উদার হৃদয়েই মেলে সমাধান

  বি ম ল স র কা র ২০ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

উদার হৃদয়েই মেলে সমাধান

একটি কথা বলা হয়ে থাকে যে, শিক্ষার্থী শিক্ষার্থীই। একজন শিক্ষার্থীর মনে কোনো কুটিলতা-জটিলতা থাকে না, যদি সে দুষ্ট রাজনৈতিক ব্যাধির দ্বারা আক্রান্ত না হয়, মনে কোনো দুরভিসন্ধি না থাকে; তা সে যে বয়সেরই হোক না কেন।

সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতির সংস্কারের দাবিতে গত কিছুদিনে দেশব্যাপী একটি ব্যাপক আন্দোলন গড়ে উঠেছে। কেবল সাধারণ শিক্ষার্থীই নয়, দল-মত নির্বিশেষে সারা দেশের তরুণ ও যুবসমাজের অংশগ্রহণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকা এবং সেরা সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনা উত্তাল হয়েছে।

নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, দাবি-দাওয়া আদায় ও বৈষম্য নিরসনে তারা সোচ্চার। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আন্দোলনের কাক্সিক্ষত ফলাফল ছাড়া তারা খালি হাতে ঘরে ফিরবে না। দায়িত্বশীলদের উচিত হবে বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করে পরিস্থিতিটি সঠিকভাবে উপলব্ধি এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা। দমন-পীড়ন বা কোনোরকমের গোঁজামিল কোনো সমস্যারই স্থায়ী সমাধান নয়।

এ ক্ষেত্রে শিক্ষকরা, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদগ্ধ শিক্ষকরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারেন। তবে শিক্ষক নামধারী, প্রতিনিয়ত সুযোগসন্ধানী ও বিল-ভাউচার তৈরিতে সদা মনোযোগীদের দ্বারা কল্যাণকর ও আশাপ্রদ কিছুই হবে না। উপরন্তু মতলববাজদের উসকানিতে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।

পেছনে তাকাই। ১৯৭২ সালের জুলাই মাস। মাত্র ছয় মাস আগে রক্তক্ষয়ী একটি যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন জাতি হিসেবে সবে আমাদের পথচলা শুরু হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স শেষ বর্ষ ও মাস্টার্স প্রথম পর্বের কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থী দাবি করে বসেন, প্রস্তুতি না থাকায় তারা পরীক্ষা দিতে পারবেন না; তাদের অটোপ্রমোশন দিতে হবে।

কর্তৃপক্ষ রাজি না হওয়ায় তারা আন্দোলন শুরু করেন। পরীক্ষা না দেয়ার সমর্থনে তাদের যুক্তি, যুদ্ধের কারণে টানা নয় মাস পড়াশোনা হয়নি। বাড়িঘর ছেড়ে এখানে-সেখানে, এমনকি প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন।

এ ছাড়া অনেকে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণও করেছেন। কাজেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি না থাকায় তারা পরীক্ষা দিতে পারবেন না। ১৮ জুলাই ডাকসুর উদ্যোগে টিএসসিতে অনুষ্ঠিত এক ছাত্র সমাবেশে প্রদত্ত বক্তৃতায় ডাকসু নেতারা অটোপ্রমোশনের বিষয়টিকে আত্মঘাতী বলে অভিহিত করে এ ধরনের অযৌক্তিক দাবি থেকে শিক্ষার্থীদের সরে আসার আহ্বান জানান।

পরদিন টিএসসিতেই শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অপর এক যৌথসভায় অনুরূপ আহ্বান জানান স্বয়ং উপাচার্য অধ্যাপক মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী। কিন্তু কে শোনে কার কথা। আন্দোলনের একপর্যায়ে ২০ জুলাই তারা উপাচার্যের অফিস ঘেরাও করেন এবং স্লোগান দিতে দিতে সবক’টি দরজা-জানালা বন্ধ করে দেন।

একে একে অফিসের টেলিফোন ও বিদ্যুৎ লাইন কেটে দেয়া হয়। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে শুরু করে টানা ৫-৬ ঘণ্টা চলে এ অবরোধ। উপাচার্য ও সিনিয়র শিক্ষকরা মাঝে মাঝে অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।

এমন পরিস্থিতির খবর পেয়ে কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই সন্ধ্যার ঠিক আগে স্বয়ং বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এসে হাজির হন। সময়ের ব্যস্ততম ও দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এসেছেন! খুবই অভাবনীয় ঘটনা।

আকস্মিক প্রধানমন্ত্রীকে দেখে সবাই বিস্মিত হয়ে পড়েন। বঙ্গবন্ধু বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের কাছে ডেকে নিয়ে বিষয়বস্তু ও উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে সরাসরি কথা বলেন। বঙ্গবন্ধুর সময়োচিত হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও অটোপ্রমোশনের দাবি মেনে নেয়া হয়নি।

পরে অবশ্য সিলেবাসের কলেবর কিছুটা কমিয়ে পরীক্ষাটি ঠিকই নেয়া হয়েছিল।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কাজে এ সময় বঙ্গবন্ধুর কর্মব্যস্ততার কোনো অন্ত ছিল না। প্রতিদিন দেশি-বিদেশি অতিথিদের সঙ্গে বৈঠক, সাক্ষাৎকার, অভ্যন্তরীণ কর্মপন্থা নির্ধারণসহ দেশের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত পর্যন্ত চষে বেড়াতে হতো তাকে।

এছাড়া মাত্র দু’মাস আগে অনুষ্ঠিত ডাকসু ও সবক’টি হল সংসদ এবং রাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে তার প্রিয় ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের শীর্ষস্তরের নেতারা প্রতিপক্ষ ছাত্র ইউনিয়ন প্রার্থীদের কাছে বলতে গেলে ‘গোহারা’ হেরেছেন।

এমন পরিস্থিতিতেও শিক্ষাঙ্গন ও শিক্ষার্থীদের প্রতি ছিল তার তীক্ষè দৃষ্টি ও গভীর মনোযোগ। আর তাই ক্যাম্পাসে কোনোরকমের ধাক্কাধাক্কি হয়নি। মারামারি হয়নি। অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়নি কাউকে। কারও অপসারণও দাবি করা হয়নি।

কয়েকদিনের আন্দোলনে রক্তপাত ঘটেনি একফোঁটাও। কেবল ‘আমাদের দাবি মানতে হবে, মেনে নাও’ ধরনের স্লোগান আর থেমে থেমে মিছিল ছাড়া তেমন কিছুই করেনি আন্দোলনকারীরা। উপাচার্য ও সিনিয়র শিক্ষকরা অবরুদ্ধ আছেন- এ কথা শোনামাত্র সবকিছু ফেলে রেখে বঙ্গবন্ধু ছুটে চলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

বঙ্গবন্ধুর প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, দূরদর্শিতা এবং সময়োচিত হস্তক্ষেপের ফলেই হয়তোবা বড় ধরনের কোনো অনভিপ্রেত ও অবাঞ্ছিত ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছিল সেদিন।

লক্ষ করার বিষয়, একসময়কার জগদ্বিখ্যাত এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই অধ্যাপক রফিকুল ইসলামসহ (বাংলা বিভাগ) কিছু শিক্ষক সেদিন গুণী উপাচার্য বলে পরিচিত ড. মুজাফফর আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গে একফাঁকে ফিস ফিস করে কী যেন কথা বলেন। আর এরই ফলস্বরূপ ক্যাম্পাসে বঙ্গবন্ধুর আবির্ভাব। ভাবা যায়!

ক্যাম্পাসে তথা রাজপথে অবস্থানরত হাজার হাজার তরুণ-তরুণী ও যুবক-যুবতীর সঙ্গে কার্যকর আলোচনার কোনো বিকল্প আছে বলে মনে হয় না। তবে তা হতে হবে খোলা মন ও উদার হৃদয় নিয়ে। সবার মনে শুভবুদ্ধির উদয় হোক।

বিমল সরকার : সহকারী অধ্যাপক, বাজিতপুর কলেজ; কিশোরগঞ্জ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×