আপন কীর্তিতে দেদীপ্যমান
jugantor
স্মরণ
আপন কীর্তিতে দেদীপ্যমান

  সালাহউদ্দিন আহমদ চৌধুরী লিপু  

০৯ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ জামাতা ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বামী প্রখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম ওয়াজেদ মিয়ার দ্বাদশ মৃত্যুবার্ষিকী আজ। তিনি বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৪২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রংপুর জেলাধীন পীরগঞ্জ উপজেলার ফতেহপুর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা আবদুল কাদের মিয়া ও মাতা ময়েজুন্নেছা। তার পারিবারিক নাম ছিল সুধা মিয়া।

ড. এম ওয়াজেদ মিয়া রংপুর জিলা স্কুল থেকে ১৯৫৬ সালে প্রথম বিভাগে মেট্রিক পাশ করেন। ১৯৫৮ সালে তিনি রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। ১৯৬১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় স্থান লাভ এবং ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। ড. এম ওয়াজেদ মিয়া ১৯৬৩ সালের ৯ এপ্রিল তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে আণবিক শক্তি কমিশনে চাকরিতে যোগ দেন। তিনি ১৯৬৪ সালে ব্রিটেনের ইম্পেরিয়াল কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ‘ডিপ্লোমা অব ইম্পেরিয়াল কলেজ কোর্স’ সম্পন্ন এবং ১৯৬৭ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে ব্রিটেনের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভের পর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করলে সে বছর তাকে ঢাকার আণবিক শক্তি গবেষণা কেন্দ্রে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি ১৯৬৭ সালের ১৭ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনার সঙ্গে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন।

জীবনী থেকে জানা যায়, বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের অধিকারী ড. এম ওয়াজেদ মিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ১৯৬১ সালে ছাত্রলীগে যোগ দেন। ১৯৬২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগের প্রার্থী হিসাবে ভিপি নির্বাচিত হন। একই বছর আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে গ্রেফতার হয়ে তাকে কারাবরণ করতে হয়। ১৯৬২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারেই তার সাক্ষাৎ ঘটে। তিনি ছাত্র অবস্থায় ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও চাকরির কারণে তার আর রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা সম্ভব হয়নি। ১৯৬৯ সালে ইতালির ট্রিয়েস্টের আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র তাকে অ্যাসোসিয়েটশিপ প্রদান করে। সে সুবাদে তিনি ১৯৬৯, ১৯৭৩ ও ১৯৮৩ সালে ওই গবেষণা কেন্দ্রে প্রতিবার ছয় মাস গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৬৯ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৭০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি ওয়াশিংটনের ড্যারেসবেরি নিউক্লিয়ার ল্যাবরেটরিতে পোস্ট ডক্টরাল গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৭১ সালের ১২ মে এম ওয়াজেদ মিয়া তার সহধর্মিণী শেখ হাসিনাসহ বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে ঢাকার মগবাজার থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার হয়ে ধানমণ্ডিতে বন্দি ছিলেন। তিনি ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির কার্লসরবয়ে শহরের আণবিক কমিশনে গবেষণার মাধ্যমে রিঅ্যাক্টর বিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ১ অক্টোবর থেকে ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভারতের আণবিক শক্তির দিল্লির ল্যাবরেটরিতে গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। ড. এম ওয়াজেদ মিয়া সর্বদা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাকে বিজ্ঞানী হিসাবে দেখতে চেয়েছেন। রাজনীতিতে তাকে কখনোই জড়ানোর চেষ্টা করেননি। এম ওয়াজেদ মিয়া ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ সাত বছর নির্বাসিত জীবন কাটান। ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে তিনি পুনরায় পরমাণু শক্তি কমিশনে যোগ দেন।

বহুমাত্রিক ড. এম ওয়াজেদ মিয়া স্নাতক স্তরের ফলিতবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য দুটি গ্রন্থ রচনা করেন। ইংরেজিতে লেখা তার দুটি গ্রন্থ Fundamentals of Thermodynamics ও Fundamentals of Electromagnetics ১৯৮২ সালে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা Tata McGraw-Hill প্রকাশ করে। তার অন্যতম গ্রন্থ ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ’ ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয়। তার অপর গ্রন্থ ‘বাংলাদেশের রাজনীতি ও সরকারের চালচিত্র’ বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি প্রেস লি. কর্তৃক ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয়। ড. এম ওয়াজেদ মিয়া বিভিন্ন আঞ্চলিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানবিষয়ক সম্মেলনে অংশ নেন।

ড. এম ওয়াজেদ মিয়ার কর্ম ও খ্যাতির সীমানা বিস্তৃত, যোগ্যতার নিরিখে ১৯৭২, ৭৪ সালে তিনি বাংলাদেশ শক্তি বিজ্ঞানী সংঘের সাধারণ সম্পাদক, ১৯৮৩, ৮৪, ৮৫ সালে ওই সংস্থার সভাপতি, ১৯৮৫-৮৮ সাল মেয়াদে বাংলাদেশ পদার্থবিজ্ঞান সমিতির সাধারণ সম্পাদক, ১৯৯৭-৮৯ সালে ওই সমিতির সভাপতি, ১৯৯১-৯২ সালে আণবিক শক্তি বিজ্ঞানী সংঘের সভাপতি, ১৯৮৯-৯৩ মেয়াদে বাংলাদেশ বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞানজীবী সমিতির সভাপতি, ১৯৯৪-৯৬ সাল মেয়াদে বাংলাদেশ বিজ্ঞান উন্নয়ন সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। এ ছাড়া তিনি বঙ্গবন্ধু গবেষণা কেন্দ্র পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা ছিলেন। বিজ্ঞানে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯৭ সালে স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু স্বর্ণপদক ও ম্যাবস ইন্টারন্যাশনাল পদকপ্রাপ্ত হন। এম ওয়াজেদ মিয়া ১৯৯৯ সালে আণবিক শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যানের পদ থেকে অবসরগ্রহণ করেন। তিনি ২০০৯ সালের ৯ মে ৬৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

প্রথিতযশা পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম ওয়াজেদ মিয়া স্বপ্ন দেখতেন বিশ্বে বাংলাদেশ বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ একটি দেশ হিসাবে পরিচিতি লাভ করবে। বাংলাদেশের রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্বপ্নদ্রষ্টা তিনি। সে স্বপ্ন বাস্তবায়নে তার নিরলস পরিশ্রম আমৃত্য অব্যাহত রেখেছিলেন। সাভারে আণবিক শক্তি কমিশন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন। তার স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ড. এম ওয়াজেদ মিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট’, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ বিজ্ঞানাগার ‘ড. এম ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র’, নাটোরে ‘ড. এম ওয়াজেদ মিয়া কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়’ এবং রংপুরে ‘ড. এম ওয়াজেদ মিয়া টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

জ্ঞানতাপস, নিভৃতচারী ও প্রচারবিমুখ ড. এম ওয়াজেদ মিয়া একজন মেধাবী ও সৃজনশীল মানুষ ছিলেন। পাণ্ডিত্য ও প্রতিভার দ্বারা তিনি নিজস্ব একটি পরিচয় গড়তে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি জয়ী হয়েছেন বিজ্ঞানের জন্য উজ্জীবিত কর্মের সাধনায়। তার বিজ্ঞানচর্চার পরিধি ছিল বিশাল, তার অপরিসীম জ্ঞানে আলোকিত হয়েছে আমাদের দেশ। তার মতো সৎ, নীতিবান, দৃঢ়চেতা, অজাতশত্রু ও দেশপ্রেমিক ব্যক্তি বিরল। তিনি সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। ব্যক্তিজীবনে ক্ষমতার মধ্যে থেকেও কখনো ক্ষমতার অপব্যবহার করেননি এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেননি। তিনি পরমাণু বিজ্ঞানকে বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের জন্য আজীবন নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। বিজ্ঞান সাধনার প্রবাদপুরুষ হিসাবে তিনি যুগে যুগে বাংলাদেশের ইতিহাসে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ চৌধুরী লিপু : রাজনীতিক

স্মরণ

আপন কীর্তিতে দেদীপ্যমান

 সালাহউদ্দিন আহমদ চৌধুরী লিপু 
০৯ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ জামাতা ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বামী প্রখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম ওয়াজেদ মিয়ার দ্বাদশ মৃত্যুবার্ষিকী আজ। তিনি বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৪২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রংপুর জেলাধীন পীরগঞ্জ উপজেলার ফতেহপুর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা আবদুল কাদের মিয়া ও মাতা ময়েজুন্নেছা। তার পারিবারিক নাম ছিল সুধা মিয়া।

ড. এম ওয়াজেদ মিয়া রংপুর জিলা স্কুল থেকে ১৯৫৬ সালে প্রথম বিভাগে মেট্রিক পাশ করেন। ১৯৫৮ সালে তিনি রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। ১৯৬১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় স্থান লাভ এবং ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। ড. এম ওয়াজেদ মিয়া ১৯৬৩ সালের ৯ এপ্রিল তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে আণবিক শক্তি কমিশনে চাকরিতে যোগ দেন। তিনি ১৯৬৪ সালে ব্রিটেনের ইম্পেরিয়াল কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ‘ডিপ্লোমা অব ইম্পেরিয়াল কলেজ কোর্স’ সম্পন্ন এবং ১৯৬৭ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে ব্রিটেনের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভের পর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করলে সে বছর তাকে ঢাকার আণবিক শক্তি গবেষণা কেন্দ্রে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি ১৯৬৭ সালের ১৭ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনার সঙ্গে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন।

জীবনী থেকে জানা যায়, বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের অধিকারী ড. এম ওয়াজেদ মিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ১৯৬১ সালে ছাত্রলীগে যোগ দেন। ১৯৬২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগের প্রার্থী হিসাবে ভিপি নির্বাচিত হন। একই বছর আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে গ্রেফতার হয়ে তাকে কারাবরণ করতে হয়। ১৯৬২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারেই তার সাক্ষাৎ ঘটে। তিনি ছাত্র অবস্থায় ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও চাকরির কারণে তার আর রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা সম্ভব হয়নি। ১৯৬৯ সালে ইতালির ট্রিয়েস্টের আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র তাকে অ্যাসোসিয়েটশিপ প্রদান করে। সে সুবাদে তিনি ১৯৬৯, ১৯৭৩ ও ১৯৮৩ সালে ওই গবেষণা কেন্দ্রে প্রতিবার ছয় মাস গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৬৯ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৭০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি ওয়াশিংটনের ড্যারেসবেরি নিউক্লিয়ার ল্যাবরেটরিতে পোস্ট ডক্টরাল গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৭১ সালের ১২ মে এম ওয়াজেদ মিয়া তার সহধর্মিণী শেখ হাসিনাসহ বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে ঢাকার মগবাজার থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার হয়ে ধানমণ্ডিতে বন্দি ছিলেন। তিনি ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির কার্লসরবয়ে শহরের আণবিক কমিশনে গবেষণার মাধ্যমে রিঅ্যাক্টর বিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ১ অক্টোবর থেকে ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভারতের আণবিক শক্তির দিল্লির ল্যাবরেটরিতে গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। ড. এম ওয়াজেদ মিয়া সর্বদা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাকে বিজ্ঞানী হিসাবে দেখতে চেয়েছেন। রাজনীতিতে তাকে কখনোই জড়ানোর চেষ্টা করেননি। এম ওয়াজেদ মিয়া ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ সাত বছর নির্বাসিত জীবন কাটান। ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে তিনি পুনরায় পরমাণু শক্তি কমিশনে যোগ দেন।

বহুমাত্রিক ড. এম ওয়াজেদ মিয়া স্নাতক স্তরের ফলিতবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য দুটি গ্রন্থ রচনা করেন। ইংরেজিতে লেখা তার দুটি গ্রন্থ Fundamentals of Thermodynamics ও Fundamentals of Electromagnetics ১৯৮২ সালে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা Tata McGraw-Hill প্রকাশ করে। তার অন্যতম গ্রন্থ ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ’ ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয়। তার অপর গ্রন্থ ‘বাংলাদেশের রাজনীতি ও সরকারের চালচিত্র’ বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি প্রেস লি. কর্তৃক ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয়। ড. এম ওয়াজেদ মিয়া বিভিন্ন আঞ্চলিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানবিষয়ক সম্মেলনে অংশ নেন।

ড. এম ওয়াজেদ মিয়ার কর্ম ও খ্যাতির সীমানা বিস্তৃত, যোগ্যতার নিরিখে ১৯৭২, ৭৪ সালে তিনি বাংলাদেশ শক্তি বিজ্ঞানী সংঘের সাধারণ সম্পাদক, ১৯৮৩, ৮৪, ৮৫ সালে ওই সংস্থার সভাপতি, ১৯৮৫-৮৮ সাল মেয়াদে বাংলাদেশ পদার্থবিজ্ঞান সমিতির সাধারণ সম্পাদক, ১৯৯৭-৮৯ সালে ওই সমিতির সভাপতি, ১৯৯১-৯২ সালে আণবিক শক্তি বিজ্ঞানী সংঘের সভাপতি, ১৯৮৯-৯৩ মেয়াদে বাংলাদেশ বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞানজীবী সমিতির সভাপতি, ১৯৯৪-৯৬ সাল মেয়াদে বাংলাদেশ বিজ্ঞান উন্নয়ন সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। এ ছাড়া তিনি বঙ্গবন্ধু গবেষণা কেন্দ্র পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা ছিলেন। বিজ্ঞানে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯৭ সালে স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু স্বর্ণপদক ও ম্যাবস ইন্টারন্যাশনাল পদকপ্রাপ্ত হন। এম ওয়াজেদ মিয়া ১৯৯৯ সালে আণবিক শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যানের পদ থেকে অবসরগ্রহণ করেন। তিনি ২০০৯ সালের ৯ মে ৬৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

প্রথিতযশা পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম ওয়াজেদ মিয়া স্বপ্ন দেখতেন বিশ্বে বাংলাদেশ বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ একটি দেশ হিসাবে পরিচিতি লাভ করবে। বাংলাদেশের রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্বপ্নদ্রষ্টা তিনি। সে স্বপ্ন বাস্তবায়নে তার নিরলস পরিশ্রম আমৃত্য অব্যাহত রেখেছিলেন। সাভারে আণবিক শক্তি কমিশন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন। তার স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ড. এম ওয়াজেদ মিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট’, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ বিজ্ঞানাগার ‘ড. এম ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র’, নাটোরে ‘ড. এম ওয়াজেদ মিয়া কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়’ এবং রংপুরে ‘ড. এম ওয়াজেদ মিয়া টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

জ্ঞানতাপস, নিভৃতচারী ও প্রচারবিমুখ ড. এম ওয়াজেদ মিয়া একজন মেধাবী ও সৃজনশীল মানুষ ছিলেন। পাণ্ডিত্য ও প্রতিভার দ্বারা তিনি নিজস্ব একটি পরিচয় গড়তে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি জয়ী হয়েছেন বিজ্ঞানের জন্য উজ্জীবিত কর্মের সাধনায়। তার বিজ্ঞানচর্চার পরিধি ছিল বিশাল, তার অপরিসীম জ্ঞানে আলোকিত হয়েছে আমাদের দেশ। তার মতো সৎ, নীতিবান, দৃঢ়চেতা, অজাতশত্রু ও দেশপ্রেমিক ব্যক্তি বিরল। তিনি সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। ব্যক্তিজীবনে ক্ষমতার মধ্যে থেকেও কখনো ক্ষমতার অপব্যবহার করেননি এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেননি। তিনি পরমাণু বিজ্ঞানকে বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের জন্য আজীবন নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। বিজ্ঞান সাধনার প্রবাদপুরুষ হিসাবে তিনি যুগে যুগে বাংলাদেশের ইতিহাসে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ চৌধুরী লিপু : রাজনীতিক

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন