাবে কথাগুলো বলেছেন। বর্তমান অবস্থার একটা বাস্তবচিত্র তিনি দিয়েছেন। এসব ব্যাপারে তিনি বেশ স্পষ্টভাষী দেখা যাচ্ছে। তিনি টাকার প্রবাহ বৃদ্ধির যে কথা বলেছেন, তা শুধু উন্নয়ন বাজেটের বেলায় সত্য নয়। টাকার প্রবাহ বেড়েছে ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে। এখন ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ৯-১০ লাখ কোটি টাকা। ভাবা যায়! পাকিস্তান আমলের শেষে তা কয়েকশ কোটি টাকাও ছিল না। ঋণ খাতে টাকার প্রবাহ বেড়েছে এবং বাড়ছে। এবার ‘প্রণোদনা কর্মসূচি’ উপলক্ষ্যে বাজারে টাকা ছাড়া হয়েছে প্রচুর পরিমাণে। উপায় ছিল না। অর্থনীতি স্থবির, মিল-কারখানা বন্ধ, মানুষের আয় রোজগার নেই, পোশাক খাতের শ্রমজীবীরা কর্মহীন। কোভিড-১৯ আমাদের বসিয়ে দিয়েছিল। এ অবস্থা থেকে অর্থনীতিকে উদ্ধার করার ক্ষেত্রে যার কোনো বিকল্প ছিল না। অর্থনীতিতে টাকার প্রবাহ বৃদ্ধি করাই ছিল একমাত্র পথ। সরকার তাই করেছে। করেছে সস্তায় ঋণের ব্যবস্থা। অবশ্য করোনার আগেই ব্যাংক ঋণের ওপর সুদের হার সর্বোচ্চ নির্ধারিত হয় ৯ শতাংশ।

করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করা হয় ভর্তুকিতে, মাত্র সাড়ে চার শতাংশে। বাকি সাড়ে চার শতাংশ সরকার দেবে ভর্তুকি হিসাবে। বোঝাই যায়, খুবই সস্তা ঋণ। এতেই অনেকে আশঙ্কা করেন অপব্যবহারের। দ্বিতীয় আশঙ্কা, এ সস্তা ঋণের সুবিধা নেবে বড় বড় প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। তাদের বেশিরভাগই কার্যত ঋণখেলাপি। নানা ধরনের সুযোগ দিয়ে তাদের বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। তারা করোনার আগেই কোনো টাকা-পয়সা ব্যাংকে জমা দিত না, শুধু নিত। কোভিড-১৯ এসে তাদের আরেকটা সুযোগ করে দিয়েছে। আশঙ্কা যা ছিল, তাই শেষ পর্যন্ত হয়েছে বলে অনেকের ধারণা। যাদের ‘সাপোর্ট’ পাওয়ার কথা, তারা ঋণের টাকা পায়নি; আর যারা পাওয়ার যোগ্য নয়, তারা টাকা পেয়েছে। বস্তুত তারাই সর্বাগ্রে ঋণের টাকা পেয়েছে। এ কারণে দাবি ওঠে-ছোট, মাঝারি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা হোক। ব্যবস্থা হোক অন্যদের জন্যও। শুধু ব্যবসায়ী-শিল্পপতিই কী ক্ষতিগ্রস্ত? ক্ষতিগ্রস্ত সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির লোক। বাজার ঠিক রাখতে হলে তাদের হাতেও টাকা দরকার।

