বাঁচতে হলে মানতে হবে
jugantor
বাঁচতে হলে মানতে হবে

  ড. অরূপ রতন চৌধুরী  

০৯ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ চূড়ায় উঠেছিল গত বছরের জুন-জুলাই মাসে।

ওই সময়টায়, বিশেষ করে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে জুলাই মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চার হাজার রোগী শনাক্ত হতো।

এরপর কয়েক মাস পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে থাকার পর এক মাসের বেশি সময় ধরে সংক্রমণ আবার ঊর্ধ্বমুখী।

করোনার এ নতুন ধরনের সংক্রমণের হার আগের চেয়ে ৭০ শতাংশ বেশি আর জটিলতা বেশি ৩০ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, শিশুরাও এখন নিরাপদ নয়।

আগে ধারণা করা হয়েছিল, শিশুদের করোনা হওয়ার ঝুঁকি কম হলেও জটিলতা থাকে খুব সামান্য। কিন্তু ইদানীং দেখা গেছে, শিশুরাও করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে।

তাই শিশুদের করোনা থেকে বাঁচতে এখনই সতর্ক হতে হবে। অনেক শিশু ডায়রিয়া, পেটে ব্যথা ও বমি নিয়ে ভর্তি হচ্ছে। অবশ্য যারা গন্ধ কম পান, করোনায় তাদের তীব্র জটিলতা কম হয়, এটি বিভিন্ন গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে। আগে যেমন অনেকেরই গন্ধহীনতার উপসর্গ হতো, এবার তেমনটি দেখা যাচ্ছে কম। বড়দের মতো জ্বর, কাশি, গলাব্যথা তো থাকেই। তবে এবারের করোনায় মাথাব্যথা, শারীরিক দুর্বলতা, শরীর ব্যথার কথা বলছে অনেক শিশু। চোখ লাল হওয়া ও শরীরে র‌্যাশও দেখা যাচ্ছে।

দেশে এক সপ্তাহের ব্যবধানে করোনাভাইরাসে মৃত্যু বেড়েছে ৭১ শতাংশ। আগের সপ্তাহের তুলনায় ৫৫তম সপ্তাহে শনাক্ত বেড়েছে প্রায় ৬৭ শতাংশ। সংক্রমণ ও শনাক্তের হার ছিল ২১ দশমিক ০২ শতাংশ।

সংক্রমণ মোকাবিলায় ২৯ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ১৮ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-অর্ধেক জনবল দিয়ে অফিস পরিচালনা করা, জনসমাগম সীমিত করা, গণপরিবহণে ধারণক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী পরিবহণ করা ইত্যাদি। করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এগুলো অন্যতম পদ্ধতি। যেহেতু ১৮ দফা নির্দেশনা দিয়ে পরিপূর্ণভাবে তা কার্যকর করা যাচ্ছিল না, তাই ‘লকডাউনে’ যেতে হয়েছে। মূল উদ্দেশ্য হলো সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, তবে ঝুঁকি বিবেচনায় সময়ে সময়ে পরিকল্পনা হালনাগাদ করা প্রয়োজন।

সারা দেশে সরকারি-বেসকারি ব্যবস্থাপনায় ২২৭টি ল্যাবে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা হচ্ছে। এর মধ্যে আরটি-পিসিআর ল্যাব ১২০টি, জিন-এক্সপার্ট ৩৪টি, র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন ৭৩টি। দেশে এখন চলছে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ। প্রথম দিকের তুলনায় এ সংক্রমণ ইতোমধ্যে রেকর্ড গড়েছে। শুধু সংক্রমণ নয়, মৃত্যুর দিক থেকেও রেকর্ড। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইতোমধ্যে সরকার করোনা সংক্রমণ রোধে কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপের পর সোমবার থেকে ‘লকডাউন’ ঘোষণা করেছে। করোনার সেকেন্ড ওয়েভ নিয়ে জনসাধারণের মাঝে চরম আতঙ্ক রয়েছে। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই এখন মূল লক্ষ্য।

‘লকডাউনে’ শুধু জরুরি সেবা দেয় এমন প্রতিষ্ঠান এবং পণ্যবাহী যানবাহন ও শিল্প-কারখানা খোলা থাকবে। বাস চলাচল প্রথমে বন্ধ রাখা হলেও পরে শহরগুলোতে তা চালু করা হয়েছে। তবে যাত্রীবাহী ট্রেন, যাত্রীবাহী নৌযান বন্ধ রাখা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ পথে বিমান চলাচলও বন্ধ থাকবে। আর যেসব অফিস চালু রাখার প্রয়োজন রয়েছে, তাদের সীমিত জনবল নিয়ে চালাতে হবে। খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ‘লকডাউনে’ ঘর থেকে বের হওয়া যাবে না।

ইতোমধ্যে করোনার প্রথম আঘাত শুরু হয়ে অনেকটা কমে যাওয়ার পর ধারণা করা হয়েছিল দেশ এ ভাইরাস থেকে পরিত্রাণ পেয়েছে। এ ধারণা ছিল সাধারণ মানুষের মধ্যে। ফলে করোনাভাইরাস নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের সব পর্যায়ে যেভাবে নতুন নতুন প্রস্তুতি এগিয়ে যাচ্ছিল, সেটি একপর্যায়ে থমকে যায়। বর্তমানে সেকেন্ড ওয়েভ শুরু হওয়ার পর আবার নতুন করে থমকে যাওয়া সেই প্রয়াসকে এগিয়ে নেওয়ার তৎপরতা শুরু হয়েছে। কিন্তু এরই মাঝে প্রতিদিন যে হারে এ ভাইরাসে মানুষ সংক্রমতি হচ্ছে এবং মৃত্যুবরণ করছে তা রীতিমতো আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। প্রতিনিয়ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর তথ্য বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশের চিত্র সব মহলকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, টিকা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাটাও অত্যন্ত জরুরি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, করোনার দ্বিতীয় ওয়েভে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ ৩০ জেলাকে উচ্চহারে সংক্রমণের স্থান হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইতঃপূর্বে চট্টগ্রামে এ ধরনের সংক্রমণ না ছড়ালেও এখন তা ঘটছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন আলাদাভাবে কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। সন্ধ্যা ৬টার পর সব ধরনের দোকানপাট, শপিংমল বন্ধের ঘোষণা কার্যকর করেছে।

সংক্রমণের হার ও রোগীর সংখ্যা যখন ক্রমাগত বেড়ে চলেছে, তখন মনোযোগ বাড়াতে হবে কোভিড রোগীদের জীবন রক্ষার প্রতি। কোভিড রোগীদের চিকিৎসার সুযোগ বাড়াতে হবে; পর্যাপ্ত অক্সিজেন, আইসিইউ সেবাসহ চিকিৎসার মান উন্নত করার জন্য বাড়তি উদ্যোগ নিতে হবে, প্রয়োজনে অর্থ বরাদ্দ বাড়াতে হবে। যদিও সামগ্রিকভাবে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা আরও দক্ষ, দায়িত্বশীল ও সুশৃঙ্খল করার উদ্যোগে সরকার সচেষ্ট।

সংক্রমণের আরও বৃদ্ধি ঠেকানোর জন্য মাস্ক পরা, নিয়মিত হাত ধোয়া, শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে চলা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রতি সবাইকে আরও মনোযোগী ও দায়িত্বশীল করে তোলার জন্য ব্যক্তিগত, পারিবারিক, প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি প্রতিটি বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানকেও এ ক্ষেত্রে নিজেদের ভূমিকা আরও জোরদার করতে হবে। পাড়ায় পাড়ায় সচেতনতা কার্যক্রমকে আরও বেগবান করতে স্থানীয় নেতারা বড় ভূমিকা রাখতে পারবেন। প্রতিটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে উদ্যোগ নিতে হবে; সেই সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে।

যারা ঘরের বাইরে বেশি সময় কাটাচ্ছেন, তারা আক্রান্ত হচ্ছেন বেশি। যুবকদের মধ্যে একটা অবহেলা ও উপেক্ষার ভাব রয়েছে। অযথা ঘুরে বেড়ানো, আড্ডা দেওয়ার কারণে করোনায় আক্রান্ত বেশি হচ্ছেন তারা। ফলে হাসপাতালগুলোতে তাদের সংখ্যা বাড়ছে।

চট্টগ্রামে করোনা আক্রান্তের হার ২০ শতাংশের বেশি। আক্রান্তের মধ্যে অর্ধেকের বেশি ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সি। শুধু তাই নয়, হাসপাতালের শয্যাও যুবকদের দখলে বেশি, প্রায় ৬৫ শতাংশ।

স্বাস্থ্যবিধি না মানা, যত্রতত্র ঘুরে বেড়ানো, আড্ডাবাজিসহ নানা কারণে কম বয়সিরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে বলে চিকিৎসকরা মনে করছেন। পাশাপাশি টিকা দেওয়ার পর করোনা জয় করার মনোভাবও কাজ করছে অনেকের মধ্যে। তাদের কারণে ঘরের বয়োবৃদ্ধ, নারী ও শিশুরা স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।

বিষয়টি আতঙ্কের হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই করোনার সংক্রমণ থেকে পরিত্রাণের প্রধান উপায়। এখানে উল্লেখ্য, প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এ দেশটিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্যগত সমস্যার কমতি নেই। এরই মাঝে কোভিড-১৯ এ দেশেও আঘাত হেনেছে। করোনার প্রথম ওয়েভ মোটামুটিভাবে সামাল দেওয়া গেছে। সরকারি উদ্যোগে দ্রুত ভ্যাকসিন প্রদানের বিষয়টি প্রশংসিত, এখন যার দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া শুরু হয়েছে।

বড়দের মাধ্যমেই শিশুদের করোনা হয়। তাই শিশুদের করোনা থেকে বাঁচাতে বড়দের দায়িত্বই বেশি। এ ক্ষেত্রে মা, বাবা এবং পরিবারের অন্যদের অবশ্যই সামাজিক অনুষ্ঠান, বিনোদনকেন্দ্র এবং যেখানে ভিড় হয়, সেসব স্থান এড়িয়ে চলতে হবে। সম্ভব হলে লিফট এড়িয়ে সিঁড়ি ব্যবহার করুন। কারও সামনে মাস্ক খোলা যাবে না। কর্মক্ষেত্র থেকেই এসে শিশুর কাছে যাওয়া যাবে না। আগে কাপড় বদলে ভালোভাবে হাত-মুখ ধুয়ে গোসল সেরে শিশুর কাছে যেতে হবে। শিশুদের স্বাস্থ্যবিধি মানতে শেখাতে হবে। কীভাবে হাঁচি-কাশি দিতে হয়, কীভাবে হাত ধুতে হয়, এসব শেখানো আমাদের দায়িত্ব।

আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষকে করোনার টিকা দেওয়া গেলে তাতে অর্থনীতিতে ২ হাজার ৪৮ কোটি ডলার বা পৌনে দুই লাখ কোটি টাকার আর্থিক সুফল মিলবে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকা দিতে হলে টিকা কেনা থেকে শুরু করে সরবরাহ ব্যয়সহ কমপক্ষে খরচ হবে ১১৭ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। এ অর্থ খরচ করে বিপুলসংখ্যক মানুষের মধ্যে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি করা গেলে তাতে অর্থনীতি ব্যাপকভাবে লাভবান হবে। বিশ্বব্যাংক বলেছে, ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনতে বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) দশমিক ১০ শতাংশ এবং পরের বছর দশমিক ২৩ শতাংশ খরচ করতে হবে। ২০২১ সালের মধ্যে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকা দেওয়া হলে তাদের মধ্যে এক ধরনের হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হবে, যার ব্যাপক অর্থনৈতিক সুফল রয়েছে, বিশ্বব্যাংকের হিসাবে এর আর্থিক মূল্য প্রায় ২ হাজার ৪৮ কোটি ডলার বা পৌনে ২ লাখ কোটি টাকা।

মাস্ক পরা, স্বাস্থ্যবিধি মানা এবং সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা-এ তিনটি হচ্ছে করোনা থেকে সুরক্ষার মূল সূত্র।

এ তিন ব্যবস্থা ছাড়া কোনো কিছুতেই উপকার হবে না। বাসার বাইরে বের হলেই এগুলো মানা বাধ্যতামূলক। যারা বাসার বাইরে যাচ্ছেন, তারা যদি স্বাস্থ্যবিধি না মানেন, তাহলে সরকারের বিধিনিষেধ আরোপ করে করোনা সংক্রমণের যে প্রচেষ্টা, তা ভেস্তে যাবে। সেই সঙ্গে আমাদের জীবনযাপনেও পরিবর্তন আনতে হবে। পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত ৩০ মিনিট ব্যায়াম এবং তামাক বা ধূমপানজাতীয় মাদকদ্রব্যের নেশা থেকে মুক্ত থাকা এ সময় সুস্থ থাকার অন্যতম উপায়।

ড. অরূপ রতন চৌধুরী : অধ্যাপক, ডিপার্টমেন্ট অব ডেন্টাল সার্জারি, বারডেম হাসপাতাল; একুশে পদকপ্রাপ্ত

prof.arupratanchoudhury@yahoo.com

বাঁচতে হলে মানতে হবে

 ড. অরূপ রতন চৌধুরী 
০৯ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ চূড়ায় উঠেছিল গত বছরের জুন-জুলাই মাসে।

ওই সময়টায়, বিশেষ করে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে জুলাই মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চার হাজার রোগী শনাক্ত হতো।

এরপর কয়েক মাস পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে থাকার পর এক মাসের বেশি সময় ধরে সংক্রমণ আবার ঊর্ধ্বমুখী।

করোনার এ নতুন ধরনের সংক্রমণের হার আগের চেয়ে ৭০ শতাংশ বেশি আর জটিলতা বেশি ৩০ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, শিশুরাও এখন নিরাপদ নয়।

আগে ধারণা করা হয়েছিল, শিশুদের করোনা হওয়ার ঝুঁকি কম হলেও জটিলতা থাকে খুব সামান্য। কিন্তু ইদানীং দেখা গেছে, শিশুরাও করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে।

তাই শিশুদের করোনা থেকে বাঁচতে এখনই সতর্ক হতে হবে। অনেক শিশু ডায়রিয়া, পেটে ব্যথা ও বমি নিয়ে ভর্তি হচ্ছে। অবশ্য যারা গন্ধ কম পান, করোনায় তাদের তীব্র জটিলতা কম হয়, এটি বিভিন্ন গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে। আগে যেমন অনেকেরই গন্ধহীনতার উপসর্গ হতো, এবার তেমনটি দেখা যাচ্ছে কম। বড়দের মতো জ্বর, কাশি, গলাব্যথা তো থাকেই। তবে এবারের করোনায় মাথাব্যথা, শারীরিক দুর্বলতা, শরীর ব্যথার কথা বলছে অনেক শিশু। চোখ লাল হওয়া ও শরীরে র‌্যাশও দেখা যাচ্ছে।

দেশে এক সপ্তাহের ব্যবধানে করোনাভাইরাসে মৃত্যু বেড়েছে ৭১ শতাংশ। আগের সপ্তাহের তুলনায় ৫৫তম সপ্তাহে শনাক্ত বেড়েছে প্রায় ৬৭ শতাংশ। সংক্রমণ ও শনাক্তের হার ছিল ২১ দশমিক ০২ শতাংশ।

সংক্রমণ মোকাবিলায় ২৯ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ১৮ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-অর্ধেক জনবল দিয়ে অফিস পরিচালনা করা, জনসমাগম সীমিত করা, গণপরিবহণে ধারণক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী পরিবহণ করা ইত্যাদি। করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এগুলো অন্যতম পদ্ধতি। যেহেতু ১৮ দফা নির্দেশনা দিয়ে পরিপূর্ণভাবে তা কার্যকর করা যাচ্ছিল না, তাই ‘লকডাউনে’ যেতে হয়েছে। মূল উদ্দেশ্য হলো সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, তবে ঝুঁকি বিবেচনায় সময়ে সময়ে পরিকল্পনা হালনাগাদ করা প্রয়োজন।

সারা দেশে সরকারি-বেসকারি ব্যবস্থাপনায় ২২৭টি ল্যাবে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা হচ্ছে। এর মধ্যে আরটি-পিসিআর ল্যাব ১২০টি, জিন-এক্সপার্ট ৩৪টি, র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন ৭৩টি। দেশে এখন চলছে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ। প্রথম দিকের তুলনায় এ সংক্রমণ ইতোমধ্যে রেকর্ড গড়েছে। শুধু সংক্রমণ নয়, মৃত্যুর দিক থেকেও রেকর্ড। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইতোমধ্যে সরকার করোনা সংক্রমণ রোধে কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপের পর সোমবার থেকে ‘লকডাউন’ ঘোষণা করেছে। করোনার সেকেন্ড ওয়েভ নিয়ে জনসাধারণের মাঝে চরম আতঙ্ক রয়েছে। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই এখন মূল লক্ষ্য।

‘লকডাউনে’ শুধু জরুরি সেবা দেয় এমন প্রতিষ্ঠান এবং পণ্যবাহী যানবাহন ও শিল্প-কারখানা খোলা থাকবে। বাস চলাচল প্রথমে বন্ধ রাখা হলেও পরে শহরগুলোতে তা চালু করা হয়েছে। তবে যাত্রীবাহী ট্রেন, যাত্রীবাহী নৌযান বন্ধ রাখা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ পথে বিমান চলাচলও বন্ধ থাকবে। আর যেসব অফিস চালু রাখার প্রয়োজন রয়েছে, তাদের সীমিত জনবল নিয়ে চালাতে হবে। খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ‘লকডাউনে’ ঘর থেকে বের হওয়া যাবে না।

ইতোমধ্যে করোনার প্রথম আঘাত শুরু হয়ে অনেকটা কমে যাওয়ার পর ধারণা করা হয়েছিল দেশ এ ভাইরাস থেকে পরিত্রাণ পেয়েছে। এ ধারণা ছিল সাধারণ মানুষের মধ্যে। ফলে করোনাভাইরাস নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের সব পর্যায়ে যেভাবে নতুন নতুন প্রস্তুতি এগিয়ে যাচ্ছিল, সেটি একপর্যায়ে থমকে যায়। বর্তমানে সেকেন্ড ওয়েভ শুরু হওয়ার পর আবার নতুন করে থমকে যাওয়া সেই প্রয়াসকে এগিয়ে নেওয়ার তৎপরতা শুরু হয়েছে। কিন্তু এরই মাঝে প্রতিদিন যে হারে এ ভাইরাসে মানুষ সংক্রমতি হচ্ছে এবং মৃত্যুবরণ করছে তা রীতিমতো আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। প্রতিনিয়ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর তথ্য বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশের চিত্র সব মহলকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, টিকা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাটাও অত্যন্ত জরুরি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, করোনার দ্বিতীয় ওয়েভে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ ৩০ জেলাকে উচ্চহারে সংক্রমণের স্থান হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইতঃপূর্বে চট্টগ্রামে এ ধরনের সংক্রমণ না ছড়ালেও এখন তা ঘটছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন আলাদাভাবে কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। সন্ধ্যা ৬টার পর সব ধরনের দোকানপাট, শপিংমল বন্ধের ঘোষণা কার্যকর করেছে।

সংক্রমণের হার ও রোগীর সংখ্যা যখন ক্রমাগত বেড়ে চলেছে, তখন মনোযোগ বাড়াতে হবে কোভিড রোগীদের জীবন রক্ষার প্রতি। কোভিড রোগীদের চিকিৎসার সুযোগ বাড়াতে হবে; পর্যাপ্ত অক্সিজেন, আইসিইউ সেবাসহ চিকিৎসার মান উন্নত করার জন্য বাড়তি উদ্যোগ নিতে হবে, প্রয়োজনে অর্থ বরাদ্দ বাড়াতে হবে। যদিও সামগ্রিকভাবে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা আরও দক্ষ, দায়িত্বশীল ও সুশৃঙ্খল করার উদ্যোগে সরকার সচেষ্ট।

সংক্রমণের আরও বৃদ্ধি ঠেকানোর জন্য মাস্ক পরা, নিয়মিত হাত ধোয়া, শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে চলা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রতি সবাইকে আরও মনোযোগী ও দায়িত্বশীল করে তোলার জন্য ব্যক্তিগত, পারিবারিক, প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি প্রতিটি বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানকেও এ ক্ষেত্রে নিজেদের ভূমিকা আরও জোরদার করতে হবে। পাড়ায় পাড়ায় সচেতনতা কার্যক্রমকে আরও বেগবান করতে স্থানীয় নেতারা বড় ভূমিকা রাখতে পারবেন। প্রতিটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে উদ্যোগ নিতে হবে; সেই সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে।

যারা ঘরের বাইরে বেশি সময় কাটাচ্ছেন, তারা আক্রান্ত হচ্ছেন বেশি। যুবকদের মধ্যে একটা অবহেলা ও উপেক্ষার ভাব রয়েছে। অযথা ঘুরে বেড়ানো, আড্ডা দেওয়ার কারণে করোনায় আক্রান্ত বেশি হচ্ছেন তারা। ফলে হাসপাতালগুলোতে তাদের সংখ্যা বাড়ছে।

চট্টগ্রামে করোনা আক্রান্তের হার ২০ শতাংশের বেশি। আক্রান্তের মধ্যে অর্ধেকের বেশি ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সি। শুধু তাই নয়, হাসপাতালের শয্যাও যুবকদের দখলে বেশি, প্রায় ৬৫ শতাংশ।

স্বাস্থ্যবিধি না মানা, যত্রতত্র ঘুরে বেড়ানো, আড্ডাবাজিসহ নানা কারণে কম বয়সিরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে বলে চিকিৎসকরা মনে করছেন। পাশাপাশি টিকা দেওয়ার পর করোনা জয় করার মনোভাবও কাজ করছে অনেকের মধ্যে। তাদের কারণে ঘরের বয়োবৃদ্ধ, নারী ও শিশুরা স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।

বিষয়টি আতঙ্কের হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই করোনার সংক্রমণ থেকে পরিত্রাণের প্রধান উপায়। এখানে উল্লেখ্য, প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এ দেশটিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্যগত সমস্যার কমতি নেই। এরই মাঝে কোভিড-১৯ এ দেশেও আঘাত হেনেছে। করোনার প্রথম ওয়েভ মোটামুটিভাবে সামাল দেওয়া গেছে। সরকারি উদ্যোগে দ্রুত ভ্যাকসিন প্রদানের বিষয়টি প্রশংসিত, এখন যার দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া শুরু হয়েছে।

বড়দের মাধ্যমেই শিশুদের করোনা হয়। তাই শিশুদের করোনা থেকে বাঁচাতে বড়দের দায়িত্বই বেশি। এ ক্ষেত্রে মা, বাবা এবং পরিবারের অন্যদের অবশ্যই সামাজিক অনুষ্ঠান, বিনোদনকেন্দ্র এবং যেখানে ভিড় হয়, সেসব স্থান এড়িয়ে চলতে হবে। সম্ভব হলে লিফট এড়িয়ে সিঁড়ি ব্যবহার করুন। কারও সামনে মাস্ক খোলা যাবে না। কর্মক্ষেত্র থেকেই এসে শিশুর কাছে যাওয়া যাবে না। আগে কাপড় বদলে ভালোভাবে হাত-মুখ ধুয়ে গোসল সেরে শিশুর কাছে যেতে হবে। শিশুদের স্বাস্থ্যবিধি মানতে শেখাতে হবে। কীভাবে হাঁচি-কাশি দিতে হয়, কীভাবে হাত ধুতে হয়, এসব শেখানো আমাদের দায়িত্ব।

আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষকে করোনার টিকা দেওয়া গেলে তাতে অর্থনীতিতে ২ হাজার ৪৮ কোটি ডলার বা পৌনে দুই লাখ কোটি টাকার আর্থিক সুফল মিলবে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকা দিতে হলে টিকা কেনা থেকে শুরু করে সরবরাহ ব্যয়সহ কমপক্ষে খরচ হবে ১১৭ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। এ অর্থ খরচ করে বিপুলসংখ্যক মানুষের মধ্যে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি করা গেলে তাতে অর্থনীতি ব্যাপকভাবে লাভবান হবে। বিশ্বব্যাংক বলেছে, ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনতে বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) দশমিক ১০ শতাংশ এবং পরের বছর দশমিক ২৩ শতাংশ খরচ করতে হবে। ২০২১ সালের মধ্যে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকা দেওয়া হলে তাদের মধ্যে এক ধরনের হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হবে, যার ব্যাপক অর্থনৈতিক সুফল রয়েছে, বিশ্বব্যাংকের হিসাবে এর আর্থিক মূল্য প্রায় ২ হাজার ৪৮ কোটি ডলার বা পৌনে ২ লাখ কোটি টাকা।

মাস্ক পরা, স্বাস্থ্যবিধি মানা এবং সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা-এ তিনটি হচ্ছে করোনা থেকে সুরক্ষার মূল সূত্র।

এ তিন ব্যবস্থা ছাড়া কোনো কিছুতেই উপকার হবে না। বাসার বাইরে বের হলেই এগুলো মানা বাধ্যতামূলক। যারা বাসার বাইরে যাচ্ছেন, তারা যদি স্বাস্থ্যবিধি না মানেন, তাহলে সরকারের বিধিনিষেধ আরোপ করে করোনা সংক্রমণের যে প্রচেষ্টা, তা ভেস্তে যাবে। সেই সঙ্গে আমাদের জীবনযাপনেও পরিবর্তন আনতে হবে। পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত ৩০ মিনিট ব্যায়াম এবং তামাক বা ধূমপানজাতীয় মাদকদ্রব্যের নেশা থেকে মুক্ত থাকা এ সময় সুস্থ থাকার অন্যতম উপায়।

ড. অরূপ রতন চৌধুরী : অধ্যাপক, ডিপার্টমেন্ট অব ডেন্টাল সার্জারি, বারডেম হাসপাতাল; একুশে পদকপ্রাপ্ত

prof.arupratanchoudhury@yahoo.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন