ঈদ শপিং আর দুর্ভাগা দোকান মালিকরা
jugantor
ঈদ শপিং আর দুর্ভাগা দোকান মালিকরা

  ডা. জাহেদ উর রহমান  

০১ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

লকডাউন একটা অ্যাবসোলিউট শব্দ, এটার সঙ্গে কোনো বিশেষণ যুক্ত করতে হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে করতে হলো। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে লকডাউন বলে একটা কিছু শুরু করা হলো, কিন্তু সেটা ধরে রাখা গেল না। শেষ পর্যন্ত চালু হয়ে গিয়েছিল সবকিছু-শুরু থেকেই খোলা ছিল শিল্প-কারখানা, অফিস আর পরে খুলে গেল সব দোকানপাট, শপিং সেন্টার, এমনকি গণপরিবহণও। ফলে ১৪ তারিখ থেকে যেটি শুরু হলো, সেটার সঙ্গে সর্বাত্মক/কঠোর যুক্ত করা হলো। কিন্তু সেটাও কী আর হয়ে উঠল, দেশের শপিং সেন্টারগুলো খুলে দেওয়া হলো। অবশ্য সঙ্গে যথারীতি যুক্ত করা হয়েছিল অর্থহীন হয়ে পড়া কথাগুলো-‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে, সীমিত পরিসরে’।

মার্কেটগুলো খুলে দেওয়ার প্রথম দিন থেকেই দেশের মূল ধারার মিডিয়ায় এবং সামাজিক মাধ্যমে আমরা অনেক ছবি দেখেছি, যেগুলোতে দেখা যায় ন্যূনতম সামাজিক দূরত্ব মানার বালাই নেই। ঈদ শপিংয়ে অন্য সময় যেমন ধরনের ভিড় হয় অনেক জায়গায়, একই ধরনের ভিড় হচ্ছে কোনোরকম সামাজিক দূরত্বের বালাই না রেখে। মাস্ক দেখা যাচ্ছে না অনেকেরই মুখে। তবে এটি নিশ্চয়ই সত্যি, রমজান অর্ধেকে চলে আসার পর ঈদের যে জমজমাট শপিং হওয়ার কথা, সেটার কাছাকাছিও কিছু হচ্ছে না, সম্ভবত অনেক ক্ষেত্রেই।

এটি অস্বাভাবিক নয়। এমন ভয়ংকর একটা বৈশ্বিক মহামারিতে বেঁচে থেকে যখন মানুষ দেখছে করোনা আক্রান্ত হলে রাষ্ট্র তার জন্য চিকিৎসার যথেষ্ট ব্যবস্থা করেনি, তখন সে সংক্রমণের ভয় করবেই, চাইবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে বেসরকারি হাসপাতালে অতি ব্যয়বহুল চিকিৎসার ব্যবস্থা করে হলেও যদি বেঁচে থাকা যায়। একইসঙ্গে এ ধরনের ভয়ংকর সংকটের সময় মানুষ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে আর অনিশ্চয়তা হচ্ছে ব্যবসার সবচেয়ে বড় শত্রু; কারণ তখন মানুষ ব্যয় কম করে। এই যে মার্কেট খুলে দেওয়া হলো, এটা কি আসলে ঠিক হয়েছে? কিছুদিন আগের কথা, তখনো মার্কেট খুলে দেওয়া হয়নি, একটা টিভি টকশোতে এ প্রসঙ্গটি উঠেছিল, যেখানে আমি আলোচক ছিলাম। ঘটনাচক্রে আমার সহ-আলোচক ছিলেন জনাব হেলাল উদ্দিন, দোকান মালিক সমিতির সভাপতি। সেখানে মার্কেট খুলে দেওয়া নিয়ে জনাব হেলালের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছিলাম আমি। বাংলাদেশের হাসপাতালে করোনা রোগীর উপচে পড়া ভিড় এবং একেবারে অপ্রতুল স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে যুক্তি হিসাবে দেখিয়ে সংক্রমণ কমানোই আমাদের একমাত্র চিন্তা হওয়া উচিত বলে আমি বলেছিলাম। সেই ক্ষেত্রে মার্কেট খুলে দেওয়া দূরেই থাকুক, লকডাউন সত্যিকার অর্থে কার্যকর করার কথা বলেছিলাম। আসলে বিজ্ঞান সেটাই বলে।

এরপর দোকান মালিক সমিতির সভাপতি এবং দেশের সব সাধারণ ব্যবসায়ী সরকারের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করেন এবং সরকার মার্কেট খুলে দেয়। এ ব্যবসায়ীদের কষ্ট আমি বুঝি। গত বছরও ঘটনাচক্রে পহেলা বৈশাখ এবং ঈদ পড়েছিল সাধারণ ছুটির মধ্যে। এ সময়টাতেই সারা বছরের ব্যবসার একটা বড় অংশ তারা করে থাকেন। ফলে গত বছরের ব্যবসা না হওয়াটা তাদের ওপর নিশ্চিতভাবেই প্রচণ্ড চাপ তৈরি করেছিল। একইসঙ্গে ছিল সরকারের দিক থেকে একেবারেই অসহযোগিতামূলক আচরণ, সে প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি।

এ বছর তাদের অনেকেই ঋণ করে নতুন ব্যবসার স্বপ্ন দেখছিলেন। ডিসেম্বর, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারিতে সারা দেশে করোনা শনাক্তকরণের যে হার সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে সেটি এবং দেশের সবকিছু পুরোপুরি খুলে যাওয়ায় মনে হচ্ছিল দেশে আর করোনা আসছে না। খুব স্বাভাবিকভাবেই তারা তাদের সর্বস্ব নিয়ে নেমেছিলেন সামনের সময়টা ব্যবসা করার জন্য; কিন্তু তারপর এলো ভয়ংকর বিপর্যয়। অনুমান করি, এ মানুষগুলোর পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ এখন।

মার্কেট খুলে গেছে এবং মানুষ মার্কেটে যেতে শুরু করেছে। মার্কেটগুলো এতদিন আবদ্ধ ছিল, তাতে করোনার ঝুঁকি বেড়েছে। কারণ সর্বশেষ গবেষণা বলছে, করোনা বাতাস দিয়েও ছড়ায়। তাই সবাইকে দুটি মাস্ক পরিধান করার কথা বলা হচ্ছে। একটা ভালো মানের সার্জিক্যাল মাস্ক প্রথমে এবং তার ওপর একটি কাপড়ের মাস্ক, যেটি সার্জিক্যাল মাস্কটিকে জায়গা মতো চেপে রাখবে। এতে ঝুঁকিকে অনেক কমিয়ে রাখা যাবে। প্রচণ্ড গরম পড়ছে বেশ কিছুদিন, তাই অনেকে দিনের বেলা বের হচ্ছেন না সুযোগ থাকলেও। কিন্তু সম্ভব হলে দিনের বেলায় শপিংয়ে যান, এতে নিজের ঝুঁকি যেমন কমবে, সন্ধ্যাবেলায় ভিড় না বাড়িয়ে আপনি অন্যের ঝুঁকিও কম তৈরি করবেন। সবচেয়ে জরুরি কথা পরিবারের সব সদস্যকে নিয়ে শপিং করা অভয়েড করার চেষ্টা করুন। একজন বা সর্বোচ্চ দুজন গিয়ে সবার জন্য প্রয়োজনীয় শপিংটা করুন। এতে ঝুঁকি সর্বনিু পর্যায়ে রাখা সম্ভব হবে।

একটা অর্থনীতি ভীষণরকম আন্তঃসম্পর্ক যুক্ত থাকে। প্রতিটা পণ্য বিক্রি মানে তার সঙ্গে জড়িত থাকে অনেক ব্যবসা। তাই পণ্য বিক্রি কমা মানে শুধু দোকান মালিকদেরই ক্ষতি সেটি নয়, ক্ষতি এসব পণ্য তৈরি করার কাঁচামাল থেকে শুরু করে মোড়ক তৈরি পর্যন্ত সবার। আবার এসব প্রতিষ্ঠানে মালিক ছাড়াও আছেন কর্মচারীরা। মালিক-কর্মচারীদের যদি উপার্জন ভালো হয় তারা এ বাজারেই গিয়েই সেই টাকা ব্যয় করবেন তাদের নানা প্রয়োজন মেটাতে। সেটার কারণে ঘটা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপকারভোগী হব আমি-আপনি সবাই।

আগে যেমন বলেছিলাম, সত্যিকার অর্থেই এ ব্যবসায়িক শ্রেণিটি এ রাষ্ট্রের চরম অসহযোগিতামূলক আচরণের শিকার হয়েছে। করোনার মোকাবিলায় সরকারের প্রণোদনা বরাদ্দ দিয়ে দেখা যাক সেটা কীভাবে।

আমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, করোনার শুরুর সময়ে হ্রাসকৃত সুদে যে ঋণ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছিল, তাতে বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের জন্য বরাদ্দ ছিল ৩০ হাজার কোটি আর সিএসএমই অর্থাৎ ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটিরশিল্প শিল্পের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা। অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, বৃহৎ শিল্প সেবা খাতের ঋণের ৮৬ শতাংশ বিতরণ করা হয়েছে। অথচ এ সময়ে সিএসএমই’র ক্ষেত্রে বিতরণ করা হয়েছিল ৬ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রতিশ্রুত ঋণের ৩১ শতাংশ মাত্র। সিএসএমই খাত বরাবরই অবহেলিত আমাদের দেশে। অথচ পরিসংখ্যান বলছে, শিল্প খাতের মোট কর্মসংস্থানের ৮০ শতাংশ এবং মোট শ্রমবাজারের ২৫ শতাংশের কর্মসংস্থান হচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকারখানাগুলোতে। অর্থাৎ বৃহৎ শিল্পের তুলনায় এসএমই খাত অন্তত চারগুণ বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। খুব সামান্য হলেও এ খাত কিছু প্রণোদনা অন্তত পেয়েছে; কিন্তু কী অবস্থা দোকান মালিকদের?

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির মতে, ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার খুব ছোট পুঁজি নিয়ে ব্যবসা করে এমন অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আছেন ৬০ লাখ। আর মুদিদোকান থেকে শুরু করে সারা দেশের ছোটখাটো বিভিন্ন পণ্যের দোকান এবং বিপণিবিতানের ব্যবসায়ী আছেন ৫৭ লাখ। অর্থাৎ এমন প্রায় সোয়া এক কোটি ব্যবসায়ী আছেন। আর মুদিদোকান থেকে শুরু করে মার্কেটের দোকানে কাজ করে এক কোটির বেশি কর্মচারী। অর্থাৎ এ খাতে কর্মরত আছেন ২ কোটির বেশি মানুষ। এর সঙ্গে তাদের পরিবারকে যুক্ত করে এ খাত জীবিকার সংস্থান করে বিপুলসংখ্যক মানুষের। এ খাত প্রচণ্ড ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার পরও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রণোদনা পাননি তারা।

আমরা এমন এক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বাস করি, যেখানে সমাজের জন্য গুরুত্বের বিবেচনায় সরকার তার নীতি ঠিক করে না। সরকারি নীতিনির্ধারিত হয় যাদের দর কষাকষির ক্ষমতা বেশি, তাদের পক্ষে। বৃহৎ শিল্প, বিশেষ করে গার্মেন্ট মালিকরা অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ার কারণে (সরকারি দলের বহু সংসদ সদস্য এসব ব্যবসার সঙ্গে জড়িত) সরকারের কাছে তাদের গুরুত্বের তুলনায় অনেক বেশি সুবিধা আদায় করে নিতে পারেন। অথচ সংগঠন হিসাবে আকারে এর চেয়ে অনেক বড় হওয়ার পরও, অনেক বেশি মানুষ এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকার পরও দোকান মালিকরা সরকার থেকে পায় না কোনো কিছুই। এ রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে এ অতি গুরুত্বপূর্ণ খাতের প্রতি সরকারের এমন দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিবাদ আমাদের জানানো উচিত। সরকারের ওপর আমাদের চাপ তৈরি করা উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য।

কিন্তু এই যে, ঈদটা চলে এলো এর আগে এখন পর্যন্ত সরকার তাদের জন্য কিছু করেনি। করেনি গত বছরও। আমাদের কেনা কিছু পণ্য এ মানুষগুলোকে বেঁচে থাকার কিছু রসদ জোগাবে। এ বছরের ঈদে এদের পণ্য কেনাকাটার সময় আমরা এ ব্যাপারটুকু অন্তত যাতে মাথায় রাখি। আর নিশ্চয়ই কেনাকাটা যদি করি, সেটা হতে হবে আগে যেভাবে বলেছি, সেসব সতর্কতামূলক নিয়ম অনুসরণ করে।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

ঈদ শপিং আর দুর্ভাগা দোকান মালিকরা

 ডা. জাহেদ উর রহমান 
০১ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

লকডাউন একটা অ্যাবসোলিউট শব্দ, এটার সঙ্গে কোনো বিশেষণ যুক্ত করতে হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে করতে হলো। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে লকডাউন বলে একটা কিছু শুরু করা হলো, কিন্তু সেটা ধরে রাখা গেল না। শেষ পর্যন্ত চালু হয়ে গিয়েছিল সবকিছু-শুরু থেকেই খোলা ছিল শিল্প-কারখানা, অফিস আর পরে খুলে গেল সব দোকানপাট, শপিং সেন্টার, এমনকি গণপরিবহণও। ফলে ১৪ তারিখ থেকে যেটি শুরু হলো, সেটার সঙ্গে সর্বাত্মক/কঠোর যুক্ত করা হলো। কিন্তু সেটাও কী আর হয়ে উঠল, দেশের শপিং সেন্টারগুলো খুলে দেওয়া হলো। অবশ্য সঙ্গে যথারীতি যুক্ত করা হয়েছিল অর্থহীন হয়ে পড়া কথাগুলো-‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে, সীমিত পরিসরে’।

মার্কেটগুলো খুলে দেওয়ার প্রথম দিন থেকেই দেশের মূল ধারার মিডিয়ায় এবং সামাজিক মাধ্যমে আমরা অনেক ছবি দেখেছি, যেগুলোতে দেখা যায় ন্যূনতম সামাজিক দূরত্ব মানার বালাই নেই। ঈদ শপিংয়ে অন্য সময় যেমন ধরনের ভিড় হয় অনেক জায়গায়, একই ধরনের ভিড় হচ্ছে কোনোরকম সামাজিক দূরত্বের বালাই না রেখে। মাস্ক দেখা যাচ্ছে না অনেকেরই মুখে। তবে এটি নিশ্চয়ই সত্যি, রমজান অর্ধেকে চলে আসার পর ঈদের যে জমজমাট শপিং হওয়ার কথা, সেটার কাছাকাছিও কিছু হচ্ছে না, সম্ভবত অনেক ক্ষেত্রেই।

এটি অস্বাভাবিক নয়। এমন ভয়ংকর একটা বৈশ্বিক মহামারিতে বেঁচে থেকে যখন মানুষ দেখছে করোনা আক্রান্ত হলে রাষ্ট্র তার জন্য চিকিৎসার যথেষ্ট ব্যবস্থা করেনি, তখন সে সংক্রমণের ভয় করবেই, চাইবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে বেসরকারি হাসপাতালে অতি ব্যয়বহুল চিকিৎসার ব্যবস্থা করে হলেও যদি বেঁচে থাকা যায়। একইসঙ্গে এ ধরনের ভয়ংকর সংকটের সময় মানুষ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে আর অনিশ্চয়তা হচ্ছে ব্যবসার সবচেয়ে বড় শত্রু; কারণ তখন মানুষ ব্যয় কম করে। এই যে মার্কেট খুলে দেওয়া হলো, এটা কি আসলে ঠিক হয়েছে? কিছুদিন আগের কথা, তখনো মার্কেট খুলে দেওয়া হয়নি, একটা টিভি টকশোতে এ প্রসঙ্গটি উঠেছিল, যেখানে আমি আলোচক ছিলাম। ঘটনাচক্রে আমার সহ-আলোচক ছিলেন জনাব হেলাল উদ্দিন, দোকান মালিক সমিতির সভাপতি। সেখানে মার্কেট খুলে দেওয়া নিয়ে জনাব হেলালের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছিলাম আমি। বাংলাদেশের হাসপাতালে করোনা রোগীর উপচে পড়া ভিড় এবং একেবারে অপ্রতুল স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে যুক্তি হিসাবে দেখিয়ে সংক্রমণ কমানোই আমাদের একমাত্র চিন্তা হওয়া উচিত বলে আমি বলেছিলাম। সেই ক্ষেত্রে মার্কেট খুলে দেওয়া দূরেই থাকুক, লকডাউন সত্যিকার অর্থে কার্যকর করার কথা বলেছিলাম। আসলে বিজ্ঞান সেটাই বলে।

এরপর দোকান মালিক সমিতির সভাপতি এবং দেশের সব সাধারণ ব্যবসায়ী সরকারের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করেন এবং সরকার মার্কেট খুলে দেয়। এ ব্যবসায়ীদের কষ্ট আমি বুঝি। গত বছরও ঘটনাচক্রে পহেলা বৈশাখ এবং ঈদ পড়েছিল সাধারণ ছুটির মধ্যে। এ সময়টাতেই সারা বছরের ব্যবসার একটা বড় অংশ তারা করে থাকেন। ফলে গত বছরের ব্যবসা না হওয়াটা তাদের ওপর নিশ্চিতভাবেই প্রচণ্ড চাপ তৈরি করেছিল। একইসঙ্গে ছিল সরকারের দিক থেকে একেবারেই অসহযোগিতামূলক আচরণ, সে প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি।

এ বছর তাদের অনেকেই ঋণ করে নতুন ব্যবসার স্বপ্ন দেখছিলেন। ডিসেম্বর, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারিতে সারা দেশে করোনা শনাক্তকরণের যে হার সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে সেটি এবং দেশের সবকিছু পুরোপুরি খুলে যাওয়ায় মনে হচ্ছিল দেশে আর করোনা আসছে না। খুব স্বাভাবিকভাবেই তারা তাদের সর্বস্ব নিয়ে নেমেছিলেন সামনের সময়টা ব্যবসা করার জন্য; কিন্তু তারপর এলো ভয়ংকর বিপর্যয়। অনুমান করি, এ মানুষগুলোর পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ এখন।

মার্কেট খুলে গেছে এবং মানুষ মার্কেটে যেতে শুরু করেছে। মার্কেটগুলো এতদিন আবদ্ধ ছিল, তাতে করোনার ঝুঁকি বেড়েছে। কারণ সর্বশেষ গবেষণা বলছে, করোনা বাতাস দিয়েও ছড়ায়। তাই সবাইকে দুটি মাস্ক পরিধান করার কথা বলা হচ্ছে। একটা ভালো মানের সার্জিক্যাল মাস্ক প্রথমে এবং তার ওপর একটি কাপড়ের মাস্ক, যেটি সার্জিক্যাল মাস্কটিকে জায়গা মতো চেপে রাখবে। এতে ঝুঁকিকে অনেক কমিয়ে রাখা যাবে। প্রচণ্ড গরম পড়ছে বেশ কিছুদিন, তাই অনেকে দিনের বেলা বের হচ্ছেন না সুযোগ থাকলেও। কিন্তু সম্ভব হলে দিনের বেলায় শপিংয়ে যান, এতে নিজের ঝুঁকি যেমন কমবে, সন্ধ্যাবেলায় ভিড় না বাড়িয়ে আপনি অন্যের ঝুঁকিও কম তৈরি করবেন। সবচেয়ে জরুরি কথা পরিবারের সব সদস্যকে নিয়ে শপিং করা অভয়েড করার চেষ্টা করুন। একজন বা সর্বোচ্চ দুজন গিয়ে সবার জন্য প্রয়োজনীয় শপিংটা করুন। এতে ঝুঁকি সর্বনিু পর্যায়ে রাখা সম্ভব হবে।

একটা অর্থনীতি ভীষণরকম আন্তঃসম্পর্ক যুক্ত থাকে। প্রতিটা পণ্য বিক্রি মানে তার সঙ্গে জড়িত থাকে অনেক ব্যবসা। তাই পণ্য বিক্রি কমা মানে শুধু দোকান মালিকদেরই ক্ষতি সেটি নয়, ক্ষতি এসব পণ্য তৈরি করার কাঁচামাল থেকে শুরু করে মোড়ক তৈরি পর্যন্ত সবার। আবার এসব প্রতিষ্ঠানে মালিক ছাড়াও আছেন কর্মচারীরা। মালিক-কর্মচারীদের যদি উপার্জন ভালো হয় তারা এ বাজারেই গিয়েই সেই টাকা ব্যয় করবেন তাদের নানা প্রয়োজন মেটাতে। সেটার কারণে ঘটা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপকারভোগী হব আমি-আপনি সবাই।

আগে যেমন বলেছিলাম, সত্যিকার অর্থেই এ ব্যবসায়িক শ্রেণিটি এ রাষ্ট্রের চরম অসহযোগিতামূলক আচরণের শিকার হয়েছে। করোনার মোকাবিলায় সরকারের প্রণোদনা বরাদ্দ দিয়ে দেখা যাক সেটা কীভাবে।

আমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, করোনার শুরুর সময়ে হ্রাসকৃত সুদে যে ঋণ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছিল, তাতে বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের জন্য বরাদ্দ ছিল ৩০ হাজার কোটি আর সিএসএমই অর্থাৎ ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটিরশিল্প শিল্পের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা। অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, বৃহৎ শিল্প সেবা খাতের ঋণের ৮৬ শতাংশ বিতরণ করা হয়েছে। অথচ এ সময়ে সিএসএমই’র ক্ষেত্রে বিতরণ করা হয়েছিল ৬ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রতিশ্রুত ঋণের ৩১ শতাংশ মাত্র। সিএসএমই খাত বরাবরই অবহেলিত আমাদের দেশে। অথচ পরিসংখ্যান বলছে, শিল্প খাতের মোট কর্মসংস্থানের ৮০ শতাংশ এবং মোট শ্রমবাজারের ২৫ শতাংশের কর্মসংস্থান হচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকারখানাগুলোতে। অর্থাৎ বৃহৎ শিল্পের তুলনায় এসএমই খাত অন্তত চারগুণ বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। খুব সামান্য হলেও এ খাত কিছু প্রণোদনা অন্তত পেয়েছে; কিন্তু কী অবস্থা দোকান মালিকদের?

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির মতে, ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার খুব ছোট পুঁজি নিয়ে ব্যবসা করে এমন অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আছেন ৬০ লাখ। আর মুদিদোকান থেকে শুরু করে সারা দেশের ছোটখাটো বিভিন্ন পণ্যের দোকান এবং বিপণিবিতানের ব্যবসায়ী আছেন ৫৭ লাখ। অর্থাৎ এমন প্রায় সোয়া এক কোটি ব্যবসায়ী আছেন। আর মুদিদোকান থেকে শুরু করে মার্কেটের দোকানে কাজ করে এক কোটির বেশি কর্মচারী। অর্থাৎ এ খাতে কর্মরত আছেন ২ কোটির বেশি মানুষ। এর সঙ্গে তাদের পরিবারকে যুক্ত করে এ খাত জীবিকার সংস্থান করে বিপুলসংখ্যক মানুষের। এ খাত প্রচণ্ড ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার পরও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রণোদনা পাননি তারা।

আমরা এমন এক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বাস করি, যেখানে সমাজের জন্য গুরুত্বের বিবেচনায় সরকার তার নীতি ঠিক করে না। সরকারি নীতিনির্ধারিত হয় যাদের দর কষাকষির ক্ষমতা বেশি, তাদের পক্ষে। বৃহৎ শিল্প, বিশেষ করে গার্মেন্ট মালিকরা অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ার কারণে (সরকারি দলের বহু সংসদ সদস্য এসব ব্যবসার সঙ্গে জড়িত) সরকারের কাছে তাদের গুরুত্বের তুলনায় অনেক বেশি সুবিধা আদায় করে নিতে পারেন। অথচ সংগঠন হিসাবে আকারে এর চেয়ে অনেক বড় হওয়ার পরও, অনেক বেশি মানুষ এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকার পরও দোকান মালিকরা সরকার থেকে পায় না কোনো কিছুই। এ রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে এ অতি গুরুত্বপূর্ণ খাতের প্রতি সরকারের এমন দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিবাদ আমাদের জানানো উচিত। সরকারের ওপর আমাদের চাপ তৈরি করা উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য।

কিন্তু এই যে, ঈদটা চলে এলো এর আগে এখন পর্যন্ত সরকার তাদের জন্য কিছু করেনি। করেনি গত বছরও। আমাদের কেনা কিছু পণ্য এ মানুষগুলোকে বেঁচে থাকার কিছু রসদ জোগাবে। এ বছরের ঈদে এদের পণ্য কেনাকাটার সময় আমরা এ ব্যাপারটুকু অন্তত যাতে মাথায় রাখি। আর নিশ্চয়ই কেনাকাটা যদি করি, সেটা হতে হবে আগে যেভাবে বলেছি, সেসব সতর্কতামূলক নিয়ম অনুসরণ করে।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন