কোটা বাতিলে পদ্ধতি অনুসরণ করুন

  মো. মা হ বু বু ল বা সে ত ২০ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শাহবাগে কোটা সংস্কার নিয়ে আলোচনা

দেশব্যাপী ছাত্রদের আন্দোলনের কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘কোটা পদ্ধতি’ বাতিল এবং মেধার ভিত্তিতে সরকারি নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন। সরকারি নিয়োগের ব্যাপারে এটি তার সরকারের নীতিনির্ধারণী ঘোষণা। এ ঘোষণাকে আইনগতভাবে কার্যকর করতে হলে নিম্নলিখিত বিধিবিধান ও কার্যপদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।

বিধিবিধান

বিষয়টির সঙ্গে সংবিধানের ২৮(৪) ও ২৯ অনুচ্ছেদ, জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি, সংসদ সচিবালয় আইন-১৯৯৪, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিপত্র, সরকারের রুলস অব বিজনেস, কোটা সংক্রান্ত অনেক গেজেট নোটিফিকেশন সংশ্লিষ্ট।

সংবিধানের ২৮(৪) অনুচ্ছেদ : ‘নারী ও শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের (মৌলিক অধিকার-সংবিধানের ৩য় ভাগ) কোনো কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত করিবে না।’

সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদ : সরকারি নিয়োগ-লাভে সুযোগের সমতা

‘২৯ (১) প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদলাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে।

(২) কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদলাভের অযোগ্য হইবেন না কিংবা সেই ক্ষেত্রে তাঁহার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না।

(৩) এই অনুচ্ছেদের কোনো কিছুই-

(ক) নাগরিকদের যে কোনো অনগ্রসর অংশ যাহাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভ করিতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যে তাঁহাদের অনুকূলে বিশেষ বিধান-প্রণয়ন করা হইতে,

(খ) কোনো ধর্মীয় বা উপ-সম্প্রদায়গত প্রতিষ্ঠানে উক্ত ধর্মাবলম্বী বা উপসম্প্রদায়ভুক্ত ব্যক্তিদের জন্য নিয়োগ সংরক্ষণের বিধান-সংবলিত যে কোনো আইন কার্যকর করা হইতে,

(গ) যে শ্রেণীর কর্মের বিশেষ প্রকৃতির জন্য তাহা নারী বা পুরুষের পক্ষে অনুপযোগী বিবেচিত হয়, সেইরূপ যে কোনো শ্রেণীর নিয়োগ বা পদ যথাক্রমে পুরুষ বা নারীর জন্য সংরক্ষণ করা হইতে রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।’

স্বাধীনতার পর ইতিমধ্যেই ৪৭ বছর অতিবাহিত হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে রাষ্ট্র বা সরকার সংবিধানের ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদের আলোকে ‘কোটা পদ্ধতি সংরক্ষণ করায়’ বাংলাদেশে এখন আর কোনো শ্রেণী, পেশা বা সমাজ বা এলাকা অনগ্রসর আছে বলে মনে হয় না। আর থাকলেও (প্রতিবন্ধী বা নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী) তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রেখে প্রধানমন্ত্রীর যৌক্তিক ঘোষণা দ্রুত কার্যকর করা উচিত।

কার্যপদ্ধতি

প্রশ্ন : প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা কার্যকর করার কর্মপদ্ধতি কী হবে?

উত্তর : ১. সাধারণ প্রক্রিয়া, ২. দ্রুত প্রক্রিয়া

১. সাধারণ প্রক্রিয়া : বিষয়টির সঙ্গে স্পিকার ও সংসদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও কেবিনেট সচিব সংশ্লিষ্ট। প্রধানমন্ত্রী সংসদের বৈঠকে এই ঘোষণা দেয়ায় এটি এখন ‘সংসদে সরকারি ঘোষণা বা প্রতিশ্রুতির’ অংশ। মন্ত্রী বলতে প্রধানমন্ত্রীকেও বোঝাবে। ফলে এটি জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ২৪৪ বিধির আলোকে ‘সরকারি প্রতিশ্রুতি সংক্রান্ত ৮ সদস্যের কমিটিতে যাবে (এই কমিটি আছে কিনা বা গঠিত হয়েছে কিনা নিশ্চিত নই)। কমিটি থাকুক বা না থাকুক, প্রস্তাবটি সংসদ সচিবালয়ের সচিব ‘সুনির্দিষ্ট আকারে’ তৈরি করে স্পিকারের (সংসদ সচিবালয়ের প্রধান নির্বাহী) অনুমোদন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিবের কাছে পাঠিয়ে দেবেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সংক্রান্ত ‘পরিপত্রের’ আলোকে সংসদ সচিবালয়ের প্রস্তাবটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বাস্তবায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করবেন। এরপর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আগের নোটিফিকেশনগুলোসহ প্রস্তাবটি যাচাই-বাছাই করে কোটা বাতিল সংক্রান্ত প্রস্তাব সারসংক্ষেপ আকারে প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরের জন্য পাঠাবেন। তিনি সই করলে এটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে উত্থাপনের জন্য কেবিনেট সচিবের কাছে দেবেন এবং কেবিনেট সচিব মন্ত্রিসভার বৈঠকে পেশ করবেন। মন্ত্রিসভা পাস করলে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় অর্থাৎ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় গেজেট করবে ও কোটা পদ্ধতি বাতিল হবে। এটি ‘নীতিগত বিষয়’ হওয়ায় সরকারের রুলস অব বিজনেস (কার্যবিধিমালা)-এর রুল ৪(২) অনুযায়ী অবশ্যই মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হতে হবে।

‘rule_4(ii): no important policy decision shall be taken except with the approval of the cabinet ।’

২. দ্রুত প্রক্রিয়া : প্রধানমন্ত্রী জনপ্রশাসন মন্ত্রীকে ডেকে বলবেন- আমি কোটা পদ্ধতি বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছি সংসদের বৈঠকে। এটি পেশ করুন। মন্ত্রী সচিবকে দায়িত্ব দেবেন প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার আলোকে সারসংক্ষেপ তৈরি করতে। যেহেতু আগেই বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে দেখার জন্য কেবিনেট সচিবকে দায়িত্ব দেয়া আছে এবং তিনিও বিষয়টি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছেন, সেহেতু জনপ্রশাসন সচিবের সারসংক্ষেপে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে পেশ করতে সাত কর্মদিবসের বেশি সময় লাগার কথা নয়।

বিষয়টির ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা যেহেতু স্পষ্ট, তাই এটি দ্রুত শেষ করে ফেলা দরকার। কারণ এটি জাতির জীবনী শক্তিতে ‘বিষফোঁড়ার’ মতো কাজ করবে।

প্রশ্ন : প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় ‘সুনির্দিষ্ট আকারে’ কী আছে?

উত্তর : ঘোষণা- ‘সারা দেশের ছাত্ররা যেহেতু আর কোটা ব্যবস্থা চায় না, সেহেতু এখন থেকে আর বাংলাদেশে কোটা ব্যবস্থা থাকবে না। এখন থেকে মেধার ভিত্তিতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দেয়া হবে।’

প্রতিবন্ধী বা নৃতাত্ত্বিক বিষয় ভিন্ন প্রসঙ্গ। এ বিষয়ে কোনো সুপারিশ থাকলে তা সারসংক্ষেপে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন একই সঙ্গে নিয়ে পৃথক গেজেট করা যেতে পারে।

মো. মাহবুবুল বাসেত : সাংবাদিক, সংসদ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter