বাংলাকে বেঁধে ফেলার চেষ্টা কি সফল হবে?
jugantor
বাংলাকে বেঁধে ফেলার চেষ্টা কি সফল হবে?

  ডা. জাহেদ উর রহমান  

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১.

টালত মোর ঘর নাহি পরবেষী

হাড়ীত ভাত নাঁহি নিতি আবেশী।

২.

ভবণই গহণগম্ভীরা বেগেঁ বাহী

দুআন্তে চিখিল মাঝেঁ ন ঠাহী।

৩.

দুলি দুহি পিটা ধরণ ন জাই

রুখের তেন্তুলি কুম্ভীরে খাঅ।

বোঝা গেল ‘বাংলা ভাষা’য় রচিত এ পঙ্ক্তিগুলোর মানে? কেউ কেউ হয়তো বুঝে ফেলেছেন, এগুলো চর্যাপদ থেকে নেওয়া। চর্যাপদের ভাষা আদতে বাংলা কিনা সেই তর্ক কখনো কখনো হলেও দীর্ঘকাল হয়েছে এ তর্ক শেষ হয়েছে এবং সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়েছে, চর্যাপদের ভাষা বাংলা। এটি বাংলা সাহিত্যের আদিতম নমুনা।

ফাস্ট ফরোয়ার্ড করে শপাঁচেক বছর এগিয়ে আসা যাক। আসুন, মহাকবি আলাওল রচিত মহাকাব্য পদ্মাবতীর কিছু পঙ্ক্তি পড়ি :

গুণিগণ থাকন্ত তাহান সভা ভরি।

গীত নাট যন্ত্র বাহি রঙ ঢঙ করি॥

একদিন মহাশয় বসিয়া আসনে।

নানা রস প্রসঙ্গ কহেন্ত গুণিগণে॥

হেনকালে শুনি পদ্মাবতীর কথন।

পরম হরিষ হৈল পাত্রবর মন॥

কৌতুকে আদেশ কৈলা পরম হরিষে

রোসাঙ্গেত আন লোকে না বুঝে এ ভাষ।

পরার রচিলে পুরে সভানের আশ॥

অনেক ভাবিয়া মনে চিন্তিলুঁ উপায়।

তান ভাগ্য যশকীর্তি আছ এ সহায়॥

জানি এবার ভাষাটা আমাদের অনেকের কাছে পরিচিত ঠেকছে; বাংলা বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু এখনকার স্কুল-কলেজে পড়া কিশোর-কিশোরীরা কি পদ্মাবতীর ভাষাও বুঝবে? এগিয়ে আসি আরও অনেকটা, যাদের কথা বলছিলাম, তারা কি সহজে বুঝতে পারবে মোটামুটি দেড়শ বছর আগে লেখা ‘কপালকুন্ডলা’ কিংবা ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্যও?

হাজারখানেক বছরের বিবর্তনে বাংলাভাষা আজ কোথায় চলে এসেছে! হাজার বছর বাদ দেই, কয়েকশ বছর পরে বাংলাভাষীরা আজকের দিনের বাংলা সম্পর্কে কী ভাববে? কিংবা কয়েকশ বছর দূরেই থাকুক, বেশ কয়েক দশক পরও কি এখনকার বাংলা সেই প্রজন্মের কাছে আদৌ পরিচিত ঠেকবে? বর্তমান কালের তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ভাষার পরিবর্তন ঘটবে অতীত ইতিহাসের যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি দ্রুতগতিতে।

ছোটবেলায় আমরা যখন উৎপত্তিগতভাবে বাংলা শব্দের শ্রেণিবিভাগ পড়তাম তখন খুব অবাক হয়ে দেখতাম, ‘খাঁটি বাংলা’ শব্দের সংখ্যা একেবারেই হাতেগোনা। বাংলাভাষার মূল শব্দসম্ভার এসেছে মূলত সংস্কৃত (তৎসম, অর্ধ-তৎসম, তদ্ভব) আর বিদেশি ভাষা থেকে। যথেষ্ট খোঁজাখুঁজি করলে ‘খাঁটি বাংলা’ শব্দের যে তালিকা পাওয়া যায় সেটা কম-বেশি এমন : ‘ঢেঁকি, ঢোল, কাঁটা, খোঁপা, ডিঙি, কুলা, টোপর, খোকা, খুকি, বাখারি, কড়ি, ঝিঙা, কয়লা, কাকা, খবর, খাতা, কামড়, কলা, গয়লা, চঙ্গ, চাউল, ছাই, ঝাল, ঝোল, ঠাটা, ডাগর, ডাহা, ঢিল, পয়লা, চুলা, আড্ডা, ঝানু, ঝোঁপ, ডাঁসা, ডাব, ডাঙর, খোঁড়া, চোঙা, ছাল, ঢিল, মাঠ, মুড়ি, কালা, বউ, চাটাই, খোঁজ, চিংড়ি, কাতলা, ঝিনুক, মেকি, নেড়া, কুলা, ঝাটা, মই, বাদুর, বক, কুকুর, তেঁতুল, গাঁদা, শিকড়, খেয়া, লাঠি, ডাল, কলাকে, ঝাপসা, কচি, ছুটি, ঘুম, দর, গোড়া, ইতি, যাতা, চোঙা, খড়, পেট, কুড়ি, দোয়েল, খবর, খোঁচা, গলা, গোড়া, গঞ্জ, ধুতি, নেকা, বোবা’।

এসব ‘খাঁটি বাংলা’ শব্দ আসলেই ‘খাঁটি বাংলা’ কিনা সেই প্রশ্নও যে নেই তা না। আসলে এসব শব্দের অন্য কোনো নিশ্চিত উৎস পাওয়া যায়নি, তাই। ভাষা তো আসলেই এরকম। নানা ভাষা থেকে শব্দ নিয়ে, প্রকাশভঙ্গি নিয়ে একটা ভাষা সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। সময় যায়, একটা ভাষা তার ব্যবহৃত কিছু শব্দ বাতিল করে, গ্রহণ করে নতুন শব্দ। এ শব্দ গ্রহণ-বর্জন সবসময় যে বিকল্প শব্দ থাকা বা না থাকার কারণে হয়, তা নয়; হয় ব্যবহারের আরামের জন্য। ভাষার শব্দ শুধু মনের ভাব প্রকাশ করলেই হয় না, সেটা ব্যবহারে আরাম হয় কিনা, সেটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ।

স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি শব্দগুলোর ভালো বিকল্প বাংলা শব্দ আছে, যথাক্রমে বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু খুব কম ‘খাঁটি বাংলা প্রেমিক’ এ বাংলা শব্দগুলো বলেন। তেমনি চেয়ার-এর বদলে বলেন না কেদারা। এ রকম অনেক ভূরিভূরি উদাহরণ দেওয়া যায়। অনেকেই বলবেন, ওই শব্দগুলোর উৎপত্তি ইংরেজি থেকে হলেও এগুলো তো এখন বাংলা শব্দ। কথা ঠিক। তাহলে এখন যখন বিকল্প বাংলা শব্দ থাকার পরও একটি ইংরেজি শব্দ বা বাক্যাংশ বাংলায় খুব ব্যবহার করা হয়, তখন সেটাকে কেন আমরা বাংলা বলছি না?

কয়েক বছর আগে নোয়াখালীর গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে অনেকের সঙ্গে নানা বিষয়ে আলাপ করছিলাম। যেহেতু বেশিরভাগ মানুষ ধান চাষের সঙ্গে যুক্ত, স্বাভাবিকভাবেই তাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতাম ধানের ফলনের খবর নিয়ে। সে বছর ধানে পোকার আক্রমণ বেশি হওয়ার কারণে ফলন কম হয়েছিল। আমি অবাক হয়ে দেখলাম অনেকেই বলছে ‘ধানে এইবার টাবল অইছে’। পরে খেয়াল করে দেখেছিলাম একেবারে অশিক্ষিত মানুষের মধ্যেও ‘টাবল’ শব্দটার ব্যবহার আছে। এই শব্দটা কি বাংলা নয়? বা নোয়াখাইল্যা শব্দ নয়?

বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত, প্রচলিত ইংরেজি ডিকশনারিগুলো যখন নতুন সংস্করণ প্রকাশ করে, তখন সেখানে খুব স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় সেই সংস্করণে কোন কোন নতুন শব্দ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। প্রতি সংস্করণের অন্তর্ভুক্ত নতুন শব্দ দেখলে দেখা যাবে, তার বিকল্প ইংরেজি শব্দ প্রায় সব ক্ষেত্রেই আছে, কিন্তু তবুও ইংরেজি ভাষায় নতুন শব্দ প্রবেশ করে। বিভিন্ন ভাষা থেকেই প্রবেশ করে।

আমরা আজ যখন বাংলায় ইংরেজি শব্দ-বাক্যাংশ ঢুকে ভাষাটা ‘বাংরেজি’ হয়ে যাওয়া নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন তখন আরেক নতুন ফেনোমেনোন (আমি ‘প্রপঞ্চ’ বললাম না) আমাদের সমাজে দেখা যাচ্ছে-বাংলায় হিন্দি শব্দের প্রবেশ। হিন্দি ভীষণভাবেই আছে আমাদের সমাজে, থাকবে। তো কী হবে এ প্রবণতার পারিভাষিক নাম? ‘বাংদি’ কিংবা ‘হিংলা’? আজকের বাংলাদেশে অনেক শিশু এবং টিন তাদের ব্যবহৃত বাংলায় হিন্দি ব্যবহার করছে। তো অনেক মানুষ যদি নিয়মিতভাবে ‘নেহি’ (বা অন্য কোনো শব্দ) বলে, তো সেটা কেন বাংলা হবে না?

‘শুদ্ধ/প্রমিত ভাষা’ বলে আসলে পরম/চিরস্থায়ী কিছু নেই। তবে এ ক্ষেত্রে এক ধরনের মান নির্ধারণ করে সেটার সঙ্গে তুলনা করে সেটাকে স্থায়ী করে ফেলার চেষ্টা সমাজে রয়েছে। আবার ইতিহাস বলে, এসব চর্চা কখনো সাফল্য পায়নি। ভাষা তার আপন গতিতেই তার পথ তৈরি করে নিয়েছে। এ সত্য শুধু বাংলার ক্ষেত্রে নয়, প্রযোজ্য সব ভাষার ক্ষেত্রেই। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো এ পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে নিজকে মানিয়ে নেওয়া। অথচ আমরা কয়েক বছর আগে দেখেছিলাম এক বহুজাতিক কোম্পানির উদ্যোগে ‘নিখোঁজ শব্দ’ খুঁজে বের করা হচ্ছিল। ব্যবহারিক উপযোগিতা হারিয়ে যে কোনো ভাষা অনেক শব্দই বর্জন করে; সেগুলো খুঁজে আনার চেষ্টা করা অকাট মূর্খতা।

যৌক্তিক প্রশ্ন আসতেই পারে, ভাষার সব পরিবর্তন কি মেনে নিতেই হবে? ভাষা কি শুধুই মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম? এর মধ্যে কি কোনো রাজনীতি নেই? নেই সাংস্কৃতিক আধিপত্যের পরিকল্পনা? আছে নিশ্চয়ই। কিন্তু সেগুলো থেকে জাতিকে রক্ষা করার পথ জোর খাটিয়ে পছন্দসই ‘বাংলা’ চাপিয়ে দেওয়া নয়। কীভাবে সেটা করতে হবে, সেটা এই কলামের চৌহদ্দির বাইরে।

পছন্দসই বাংলা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা আমরা মাঝে মাঝেই দেখি সরকারের পক্ষ থেকে হয়, হয় সিটি করপোরেশনে থেকেও। এ বছর আরও একটা অদ্ভুত উদাহরণ দেখা গেল। একুশে ফেব্র“য়ারি দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকায় সংবাদ এসেছে শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের দিন বনভোজনের গাড়িতে হিন্দি গান বাজানোর অপরাধে চালককে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। ঘটনাটি পড়ে মনে পড়ল ‘মুতাউইন’-এর কথা।

ধর্মকে ব্যক্তির একেবারে নিজস্ব পর্যায়ে না রেখে রাষ্ট্র তার নিজ এখতিয়ারে নিয়ে সেটার অনুশাসন মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়াটা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মানদণ্ডে চরম কর্তৃত্ববাদী আচরণ। আমরা অনেকেই জানি, এ একবিংশ শতাব্দীতেও পৃথিবীতে এটা আছে-‘নীতি-পুণ্য প্রচার এবং পাপ রোধ’ করার জন্য ধর্মীয় পুলিশ সেটাই করে জনগণের সঙ্গে। কয়েকটি দেশে থাকলেও সৌদি আরবের ধর্মীয় পুলিশ ‘মুতাউইন’ খুব আলোচিত, কুখ্যাত (কিংবা বিখ্যাত)।

রাষ্ট্র তার নাগরিকের ওপর ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে সংঘটিত আন্দোলনের স্মরণে আমরা ২১ ফেব্র“য়ারি পালন করছি। আজ সরকার, কিছু প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি আমাদের ওপরও ‘ভাষা চাপিয়ে’ দিতে চাইছে। তারা সবাই তো খুশি হবে ‘মুতাউইন’-এর আদলে ভাষা-পুলিশ বানিয়ে আমাদের ভাষার শুদ্ধতা নিশ্চিত করতে। মানি ‘মুতাউইন’-এর কথা বলাটায় এক ধরনের অতিরঞ্জন আছে; কিন্তু ভাষার তথাকথিত মান রক্ষার নামে এ রাষ্ট্র কিছু প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তির সহায়তায় আমার এমন কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে যার এখতিয়ার তার নেই? কিন্তু আমাদের অনেকেই এ প্রবণতাকে সমর্থন করছেন কিংবা নীরব থাকছেন; কিন্তু প্রতিবাদ করছেন খুব কম মানুষ। অথচ এর প্রতিবাদ হওয়া উচিত ছিল তীব্রভাবে।

বাংলা ঠিক আর কতদিন টিকে থাকবে, জানি না। ভাষার টিকে থাকার ব্যাপারে যেসব প্রথাগত হিসাব-নিকাশ ছিল, সেসব তথ্যপ্রযুক্তির প্রবল স্রোতের সামনে দাঁড়িয়ে একইরকমভাবে আর প্রযোজ্য হতে পারে না। তবে এটা বলাই যায়, বাংলাভাষা নিশ্চয়ই টিকে থাকবে আরও বহুকাল। কিন্তু আজ থেকে প্রতিটি দশক, শতক পরে বাংলাভাষা বলে যা থাকবে, সেটার চেহারা একেবারে আলাদা হবে এখনকার বাংলার চাইতে। তখনো নিশ্চয়ই এখনকার মতো কিছু মানুষ থাকবেন, যারা তখনকার ভাষাটাকেই সঠিক ধরে সে সময়ের পরিবর্তনগুলোর বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন ‘লাঠি হাতে’।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

ভাষা আন্দোলনের ৬৯ বছর

বাংলাকে বেঁধে ফেলার চেষ্টা কি সফল হবে?

 ডা. জাহেদ উর রহমান 
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১.

টালত মোর ঘর নাহি পরবেষী

হাড়ীত ভাত নাঁহি নিতি আবেশী।

২.

ভবণই গহণগম্ভীরা বেগেঁ বাহী

দুআন্তে চিখিল মাঝেঁ ন ঠাহী।

৩.

দুলি দুহি পিটা ধরণ ন জাই

রুখের তেন্তুলি কুম্ভীরে খাঅ।

বোঝা গেল ‘বাংলা ভাষা’য় রচিত এ পঙ্ক্তিগুলোর মানে? কেউ কেউ হয়তো বুঝে ফেলেছেন, এগুলো চর্যাপদ থেকে নেওয়া। চর্যাপদের ভাষা আদতে বাংলা কিনা সেই তর্ক কখনো কখনো হলেও দীর্ঘকাল হয়েছে এ তর্ক শেষ হয়েছে এবং সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়েছে, চর্যাপদের ভাষা বাংলা। এটি বাংলা সাহিত্যের আদিতম নমুনা।

ফাস্ট ফরোয়ার্ড করে শপাঁচেক বছর এগিয়ে আসা যাক। আসুন, মহাকবি আলাওল রচিত মহাকাব্য পদ্মাবতীর কিছু পঙ্ক্তি পড়ি :

গুণিগণ থাকন্ত তাহান সভা ভরি।

গীত নাট যন্ত্র বাহি রঙ ঢঙ করি॥

একদিন মহাশয় বসিয়া আসনে।

নানা রস প্রসঙ্গ কহেন্ত গুণিগণে॥

হেনকালে শুনি পদ্মাবতীর কথন।

পরম হরিষ হৈল পাত্রবর মন॥

কৌতুকে আদেশ কৈলা পরম হরিষে

রোসাঙ্গেত আন লোকে না বুঝে এ ভাষ।

পরার রচিলে পুরে সভানের আশ॥

অনেক ভাবিয়া মনে চিন্তিলুঁ উপায়।

তান ভাগ্য যশকীর্তি আছ এ সহায়॥

জানি এবার ভাষাটা আমাদের অনেকের কাছে পরিচিত ঠেকছে; বাংলা বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু এখনকার স্কুল-কলেজে পড়া কিশোর-কিশোরীরা কি পদ্মাবতীর ভাষাও বুঝবে? এগিয়ে আসি আরও অনেকটা, যাদের কথা বলছিলাম, তারা কি সহজে বুঝতে পারবে মোটামুটি দেড়শ বছর আগে লেখা ‘কপালকুন্ডলা’ কিংবা ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্যও?

হাজারখানেক বছরের বিবর্তনে বাংলাভাষা আজ কোথায় চলে এসেছে! হাজার বছর বাদ দেই, কয়েকশ বছর পরে বাংলাভাষীরা আজকের দিনের বাংলা সম্পর্কে কী ভাববে? কিংবা কয়েকশ বছর দূরেই থাকুক, বেশ কয়েক দশক পরও কি এখনকার বাংলা সেই প্রজন্মের কাছে আদৌ পরিচিত ঠেকবে? বর্তমান কালের তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ভাষার পরিবর্তন ঘটবে অতীত ইতিহাসের যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি দ্রুতগতিতে।

ছোটবেলায় আমরা যখন উৎপত্তিগতভাবে বাংলা শব্দের শ্রেণিবিভাগ পড়তাম তখন খুব অবাক হয়ে দেখতাম, ‘খাঁটি বাংলা’ শব্দের সংখ্যা একেবারেই হাতেগোনা। বাংলাভাষার মূল শব্দসম্ভার এসেছে মূলত সংস্কৃত (তৎসম, অর্ধ-তৎসম, তদ্ভব) আর বিদেশি ভাষা থেকে। যথেষ্ট খোঁজাখুঁজি করলে ‘খাঁটি বাংলা’ শব্দের যে তালিকা পাওয়া যায় সেটা কম-বেশি এমন : ‘ঢেঁকি, ঢোল, কাঁটা, খোঁপা, ডিঙি, কুলা, টোপর, খোকা, খুকি, বাখারি, কড়ি, ঝিঙা, কয়লা, কাকা, খবর, খাতা, কামড়, কলা, গয়লা, চঙ্গ, চাউল, ছাই, ঝাল, ঝোল, ঠাটা, ডাগর, ডাহা, ঢিল, পয়লা, চুলা, আড্ডা, ঝানু, ঝোঁপ, ডাঁসা, ডাব, ডাঙর, খোঁড়া, চোঙা, ছাল, ঢিল, মাঠ, মুড়ি, কালা, বউ, চাটাই, খোঁজ, চিংড়ি, কাতলা, ঝিনুক, মেকি, নেড়া, কুলা, ঝাটা, মই, বাদুর, বক, কুকুর, তেঁতুল, গাঁদা, শিকড়, খেয়া, লাঠি, ডাল, কলাকে, ঝাপসা, কচি, ছুটি, ঘুম, দর, গোড়া, ইতি, যাতা, চোঙা, খড়, পেট, কুড়ি, দোয়েল, খবর, খোঁচা, গলা, গোড়া, গঞ্জ, ধুতি, নেকা, বোবা’।

এসব ‘খাঁটি বাংলা’ শব্দ আসলেই ‘খাঁটি বাংলা’ কিনা সেই প্রশ্নও যে নেই তা না। আসলে এসব শব্দের অন্য কোনো নিশ্চিত উৎস পাওয়া যায়নি, তাই। ভাষা তো আসলেই এরকম। নানা ভাষা থেকে শব্দ নিয়ে, প্রকাশভঙ্গি নিয়ে একটা ভাষা সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। সময় যায়, একটা ভাষা তার ব্যবহৃত কিছু শব্দ বাতিল করে, গ্রহণ করে নতুন শব্দ। এ শব্দ গ্রহণ-বর্জন সবসময় যে বিকল্প শব্দ থাকা বা না থাকার কারণে হয়, তা নয়; হয় ব্যবহারের আরামের জন্য। ভাষার শব্দ শুধু মনের ভাব প্রকাশ করলেই হয় না, সেটা ব্যবহারে আরাম হয় কিনা, সেটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ।

স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি শব্দগুলোর ভালো বিকল্প বাংলা শব্দ আছে, যথাক্রমে বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু খুব কম ‘খাঁটি বাংলা প্রেমিক’ এ বাংলা শব্দগুলো বলেন। তেমনি চেয়ার-এর বদলে বলেন না কেদারা। এ রকম অনেক ভূরিভূরি উদাহরণ দেওয়া যায়। অনেকেই বলবেন, ওই শব্দগুলোর উৎপত্তি ইংরেজি থেকে হলেও এগুলো তো এখন বাংলা শব্দ। কথা ঠিক। তাহলে এখন যখন বিকল্প বাংলা শব্দ থাকার পরও একটি ইংরেজি শব্দ বা বাক্যাংশ বাংলায় খুব ব্যবহার করা হয়, তখন সেটাকে কেন আমরা বাংলা বলছি না?

কয়েক বছর আগে নোয়াখালীর গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে অনেকের সঙ্গে নানা বিষয়ে আলাপ করছিলাম। যেহেতু বেশিরভাগ মানুষ ধান চাষের সঙ্গে যুক্ত, স্বাভাবিকভাবেই তাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতাম ধানের ফলনের খবর নিয়ে। সে বছর ধানে পোকার আক্রমণ বেশি হওয়ার কারণে ফলন কম হয়েছিল। আমি অবাক হয়ে দেখলাম অনেকেই বলছে ‘ধানে এইবার টাবল অইছে’। পরে খেয়াল করে দেখেছিলাম একেবারে অশিক্ষিত মানুষের মধ্যেও ‘টাবল’ শব্দটার ব্যবহার আছে। এই শব্দটা কি বাংলা নয়? বা নোয়াখাইল্যা শব্দ নয়?

বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত, প্রচলিত ইংরেজি ডিকশনারিগুলো যখন নতুন সংস্করণ প্রকাশ করে, তখন সেখানে খুব স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় সেই সংস্করণে কোন কোন নতুন শব্দ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। প্রতি সংস্করণের অন্তর্ভুক্ত নতুন শব্দ দেখলে দেখা যাবে, তার বিকল্প ইংরেজি শব্দ প্রায় সব ক্ষেত্রেই আছে, কিন্তু তবুও ইংরেজি ভাষায় নতুন শব্দ প্রবেশ করে। বিভিন্ন ভাষা থেকেই প্রবেশ করে।

আমরা আজ যখন বাংলায় ইংরেজি শব্দ-বাক্যাংশ ঢুকে ভাষাটা ‘বাংরেজি’ হয়ে যাওয়া নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন তখন আরেক নতুন ফেনোমেনোন (আমি ‘প্রপঞ্চ’ বললাম না) আমাদের সমাজে দেখা যাচ্ছে-বাংলায় হিন্দি শব্দের প্রবেশ। হিন্দি ভীষণভাবেই আছে আমাদের সমাজে, থাকবে। তো কী হবে এ প্রবণতার পারিভাষিক নাম? ‘বাংদি’ কিংবা ‘হিংলা’? আজকের বাংলাদেশে অনেক শিশু এবং টিন তাদের ব্যবহৃত বাংলায় হিন্দি ব্যবহার করছে। তো অনেক মানুষ যদি নিয়মিতভাবে ‘নেহি’ (বা অন্য কোনো শব্দ) বলে, তো সেটা কেন বাংলা হবে না?

‘শুদ্ধ/প্রমিত ভাষা’ বলে আসলে পরম/চিরস্থায়ী কিছু নেই। তবে এ ক্ষেত্রে এক ধরনের মান নির্ধারণ করে সেটার সঙ্গে তুলনা করে সেটাকে স্থায়ী করে ফেলার চেষ্টা সমাজে রয়েছে। আবার ইতিহাস বলে, এসব চর্চা কখনো সাফল্য পায়নি। ভাষা তার আপন গতিতেই তার পথ তৈরি করে নিয়েছে। এ সত্য শুধু বাংলার ক্ষেত্রে নয়, প্রযোজ্য সব ভাষার ক্ষেত্রেই। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো এ পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে নিজকে মানিয়ে নেওয়া। অথচ আমরা কয়েক বছর আগে দেখেছিলাম এক বহুজাতিক কোম্পানির উদ্যোগে ‘নিখোঁজ শব্দ’ খুঁজে বের করা হচ্ছিল। ব্যবহারিক উপযোগিতা হারিয়ে যে কোনো ভাষা অনেক শব্দই বর্জন করে; সেগুলো খুঁজে আনার চেষ্টা করা অকাট মূর্খতা।

যৌক্তিক প্রশ্ন আসতেই পারে, ভাষার সব পরিবর্তন কি মেনে নিতেই হবে? ভাষা কি শুধুই মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম? এর মধ্যে কি কোনো রাজনীতি নেই? নেই সাংস্কৃতিক আধিপত্যের পরিকল্পনা? আছে নিশ্চয়ই। কিন্তু সেগুলো থেকে জাতিকে রক্ষা করার পথ জোর খাটিয়ে পছন্দসই ‘বাংলা’ চাপিয়ে দেওয়া নয়। কীভাবে সেটা করতে হবে, সেটা এই কলামের চৌহদ্দির বাইরে।

পছন্দসই বাংলা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা আমরা মাঝে মাঝেই দেখি সরকারের পক্ষ থেকে হয়, হয় সিটি করপোরেশনে থেকেও। এ বছর আরও একটা অদ্ভুত উদাহরণ দেখা গেল। একুশে ফেব্র“য়ারি দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকায় সংবাদ এসেছে শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের দিন বনভোজনের গাড়িতে হিন্দি গান বাজানোর অপরাধে চালককে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। ঘটনাটি পড়ে মনে পড়ল ‘মুতাউইন’-এর কথা।

ধর্মকে ব্যক্তির একেবারে নিজস্ব পর্যায়ে না রেখে রাষ্ট্র তার নিজ এখতিয়ারে নিয়ে সেটার অনুশাসন মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়াটা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মানদণ্ডে চরম কর্তৃত্ববাদী আচরণ। আমরা অনেকেই জানি, এ একবিংশ শতাব্দীতেও পৃথিবীতে এটা আছে-‘নীতি-পুণ্য প্রচার এবং পাপ রোধ’ করার জন্য ধর্মীয় পুলিশ সেটাই করে জনগণের সঙ্গে। কয়েকটি দেশে থাকলেও সৌদি আরবের ধর্মীয় পুলিশ ‘মুতাউইন’ খুব আলোচিত, কুখ্যাত (কিংবা বিখ্যাত)।

রাষ্ট্র তার নাগরিকের ওপর ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে সংঘটিত আন্দোলনের স্মরণে আমরা ২১ ফেব্র“য়ারি পালন করছি। আজ সরকার, কিছু প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি আমাদের ওপরও ‘ভাষা চাপিয়ে’ দিতে চাইছে। তারা সবাই তো খুশি হবে ‘মুতাউইন’-এর আদলে ভাষা-পুলিশ বানিয়ে আমাদের ভাষার শুদ্ধতা নিশ্চিত করতে। মানি ‘মুতাউইন’-এর কথা বলাটায় এক ধরনের অতিরঞ্জন আছে; কিন্তু ভাষার তথাকথিত মান রক্ষার নামে এ রাষ্ট্র কিছু প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তির সহায়তায় আমার এমন কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে যার এখতিয়ার তার নেই? কিন্তু আমাদের অনেকেই এ প্রবণতাকে সমর্থন করছেন কিংবা নীরব থাকছেন; কিন্তু প্রতিবাদ করছেন খুব কম মানুষ। অথচ এর প্রতিবাদ হওয়া উচিত ছিল তীব্রভাবে।

বাংলা ঠিক আর কতদিন টিকে থাকবে, জানি না। ভাষার টিকে থাকার ব্যাপারে যেসব প্রথাগত হিসাব-নিকাশ ছিল, সেসব তথ্যপ্রযুক্তির প্রবল স্রোতের সামনে দাঁড়িয়ে একইরকমভাবে আর প্রযোজ্য হতে পারে না। তবে এটা বলাই যায়, বাংলাভাষা নিশ্চয়ই টিকে থাকবে আরও বহুকাল। কিন্তু আজ থেকে প্রতিটি দশক, শতক পরে বাংলাভাষা বলে যা থাকবে, সেটার চেহারা একেবারে আলাদা হবে এখনকার বাংলার চাইতে। তখনো নিশ্চয়ই এখনকার মতো কিছু মানুষ থাকবেন, যারা তখনকার ভাষাটাকেই সঠিক ধরে সে সময়ের পরিবর্তনগুলোর বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন ‘লাঠি হাতে’।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : ভাষা আন্দোলনের ৬৯ বছর