না, এ ব্যবস্থা এখনো হয়নি। কিন্তু কথা উঠেছে, সরবরাহকৃত টাকা সদ্ব্যবহার প্রশ্নে। ব্যাংক ঋণের টাকার সদ্ব্যবহার যে সেভাবে হয় না, তা আমাদের অভিজ্ঞতাই বলে। ঋণের টাকা দিয়ে অনেকে শিল্পের পর শিল্প করেছে, উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়েছে। এখন অনেক ক্ষেত্রেই এসব শিল্প রুগ্ণশিল্প। তাদের ক্যাশ জেনারেশন নেই। তারা ব্যাংকের টাকা দিতে পারে না। পুরো কারখানা বিক্রি করতে চাইলেও তা বিক্রি হয় না। এত বড় শিল্পকারখানা অথচ কোথাও কোনো ক্রেতা নেই। আবার অনেকে ব্যাংক ঋণের টাকা নিয়ে গেছে শেয়ারবাজারে। শেয়ারবাজারে বুদ্বুদ সৃষ্টি হয়েছিল অতীতে অন্তত দুবার এবং সেই বুদ্বুদের শিকার হয়েছিলেন হাজার হাজার বিনিয়োগকারী। ওই ধাক্কা খেয়ে আজও অনেকেই স্বাভাবিক হতে পারেনি। অনেকে ব্যাংক ঋণের টাকা নিয়ে বিনিয়োগ করেছে জমিতে-ফ্ল্যাটে-বাড়িতে। এ কারণে বিগত ১০-১৫ বছরের মধ্যে রিয়েল এস্টেটের মূল্য বেড়েছে কয়েকগুণ। আবার বহু ব্যবসায়ী-শিল্পপতি ব্যাংকের টাকা মেরে চলে গেছে বিদেশে। গত বছরের ২২ নভেম্বরের খবর-চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী আব্দুল আলিম চৌধুরী বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ৪১৬ কোটি টাকা নিয়ে বিদেশে চলে গেছে। ইউরোপের একটি দেশে তার হোটেল রয়েছে। সাতটি ব্যাংক এবং একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান তার বিরুদ্ধে মামলা রুজু করেছে ঋণখেলাপের জন্য। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের টাকা মেরে বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে পি কে হালদার এক অনন্য নজির। বলা বাহুল্য, ঋণ সহজলভ্য এবং সস্তা হলে তার পরিণতি অতীতে হয়েছে খুবই খারাপ। অতীতে ‘বেবিটেক্সি বিল’, ‘বিকল্প’ নামীয় প্রকল্পের বাস ঋণ, ‘তাঁতি ঋণ’সহ অনেক ঋণ যা দেওয়া হয়েছিল; গণহারে তাদের ‘রিকভারি’ ছিল খুবই খারাপ।

এবারও বাজারে নানা কথা উঠেছে ‘প্রণোদনার’ টাকা নিয়ে। শেয়ারবাজরের হঠাৎ উত্থান, রিয়েল এস্টেট বাজারের পুনর্জাগরণ ইত্যাদি নিয়ে নানা সংশয় জাগছে মানুষের মনে। সত্যি-মিথ্যা বলা খুবই কঠিন। বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বসহকারে দেখা উচিত বলে আমি মনে করি। সহজভাবে সস্তায় প্রণোদনার অধীন প্রাপ্ত ব্যাংক ঋণের অপব্যবহার হচ্ছে কি না, টাকা ‘ডাইভার্ট’ হচ্ছে কি না, তা তলিয়ে দেখা দরকার। বিশেষ করে যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে যথাযথ ব্যবহারের কথা। ব্যাংক ঋণের টাকা যাতে ‘ডাইভার্ট’ না হয়, তার জন্য দেখা দরকার ‘কোভিড-১৯’-এর আগে ব্যাবসা এবং শিল্প চালু ছিল কি না। চালু থাকলে ঋণযোগ্য বিবেচিত হবে, নতুবা নয়। করোনার আগেই বন্ধ কারখানা সুযোগ বুঝে ঋণের আবদার করবে, তা হওয়া উচিত নয়।

করোনা-পূর্ব ভালো কারখানাকে ঋণ দিতে গিয়ে দেখতে হবে তার ‘ক্যাশ জেনারেশনের’ ক্ষমতা। ঢালাওভাবে ঋণ না দিয়ে যেসব কারখানার ‘ক্যাশ জেনারেশনের’ ক্ষমতা আছে, তাদেরই শুধু পরিমিত ঋণ দেওয়া দরকার। একই কথা সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে। দেখা যাচ্ছে, সরকার ২০২১-২২ অর্থবছরে সামাজিক সুরক্ষার আওতা বাড়াবে। এ ক্ষেত্রেও সদ্ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পনা কমিশনের রিপোর্টে দেখা যায়, যারা সুরক্ষার টাকা পাওয়ার কথা, তারা পাচ্ছে না। যাদের পাওয়ার কথা নয়, তারা পাচ্ছে। এ অপব্যবহার, অনিয়মও বন্ধ হওয়া দরকার।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রণোদনায় অনিয়ম বন্ধ হওয়া দরকার

নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি
 ড. আর এম দেবনাথ 
২৩ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

একটি কাগজে খবরের একটি শিরোনাম হচ্ছে ‘তেলের দাম নয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ’। তেল মানে ভোজ্য তেল-সয়াবিন। খবরটিতে বলা হয়েছে, কোম্পানিভেদে পাঁচ লিটারের এক বোতল সয়াবিন তেলের মূল্য এখন ৬৫৫ থেকে ৬৬৫ টাকা। বড় তিনটি কোম্পানির বাধা দর থেকে দেখা যায়, প্রতি লিটার সয়াবিনের দাম দুই থেকে চার টাকা বেড়েছে। উল্লেখ্য, শুধু সয়াবিন তেল নয়; খোলাবাজারে চালের দাম বেড়ে চলেছে, অথচ এখন চালের মৌসুম। আমন ধানের মৌসুম। কৃষকের ঘরে ঘরে চাল। বাজারে চিনি, মসলাপাতি থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দামই ঊর্ধ্বমুখী। এমনকি শীত মৌসুমের সবজির দাম উঁচুতে উঠে আর নড়ছে না। অথচ লোকের আয় নেই, আয় কমেছে। বাড়িওয়ালাদের ভাড়াটিয়ারা ঠিকমতো বাড়িভাড়া পরিশোধ করতে পারছে না। ব্যাংকসুদের আয় সর্বনিুে। চাকরিচ্যুত অনেক মানুষ। ব্যাবসাচ্যুত হাজার হাজার লোক। পেশাজীবীদের কাজে এখনো গতি আসেনি। অথচ জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে কোনো কারণ ছাড়াই। এক কেজি চিনির দাম পাঁচ টাকা বাড়লে মধ্যবিত্তের মাসিক খরচ বাড়ে কমপক্ষে ১৫ টাকা-মাসিক ভোগ তিন কেজি ধরে। চাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর দামের হিসাব করলে মাসিক বাড়তি খরচ কত হয় তা সহজেই অনুমেয়। অথচ দেশে এখনো অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে। মানুষ এমনিতেই কষ্টে আছে। এর মধ্যে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী ভোক্তাদের পেয়ে বসেছে। ভোক্তারা অসহায়। মনে হচ্ছে, এ অসহায়ত্ব আগামী দিনে আরও বাড়বে। এ কথা আমি বলছি না; বলছে বাংলাদেশের ব্যাংক। তারা বলছে, আগামীতে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে, বাড়বে।

কাগজে দেখলাম, বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘বার্ষিক রিপোর্ট ২০১৯-২০’ প্রকাশিত হয়েছে। এটা সব সময়ই অর্থবছর শেষ হওয়ার ৬-৭ মাস পর প্রকাশিত হয়। গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এতে বছরের হিসাব যেমন থাকে, তেমনি থাকে কিছু ভবিষ্যদ্বাণী। অবশ্যই অর্থনীতির ওপর। রিপোর্ট অনুযায়ী চার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি উদ্ধারে ধীরগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ চারটি কারণ হচ্ছে : বৈদেশিক বাণিজ্যে স্থবিরতা, বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধ। বলা বাহুল্য, এসব কাগজের রিপোর্ট। আমি বার্ষিক রিপোর্টটি এখনো পড়িনি। তবু রিপোর্ট থেকে মনে হয়, আগামী দিনে মূল্যস্ফীতি বাড়বে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে। বলা হচ্ছে, ‘করোনার প্রভাব মোকাবিলায় প্রণোদনা প্যাকেজের মাধ্যমে বাজারে টাকার জোগান বাড়ানো হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। এ চাপ মোকাবিলায় কঠোর তদারকি করতে হবে। যাতে বাজারে ছাড়া টাকার ব্যবহার যথাযথ হয়। একইসঙ্গে উৎপাদন, চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।’ (যুগান্তর ২০.১.২১)। এ বছর (২০২০-২১) মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে, এ হার বছর শেষে ৫ থেকে ৫ দশমিক ৯ শতাংশের মধ্যে থাকতে পারে।

সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনটি পাঠ করে মনেই হচ্ছে ‘প্রণোদনা প্যাকেজটি’ মূল্যস্ফীতি উসকে দিতে পারে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে; যদি না ওই টাকার যথাযথ ব্যবহার হয়। প্রশ্ন, কত টাকার প্রণোদনা যে, ওই টাকা মূল্যস্ফীতির জন্ম দিতে পারে। তথ্যে দেখা যায় ‘করোনা-১৯’ শুরু হওয়ার পর সরকার দেশের অর্থনীতিকে চাঙা করতে সর্বমোট এক লাখ ২১ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এ প্রণোদনা বড়, মাঝারি ও ছোট শিল্পের জন্য। তাদের ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অর্থ সরবরাহ করাই এর উদ্দেশ্য। এ প্রণোদনার সিংহভাগই ব্যাংক ঋণ এবং সেই ঋণ সহজলভ্য ও কম সুদে অর্থাৎ ভর্তুকিতে। সুদের অর্ধেক দেবে সরকার। বাকি অর্ধেক দেবে ব্যবসায়ীরা। প্রণোদনার টাকা বণ্টনে ছোটরা বঞ্চিত এবং অবহেলিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে সরকার কয়েকদিন আগে ক্ষুদ্রদের জন্য একটি বিশেষ ‘প্রণোদনা প্যাকেজ’ ঘোষণা করেছে। এর পরিমাণ দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকা। ক্ষুদ্র, মাঝারি ও ছোটদের পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনতেই এ নতুন প্যাকেজ। দেখা যাচ্ছে, প্যাকেজটি দুভাগে বিভক্ত। এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা শিল্পের জন্য আর বাকি এক হাজার ২০০ কোটি টাকা সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয়ের জন্য। সুরক্ষার টাকা খরচ হবে ২০২১-২২ অর্থবছরে। এটা পাবে দরিদ্র-বয়স্ক লোকজন, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা নারীরা। বলা বাহুল্য, এরা ভাতা পাচ্ছে, এর আওতা বাড়ানো হবে মাত্র।

আলোচনার মূলে ‘প্রণোদনা কর্মসূচি’ নয়। মূলে হচ্ছে প্রণোদনার টাকা সদ্ব্যবহার। বাংলাদেশ ব্যাংক এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছে। তারা বলেছে, টাকার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত না করতে পারলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। আর তা হলে জনদুর্ভোগ বাড়বে, বলাই বাহুল্য। ঋণের যথাযথ ব্যবহার, সরকারি ব্যয়ের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে কথা আজকের নয়। সরকারি ব্যয়ের টাকা যথাযথভাবে খরচ হয় না। খরচের গুণগত মান খুবই খারাপ। এক টাকার কাজ সরকার দুই টাকা, তিন টাকায় করে। ফলে আমাদের বাজেটের আকার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদি এক টাকার কাজ এক টাকাতেই করা যেত, তাহলে আমাদের অল্প পরিমাণের বাজেট দিয়েই বেশি কাজ করা যেত। কিন্তু দুর্নীতি ও অনিয়ম আমাদের বাজেট বড় করে দিচ্ছে। এ ব্যাপারে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান কী বলেন, তা দেখা যাক। তিনি বলেন, ‘প্রকল্পে দলগত দুর্নীতি হচ্ছে। সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি নিয়ে এক ধরনের জোয়ার উঠে গেছে। প্রকল্পের কেনাকাটায় দলগত (টিমওয়ার্ক) দুর্নীতি হয় বলে আমার ধারণা, তবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে দুর্নীতি বেশি হয়।’ তিনি অন্যত্র বলছেন, ‘এবার আমরা উন্নয়ন বাজেট দিচ্ছি দুই লাখ দুই হাজার কোটি টাকার; ১৯৭৩ সালে যেটি ছিল মাত্র ৫০০ কোটি টাকার। ...এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, আমাদের পূর্বপুরুষরা এত টাকা দেখেনি।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘এখন একটু আয়-উন্নতি হয়েছে। টাকার প্রবাহ বেড়েছে। লোভ-লালসা বেড়েছে।’

পরিকল্পনামন্ত্রী খুব সহজভাবে কথাগুলো বলেছেন। বর্তমান অবস্থার একটা বাস্তবচিত্র তিনি দিয়েছেন। এসব ব্যাপারে তিনি বেশ স্পষ্টভাষী দেখা যাচ্ছে। তিনি টাকার প্রবাহ বৃদ্ধির যে কথা বলেছেন, তা শুধু উন্নয়ন বাজেটের বেলায় সত্য নয়। টাকার প্রবাহ বেড়েছে ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে। এখন ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ৯-১০ লাখ কোটি টাকা। ভাবা যায়! পাকিস্তান আমলের শেষে তা কয়েকশ কোটি টাকাও ছিল না। ঋণ খাতে টাকার প্রবাহ বেড়েছে এবং বাড়ছে। এবার ‘প্রণোদনা কর্মসূচি’ উপলক্ষ্যে বাজারে টাকা ছাড়া হয়েছে প্রচুর পরিমাণে। উপায় ছিল না। অর্থনীতি স্থবির, মিল-কারখানা বন্ধ, মানুষের আয় রোজগার নেই, পোশাক খাতের শ্রমজীবীরা কর্মহীন। কোভিড-১৯ আমাদের বসিয়ে দিয়েছিল। এ অবস্থা থেকে অর্থনীতিকে উদ্ধার করার ক্ষেত্রে যার কোনো বিকল্প ছিল না। অর্থনীতিতে টাকার প্রবাহ বৃদ্ধি করাই ছিল একমাত্র পথ। সরকার তাই করেছে। করেছে সস্তায় ঋণের ব্যবস্থা। অবশ্য করোনার আগেই ব্যাংক ঋণের ওপর সুদের হার সর্বোচ্চ নির্ধারিত হয় ৯ শতাংশ।

করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করা হয় ভর্তুকিতে, মাত্র সাড়ে চার শতাংশে। বাকি সাড়ে চার শতাংশ সরকার দেবে ভর্তুকি হিসাবে। বোঝাই যায়, খুবই সস্তা ঋণ। এতেই অনেকে আশঙ্কা করেন অপব্যবহারের। দ্বিতীয় আশঙ্কা, এ সস্তা ঋণের সুবিধা নেবে বড় বড় প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। তাদের বেশিরভাগই কার্যত ঋণখেলাপি। নানা ধরনের সুযোগ দিয়ে তাদের বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। তারা করোনার আগেই কোনো টাকা-পয়সা ব্যাংকে জমা দিত না, শুধু নিত। কোভিড-১৯ এসে তাদের আরেকটা সুযোগ করে দিয়েছে। আশঙ্কা যা ছিল, তাই শেষ পর্যন্ত হয়েছে বলে অনেকের ধারণা। যাদের ‘সাপোর্ট’ পাওয়ার কথা, তারা ঋণের টাকা পায়নি; আর যারা পাওয়ার যোগ্য নয়, তারা টাকা পেয়েছে। বস্তুত তারাই সর্বাগ্রে ঋণের টাকা পেয়েছে। এ কারণে দাবি ওঠে-ছোট, মাঝারি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা হোক। ব্যবস্থা হোক অন্যদের জন্যও। শুধু ব্যবসায়ী-শিল্পপতিই কী ক্ষতিগ্রস্ত? ক্ষতিগ্রস্ত সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির লোক। বাজার ঠিক রাখতে হলে তাদের হাতেও টাকা দরকার।

না, এ ব্যবস্থা এখনো হয়নি। কিন্তু কথা উঠেছে, সরবরাহকৃত টাকা সদ্ব্যবহার প্রশ্নে। ব্যাংক ঋণের টাকার সদ্ব্যবহার যে সেভাবে হয় না, তা আমাদের অভিজ্ঞতাই বলে। ঋণের টাকা দিয়ে অনেকে শিল্পের পর শিল্প করেছে, উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়েছে। এখন অনেক ক্ষেত্রেই এসব শিল্প রুগ্ণশিল্প। তাদের ক্যাশ জেনারেশন নেই। তারা ব্যাংকের টাকা দিতে পারে না। পুরো কারখানা বিক্রি করতে চাইলেও তা বিক্রি হয় না। এত বড় শিল্পকারখানা অথচ কোথাও কোনো ক্রেতা নেই। আবার অনেকে ব্যাংক ঋণের টাকা নিয়ে গেছে শেয়ারবাজারে। শেয়ারবাজারে বুদ্বুদ সৃষ্টি হয়েছিল অতীতে অন্তত দুবার এবং সেই বুদ্বুদের শিকার হয়েছিলেন হাজার হাজার বিনিয়োগকারী। ওই ধাক্কা খেয়ে আজও অনেকেই স্বাভাবিক হতে পারেনি। অনেকে ব্যাংক ঋণের টাকা নিয়ে বিনিয়োগ করেছে জমিতে-ফ্ল্যাটে-বাড়িতে। এ কারণে বিগত ১০-১৫ বছরের মধ্যে রিয়েল এস্টেটের মূল্য বেড়েছে কয়েকগুণ। আবার বহু ব্যবসায়ী-শিল্পপতি ব্যাংকের টাকা মেরে চলে গেছে বিদেশে। গত বছরের ২২ নভেম্বরের খবর-চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী আব্দুল আলিম চৌধুরী বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ৪১৬ কোটি টাকা নিয়ে বিদেশে চলে গেছে। ইউরোপের একটি দেশে তার হোটেল রয়েছে। সাতটি ব্যাংক এবং একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান তার বিরুদ্ধে মামলা রুজু করেছে ঋণখেলাপের জন্য। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের টাকা মেরে বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে পি কে হালদার এক অনন্য নজির। বলা বাহুল্য, ঋণ সহজলভ্য এবং সস্তা হলে তার পরিণতি অতীতে হয়েছে খুবই খারাপ। অতীতে ‘বেবিটেক্সি বিল’, ‘বিকল্প’ নামীয় প্রকল্পের বাস ঋণ, ‘তাঁতি ঋণ’সহ অনেক ঋণ যা দেওয়া হয়েছিল; গণহারে তাদের ‘রিকভারি’ ছিল খুবই খারাপ।

এবারও বাজারে নানা কথা উঠেছে ‘প্রণোদনার’ টাকা নিয়ে। শেয়ারবাজরের হঠাৎ উত্থান, রিয়েল এস্টেট বাজারের পুনর্জাগরণ ইত্যাদি নিয়ে নানা সংশয় জাগছে মানুষের মনে। সত্যি-মিথ্যা বলা খুবই কঠিন। বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বসহকারে দেখা উচিত বলে আমি মনে করি। সহজভাবে সস্তায় প্রণোদনার অধীন প্রাপ্ত ব্যাংক ঋণের অপব্যবহার হচ্ছে কি না, টাকা ‘ডাইভার্ট’ হচ্ছে কি না, তা তলিয়ে দেখা দরকার। বিশেষ করে যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে যথাযথ ব্যবহারের কথা। ব্যাংক ঋণের টাকা যাতে ‘ডাইভার্ট’ না হয়, তার জন্য দেখা দরকার ‘কোভিড-১৯’-এর আগে ব্যাবসা এবং শিল্প চালু ছিল কি না। চালু থাকলে ঋণযোগ্য বিবেচিত হবে, নতুবা নয়। করোনার আগেই বন্ধ কারখানা সুযোগ বুঝে ঋণের আবদার করবে, তা হওয়া উচিত নয়।

করোনা-পূর্ব ভালো কারখানাকে ঋণ দিতে গিয়ে দেখতে হবে তার ‘ক্যাশ জেনারেশনের’ ক্ষমতা। ঢালাওভাবে ঋণ না দিয়ে যেসব কারখানার ‘ক্যাশ জেনারেশনের’ ক্ষমতা আছে, তাদেরই শুধু পরিমিত ঋণ দেওয়া দরকার। একই কথা সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে। দেখা যাচ্ছে, সরকার ২০২১-২২ অর্থবছরে সামাজিক সুরক্ষার আওতা বাড়াবে। এ ক্ষেত্রেও সদ্ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পনা কমিশনের রিপোর্টে দেখা যায়, যারা সুরক্ষার টাকা পাওয়ার কথা, তারা পাচ্ছে না। যাদের পাওয়ার কথা নয়, তারা পাচ্ছে। এ অপব্যবহার, অনিয়মও বন্ধ হওয়া দরকার।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন