করোনাকালে মে দিবস : বিশ্বব্যবস্থা পুনর্গঠনের তাগিদ
jugantor
করোনাকালে মে দিবস : বিশ্বব্যবস্থা পুনর্গঠনের তাগিদ

  আনু মুহাম্মদ  

০১ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্ব একটাই। সীমান্ত দিয়ে ভাগ করা থাকলেও বিশ্বের সব দেশই সুখে-দুঃখে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। প্রকৃতি এক; আকাশ-বাতাস, নদী-সমুদ্র, বন-বায়ুমণ্ডল সবই অভিন্ন। কোথাও যদি বিপন্ন হয় প্রাণ-প্রকৃতি, তার প্রভাব পড়ে সর্বত্র; সীমান্ত দিয়ে ঠেকানো যায় না। বিশ্বের মানুষও তাই; সীমান্ত দিয়ে ভাগ করা থাকলেও তাদের জীবনের লড়াই, স্বপ্ন-সংকট অনেকটাই অভিন্ন। এ অভিন্ন জায়গাটিরই সন্ধান দেয় আন্তর্জাতিক মে দিবস; যার মূল কথা হলো শ্রমিক শ্রেণি। শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ দুনিয়াজুড়ে অভিন্ন, তার দাবি ও লড়াই তাই একসূত্রে গাঁথা। পুঁজিবাদ পুঁজিকে যেমন বৈশ্বিক রূপ দিয়েছে, শ্রমকেও তেমনি বৈশ্বিকভাবে যুক্ত করেছে। বিশ্ব সভ্যতার এ পর্যায় বিশ্লেষণ করে সেজন্যই মার্কস এঙ্গেলসের সারকথা আহ্বান আকারে বলেছেন, ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’।

প্রাণ-প্রকৃতি ও মানুষের এ অভিন্ন ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়েছে করোনা অতিমারিতে। পরপর দুবছর দুনিয়াজুড়ে মে দিবস তাই অভূতপূর্ব সংকটময় পরিস্থিতিতে হাজির হয়েছে নতুন তাগিদ নিয়ে। বিশ্বের প্রায় সব দেশে উৎপাদন, বিতরণ ও পরিবহন ব্যবস্থা সংকুচিত। জোর কদমে চলা বিশ্ব প্রবৃদ্ধি কমে গেছে; বাংলাদেশেও তাই। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে সংকটগুলো দানা বাঁধছিল, তা আড়াল করে করোনাভাইরাস সব তৎপরতা আর মনোযোগ গ্রাস করেছে। বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যখন বিপর্যস্ত, ক্ষমতা কাঠামোর কারণে তখনো বিশ্বের ধনিক গোষ্ঠীর মুনাফা ঠিকই বাড়ছে।

করোনাকালে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও অভাবিত বিপদ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে নিপতিত। কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষ এখন কাজ ও মজুরির অনিশ্চয়তায়। পণ্য পরিবহণের সংকট কৃষি ও কৃষককে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে বারবার। পোশাকশিল্পের অনিশ্চয়তা এবং সরকার ও মালিকপক্ষের যোগসাজশ পোশাক শ্রমিকদের আর্থিক ও স্বাস্থ্যঝুঁকি দুই-ই বাড়িয়েছে, সেই সঙ্গে সংক্রমণের ভয়ও বাড়িয়েছে। বেসরকারি খাতের পেশাজীবীরাও বড় অনিশ্চয়তায়। বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য খাবার ও স্বাস্থ্যসেবা সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।

গত বছর সরকার কয়েক দফায় কয়েকটি ‘প্রণোদনা প্যাকেজ’ ঘোষণা করেছিল। এসব প্যাকেজে প্রধানত রপ্তানিমুখী শিল্প, যা প্রধানত তৈরি পোশাকশিল্প; তার জন্য ব্যাংকগুলো যাতে ঋণ বরাদ্দ করে, সে উদ্দেশ্যে সরকারের ভর্তুকি বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কৃষিক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট পণ্য উৎপাদনে ভর্তুকি ঋণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এসব প্যাকেজে সুদের ভর্তুকি পেয়ে ব্যাংকগুলোর লাভ হয়েছে, কম সুদে ঋণ পেয়ে, যেসব ব্যবসায়ীর ব্যাংকের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ, তাদেরও লাভ হয়েছে। কিন্তু রপ্তানিমুখী শিল্পের বাইরে যে হাজার হাজার ছোট, মাঝারি ও কুটির শিল্প আছে; যেগুলো দেশের চাহিদা মেটায় এবং যাদের এখন পথে বসার দশা, তাদের অধিকাংশের জন্য ঋণের এসব প্যাকেজ কোনো কাজে লাগেনি। কেননা, যেহেতু ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে ঋণের কথা বলা হয়েছে; তাতে অধিকাংশ ক্ষুদে ব্যবসায়ীর পক্ষে ব্যাংকের সঙ্গে বোঝাপড়া করা সম্ভব নয়। করোনা আক্রমণের পর বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণখেলাপিদের জন্য সুবিধা ঘোষণা করেছে। এ ঋণখেলাপিদের হাতেই সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক। সুতরাং, তারাই এ প্যাকেজে সরকারের ভর্তুকির বিশেষ সুবিধা নিতে পেরেছে। সরকারের প্যাকেজে যারা দিন আনে দিন খায় ধরনের পেশা বা ব্যবসায় যুক্ত, সেই কোটি কোটি মানুষের জন্য ঋণ বা বরাদ্দ কিছুরই সন্ধান পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে করোনা মোকাবিলায় একাধিকবার সাধারণ ছুটি/লকডাউন ঘোষণা করা হলেও কারখানা দোকানপাট পরিবহণ অনেকই চালু ছিল। আবার যেগুলো বন্ধ ছিল, সেগুলোর মজুরি সবার পরিশোধ হয়নি। পাশাপাশি শ্রমিক ছাঁটাই চলেছে; সামনে আরও কতজন ছাঁটাই হবে, সেটি নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন। গত বছর গণপরিবহণ বন্ধ থাকাবস্থায় একবার দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকায় ডাকা হয়েছে পোশাক কারখানা খোলা বলে, শ্রমিকরা অবর্ণনীয় কষ্ট করে এসেছেন। ঢাকায় আসার পর আবার মজুরি না দিয়ে অনেক কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। লাখ লাখ শ্রমিককে এভাবে সীমাহীন ভোগান্তিতে ফেলার জন্য কোনো জবাবদিহি নেই। এ ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে। এ বছর লকডাউনকালে পোশাক কারখানা খোলা রাখা হয়েছে, গণপরিবহণ বন্ধ থাকায় কারখানা থেকে পরিবহণের ব্যবস্থা করার কথা থাকলেও বহু কারখানা তা বাস্তবায়ন করেনি, সরকারের দিক থেকেও কোনো চাপ ছিল না। ফলে শ্রমিকদের নানাভাবে গাদাগাদি করে যাতায়াত করতে হয়েছে, এতে খরচ বেড়েছে-ঝুঁকিও বেড়েছে।

দেশে নিয়মিত বেতন ও মজুরি পেয়ে কাজ করেন এ রকম মানুষ সংখ্যায় খুবই কম, যথাযথ মজুরি/বেতন পাওয়া মানুষের সংখ্যা আরও কম। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই স্বনিয়োজিত; অনিশ্চিত, অনিয়মিত পেশাই প্রধান জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার অবলম্বন। কৃষি, শিল্প আর পরিষেবা খাতে প্রায় ৬ কোটি শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে ৫ কোটিরও বেশিসংখ্যক মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। তাদের বেঁচে থাকা নির্ভর করে প্রতিদিনের হাড়ভাঙা কাজের ওপর। করোনাভাইরাসের আক্রমণে এ কোটি কোটি মানুষ এখন বেকার ও দিশেহারা। করোনা ছাড়াই তাদের জীবন ক্ষুধা ও অনিশ্চয়তায় বিপন্ন। এদের বিপুল অধিকাংশের এমন কোনো সঞ্চয়ও নেই, যা তাদের অনিশ্চিত সময় পার হতে সাহায্য করবে; বরং এ সময়ে তারা আরও ঋণগ্রস্ত হয়েছেন, দারিদ্র্যসীমার নিচে মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেছে। সরকারের প্যাকেজ দেখে মনে হয়, এ সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী মানুষের কোনো অস্তিত্বই নেই!

করোনা আক্রমণের শুরুতেই আমাদের প্রস্তাব ছিল-এ কর্মহীন জনগোষ্ঠীর জন্য অন্তত তিন মাস খাবারের ব্যবস্থা করার। আমরা এও বলেছি, সরকার এ বরাদ্দ ঘোষণা করে তা বাস্তবায়নের জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি কমিটি গঠন করলে এ কর্মসূচির বাস্তবায়ন খুবই সহজ হবে। স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করলে বহু সামাজিক শক্তি এতে স্বেচ্ছাশ্রম দিতে রাজি থাকবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। এ বরাদ্দের জন্য জনগণের ওপর নতুন করে বোঝা চাপানো বা টাকা ছাপানো বা ঋণ করার দরকার হতো না। কয়েকটি গোষ্ঠীর কাছ থেকে জনগণের লুণ্ঠিত সম্পদের কিয়দংশ উদ্ধার করলেই এ বিপদ থেকে জনগণকে উদ্ধার করা সম্ভব। কারণ, গত ১০ বছরে দেশ থেকে বাইরে পাচার হয়েছে কমপক্ষে ৭ লাখ কোটি টাকা। দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে খেলাপি ঋণ দেড় থেকে দুই লাখ কোটি টাকা; এর মধ্যে ১০টি গ্রুপের হাতেই আছে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি। সরকারের পক্ষে এদের চিহ্নিত করা খুবই সহজ। এদের অর্থ বিদেশ থেকে ফেরত আনা সময়সাপেক্ষ হলে দেশে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে সরকার এ বিপদকালীন তহবিল গঠন করতে পারে।

কিন্তু আমরা বারবার দেখতে পাচ্ছি, সরকারের অবস্থান হলো এর বিপরীত। আমরা জানি, দেশে বৃহৎ ঋণখেলাপি, সম্পদ পাচারকারীদের প্রতাপ, বিজিএমইএ আর ব্যাংক সমিতির দাপট। সরকারের ভূমিকা দেখে মনে হয়, এরাই সবচেয়ে দুর্দশাগ্রস্ত। সুতরাং কয়েক কোটি নিরন্ন কর্মহীন মানুষের প্রাপ্য এসব গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়াই সরকার তার দায়িত্ব বলে গ্রহণ করেছে। তাই করোনার মধ্যেও বকেয়া বেতন মজুরির দাবিতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ করতে হয়। বকেয়া মজুরি পরিশোধ না করে এদের অনেকের ওপর উল্টো মালিকের সন্ত্রাসী আর পুলিশের হামলা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মে দিবসের মূল যে দাবি-৮ ঘণ্টা কাজ করে বাঁচার মতো মজুরি, তা থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতের শ্রমিক-মেহনতি মানুষ অনেক দূরে। বেশিরভাগ শিল্প-কারখানায় ন্যূনতম বাঁচার মতো মজুরি, ৮ ঘণ্টা শ্রম দিবস, নিয়োগপত্র, সাপ্তাহিক ছুটি, কাজ ও কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা-এর সব বা অধিকাংশই অনুপস্থিত। শ্রমিক শ্রেণির বর্তমান গঠনের কারণে সব খাতের শ্রমিকদের মধ্যে অস্থায়ী, দিনভিত্তিক, খণ্ডকালীন, ইনফর্মাল শ্রমিকের সংখ্যাই এখন বেশি। করোনাকালেও তাই তারাই সবচেয়ে বিপর্যস্ত।

আমরা খেয়াল করলে দেখব-বিশ্বে করোনাভাইরাস হঠাৎ করে আসেনি, এর ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে মুনাফা উন্মাদনাভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার আগ্রাসী তৎপরতায়। যে পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা আর মুনাফা উন্মাদনা অস্থির করে রেখেছে বিশ্বকে, তারই একটা বড় ধাক্কা এ অতিমারি। বিশ্বে এ পর্যন্ত সাত লক্ষাধিক মানুষ এ ভাইরাসে প্রাণ হারিয়েছেন। বিশ্বের সাগর-মহাসাগর-বায়ুমণ্ডল-নদী-পাহাড়-বাস্তুসংস্থান সব মুনাফার তাণ্ডবে এখন ক্ষতবিক্ষত। কিছু লোকের অতিভোগ, লোভ আর হিংস্রতায় বিশ্ব কাতর। যুদ্ধ আর যুদ্ধাস্ত্র খাতে ব্যয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও গবেষণার চাইতে অনেক বেশি। সামরিকীকরণ আর প্লাস্টিকের জৌলুস মানুষকে ঢেকে দিচ্ছে। শ্বাস নেওয়ার বাতাস আর পানের পানিও ঢেকে যাচ্ছে মারণাস্ত্র আর বিষে। মুনাফার পেছনে উন্মাদ হয়ে দুনিয়া যেভাবে ছুটছিল, তা যে টেকসই কোনো ব্যবস্থা নয়; এ করোনা অতিমারি তা দেখিয়েছে। বিশ্ব যে অখণ্ড, সেটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে এ বিপদ-ভাইরাস। এ বিপর্যয় তাগিদ দিচ্ছে- ১. স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা মুনাফার বিষয় নয়, তা অবশ্যই রাষ্ট্রের দায়িত্ব; ২. নাগরিকদের কাজ ও খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামাজিক অর্থবহ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য; এবং ৩. প্রাণ-প্রকৃতি মানববিনাশী প্রকল্প বন্ধ করে সেই অর্থ সব নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও পূর্ণ রেশনিং ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় ব্যয় করতে হবে।

বাংলাদেশেও করোনাকালে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন-মরণ সমস্যা, শ্রমিকদের কাজ ও মজুরির সংকট, বাঁশখালীতে শ্রমিক হত্যা, পাটকল-চিনিকল-পোশাক শিল্পসহ নানা কর্মক্ষেত্রে ছাঁটাই, বিভিন্ন পেশায় বেতন হ্রাস ও ছাঁটাই এটাই দেখাচ্ছে-উন্নয়নের-শাসনব্যবস্থার পুরো ধারার মধ্যেই বড় পরিবর্তন ছাড়া আমাদের উদ্ধার নেই। মে দিবসও প্রবলভাবে সে কথাটাই আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে।

আনু মুহাম্মদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

করোনাকালে মে দিবস : বিশ্বব্যবস্থা পুনর্গঠনের তাগিদ

 আনু মুহাম্মদ 
০১ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্ব একটাই। সীমান্ত দিয়ে ভাগ করা থাকলেও বিশ্বের সব দেশই সুখে-দুঃখে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। প্রকৃতি এক; আকাশ-বাতাস, নদী-সমুদ্র, বন-বায়ুমণ্ডল সবই অভিন্ন। কোথাও যদি বিপন্ন হয় প্রাণ-প্রকৃতি, তার প্রভাব পড়ে সর্বত্র; সীমান্ত দিয়ে ঠেকানো যায় না। বিশ্বের মানুষও তাই; সীমান্ত দিয়ে ভাগ করা থাকলেও তাদের জীবনের লড়াই, স্বপ্ন-সংকট অনেকটাই অভিন্ন। এ অভিন্ন জায়গাটিরই সন্ধান দেয় আন্তর্জাতিক মে দিবস; যার মূল কথা হলো শ্রমিক শ্রেণি। শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ দুনিয়াজুড়ে অভিন্ন, তার দাবি ও লড়াই তাই একসূত্রে গাঁথা। পুঁজিবাদ পুঁজিকে যেমন বৈশ্বিক রূপ দিয়েছে, শ্রমকেও তেমনি বৈশ্বিকভাবে যুক্ত করেছে। বিশ্ব সভ্যতার এ পর্যায় বিশ্লেষণ করে সেজন্যই মার্কস এঙ্গেলসের সারকথা আহ্বান আকারে বলেছেন, ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’।

প্রাণ-প্রকৃতি ও মানুষের এ অভিন্ন ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়েছে করোনা অতিমারিতে। পরপর দুবছর দুনিয়াজুড়ে মে দিবস তাই অভূতপূর্ব সংকটময় পরিস্থিতিতে হাজির হয়েছে নতুন তাগিদ নিয়ে। বিশ্বের প্রায় সব দেশে উৎপাদন, বিতরণ ও পরিবহন ব্যবস্থা সংকুচিত। জোর কদমে চলা বিশ্ব প্রবৃদ্ধি কমে গেছে; বাংলাদেশেও তাই। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে সংকটগুলো দানা বাঁধছিল, তা আড়াল করে করোনাভাইরাস সব তৎপরতা আর মনোযোগ গ্রাস করেছে। বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যখন বিপর্যস্ত, ক্ষমতা কাঠামোর কারণে তখনো বিশ্বের ধনিক গোষ্ঠীর মুনাফা ঠিকই বাড়ছে।

করোনাকালে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও অভাবিত বিপদ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে নিপতিত। কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষ এখন কাজ ও মজুরির অনিশ্চয়তায়। পণ্য পরিবহণের সংকট কৃষি ও কৃষককে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে বারবার। পোশাকশিল্পের অনিশ্চয়তা এবং সরকার ও মালিকপক্ষের যোগসাজশ পোশাক শ্রমিকদের আর্থিক ও স্বাস্থ্যঝুঁকি দুই-ই বাড়িয়েছে, সেই সঙ্গে সংক্রমণের ভয়ও বাড়িয়েছে। বেসরকারি খাতের পেশাজীবীরাও বড় অনিশ্চয়তায়। বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য খাবার ও স্বাস্থ্যসেবা সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।

গত বছর সরকার কয়েক দফায় কয়েকটি ‘প্রণোদনা প্যাকেজ’ ঘোষণা করেছিল। এসব প্যাকেজে প্রধানত রপ্তানিমুখী শিল্প, যা প্রধানত তৈরি পোশাকশিল্প; তার জন্য ব্যাংকগুলো যাতে ঋণ বরাদ্দ করে, সে উদ্দেশ্যে সরকারের ভর্তুকি বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কৃষিক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট পণ্য উৎপাদনে ভর্তুকি ঋণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এসব প্যাকেজে সুদের ভর্তুকি পেয়ে ব্যাংকগুলোর লাভ হয়েছে, কম সুদে ঋণ পেয়ে, যেসব ব্যবসায়ীর ব্যাংকের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ, তাদেরও লাভ হয়েছে। কিন্তু রপ্তানিমুখী শিল্পের বাইরে যে হাজার হাজার ছোট, মাঝারি ও কুটির শিল্প আছে; যেগুলো দেশের চাহিদা মেটায় এবং যাদের এখন পথে বসার দশা, তাদের অধিকাংশের জন্য ঋণের এসব প্যাকেজ কোনো কাজে লাগেনি। কেননা, যেহেতু ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে ঋণের কথা বলা হয়েছে; তাতে অধিকাংশ ক্ষুদে ব্যবসায়ীর পক্ষে ব্যাংকের সঙ্গে বোঝাপড়া করা সম্ভব নয়। করোনা আক্রমণের পর বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণখেলাপিদের জন্য সুবিধা ঘোষণা করেছে। এ ঋণখেলাপিদের হাতেই সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক। সুতরাং, তারাই এ প্যাকেজে সরকারের ভর্তুকির বিশেষ সুবিধা নিতে পেরেছে। সরকারের প্যাকেজে যারা দিন আনে দিন খায় ধরনের পেশা বা ব্যবসায় যুক্ত, সেই কোটি কোটি মানুষের জন্য ঋণ বা বরাদ্দ কিছুরই সন্ধান পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে করোনা মোকাবিলায় একাধিকবার সাধারণ ছুটি/লকডাউন ঘোষণা করা হলেও কারখানা দোকানপাট পরিবহণ অনেকই চালু ছিল। আবার যেগুলো বন্ধ ছিল, সেগুলোর মজুরি সবার পরিশোধ হয়নি। পাশাপাশি শ্রমিক ছাঁটাই চলেছে; সামনে আরও কতজন ছাঁটাই হবে, সেটি নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন। গত বছর গণপরিবহণ বন্ধ থাকাবস্থায় একবার দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকায় ডাকা হয়েছে পোশাক কারখানা খোলা বলে, শ্রমিকরা অবর্ণনীয় কষ্ট করে এসেছেন। ঢাকায় আসার পর আবার মজুরি না দিয়ে অনেক কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। লাখ লাখ শ্রমিককে এভাবে সীমাহীন ভোগান্তিতে ফেলার জন্য কোনো জবাবদিহি নেই। এ ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে। এ বছর লকডাউনকালে পোশাক কারখানা খোলা রাখা হয়েছে, গণপরিবহণ বন্ধ থাকায় কারখানা থেকে পরিবহণের ব্যবস্থা করার কথা থাকলেও বহু কারখানা তা বাস্তবায়ন করেনি, সরকারের দিক থেকেও কোনো চাপ ছিল না। ফলে শ্রমিকদের নানাভাবে গাদাগাদি করে যাতায়াত করতে হয়েছে, এতে খরচ বেড়েছে-ঝুঁকিও বেড়েছে।

দেশে নিয়মিত বেতন ও মজুরি পেয়ে কাজ করেন এ রকম মানুষ সংখ্যায় খুবই কম, যথাযথ মজুরি/বেতন পাওয়া মানুষের সংখ্যা আরও কম। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই স্বনিয়োজিত; অনিশ্চিত, অনিয়মিত পেশাই প্রধান জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার অবলম্বন। কৃষি, শিল্প আর পরিষেবা খাতে প্রায় ৬ কোটি শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে ৫ কোটিরও বেশিসংখ্যক মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। তাদের বেঁচে থাকা নির্ভর করে প্রতিদিনের হাড়ভাঙা কাজের ওপর। করোনাভাইরাসের আক্রমণে এ কোটি কোটি মানুষ এখন বেকার ও দিশেহারা। করোনা ছাড়াই তাদের জীবন ক্ষুধা ও অনিশ্চয়তায় বিপন্ন। এদের বিপুল অধিকাংশের এমন কোনো সঞ্চয়ও নেই, যা তাদের অনিশ্চিত সময় পার হতে সাহায্য করবে; বরং এ সময়ে তারা আরও ঋণগ্রস্ত হয়েছেন, দারিদ্র্যসীমার নিচে মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেছে। সরকারের প্যাকেজ দেখে মনে হয়, এ সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী মানুষের কোনো অস্তিত্বই নেই!

করোনা আক্রমণের শুরুতেই আমাদের প্রস্তাব ছিল-এ কর্মহীন জনগোষ্ঠীর জন্য অন্তত তিন মাস খাবারের ব্যবস্থা করার। আমরা এও বলেছি, সরকার এ বরাদ্দ ঘোষণা করে তা বাস্তবায়নের জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি কমিটি গঠন করলে এ কর্মসূচির বাস্তবায়ন খুবই সহজ হবে। স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করলে বহু সামাজিক শক্তি এতে স্বেচ্ছাশ্রম দিতে রাজি থাকবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। এ বরাদ্দের জন্য জনগণের ওপর নতুন করে বোঝা চাপানো বা টাকা ছাপানো বা ঋণ করার দরকার হতো না। কয়েকটি গোষ্ঠীর কাছ থেকে জনগণের লুণ্ঠিত সম্পদের কিয়দংশ উদ্ধার করলেই এ বিপদ থেকে জনগণকে উদ্ধার করা সম্ভব। কারণ, গত ১০ বছরে দেশ থেকে বাইরে পাচার হয়েছে কমপক্ষে ৭ লাখ কোটি টাকা। দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে খেলাপি ঋণ দেড় থেকে দুই লাখ কোটি টাকা; এর মধ্যে ১০টি গ্রুপের হাতেই আছে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি। সরকারের পক্ষে এদের চিহ্নিত করা খুবই সহজ। এদের অর্থ বিদেশ থেকে ফেরত আনা সময়সাপেক্ষ হলে দেশে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে সরকার এ বিপদকালীন তহবিল গঠন করতে পারে।

কিন্তু আমরা বারবার দেখতে পাচ্ছি, সরকারের অবস্থান হলো এর বিপরীত। আমরা জানি, দেশে বৃহৎ ঋণখেলাপি, সম্পদ পাচারকারীদের প্রতাপ, বিজিএমইএ আর ব্যাংক সমিতির দাপট। সরকারের ভূমিকা দেখে মনে হয়, এরাই সবচেয়ে দুর্দশাগ্রস্ত। সুতরাং কয়েক কোটি নিরন্ন কর্মহীন মানুষের প্রাপ্য এসব গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়াই সরকার তার দায়িত্ব বলে গ্রহণ করেছে। তাই করোনার মধ্যেও বকেয়া বেতন মজুরির দাবিতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ করতে হয়। বকেয়া মজুরি পরিশোধ না করে এদের অনেকের ওপর উল্টো মালিকের সন্ত্রাসী আর পুলিশের হামলা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মে দিবসের মূল যে দাবি-৮ ঘণ্টা কাজ করে বাঁচার মতো মজুরি, তা থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতের শ্রমিক-মেহনতি মানুষ অনেক দূরে। বেশিরভাগ শিল্প-কারখানায় ন্যূনতম বাঁচার মতো মজুরি, ৮ ঘণ্টা শ্রম দিবস, নিয়োগপত্র, সাপ্তাহিক ছুটি, কাজ ও কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা-এর সব বা অধিকাংশই অনুপস্থিত। শ্রমিক শ্রেণির বর্তমান গঠনের কারণে সব খাতের শ্রমিকদের মধ্যে অস্থায়ী, দিনভিত্তিক, খণ্ডকালীন, ইনফর্মাল শ্রমিকের সংখ্যাই এখন বেশি। করোনাকালেও তাই তারাই সবচেয়ে বিপর্যস্ত।

আমরা খেয়াল করলে দেখব-বিশ্বে করোনাভাইরাস হঠাৎ করে আসেনি, এর ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে মুনাফা উন্মাদনাভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার আগ্রাসী তৎপরতায়। যে পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা আর মুনাফা উন্মাদনা অস্থির করে রেখেছে বিশ্বকে, তারই একটা বড় ধাক্কা এ অতিমারি। বিশ্বে এ পর্যন্ত সাত লক্ষাধিক মানুষ এ ভাইরাসে প্রাণ হারিয়েছেন। বিশ্বের সাগর-মহাসাগর-বায়ুমণ্ডল-নদী-পাহাড়-বাস্তুসংস্থান সব মুনাফার তাণ্ডবে এখন ক্ষতবিক্ষত। কিছু লোকের অতিভোগ, লোভ আর হিংস্রতায় বিশ্ব কাতর। যুদ্ধ আর যুদ্ধাস্ত্র খাতে ব্যয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও গবেষণার চাইতে অনেক বেশি। সামরিকীকরণ আর প্লাস্টিকের জৌলুস মানুষকে ঢেকে দিচ্ছে। শ্বাস নেওয়ার বাতাস আর পানের পানিও ঢেকে যাচ্ছে মারণাস্ত্র আর বিষে। মুনাফার পেছনে উন্মাদ হয়ে দুনিয়া যেভাবে ছুটছিল, তা যে টেকসই কোনো ব্যবস্থা নয়; এ করোনা অতিমারি তা দেখিয়েছে। বিশ্ব যে অখণ্ড, সেটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে এ বিপদ-ভাইরাস। এ বিপর্যয় তাগিদ দিচ্ছে- ১. স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা মুনাফার বিষয় নয়, তা অবশ্যই রাষ্ট্রের দায়িত্ব; ২. নাগরিকদের কাজ ও খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামাজিক অর্থবহ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য; এবং ৩. প্রাণ-প্রকৃতি মানববিনাশী প্রকল্প বন্ধ করে সেই অর্থ সব নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও পূর্ণ রেশনিং ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় ব্যয় করতে হবে।

বাংলাদেশেও করোনাকালে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন-মরণ সমস্যা, শ্রমিকদের কাজ ও মজুরির সংকট, বাঁশখালীতে শ্রমিক হত্যা, পাটকল-চিনিকল-পোশাক শিল্পসহ নানা কর্মক্ষেত্রে ছাঁটাই, বিভিন্ন পেশায় বেতন হ্রাস ও ছাঁটাই এটাই দেখাচ্ছে-উন্নয়নের-শাসনব্যবস্থার পুরো ধারার মধ্যেই বড় পরিবর্তন ছাড়া আমাদের উদ্ধার নেই। মে দিবসও প্রবলভাবে সে কথাটাই আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে।

আনু মুহাম্মদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন