গণতন্ত্রের ক্ষত সারাতে পারবেন কি বাইডেন?
jugantor
গণতন্ত্রের ক্ষত সারাতে পারবেন কি বাইডেন?

  মেজর (অব.) সুধীর সাহা  

২৬ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ট্রাম্প জমানা অতীত। আমেরিকায় শুরু বাইডেন-যুগ। সঙ্গী অশ্বেতাঙ্গ প্রথম নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস। পূর্বসূরি থেকে তিনি যে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে প্রশাসন চালাবেন, শপথ নেওয়ার পরই তা স্পষ্ট করে দিলেন আমেরিকার ৪৬তম প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। গত চার বছর ছিল আমেরিকার জাতি-সম্প্রদায়ের বিভেদযুক্ত একটি নিষ্ঠুর যুগ।

ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসকে পাশে নিয়ে বাইডেন যেন সেই অঘোষিত গৃহযুদ্ধ অবসানের ডাক দিলেন। ট্রাম্প আমলে জারি হওয়া ১৭টি নির্দেশিকা বাতিলের জন্য প্রথম দিনের অফিস কাজে বাইডেন এক্সিকিউটিভ অর্ডারে স্বাক্ষর করলেন। এর মধ্যে প্রধান প্রধান বিষয় হচ্ছে-বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় পুনঃপ্রবেশ, প্যারিস জলবায়ু চুক্তি কার্যকর করা, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের নাগরিকদের আমেরিকায় প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, করোনা মোকাবিলায় বিজ্ঞানসম্মত পদক্ষেপ, বিপর্যয় মোকাবিলা তহবিল থেকে করোনার জন্য অর্থ বরাদ্দ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা এবং বিমান থেকে বাস, সর্বত্র মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা।

প্রথমদিনেই অভিবাসনসংক্রান্ত সংশোধনী বিল কংগ্রেসে পাঠিয়েছেন বাইডেন। এ নীতি কার্যকর হলে আমেরিকায় বসবাসরত বহু অভিবাসী নাগরিকত্ব লাভ করবেন।

সম্প্রীতির কাজ কঠিন নয়-এ কথাও প্রত্যয়ের সঙ্গে জানিয়েছেন বাইডেন। বাইডেন বলেছেন, ‘আমাদের হৃদয়কে উন্মুক্ত করলেই সম্প্রীতির লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব। যদি আমরা একটু সহিষ্ণুতা এবং মানবিকতা দেখাই, অপরের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা দেখাতে পারি, তবে চলতি পরিস্থিতির পরিবর্তন আসতে সময় লাগবে না।’

ট্রাম্প শাসনামলে সবচেয়ে কলঙ্কজনক ঘটনা ক্যাপিটল হিলে ট্রাম্প সমর্থকদের হামলা। ৬ জানুয়ারি আমেরিকার গণতান্ত্রিক ইতিহাসে সবচেয়ে লজ্জার দিন-এমনটাই বলেছেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ইতোমধ্যে ট্রাম্প হুংকার দিলেন, ‘আমরা হারতেই পারি না। নানারকম হিসাব করে দেখেছি, এ ভোটের ফল একটা বড় ধাপ্পা।’ তিনি আরও বললেন, ‘ক্যাপিটল চলো। আমাদের দেশকে ফিরে পেতে হলে, ক্যাপিটলে গিয়ে শক্তিশালী আচরণ করতে হবে।

দুর্বল হলে চলবে না।’ কিন্তু ট্রাম্পের যত আহ্বানই থাকুক, ট্রাম্পভক্তদের যত তাণ্ডবই চলুক, মার্কিন পদ্ধতি চলল গণতান্ত্রিক উপায়েই। বাইডেন ক্ষমতা পেলেন শান্তিপূর্ণভাবেই। ট্রাম্প বর্ণবাদ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, উগ্র সাম্প্রদায়িক মৌলবাদ সচেতনভাবেই ধারণ করেছিলেন। তাই তিনি বিভাজনের রাজনীতি উপহার দিয়ে এক শ্রেণির শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী ভক্তকুল তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ৬ জানুয়ারির ক্যাপিটল হিলের সংঘবদ্ধ আক্রমণ একদিকে যেমন আমেরিকার এক কলঙ্কজনক ইতিহাস, অন্যদিকে বর্ণবাদীদের ব্যর্থতার স্বাক্ষর।

ঠিক এ ঘটনার হাত ধরে আসা ট্রাম্পের দ্বিতীয়বারের ইমপিচমেন্টটিও আমেরিকার গণতন্ত্রের জয়গানই সরবে প্রকাশ করছে। ট্রাম্প ক্ষমতা থেকে সরে গেলেও ইমপিচমেন্টের বিচার থেকে রেহাই পাচ্ছেন না, এটি প্রায় নিশ্চিত। সিনেটে তার বিচার শুরু হচ্ছে এবং দোষী সাব্যস্ত হলে এবং দুই-তৃতীয়াংশ ভোট তার বিপক্ষে গেলে ট্রাম্প ভবিষ্যতে আর প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পাবেন না।

বাইডেন তার শপথ অনুষ্ঠানের ভাষণে যা বললেন, তার সারসংক্ষেপ এমন-‘আমরা আমেরিকার নতুন ইতিহাস রচনা করব। আমি আপনাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, সবসময় আপনাদের পাশে থাকব। আমরা পরস্পর পরস্পরকে সম্মান করব। আমরা সন্ত্রাসবাদকে পরাজিত করব। আমরা একত্রে অনেক ভালো কাজই করতে পারি। আমাদের ক্ষত মেরামতের প্রয়োজন রয়েছে। আমরা অনেকদূর এগিয়েছি, আরও এগোতে চাই। অর্থনীতির দিকে দৃষ্টি দিতে হবে, যেখানে অনেক লোক কাজ হারিয়েছেন। আজকের দিনটি গণতন্ত্রের বিজয়ের দিন। আজ থেকে আমরা নতুনভাবে শুরু করব। আমি সব আমেরিকানের প্রেসিডেন্ট হব।’

গণতন্ত্র নামের যে যন্ত্রটা আমেরিকাকে গত দুশতক বছর ধরে চালাচ্ছে, ক্যাপিটল ভবনে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীদের তাণ্ডবটি ছিল সেখানে ব্যতিক্রম। মনে হচ্ছিল, আমেরিকার গণতন্ত্রের নাটবল্টু বুঝি এবার খুলে যায়-গণতন্ত্র বুঝি এবার ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। কিন্তু শেষটা তা হলো না, সবকিছু হলো গণতান্ত্রিক পদ্ধতি মেনেই। তাণ্ডবকারীরা ঘরে ফিরে গেল, ট্রাম্প কোণঠাসা অবস্থায় পতিত হলেন। জনপ্রতিনিধিরা নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বজায় রাখলেন এবং ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসাবে বাইডেন শপথ নিলেন।

বাইডেন এবং হ্যারিস দুজনই জানেন, তারা এক ভঙ্গুর ও অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছেন। একদিকে তাদের বিশ্ববাসীকে ভরসা জোগাতে হবে, বিশ্বের কাছে আমেরিকা সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা দিতে হবে, অন্যদিকে খোদ আমেরিকার বিভাজন ঠেকাতে হবে। সাদা-কালোর অঘোষিত যুদ্ধ থামাতে হবে। বর্ণবাদীদের রুখে দিতে হবে। কাজটি সহজ নয়। ট্রাম্প গত চার বছরে বিভাজনের বীজটি শক্তভাবেই রোপণ করতে পেরেছিলেন।

সেখান থেকে আমেরিকানদের ঐক্যের মঞ্চে নিয়ে আসার কাজটি সহজ হবে না বাইডেন প্রশাসনের। তবে শুরুটা ভালোভাবেই করেছেন বাইডেন। বাইডেনের প্রধান লক্ষ্য ট্রাম্প আমলের ছিদ্র মেরামত করে ওবামা-বাইডেন যুগে ফিরে যাওয়া। সেদিন কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট ওবামার পাশে ছিলেন শ্বেতাঙ্গ ভাইস প্রেসিডেন্ট বাইডেন, আর আজ শ্বেতাঙ্গ প্রেসিডেন্ট বাইডেনের পাশে আছেন কৃষ্ণাঙ্গ ভারতীয় কমলা হ্যারিস।

শপথ অনুষ্ঠানের দিন সাতসকালেই বাইডেনের ‘ছকভাঙা’ পূর্বসূরি ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ ছেড়ে চলে যান। নবীন প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানানোর শোভন আচরণটুকু ট্রাম্পের কাছে প্রত্যাশিতও ছিল না। তারপরও বাইডেন-হ্যারিসের শপথ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে প্রথা মেনেই। ইতোমধ্যে করোনায় মৃত চার লাখ মানুষের স্মরণে ওয়াশিংটন ন্যাশনাল ক্যাথিড্রালের দেওয়ালে ফুটে উঠেছে ‘৪,০০,০০০’ নম্বরটি। ক্যাথিড্রালের ঘণ্টা বেজেছে ৪০০ বার। উপস্থিত ছিলেন সস্ত্রীক তিন সাবেক প্রেসিডেন্ট ও তাদের স্ত্রীরা-মিশেল ও বারাক ওবামা, হিলারি ও বিল ক্লিন্টন এবং লরা ও জর্জ বুশ। সবচেয়ে উজ্জ্বল উপস্থিতি ছিল কৃষ্ণাঙ্গ তরুণী আমান্ডা গোরম্যান।

বর্তমান প্রেসিডেন্টের মতো ছোটবেলায় তারও কথা বলতে অসুবিধা হতো। শপথ অনুষ্ঠানে হোঁচট না খেয়ে ২৩ বছরের এ কৃষ্ণাঙ্গ কবি পড়লেন স্বরচিত কবিতা: ‘যে পাহাড় আমরা পেরিয়ে যাই’। সেই কবিতা শুনতে শুনতে আমেরিকাবাসীর চোখে ছিল জল, মুখে ছিল হাসি। মনে ছিল আশা-আগামী চার বছর দেশকে বাধা-বিপত্তির পাহাড় ভেঙে এগিয়ে নিয়ে যাবেন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং তার ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস।

ভোট এবং ট্রাম্প-যুগ শেষ হলেও ট্রাম্পের ঐতিহ্য আমেরিকার শানিত স্রোতে প্রবাহিত হবে দীর্ঘদিন। এবারও প্রায় ৪৭ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন ট্রাম্পকে। বিভাজনের ইতিহাস জেনেই তাকে ভোট দিয়েছেন। আমেরিকার গণতন্ত্রই ট্রাম্পের মতো এক নেতাকে প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। এখনো সেই গণতন্ত্র তার সঙ্গে তার ভক্তদের মিলন ঘটানোর চেষ্টা করবে। ট্রাম্প আমেরিকার গণতন্ত্রের যেন এক ফ্রাঙ্কেনস্টাইন।

কেননা, আমেরিকার গণতন্ত্রই তিলে তিলে মূর্ত করেছে আজকের ট্রাম্পকে। তারপরও সেই গণতন্ত্র তাকে শেষ জবাব দিয়েছে। তাকে সরিয়ে দিয়ে ফিরিয়ে এনেছে বাইডেন-হ্যারিস প্রশাসনকে। আমেরিকা এখন এটি দেখার আশায় থাকবে-বাইডেন কীভাবে গত চার বছরের ক্ষত সারাবে।

গোটা বিশ্ব এখন এটি দেখার আশায় থাকবে-আমেরিকা কীভাবে আবার তার চেনা বিশ্বদরবারে নেতৃত্বের ভূমিকায় ফিরে আসবে। এ মুহূর্তে সম্ভবত সবকিছু বলার সময় আসেনি; অপেক্ষা করতে হবে। তবে এটুকু বলা যায়, তাদের শুরুটা ভালো হয়েছে। ঐক্যের ডাক এসেছে। ইতোমধ্যে সিনেট সভায়ও গত এক দশকের মধ্যে এই প্রথম ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।

মেজর (অব.) সুধীর সাহা : কলাম লেখক

ceo@ilcb.net

গণতন্ত্রের ক্ষত সারাতে পারবেন কি বাইডেন?

 মেজর (অব.) সুধীর সাহা 
২৬ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ট্রাম্প জমানা অতীত। আমেরিকায় শুরু বাইডেন-যুগ। সঙ্গী অশ্বেতাঙ্গ প্রথম নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস। পূর্বসূরি থেকে তিনি যে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে প্রশাসন চালাবেন, শপথ নেওয়ার পরই তা স্পষ্ট করে দিলেন আমেরিকার ৪৬তম প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। গত চার বছর ছিল আমেরিকার জাতি-সম্প্রদায়ের বিভেদযুক্ত একটি নিষ্ঠুর যুগ।

ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসকে পাশে নিয়ে বাইডেন যেন সেই অঘোষিত গৃহযুদ্ধ অবসানের ডাক দিলেন। ট্রাম্প আমলে জারি হওয়া ১৭টি নির্দেশিকা বাতিলের জন্য প্রথম দিনের অফিস কাজে বাইডেন এক্সিকিউটিভ অর্ডারে স্বাক্ষর করলেন। এর মধ্যে প্রধান প্রধান বিষয় হচ্ছে-বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় পুনঃপ্রবেশ, প্যারিস জলবায়ু চুক্তি কার্যকর করা, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের নাগরিকদের আমেরিকায় প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, করোনা মোকাবিলায় বিজ্ঞানসম্মত পদক্ষেপ, বিপর্যয় মোকাবিলা তহবিল থেকে করোনার জন্য অর্থ বরাদ্দ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা এবং বিমান থেকে বাস, সর্বত্র মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা।

প্রথমদিনেই অভিবাসনসংক্রান্ত সংশোধনী বিল কংগ্রেসে পাঠিয়েছেন বাইডেন। এ নীতি কার্যকর হলে আমেরিকায় বসবাসরত বহু অভিবাসী নাগরিকত্ব লাভ করবেন।

সম্প্রীতির কাজ কঠিন নয়-এ কথাও প্রত্যয়ের সঙ্গে জানিয়েছেন বাইডেন। বাইডেন বলেছেন, ‘আমাদের হৃদয়কে উন্মুক্ত করলেই সম্প্রীতির লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব। যদি আমরা একটু সহিষ্ণুতা এবং মানবিকতা দেখাই, অপরের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা দেখাতে পারি, তবে চলতি পরিস্থিতির পরিবর্তন আসতে সময় লাগবে না।’

ট্রাম্প শাসনামলে সবচেয়ে কলঙ্কজনক ঘটনা ক্যাপিটল হিলে ট্রাম্প সমর্থকদের হামলা। ৬ জানুয়ারি আমেরিকার গণতান্ত্রিক ইতিহাসে সবচেয়ে লজ্জার দিন-এমনটাই বলেছেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ইতোমধ্যে ট্রাম্প হুংকার দিলেন, ‘আমরা হারতেই পারি না। নানারকম হিসাব করে দেখেছি, এ ভোটের ফল একটা বড় ধাপ্পা।’ তিনি আরও বললেন, ‘ক্যাপিটল চলো। আমাদের দেশকে ফিরে পেতে হলে, ক্যাপিটলে গিয়ে শক্তিশালী আচরণ করতে হবে।

দুর্বল হলে চলবে না।’ কিন্তু ট্রাম্পের যত আহ্বানই থাকুক, ট্রাম্পভক্তদের যত তাণ্ডবই চলুক, মার্কিন পদ্ধতি চলল গণতান্ত্রিক উপায়েই। বাইডেন ক্ষমতা পেলেন শান্তিপূর্ণভাবেই। ট্রাম্প বর্ণবাদ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, উগ্র সাম্প্রদায়িক মৌলবাদ সচেতনভাবেই ধারণ করেছিলেন। তাই তিনি বিভাজনের রাজনীতি উপহার দিয়ে এক শ্রেণির শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী ভক্তকুল তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ৬ জানুয়ারির ক্যাপিটল হিলের সংঘবদ্ধ আক্রমণ একদিকে যেমন আমেরিকার এক কলঙ্কজনক ইতিহাস, অন্যদিকে বর্ণবাদীদের ব্যর্থতার স্বাক্ষর।

ঠিক এ ঘটনার হাত ধরে আসা ট্রাম্পের দ্বিতীয়বারের ইমপিচমেন্টটিও আমেরিকার গণতন্ত্রের জয়গানই সরবে প্রকাশ করছে। ট্রাম্প ক্ষমতা থেকে সরে গেলেও ইমপিচমেন্টের বিচার থেকে রেহাই পাচ্ছেন না, এটি প্রায় নিশ্চিত। সিনেটে তার বিচার শুরু হচ্ছে এবং দোষী সাব্যস্ত হলে এবং দুই-তৃতীয়াংশ ভোট তার বিপক্ষে গেলে ট্রাম্প ভবিষ্যতে আর প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পাবেন না।

বাইডেন তার শপথ অনুষ্ঠানের ভাষণে যা বললেন, তার সারসংক্ষেপ এমন-‘আমরা আমেরিকার নতুন ইতিহাস রচনা করব। আমি আপনাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, সবসময় আপনাদের পাশে থাকব। আমরা পরস্পর পরস্পরকে সম্মান করব। আমরা সন্ত্রাসবাদকে পরাজিত করব। আমরা একত্রে অনেক ভালো কাজই করতে পারি। আমাদের ক্ষত মেরামতের প্রয়োজন রয়েছে। আমরা অনেকদূর এগিয়েছি, আরও এগোতে চাই। অর্থনীতির দিকে দৃষ্টি দিতে হবে, যেখানে অনেক লোক কাজ হারিয়েছেন। আজকের দিনটি গণতন্ত্রের বিজয়ের দিন। আজ থেকে আমরা নতুনভাবে শুরু করব। আমি সব আমেরিকানের প্রেসিডেন্ট হব।’

গণতন্ত্র নামের যে যন্ত্রটা আমেরিকাকে গত দুশতক বছর ধরে চালাচ্ছে, ক্যাপিটল ভবনে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীদের তাণ্ডবটি ছিল সেখানে ব্যতিক্রম। মনে হচ্ছিল, আমেরিকার গণতন্ত্রের নাটবল্টু বুঝি এবার খুলে যায়-গণতন্ত্র বুঝি এবার ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। কিন্তু শেষটা তা হলো না, সবকিছু হলো গণতান্ত্রিক পদ্ধতি মেনেই। তাণ্ডবকারীরা ঘরে ফিরে গেল, ট্রাম্প কোণঠাসা অবস্থায় পতিত হলেন। জনপ্রতিনিধিরা নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বজায় রাখলেন এবং ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসাবে বাইডেন শপথ নিলেন।

বাইডেন এবং হ্যারিস দুজনই জানেন, তারা এক ভঙ্গুর ও অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছেন। একদিকে তাদের বিশ্ববাসীকে ভরসা জোগাতে হবে, বিশ্বের কাছে আমেরিকা সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা দিতে হবে, অন্যদিকে খোদ আমেরিকার বিভাজন ঠেকাতে হবে। সাদা-কালোর অঘোষিত যুদ্ধ থামাতে হবে। বর্ণবাদীদের রুখে দিতে হবে। কাজটি সহজ নয়। ট্রাম্প গত চার বছরে বিভাজনের বীজটি শক্তভাবেই রোপণ করতে পেরেছিলেন।

সেখান থেকে আমেরিকানদের ঐক্যের মঞ্চে নিয়ে আসার কাজটি সহজ হবে না বাইডেন প্রশাসনের। তবে শুরুটা ভালোভাবেই করেছেন বাইডেন। বাইডেনের প্রধান লক্ষ্য ট্রাম্প আমলের ছিদ্র মেরামত করে ওবামা-বাইডেন যুগে ফিরে যাওয়া। সেদিন কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট ওবামার পাশে ছিলেন শ্বেতাঙ্গ ভাইস প্রেসিডেন্ট বাইডেন, আর আজ শ্বেতাঙ্গ প্রেসিডেন্ট বাইডেনের পাশে আছেন কৃষ্ণাঙ্গ ভারতীয় কমলা হ্যারিস।

শপথ অনুষ্ঠানের দিন সাতসকালেই বাইডেনের ‘ছকভাঙা’ পূর্বসূরি ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ ছেড়ে চলে যান। নবীন প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানানোর শোভন আচরণটুকু ট্রাম্পের কাছে প্রত্যাশিতও ছিল না। তারপরও বাইডেন-হ্যারিসের শপথ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে প্রথা মেনেই। ইতোমধ্যে করোনায় মৃত চার লাখ মানুষের স্মরণে ওয়াশিংটন ন্যাশনাল ক্যাথিড্রালের দেওয়ালে ফুটে উঠেছে ‘৪,০০,০০০’ নম্বরটি। ক্যাথিড্রালের ঘণ্টা বেজেছে ৪০০ বার। উপস্থিত ছিলেন সস্ত্রীক তিন সাবেক প্রেসিডেন্ট ও তাদের স্ত্রীরা-মিশেল ও বারাক ওবামা, হিলারি ও বিল ক্লিন্টন এবং লরা ও জর্জ বুশ। সবচেয়ে উজ্জ্বল উপস্থিতি ছিল কৃষ্ণাঙ্গ তরুণী আমান্ডা গোরম্যান।

বর্তমান প্রেসিডেন্টের মতো ছোটবেলায় তারও কথা বলতে অসুবিধা হতো। শপথ অনুষ্ঠানে হোঁচট না খেয়ে ২৩ বছরের এ কৃষ্ণাঙ্গ কবি পড়লেন স্বরচিত কবিতা: ‘যে পাহাড় আমরা পেরিয়ে যাই’। সেই কবিতা শুনতে শুনতে আমেরিকাবাসীর চোখে ছিল জল, মুখে ছিল হাসি। মনে ছিল আশা-আগামী চার বছর দেশকে বাধা-বিপত্তির পাহাড় ভেঙে এগিয়ে নিয়ে যাবেন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং তার ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস।

ভোট এবং ট্রাম্প-যুগ শেষ হলেও ট্রাম্পের ঐতিহ্য আমেরিকার শানিত স্রোতে প্রবাহিত হবে দীর্ঘদিন। এবারও প্রায় ৪৭ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন ট্রাম্পকে। বিভাজনের ইতিহাস জেনেই তাকে ভোট দিয়েছেন। আমেরিকার গণতন্ত্রই ট্রাম্পের মতো এক নেতাকে প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। এখনো সেই গণতন্ত্র তার সঙ্গে তার ভক্তদের মিলন ঘটানোর চেষ্টা করবে। ট্রাম্প আমেরিকার গণতন্ত্রের যেন এক ফ্রাঙ্কেনস্টাইন।

কেননা, আমেরিকার গণতন্ত্রই তিলে তিলে মূর্ত করেছে আজকের ট্রাম্পকে। তারপরও সেই গণতন্ত্র তাকে শেষ জবাব দিয়েছে। তাকে সরিয়ে দিয়ে ফিরিয়ে এনেছে বাইডেন-হ্যারিস প্রশাসনকে। আমেরিকা এখন এটি দেখার আশায় থাকবে-বাইডেন কীভাবে গত চার বছরের ক্ষত সারাবে।

গোটা বিশ্ব এখন এটি দেখার আশায় থাকবে-আমেরিকা কীভাবে আবার তার চেনা বিশ্বদরবারে নেতৃত্বের ভূমিকায় ফিরে আসবে। এ মুহূর্তে সম্ভবত সবকিছু বলার সময় আসেনি; অপেক্ষা করতে হবে। তবে এটুকু বলা যায়, তাদের শুরুটা ভালো হয়েছে। ঐক্যের ডাক এসেছে। ইতোমধ্যে সিনেট সভায়ও গত এক দশকের মধ্যে এই প্রথম ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।

মেজর (অব.) সুধীর সাহা : কলাম লেখক

ceo@ilcb.net

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন-২০২০