বিচারের অতিবিলম্ব ছুটানোর চাবিকাঠি
jugantor
বিচারের অতিবিলম্ব ছুটানোর চাবিকাঠি

  মঈদুল ইসলাম  

২৬ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ন্যায়বিচারের অতিবিলম্ব ঘোচানোর কথা উঠলে চট করেই মাথায় আসে আদালত বাড়ানোর কথা। ভাবনাটা ভুল নয় একেবারে। কিন্তু বাড়বে কেমন, কতটা! মাথাব্যথা হলে সরকারও আদালত বাড়ায় মাঝেমধ্যে। ভিন্ন আদালত নামেই শুধু! অনেক ক্ষেত্রে বিচারক একইজন, বিচারকক্ষও একটাই। ভোল পালটিয়ে হয় কখনো দেওয়ানি, কখনো পারিবারিক, কখনো অর্থঋণ, কখনো দায়রা, কখনো স্পেশাল টাইব্যুনাল, কখনো স্পেশাল জজ।

১৯৯৪ সালে জেলাগুলোয় আদতেই ভিন্ন করা হয়েছিল দ্বিতীয় সাব-জজ আদালত। তাতে ‘একমেবাদ্বিতীয়ম’ ছিলেন ওই সাব-জজই। স্টেনোগ্রাফার-সেরেস্তাদার-আর্দালি দূরে থাক, একজন পেশকারেরও পদ করা হয়নি তার। যুগ্ম জেলা জজ নামে চলছে এখনো সেভাবেই। অতিরিক্ত জেলা জজ রিক্ত এসবে তারও আগে থেকে।

২০০৭ সাল থেকে স্টেনোটাইপিস্ট ছাড়াই চলছিল ঢাকার ১০টি স্পেশাল জজ কোর্ট। দুদক থেকে লেখালেখি করে সেই পদগুলো করিয়েছিলাম ২০১৭ সালে। হাল আমলে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল হয়েছে সেই দ্বিতীয় সাব-জজের ‘একমেবাদ্বিতীয়ম’ আদলে। হাইকোর্ট জজ দিয়ে ‘একমেবাদ্বিতীয়ম-আদল’ আদবে বাধে বলে আপিল ট্রাইব্যুনাল আর হয়নি, রয়ে গেছে কেতাবে ২০০৪ সাল থেকে।

মহাকুমা থেকে উন্নীত অনেক জেলায় তখন দ্বিতীয় সাব-জজের মামলা ঘাটতি ছিল। ঘাটতি ছিল অনেক উপজেলা আদালতেও। অল্পকিছু মামলা নিয়ে অপর্যাপ্ত নিষ্পত্তির কৈফিয়ত দিতে দিতে এসিআর বিরূপ হয়েছে অনেকের। যেখানে যতটা প্রয়োজন ততটা বাড়াতে হবে আদালত। সঙ্গে সহায়ক কর্মকর্তা-কর্মচারী, অফিস-এজলাস এবং পৃথক বিচারক দিয়ে। মামলা ভারাক্রান্ত আদালতে প্রতিদিন গাদাগাদা নথি লেখা, সেগুলোর ডায়েরি-কজলিস্ট লেখা, সমন-ওয়ারেন্ট লেখা-ইস্যুর অসাধ্য সাধন এক পেশকারের দু-হাতে আর হয় না সবটা, বকেয়াই রয়ে যায় বেশিটা। অনাহুত, তাই সাক্ষী আসে না নির্ধারিত তারিখে। এসব কাজে আরও দু-একটি পদ বাড়ানো জরুরি।

পুরো আদলে আদালত বাড়ানোর আর জায়গা নেই রাজধানী কিংবা জেলা শহরে। সুপ্রিমকোর্ট, জেলা আদালত, সবার প্রাঙ্গণ আজ বিল্ডিংয়ের বন হয়ে আছে। কোলাহলপূর্ণ পরিসরে বাজার চলে, বিচারে লাগে শান্ত-স্নিগ্ধ পরিসর, ভাবগম্ভীর পরিবেশ। আদালত বাড়াতে হবে সেই পরিবেশের পরিসরে। উকিলবিহীন গ্রাম্য কিংবা ভ্রাম্য আদালত সে বিকল্প নয়। সাক্ষী শুনে আর দলিল দেখে বিচার হয় দেখেই চোখ-কানওয়ালা যে কেউই বিচারকর্ম সারতে পারে ভাবাটা বিরাট ভ্রম।

বিশেষ জ্ঞানসম্পন্ন ন্যায়নিষ্ঠ বিচক্ষণ মানুষ ছাড়া সুবিচার মেলে না আসলে। ফিরিয়ে নিতে হবে ম্যাজিস্ট্রেট, সহকারী জজ, সিনিয়র সহকারী জজ আদালত সব উপজেলায়। জেলার বাইরে সুবিধাজনক জায়গায় কয়েকটি উপজেলার জন্য যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত নতুন করে বাড়াতে হবে। হাইকোর্ট বেঞ্চ সম্প্রসারণ করতে হবে বিভাগীয় শহরে। সংবিধানের ১০০ অনুচ্ছেদ মেনে সার্কিট বা অস্থায়ী, যে নামেই হোক।

আইনজীবীদের সবার কাছেই মামলা থাকবে পর্যাপ্ত। কতিপয় চেম্বারের মামলা উপচানো কমবে। কতিপয়ের স্বার্থে এসব আদালত তুলে আনার অপবাদ (!) মিথ্যা প্রমাণ হবে। আইনজীবীর ব্যক্তিগত কারণে সময় নেওয়াও কমবে।

অর্থ কোথায় পাওয়া যাবে! প্রতিটি আদালতে বিচারক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা আর আনুষঙ্গিকে যত ব্যয় তার প্রায় দ্বিগুণ আয় কোর্ট-ফি থেকে। দুর্নীতি-মানি লন্ডারিং মামলায় হাজারো লাখ টাকা জরিমানা, আর শতকোটি টাকার সম্পদ বাজেয়াপ্ত হয়। কোর্ট-ফির আয়, জরিমানা-বাজেয়াপ্তির অর্থ-সম্পদ ব্যয় হওয়া উচিত আদালতের মান ও বিচারের গতি বাড়াতেই। সিআরপিসির ৩৮৬ ধারায় সংশোধনী এনে ক্রোক-নিলাম-বিক্রির ক্ষমতাটুকুও দণ্ডদাতা আদালতকে দিলে জরিমানা-বাজেয়াপ্তি আদায়ে গতি আসে।

ফৌজদারি মামলায় ‘কগনিজ্যান্স’ বড় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আদালতে ফৌজদারি ঢোকার সেটাই পথ। সে পথে কড়া পাহারা দরকার, যেন মেরিটবিহীন হয়রানির অচল মামলা ঢুকতে না পারে। এ কাজে থাকতে হবে আরও অভিজ্ঞ বিচক্ষণ বিচারক। তাই প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের বদলে কগনিজ্যান্সের কাজটা কেবল চিফ জুডিশিয়াল-চিফ মেট্রোপলিটান ম্যাজিস্ট্রেটদের দিয়েই করাতে হবে [সিআরপিসির ৬(৩) ধারামতে এখন তারা প্রথম শ্রেণিরও উচ্চ শ্রেণিতে]।

যেমনটা দায়রা বিচার্য মামলা আগে যায় দায়রা জজের কাছে, তিনি গ্রহণ করলে বিচারে পাঠান অতিরিক্ত ও যুগ্ম জজের কাছে। তবে আগে ম্যাজিস্ট্রেটের কগনিজ্যান্স, পরে আবার দায়রা জজের কগনিজ্যান্সের বদলে সরাসরি দায়রা জজেরই কগনিজ্যান্স, শুরু থেকেই মামলাটা দায়রায় থাকার ব্যবস্থা করা দরকার। ট্রাইব্যুনাল ও বিশেষ ধরনের আদালতের আমলযোগ্য ফৌজদারি মামলাও তদন্তকালে আমলি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে রাখা চলছে আইন ছাড়া পুরোনো স্বভাবে। সেগুলো তো শুরু থেকেই সেসব ট্রাইব্যুনাল ও বিশেষ আদালতেই থাকার কথা। অর্থহীন এসব ধাপ কমালে কাল কাটানোর অনেক ধাপ কমে, সময় বাঁচে।

যতই পাকা বন্দোবস্ত হোক না কেন, চার আনারও সাধ মিটবে না ঠিকমতো দেখভাল না করলে। দামি যন্ত্রপাতির অত্যাধুনিক কারখানাও অচল হয় নিয়মিত ‘সুপারভিশন’ না থাকলে। নষ্ট ‘পার্টস’ আর দুষ্ট গরু শনাক্ত করে সারাতে হয়, সরাতে হয়। করিয়ে না নিলে কাজ করে না কেউই। কর্তা আর কর্মীতে ফারাক এই। অধস্তন আদালতগুলোর বিচারকদের নিজ নিজ আদালতের এবং নিজ অধস্তনগুলোর জেলা ও দায়রা জজের তদারকি-তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব।

নিজেরসহ সব আদালতের তদারকি-তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব সুপ্রিমকোর্টের। কায়দা-কৌশল দেওয়া আছে ‘সিভিল রুলস অ্যান্ড অর্ডারস’, ‘ক্রিমিনাল রুলস অ্যান্ড অর্ডারসে’। আছে হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগের কোর্ট রুলস। সেগুলো মানা হচ্ছে কি না, সেই তদারকি ও কাজ করিয়ে নেওয়ার কর্তা সুপ্রিমকোর্ট।

অধস্তন সব আদালত থেকে বিচারাধীন মামলার কতগুলো কত মাসের, কত বছরের পুরোনো, অতিবিলম্বের কী কারণ-সব তথ্যই সুপ্রিমকোর্টে আসে বার্ষিক, ত্রৈমাসিক স্টেটমেন্টে। বছরে কোন আদালতে, কোন বেঞ্চে শতকরা কতভাগ নিষ্পত্তি, কতভাগ দায়ের, কতভাগ পেন্ডিং, কত বছরের পুরোনো কতটি কার কাছে থাকল, পুরো হিসাব থাকতে হবে সুপ্রিমকোর্ট বার্ষিক রিপোর্টে। আসল খবরদারি করতে লাগে খুঁটিনাটি সব খবরাদি। মোটা দাগের হিসাবে ধরা যায় না আসল দাগি কে!

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯০ সালের ‘সিভিল জাস্টিস রিফর্ম অ্যাক্টে’ অভিনব নিয়ম করেছে। ফেডারেল জজ-ম্যাজিস্ট্রেটদের যারা মামলা নিষ্পত্তিতে অতিবিলম্ব করেন তাদের নাম জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়। সাক্ষী বা শুনানি শুরুর ৬ মাসে, মামলা দাখিলের তিন বছরের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে না পারলে সেই বিচারককেই তা জানাতে হয় ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিস অব দি ইউনাইটেড স্টেটস কোর্টসে’র পরিচালকের কাছে।

পরিচালক সেগুলোর রিপোর্ট ৬ মাস পরপর প্রকাশ করে। কানাডায় সাধারণ দেওয়ানি মামলা সর্বোচ্চ ৬ মাসে নিষ্পত্তি করা নিয়ম। পাঁচটি মামলায় এই সীমা লঙ্ঘন করায় বিভাগীয় ব্যবস্থায় ‘ওয়ার্নিং’ খেয়ে বিচারকের পদত্যাগের নজিরও আছে। এমনই করা উচিত আমাদের এখানে বিচারক ও আইনজীবীর জন্য। শনাক্ত হয় সত্যিকারের বিলম্বকারী, আরামকারী। ঢালাও দোষের ভাগী হয় না খেটে-মরা বেচারি।

অধস্তন-ঊর্ধ্বতন, বিচারক-সহায়ক সবাইকেই রাখতে হবে সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসনের নজরে। দায়মুক্তিতে রাখা যাবে না কাউকেই। ঢালাও দোষের সার্কুলার নয়- ধরতে হবে, সারতে হবে, সরাতে হবে, আসল নষ্ট, আসল দুষ্টকে। কেবল অভিযোগ পেলেই নয়, গন্ধ পেলে, ধোঁয়া দেখলেই নিজ গরজে খবর নেবে, বিহিত করবে। সব আদালতে কড়া তদারকি আর সত্যিকারের দেখভালের তত্ত্বাবধানই হলো বিচার-বিলম্বের একপাশের পাষাণকপাট সরানোর আসল চাবিকাঠি। ঘোরাতে হবে সবল হাতে।

মামলা যত কম আসে, বিচার শেষের আগে আপিল-রিভিশন-রিট যত কম হয় ততই কম জট বাঁধে। সেগুলো আদৌ চলে কি না, তার বাছবিচার শুরুতেই করে নেওয়ার, অচলগুলো বাদ দেওয়ার বিধান আছে কার্যবিধিগুলোয়। সেগুলো বোধবুদ্ধি দিয়ে বিচারক-আইনজীবী মেনে চললে নর্দমায় আবর্জনা ফেলার মনানন্দে আদালতে ফেলা হাবিজাবি মামলা-আপিল রিভিশন-রিটে বিচারস্রোত আবদ্ধ হতো না।

মামলায় ঢুকিয়ে মক্কেলকে আদালত, আর আদালতকে মক্কেল দেখানো শেষে আপস-নিষ্পত্তির বিকল্প পথের প্যাঁচে ঘোরানোর বদলে দরকার এমন ব্যবস্থা: “বিরোধ নিয়ে মক্কেল এলে তাকে শুনে, কাগজপত্র দেখে আইনজীবী ‘মেরিট’ দেখলে দাবি মেনে নিতে নোটিশ দেবেন অপরপক্ষকে। অপরপক্ষ আরেক আইনজীবীর কাছে গেলে তিনিও শুনে, কাগজপত্র দেখে প্রথমপক্ষের আইনজীবীর সঙ্গে মিটমাটে বসবেন নিজ নিজ মক্কেল নিয়ে।

আপসরফার উদ্যোগটা গোড়াতেই নেবেন দুপক্ষের আইনজীবী। সময়সীমা থাকবে নির্দিষ্ট, ফি’র হারটাও। মিটে গেলে সোলেনামায় বিরোধ নিষ্পত্তি। না মিটলে তার কারণ বিস্তারে একটি স্মারক তৈরি করবেন দুপক্ষ। সেই স্মারক নিয়ে আদালতে যাবেন সংক্ষুব্ধপক্ষ। বিচারে যে পক্ষ হারবে তার হবে মামলার দাবির সমান জরিমানা গোঁয়ার্তুমি করে অপরপক্ষকে হয়রানির মামলায় ফেলার দায়ে।”

এক বিরোধে মামলা হয় কয়েকটি। পারিবারিক বিরোধ বাধলে মামলা হয় যৌতুকের আগে, পরে নারী নির্যাতনের, চুরির, শেষে হয় পারিবারিক। দেওয়ানির বিরোধ লাগলে মামলা হয় আগে চাঁদাবাজির, পরে দেওয়ানি। একখানা চেকেই হয় প্রতারণা, জালিয়াতি, এনআই অ্যাক্ট, অর্থঋণ। বাদী-বিবাদী, আসামি-ফরিয়াদি একই লোক, বিচারকও একই জন, আইনজীবীও একই। বিচার হয় একই এজলাসে, শুধু পৃথক নথি টেনে। আজ যে বিচারক ম্যাজিস্ট্রেসিতে কাল তিনি দেওয়ানিতে।

মামলার সংখ্যা কমাতে এক বিরোধে একটাই মামলা, দেওয়ানি-ফৌজদারি প্রতিকার একই বিচারে, এমন ব্যবস্থাই করতে হবে। দেওয়ানির ডিক্রি হলে জারির প্রক্রিয়াটি নিতে হবে সেই আদালতকেই, নিজের রায়-ডিক্রির মান বাঁচাতে। নইলে বিচার থাকে অসমাপ্ত। সে ব্যবস্থাটাও করতে হবে।

মিথ্যা মামলা, আর জাল কাগজ প্রমাণ হয় যে, আদালতে তাকে ফৌজদারির নালিশকারী হওয়ার যে ঘোরপ্যাঁচ লাগানো আছে কার্যবিধির ১৯৫ ও ৪৭৬ ধারায়, সেটি ছুটিয়ে সেই আদালতকেই দণ্ডদাতা করা দরকার। তার একই রায়ে মিথ্যা-জালিয়াতিরও সাজা হলে আরেক মামলা লাগে না, মিথ্যা মামলাও কমে।

আইনজীবী ছাড়া মামলা ঢোকেও না, চলেও না আদালতে। নিজের মামলা নিজে করার সুযোগ থাকলেও আইনজীবী না ধরে কেউ আদালতের পথ মাড়ায় না। অনেক আইনজীবীও নিজের মামলা করতে ধরেন আরেক আইনজীবীকে। দাম্পত্যকলহে স্ত্রী তার বাবার বাড়ি গিয়ে ফিরে না এলে কার কোন ফৌজদারি অপরাধ হয়? বিরহকাতর স্বামীকে আপসের পথ না দেখিয়ে, আদালতে কোন যুক্তিবাণে ‘সিআরপিসি’-র ১০০ ধারায় সার্চ-ওয়ারেন্টের মামলা বাধালেন?

অচল বলে মামলা খারিজে চির বিচ্ছেদযন্ত্রণায় স্বামী হলেন আত্মঘাতী (সংবাদভাষ্য মতে)। আপিল-আদালতের দণ্ডিতকে উচ্চ-আদালতে যেতেও বিচার-আদালতের জামিন দিতে নেই বলে তলব পড়ে শুধু জামিনদাতা বিচারকেরই। যুক্তিজালে জামিন ধরা আইনজীবীর যুক্তিটা জানারও নয়! আইনজীবী নির্দয় জীবিকাধিকারে! বিচারের এই ডানায়ও একটু তো ভর দেওয়ার আছে।

মক্কেল এলেই মামলা বানানো কিংবা লড়তেনামা, দেওয়ানি বিরোধে ফৌজদারি লাগানো কি আইনজীবীর পেশা! মক্কেলের গল্প সত্য কি না, কাগজপত্রের আসল-জাল পরখ করার পহেলা দায় তো আইনজীবীরই। আদালতে সেসব প্রমাণ করতে পারবেন কি না, বিপক্ষের জেরায় সাক্ষী টিকবে কি না, কাগজপত্রের জালিয়াতি ধরা পড়বে কি না, সব তো তিনিই দেখেন আগে। কোন বিরোধে কী মামলা, সে তো মক্কেলের খায়েশমতো হবে না, ঠিক করেন তো আইনজীবীই। চিকিৎসকে চিকিৎসা দেয় রোগ ধরে শাস্ত্রমতে, রোগীর রুচিমতে দিলে কুচিকিৎসায় জীবননাশ।

ফাঁকা বুলি নয় এসব। সত্যিই লেখা আছে, ‘Canons of Professional Conduct and Etiquette of Advocates’-এ। নিজের কারণে আদালতে সময় নিতে নয়, বলা আছে নিজে না পারলে বিকল্প ব্যবস্থা করে রাখতে। হয়রানির মামলা বানাতে নিষেধ আছে। বলা আছে, আইন আর ‘ফ্যাক্টস’ বুঝে নিশ্চিত হয়েই আইনজীবী নিজ দায়িত্বে ঠিক করবেন মামলা করবেন কি না, লড়বেন কি না। ‘দায় ছাড়া আয়’, এমন পেশা নয় আইনজীবীর।

‘আইনজীবী’ নামে বাংলাকরণ সম্মানের হয়নি মোটে ‘অ্যাডভোকেট’ সাহেবের। জীবিকার্জনই মুখ্য দেখায় বলে অনেকেই তাদের কৌশলী ভাবেন! আইনি আচরণের খেলাপ করলে পেশাগত অসদাচরণে আইনজীবীর দায়ী হওয়ার কথা বার কাউন্সিলে। কেউ অভিযোগ না করলেও গন্ধ পেলে, ধোঁয়া দেখলেই নিজ গরজে খোঁজ-খবর করার কথা বার কাউন্সিলের। সেই চাবিকাঠি ঘোরে না দুর্বল হাতে।

ইচ্ছামতো আপিলের অধিকার খাটানো বিচারকারী আদালত ও ন্যায়বিচারের ওপর চড়াও হওয়ার শামিল, অতিবিলম্বের বিচারবঞ্চনার মূল বলেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি (১৮ ডিসেম্বর ১৮৮৯ থেকে ২৮ মার্চ ১৯১০) ডেভিড জসিয়াহ ব্রিউয়ার। সে কথা তো মিথ্যে নয় এখনো আমাদের দেশে। আপিল-রিভিশন, মামলা-রিটের দায় পুরোটাই নিতে হবে আইনজীবীকে, যিনি ‘মেরিট’ ছাড়া হয়রানির কায়দা করে দাখিল করেন, লড়তে নামেন।

আদালতে জরিমানা লাগাতে হবে তার, পেশাগত অসদাচরণের ব্যবস্থা নিতে হবে বার কাউন্সিলে। এটুকু ব্যবস্থা এখনই করতে পারে সুপ্রিমকোর্ট ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৫৪(২)(সি) ধারা ও দেওয়ানি কার্যবিধির ১২২, ১২৬ ধারার ক্ষমতায় আর হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের ‘রুলসে’ বিধিজুড়ে। ‘মূল্য সংযোজন’ করে দোকানদার, ‘মূল্য সংযোজন কর’ (VAT) দেয় খরিদ্দার! এই অনাচার বাজারে চলে, চালানো যায় না অন্তত বিচারে। হয়রানির না-হোক আপিল-রিভিশন-রিটের, অচল মামলা, ভুল মামলার খেসারত মক্কেল নয়, গুনতে হবে তার আইনজীবীকেই। ঢালাও দোষের ভাগী হতে বাঁচেন নীতিনিষ্ঠ ‘অ্যাডভোকেট’।

বিশ্বাসের পাল্লায় ওজনদার হলে এক সাক্ষীতেই প্রমাণ হতে পারে, কাজ হয় না ওজনবিহীন শতেক সাক্ষীতেও। এক মামলায় একপক্ষে যোগ্য আইনজীবী দু-একজনই যথেষ্ট। অত্যধিকের হট্টগোলে আইনের যুক্তি নাকি মক্কেলের শক্তি দেখানো হয় বুঝতে গোল বাধে! সেসব মিটিয়ে সুস্থির হয়ে বসতেই দিন কাবার। একপক্ষেরই বিজ্ঞ সবার লম্বা শুনানিতে বিচার লবেজান। বিত্তশালীর পাল্লায় পড়লে বিপক্ষের আইনজীবী মেলা ভার। এক মামলায় এক মক্কেল কতজন আইনজীবী দিতে পারে, তার পক্ষে এক তারিখে কতজনে শোনাতে পারে তারও একটা সীমা থাকা দরকার।

এসব কোন দেশে আছে! পাওয়া যাবে সেই দেশে যেখানে আদালতে কারাফটকে ধর্ষক-ধর্ষিতার বিয়ে দিয়ে ধর্ষণ মামলা মেটে; যেখানে একজনের মান গেছে বলে মামলা করে অন্যেরা সব জনে জনে যত থানা যত আদালতে।

বিচারে আসার আগেই বিলম্ব শুরু ফৌজদারিতে। ‘সিআরপিসি’-তে তদন্তের সময়সীমা বাঁধা নেই বলে কি চলবে তদন্তকারীর মর্জিতে। ১৬৭ ধারার (১) উপধারায় চব্বিশ ঘণ্টায়, আর (৫) উপধারায় ১২০ দিনে শেষ করার ইশারাটা ‘কাফি’ হবে না ‘আকেলমন্দ’ দু-একজনেরও! দুদক আইনে (২০ক ধারা) ১২০ দিনে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে (১৮ ধারা) অপরাধী হাতেনাতে ধরা পড়লে ১৫ দিনে, না পড়লে ৬০ দিনে তদন্তের সময়সীমার স্পষ্ট বিধান আছে।

সীমা লঙ্ঘনকারীর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব আছে কর্তৃপক্ষের। এখনকার অনেক আইনেও তাই আছে। সীমা লঙ্ঘনই অলঙ্ঘনীয় হয়ে গেছে। ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না কর্তৃপক্ষকে। দীর্ঘতর তদন্ত শেষ হলে শুরু হয় অধিকতর তদন্ত-ফাঁকফোঁকর রেখে দায়সারা, দোষীর বেরিয়ে যাওয়ার রাস্তা বানিয়ে নির্দোষকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার প্যাঁচ লাগানো কাজে। বখে যাওয়া কর্মীকে অতিশয় অপত্যস্নেহে কর্তার আগলে রাখার কী আছে! লোকে দুষবে কাকে! সময়মতো শেষ করিয়ে নেওয়া, একবারেই নিখুঁত তদন্ত করিয়ে নেওয়ার কর্তৃত্বটা করতে হবে কর্তৃপক্ষকে নজরদারি, তদারকি দিয়ে। নষ্ট ‘পার্টস’, দুষ্ট গরু সরাতে হবে, সারাতে হবে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়ে।

আসে না বলে সাক্ষীর বদনামে মামলা ঝুলে ফৌজদারিতে। এলেও তো দাবড়ায় আসামি আর দুপক্ষের আইনজীবী এবং আরও যে পারে। সাক্ষী, তাই খাড়া সর্বদা! বসার জায়গা নেই তার আদালতের কোনোখানে। গাঁটের পয়সা খরচ করে এসে ফিরতে হয় খালি হাতে। এসব দুঃখ ঘুচিয়ে স্বস্তি একটু না দিলে সাক্ষী স্বতঃপ্রবৃত্ত হবে? আদালতে তার বসার জায়গা দিতে হবে। দিনের লোকসান, যাওয়া-আসা, থাকা-খাওয়ার হিসাব করে খরচা দিতে হবে নগদে। খাত রাখতে হবে সাক্ষী নেওয়া আদালতের হাতে। সমনটা সত্যিই পৌঁছাতে হবে সাক্ষীর কাছে। সে তদারকিটা করতে হবে থানা ও আদালতের কর্তাদের। সাক্ষীর ফিরে গিয়ে নিরাপদে থাকার আস্থাটুকুও জাগানোর আছে।

১৮০ দিনে বিচার শেষ না হলে বিচারক, পাবলিক প্রসিকিউটর, পুলিশ কর্মকর্তাকে সুপ্রিমকোর্ট ও সরকারের কাছে কারণ জানাতে বলা আছে; আর খতিয়ে দেখে দায়ী ধরে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে যার যার কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব দেওয়া আছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে (ধারা ৩১ক)। জানানোই হয় কি না, জানা যায় না ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না বলে। শুধু এই মামলায় নয়, অতিবিলম্বের কারণ জানাতে হবে, বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে ফৌজদারির সব মামলাতেই। তদন্তকারী-আইনজীবী-বিচারক, ধরে দেখাতে হবে দায় কার কতখানি। তদন্ত আর বিচারে তথ্যপ্রযুক্তি, আধুনিক যত প্রযুক্তি সব লাগাতে হবে।

বিচারের অতিবিলম্বের সব পাষাণকপাটে তদারকি-তত্ত্বাবধানের চাবিকাঠি ঘোরাতে হবে সবল হাতে। বিচারব্যবস্থার ‘সুপ্রিম অথোরিটি’ হিসেবে সেই হাঁকটা দিতে হবে সুপ্রিমকোর্টকে। হাইকোর্ট কিংবা আপিল বিভাগের বেঞ্চ থেকে দু-চারটার তলবে তদারকি-তত্ত্বাবধানের সবটা সারবে না। বেঞ্চের প্রধান কাজ বিচারকর্ম।

বিচার ব্যবস্থার সব ঘাটে দেখভাল ও বিহিত করতে অন্য কাজের ভারমুক্ত দক্ষ লোকের শক্ত ব্যবস্থা থাকতে হবে সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসনে। ভারমুক্ত ‘রেডিমেড’ অভিজ্ঞ দক্ষ মানুষ পাওয়া যাবে চাকরির শেষে অবসরে। তাদেরকে এ কাজে লাগানো যায়, অবসরভোগীর আয়েশখানা হওয়ার অপবাদ না ওঠে সেদিকটায় নজর রেখে। এতটুকু যদি সত্যি করা যায়, ভাবা যাবে আরও কী করার আছে।

মঈদুল ইসলাম : অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক; প্রবন্ধকার ও আইনগ্রন্থকার

moyeedislam@yahoo.com

বিচারের অতিবিলম্ব ছুটানোর চাবিকাঠি

 মঈদুল ইসলাম 
২৬ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ন্যায়বিচারের অতিবিলম্ব ঘোচানোর কথা উঠলে চট করেই মাথায় আসে আদালত বাড়ানোর কথা। ভাবনাটা ভুল নয় একেবারে। কিন্তু বাড়বে কেমন, কতটা! মাথাব্যথা হলে সরকারও আদালত বাড়ায় মাঝেমধ্যে। ভিন্ন আদালত নামেই শুধু! অনেক ক্ষেত্রে বিচারক একইজন, বিচারকক্ষও একটাই। ভোল পালটিয়ে হয় কখনো দেওয়ানি, কখনো পারিবারিক, কখনো অর্থঋণ, কখনো দায়রা, কখনো স্পেশাল টাইব্যুনাল, কখনো স্পেশাল জজ।

১৯৯৪ সালে জেলাগুলোয় আদতেই ভিন্ন করা হয়েছিল দ্বিতীয় সাব-জজ আদালত। তাতে ‘একমেবাদ্বিতীয়ম’ ছিলেন ওই সাব-জজই। স্টেনোগ্রাফার-সেরেস্তাদার-আর্দালি দূরে থাক, একজন পেশকারেরও পদ করা হয়নি তার। যুগ্ম জেলা জজ নামে চলছে এখনো সেভাবেই। অতিরিক্ত জেলা জজ রিক্ত এসবে তারও আগে থেকে।

২০০৭ সাল থেকে স্টেনোটাইপিস্ট ছাড়াই চলছিল ঢাকার ১০টি স্পেশাল জজ কোর্ট। দুদক থেকে লেখালেখি করে সেই পদগুলো করিয়েছিলাম ২০১৭ সালে। হাল আমলে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল হয়েছে সেই দ্বিতীয় সাব-জজের ‘একমেবাদ্বিতীয়ম’ আদলে। হাইকোর্ট জজ দিয়ে ‘একমেবাদ্বিতীয়ম-আদল’ আদবে বাধে বলে আপিল ট্রাইব্যুনাল আর হয়নি, রয়ে গেছে কেতাবে ২০০৪ সাল থেকে।

মহাকুমা থেকে উন্নীত অনেক জেলায় তখন দ্বিতীয় সাব-জজের মামলা ঘাটতি ছিল। ঘাটতি ছিল অনেক উপজেলা আদালতেও। অল্পকিছু মামলা নিয়ে অপর্যাপ্ত নিষ্পত্তির কৈফিয়ত দিতে দিতে এসিআর বিরূপ হয়েছে অনেকের। যেখানে যতটা প্রয়োজন ততটা বাড়াতে হবে আদালত। সঙ্গে সহায়ক কর্মকর্তা-কর্মচারী, অফিস-এজলাস এবং পৃথক বিচারক দিয়ে। মামলা ভারাক্রান্ত আদালতে প্রতিদিন গাদাগাদা নথি লেখা, সেগুলোর ডায়েরি-কজলিস্ট লেখা, সমন-ওয়ারেন্ট লেখা-ইস্যুর অসাধ্য সাধন এক পেশকারের দু-হাতে আর হয় না সবটা, বকেয়াই রয়ে যায় বেশিটা। অনাহুত, তাই সাক্ষী আসে না নির্ধারিত তারিখে। এসব কাজে আরও দু-একটি পদ বাড়ানো জরুরি।

পুরো আদলে আদালত বাড়ানোর আর জায়গা নেই রাজধানী কিংবা জেলা শহরে। সুপ্রিমকোর্ট, জেলা আদালত, সবার প্রাঙ্গণ আজ বিল্ডিংয়ের বন হয়ে আছে। কোলাহলপূর্ণ পরিসরে বাজার চলে, বিচারে লাগে শান্ত-স্নিগ্ধ পরিসর, ভাবগম্ভীর পরিবেশ। আদালত বাড়াতে হবে সেই পরিবেশের পরিসরে। উকিলবিহীন গ্রাম্য কিংবা ভ্রাম্য আদালত সে বিকল্প নয়। সাক্ষী শুনে আর দলিল দেখে বিচার হয় দেখেই চোখ-কানওয়ালা যে কেউই বিচারকর্ম সারতে পারে ভাবাটা বিরাট ভ্রম।

বিশেষ জ্ঞানসম্পন্ন ন্যায়নিষ্ঠ বিচক্ষণ মানুষ ছাড়া সুবিচার মেলে না আসলে। ফিরিয়ে নিতে হবে ম্যাজিস্ট্রেট, সহকারী জজ, সিনিয়র সহকারী জজ আদালত সব উপজেলায়। জেলার বাইরে সুবিধাজনক জায়গায় কয়েকটি উপজেলার জন্য যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত নতুন করে বাড়াতে হবে। হাইকোর্ট বেঞ্চ সম্প্রসারণ করতে হবে বিভাগীয় শহরে। সংবিধানের ১০০ অনুচ্ছেদ মেনে সার্কিট বা অস্থায়ী, যে নামেই হোক।

আইনজীবীদের সবার কাছেই মামলা থাকবে পর্যাপ্ত। কতিপয় চেম্বারের মামলা উপচানো কমবে। কতিপয়ের স্বার্থে এসব আদালত তুলে আনার অপবাদ (!) মিথ্যা প্রমাণ হবে। আইনজীবীর ব্যক্তিগত কারণে সময় নেওয়াও কমবে।

অর্থ কোথায় পাওয়া যাবে! প্রতিটি আদালতে বিচারক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা আর আনুষঙ্গিকে যত ব্যয় তার প্রায় দ্বিগুণ আয় কোর্ট-ফি থেকে। দুর্নীতি-মানি লন্ডারিং মামলায় হাজারো লাখ টাকা জরিমানা, আর শতকোটি টাকার সম্পদ বাজেয়াপ্ত হয়। কোর্ট-ফির আয়, জরিমানা-বাজেয়াপ্তির অর্থ-সম্পদ ব্যয় হওয়া উচিত আদালতের মান ও বিচারের গতি বাড়াতেই। সিআরপিসির ৩৮৬ ধারায় সংশোধনী এনে ক্রোক-নিলাম-বিক্রির ক্ষমতাটুকুও দণ্ডদাতা আদালতকে দিলে জরিমানা-বাজেয়াপ্তি আদায়ে গতি আসে।

ফৌজদারি মামলায় ‘কগনিজ্যান্স’ বড় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আদালতে ফৌজদারি ঢোকার সেটাই পথ। সে পথে কড়া পাহারা দরকার, যেন মেরিটবিহীন হয়রানির অচল মামলা ঢুকতে না পারে। এ কাজে থাকতে হবে আরও অভিজ্ঞ বিচক্ষণ বিচারক। তাই প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের বদলে কগনিজ্যান্সের কাজটা কেবল চিফ জুডিশিয়াল-চিফ মেট্রোপলিটান ম্যাজিস্ট্রেটদের দিয়েই করাতে হবে [সিআরপিসির ৬(৩) ধারামতে এখন তারা প্রথম শ্রেণিরও উচ্চ শ্রেণিতে]।

যেমনটা দায়রা বিচার্য মামলা আগে যায় দায়রা জজের কাছে, তিনি গ্রহণ করলে বিচারে পাঠান অতিরিক্ত ও যুগ্ম জজের কাছে। তবে আগে ম্যাজিস্ট্রেটের কগনিজ্যান্স, পরে আবার দায়রা জজের কগনিজ্যান্সের বদলে সরাসরি দায়রা জজেরই কগনিজ্যান্স, শুরু থেকেই মামলাটা দায়রায় থাকার ব্যবস্থা করা দরকার। ট্রাইব্যুনাল ও বিশেষ ধরনের আদালতের আমলযোগ্য ফৌজদারি মামলাও তদন্তকালে আমলি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে রাখা চলছে আইন ছাড়া পুরোনো স্বভাবে। সেগুলো তো শুরু থেকেই সেসব ট্রাইব্যুনাল ও বিশেষ আদালতেই থাকার কথা। অর্থহীন এসব ধাপ কমালে কাল কাটানোর অনেক ধাপ কমে, সময় বাঁচে।

যতই পাকা বন্দোবস্ত হোক না কেন, চার আনারও সাধ মিটবে না ঠিকমতো দেখভাল না করলে। দামি যন্ত্রপাতির অত্যাধুনিক কারখানাও অচল হয় নিয়মিত ‘সুপারভিশন’ না থাকলে। নষ্ট ‘পার্টস’ আর দুষ্ট গরু শনাক্ত করে সারাতে হয়, সরাতে হয়। করিয়ে না নিলে কাজ করে না কেউই। কর্তা আর কর্মীতে ফারাক এই। অধস্তন আদালতগুলোর বিচারকদের নিজ নিজ আদালতের এবং নিজ অধস্তনগুলোর জেলা ও দায়রা জজের তদারকি-তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব।

নিজেরসহ সব আদালতের তদারকি-তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব সুপ্রিমকোর্টের। কায়দা-কৌশল দেওয়া আছে ‘সিভিল রুলস অ্যান্ড অর্ডারস’, ‘ক্রিমিনাল রুলস অ্যান্ড অর্ডারসে’। আছে হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগের কোর্ট রুলস। সেগুলো মানা হচ্ছে কি না, সেই তদারকি ও কাজ করিয়ে নেওয়ার কর্তা সুপ্রিমকোর্ট।

অধস্তন সব আদালত থেকে বিচারাধীন মামলার কতগুলো কত মাসের, কত বছরের পুরোনো, অতিবিলম্বের কী কারণ-সব তথ্যই সুপ্রিমকোর্টে আসে বার্ষিক, ত্রৈমাসিক স্টেটমেন্টে। বছরে কোন আদালতে, কোন বেঞ্চে শতকরা কতভাগ নিষ্পত্তি, কতভাগ দায়ের, কতভাগ পেন্ডিং, কত বছরের পুরোনো কতটি কার কাছে থাকল, পুরো হিসাব থাকতে হবে সুপ্রিমকোর্ট বার্ষিক রিপোর্টে। আসল খবরদারি করতে লাগে খুঁটিনাটি সব খবরাদি। মোটা দাগের হিসাবে ধরা যায় না আসল দাগি কে!

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯০ সালের ‘সিভিল জাস্টিস রিফর্ম অ্যাক্টে’ অভিনব নিয়ম করেছে। ফেডারেল জজ-ম্যাজিস্ট্রেটদের যারা মামলা নিষ্পত্তিতে অতিবিলম্ব করেন তাদের নাম জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়। সাক্ষী বা শুনানি শুরুর ৬ মাসে, মামলা দাখিলের তিন বছরের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে না পারলে সেই বিচারককেই তা জানাতে হয় ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিস অব দি ইউনাইটেড স্টেটস কোর্টসে’র পরিচালকের কাছে।

পরিচালক সেগুলোর রিপোর্ট ৬ মাস পরপর প্রকাশ করে। কানাডায় সাধারণ দেওয়ানি মামলা সর্বোচ্চ ৬ মাসে নিষ্পত্তি করা নিয়ম। পাঁচটি মামলায় এই সীমা লঙ্ঘন করায় বিভাগীয় ব্যবস্থায় ‘ওয়ার্নিং’ খেয়ে বিচারকের পদত্যাগের নজিরও আছে। এমনই করা উচিত আমাদের এখানে বিচারক ও আইনজীবীর জন্য। শনাক্ত হয় সত্যিকারের বিলম্বকারী, আরামকারী। ঢালাও দোষের ভাগী হয় না খেটে-মরা বেচারি।

অধস্তন-ঊর্ধ্বতন, বিচারক-সহায়ক সবাইকেই রাখতে হবে সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসনের নজরে। দায়মুক্তিতে রাখা যাবে না কাউকেই। ঢালাও দোষের সার্কুলার নয়- ধরতে হবে, সারতে হবে, সরাতে হবে, আসল নষ্ট, আসল দুষ্টকে। কেবল অভিযোগ পেলেই নয়, গন্ধ পেলে, ধোঁয়া দেখলেই নিজ গরজে খবর নেবে, বিহিত করবে। সব আদালতে কড়া তদারকি আর সত্যিকারের দেখভালের তত্ত্বাবধানই হলো বিচার-বিলম্বের একপাশের পাষাণকপাট সরানোর আসল চাবিকাঠি। ঘোরাতে হবে সবল হাতে।

মামলা যত কম আসে, বিচার শেষের আগে আপিল-রিভিশন-রিট যত কম হয় ততই কম জট বাঁধে। সেগুলো আদৌ চলে কি না, তার বাছবিচার শুরুতেই করে নেওয়ার, অচলগুলো বাদ দেওয়ার বিধান আছে কার্যবিধিগুলোয়। সেগুলো বোধবুদ্ধি দিয়ে বিচারক-আইনজীবী মেনে চললে নর্দমায় আবর্জনা ফেলার মনানন্দে আদালতে ফেলা হাবিজাবি মামলা-আপিল রিভিশন-রিটে বিচারস্রোত আবদ্ধ হতো না।

মামলায় ঢুকিয়ে মক্কেলকে আদালত, আর আদালতকে মক্কেল দেখানো শেষে আপস-নিষ্পত্তির বিকল্প পথের প্যাঁচে ঘোরানোর বদলে দরকার এমন ব্যবস্থা: “বিরোধ নিয়ে মক্কেল এলে তাকে শুনে, কাগজপত্র দেখে আইনজীবী ‘মেরিট’ দেখলে দাবি মেনে নিতে নোটিশ দেবেন অপরপক্ষকে। অপরপক্ষ আরেক আইনজীবীর কাছে গেলে তিনিও শুনে, কাগজপত্র দেখে প্রথমপক্ষের আইনজীবীর সঙ্গে মিটমাটে বসবেন নিজ নিজ মক্কেল নিয়ে।

আপসরফার উদ্যোগটা গোড়াতেই নেবেন দুপক্ষের আইনজীবী। সময়সীমা থাকবে নির্দিষ্ট, ফি’র হারটাও। মিটে গেলে সোলেনামায় বিরোধ নিষ্পত্তি। না মিটলে তার কারণ বিস্তারে একটি স্মারক তৈরি করবেন দুপক্ষ। সেই স্মারক নিয়ে আদালতে যাবেন সংক্ষুব্ধপক্ষ। বিচারে যে পক্ষ হারবে তার হবে মামলার দাবির সমান জরিমানা গোঁয়ার্তুমি করে অপরপক্ষকে হয়রানির মামলায় ফেলার দায়ে।”

এক বিরোধে মামলা হয় কয়েকটি। পারিবারিক বিরোধ বাধলে মামলা হয় যৌতুকের আগে, পরে নারী নির্যাতনের, চুরির, শেষে হয় পারিবারিক। দেওয়ানির বিরোধ লাগলে মামলা হয় আগে চাঁদাবাজির, পরে দেওয়ানি। একখানা চেকেই হয় প্রতারণা, জালিয়াতি, এনআই অ্যাক্ট, অর্থঋণ। বাদী-বিবাদী, আসামি-ফরিয়াদি একই লোক, বিচারকও একই জন, আইনজীবীও একই। বিচার হয় একই এজলাসে, শুধু পৃথক নথি টেনে। আজ যে বিচারক ম্যাজিস্ট্রেসিতে কাল তিনি দেওয়ানিতে।

মামলার সংখ্যা কমাতে এক বিরোধে একটাই মামলা, দেওয়ানি-ফৌজদারি প্রতিকার একই বিচারে, এমন ব্যবস্থাই করতে হবে। দেওয়ানির ডিক্রি হলে জারির প্রক্রিয়াটি নিতে হবে সেই আদালতকেই, নিজের রায়-ডিক্রির মান বাঁচাতে। নইলে বিচার থাকে অসমাপ্ত। সে ব্যবস্থাটাও করতে হবে।

মিথ্যা মামলা, আর জাল কাগজ প্রমাণ হয় যে, আদালতে তাকে ফৌজদারির নালিশকারী হওয়ার যে ঘোরপ্যাঁচ লাগানো আছে কার্যবিধির ১৯৫ ও ৪৭৬ ধারায়, সেটি ছুটিয়ে সেই আদালতকেই দণ্ডদাতা করা দরকার। তার একই রায়ে মিথ্যা-জালিয়াতিরও সাজা হলে আরেক মামলা লাগে না, মিথ্যা মামলাও কমে।

আইনজীবী ছাড়া মামলা ঢোকেও না, চলেও না আদালতে। নিজের মামলা নিজে করার সুযোগ থাকলেও আইনজীবী না ধরে কেউ আদালতের পথ মাড়ায় না। অনেক আইনজীবীও নিজের মামলা করতে ধরেন আরেক আইনজীবীকে। দাম্পত্যকলহে স্ত্রী তার বাবার বাড়ি গিয়ে ফিরে না এলে কার কোন ফৌজদারি অপরাধ হয়? বিরহকাতর স্বামীকে আপসের পথ না দেখিয়ে, আদালতে কোন যুক্তিবাণে ‘সিআরপিসি’-র ১০০ ধারায় সার্চ-ওয়ারেন্টের মামলা বাধালেন?

অচল বলে মামলা খারিজে চির বিচ্ছেদযন্ত্রণায় স্বামী হলেন আত্মঘাতী (সংবাদভাষ্য মতে)। আপিল-আদালতের দণ্ডিতকে উচ্চ-আদালতে যেতেও বিচার-আদালতের জামিন দিতে নেই বলে তলব পড়ে শুধু জামিনদাতা বিচারকেরই। যুক্তিজালে জামিন ধরা আইনজীবীর যুক্তিটা জানারও নয়! আইনজীবী নির্দয় জীবিকাধিকারে! বিচারের এই ডানায়ও একটু তো ভর দেওয়ার আছে।

মক্কেল এলেই মামলা বানানো কিংবা লড়তেনামা, দেওয়ানি বিরোধে ফৌজদারি লাগানো কি আইনজীবীর পেশা! মক্কেলের গল্প সত্য কি না, কাগজপত্রের আসল-জাল পরখ করার পহেলা দায় তো আইনজীবীরই। আদালতে সেসব প্রমাণ করতে পারবেন কি না, বিপক্ষের জেরায় সাক্ষী টিকবে কি না, কাগজপত্রের জালিয়াতি ধরা পড়বে কি না, সব তো তিনিই দেখেন আগে। কোন বিরোধে কী মামলা, সে তো মক্কেলের খায়েশমতো হবে না, ঠিক করেন তো আইনজীবীই। চিকিৎসকে চিকিৎসা দেয় রোগ ধরে শাস্ত্রমতে, রোগীর রুচিমতে দিলে কুচিকিৎসায় জীবননাশ।

ফাঁকা বুলি নয় এসব। সত্যিই লেখা আছে, ‘Canons of Professional Conduct and Etiquette of Advocates’-এ। নিজের কারণে আদালতে সময় নিতে নয়, বলা আছে নিজে না পারলে বিকল্প ব্যবস্থা করে রাখতে। হয়রানির মামলা বানাতে নিষেধ আছে। বলা আছে, আইন আর ‘ফ্যাক্টস’ বুঝে নিশ্চিত হয়েই আইনজীবী নিজ দায়িত্বে ঠিক করবেন মামলা করবেন কি না, লড়বেন কি না। ‘দায় ছাড়া আয়’, এমন পেশা নয় আইনজীবীর।

‘আইনজীবী’ নামে বাংলাকরণ সম্মানের হয়নি মোটে ‘অ্যাডভোকেট’ সাহেবের। জীবিকার্জনই মুখ্য দেখায় বলে অনেকেই তাদের কৌশলী ভাবেন! আইনি আচরণের খেলাপ করলে পেশাগত অসদাচরণে আইনজীবীর দায়ী হওয়ার কথা বার কাউন্সিলে। কেউ অভিযোগ না করলেও গন্ধ পেলে, ধোঁয়া দেখলেই নিজ গরজে খোঁজ-খবর করার কথা বার কাউন্সিলের। সেই চাবিকাঠি ঘোরে না দুর্বল হাতে।

ইচ্ছামতো আপিলের অধিকার খাটানো বিচারকারী আদালত ও ন্যায়বিচারের ওপর চড়াও হওয়ার শামিল, অতিবিলম্বের বিচারবঞ্চনার মূল বলেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি (১৮ ডিসেম্বর ১৮৮৯ থেকে ২৮ মার্চ ১৯১০) ডেভিড জসিয়াহ ব্রিউয়ার। সে কথা তো মিথ্যে নয় এখনো আমাদের দেশে। আপিল-রিভিশন, মামলা-রিটের দায় পুরোটাই নিতে হবে আইনজীবীকে, যিনি ‘মেরিট’ ছাড়া হয়রানির কায়দা করে দাখিল করেন, লড়তে নামেন।

আদালতে জরিমানা লাগাতে হবে তার, পেশাগত অসদাচরণের ব্যবস্থা নিতে হবে বার কাউন্সিলে। এটুকু ব্যবস্থা এখনই করতে পারে সুপ্রিমকোর্ট ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৫৪(২)(সি) ধারা ও দেওয়ানি কার্যবিধির ১২২, ১২৬ ধারার ক্ষমতায় আর হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের ‘রুলসে’ বিধিজুড়ে। ‘মূল্য সংযোজন’ করে দোকানদার, ‘মূল্য সংযোজন কর’ (VAT) দেয় খরিদ্দার! এই অনাচার বাজারে চলে, চালানো যায় না অন্তত বিচারে। হয়রানির না-হোক আপিল-রিভিশন-রিটের, অচল মামলা, ভুল মামলার খেসারত মক্কেল নয়, গুনতে হবে তার আইনজীবীকেই। ঢালাও দোষের ভাগী হতে বাঁচেন নীতিনিষ্ঠ ‘অ্যাডভোকেট’।

বিশ্বাসের পাল্লায় ওজনদার হলে এক সাক্ষীতেই প্রমাণ হতে পারে, কাজ হয় না ওজনবিহীন শতেক সাক্ষীতেও। এক মামলায় একপক্ষে যোগ্য আইনজীবী দু-একজনই যথেষ্ট। অত্যধিকের হট্টগোলে আইনের যুক্তি নাকি মক্কেলের শক্তি দেখানো হয় বুঝতে গোল বাধে! সেসব মিটিয়ে সুস্থির হয়ে বসতেই দিন কাবার। একপক্ষেরই বিজ্ঞ সবার লম্বা শুনানিতে বিচার লবেজান। বিত্তশালীর পাল্লায় পড়লে বিপক্ষের আইনজীবী মেলা ভার। এক মামলায় এক মক্কেল কতজন আইনজীবী দিতে পারে, তার পক্ষে এক তারিখে কতজনে শোনাতে পারে তারও একটা সীমা থাকা দরকার।

এসব কোন দেশে আছে! পাওয়া যাবে সেই দেশে যেখানে আদালতে কারাফটকে ধর্ষক-ধর্ষিতার বিয়ে দিয়ে ধর্ষণ মামলা মেটে; যেখানে একজনের মান গেছে বলে মামলা করে অন্যেরা সব জনে জনে যত থানা যত আদালতে।

বিচারে আসার আগেই বিলম্ব শুরু ফৌজদারিতে। ‘সিআরপিসি’-তে তদন্তের সময়সীমা বাঁধা নেই বলে কি চলবে তদন্তকারীর মর্জিতে। ১৬৭ ধারার (১) উপধারায় চব্বিশ ঘণ্টায়, আর (৫) উপধারায় ১২০ দিনে শেষ করার ইশারাটা ‘কাফি’ হবে না ‘আকেলমন্দ’ দু-একজনেরও! দুদক আইনে (২০ক ধারা) ১২০ দিনে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে (১৮ ধারা) অপরাধী হাতেনাতে ধরা পড়লে ১৫ দিনে, না পড়লে ৬০ দিনে তদন্তের সময়সীমার স্পষ্ট বিধান আছে।

সীমা লঙ্ঘনকারীর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব আছে কর্তৃপক্ষের। এখনকার অনেক আইনেও তাই আছে। সীমা লঙ্ঘনই অলঙ্ঘনীয় হয়ে গেছে। ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না কর্তৃপক্ষকে। দীর্ঘতর তদন্ত শেষ হলে শুরু হয় অধিকতর তদন্ত-ফাঁকফোঁকর রেখে দায়সারা, দোষীর বেরিয়ে যাওয়ার রাস্তা বানিয়ে নির্দোষকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার প্যাঁচ লাগানো কাজে। বখে যাওয়া কর্মীকে অতিশয় অপত্যস্নেহে কর্তার আগলে রাখার কী আছে! লোকে দুষবে কাকে! সময়মতো শেষ করিয়ে নেওয়া, একবারেই নিখুঁত তদন্ত করিয়ে নেওয়ার কর্তৃত্বটা করতে হবে কর্তৃপক্ষকে নজরদারি, তদারকি দিয়ে। নষ্ট ‘পার্টস’, দুষ্ট গরু সরাতে হবে, সারাতে হবে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়ে।

আসে না বলে সাক্ষীর বদনামে মামলা ঝুলে ফৌজদারিতে। এলেও তো দাবড়ায় আসামি আর দুপক্ষের আইনজীবী এবং আরও যে পারে। সাক্ষী, তাই খাড়া সর্বদা! বসার জায়গা নেই তার আদালতের কোনোখানে। গাঁটের পয়সা খরচ করে এসে ফিরতে হয় খালি হাতে। এসব দুঃখ ঘুচিয়ে স্বস্তি একটু না দিলে সাক্ষী স্বতঃপ্রবৃত্ত হবে? আদালতে তার বসার জায়গা দিতে হবে। দিনের লোকসান, যাওয়া-আসা, থাকা-খাওয়ার হিসাব করে খরচা দিতে হবে নগদে। খাত রাখতে হবে সাক্ষী নেওয়া আদালতের হাতে। সমনটা সত্যিই পৌঁছাতে হবে সাক্ষীর কাছে। সে তদারকিটা করতে হবে থানা ও আদালতের কর্তাদের। সাক্ষীর ফিরে গিয়ে নিরাপদে থাকার আস্থাটুকুও জাগানোর আছে।

১৮০ দিনে বিচার শেষ না হলে বিচারক, পাবলিক প্রসিকিউটর, পুলিশ কর্মকর্তাকে সুপ্রিমকোর্ট ও সরকারের কাছে কারণ জানাতে বলা আছে; আর খতিয়ে দেখে দায়ী ধরে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে যার যার কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব দেওয়া আছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে (ধারা ৩১ক)। জানানোই হয় কি না, জানা যায় না ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না বলে। শুধু এই মামলায় নয়, অতিবিলম্বের কারণ জানাতে হবে, বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে ফৌজদারির সব মামলাতেই। তদন্তকারী-আইনজীবী-বিচারক, ধরে দেখাতে হবে দায় কার কতখানি। তদন্ত আর বিচারে তথ্যপ্রযুক্তি, আধুনিক যত প্রযুক্তি সব লাগাতে হবে।

বিচারের অতিবিলম্বের সব পাষাণকপাটে তদারকি-তত্ত্বাবধানের চাবিকাঠি ঘোরাতে হবে সবল হাতে। বিচারব্যবস্থার ‘সুপ্রিম অথোরিটি’ হিসেবে সেই হাঁকটা দিতে হবে সুপ্রিমকোর্টকে। হাইকোর্ট কিংবা আপিল বিভাগের বেঞ্চ থেকে দু-চারটার তলবে তদারকি-তত্ত্বাবধানের সবটা সারবে না। বেঞ্চের প্রধান কাজ বিচারকর্ম।

বিচার ব্যবস্থার সব ঘাটে দেখভাল ও বিহিত করতে অন্য কাজের ভারমুক্ত দক্ষ লোকের শক্ত ব্যবস্থা থাকতে হবে সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসনে। ভারমুক্ত ‘রেডিমেড’ অভিজ্ঞ দক্ষ মানুষ পাওয়া যাবে চাকরির শেষে অবসরে। তাদেরকে এ কাজে লাগানো যায়, অবসরভোগীর আয়েশখানা হওয়ার অপবাদ না ওঠে সেদিকটায় নজর রেখে। এতটুকু যদি সত্যি করা যায়, ভাবা যাবে আরও কী করার আছে।

মঈদুল ইসলাম : অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক; প্রবন্ধকার ও আইনগ্রন্থকার

moyeedislam@yahoo.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন