প্রশান্ত কিশোরের কথাই ফলে গেল!
jugantor
প্রশান্ত কিশোরের কথাই ফলে গেল!

  হারুন হাবীব  

০৪ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্র, আমাদের পড়শি দেশ ভারতের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ স্বাভাবিকভাবেই সীমান্তের এপারে আগ্রহের সৃষ্টি করে। কিন্তু সেদেশের কোনো একটি রাজ্যের ভোট বাংলাদেশের সব মহলে যেভাবে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করেছিল এবার, আগে এমনটা কখনোই দেখা যায়নি।

এর কয়েকটি প্রধান কারণ হয়তো এই : ১. দেশ দুই হলেও বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে একই ভাষা-সংস্কৃতির মানুষের বসবাস, ২. এবারের নির্বাচনি প্রচারে সাম্প্রদায়িকতাকে প্রকাশ্যে উসকে দেওয়া হয়েছিল, কারণে-অকারণে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ টানা হয়েছিল, ৩. ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারি দল বিজেপি যেভাবেই হোক ‘বাংলা দখল’ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল এবং ৪. টানা দুইবারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে তাদের ভাষায়, ‘বাংলা দখল’ করতে দেবে না বলে পালটা চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন। অতএব, আগ্রহের মাত্রাটা অনেক বেশি বেড়েছিল।

নির্বাচনি প্রচারের অনেক ক্ষেত্রেই ধরে নেওয়া হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত ইমেজ এবং গেরুয়া শিবিরের ভারত-বিস্তারি প্রভাব বাংলার মাটিতে এবার অবশ্যই ছাপ ফেলবে। বিজেপি ‘বাংলা দখল’ করবে, ঠেকানো যাবে না। এর কারণও ছিল একাধিক।

মমতার দুইবারের শাসনের বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী বিদ্যমান জনমত, ভোটের আগে মমতার শিবির থেকে বেশকিছু মন্ত্রী-সাংসদের গেরুয়া শিবিরে পাড়ি জমানো, অন্যদিকে বামফ্রন্ট, কংগ্রেস ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি অংশের নবগঠিত ‘ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট’ নামের জোট গঠনের মধ্য দিয়ে ভোটের বিভক্তি ইত্যাদি।

তবে এর বাইরেও যেটি ঘটেছিল, তা ভারতের কোনো রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের ইতিহাসে বড় ব্যতিক্রম। দেশের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সার্বক্ষণিকভাবে উপস্থিত থাকলেন প্রচারে, দেশের প্রধানমন্ত্রী বারবার এলেন পশ্চিমবঙ্গের বহু জনসভায়, যা তৃণমূলের পতনকে অনেকের চোখে প্রায় অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছিল। কিন্তু এসব কারণ সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গের ভোটার মমতার তৃণমূল কংগ্রেসকেই ক্ষমতায় আনলেন এবং টানা তৃতীয়বারের মতো। শুধু তা-ই নয়, দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসন পেল মমতার দল।

এই বিশাল সাফল্যের পরও নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে নন্দীগ্রামের আসনে খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরাজিত হলেন। জিতলেন তৃণমূল থেকে বিজেপিতে পাড়ি জমানো শুভেন্দু অধিকারী। কিন্তু এতে ফলাফলের হেরফের হওয়ার বিন্দুমাত্র কারণ নেই।

সরকার গঠনের সব বিধি মেনে মমতাই হতে যাচ্ছেন তৃতীয়বারের মতো পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। আক্ষরিক অর্থেই পশ্চিমবঙ্গের এ হার বিজেপিকে ভাবাবে। ধাক্কাটা মোটেও সাধারণ নয়। প্রশ্ন উঠবে, পশ্চিমবঙ্গের হার কি সর্বভারতীয় ভোট জলসায় প্রভাব ফেলবে? আমার ধারণা, সে হিসাবের সময় এখনো আসেনি।

একই ধারার নির্বাচনে এদিকে আসামে যদিও সরকার গঠন সম্ভব হচ্ছে; কিন্তু তামিলনাড়ু ও কেরালায় ফল আশানুরূপ হয়নি বিজেপির। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ব্যাপক হার তাৎপর্যপূর্ণ বৈকি। অতএব বিস্তর গবেষণা, পর্যালোচনা চলবে, সেটাই স্বাভাবিক। গবেষণা হবে কেন বিজেপি হারল। কেন তৃণমূল জিততে পারল। যে দলটি এখন গোটা ভারতে গেরুয়া শাসন চালু করার বিশাল সাফল্য অর্জন করেছে, বিশেষত নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত ম্যাজিকে, কেনইবা তা বাঙ্গাল মুল্লুকে স্বপ্নপূরণ করতে ব্যর্থ হলো?

ভারতীয় অনেক বিশ্লেষক নানামুখী কারণ দাঁড় করাতে শুরু করেছেন এরই মধ্যে। বেশির ভাগই মনে করছেন, নির্বাচনি প্রচারে বিজেপি যখন ধর্মীয় মেরুকরণের কাজে ব্যস্ত ছিল, তৃণমূল কংগ্রেস তখন মধ্যবিত্ত, মহিলা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু ভোটারদের একত্রিত করার সাফল্য দেখাতে পেরেছে।

অন্যদিকে রাজ্য রাজনীতিতে বিজেপির ‘অনুপ্রবেশ’ ঠেকাতে, অনেকটা অনন্যোপায় হয়েই বাম ও কংগ্রেসের ভরাডুবি হবে জেনেও তাদেরই একটি তাৎপর্যময় অংশ হয়তো মমতার দলকেই ভোট দিয়েছে, যদিও তারা চিরন্তনভাবেই মমতাবিরোধী। তা না হলে তৃণমূলের এমন বড় ভোটের ব্যবধানে জেতার কথা ছিল না বলেও কেউ কেউ মনে করেন।

আরও একটি বড় ঘটনা ঘটেছে এবারের ভোটে। যে বামেরা রাজ্যজুড়ে টানা ৩৪ বছর শাসন করেছে তারা প্রায় খালি হাতেই ঘরে ফিরেছে। বামেরা ‘রাম শাসন’ চায় না বটে; কিন্তু সুদীর্ঘ ‘বাম শাসনের’ বিন্দুমাত্র সাফল্যও আনতে পারেনি তারা। ভোটের শতাংশের অঙ্কেও বঞ্চিত তারা! অর্থাৎ রাজ্য বিধানসভা এই প্রথমবারের মতো বাম দলের প্রতিনিধি ছাড়াই চলবে।

তবে এবারের ভোটে এই প্রথমবারের মতো একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে বামফ্রন্ট। তারা রাজ্য রাজনীতিতে বয়োবৃদ্ধদের সরিয়ে একঝাঁক তরুণকে সামনে নিয়ে এসেছে। তারা রাজ্যজুড়ে ব্যাপক প্রচার চালিয়েছে, মানুষের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। তাৎক্ষণিকভাবে ফল না পেলেও অনেকেই মনে করেন, এতে সামনের দিনগুলোয় সুদিন এলেও আসতে পারে। অন্যদিকে কংগ্রেস দলটি তো প্রায় উঠেই গেল রাজ্য রাজনীতি থেকে।

পশ্চিমবঙ্গের বামেরা আবার কখনো ক্ষমতায় আসবে কি আসবে না, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। তবে এবারের ভোটে দেখা গেল কেরালায় বামদুর্গ অটুট রয়েছে। অতএব বাংলার বামেরা নিশ্চিতভাবেই আত্মানুসন্ধান করবেন বলে তাদের সমর্থকরা মনে করেন।

তবে এবারের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গেরুয়া শিবিরের উত্থানটা যেমন চমকপ্রদ, হয়তো পরাজয়টাও তেমনই। তবে ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির আধিপত্য আদপেই কতটা সুফল আনবে, তা সামনের দিনগুলোতে দেখার বিষয়। কারণ ভারত এমনই একটি দেশ, যেখানে সংস্কৃতির বহুত্ববাদী ধারায় বিপন্নতা দেখা দিলে তা আখেরে মঙ্গল বয়ে আনবে বলে অনেকেই মনে করেন না। ইতিহাসও সে দৃষ্টান্ত বহন করে না।

উল্লেখ্য, এবারের পশ্চিমবঙ্গীয় নির্বাচনে শুধু বিজেপির কেন্দ্রীয় বা রাজ্য নেতারাই নন, খোদ সংঘ পরিবারও জয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত বিজয় তারা পায়নি। কাছেও যেতে পারেনি। অতএব তারা পরাজয় বিশ্লেষণে যাবে, এটিই স্বাভাবিক। যে বিজেপি প্রায় গোটা ভারতে প্রভাব বিস্তার করেছে, কেন্দ্র শাসন করে চলেছে অনেক বছর, একমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই কেন হারতে হলো তাদের? অবশ্য এটিও ঠিক যে, এই হারার পরও বিজেপি এই প্রথমবারের মতো বাঙ্গাল রাজ্যে স্থায়ী আসন লাভ করার সাফল্য অর্জন করতে পেরেছে। কারণ তারাই বসবে বিরোধী দলের আসনে।

আপাতত যে কয়েকটি কারণ শনাক্ত করা হয়েছে এই হারের পেছনে, তার মধ্যে আছে রাজ্যে মুখচেনা প্রভাবশালী নেতার তীব্র অভাব, নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহরা বারবার ‘ভূমিপুত্র’ কেউ মুখ্যমন্ত্রী হবেন বলে প্রচার করলেও কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে তারা সরাসরি চিহ্নিত করতে পারেননি।

প্রবল জনপ্রিয় অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী সোরগোল তুলে দলে ভিড়লেও কার্যকর কিছু করতে পারেননি তিনি। বরং এককালের চরমপন্থি নকশাল থেকে এই অভিনেতার গেরুয়া শিবিরে যাওয়াটাকে সাধারণ মানুষ হয়তো মন্দ চোখেই দেখেছেন। ফলে মুখ্যমন্ত্রীর পদে কে বসবে সে ব্যাপারে একটা সংকট ছিল বৈকি।

অন্যদিকে তৃণমূল শিবিরে ছিল রাজ্য রাজনীতির পরীক্ষিত লড়াকু নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি ১০ বছর আগে বামেদের ৩৪ বছরের ক্ষমতার ছেদ ঘটানোর সাফল্য দেখিয়েছেন। মমতার সমালোচনা কম আছে ভাবার কারণ নেই; কিন্তু তার লড়াকু চরিত্র সর্বজনবিদিত।

আরেকটি দিকও আলোচনায় এসেছে বৈকি। বিজেপিকে এন্তার ‘বহিরাগত’ আখ্যা দিয়ে সামনে এগিয়ে গেছে তৃণমূল। এর যৌক্তিক কারণও আছে কিছু। রাজ্য বিজেপির গঠন ও পরিচালিত হয়েছে সেই সব মুখচেনা রাজনীতিবিদের হাতে, যারা দীর্ঘদিন তৃণমূলে ছিলেন, নয়তো কংগ্রেসে-যারা ভোটের আগে বিজেপিতে পাড়ি দিয়েছিলেন। বলা বাহুল্য, সাধারণ ভোটাররা এই ‘টার্ন কোট ওয়ালাদের’ ভালো চোখে দেখেননি।

অন্যদিকে ধর্মীয় মেরুকরণকে হাতিয়ার করে বিজেপি যেভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করেছিল, তাতে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। যে পশ্চিমবঙ্গে ২৭ শতাংশের উপরে সংখ্যালঘু ভোটার, সেখানে এই একদর্শী মেরুকরণ বিস্তর প্রভাব ফেলেছিল। অন্যদিকে বাংলার শাশ্বত কিংবা ঐতিহ্যবাহী সহাবস্থানের অনুসারীরা ধর্মীয় মেরুকরণের আতঙ্কে চিন্তিত হয়েছিলেন।

তারা ভেবেছিলেন, ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলে হয়তোবা হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কে বড় চির ধরবে, যা রাজ্যের অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিচর্চায় অশুভ প্রভাব ফেলবে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য, শিল্পকলা, চলচ্চিত্র এবং সৃজনশীল জগতের একটি বড় অংশ বিজেপিকে ঠেকানোর যুক্তি খুঁজে পেয়েছিল। ‘জয়বাংলা’ তাদের স্লোগান হয়ে উঠেছিল।

এর বাইরেও হয়তো আরও কিছু যৌক্তিক কারণ থাকবে, যা তৃণমূলকে অসামান্য বিজয় দিয়েছে। তবে বিস্ময় সৃষ্টি করেছেন এককালে বিহারের রাজনীতিতে যুক্ত প্রশান্ত কিশোর, যিনি বেশ কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে ভোটে কী ঘটতে যাচ্ছে, সেই দাবি করে যচ্ছিলেন আগেভাগে। প্রশান্ত কিশোর মমতা শিবিরের ভোট পরিচালনায় যুক্ত এমন একজন দক্ষ কুশলী, যিনি ভারতের বহু জায়গাতেই নির্বাচনি উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করেছেন।

এবারের ফলাফল প্রকাশের আগে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে এমনটিও বলেছিলেন, যদি বিজেপি ১০০ বা তার বেশি আসন লাভ করে, তাহলে তিনি নির্বাচনি কাজ ছেড়ে দেবেন। অন্য কাজে যুক্ত হবেন। আরও বলেছিলেন, তৃণমূল দুইশরও বেশি আসন পেতে যাচ্ছে।

বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে এ ভোটকুশলীর আশাবাদ ঘিরে নানা বিদ্রূপও হয়েছে। বেশির ভাগই বিশ্বাস রাখতে পারেননি এ ভবিষ্যদ্বাণীতে। কিন্তু শেষমেশ দেখা গেল প্রশান্ত কিশোরের কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল!

হারুন হাবীব : লেখক, বিশ্লেষক

প্রশান্ত কিশোরের কথাই ফলে গেল!

 হারুন হাবীব 
০৪ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্র, আমাদের পড়শি দেশ ভারতের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ স্বাভাবিকভাবেই সীমান্তের এপারে আগ্রহের সৃষ্টি করে। কিন্তু সেদেশের কোনো একটি রাজ্যের ভোট বাংলাদেশের সব মহলে যেভাবে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করেছিল এবার, আগে এমনটা কখনোই দেখা যায়নি।

এর কয়েকটি প্রধান কারণ হয়তো এই : ১. দেশ দুই হলেও বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে একই ভাষা-সংস্কৃতির মানুষের বসবাস, ২. এবারের নির্বাচনি প্রচারে সাম্প্রদায়িকতাকে প্রকাশ্যে উসকে দেওয়া হয়েছিল, কারণে-অকারণে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ টানা হয়েছিল, ৩. ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারি দল বিজেপি যেভাবেই হোক ‘বাংলা দখল’ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল এবং ৪. টানা দুইবারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে তাদের ভাষায়, ‘বাংলা দখল’ করতে দেবে না বলে পালটা চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন। অতএব, আগ্রহের মাত্রাটা অনেক বেশি বেড়েছিল।

নির্বাচনি প্রচারের অনেক ক্ষেত্রেই ধরে নেওয়া হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত ইমেজ এবং গেরুয়া শিবিরের ভারত-বিস্তারি প্রভাব বাংলার মাটিতে এবার অবশ্যই ছাপ ফেলবে। বিজেপি ‘বাংলা দখল’ করবে, ঠেকানো যাবে না। এর কারণও ছিল একাধিক।

মমতার দুইবারের শাসনের বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী বিদ্যমান জনমত, ভোটের আগে মমতার শিবির থেকে বেশকিছু মন্ত্রী-সাংসদের গেরুয়া শিবিরে পাড়ি জমানো, অন্যদিকে বামফ্রন্ট, কংগ্রেস ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি অংশের নবগঠিত ‘ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট’ নামের জোট গঠনের মধ্য দিয়ে ভোটের বিভক্তি ইত্যাদি।

তবে এর বাইরেও যেটি ঘটেছিল, তা ভারতের কোনো রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের ইতিহাসে বড় ব্যতিক্রম। দেশের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সার্বক্ষণিকভাবে উপস্থিত থাকলেন প্রচারে, দেশের প্রধানমন্ত্রী বারবার এলেন পশ্চিমবঙ্গের বহু জনসভায়, যা তৃণমূলের পতনকে অনেকের চোখে প্রায় অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছিল। কিন্তু এসব কারণ সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গের ভোটার মমতার তৃণমূল কংগ্রেসকেই ক্ষমতায় আনলেন এবং টানা তৃতীয়বারের মতো। শুধু তা-ই নয়, দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসন পেল মমতার দল।

এই বিশাল সাফল্যের পরও নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে নন্দীগ্রামের আসনে খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরাজিত হলেন। জিতলেন তৃণমূল থেকে বিজেপিতে পাড়ি জমানো শুভেন্দু অধিকারী। কিন্তু এতে ফলাফলের হেরফের হওয়ার বিন্দুমাত্র কারণ নেই।

সরকার গঠনের সব বিধি মেনে মমতাই হতে যাচ্ছেন তৃতীয়বারের মতো পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। আক্ষরিক অর্থেই পশ্চিমবঙ্গের এ হার বিজেপিকে ভাবাবে। ধাক্কাটা মোটেও সাধারণ নয়। প্রশ্ন উঠবে, পশ্চিমবঙ্গের হার কি সর্বভারতীয় ভোট জলসায় প্রভাব ফেলবে? আমার ধারণা, সে হিসাবের সময় এখনো আসেনি।

একই ধারার নির্বাচনে এদিকে আসামে যদিও সরকার গঠন সম্ভব হচ্ছে; কিন্তু তামিলনাড়ু ও কেরালায় ফল আশানুরূপ হয়নি বিজেপির। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ব্যাপক হার তাৎপর্যপূর্ণ বৈকি। অতএব বিস্তর গবেষণা, পর্যালোচনা চলবে, সেটাই স্বাভাবিক। গবেষণা হবে কেন বিজেপি হারল। কেন তৃণমূল জিততে পারল। যে দলটি এখন গোটা ভারতে গেরুয়া শাসন চালু করার বিশাল সাফল্য অর্জন করেছে, বিশেষত নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত ম্যাজিকে, কেনইবা তা বাঙ্গাল মুল্লুকে স্বপ্নপূরণ করতে ব্যর্থ হলো?

ভারতীয় অনেক বিশ্লেষক নানামুখী কারণ দাঁড় করাতে শুরু করেছেন এরই মধ্যে। বেশির ভাগই মনে করছেন, নির্বাচনি প্রচারে বিজেপি যখন ধর্মীয় মেরুকরণের কাজে ব্যস্ত ছিল, তৃণমূল কংগ্রেস তখন মধ্যবিত্ত, মহিলা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু ভোটারদের একত্রিত করার সাফল্য দেখাতে পেরেছে।

অন্যদিকে রাজ্য রাজনীতিতে বিজেপির ‘অনুপ্রবেশ’ ঠেকাতে, অনেকটা অনন্যোপায় হয়েই বাম ও কংগ্রেসের ভরাডুবি হবে জেনেও তাদেরই একটি তাৎপর্যময় অংশ হয়তো মমতার দলকেই ভোট দিয়েছে, যদিও তারা চিরন্তনভাবেই মমতাবিরোধী। তা না হলে তৃণমূলের এমন বড় ভোটের ব্যবধানে জেতার কথা ছিল না বলেও কেউ কেউ মনে করেন।

আরও একটি বড় ঘটনা ঘটেছে এবারের ভোটে। যে বামেরা রাজ্যজুড়ে টানা ৩৪ বছর শাসন করেছে তারা প্রায় খালি হাতেই ঘরে ফিরেছে। বামেরা ‘রাম শাসন’ চায় না বটে; কিন্তু সুদীর্ঘ ‘বাম শাসনের’ বিন্দুমাত্র সাফল্যও আনতে পারেনি তারা। ভোটের শতাংশের অঙ্কেও বঞ্চিত তারা! অর্থাৎ রাজ্য বিধানসভা এই প্রথমবারের মতো বাম দলের প্রতিনিধি ছাড়াই চলবে।

তবে এবারের ভোটে এই প্রথমবারের মতো একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে বামফ্রন্ট। তারা রাজ্য রাজনীতিতে বয়োবৃদ্ধদের সরিয়ে একঝাঁক তরুণকে সামনে নিয়ে এসেছে। তারা রাজ্যজুড়ে ব্যাপক প্রচার চালিয়েছে, মানুষের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। তাৎক্ষণিকভাবে ফল না পেলেও অনেকেই মনে করেন, এতে সামনের দিনগুলোয় সুদিন এলেও আসতে পারে। অন্যদিকে কংগ্রেস দলটি তো প্রায় উঠেই গেল রাজ্য রাজনীতি থেকে।

পশ্চিমবঙ্গের বামেরা আবার কখনো ক্ষমতায় আসবে কি আসবে না, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। তবে এবারের ভোটে দেখা গেল কেরালায় বামদুর্গ অটুট রয়েছে। অতএব বাংলার বামেরা নিশ্চিতভাবেই আত্মানুসন্ধান করবেন বলে তাদের সমর্থকরা মনে করেন।

তবে এবারের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গেরুয়া শিবিরের উত্থানটা যেমন চমকপ্রদ, হয়তো পরাজয়টাও তেমনই। তবে ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির আধিপত্য আদপেই কতটা সুফল আনবে, তা সামনের দিনগুলোতে দেখার বিষয়। কারণ ভারত এমনই একটি দেশ, যেখানে সংস্কৃতির বহুত্ববাদী ধারায় বিপন্নতা দেখা দিলে তা আখেরে মঙ্গল বয়ে আনবে বলে অনেকেই মনে করেন না। ইতিহাসও সে দৃষ্টান্ত বহন করে না।

উল্লেখ্য, এবারের পশ্চিমবঙ্গীয় নির্বাচনে শুধু বিজেপির কেন্দ্রীয় বা রাজ্য নেতারাই নন, খোদ সংঘ পরিবারও জয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত বিজয় তারা পায়নি। কাছেও যেতে পারেনি। অতএব তারা পরাজয় বিশ্লেষণে যাবে, এটিই স্বাভাবিক। যে বিজেপি প্রায় গোটা ভারতে প্রভাব বিস্তার করেছে, কেন্দ্র শাসন করে চলেছে অনেক বছর, একমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই কেন হারতে হলো তাদের? অবশ্য এটিও ঠিক যে, এই হারার পরও বিজেপি এই প্রথমবারের মতো বাঙ্গাল রাজ্যে স্থায়ী আসন লাভ করার সাফল্য অর্জন করতে পেরেছে। কারণ তারাই বসবে বিরোধী দলের আসনে।

আপাতত যে কয়েকটি কারণ শনাক্ত করা হয়েছে এই হারের পেছনে, তার মধ্যে আছে রাজ্যে মুখচেনা প্রভাবশালী নেতার তীব্র অভাব, নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহরা বারবার ‘ভূমিপুত্র’ কেউ মুখ্যমন্ত্রী হবেন বলে প্রচার করলেও কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে তারা সরাসরি চিহ্নিত করতে পারেননি।

প্রবল জনপ্রিয় অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী সোরগোল তুলে দলে ভিড়লেও কার্যকর কিছু করতে পারেননি তিনি। বরং এককালের চরমপন্থি নকশাল থেকে এই অভিনেতার গেরুয়া শিবিরে যাওয়াটাকে সাধারণ মানুষ হয়তো মন্দ চোখেই দেখেছেন। ফলে মুখ্যমন্ত্রীর পদে কে বসবে সে ব্যাপারে একটা সংকট ছিল বৈকি।

অন্যদিকে তৃণমূল শিবিরে ছিল রাজ্য রাজনীতির পরীক্ষিত লড়াকু নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি ১০ বছর আগে বামেদের ৩৪ বছরের ক্ষমতার ছেদ ঘটানোর সাফল্য দেখিয়েছেন। মমতার সমালোচনা কম আছে ভাবার কারণ নেই; কিন্তু তার লড়াকু চরিত্র সর্বজনবিদিত।

আরেকটি দিকও আলোচনায় এসেছে বৈকি। বিজেপিকে এন্তার ‘বহিরাগত’ আখ্যা দিয়ে সামনে এগিয়ে গেছে তৃণমূল। এর যৌক্তিক কারণও আছে কিছু। রাজ্য বিজেপির গঠন ও পরিচালিত হয়েছে সেই সব মুখচেনা রাজনীতিবিদের হাতে, যারা দীর্ঘদিন তৃণমূলে ছিলেন, নয়তো কংগ্রেসে-যারা ভোটের আগে বিজেপিতে পাড়ি দিয়েছিলেন। বলা বাহুল্য, সাধারণ ভোটাররা এই ‘টার্ন কোট ওয়ালাদের’ ভালো চোখে দেখেননি।

অন্যদিকে ধর্মীয় মেরুকরণকে হাতিয়ার করে বিজেপি যেভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করেছিল, তাতে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। যে পশ্চিমবঙ্গে ২৭ শতাংশের উপরে সংখ্যালঘু ভোটার, সেখানে এই একদর্শী মেরুকরণ বিস্তর প্রভাব ফেলেছিল। অন্যদিকে বাংলার শাশ্বত কিংবা ঐতিহ্যবাহী সহাবস্থানের অনুসারীরা ধর্মীয় মেরুকরণের আতঙ্কে চিন্তিত হয়েছিলেন।

তারা ভেবেছিলেন, ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলে হয়তোবা হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কে বড় চির ধরবে, যা রাজ্যের অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিচর্চায় অশুভ প্রভাব ফেলবে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য, শিল্পকলা, চলচ্চিত্র এবং সৃজনশীল জগতের একটি বড় অংশ বিজেপিকে ঠেকানোর যুক্তি খুঁজে পেয়েছিল। ‘জয়বাংলা’ তাদের স্লোগান হয়ে উঠেছিল।

এর বাইরেও হয়তো আরও কিছু যৌক্তিক কারণ থাকবে, যা তৃণমূলকে অসামান্য বিজয় দিয়েছে। তবে বিস্ময় সৃষ্টি করেছেন এককালে বিহারের রাজনীতিতে যুক্ত প্রশান্ত কিশোর, যিনি বেশ কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে ভোটে কী ঘটতে যাচ্ছে, সেই দাবি করে যচ্ছিলেন আগেভাগে। প্রশান্ত কিশোর মমতা শিবিরের ভোট পরিচালনায় যুক্ত এমন একজন দক্ষ কুশলী, যিনি ভারতের বহু জায়গাতেই নির্বাচনি উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করেছেন।

এবারের ফলাফল প্রকাশের আগে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে এমনটিও বলেছিলেন, যদি বিজেপি ১০০ বা তার বেশি আসন লাভ করে, তাহলে তিনি নির্বাচনি কাজ ছেড়ে দেবেন। অন্য কাজে যুক্ত হবেন। আরও বলেছিলেন, তৃণমূল দুইশরও বেশি আসন পেতে যাচ্ছে।

বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে এ ভোটকুশলীর আশাবাদ ঘিরে নানা বিদ্রূপও হয়েছে। বেশির ভাগই বিশ্বাস রাখতে পারেননি এ ভবিষ্যদ্বাণীতে। কিন্তু শেষমেশ দেখা গেল প্রশান্ত কিশোরের কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল!

হারুন হাবীব : লেখক, বিশ্লেষক

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন