যুক্তরাষ্ট্রে করোনাকালেও পুঁজিবাজারের উল্লম্ফনের রহস্য কী
jugantor
যুক্তরাষ্ট্রে করোনাকালেও পুঁজিবাজারের উল্লম্ফনের রহস্য কী

  আবু এন এম ওয়াহিদ  

২৩ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অর্থশাস্ত্রের একজন বুড়ো ছাত্র হিসাবে করোনার এই আকালকালে ওয়াল স্ট্রিটের গতি-প্রকৃতি দেখে আমি রীতিমতো এক মহাধন্দে আছি। আপনারা জানেন, ওয়াল স্ট্রিটে নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জের অবস্থান। হলে কী হবে, এটি কোনো মামুলি ঠিকানা নয়-এ জায়গাকে ‘ক্যাপিটালিজমের ক্যাপিটাল’ বললেও অত্যুক্তি হবে না। এটাই পৃথিবীর সর্ববৃহৎ স্টক এক্সচেঞ্জ। এখানে প্রতিদিন শত শত কোটি ডলারের লেনদেন হয়। ওয়াল স্ট্রিটে যেসব কোম্পানির শেয়ার হাতবদল হয়, তাদের যৌথ বাজারমূল্য দুবছর আগেই ৩০ লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে! এখন কত হতে পারে, নিজেই আন্দাজ করে নিন। করোনাকালে এ স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচকগুলো সর্বকালের সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠে বসে আছে।

অথচ মার্কিন অর্থনীতির বাস্তব অবস্থা এখনো বেহদ্দ নাজুক। statisco.com-এর এক সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, অতিমারির প্রথমদিকে ২০২০-এর এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রে মোট বেকার ছিল দুই কোটি ৩৮ লাখ। এর পর কমলেও নভেম্বরে এসে দেখা যায় এ সংখ্যা এক কোটি ৭৪ লাখে বহাল আছে। মৌসুমি বেকারদের যোগ করলে সংখ্যাটা আরও অন্তত এক-তৃতীয়াংশ বাড়বে। বেকার মানুষের সংখ্যা কমেছে-এর মানে এই নয় যে, আমেরিকার শ্রমবাজার স্থিতিশীল হয়ে গেছে এবং এখন আর কেউ চাকরি হারাচ্ছে না। না, ব্যাপারটা তা নয়; বরং এখনো প্রতি সপ্তাহে দলে দলে মানুষ চাকরি হারিয়ে বেকারদের আঁকাবাঁকা লম্বা মিছিলে এসে যোগ দিচ্ছে। সেদিন দেখলাম yahoofinance.com বলছে, ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে আট লাখ তিন হাজার লোক বেকার হয়েছে, যারা এক সপ্তাহ আগেও সসম্মানে কাজে ব্যস্ত ছিল।

এ নতুন বেকারত্বের সংখ্যা আগের সপ্তাহ থেকে কিঞ্চিৎ কম হলেও ঐতিহাসিকভাবে আমেরিকার জন্য এটা অনেক গুরুতর ও বিস্ময়কর একটি বিষয়। ‘ইউএসএ ফ্যাক্টসে’র তথ্যানুযায়ী, করোনার আগে যুক্তরাষ্ট্রে বেকারের হার ছিল মাত্র ৩.২ শতাংশ, অতিমারি আঘাত হানার পর এপ্রিলে উঠতে উঠতে গিয়ে উঠেছিল ১০.৫ শতাংশে। গত মাসে এসে দেখা যায় বেকারের হার ৬.৭ শতাংশ। এটা সরকারি হিসাব। এ হিসাবের ফাঁকফোকর বন্ধ করে দিলে আমার ধারণা, এখনকার বেকারের হার কোনো অবস্থাতেই ১০ শতাংশের নিচে হবে না। এ বিষয়ে আমি কোনো জরিপ করিনি, তবে একটি উদাহরণ দেব। গত সপ্তাহে ডিনার টাইমে ‘আনাতলিয়া’ (স্থানীয় টার্কিশ রেস্তোরাঁ) থেকে খাবার তুলতে গিয়ে দেখি ভেতরটা খাঁখাঁ করছে, কোনো কাস্টমার নেই, অবশিষ্ট একমাত্র ওয়েটার মেয়েটি চেয়ারে বসে বসে ঝিমোচ্ছে। আওয়াজ পেয়ে রান্নাঘর থেকে আমার চিরপরিচিত মানুষটি বেরিয়ে এলেন। তার হাতে খাবারের পোঁটলা, মুখে এক ঝিলিক দারুণ কষ্টের হাসি! যেন নতুন পারিবারিক ব্যাবসা-তিনিই কুক, তিনিই ক্যাশিয়ার, তিনিই ম্যানেজার! আহা, কী ছিল আর এই ক’টা মাসে কী হয়ে গেল! হোটেল-রেস্তোরাঁ, থিয়েটার-সিনেমা, খেলাধুলা-বিনোদন, বিমান-গণপরিবহণ, শপিং মল-ডিপার্টমেন্ট স্টোরস, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি খাতে শিগগির স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসার আমি কোনো আলামতই দেখছি না।

পক্ষান্তরে ফার্মেসি, ক্লিনিক, মেডিকেল ল্যাবে রমরমা ব্যাবসা, বলতে গেলে দিন-রাত কাজ চলছে। হাসপাতালগুলোয় ব্যাবসা-ব্যস্ততা আরও বেশি; কিন্তু তাদের ভেতরে-বাইরে করুণ দশা। রোগীদের বসার জায়গা নেই, শোয়ার বিছানা নেই, ‘আইসিইউ-বেড’ আগে যেখানে খালি পড়ে থাকত এখন সোনার হরিণ! করোনার ভয়ে সাধারণ রোগীরা ডাক্তারের কাছে কিংবা হাসপাতালে যেতেই চায় না। প্রাণ বাঁচানোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে যারা ‘যমালয়ে’ যেতে বাধ্য হয়, তারা ভাগ্য ভালো থাকলে ফিরে আসে, নতুবা না। কারও অস্ত্রোপচার সফল হলেও কারোনার কশাঘাতে কবরে গিয়ে আশ্রয় নেয়। শত চেষ্টা করেও মৃত্যুর মিছিল ঠেকানো যাচ্ছে না। এখনো প্রতিদিন গড়ে আড়াই থেকে তিন হাজার করোনা রোগী মারা যাচ্ছে এবং দৈনিক প্রায় দুই লাখ লোক নতুনভাবে এ মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে আপন ঘরে বন্দিজীবন কাটাচ্ছে। শোনা যাচ্ছে, মাত্র এক মাস পর নতুন আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াবে দিনে দশ লাখ করে। তারপর গিয়ে পরিস্থিতির উন্নতি হলে হতেও পারে। এখন আশার কথা, বিভিন্ন দেশে টিকা-অভিযান শুরু হয়েছে। তবে ইংল্যান্ডে ভাইরাসের নতুন স্ট্রেইন ধরা পড়ায় সম্ভাবনার এ নীল আকাশে কেউ কেউ ছেঁড়া ছেঁড়া কালো মেঘের পূর্বাভাস পাচ্ছেন।

এ রকম ধুন্ধুমার অবস্থায়ও ওয়াল স্ট্রিটের শনৈ শনৈ তরক্কি দেখে আমি বিস্মিত, হতবাক! যেখানে মানুষ অসহায়ভাবে মারা যাচ্ছে, কাজের অভাবে বেশুমার লোক পথে বসে গেছে, অতিমারির করাল থাবায় সারাটা দেশ আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার কালো চাদরে ঢাকা পড়ে আছে, সেখানে বিশেষ বিশেষ কিছু কোম্পানি আঙুল ফুলে কলাগাছে পরিণত হয়েছে। এদের মাঝে আছে অ্যাপল, গুগল, ফেসবুক, আমাজন, মাইক্রোসফট, নেটফ্লিক্স, টেজলা ইত্যাদি। সম্প্রতি অ্যাপল করপোরেশনের ‘মার্কেট ক্যাপিটাল’ দুই লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। কী বিশাল ব্যাপার! এটা অভিনব, অবিশ্বাস্য! এসব রহস্যের উত্তর যেহেতু আমার জানা নেই, তাই আলোর পর্দায় ‘কারসার’ ঘোরাতে ঘোরাতে বেশ কজন পণ্ডিত ব্যক্তির লেখা দেখতে পেলাম। ধৈর্য ধরে পড়লাম। যার লেখাটা আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে তার কঠিন তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা একটু সহজ করে আপনাদের সামনে তুলে ধরার নিমিত্তে এ আমার এক বিনীত প্রয়াস।

যার কথা বলছি, তিনি একজন জগদ্বরেণ্য পণ্ডিত ব্যক্তি। আগে ছিলেন আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ। বর্তমানে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইকোনমিক্স অ্যান্ড পাবলিক পলিসি’র অধ্যাপক। আপন পেশায় সবাই তাকে এক নামে চেনে-তিনি ‘কেনেথ রগোফ’। তার যে মূল্যবান লেখাটির প্রতি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই তা প্রকাশিত হয়েছে ‘গার্ডিয়ান’ ইউএস সংস্করণে, ৬ অক্টোবর ২০২০ তারিখে। আমেরিকার সার্বিক অর্থনীতির অবস্থা এত খারাপ থাকার পরও ওয়াল স্ট্রিট কেন এত রমরমা, লেখক এখানে তার কিছু ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এবার সংক্ষেপে রগোফ সাহেবের বয়ান বলছি, আমার মতো করে আমার জবানিতে।

১. মেইন স্ট্রিট (প্রকৃত অর্থনীতির প্রতিবিম্ব) এবং ওয়াল স্ট্রিটের (শেয়ারবাজারের প্রতিফলন) মধ্যে একটা অদৃশ্য যুগবিচ্ছেদ (disconnect) অনেক দিন ধরেই আছে। এ দুয়ের সূচক সব সময় একইদিকে একই গতিতে ধাবিত হয় না। ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরের তরক্কির ওপর নির্ভর করে ‘এসঅ্যান্ডপি ৫০০’। অতিমারির কারণে নতুন এবং বাড়তি যত পুঁজি বিনিয়োগ হয়েছে, তার একটি বড় অংশ গিয়েছে প্রযুক্তি খাতে-সেটা আবার ‘এসঅ্যান্ডপি ৫০০’-কে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে শক্তিশালী করে তুলেছে। করোনাকালে এ সেক্টরের অবস্থা খুব ভালো, তাই তার সূচক উঠছে আর ওয়াল স্ট্রিটের বাকি সব কিছুকে টেনে টেনে উপরে তুলছে। পক্ষান্তরে মেইন স্ট্রিটের স্বাস্থ্য নির্ভর করে জিডিপির প্রবৃদ্ধির ওপর। মার্কিন জিডিপির সর্ববৃহৎ খাত হলো সেবা খাত। করোনাকালে সেবা খাতের ওপর সবচেয়ে বেশি অভিঘাত পড়েছে-‘লকডাউন’ ও ‘শারীরিক দূরত্ব’ বজায় রাখার বাধ্যবাধকতার কারণে। এ জন্য ওয়াল স্ট্রিট যখন রমরমা, মেইন স্ট্রিটে তখন ভীষণ খরা।

২. ওয়াল স্ট্রিট এবং মেইন স্ট্রিটের গতি-প্রকৃতি নির্ধারিত হয় ভিন্নভাবে আলাদা আলাদ বিবেচনায়। মেইন স্ট্রিট নির্ভর করে অতিসম্প্রতি কী ঘটেছে এবং এখন কী ঘটছে তার ওপর। ওয়াল স্ট্রিট চলে মেইন স্ট্রিটের আগে আগে। ওয়াল স্ট্রিটের বর্তমান নির্মিত হয় আগামীতে কী ঘটবে তার সম্ভাবনা ও প্রত্যাশার ভিত্তিতে। এখনই ওয়াল স্ট্রিটে উল্লম্ফনের কারণ হলো আরও দুটো প্রত্যাশা-এক. টিকা এসে দেশে দেশে করোনাকে সহজেই কাবু করে ফেলবে। দুই. কংগ্রেস ৯০০ কোটি ডলারের নতুন প্রণোদনা প্যাকেজ সদ্য পাশ করে দিয়েছে। নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন দিচ্ছেন আরও এক হাজার ৯০০ কোটি ডলার। এ তিনটি বিষয় অর্থনীতির সম্ভাবনাকে আলো ঝলমল করে তুলেছে। আর তাই স্টক মার্কেটে এই উপচে পড়া আনন্দ ও উচ্ছ্বাস!

৩. যেহেতু কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার শূন্যের কাছাকাছি রাখছে, তাই আবাসন খাত চাঙা যাবে, যার ফলে সোনা ও বিটকয়েনের দামও এখন খুব চড়া যাচ্ছে। এগুলো সব ওয়াল স্ট্রিটের জন্য সুখবর। নিম্নসুদের আড়ালে এখানে নীরবে আরেকটা অভূতপূর্ব ঘটনাও ঘটে চলেছে। এটা আমেরিকায় এর আগে আর কখনো হয়নি। ফেডারেল রিজার্ভ (কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নাম, সংক্ষেপে বলে ‘ফেড’) সুদের হার শুধু শূন্যের কাছে নামিয়ে আনেনি; বরং তারা প্রাইভেট বন্ডবাজারকেও চাঙা করে রাখছে। ‘ফেড’ সরকারি বন্ডের মতো প্রাইভেট কোম্পানি কর্তৃক ইস্যুকৃত বন্ড ক্রমাগত কিনছে। এটাকে অধ্যাপক রগোফ ‘মুদ্রানীতি’ বলতে নারাজ, বরং তিনি বলছেন, এ এক ধরনের ‘দৃশ্যত রাজস্বনীতি’।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক আপৎকালীন অর্থ মন্ত্রণালয়ের এজেন্ট হিসাবে সাময়িকভাবে এ কাজটি করছে। এমন ব্যাপক ও আগ্রাসি মুদ্রানীতির নজির আমেরিকার ইতিহাসে দ্বিতীয় আরেকটি খুঁজে পাওয়া যায় না। ‘ফেড’ যেহেতু দেদার প্রাইভেট কোম্পানির বন্ড কিনছে, তাই বন্ড বিক্রেতাদের পুঁজির কোনো অভাব হচ্ছে না। এ জন্য সার্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের মন্দা থাকা সত্ত্বেও কোম্পানিগুলো ব্যবসায় টিকে আছে এবং ভালোভাবেই আছে। এতে মুদ্রা-পুঁজিবাজার মনে করছে, করদাতারা নিরন্তর প্রাইভেট ব্যাবসার ঝুঁকি নিতেই থাকবে, তাই ওয়াল স্ট্রিটে এত জমজমাট ব্যাবসা। কিন্তু যদি করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মারাত্মক আকার ধারণ করে এবং সরকার তার সহৃদয় মুদ্রানীতি বদলায় তাহলে এসব আশা হবে গুড়ে বালি, আর ইতোমধ্যে বিপদে থাকা ছোট ও মাঝারি সেবা-কোম্পানিগুলোর হবে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’। তাদের হাতে না আছে জমা টাকা, না তারা পারছে ‘ফেড’-এর কাছে বন্ড বেচতে। তাই তারাই লালবাতি জ্বালাচ্ছে এবং তাদের কর্মচারীরা বেকার হয়ে পথে-প্রান্তরে ঘুরছে। এ জন্যই মেইন স্ট্রিটের এমন হাল।

৪. করোনা চলে গেলে প্রাইভেট সেক্টরে বড় রকমের পুনর্গঠন হবে। ছোট ছোট অনেক কোম্পানি হাওয়া হয়ে যাবে। সেগুলোর কাজ বড় কোম্পানি করবে, তাই তারা আরও বড় হয়ে উঠবে। স্টক মার্কেটে এত চাঙাভাবের এটাও আরেকটা কারণ।

৫. অর্থনীতি যত খারাপ হোক, অতিমারি যত মরণঘাতী হোক, ছোট কোম্পানি এবং সেখানে কর্মরত কর্মচারীরা সরকারকে আর ক’পয়সা ট্যাক্স দেয়! ট্যাক্সের বড় অংশ আসে বড় কোম্পানি এবং মোটা মোটা মাইনের করপোরেট কর্মকর্তা ও পেশাজীবীদের কাছ থেকে। এ দুঃসময়ে তাদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না, ফলে সরকার অনেকটা স্বস্তিতে আছে। কারণ, তার রাজস্ব আয় মোটামুটি আগের মতোই আছে।

৬. ২০০৮-৯-এর অর্থনৈতিক সংকটের সময় সরকারি রেগুলেটরি নীতিনির্ধারকদের তীব্র ও ব্যাপক প্রতিবাদ ও অপবাদের দায় নিতে হয়েছিল, যার ফলে মেইন স্ট্রিটের ওপর ওয়াল স্ট্রিট একচেটিয়া অগ্রাধিকার ও সুবিধা পেয়েছিল। এবার অপবাদ ও কলঙ্কের প্রথম ও প্রধান ভাগীদার হবে ওয়াল স্ট্রিট এবং এর আক্রোশ গিয়ে পড়বে ‘সিলিকন ভ্যালি’র ওপর। এখানে অধ্যাপক রগোফ শুধু সিলিকন ভ্যালিকে নিশানা করলেন কেন, তা আমার মাথায় আসে না।

উপসংহারে, হার্ভার্ডের এ খ্যাতিমান অধ্যাপক কয়েকটি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। তিনি বলেছেন, যদি বার্নি স্যান্ডারস এবং এলিজাবেথ ওয়ারেনের পক্ষ থেকে বাইডেনের ওপর বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে চাপ বাড়তে থাকে এবং বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানি কম করের দেশগুলোয় আউটসোর্সিং ও অফসোরিং বজায় রাখতে না পারে, তাহলে এটা হবে করপোরেট ট্যাক্স বাড়ারই নামান্তর এবং এ খবর শেয়ারবাজারের জন্য মোটেও সুখকর হবে না। যদি স্বাস্থ্য খাত এবং সার্বিক অর্থনীতি অদূর ভবিষ্যতে শক্ত মাটির ওপর ঘুরে দাঁড়াতে না পারে, তাহলে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আসমানে জন্ম নেবে চাকা চাকা ঘন কালো মেঘ! সব শেষে ওয়াল স্ট্রিট কুশীলবদের জন্য তিনি একটি সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছেন-‘যা ম্যাজিকের মতো আকাশে ওড়ে, তা সহজে মাটিতে পড়েও বটে’!

আবু এন এম ওয়াহিদ : অধ্যাপক, টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র

wahid2569@gmail.com

যুক্তরাষ্ট্রে করোনাকালেও পুঁজিবাজারের উল্লম্ফনের রহস্য কী

 আবু এন এম ওয়াহিদ 
২৩ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অর্থশাস্ত্রের একজন বুড়ো ছাত্র হিসাবে করোনার এই আকালকালে ওয়াল স্ট্রিটের গতি-প্রকৃতি দেখে আমি রীতিমতো এক মহাধন্দে আছি। আপনারা জানেন, ওয়াল স্ট্রিটে নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জের অবস্থান। হলে কী হবে, এটি কোনো মামুলি ঠিকানা নয়-এ জায়গাকে ‘ক্যাপিটালিজমের ক্যাপিটাল’ বললেও অত্যুক্তি হবে না। এটাই পৃথিবীর সর্ববৃহৎ স্টক এক্সচেঞ্জ। এখানে প্রতিদিন শত শত কোটি ডলারের লেনদেন হয়। ওয়াল স্ট্রিটে যেসব কোম্পানির শেয়ার হাতবদল হয়, তাদের যৌথ বাজারমূল্য দুবছর আগেই ৩০ লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে! এখন কত হতে পারে, নিজেই আন্দাজ করে নিন। করোনাকালে এ স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচকগুলো সর্বকালের সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠে বসে আছে।

অথচ মার্কিন অর্থনীতির বাস্তব অবস্থা এখনো বেহদ্দ নাজুক। statisco.com-এর এক সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, অতিমারির প্রথমদিকে ২০২০-এর এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রে মোট বেকার ছিল দুই কোটি ৩৮ লাখ। এর পর কমলেও নভেম্বরে এসে দেখা যায় এ সংখ্যা এক কোটি ৭৪ লাখে বহাল আছে। মৌসুমি বেকারদের যোগ করলে সংখ্যাটা আরও অন্তত এক-তৃতীয়াংশ বাড়বে। বেকার মানুষের সংখ্যা কমেছে-এর মানে এই নয় যে, আমেরিকার শ্রমবাজার স্থিতিশীল হয়ে গেছে এবং এখন আর কেউ চাকরি হারাচ্ছে না। না, ব্যাপারটা তা নয়; বরং এখনো প্রতি সপ্তাহে দলে দলে মানুষ চাকরি হারিয়ে বেকারদের আঁকাবাঁকা লম্বা মিছিলে এসে যোগ দিচ্ছে। সেদিন দেখলাম yahoofinance.com বলছে, ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে আট লাখ তিন হাজার লোক বেকার হয়েছে, যারা এক সপ্তাহ আগেও সসম্মানে কাজে ব্যস্ত ছিল।

এ নতুন বেকারত্বের সংখ্যা আগের সপ্তাহ থেকে কিঞ্চিৎ কম হলেও ঐতিহাসিকভাবে আমেরিকার জন্য এটা অনেক গুরুতর ও বিস্ময়কর একটি বিষয়। ‘ইউএসএ ফ্যাক্টসে’র তথ্যানুযায়ী, করোনার আগে যুক্তরাষ্ট্রে বেকারের হার ছিল মাত্র ৩.২ শতাংশ, অতিমারি আঘাত হানার পর এপ্রিলে উঠতে উঠতে গিয়ে উঠেছিল ১০.৫ শতাংশে। গত মাসে এসে দেখা যায় বেকারের হার ৬.৭ শতাংশ। এটা সরকারি হিসাব। এ হিসাবের ফাঁকফোকর বন্ধ করে দিলে আমার ধারণা, এখনকার বেকারের হার কোনো অবস্থাতেই ১০ শতাংশের নিচে হবে না। এ বিষয়ে আমি কোনো জরিপ করিনি, তবে একটি উদাহরণ দেব। গত সপ্তাহে ডিনার টাইমে ‘আনাতলিয়া’ (স্থানীয় টার্কিশ রেস্তোরাঁ) থেকে খাবার তুলতে গিয়ে দেখি ভেতরটা খাঁখাঁ করছে, কোনো কাস্টমার নেই, অবশিষ্ট একমাত্র ওয়েটার মেয়েটি চেয়ারে বসে বসে ঝিমোচ্ছে। আওয়াজ পেয়ে রান্নাঘর থেকে আমার চিরপরিচিত মানুষটি বেরিয়ে এলেন। তার হাতে খাবারের পোঁটলা, মুখে এক ঝিলিক দারুণ কষ্টের হাসি! যেন নতুন পারিবারিক ব্যাবসা-তিনিই কুক, তিনিই ক্যাশিয়ার, তিনিই ম্যানেজার! আহা, কী ছিল আর এই ক’টা মাসে কী হয়ে গেল! হোটেল-রেস্তোরাঁ, থিয়েটার-সিনেমা, খেলাধুলা-বিনোদন, বিমান-গণপরিবহণ, শপিং মল-ডিপার্টমেন্ট স্টোরস, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি খাতে শিগগির স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসার আমি কোনো আলামতই দেখছি না।

পক্ষান্তরে ফার্মেসি, ক্লিনিক, মেডিকেল ল্যাবে রমরমা ব্যাবসা, বলতে গেলে দিন-রাত কাজ চলছে। হাসপাতালগুলোয় ব্যাবসা-ব্যস্ততা আরও বেশি; কিন্তু তাদের ভেতরে-বাইরে করুণ দশা। রোগীদের বসার জায়গা নেই, শোয়ার বিছানা নেই, ‘আইসিইউ-বেড’ আগে যেখানে খালি পড়ে থাকত এখন সোনার হরিণ! করোনার ভয়ে সাধারণ রোগীরা ডাক্তারের কাছে কিংবা হাসপাতালে যেতেই চায় না। প্রাণ বাঁচানোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে যারা ‘যমালয়ে’ যেতে বাধ্য হয়, তারা ভাগ্য ভালো থাকলে ফিরে আসে, নতুবা না। কারও অস্ত্রোপচার সফল হলেও কারোনার কশাঘাতে কবরে গিয়ে আশ্রয় নেয়। শত চেষ্টা করেও মৃত্যুর মিছিল ঠেকানো যাচ্ছে না। এখনো প্রতিদিন গড়ে আড়াই থেকে তিন হাজার করোনা রোগী মারা যাচ্ছে এবং দৈনিক প্রায় দুই লাখ লোক নতুনভাবে এ মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে আপন ঘরে বন্দিজীবন কাটাচ্ছে। শোনা যাচ্ছে, মাত্র এক মাস পর নতুন আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াবে দিনে দশ লাখ করে। তারপর গিয়ে পরিস্থিতির উন্নতি হলে হতেও পারে। এখন আশার কথা, বিভিন্ন দেশে টিকা-অভিযান শুরু হয়েছে। তবে ইংল্যান্ডে ভাইরাসের নতুন স্ট্রেইন ধরা পড়ায় সম্ভাবনার এ নীল আকাশে কেউ কেউ ছেঁড়া ছেঁড়া কালো মেঘের পূর্বাভাস পাচ্ছেন।

এ রকম ধুন্ধুমার অবস্থায়ও ওয়াল স্ট্রিটের শনৈ শনৈ তরক্কি দেখে আমি বিস্মিত, হতবাক! যেখানে মানুষ অসহায়ভাবে মারা যাচ্ছে, কাজের অভাবে বেশুমার লোক পথে বসে গেছে, অতিমারির করাল থাবায় সারাটা দেশ আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার কালো চাদরে ঢাকা পড়ে আছে, সেখানে বিশেষ বিশেষ কিছু কোম্পানি আঙুল ফুলে কলাগাছে পরিণত হয়েছে। এদের মাঝে আছে অ্যাপল, গুগল, ফেসবুক, আমাজন, মাইক্রোসফট, নেটফ্লিক্স, টেজলা ইত্যাদি। সম্প্রতি অ্যাপল করপোরেশনের ‘মার্কেট ক্যাপিটাল’ দুই লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। কী বিশাল ব্যাপার! এটা অভিনব, অবিশ্বাস্য! এসব রহস্যের উত্তর যেহেতু আমার জানা নেই, তাই আলোর পর্দায় ‘কারসার’ ঘোরাতে ঘোরাতে বেশ কজন পণ্ডিত ব্যক্তির লেখা দেখতে পেলাম। ধৈর্য ধরে পড়লাম। যার লেখাটা আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে তার কঠিন তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা একটু সহজ করে আপনাদের সামনে তুলে ধরার নিমিত্তে এ আমার এক বিনীত প্রয়াস।

যার কথা বলছি, তিনি একজন জগদ্বরেণ্য পণ্ডিত ব্যক্তি। আগে ছিলেন আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ। বর্তমানে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইকোনমিক্স অ্যান্ড পাবলিক পলিসি’র অধ্যাপক। আপন পেশায় সবাই তাকে এক নামে চেনে-তিনি ‘কেনেথ রগোফ’। তার যে মূল্যবান লেখাটির প্রতি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই তা প্রকাশিত হয়েছে ‘গার্ডিয়ান’ ইউএস সংস্করণে, ৬ অক্টোবর ২০২০ তারিখে। আমেরিকার সার্বিক অর্থনীতির অবস্থা এত খারাপ থাকার পরও ওয়াল স্ট্রিট কেন এত রমরমা, লেখক এখানে তার কিছু ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এবার সংক্ষেপে রগোফ সাহেবের বয়ান বলছি, আমার মতো করে আমার জবানিতে।

১. মেইন স্ট্রিট (প্রকৃত অর্থনীতির প্রতিবিম্ব) এবং ওয়াল স্ট্রিটের (শেয়ারবাজারের প্রতিফলন) মধ্যে একটা অদৃশ্য যুগবিচ্ছেদ (disconnect) অনেক দিন ধরেই আছে। এ দুয়ের সূচক সব সময় একইদিকে একই গতিতে ধাবিত হয় না। ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরের তরক্কির ওপর নির্ভর করে ‘এসঅ্যান্ডপি ৫০০’। অতিমারির কারণে নতুন এবং বাড়তি যত পুঁজি বিনিয়োগ হয়েছে, তার একটি বড় অংশ গিয়েছে প্রযুক্তি খাতে-সেটা আবার ‘এসঅ্যান্ডপি ৫০০’-কে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে শক্তিশালী করে তুলেছে। করোনাকালে এ সেক্টরের অবস্থা খুব ভালো, তাই তার সূচক উঠছে আর ওয়াল স্ট্রিটের বাকি সব কিছুকে টেনে টেনে উপরে তুলছে। পক্ষান্তরে মেইন স্ট্রিটের স্বাস্থ্য নির্ভর করে জিডিপির প্রবৃদ্ধির ওপর। মার্কিন জিডিপির সর্ববৃহৎ খাত হলো সেবা খাত। করোনাকালে সেবা খাতের ওপর সবচেয়ে বেশি অভিঘাত পড়েছে-‘লকডাউন’ ও ‘শারীরিক দূরত্ব’ বজায় রাখার বাধ্যবাধকতার কারণে। এ জন্য ওয়াল স্ট্রিট যখন রমরমা, মেইন স্ট্রিটে তখন ভীষণ খরা।

২. ওয়াল স্ট্রিট এবং মেইন স্ট্রিটের গতি-প্রকৃতি নির্ধারিত হয় ভিন্নভাবে আলাদা আলাদ বিবেচনায়। মেইন স্ট্রিট নির্ভর করে অতিসম্প্রতি কী ঘটেছে এবং এখন কী ঘটছে তার ওপর। ওয়াল স্ট্রিট চলে মেইন স্ট্রিটের আগে আগে। ওয়াল স্ট্রিটের বর্তমান নির্মিত হয় আগামীতে কী ঘটবে তার সম্ভাবনা ও প্রত্যাশার ভিত্তিতে। এখনই ওয়াল স্ট্রিটে উল্লম্ফনের কারণ হলো আরও দুটো প্রত্যাশা-এক. টিকা এসে দেশে দেশে করোনাকে সহজেই কাবু করে ফেলবে। দুই. কংগ্রেস ৯০০ কোটি ডলারের নতুন প্রণোদনা প্যাকেজ সদ্য পাশ করে দিয়েছে। নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন দিচ্ছেন আরও এক হাজার ৯০০ কোটি ডলার। এ তিনটি বিষয় অর্থনীতির সম্ভাবনাকে আলো ঝলমল করে তুলেছে। আর তাই স্টক মার্কেটে এই উপচে পড়া আনন্দ ও উচ্ছ্বাস!

৩. যেহেতু কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার শূন্যের কাছাকাছি রাখছে, তাই আবাসন খাত চাঙা যাবে, যার ফলে সোনা ও বিটকয়েনের দামও এখন খুব চড়া যাচ্ছে। এগুলো সব ওয়াল স্ট্রিটের জন্য সুখবর। নিম্ন সুদের আড়ালে এখানে নীরবে আরেকটা অভূতপূর্ব ঘটনাও ঘটে চলেছে। এটা আমেরিকায় এর আগে আর কখনো হয়নি। ফেডারেল রিজার্ভ (কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নাম, সংক্ষেপে বলে ‘ফেড’) সুদের হার শুধু শূন্যের কাছে নামিয়ে আনেনি; বরং তারা প্রাইভেট বন্ডবাজারকেও চাঙা করে রাখছে। ‘ফেড’ সরকারি বন্ডের মতো প্রাইভেট কোম্পানি কর্তৃক ইস্যুকৃত বন্ড ক্রমাগত কিনছে। এটাকে অধ্যাপক রগোফ ‘মুদ্রানীতি’ বলতে নারাজ, বরং তিনি বলছেন, এ এক ধরনের ‘দৃশ্যত রাজস্বনীতি’।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক আপৎকালীন অর্থ মন্ত্রণালয়ের এজেন্ট হিসাবে সাময়িকভাবে এ কাজটি করছে। এমন ব্যাপক ও আগ্রাসি মুদ্রানীতির নজির আমেরিকার ইতিহাসে দ্বিতীয় আরেকটি খুঁজে পাওয়া যায় না। ‘ফেড’ যেহেতু দেদার প্রাইভেট কোম্পানির বন্ড কিনছে, তাই বন্ড বিক্রেতাদের পুঁজির কোনো অভাব হচ্ছে না। এ জন্য সার্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের মন্দা থাকা সত্ত্বেও কোম্পানিগুলো ব্যবসায় টিকে আছে এবং ভালোভাবেই আছে। এতে মুদ্রা-পুঁজিবাজার মনে করছে, করদাতারা নিরন্তর প্রাইভেট ব্যাবসার ঝুঁকি নিতেই থাকবে, তাই ওয়াল স্ট্রিটে এত জমজমাট ব্যাবসা। কিন্তু যদি করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মারাত্মক আকার ধারণ করে এবং সরকার তার সহৃদয় মুদ্রানীতি বদলায় তাহলে এসব আশা হবে গুড়ে বালি, আর ইতোমধ্যে বিপদে থাকা ছোট ও মাঝারি সেবা-কোম্পানিগুলোর হবে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’। তাদের হাতে না আছে জমা টাকা, না তারা পারছে ‘ফেড’-এর কাছে বন্ড বেচতে। তাই তারাই লালবাতি জ্বালাচ্ছে এবং তাদের কর্মচারীরা বেকার হয়ে পথে-প্রান্তরে ঘুরছে। এ জন্যই মেইন স্ট্রিটের এমন হাল।

৪. করোনা চলে গেলে প্রাইভেট সেক্টরে বড় রকমের পুনর্গঠন হবে। ছোট ছোট অনেক কোম্পানি হাওয়া হয়ে যাবে। সেগুলোর কাজ বড় কোম্পানি করবে, তাই তারা আরও বড় হয়ে উঠবে। স্টক মার্কেটে এত চাঙাভাবের এটাও আরেকটা কারণ।

৫. অর্থনীতি যত খারাপ হোক, অতিমারি যত মরণঘাতী হোক, ছোট কোম্পানি এবং সেখানে কর্মরত কর্মচারীরা সরকারকে আর ক’পয়সা ট্যাক্স দেয়! ট্যাক্সের বড় অংশ আসে বড় কোম্পানি এবং মোটা মোটা মাইনের করপোরেট কর্মকর্তা ও পেশাজীবীদের কাছ থেকে। এ দুঃসময়ে তাদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না, ফলে সরকার অনেকটা স্বস্তিতে আছে। কারণ, তার রাজস্ব আয় মোটামুটি আগের মতোই আছে।

৬. ২০০৮-৯-এর অর্থনৈতিক সংকটের সময় সরকারি রেগুলেটরি নীতিনির্ধারকদের তীব্র ও ব্যাপক প্রতিবাদ ও অপবাদের দায় নিতে হয়েছিল, যার ফলে মেইন স্ট্রিটের ওপর ওয়াল স্ট্রিট একচেটিয়া অগ্রাধিকার ও সুবিধা পেয়েছিল। এবার অপবাদ ও কলঙ্কের প্রথম ও প্রধান ভাগীদার হবে ওয়াল স্ট্রিট এবং এর আক্রোশ গিয়ে পড়বে ‘সিলিকন ভ্যালি’র ওপর। এখানে অধ্যাপক রগোফ শুধু সিলিকন ভ্যালিকে নিশানা করলেন কেন, তা আমার মাথায় আসে না।

উপসংহারে, হার্ভার্ডের এ খ্যাতিমান অধ্যাপক কয়েকটি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। তিনি বলেছেন, যদি বার্নি স্যান্ডারস এবং এলিজাবেথ ওয়ারেনের পক্ষ থেকে বাইডেনের ওপর বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে চাপ বাড়তে থাকে এবং বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানি কম করের দেশগুলোয় আউটসোর্সিং ও অফসোরিং বজায় রাখতে না পারে, তাহলে এটা হবে করপোরেট ট্যাক্স বাড়ারই নামান্তর এবং এ খবর শেয়ারবাজারের জন্য মোটেও সুখকর হবে না। যদি স্বাস্থ্য খাত এবং সার্বিক অর্থনীতি অদূর ভবিষ্যতে শক্ত মাটির ওপর ঘুরে দাঁড়াতে না পারে, তাহলে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আসমানে জন্ম নেবে চাকা চাকা ঘন কালো মেঘ! সব শেষে ওয়াল স্ট্রিট কুশীলবদের জন্য তিনি একটি সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছেন-‘যা ম্যাজিকের মতো আকাশে ওড়ে, তা সহজে মাটিতে পড়েও বটে’!

আবু এন এম ওয়াহিদ : অধ্যাপক, টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র

wahid2569@gmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন