দেশভাগ ও ভাষাযুদ্ধ
jugantor
দেশভাগ ও ভাষাযুদ্ধ

  অমিতরায় চৌধুরী  

২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ভাষা আন্দোলনের পটভূমি, গতিপ্রকৃতি কিংবা গভীরতা অনুধাবনের জন্য দেশভাগের পর পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান সামাজিক ও আর্থিক অসাম্যের ইতিবৃত্ত আলোচনায় একটা নতুন মাত্রা দিতে পারে। পাকিস্তানের উর্দুভাষী জনসংখ্যা ছিল ৭.১ শতাংশ, কিন্তু সামাজিকভাবে তারাই দেশের আমলাতন্ত্র, রাজনীতি কিংবা ব্যবসায়-সব খানেই কর্তৃত্ব কায়েম করেছিল। মজার ব্যাপার-এরা অধিকাংশই ছিল উত্তর ভারত থেকে আসা অভিজাত সম্প্রদায়। সেনাবাহিনীতেও আধিপত্য ছিল সামন্ত জমিদার শ্রেণির।

৫৪.৬ শতাংশ পাকিস্তানি বাংলাভাষী হলেও তাদের বৃহত্তর অংশ ছিল অনগ্রসর, বৈষম্যক্লিষ্ট কৃষক। উর্দু বনাম বাংলার এই স্নায়ুযুদ্ধে আর্থিক বিভাজন নির্ণায়ক হয়ে উঠেছিল। বলা বাহুল্য-এ বৈষম্য বাঙালি সত্তাকে জাগিয়ে তুলেছিল। ১৯৪৮ সালে সৈয়দ মুজতবা আলীও সতর্ক করেছিলেন পাক নেতৃত্বের এ ভাষাবিদ্বেষ অব্যাহত থাকলে পূর্ব পাকিস্তান রাজনৈতিক স্বাধীনতার পথে পা বাড়াবে। ইতিহাস বলে-ভাষার জন্য গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক আন্দোলনই ক্রমশ রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। আওয়ামী লীগও এ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দিশা, পরিচিতি ও শক্তি সঞ্চয় করে। চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের অমর ছায়াছবি, আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর কালজয়ী গান ও আলতাফ মাহমুদের সুর বাঙালি মননে অবিনশ্বর শক্তি ও অবিশ্বাস্য আবেগ সঞ্চার করে।

আগেই উল্লেখ করেছি, ভাষা আন্দোলনের শক্তি শুধু আবেগ থেকেই উৎসারিত হয়নি, পাকিস্তান আন্দোলনের অংশীদার বাঙালি নেতৃত্বের দেশভাগ-উত্তর হতাশাও ভাষা বিদ্রোহে আগুনের ফুলকি ছড়িয়েছিল। এটা মীমাংসিত সত্য যে, এ দেশের বাঙালি নেতৃত্বই পাকিস্তান আন্দোলনের উদ্যমকে যৌক্তিক পরিণতির দিকে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আটচল্লিশেই কীভাবে সেই নেতৃত্ব পাকিস্তানি শাসকদের ওপর ভীষণভাবে নাখোশ হলো বা হতাশার মেঘ স্বাধীনতার উচ্ছ্বাসে ছায়া ফেলল-তা যথেষ্টই ভেবে দেখার দাবি রাখে। এ কথাও মিথ্যা নয়-বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে অবিভক্ত ভারতের হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কে নানা ভ্রান্তি, ধোঁয়াশা, দ্বন্দ্ব বা সংশয়ের জায়গা তৈরি হয়েছিল। ঊনবিংশ শতকজুড়েই মুসলিম জাতিগোষ্ঠীর মাঝে পৃথক ধর্মীয় জাতিসত্তার উন্মেষ ঘটে। আত্মপরিচয়ের ধারণায় ধর্মীয় সত্তা জায়গা নিতে শুরু করে। কংগ্রেসের অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদ মুসলিম জনগোষ্ঠীকে সেভাবে আকৃষ্ট করেনি। এমন বোধের জন্ম হতে শুরু করে যে, ঐতিহাসিক সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে মুসলিমরা পৃথক রাষ্ট্র গঠনে সক্ষম।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি সমাজ মানসে ঘনিয়ে আসা এ বিভেদকে কাজে লাগাতে শুরু করে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত অবিভক্ত বাংলায় সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের অস্পষ্ট রেখাকে ক্রমেই স্পষ্ট করে তোলে। ১৯০৬ সালেই মুসলিম লীগ এ নতুন রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে মাঠে নামে। স্যার সৈয়দ আহমদ খান পৃথক ধর্মীয় জাতিসত্তার যে বৌদ্ধিক ধারণার সূত্রপাত করেছিলেন, তা ঔপনিবেশিক শাসকদের প্রশ্রয়ে ক্রমশ পুষ্ট হতে থাকে। ১৯৩০ সালে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব স্যার মুহাম্মদ ইকবাল দ্বি-জাতিতত্ত্বের তাত্ত্বিক কাঠামো উপস্থাপন করেন। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলা বিশেষ করে পূর্ব বাংলায় মুসলমান জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ যেমন ছিল কৃষক, অন্যদিকে ভূ-স্বামীদের সিংহভাগই ছিল হিন্দু জমিদার। ফলে শ্রেণিগত বৈষম্যের বোধও এই সাধারণ জনগোষ্ঠীর মাঝে জন্ম নেওয়া অস্বাভাবিক নয়। এর সঙ্গে হিন্দু সমাজে বিদ্যমান বর্ণবৈষম্য, জাত-পাতের ভেদমন্ত্র সমাজের গভীরেও কিছু ক্ষতচিহ্নের সৃষ্টি করেছিল। নানা কারণে জীবন ও জীবনধারণ সম্পর্কে দুটি জাতির মধ্যে ধারণা ও অনুশীলনগত দূরত্ব বাড়ছিল। পারস্পরিক দ্বন্দ্বপূর্ণ বিশ্বাস ও জীবনব্যবস্থার কিছু বৈপরীত্য মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিরোধের ক্ষেত্রকে উর্বর করে রেখেছিল। ফলে ব্রিটিশ প্রশ্রয় বিভাজনের প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অনুঘটকের কাজ করে। কিন্তু ধর্মের নামে দেশ বিভাগ শুধু বাস্তুহারা মানুষের অস্তিত্বকে বিপন্ন করেনি, পাকিস্তানি সুবিধাভোগী, বিত্তশালী শ্রেণির কায়েমি স্বার্থকে ক্রমাগত পুষ্ট করেছে। আর ঔপনিবেশিক কায়দায় সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের সীমাহীন লালসা বাঙালি নেতৃত্বকে যে হতাশ করেছিল-সে বিষয়ে কোনো সংশয় নেই।

তবে একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, তৎকালীন হিন্দু সামন্তশ্রেণি অনেক ক্ষেত্রে কৃষক নিগ্রহ, কর্তৃত্ব, ক্ষমতা ও দম্ভের জন্য নিন্দিত হয়েছে। তবে বিপরীত চিত্রটিও উপেক্ষার নয়- তাদের শিক্ষানুরাগ বা বিদ্যোৎসাহী নানা অবদানের ফলস্বরূপ এ দেশের বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্প-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা বিশেষ করে শিক্ষা কাঠামোর একটা গ্রহণযোগ্য মান প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। তাদের অবদান কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে; আজকের নব্য ধনীদের ক্ষেত্রে যা একদমই বিরল। এ কালের নব্য সামন্ত প্রভুরা কর্তৃত্ব ও ভোগের উত্তরাধিকার ঠিকই বহন করছে, কিন্তু ত্যাগের শিক্ষাটুকুর লেশমাত্র তারা নিতে পারেনি। যার প্রমাণ শুধু শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সংস্কৃতি জগতে হাল আমলে তাদের নগণ্য উপস্থিতি নয়, বৈশ্বিক মহামারিকবলিত সমাজেও তাদের ভোগ ও প্রদর্শনের নজির লজ্জার সীমানা পেরিয়েছে। ত্যাগের ছিটেফোঁটাও চোখে পড়েনি।

এ কথা ভুললেও চলবে না যে, কিছু বঞ্চনা, বৈষম্য ও বিভেদের উপকরণ দেশভাগপূর্ব বঙ্গীয় সমাজে ক্রিয়াশীল থাকলেও সামাজিক সম্প্রীতি, আদান-প্রদান ও সহনশীলতার পরিবেশও ছিল লক্ষণীয়। বিশেষ করে ধর্মীয় উৎসবগুলোতে উভয় সম্প্রদায় মিলনের উদ্ভাসে জীবনের উদ্যাপনে মেতে উঠত। এ ছাড়া অনেক সামাজিক উৎসব ছিল চরিত্রগতভাবেই ধর্মনিরপেক্ষ, ঋতুধর্মী মেলা, সামাজিক পার্বণ, জন্ম বার্ষিকী কিংবা শিল্প সাহিত্যের নানা উপলক্ষ্য ঘিরে আছড়ে পড়া অবিশ্রান্ত জনস্রোত শুদ্ধতর চেতনার রঙে মূর্ত হয়ে উঠত। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামও এই দুই সম্প্রদায়ের ঐক্য ও জাতিগত সম্প্রীতিকে আরও জোরদার করেছিল। তবে হিন্দু ও মুসলিম-উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই এক ধরনের বিভেদকামী, কায়েমি শক্তির উত্থান এ সৌহার্দ্যকে টেকসই করার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর এটা ছিল ভারতবর্ষের ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠায় সংকল্পবদ্ধ গান্ধী, নেহেরু, সুভাষ বোস, চিত্তরঞ্জন, মাওলানা আজাদের মতো রাজনীতিক বা রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-শরৎ-জীবনানন্দের মতো কবি সাহিত্যিকদের জন্য চ্যালেঞ্জ। তবে ইতিহাসের অস্পষ্ট একটা অধ্যায়ে বীভৎস সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ধর্মভিত্তিক এ বিভক্তিকে অনিবার্য করে তুলেছিল-এ কথাও সত্যি।

ইতিহাসের গতিপথ পর্যালোচনায় আজ একটা প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খায়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ধারণা তাহলে কি একটি দার্শনিক ভ্রান্তি? যে যুক্তিতে দেশবিভাগ সম্পন্ন হল বিশেষ করে জিন্নাহ্ সাহেব তথাকথিত সামাজিক, সাংস্কৃতিক বৈপরীত্য মুছে ফেলার যে অঙ্গীকার করে ক্ষমতার মসনদে বসলেন, ৪৭-এ স্বাধীনতা দিবসের প্রথম প্রহরেই তিনি ব্যক্ত করলেন ভিন্ন চিন্তা, ইঙ্গিত দিলেন ভিন্ন দর্শন। ঘোষণা করলেন নতুন অবস্থান; যা দ্বি-জাতিতত্ত্বের সঙ্গে সংঘর্ষপূর্ণ। ঘোষণা করলেন-দেশ সবার। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান-সবার। তাহলে কেন সেই ৪৬-এর দাঙ্গা, গোটা উপমহাদেশজুড়ে কেন আজও যুদ্ধ, ধ্বংস, ঘৃণা ও আত্মঘাতী লড়াইয়ের লেগ্যাসি বহমান, কোটি কোটি মানুষ উদ্বাস্তু, কত স্বপ্ন ভেঙে ছারখার, আর্থিক-সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক নিপীড়ন বিস্তৃত হয়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।

জিন্নাহ্র এ আদর্শিক পিছুটানের কারণ ছিল। একদিকে উদ্বাস্তু মানুষের বর্ধনশীল কাফেলা, অন্যদিকে ধর্মের নামে বিভক্তি আদায় করেও জনগোষ্ঠীর বিপুল অংশকে ঠাঁই দেওয়ার অক্ষমতা। দেখা গেল, পাকিস্তান সৃষ্টির পর পাকিস্তানের চেয়ে ভারতেই থেকে গেল বেশি মুসলমান। তারা যথারীতি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীতে পরিণত হলো। যদিও একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার আশ্বাসে তারা মূল বিস্তারের তাৎক্ষণিক সুযোগ পেয়েছিল, যা পাকিস্তান রাষ্ট্রে ঘটেনি। শত্রুসম্পত্তি আইন বা বিভিন্ন নিবর্তনমূলক প্রক্রিয়ায় পশ্চিম পাকিস্তানকে দ্রুত সংখ্যালঘুমুক্ত করা সম্ভব হলেও সে দেশে সামাজিক শান্তি ও দেশজ প্রগতির ধারা অব্যাহত রাখার স্বপ্ন দুরস্তই থেকে গেছে। গাঙ্গেয় উপত্যকায় এমন প্রতিক্রিয়া বা ঘৃণার উপাদান কম থাকায় সংখ্যালঘু বিতাড়ন প্রক্রিয়া ততটা বেগবান বা আগ্রাসী হয়নি। পক্ষান্তরে বাংলায় দেখা গেল বাঙালি-অবাঙালি বিরোধ ধর্মীয় মিলনকে ছাপিয়ে গেছে। ৫২, ৬২, ৬৬, ৬৯, ৭১-এর পটভূমি ক্রমাগত এ দ্বন্দ্বের জমিকে প্রশস্তই করল। দ্বিজাতিতত্ত্ব শুধু খান খান হয়নি, দাবি এলো অধিকারের। সংস্কৃতির নয়। বৈষম্যের বিস্তার তো কমলই না। বরং আড়ে-বহরে তা বৃদ্ধি পেল। স্বাধীন দেশে এমন ধনবৈষম্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল-আসল দ্বন্দ্ব ধর্মের নয়, অর্থনীতিতে।

অন্যদিকে হাজার হাজার মাইল দূরের বিজাতীয় সংস্কৃতি, দুর্বোধ্য ভাষাকে নিজের ভেবে আপনকে দূরে ঠেলে দিয়েছি। আমরা কি বাঙালি নাকি মুসলমান-সে দ্বিধায় ভুগেছি বহুকাল। সে অস্পষ্ট ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদই আজ বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। এতে পশ্চিমবঙ্গীয় কোনো পক্ষও হয়তো স্বস্তি পেয়ে থাকবে। আসলে কোথাও কোথাও মিল আছে দুপক্ষেরই। দৃষ্টিভঙ্গির ভ্রান্তিও একই রকম। যেমন মুসলমানকে অবাঙালি হিসাবে দাগিয়ে দিয়েও একশ্রেণির হিন্দু নতুন বয়ান তৈরি করেছিল। মুসলিমদেরও একাংশ একইভাবে মরু দেশের ভাষা, সংস্কৃতি জীবনযাপনের পদ্ধতিকে নিজের ভেবে ভ্রান্তির বলয়ে আবর্তিত হয়েছে।

তবে এটিও ঐতিহাসিক বাস্তবতা, ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল থেকে মুক্তির আকাক্সক্ষা দেশবিভাগ পরবর্তী সময়ে এমন এক জাতীয়তাবাদী আবেগের সূত্রপাত ঘটিয়েছিল যা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ভাষাভিত্তিক চেতনার উন্মেষকে অনিবার্য করে তুলেছিল। ভারতের পরিণত নেতৃত্ব সুদৃঢ় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্তর্গত শক্তি নিয়ে তা মোকাবিলা করেছে। পাকিস্তানের কর্তৃত্ববাদী শাসনযন্ত্র যা পারেনি। ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে ভারতের মারাঠি, গুজরাটি, ওড়িয়া, অহমিয়া, কন্নর, মালায়ালাম ভাষাভাষীরাও একই রকম দাবি তুলেছিল। ভারতীয় রাজনীতিক ও আমলারাও সতর্ক ছিলেন-ভাষার যেমন বাঁধার ক্ষমতা আছে, তেমনি ভাঙার ক্ষমতাও আছে। দক্ষিণ ভারতে তেলেগুভাষীদের দাবির কাছে নত হয়ে নেহেরু অন্ধ্রের পৃথক রাজ্যের দাবিও মেনে নেন। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, ভারতের এ ভাষাভিত্তিক পুনর্গঠন কার্যত ভারতের ঐক্যকে আরও মজবুত করেছিল। গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের দূরদৃষ্টি ভারতের ক্ষেত্রে যেভাবে কাজ করেছিল, পাকিস্তানের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনযন্ত্র তা করতে ব্যর্থ হয়। কর্তৃত্ববাদী একগুঁয়ে শক্তি যখন সব শক্তির নিয়ামক হয়ে ওঠে, সামাজিক বিন্যাসে শুধু সুযোগের বৈষম্য সৃষ্টি হয় না, শোষিত জনগোষ্ঠী শাসন কাঠামোয় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে।

৬০-৭০ দশকে বাঙালির জাতীয়তাবাদের প্রতীক ছিল ভাষা। বাংলাভাষা বাঙালিদের মতোই মিশ্র প্রকৃতির। আরবি, ফারসি, হিন্দি, উর্দু, সংস্কৃত, ইংরেজি, ওলন্দাজ-সব উৎস থেকেই শব্দ আত্তীকৃত হয়েছে এ ভাষায়। এটি কোনো ভাষার দুর্বলতা নয়, বরং তার অন্তর্গত সৌন্দর্য, অনবদ্য ভাষাবৈচিত্র্য; যা অন্য প্রাণী বা জীবকুলের মধ্যে দেখা যায় না। ভাষার মধ্যেই ভেসে ওঠে নির্দিষ্ট জাতির রুচি, আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য। ভাষার সঙ্গেই মিশে থাকে আবেগ আর অভিমান; সেখানে আঘাত করা মানেই জাতিসত্তার মর্মমূলে আঘাত, তার অস্তিত্বকে ধ্বংস করা। আর ঔপনিবেশিক শাসকের চিরায়ত কৌশল-শাসিতের ভাষাকে আক্রমণ করা। কারণ সেখানেই লুকিয়ে থাকে জাতির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর ইতিহাস।

ভাষা পরস্পরের ভাব প্রকাশের মাধ্যম। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার জন্যই হয়তো মানুষ ভাষা শিখেছে। ভাব বিনিময়ে বাধ্য হয়েই ভাষাকে বাহন মেনেছে। কালের নিয়মে ভাষায়ও এসেছে বিবর্তন। ব্রাহ্মীলিপি থেকে বাংলালিপি। চর্যাপদ থেকে আধুনিক বাংলা। প্রায় ৩০০০ বছরজুড়ে চলেছে রূপান্তরের এ পরিক্রমা। অনেক ভাষার নিজের বর্ণমালাই নেই, বাংলার তা আছে। শুধু এখানে নয়; সাহিত্য, ইতিহাস, সংবাদপত্র, গান-সর্বত্রই বাঙালির ঐতিহ্য, আভিজাত্যের স্বাক্ষর। হয়তো এভাবেই বাঙালির মনোভূমিতে গড়ে ওঠে অনন্য এক উপলব্ধি, এক ধরনের শ্লাঘা। বুদ্ধিপ্রদ, উজ্জ্বল এ সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী আমরা সবাই। একুশ তাই আমাদের আকূল করে, বেদনা ও অহঙ্কারের মিশ্রস্রোত আমাদের চেতনাকে রঞ্জিত করে, বাঙালির আবেগ রাষ্ট্রের সীমানা ছাপিয়ে যায়, বাঙালিয়ানা এক মহত্তর শিল্পসত্তায় উত্তীর্ণ হয়। সংকীর্ণ রাজনীতির যুক্তি যেখানে ম্লান হয়ে পড়ে; বহুত্ব, শুদ্ধতা ও ন্যায্যতার যুক্তি সেখানে প্রবল হয়ে ওঠে।

অমিত রায় চৌধুরী : সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ

principalffmmc@gmail.com

দেশভাগ ও ভাষাযুদ্ধ

 অমিতরায় চৌধুরী 
২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ভাষা আন্দোলনের পটভূমি, গতিপ্রকৃতি কিংবা গভীরতা অনুধাবনের জন্য দেশভাগের পর পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান সামাজিক ও আর্থিক অসাম্যের ইতিবৃত্ত আলোচনায় একটা নতুন মাত্রা দিতে পারে। পাকিস্তানের উর্দুভাষী জনসংখ্যা ছিল ৭.১ শতাংশ, কিন্তু সামাজিকভাবে তারাই দেশের আমলাতন্ত্র, রাজনীতি কিংবা ব্যবসায়-সব খানেই কর্তৃত্ব কায়েম করেছিল। মজার ব্যাপার-এরা অধিকাংশই ছিল উত্তর ভারত থেকে আসা অভিজাত সম্প্রদায়। সেনাবাহিনীতেও আধিপত্য ছিল সামন্ত জমিদার শ্রেণির।

৫৪.৬ শতাংশ পাকিস্তানি বাংলাভাষী হলেও তাদের বৃহত্তর অংশ ছিল অনগ্রসর, বৈষম্যক্লিষ্ট কৃষক। উর্দু বনাম বাংলার এই স্নায়ুযুদ্ধে আর্থিক বিভাজন নির্ণায়ক হয়ে উঠেছিল। বলা বাহুল্য-এ বৈষম্য বাঙালি সত্তাকে জাগিয়ে তুলেছিল। ১৯৪৮ সালে সৈয়দ মুজতবা আলীও সতর্ক করেছিলেন পাক নেতৃত্বের এ ভাষাবিদ্বেষ অব্যাহত থাকলে পূর্ব পাকিস্তান রাজনৈতিক স্বাধীনতার পথে পা বাড়াবে। ইতিহাস বলে-ভাষার জন্য গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক আন্দোলনই ক্রমশ রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। আওয়ামী লীগও এ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দিশা, পরিচিতি ও শক্তি সঞ্চয় করে। চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের অমর ছায়াছবি, আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর কালজয়ী গান ও আলতাফ মাহমুদের সুর বাঙালি মননে অবিনশ্বর শক্তি ও অবিশ্বাস্য আবেগ সঞ্চার করে।

আগেই উল্লেখ করেছি, ভাষা আন্দোলনের শক্তি শুধু আবেগ থেকেই উৎসারিত হয়নি, পাকিস্তান আন্দোলনের অংশীদার বাঙালি নেতৃত্বের দেশভাগ-উত্তর হতাশাও ভাষা বিদ্রোহে আগুনের ফুলকি ছড়িয়েছিল। এটা মীমাংসিত সত্য যে, এ দেশের বাঙালি নেতৃত্বই পাকিস্তান আন্দোলনের উদ্যমকে যৌক্তিক পরিণতির দিকে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আটচল্লিশেই কীভাবে সেই নেতৃত্ব পাকিস্তানি শাসকদের ওপর ভীষণভাবে নাখোশ হলো বা হতাশার মেঘ স্বাধীনতার উচ্ছ্বাসে ছায়া ফেলল-তা যথেষ্টই ভেবে দেখার দাবি রাখে। এ কথাও মিথ্যা নয়-বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে অবিভক্ত ভারতের হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কে নানা ভ্রান্তি, ধোঁয়াশা, দ্বন্দ্ব বা সংশয়ের জায়গা তৈরি হয়েছিল। ঊনবিংশ শতকজুড়েই মুসলিম জাতিগোষ্ঠীর মাঝে পৃথক ধর্মীয় জাতিসত্তার উন্মেষ ঘটে। আত্মপরিচয়ের ধারণায় ধর্মীয় সত্তা জায়গা নিতে শুরু করে। কংগ্রেসের অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদ মুসলিম জনগোষ্ঠীকে সেভাবে আকৃষ্ট করেনি। এমন বোধের জন্ম হতে শুরু করে যে, ঐতিহাসিক সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে মুসলিমরা পৃথক রাষ্ট্র গঠনে সক্ষম।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি সমাজ মানসে ঘনিয়ে আসা এ বিভেদকে কাজে লাগাতে শুরু করে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত অবিভক্ত বাংলায় সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের অস্পষ্ট রেখাকে ক্রমেই স্পষ্ট করে তোলে। ১৯০৬ সালেই মুসলিম লীগ এ নতুন রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে মাঠে নামে। স্যার সৈয়দ আহমদ খান পৃথক ধর্মীয় জাতিসত্তার যে বৌদ্ধিক ধারণার সূত্রপাত করেছিলেন, তা ঔপনিবেশিক শাসকদের প্রশ্রয়ে ক্রমশ পুষ্ট হতে থাকে। ১৯৩০ সালে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব স্যার মুহাম্মদ ইকবাল দ্বি-জাতিতত্ত্বের তাত্ত্বিক কাঠামো উপস্থাপন করেন। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলা বিশেষ করে পূর্ব বাংলায় মুসলমান জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ যেমন ছিল কৃষক, অন্যদিকে ভূ-স্বামীদের সিংহভাগই ছিল হিন্দু জমিদার। ফলে শ্রেণিগত বৈষম্যের বোধও এই সাধারণ জনগোষ্ঠীর মাঝে জন্ম নেওয়া অস্বাভাবিক নয়। এর সঙ্গে হিন্দু সমাজে বিদ্যমান বর্ণবৈষম্য, জাত-পাতের ভেদমন্ত্র সমাজের গভীরেও কিছু ক্ষতচিহ্নের সৃষ্টি করেছিল। নানা কারণে জীবন ও জীবনধারণ সম্পর্কে দুটি জাতির মধ্যে ধারণা ও অনুশীলনগত দূরত্ব বাড়ছিল। পারস্পরিক দ্বন্দ্বপূর্ণ বিশ্বাস ও জীবনব্যবস্থার কিছু বৈপরীত্য মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিরোধের ক্ষেত্রকে উর্বর করে রেখেছিল। ফলে ব্রিটিশ প্রশ্রয় বিভাজনের প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অনুঘটকের কাজ করে। কিন্তু ধর্মের নামে দেশ বিভাগ শুধু বাস্তুহারা মানুষের অস্তিত্বকে বিপন্ন করেনি, পাকিস্তানি সুবিধাভোগী, বিত্তশালী শ্রেণির কায়েমি স্বার্থকে ক্রমাগত পুষ্ট করেছে। আর ঔপনিবেশিক কায়দায় সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের সীমাহীন লালসা বাঙালি নেতৃত্বকে যে হতাশ করেছিল-সে বিষয়ে কোনো সংশয় নেই।

তবে একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, তৎকালীন হিন্দু সামন্তশ্রেণি অনেক ক্ষেত্রে কৃষক নিগ্রহ, কর্তৃত্ব, ক্ষমতা ও দম্ভের জন্য নিন্দিত হয়েছে। তবে বিপরীত চিত্রটিও উপেক্ষার নয়- তাদের শিক্ষানুরাগ বা বিদ্যোৎসাহী নানা অবদানের ফলস্বরূপ এ দেশের বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্প-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা বিশেষ করে শিক্ষা কাঠামোর একটা গ্রহণযোগ্য মান প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। তাদের অবদান কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে; আজকের নব্য ধনীদের ক্ষেত্রে যা একদমই বিরল। এ কালের নব্য সামন্ত প্রভুরা কর্তৃত্ব ও ভোগের উত্তরাধিকার ঠিকই বহন করছে, কিন্তু ত্যাগের শিক্ষাটুকুর লেশমাত্র তারা নিতে পারেনি। যার প্রমাণ শুধু শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সংস্কৃতি জগতে হাল আমলে তাদের নগণ্য উপস্থিতি নয়, বৈশ্বিক মহামারিকবলিত সমাজেও তাদের ভোগ ও প্রদর্শনের নজির লজ্জার সীমানা পেরিয়েছে। ত্যাগের ছিটেফোঁটাও চোখে পড়েনি।

এ কথা ভুললেও চলবে না যে, কিছু বঞ্চনা, বৈষম্য ও বিভেদের উপকরণ দেশভাগপূর্ব বঙ্গীয় সমাজে ক্রিয়াশীল থাকলেও সামাজিক সম্প্রীতি, আদান-প্রদান ও সহনশীলতার পরিবেশও ছিল লক্ষণীয়। বিশেষ করে ধর্মীয় উৎসবগুলোতে উভয় সম্প্রদায় মিলনের উদ্ভাসে জীবনের উদ্যাপনে মেতে উঠত। এ ছাড়া অনেক সামাজিক উৎসব ছিল চরিত্রগতভাবেই ধর্মনিরপেক্ষ, ঋতুধর্মী মেলা, সামাজিক পার্বণ, জন্ম বার্ষিকী কিংবা শিল্প সাহিত্যের নানা উপলক্ষ্য ঘিরে আছড়ে পড়া অবিশ্রান্ত জনস্রোত শুদ্ধতর চেতনার রঙে মূর্ত হয়ে উঠত। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামও এই দুই সম্প্রদায়ের ঐক্য ও জাতিগত সম্প্রীতিকে আরও জোরদার করেছিল। তবে হিন্দু ও মুসলিম-উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই এক ধরনের বিভেদকামী, কায়েমি শক্তির উত্থান এ সৌহার্দ্যকে টেকসই করার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর এটা ছিল ভারতবর্ষের ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠায় সংকল্পবদ্ধ গান্ধী, নেহেরু, সুভাষ বোস, চিত্তরঞ্জন, মাওলানা আজাদের মতো রাজনীতিক বা রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-শরৎ-জীবনানন্দের মতো কবি সাহিত্যিকদের জন্য চ্যালেঞ্জ। তবে ইতিহাসের অস্পষ্ট একটা অধ্যায়ে বীভৎস সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ধর্মভিত্তিক এ বিভক্তিকে অনিবার্য করে তুলেছিল-এ কথাও সত্যি।

ইতিহাসের গতিপথ পর্যালোচনায় আজ একটা প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খায়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ধারণা তাহলে কি একটি দার্শনিক ভ্রান্তি? যে যুক্তিতে দেশবিভাগ সম্পন্ন হল বিশেষ করে জিন্নাহ্ সাহেব তথাকথিত সামাজিক, সাংস্কৃতিক বৈপরীত্য মুছে ফেলার যে অঙ্গীকার করে ক্ষমতার মসনদে বসলেন, ৪৭-এ স্বাধীনতা দিবসের প্রথম প্রহরেই তিনি ব্যক্ত করলেন ভিন্ন চিন্তা, ইঙ্গিত দিলেন ভিন্ন দর্শন। ঘোষণা করলেন নতুন অবস্থান; যা দ্বি-জাতিতত্ত্বের সঙ্গে সংঘর্ষপূর্ণ। ঘোষণা করলেন-দেশ সবার। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান-সবার। তাহলে কেন সেই ৪৬-এর দাঙ্গা, গোটা উপমহাদেশজুড়ে কেন আজও যুদ্ধ, ধ্বংস, ঘৃণা ও আত্মঘাতী লড়াইয়ের লেগ্যাসি বহমান, কোটি কোটি মানুষ উদ্বাস্তু, কত স্বপ্ন ভেঙে ছারখার, আর্থিক-সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক নিপীড়ন বিস্তৃত হয়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।

জিন্নাহ্র এ আদর্শিক পিছুটানের কারণ ছিল। একদিকে উদ্বাস্তু মানুষের বর্ধনশীল কাফেলা, অন্যদিকে ধর্মের নামে বিভক্তি আদায় করেও জনগোষ্ঠীর বিপুল অংশকে ঠাঁই দেওয়ার অক্ষমতা। দেখা গেল, পাকিস্তান সৃষ্টির পর পাকিস্তানের চেয়ে ভারতেই থেকে গেল বেশি মুসলমান। তারা যথারীতি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীতে পরিণত হলো। যদিও একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার আশ্বাসে তারা মূল বিস্তারের তাৎক্ষণিক সুযোগ পেয়েছিল, যা পাকিস্তান রাষ্ট্রে ঘটেনি। শত্রুসম্পত্তি আইন বা বিভিন্ন নিবর্তনমূলক প্রক্রিয়ায় পশ্চিম পাকিস্তানকে দ্রুত সংখ্যালঘুমুক্ত করা সম্ভব হলেও সে দেশে সামাজিক শান্তি ও দেশজ প্রগতির ধারা অব্যাহত রাখার স্বপ্ন দুরস্তই থেকে গেছে। গাঙ্গেয় উপত্যকায় এমন প্রতিক্রিয়া বা ঘৃণার উপাদান কম থাকায় সংখ্যালঘু বিতাড়ন প্রক্রিয়া ততটা বেগবান বা আগ্রাসী হয়নি। পক্ষান্তরে বাংলায় দেখা গেল বাঙালি-অবাঙালি বিরোধ ধর্মীয় মিলনকে ছাপিয়ে গেছে। ৫২, ৬২, ৬৬, ৬৯, ৭১-এর পটভূমি ক্রমাগত এ দ্বন্দ্বের জমিকে প্রশস্তই করল। দ্বিজাতিতত্ত্ব শুধু খান খান হয়নি, দাবি এলো অধিকারের। সংস্কৃতির নয়। বৈষম্যের বিস্তার তো কমলই না। বরং আড়ে-বহরে তা বৃদ্ধি পেল। স্বাধীন দেশে এমন ধনবৈষম্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল-আসল দ্বন্দ্ব ধর্মের নয়, অর্থনীতিতে।

অন্যদিকে হাজার হাজার মাইল দূরের বিজাতীয় সংস্কৃতি, দুর্বোধ্য ভাষাকে নিজের ভেবে আপনকে দূরে ঠেলে দিয়েছি। আমরা কি বাঙালি নাকি মুসলমান-সে দ্বিধায় ভুগেছি বহুকাল। সে অস্পষ্ট ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদই আজ বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। এতে পশ্চিমবঙ্গীয় কোনো পক্ষও হয়তো স্বস্তি পেয়ে থাকবে। আসলে কোথাও কোথাও মিল আছে দুপক্ষেরই। দৃষ্টিভঙ্গির ভ্রান্তিও একই রকম। যেমন মুসলমানকে অবাঙালি হিসাবে দাগিয়ে দিয়েও একশ্রেণির হিন্দু নতুন বয়ান তৈরি করেছিল। মুসলিমদেরও একাংশ একইভাবে মরু দেশের ভাষা, সংস্কৃতি জীবনযাপনের পদ্ধতিকে নিজের ভেবে ভ্রান্তির বলয়ে আবর্তিত হয়েছে।

তবে এটিও ঐতিহাসিক বাস্তবতা, ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল থেকে মুক্তির আকাক্সক্ষা দেশবিভাগ পরবর্তী সময়ে এমন এক জাতীয়তাবাদী আবেগের সূত্রপাত ঘটিয়েছিল যা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ভাষাভিত্তিক চেতনার উন্মেষকে অনিবার্য করে তুলেছিল। ভারতের পরিণত নেতৃত্ব সুদৃঢ় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্তর্গত শক্তি নিয়ে তা মোকাবিলা করেছে। পাকিস্তানের কর্তৃত্ববাদী শাসনযন্ত্র যা পারেনি। ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে ভারতের মারাঠি, গুজরাটি, ওড়িয়া, অহমিয়া, কন্নর, মালায়ালাম ভাষাভাষীরাও একই রকম দাবি তুলেছিল। ভারতীয় রাজনীতিক ও আমলারাও সতর্ক ছিলেন-ভাষার যেমন বাঁধার ক্ষমতা আছে, তেমনি ভাঙার ক্ষমতাও আছে। দক্ষিণ ভারতে তেলেগুভাষীদের দাবির কাছে নত হয়ে নেহেরু অন্ধ্রের পৃথক রাজ্যের দাবিও মেনে নেন। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, ভারতের এ ভাষাভিত্তিক পুনর্গঠন কার্যত ভারতের ঐক্যকে আরও মজবুত করেছিল। গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের দূরদৃষ্টি ভারতের ক্ষেত্রে যেভাবে কাজ করেছিল, পাকিস্তানের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনযন্ত্র তা করতে ব্যর্থ হয়। কর্তৃত্ববাদী একগুঁয়ে শক্তি যখন সব শক্তির নিয়ামক হয়ে ওঠে, সামাজিক বিন্যাসে শুধু সুযোগের বৈষম্য সৃষ্টি হয় না, শোষিত জনগোষ্ঠী শাসন কাঠামোয় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে।

৬০-৭০ দশকে বাঙালির জাতীয়তাবাদের প্রতীক ছিল ভাষা। বাংলাভাষা বাঙালিদের মতোই মিশ্র প্রকৃতির। আরবি, ফারসি, হিন্দি, উর্দু, সংস্কৃত, ইংরেজি, ওলন্দাজ-সব উৎস থেকেই শব্দ আত্তীকৃত হয়েছে এ ভাষায়। এটি কোনো ভাষার দুর্বলতা নয়, বরং তার অন্তর্গত সৌন্দর্য, অনবদ্য ভাষাবৈচিত্র্য; যা অন্য প্রাণী বা জীবকুলের মধ্যে দেখা যায় না। ভাষার মধ্যেই ভেসে ওঠে নির্দিষ্ট জাতির রুচি, আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য। ভাষার সঙ্গেই মিশে থাকে আবেগ আর অভিমান; সেখানে আঘাত করা মানেই জাতিসত্তার মর্মমূলে আঘাত, তার অস্তিত্বকে ধ্বংস করা। আর ঔপনিবেশিক শাসকের চিরায়ত কৌশল-শাসিতের ভাষাকে আক্রমণ করা। কারণ সেখানেই লুকিয়ে থাকে জাতির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর ইতিহাস।

ভাষা পরস্পরের ভাব প্রকাশের মাধ্যম। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার জন্যই হয়তো মানুষ ভাষা শিখেছে। ভাব বিনিময়ে বাধ্য হয়েই ভাষাকে বাহন মেনেছে। কালের নিয়মে ভাষায়ও এসেছে বিবর্তন। ব্রাহ্মীলিপি থেকে বাংলালিপি। চর্যাপদ থেকে আধুনিক বাংলা। প্রায় ৩০০০ বছরজুড়ে চলেছে রূপান্তরের এ পরিক্রমা। অনেক ভাষার নিজের বর্ণমালাই নেই, বাংলার তা আছে। শুধু এখানে নয়; সাহিত্য, ইতিহাস, সংবাদপত্র, গান-সর্বত্রই বাঙালির ঐতিহ্য, আভিজাত্যের স্বাক্ষর। হয়তো এভাবেই বাঙালির মনোভূমিতে গড়ে ওঠে অনন্য এক উপলব্ধি, এক ধরনের শ্লাঘা। বুদ্ধিপ্রদ, উজ্জ্বল এ সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী আমরা সবাই। একুশ তাই আমাদের আকূল করে, বেদনা ও অহঙ্কারের মিশ্রস্রোত আমাদের চেতনাকে রঞ্জিত করে, বাঙালির আবেগ রাষ্ট্রের সীমানা ছাপিয়ে যায়, বাঙালিয়ানা এক মহত্তর শিল্পসত্তায় উত্তীর্ণ হয়। সংকীর্ণ রাজনীতির যুক্তি যেখানে ম্লান হয়ে পড়ে; বহুত্ব, শুদ্ধতা ও ন্যায্যতার যুক্তি সেখানে প্রবল হয়ে ওঠে।

অমিত রায় চৌধুরী : সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ

principalffmmc@gmail.com