‘মুজিবনগর দিবস’ নিয়ে একটি প্রস্তাবনা
jugantor
‘মুজিবনগর দিবস’ নিয়ে একটি প্রস্তাবনা

  সৈকত রুশদী  

১৭ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ নামের একটি নতুন দেশের জন্ম ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ হলেও রাষ্ট্র হিসাবে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশটির প্রকাশ্য অভ্যুদয় ঘটেছিল তেইশ দিন পর, ১৭ এপ্রিল ১৯৭১-নিজ ভূখণ্ডের সীমানার মধ্যে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রথম সরকারের শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে।

মুজিবনগর

অখণ্ড পাকিস্তানের সর্বশেষ নির্বাচনে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দল আওয়ামী লীগ প্রথম সরকার গঠন করে দলের সভাপতি ও সংসদীয় দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, দলের সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ-রাষ্ট্রপতি এবং দলের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে। রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সে সময় পাকিস্তানে কারাগারে বন্দি থাকায় উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

সেই প্রথম সরকারের উপ-রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণের স্থানটি ছিল তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার সদর থানার দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তসংলগ্ন বাগোয়ান ইউনিয়নের বৈদ্যনাথতলা গ্রামের এক আমবাগানে।

শপথের পরপরই, পাকিস্তান সরকারের হাতে বন্দি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি ও রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের লক্ষ্যে তার নামে স্থানটির নামকরণ করা হয় ‘মুজিবনগর’। আর নবীন রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় প্রথম রাজধানী হিসাবে ঘোষিত এ মুজিবনগর থেকে। বাংলাদেশের প্রথম সরকারের সব গেজেট, দলিল, নথি, প্রকাশনা ও সম্প্রচারে রাষ্ট্রের রাজধানীর নাম মুজিবনগর হিসাবে উল্লেখ করা শুরু হয়।

যুদ্ধ চলাকালীন বাংলাদেশ, ভারত ও অপর বহু রাষ্ট্রের সরকারি দলিল-দস্তাবেজে এবং দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে মুজিবনগরকে বাংলাদেশ সরকারের রাজধানী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। সে কারণে অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রথম সরকারকে ‘মুজিবনগর সরকার’ হিসাবে উল্লেখ করা হয়। তবে বইপত্র ও গণমাধ্যমে অনেক সময় বাংলাদেশের প্রথম সরকারকে ‘প্রবাসী সরকার’ অথবা ‘অস্থায়ী সরকার’ হিসাবেও উল্লেখ করা হয়ে থাকে, যা একটি ভুল। কেননা, বাংলাদেশের প্রথম সরকারটি প্রবাসী অথবা অস্থায়ী ছিল না।

মুজিবনগর দিবস

রাষ্ট্রের প্রথম সরকার গঠন এবং প্রথম রাজধানী মুজিবনগর প্রতিষ্ঠার দিন ১৭ এপ্রিলকে ১৯৭২ সাল থেকে ‘মুজিবনগর দিবস’ হিসাবে পালন করা হচ্ছে। কখনো সরকারিভাবে, কখনো আওয়ামী লীগ, অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে, কখনো মেহেরপুর জেলার মানুষ ও বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে। তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘মুজিবনগর দিবস’ প্রথম পালন করা হয় স্বাধীনতার ষোলো বছর পর, ১৯৮৭ সালের ১৭ এপ্রিল।

যখন সে সময়ের রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তার উদ্যোগে শপথগ্রহণের স্থানে নবনির্মিত ‘মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ’ উদ্বোধন করতে আসেন। মুজিবনগর দিবসে রাষ্ট্রপতির স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন প্রত্যক্ষ করতে এবং তার সংবাদ সংগ্রহ করতে আগত জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের একটি দলের সঙ্গে জাতীয় ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য বাংলাদেশ টাইমসে’র একজন রিপোর্টার হিসাবে ঢাকা থেকে আমিও ওইদিন গিয়েছিলাম মুজিবনগরে। প্রত্যক্ষ করেছিলাম ইতিহাসের আরেকটি মাহেন্দ্রক্ষণকে। এর আগে বাংলাদেশের কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান ঐতিহাসিক মুজিবনগর পরিদর্শন করেননি। কিংবা মুজিবনগর দিবস পালন করেননি।

নির্বাচিত একটি সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা গ্রহণকারী এক সময়ের সামরিক ও স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নানা কারণে নিন্দিত ও সমালোচিত হলেও কেবল ঢাকার সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও মেহেরপুরে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ নির্মাণ এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে মুজিবনগর দিবস পালনের জন্য প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। সামরিক ও স্বৈরশাসক হিসাবে তার গণবিচ্ছিন্নতা আড়াল করতে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তার নয় বছরের শাসনকালে যেসব লোকরঞ্জন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, মুজিবনগর দিবস পালন ছিল তার অন্যতম।

১৯৯৬ সালের জুন মাসে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসার পর সরকারিভাবে ‘মুজিবনগর দিবস’ নিয়মিত পালন শুরু হয়। সেই সময় থেকেই মন্ত্রী পর্যায়ের পদমর্যাদার রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধির উপস্থিতিতে এ মুজিবনগর দিবস পালিত হচ্ছে।

মুজিবনগর দিবসের মর্যাদা

রাষ্ট্রের প্রথম সরকারের শপথের দিন ও স্থানের যে ঐতিহাসিক গুরুত্ব, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অংশগ্রহণ ছাড়া দিবসটি পালনের ফলে তার যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে বলে মেহেরপুরের অধিকাংশ অধিবাসীর মতো আমিও মনে করি না। অথচ এ দিবস ও স্থানটির গুরুত্ব বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য অপরিসীম। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মানুষের বেশিরভাগই এ ব্যাপারে আমার সঙ্গে একমত হবেন বলে আমার বিশ্বাস।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনে প্রথম সরকারের শপথের দিন ও স্থানকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। যেমনটি করেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা এবং যুদ্ধে দেশে ও বিদেশে সহায়ক প্রতিষ্ঠান, সংগঠন ও ব্যক্তিকে বিশেষ মর্যাদা প্রদানের ব্যবস্থা করে।

সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও জাতীয় শপথ দিবস

মুজিবনগর দিবসকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়ার লক্ষ্যে মেহেরপুরবাসী ও স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মানুষদের নানাবিধ প্রস্তাব রয়েছে। এ বিভিন্ন প্রস্তাবের সমন্বয়ে আমার প্রস্তাব হলো : রাষ্ট্রের প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণের ঐতিহাসিক দিন মুজিবনগর দিবসকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদানের লক্ষ্যে দিবসটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘জাতীয় শপথ দিবস’ হিসাবে পালন এবং রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের অংশগ্রহণের বিধান চালু করে বর্তমান সরকার প্রথমে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রদান ও পরে গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে পারে।

‘জাতীয় শপথ দিবস’ পালন করা হবে প্রতি বছর ১৭ এপ্রিল। মূল অনুষ্ঠানটি হবে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপ্রধান রাষ্ট্রপতি অথবা সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে। এতে অংশ নেবে দেশের প্রত্যেক নাগরিক এবং সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যার যার অবস্থান থেকে। মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে সকাল ১০টা বা ১১টায় বিউগল বাদনের পর স্বাধীনতা যুদ্ধে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে জাতীয় পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন এবং তার পরপরই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে দুই থেকে তিনটি বাক্যে শপথপাঠ। শপথ শেষে জাতীয় সংগীতের সুর বাদন। মাতৃভূমি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে (প্রথম সরকারের শপথের বাক্যাংশ ব্যবহার করা যেতে পারে; কোনো ব্যক্তি বা দলের নাম বা স্লোগান উল্লেখ করা যাবে না) এ শপথবাক্য পাঠ হবে। বেতার, টেলিভিশন ও অনলাইনে রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ তিন মিনিট সময় লাগবে। কিন্তু গোটা জাতির এ তিন-চার মিনিট ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা, মুক্তিযুদ্ধে শহিদ ও জাতীয় সংগীতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং শপথবাক্য পাঠ দেশজুড়ে এক অভূতপূর্ব ঐকতান সৃষ্টি করবে। দেশের প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মানুষ তাদের কাজ বন্ধ করে নিজ নিজ আসন ও অবস্থান থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানের সঙ্গে শ্রদ্ধা নিবেদন ও শপথ পাঠ করবেন।

তবে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খোলা মাঠে বা হলরুমে জাতীয় পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে জাতীয় শপথ দিবস পালনের আয়োজনে অংশগ্রহণ করলে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ও সংহতি প্রকাশ, দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলতে এবং দেশ গঠন ও সেবামূলক মনোভাব সৃষ্টিতে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।

জাতীয় শপথ দিবসে শপথবাক্য পাঠের পর মূল আয়োজনস্থলে দেশাত্মবোধক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যেতে পারে। উল্লেখ্য, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী সৈন্য ও নাগরিকদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে মিত্রবাহিনীর সদস্য ও কমনওয়েলথভুক্ত কয়েকটি দেশ প্রতিবছর ১১ নভেম্বর ঠিক একইভাবে রাষ্ট্রীয়ভাবে রাষ্ট্রপ্রধান অথবা সরকারপ্রধানের উপস্থিতিতে স্মরণ দিবস (Remembrance Day) পালন করে থাকে। জাতীয় পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে বিউগল বাদনের পর এক মিনিট নীরবতা পালন করে এবং দেশজুড়ে তা পালন করা হয়। যারা উত্তর আমেরিকা, পশ্চিম ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে বাস করেন অথবা ভ্রমণকালে ওইদিন ওইসব দেশে উপস্থিত ছিলেন, তারা এ বার্ষিক স্মরণ দিবস পালনের সঙ্গে সুপরিচিত।

দিবসটিকে একেক দেশে একেক নামে অভিহিত করা হয়। সাধারণত ‘পপি ডে’ বা নামে পরিচিত এ দিবসকে ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডসহ কয়েকটি কমনওয়েলথ দেশে বলা হয় ‘রিমেমব্রান্স ডে’। যুক্তরাষ্ট্রে বলা হয় ‘ভেটেরানস ডে’। ফ্রান্সে ‘আরমিস্টিস ডে’। একইভাবে বাংলাদেশে পালন হতে পারে ‘জাতীয় শপথ দিবস’।

জাতীয় শপথ দিবসের তাৎপর্য

এ কথা আজ আর কারও অজানা থাকার কথা নয়, ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবর্তে ২৫ মার্চ ১৯৭১ পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠী সেই দেশেরই পূর্ব অংশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ওপর সামরিক বাহিনীর সাহায্যে আক্রমণ ও গণহত্যা শুরু করলে, নিজেদের অস্তিত্বের প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগণ প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত বাঙালি সামরিক, আধা-সামরিক, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সদস্যদের বেশিরভাগই সেই রাষ্ট্রের সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে প্রথম থেকে এ যুদ্ধে যোগ ও নেতৃত্ব দেওয়ায় আগে থেকেই স্বায়ত্তশাসন ও পরে স্বাধীনতাকামী বাঙালির এ প্রতিরোধ যুদ্ধ পরিণত হয় বাংলাদেশ নামে এক নতুন রাষ্ট্রের স্বাধীনতার লক্ষ্যে এক সর্বাত্মক জনযুদ্ধে।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয় ১১ এপ্রিল ১৯৭১ পাকিস্তানের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদের রেকর্ড করা এক বেতার ভাষণ প্রচারের মধ্য দিয়ে। সেই ভাষণে ১০ এপ্রিল ১৯৭১ প্রথম বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। মুক্তাঞ্চল মেহেরপুর মহকুমার বাগোয়ান ইউনিয়নের বৈদ্যনাথতলা গ্রামের আমবাগানে ১৭ এপ্রিল অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথগ্রহণ করেন। পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ নামে একটি নতুন রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক অভ্যুদয় হয়।

প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ১১ এপ্রিলের প্রথম বেতার বক্তৃতাকে বৈধ সরকার গঠনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য ‘স্বাধীনতা আদেশ ঘোষণা’র তারিখ ১০ এপ্রিল ১৯৭১ বলে ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীকালে গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রথম সরকার গঠনের তারিখ হিসাবে ১০ এপ্রিল ১৯৭১ রেকর্ড করা হয়।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার লক্ষ্যে যুদ্ধে ও সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী সশস্ত্র বাহিনীর সব সদস্য ও বেসামরিক কর্মকর্তা ও নাগরিক এই প্রথম সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে একটি মাত্র ব্যতিক্রম ছাড়া। ভারত সরকারের বিশেষ পরিকল্পনার অংশ হিসাবে সৃষ্ট ও প্রশিক্ষিত ‘মুজিববাহিনী’ নামে খ্যাত বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) ১৯৭১ সালে পৃথকভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। যুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের পর দেশের অভ্যন্তরে থেকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া বিভিন্ন বাহিনী (যেমন, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন ‘কাদেরিয়া বাহিনী’; ‘হেমায়েত বাহিনী’ ইত্যাদি) মুজিবনগর সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। মুজিববাহিনী তখনই তাজউদ্দীন সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ না করলেও ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে এসব বাহিনী তাদের অস্ত্র সমর্পণ করে।

১৭ এপ্রিল ১৯৭১ সালে মুজিবনগরে শপথ গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের প্রথম সরকারের ধারাবাহিকতায় ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হয় বঙ্গবন্ধু সরকারের পূর্ণ কর্তৃত্ব। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে বাংলাদেশে সরকারের সেই ধারাবাহিকতা বাংলাদেশে অব্যাহত রয়েছে ও থাকবে।

সৈকত রুশদী : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, রেডিও-টেলিভিশন ব্রডকাস্টার, রাজনৈতিক বিশ্লেষক; কবি ও সাহিত্যিক; সাবেক যুগ্ম সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব, ঢাকা; বর্তমানে কানাডায় বসবাসরত

‘মুজিবনগর দিবস’ নিয়ে একটি প্রস্তাবনা

 সৈকত রুশদী 
১৭ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ নামের একটি নতুন দেশের জন্ম ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ হলেও রাষ্ট্র হিসাবে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশটির প্রকাশ্য অভ্যুদয় ঘটেছিল তেইশ দিন পর, ১৭ এপ্রিল ১৯৭১-নিজ ভূখণ্ডের সীমানার মধ্যে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রথম সরকারের শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে।

মুজিবনগর

অখণ্ড পাকিস্তানের সর্বশেষ নির্বাচনে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দল আওয়ামী লীগ প্রথম সরকার গঠন করে দলের সভাপতি ও সংসদীয় দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, দলের সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ-রাষ্ট্রপতি এবং দলের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে। রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সে সময় পাকিস্তানে কারাগারে বন্দি থাকায় উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

সেই প্রথম সরকারের উপ-রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণের স্থানটি ছিল তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার সদর থানার দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তসংলগ্ন বাগোয়ান ইউনিয়নের বৈদ্যনাথতলা গ্রামের এক আমবাগানে।

শপথের পরপরই, পাকিস্তান সরকারের হাতে বন্দি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি ও রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের লক্ষ্যে তার নামে স্থানটির নামকরণ করা হয় ‘মুজিবনগর’। আর নবীন রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় প্রথম রাজধানী হিসাবে ঘোষিত এ মুজিবনগর থেকে। বাংলাদেশের প্রথম সরকারের সব গেজেট, দলিল, নথি, প্রকাশনা ও সম্প্রচারে রাষ্ট্রের রাজধানীর নাম মুজিবনগর হিসাবে উল্লেখ করা শুরু হয়।

যুদ্ধ চলাকালীন বাংলাদেশ, ভারত ও অপর বহু রাষ্ট্রের সরকারি দলিল-দস্তাবেজে এবং দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে মুজিবনগরকে বাংলাদেশ সরকারের রাজধানী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। সে কারণে অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রথম সরকারকে ‘মুজিবনগর সরকার’ হিসাবে উল্লেখ করা হয়। তবে বইপত্র ও গণমাধ্যমে অনেক সময় বাংলাদেশের প্রথম সরকারকে ‘প্রবাসী সরকার’ অথবা ‘অস্থায়ী সরকার’ হিসাবেও উল্লেখ করা হয়ে থাকে, যা একটি ভুল। কেননা, বাংলাদেশের প্রথম সরকারটি প্রবাসী অথবা অস্থায়ী ছিল না।

মুজিবনগর দিবস

রাষ্ট্রের প্রথম সরকার গঠন এবং প্রথম রাজধানী মুজিবনগর প্রতিষ্ঠার দিন ১৭ এপ্রিলকে ১৯৭২ সাল থেকে ‘মুজিবনগর দিবস’ হিসাবে পালন করা হচ্ছে। কখনো সরকারিভাবে, কখনো আওয়ামী লীগ, অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে, কখনো মেহেরপুর জেলার মানুষ ও বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে। তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘মুজিবনগর দিবস’ প্রথম পালন করা হয় স্বাধীনতার ষোলো বছর পর, ১৯৮৭ সালের ১৭ এপ্রিল।

যখন সে সময়ের রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তার উদ্যোগে শপথগ্রহণের স্থানে নবনির্মিত ‘মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ’ উদ্বোধন করতে আসেন। মুজিবনগর দিবসে রাষ্ট্রপতির স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন প্রত্যক্ষ করতে এবং তার সংবাদ সংগ্রহ করতে আগত জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের একটি দলের সঙ্গে জাতীয় ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য বাংলাদেশ টাইমসে’র একজন রিপোর্টার হিসাবে ঢাকা থেকে আমিও ওইদিন গিয়েছিলাম মুজিবনগরে। প্রত্যক্ষ করেছিলাম ইতিহাসের আরেকটি মাহেন্দ্রক্ষণকে। এর আগে বাংলাদেশের কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান ঐতিহাসিক মুজিবনগর পরিদর্শন করেননি। কিংবা মুজিবনগর দিবস পালন করেননি।

নির্বাচিত একটি সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা গ্রহণকারী এক সময়ের সামরিক ও স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নানা কারণে নিন্দিত ও সমালোচিত হলেও কেবল ঢাকার সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও মেহেরপুরে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ নির্মাণ এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে মুজিবনগর দিবস পালনের জন্য প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। সামরিক ও স্বৈরশাসক হিসাবে তার গণবিচ্ছিন্নতা আড়াল করতে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তার নয় বছরের শাসনকালে যেসব লোকরঞ্জন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, মুজিবনগর দিবস পালন ছিল তার অন্যতম।

১৯৯৬ সালের জুন মাসে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসার পর সরকারিভাবে ‘মুজিবনগর দিবস’ নিয়মিত পালন শুরু হয়। সেই সময় থেকেই মন্ত্রী পর্যায়ের পদমর্যাদার রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধির উপস্থিতিতে এ মুজিবনগর দিবস পালিত হচ্ছে।

মুজিবনগর দিবসের মর্যাদা

রাষ্ট্রের প্রথম সরকারের শপথের দিন ও স্থানের যে ঐতিহাসিক গুরুত্ব, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অংশগ্রহণ ছাড়া দিবসটি পালনের ফলে তার যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে বলে মেহেরপুরের অধিকাংশ অধিবাসীর মতো আমিও মনে করি না। অথচ এ দিবস ও স্থানটির গুরুত্ব বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য অপরিসীম। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মানুষের বেশিরভাগই এ ব্যাপারে আমার সঙ্গে একমত হবেন বলে আমার বিশ্বাস।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনে প্রথম সরকারের শপথের দিন ও স্থানকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। যেমনটি করেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা এবং যুদ্ধে দেশে ও বিদেশে সহায়ক প্রতিষ্ঠান, সংগঠন ও ব্যক্তিকে বিশেষ মর্যাদা প্রদানের ব্যবস্থা করে।

সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও জাতীয় শপথ দিবস

মুজিবনগর দিবসকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়ার লক্ষ্যে মেহেরপুরবাসী ও স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মানুষদের নানাবিধ প্রস্তাব রয়েছে। এ বিভিন্ন প্রস্তাবের সমন্বয়ে আমার প্রস্তাব হলো : রাষ্ট্রের প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণের ঐতিহাসিক দিন মুজিবনগর দিবসকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদানের লক্ষ্যে দিবসটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘জাতীয় শপথ দিবস’ হিসাবে পালন এবং রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের অংশগ্রহণের বিধান চালু করে বর্তমান সরকার প্রথমে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রদান ও পরে গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে পারে।

‘জাতীয় শপথ দিবস’ পালন করা হবে প্রতি বছর ১৭ এপ্রিল। মূল অনুষ্ঠানটি হবে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপ্রধান রাষ্ট্রপতি অথবা সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে। এতে অংশ নেবে দেশের প্রত্যেক নাগরিক এবং সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যার যার অবস্থান থেকে। মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে সকাল ১০টা বা ১১টায় বিউগল বাদনের পর স্বাধীনতা যুদ্ধে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে জাতীয় পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন এবং তার পরপরই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে দুই থেকে তিনটি বাক্যে শপথপাঠ। শপথ শেষে জাতীয় সংগীতের সুর বাদন। মাতৃভূমি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে (প্রথম সরকারের শপথের বাক্যাংশ ব্যবহার করা যেতে পারে; কোনো ব্যক্তি বা দলের নাম বা স্লোগান উল্লেখ করা যাবে না) এ শপথবাক্য পাঠ হবে। বেতার, টেলিভিশন ও অনলাইনে রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ তিন মিনিট সময় লাগবে। কিন্তু গোটা জাতির এ তিন-চার মিনিট ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা, মুক্তিযুদ্ধে শহিদ ও জাতীয় সংগীতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং শপথবাক্য পাঠ দেশজুড়ে এক অভূতপূর্ব ঐকতান সৃষ্টি করবে। দেশের প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মানুষ তাদের কাজ বন্ধ করে নিজ নিজ আসন ও অবস্থান থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানের সঙ্গে শ্রদ্ধা নিবেদন ও শপথ পাঠ করবেন।

তবে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খোলা মাঠে বা হলরুমে জাতীয় পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে জাতীয় শপথ দিবস পালনের আয়োজনে অংশগ্রহণ করলে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ও সংহতি প্রকাশ, দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলতে এবং দেশ গঠন ও সেবামূলক মনোভাব সৃষ্টিতে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।

জাতীয় শপথ দিবসে শপথবাক্য পাঠের পর মূল আয়োজনস্থলে দেশাত্মবোধক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যেতে পারে। উল্লেখ্য, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী সৈন্য ও নাগরিকদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে মিত্রবাহিনীর সদস্য ও কমনওয়েলথভুক্ত কয়েকটি দেশ প্রতিবছর ১১ নভেম্বর ঠিক একইভাবে রাষ্ট্রীয়ভাবে রাষ্ট্রপ্রধান অথবা সরকারপ্রধানের উপস্থিতিতে স্মরণ দিবস (Remembrance Day) পালন করে থাকে। জাতীয় পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে বিউগল বাদনের পর এক মিনিট নীরবতা পালন করে এবং দেশজুড়ে তা পালন করা হয়। যারা উত্তর আমেরিকা, পশ্চিম ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে বাস করেন অথবা ভ্রমণকালে ওইদিন ওইসব দেশে উপস্থিত ছিলেন, তারা এ বার্ষিক স্মরণ দিবস পালনের সঙ্গে সুপরিচিত।

দিবসটিকে একেক দেশে একেক নামে অভিহিত করা হয়। সাধারণত ‘পপি ডে’ বা নামে পরিচিত এ দিবসকে ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডসহ কয়েকটি কমনওয়েলথ দেশে বলা হয় ‘রিমেমব্রান্স ডে’। যুক্তরাষ্ট্রে বলা হয় ‘ভেটেরানস ডে’। ফ্রান্সে ‘আরমিস্টিস ডে’। একইভাবে বাংলাদেশে পালন হতে পারে ‘জাতীয় শপথ দিবস’।

জাতীয় শপথ দিবসের তাৎপর্য

এ কথা আজ আর কারও অজানা থাকার কথা নয়, ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবর্তে ২৫ মার্চ ১৯৭১ পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠী সেই দেশেরই পূর্ব অংশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ওপর সামরিক বাহিনীর সাহায্যে আক্রমণ ও গণহত্যা শুরু করলে, নিজেদের অস্তিত্বের প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগণ প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত বাঙালি সামরিক, আধা-সামরিক, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সদস্যদের বেশিরভাগই সেই রাষ্ট্রের সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে প্রথম থেকে এ যুদ্ধে যোগ ও নেতৃত্ব দেওয়ায় আগে থেকেই স্বায়ত্তশাসন ও পরে স্বাধীনতাকামী বাঙালির এ প্রতিরোধ যুদ্ধ পরিণত হয় বাংলাদেশ নামে এক নতুন রাষ্ট্রের স্বাধীনতার লক্ষ্যে এক সর্বাত্মক জনযুদ্ধে।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয় ১১ এপ্রিল ১৯৭১ পাকিস্তানের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদের রেকর্ড করা এক বেতার ভাষণ প্রচারের মধ্য দিয়ে। সেই ভাষণে ১০ এপ্রিল ১৯৭১ প্রথম বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। মুক্তাঞ্চল মেহেরপুর মহকুমার বাগোয়ান ইউনিয়নের বৈদ্যনাথতলা গ্রামের আমবাগানে ১৭ এপ্রিল অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথগ্রহণ করেন। পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ নামে একটি নতুন রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক অভ্যুদয় হয়।

প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ১১ এপ্রিলের প্রথম বেতার বক্তৃতাকে বৈধ সরকার গঠনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য ‘স্বাধীনতা আদেশ ঘোষণা’র তারিখ ১০ এপ্রিল ১৯৭১ বলে ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীকালে গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রথম সরকার গঠনের তারিখ হিসাবে ১০ এপ্রিল ১৯৭১ রেকর্ড করা হয়।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার লক্ষ্যে যুদ্ধে ও সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী সশস্ত্র বাহিনীর সব সদস্য ও বেসামরিক কর্মকর্তা ও নাগরিক এই প্রথম সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে একটি মাত্র ব্যতিক্রম ছাড়া। ভারত সরকারের বিশেষ পরিকল্পনার অংশ হিসাবে সৃষ্ট ও প্রশিক্ষিত ‘মুজিববাহিনী’ নামে খ্যাত বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) ১৯৭১ সালে পৃথকভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। যুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের পর দেশের অভ্যন্তরে থেকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া বিভিন্ন বাহিনী (যেমন, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন ‘কাদেরিয়া বাহিনী’; ‘হেমায়েত বাহিনী’ ইত্যাদি) মুজিবনগর সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। মুজিববাহিনী তখনই তাজউদ্দীন সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ না করলেও ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে এসব বাহিনী তাদের অস্ত্র সমর্পণ করে।

১৭ এপ্রিল ১৯৭১ সালে মুজিবনগরে শপথ গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের প্রথম সরকারের ধারাবাহিকতায় ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হয় বঙ্গবন্ধু সরকারের পূর্ণ কর্তৃত্ব। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে বাংলাদেশে সরকারের সেই ধারাবাহিকতা বাংলাদেশে অব্যাহত রয়েছে ও থাকবে।

সৈকত রুশদী : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, রেডিও-টেলিভিশন ব্রডকাস্টার, রাজনৈতিক বিশ্লেষক; কবি ও সাহিত্যিক; সাবেক যুগ্ম সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব, ঢাকা; বর্তমানে কানাডায় বসবাসরত

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন