করোনাকালে কেন এ অপরিণামদর্শী ঈদযাত্রা?
jugantor
করোনাকালে কেন এ অপরিণামদর্শী ঈদযাত্রা?

  এ কে এম শাহনাওয়াজ  

১১ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনা মহামারি সারা পৃথিবীকেই নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। মানুষের যাপিত জীবনে এনেছে পরিবর্তন। হোমকোয়ারেন্টিন আর লকডাউন শব্দের সঙ্গে পরিচিত করিয়েছে আমাদের। পরিচিত করিয়েছে ‘সামাজিক দূরত্ব’ নামে একটি নতুন ধারণার সঙ্গে। আর সবকিছুর মধ্যে অদৃশ্য শত্রু করোনা ছড়িয়েছে মৃত্যুভীতি। বাংলাদেশের ধর্মপ্রবণ ও উৎসবপ্রিয় মানুষের চিরচেনা দিনগুলোকেও এলোমেলো করে দিয়েছে।

এ সময়টি একটি প্রতীকী শব্দ ‘করোনাকাল’ নামে হয়তো ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এ করোনাকালেই তৃতীয়বারের মতো বাঙালি মুসলমানের সামনে উপস্থিত হচ্ছে ঈদ। বিশেষ করে সবচেয়ে বড় ধর্মীয় সামাজিক উৎসব ঈদুলফিতর বা রমজানের ঈদ। গত বছর সংক্রমণের ভীতিকে উপেক্ষা করে স্রোতের মতো মানুষ নানা যানবাহনে ছুটে গেছে স্বজনদের কাছে। ঈদুল-আজহায় কুরবানি দিয়েছে মহাসমারোহে।

এবার রোজার আগে থেকেই করোনা পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নিয়েছে। দ্বিতীয় ঢেউ লাশের মিছিল বড় করেছে। সরকার নানা প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করছে। কয়েক দফা ‘কঠোর’ লকডাউন ঘোষণা করেছে। কিন্তু তেমন কঠোরতা আরোপ করা যায়নি। অদ্ভুত আত্মবিশ্বাসী বাঙালি আমরা। নিজে আক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত নিজেকে ও পরিবারকে নিরাপদ মনে করে স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়কে গুরুত্ব দিই না।

কেউ কেউ মনে করি, করোনা ধনীদের রোগ। আমরা ধনী নই, তাই আমাদের মাস্ক পরার দরকার নেই। এমনই নানা ধরনের মতবাদ আমরা দেখতে পাচ্ছি। তবে এ স্বস্তি পাওয়া মানুষের সাম্প্রতিক সময়ের একটি পরিসংখ্যান জানাতে চাই; তা হচ্ছে দরিদ্রদেরও ক্ষমা করছে না করোনা। মুগদা হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া করোনা রোগীর ৯০ শতাংশ এখন দরিদ্র ও নিুমধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ।

সংক্রমণ রোধ করার জন্য সরকার গণপরিবহণ, শপিংমল সব বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক, কর্মচারী, গণপরিবহণের মালিক, চালক, শ্রমিক সবার জীবিকার প্রশ্নে কোনো সমাধান না থাকায় তাদের চাপের মুখে সরকারকে একে একে সব খুলে দিতে হচ্ছে। তবে ঢিলেঢালা লকডাউন হলেও এরই মধ্যে কিছু ইতিবাচক প্রভাব আমরা দেখতে পাচ্ছি। সংক্রমণ ও মৃত্যু কিছুটা কমে এসেছে। সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের সরকার ছুটি কমিয়ে ঈদের গ্রামমুখী স্রোত কমাতে চেয়েছে। কিন্তু পরিজনের সঙ্গে ঈদ করতে উন্মুখ উৎসবপ্রিয় বাঙালিকে আটকে রাখা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। সুতরাং এ নিুমুখী মৃত্যু আর সংক্রমণের সূচক যে আবারও ঊর্ধ্বমুখী হবে না, সে কথা কেউ বলতে পারে না।

তবে মানতেই হবে, করোনাকাল ঈদ উৎসবে বড় রকম ছন্দপতন ঘটিয়েছে। স্থবির করে দিয়েছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ। প্রকৃত অর্থে ঈদুলফিতরের উৎসব শুরু হয় রমজানের শুরু থেকেই। রমজান হচ্ছে ঈদের আগমনি সুর। করোনা রমজানকেও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবের আঙ্গিকে উদযাপিত হতে দেয়নি। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার প্রয়োজনে মসজিদগুলোয় মুসল্লির সংখ্যা সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। চিরায়ত তারাবি নামাজে ছন্দপতন ঘটে এবার। এভাবে ঈদ উৎসবের প্রেক্ষাপট কিছুটা বিবর্ণ হয়ে যায়।

ইফতারি নিয়ে একটি সাজসাজ প্রস্তুতি থাকে রাজধানী থেকে শুরু করে ছোট-বড় শহরেও। নামকরা রেস্টুরেন্ট থেকে মৌসুমি দোকানগুলোয় হরেক ইফতারির মেলা বসে। এবার তা একেবারেই সীমিত হয়ে গেছে। সেহরির সময় কোনো রেস্টুরেন্ট খুলতে পেরেছে কি না জানি না। সব মিলিয়ে করোনাকালের ঈদ প্রস্তুতির মধ্যে একটি বিষণ্নতা যেন ছড়িয়ে রয়েছে। তবে আমুদে বাঙালি ভয়কে তুচ্ছজ্ঞান করছে।

এ করোনাকালে শপিংমলে ক্রেতার কল্পনাতীত সমাগম দেখে মনে হয় না কেউ করোনার ভয়ে ঈদ উৎসবকে মাটি করতে চায়! অনেক শপিংমল ও মার্কেটে স্বাস্থ্যসুরক্ষার নিয়ম মানা হচ্ছে না। অবশ্য ক্রেতা সতর্ক না হলে মার্কেট কর্তৃপক্ষের করণীয় তেমন থাকে না।

করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে দেশবাসীর প্রতি আবেদন ছিল এবারে কেউ যেন নাড়ির টানে শেকড়ের দিকে না ছুটেন। নিজেদের আটকে রাখেন নিজ নিজ অবস্থানে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও আবেদন রেখেছেন প্রত্যেকে যেন যার যার অবস্থানে থেকে এবার ঈদ উদযাপন করেন। কিন্তু কে শোনে ‘ধর্মবাণী’! এ অবোধ মানুষগুলো ভাবতে চান না, তিনি এবং তার পরিবার এ মুহূর্তে ভালো থাকলেও ভবিষ্যতে কী হবে তা কেউ জানে না।

বাড়ি পৌঁছা পর্যন্ত কত মানুষের সংস্পর্শে আসতে হবে তাকে। অবশেষে তিনি বা তারা হয়তো করোনা বহন করে নিয়ে যাবেন। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকায় নিজে হয়তো আক্রান্ত হবেন না। কিন্তু তার সংস্পর্শে আসা বৃদ্ধ বাবা, মা বা পরিজনদের কেউ আক্রান্ত হতে পারেন। এভাবে গ্রামে, পাড়ায়, মহল্লায় ছড়িয়ে পড়তে পারে করোনা। সুতরাং এক-দু বছর একা একা ঈদ করলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। এভাবে কেন আমরা ভাবতে পারছি না!

আগে ঈদযাত্রা সুখকর করার জন্য সরকারি উদ্যোগ থাকত। সড়ক বিভাগ ব্যস্ত থাকত রাস্তাঘাট মেরামতিতে। সাধারণ ট্রেনের বাইরেও বিশেষ ট্রেন চালু থাকত। রেলস্টেশনে সারা রাত জেগে টিকিটের জন্য লাইন দিত মানুষ। সংবাদকর্মীরা সেসব দৃশ্য রিপোর্ট করার জন্য ছুটোছুটি করতেন। ট্রেনগুলোতে ছাদ পর্যন্ত গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাসতে হাসতে মানুষ ছুটত গ্রামের ঠিকানায়।

দক্ষিণবঙ্গে যাওয়ার জন্য বিশাল বিশাল লঞ্চ ভরপুর হয়ে যেত। সড়কপথের বাসগুলো অতিরিক্ত চাপে কোনো কোনো সড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি করত। বিরোধী দলের নেতাদের কণ্ঠ সচল হতো তখন। সরকার যে ঠিকভাবে ঈদযাত্রার আয়োজন করতে পারেনি তা নিয়ে লাগাতার বিবৃতি দিতে থাকতেন। এ ব্যর্থতায় সরকারের ‘পদত্যাগ’ও দাবি করতেন।

করোনাকালে এসবের কোনো কিছুই করতে হচ্ছে না। নাড়ির টান অনুভব করা দুরন্ত মানুষ যাতে হোমকোয়ারেন্টিন বা লকডাউন মানা বাদ দিয়ে পাগলের মতো না ছোটে, তাই আন্তঃজেলা গণপরিবহণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। লঞ্চ-স্টিমার ও ট্রেন সার্ভিস বন্ধ। অবশ্য সরকারি নির্দেশ অমান্য করে নানা অঞ্চলে শুরু হয়ে গেছে গণপরিবহণ চলা।

অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, করোনায় আক্রান্ত হওয়া বা অন্যদের আক্রান্ত করার আশঙ্কা থাকলেও ছুটতে থাকবেন হেঁটে, পণ্যবাহী ট্রাকে বা ছোটখাটো বাহনে চড়ে। অ্যাম্বুলেন্স বহনের ফেরি দখল করে গাদাগাদির মধ্য দিয়ে নদী পাড়ি দেবেন। করোনাকালে এমন ভয়াবহ চিত্র আমাদের দেখতে হবে। ইতোমধ্যে সংবাদমাধ্যম থেকে জানা গেছে, ফেরিঘাট লোকারণ্য হয়ে গেছে।

সরকার আন্তঃজেলা পরিবহণ বন্ধ রেখেছে মানুষ যাতে যার যার অবস্থানেই থেকে যায়। সরকারি-বেসরকারি সব কর্মস্থল তিনদিনের ছুটিতে আটকে রেখেছে একই উদ্দেশ্যে। ছুটির কড়াকড়ির কারণে কিছুসংখ্যক মানুষকে না হয় আটকে রাখা যাবে; কিন্তু অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষ, ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত যারা তাদের আটকাবে কে? মানুষকে যার যার অবস্থানে থাকার কথা বলার উদ্দেশ্য তো একটিই, তা হচ্ছে করোনা সংক্রমণ যাতে ছড়িয়ে না পড়ে।

এটি তো নিজের, পরিবারের এবং সবার সুস্থ থাকারই চেষ্টা। আমুদে বাঙালি একবার যদি ভাবতে পারত জীবনের দায় উৎসবে যোগ দেওয়ার চেয়ে অনেক বেশি, তবে সে নিজের রাশ টানতে পারত। কিন্তু টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে যখন বলতে শুনি, ‘বছরে একবারই আসে ঈদ, তাই পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঈদ পালন করতেই হবে’, তখন স্পষ্ট হয়, এ অবোধ বাঙালিকে বোঝানোর সাধ্য কারও নেই।

আন্তঃজেলা পরিবহণ বন্ধ, তাতে কি ঈদযাত্রা ঠেকানো যাচ্ছে! নগর পরিবহণে গাবতলীতে নেমে ছেলে-বুড়ো, পুরুষ-রমণী সবাই হেঁটে ব্রিজ দিয়ে তুরাগ পাড়ি দিচ্ছে। আমিনবাজারে গিয়ে আরেকটি পরিবহণ ধরছে। বাসে জায়গা না পেলে গাদাগাদি করে ট্রাকে উঠছে। ভাড়া দিতে হচ্ছে দুই-তিনগুণ।

যাদের সামর্থ্য বেশি তারা ট্যাক্সি আর মাইক্রোবাসে ছুটছে। রাজধানী থেকে সব রুটে একই অবস্থা। আন্তঃজেলা পরিবহণ কতক্ষণ বন্ধ রাখা যাবে বলা যাচ্ছে না। ৮ মে সংবাদ সম্মেলনে পরিবহণ শ্রমিক নেতা- সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা শাজাহান খান অবিলম্বে আন্তঃনগর বাস চালুর দাবি জানিয়েছেন; না হলে ঈদের দিন ধর্মঘট করার ঘোষণাও এসেছে।

মানুষ বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে সহজেই। আমাদের বাসার গৃহকর্মীর পাঁচ সদস্যের সংসার। ক্যাম্পাসের পাশেই বাসা ভাড়া করে থাকেন। মন খারাপ তাদের, লকডাউনের কারণে গ্রামের বাড়ি জামালপুরে এবার ঈদ করতে যেতে পারছে না। কদিন পরই মন ফুরফুরে হয়ে গেল। জানলাম, তাদের ওই অঞ্চলের ২৫ জন একত্রিত হয়ে একটি মিনিবাস ভাড়া করেছে।

মাথাপিছু ১০০০ টাকা করে ভাড়া দিয়ে ঈদযাত্রা সফল করে তুলতে রওনা হচ্ছেন ঈদের দুদিন আগে। পরিচিত এক মাইক্রোবাস চালককে বললাম অবৈধ যাত্রী পরিবহণের কারণে পুলিশ তো মামলা করতে পারে, বলল তাতে ক্ষতি নেই। পাঁচ হাজার টাকার মামলা আর এক হাজার টাকা পুলিশ খরচ বাদ দিলেও আমাদের অতিরিক্ত দশ-বারো হাজার টাকা থাকবে।

দোকানপাট আর শপিংমল খুলে দেওয়ার পর সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী প্রথমদিকে তেমন বেচাকেনা হয়নি। কিন্তু রমজানের শেষ পর্বে ছোট-বড় শপিংমল আর ফুটপাতের দোকানে স্বাভাবিক সময়ের ঈদের বাজারের মতো ছিল ক্রেতাদের ভিড়। ভেবেছিলাম সাধারণ মানুষের অনেকেরই জীবিকা বন্ধ। বেঁচে থাকার জন্য ত্রাণের অপেক্ষা করছে। মধ্যবিত্তও আর্থিকভাবে তেমন সুখে নেই। তাই ঈদবাজারে ধস নামবে। কিন্তু তেমন বাস্তবতা মার্কেটগুলোয় গেলে দেখা যাচ্ছে না। অনেকে ছোট ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে বুড়ো বাবা-মাকে নিয়েও এসেছেন ঈদবাজারে।

এসব দেখে আমাদের আতঙ্ক কাটছে না। গাদাগাদি করে যানবাহনে ঈদযাত্রা। ঠেলাঠেলি করে ঈদ কেনাকাটা। একমাত্র ঈশ্বর ছাড়া আমাদের কে রক্ষা করবে! এখন করুণাময়ের কাছেই প্রার্থনার হাত তুলতে হয়। এসব অবোধ মানুষের মধ্যে বাস্তববোধ যেন তিনি তৈরি করে দেন।

মহামারির ভয়ংকর পরিস্থিতি বিবেচনায় এক-দুবার না হয় পরিজনদের সঙ্গে ঈদ না করলাম। এক-দুবার ঈদের পোশাক না কিনলেই বা কী আসে যায়। জীবনের দায় কি সবকিছুর চেয়ে বড় নয়? জানি না এ বাস্তববোধ আমাদের মধ্যে জাগবে কি না!

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com

করোনাকালে কেন এ অপরিণামদর্শী ঈদযাত্রা?

 এ কে এম শাহনাওয়াজ 
১১ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনা মহামারি সারা পৃথিবীকেই নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। মানুষের যাপিত জীবনে এনেছে পরিবর্তন। হোমকোয়ারেন্টিন আর লকডাউন শব্দের সঙ্গে পরিচিত করিয়েছে আমাদের। পরিচিত করিয়েছে ‘সামাজিক দূরত্ব’ নামে একটি নতুন ধারণার সঙ্গে। আর সবকিছুর মধ্যে অদৃশ্য শত্রু করোনা ছড়িয়েছে মৃত্যুভীতি। বাংলাদেশের ধর্মপ্রবণ ও উৎসবপ্রিয় মানুষের চিরচেনা দিনগুলোকেও এলোমেলো করে দিয়েছে।

এ সময়টি একটি প্রতীকী শব্দ ‘করোনাকাল’ নামে হয়তো ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এ করোনাকালেই তৃতীয়বারের মতো বাঙালি মুসলমানের সামনে উপস্থিত হচ্ছে ঈদ। বিশেষ করে সবচেয়ে বড় ধর্মীয় সামাজিক উৎসব ঈদুলফিতর বা রমজানের ঈদ। গত বছর সংক্রমণের ভীতিকে উপেক্ষা করে স্রোতের মতো মানুষ নানা যানবাহনে ছুটে গেছে স্বজনদের কাছে। ঈদুল-আজহায় কুরবানি দিয়েছে মহাসমারোহে।

এবার রোজার আগে থেকেই করোনা পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নিয়েছে। দ্বিতীয় ঢেউ লাশের মিছিল বড় করেছে। সরকার নানা প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করছে। কয়েক দফা ‘কঠোর’ লকডাউন ঘোষণা করেছে। কিন্তু তেমন কঠোরতা আরোপ করা যায়নি। অদ্ভুত আত্মবিশ্বাসী বাঙালি আমরা। নিজে আক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত নিজেকে ও পরিবারকে নিরাপদ মনে করে স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়কে গুরুত্ব দিই না।

কেউ কেউ মনে করি, করোনা ধনীদের রোগ। আমরা ধনী নই, তাই আমাদের মাস্ক পরার দরকার নেই। এমনই নানা ধরনের মতবাদ আমরা দেখতে পাচ্ছি। তবে এ স্বস্তি পাওয়া মানুষের সাম্প্রতিক সময়ের একটি পরিসংখ্যান জানাতে চাই; তা হচ্ছে দরিদ্রদেরও ক্ষমা করছে না করোনা। মুগদা হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া করোনা রোগীর ৯০ শতাংশ এখন দরিদ্র ও নিুমধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ।

সংক্রমণ রোধ করার জন্য সরকার গণপরিবহণ, শপিংমল সব বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক, কর্মচারী, গণপরিবহণের মালিক, চালক, শ্রমিক সবার জীবিকার প্রশ্নে কোনো সমাধান না থাকায় তাদের চাপের মুখে সরকারকে একে একে সব খুলে দিতে হচ্ছে। তবে ঢিলেঢালা লকডাউন হলেও এরই মধ্যে কিছু ইতিবাচক প্রভাব আমরা দেখতে পাচ্ছি। সংক্রমণ ও মৃত্যু কিছুটা কমে এসেছে। সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের সরকার ছুটি কমিয়ে ঈদের গ্রামমুখী স্রোত কমাতে চেয়েছে। কিন্তু পরিজনের সঙ্গে ঈদ করতে উন্মুখ উৎসবপ্রিয় বাঙালিকে আটকে রাখা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। সুতরাং এ নিুমুখী মৃত্যু আর সংক্রমণের সূচক যে আবারও ঊর্ধ্বমুখী হবে না, সে কথা কেউ বলতে পারে না।

তবে মানতেই হবে, করোনাকাল ঈদ উৎসবে বড় রকম ছন্দপতন ঘটিয়েছে। স্থবির করে দিয়েছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ। প্রকৃত অর্থে ঈদুলফিতরের উৎসব শুরু হয় রমজানের শুরু থেকেই। রমজান হচ্ছে ঈদের আগমনি সুর। করোনা রমজানকেও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবের আঙ্গিকে উদযাপিত হতে দেয়নি। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার প্রয়োজনে মসজিদগুলোয় মুসল্লির সংখ্যা সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। চিরায়ত তারাবি নামাজে ছন্দপতন ঘটে এবার। এভাবে ঈদ উৎসবের প্রেক্ষাপট কিছুটা বিবর্ণ হয়ে যায়।

ইফতারি নিয়ে একটি সাজসাজ প্রস্তুতি থাকে রাজধানী থেকে শুরু করে ছোট-বড় শহরেও। নামকরা রেস্টুরেন্ট থেকে মৌসুমি দোকানগুলোয় হরেক ইফতারির মেলা বসে। এবার তা একেবারেই সীমিত হয়ে গেছে। সেহরির সময় কোনো রেস্টুরেন্ট খুলতে পেরেছে কি না জানি না। সব মিলিয়ে করোনাকালের ঈদ প্রস্তুতির মধ্যে একটি বিষণ্নতা যেন ছড়িয়ে রয়েছে। তবে আমুদে বাঙালি ভয়কে তুচ্ছজ্ঞান করছে।

এ করোনাকালে শপিংমলে ক্রেতার কল্পনাতীত সমাগম দেখে মনে হয় না কেউ করোনার ভয়ে ঈদ উৎসবকে মাটি করতে চায়! অনেক শপিংমল ও মার্কেটে স্বাস্থ্যসুরক্ষার নিয়ম মানা হচ্ছে না। অবশ্য ক্রেতা সতর্ক না হলে মার্কেট কর্তৃপক্ষের করণীয় তেমন থাকে না।

করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে দেশবাসীর প্রতি আবেদন ছিল এবারে কেউ যেন নাড়ির টানে শেকড়ের দিকে না ছুটেন। নিজেদের আটকে রাখেন নিজ নিজ অবস্থানে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও আবেদন রেখেছেন প্রত্যেকে যেন যার যার অবস্থানে থেকে এবার ঈদ উদযাপন করেন। কিন্তু কে শোনে ‘ধর্মবাণী’! এ অবোধ মানুষগুলো ভাবতে চান না, তিনি এবং তার পরিবার এ মুহূর্তে ভালো থাকলেও ভবিষ্যতে কী হবে তা কেউ জানে না।

বাড়ি পৌঁছা পর্যন্ত কত মানুষের সংস্পর্শে আসতে হবে তাকে। অবশেষে তিনি বা তারা হয়তো করোনা বহন করে নিয়ে যাবেন। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকায় নিজে হয়তো আক্রান্ত হবেন না। কিন্তু তার সংস্পর্শে আসা বৃদ্ধ বাবা, মা বা পরিজনদের কেউ আক্রান্ত হতে পারেন। এভাবে গ্রামে, পাড়ায়, মহল্লায় ছড়িয়ে পড়তে পারে করোনা। সুতরাং এক-দু বছর একা একা ঈদ করলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। এভাবে কেন আমরা ভাবতে পারছি না!

আগে ঈদযাত্রা সুখকর করার জন্য সরকারি উদ্যোগ থাকত। সড়ক বিভাগ ব্যস্ত থাকত রাস্তাঘাট মেরামতিতে। সাধারণ ট্রেনের বাইরেও বিশেষ ট্রেন চালু থাকত। রেলস্টেশনে সারা রাত জেগে টিকিটের জন্য লাইন দিত মানুষ। সংবাদকর্মীরা সেসব দৃশ্য রিপোর্ট করার জন্য ছুটোছুটি করতেন। ট্রেনগুলোতে ছাদ পর্যন্ত গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাসতে হাসতে মানুষ ছুটত গ্রামের ঠিকানায়।

দক্ষিণবঙ্গে যাওয়ার জন্য বিশাল বিশাল লঞ্চ ভরপুর হয়ে যেত। সড়কপথের বাসগুলো অতিরিক্ত চাপে কোনো কোনো সড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি করত। বিরোধী দলের নেতাদের কণ্ঠ সচল হতো তখন। সরকার যে ঠিকভাবে ঈদযাত্রার আয়োজন করতে পারেনি তা নিয়ে লাগাতার বিবৃতি দিতে থাকতেন। এ ব্যর্থতায় সরকারের ‘পদত্যাগ’ও দাবি করতেন।

করোনাকালে এসবের কোনো কিছুই করতে হচ্ছে না। নাড়ির টান অনুভব করা দুরন্ত মানুষ যাতে হোমকোয়ারেন্টিন বা লকডাউন মানা বাদ দিয়ে পাগলের মতো না ছোটে, তাই আন্তঃজেলা গণপরিবহণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। লঞ্চ-স্টিমার ও ট্রেন সার্ভিস বন্ধ। অবশ্য সরকারি নির্দেশ অমান্য করে নানা অঞ্চলে শুরু হয়ে গেছে গণপরিবহণ চলা।

অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, করোনায় আক্রান্ত হওয়া বা অন্যদের আক্রান্ত করার আশঙ্কা থাকলেও ছুটতে থাকবেন হেঁটে, পণ্যবাহী ট্রাকে বা ছোটখাটো বাহনে চড়ে। অ্যাম্বুলেন্স বহনের ফেরি দখল করে গাদাগাদির মধ্য দিয়ে নদী পাড়ি দেবেন। করোনাকালে এমন ভয়াবহ চিত্র আমাদের দেখতে হবে। ইতোমধ্যে সংবাদমাধ্যম থেকে জানা গেছে, ফেরিঘাট লোকারণ্য হয়ে গেছে।

সরকার আন্তঃজেলা পরিবহণ বন্ধ রেখেছে মানুষ যাতে যার যার অবস্থানেই থেকে যায়। সরকারি-বেসরকারি সব কর্মস্থল তিনদিনের ছুটিতে আটকে রেখেছে একই উদ্দেশ্যে। ছুটির কড়াকড়ির কারণে কিছুসংখ্যক মানুষকে না হয় আটকে রাখা যাবে; কিন্তু অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষ, ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত যারা তাদের আটকাবে কে? মানুষকে যার যার অবস্থানে থাকার কথা বলার উদ্দেশ্য তো একটিই, তা হচ্ছে করোনা সংক্রমণ যাতে ছড়িয়ে না পড়ে।

এটি তো নিজের, পরিবারের এবং সবার সুস্থ থাকারই চেষ্টা। আমুদে বাঙালি একবার যদি ভাবতে পারত জীবনের দায় উৎসবে যোগ দেওয়ার চেয়ে অনেক বেশি, তবে সে নিজের রাশ টানতে পারত। কিন্তু টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে যখন বলতে শুনি, ‘বছরে একবারই আসে ঈদ, তাই পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঈদ পালন করতেই হবে’, তখন স্পষ্ট হয়, এ অবোধ বাঙালিকে বোঝানোর সাধ্য কারও নেই।

আন্তঃজেলা পরিবহণ বন্ধ, তাতে কি ঈদযাত্রা ঠেকানো যাচ্ছে! নগর পরিবহণে গাবতলীতে নেমে ছেলে-বুড়ো, পুরুষ-রমণী সবাই হেঁটে ব্রিজ দিয়ে তুরাগ পাড়ি দিচ্ছে। আমিনবাজারে গিয়ে আরেকটি পরিবহণ ধরছে। বাসে জায়গা না পেলে গাদাগাদি করে ট্রাকে উঠছে। ভাড়া দিতে হচ্ছে দুই-তিনগুণ।

যাদের সামর্থ্য বেশি তারা ট্যাক্সি আর মাইক্রোবাসে ছুটছে। রাজধানী থেকে সব রুটে একই অবস্থা। আন্তঃজেলা পরিবহণ কতক্ষণ বন্ধ রাখা যাবে বলা যাচ্ছে না। ৮ মে সংবাদ সম্মেলনে পরিবহণ শ্রমিক নেতা- সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা শাজাহান খান অবিলম্বে আন্তঃনগর বাস চালুর দাবি জানিয়েছেন; না হলে ঈদের দিন ধর্মঘট করার ঘোষণাও এসেছে।

মানুষ বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে সহজেই। আমাদের বাসার গৃহকর্মীর পাঁচ সদস্যের সংসার। ক্যাম্পাসের পাশেই বাসা ভাড়া করে থাকেন। মন খারাপ তাদের, লকডাউনের কারণে গ্রামের বাড়ি জামালপুরে এবার ঈদ করতে যেতে পারছে না। কদিন পরই মন ফুরফুরে হয়ে গেল। জানলাম, তাদের ওই অঞ্চলের ২৫ জন একত্রিত হয়ে একটি মিনিবাস ভাড়া করেছে।

মাথাপিছু ১০০০ টাকা করে ভাড়া দিয়ে ঈদযাত্রা সফল করে তুলতে রওনা হচ্ছেন ঈদের দুদিন আগে। পরিচিত এক মাইক্রোবাস চালককে বললাম অবৈধ যাত্রী পরিবহণের কারণে পুলিশ তো মামলা করতে পারে, বলল তাতে ক্ষতি নেই। পাঁচ হাজার টাকার মামলা আর এক হাজার টাকা পুলিশ খরচ বাদ দিলেও আমাদের অতিরিক্ত দশ-বারো হাজার টাকা থাকবে।

দোকানপাট আর শপিংমল খুলে দেওয়ার পর সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী প্রথমদিকে তেমন বেচাকেনা হয়নি। কিন্তু রমজানের শেষ পর্বে ছোট-বড় শপিংমল আর ফুটপাতের দোকানে স্বাভাবিক সময়ের ঈদের বাজারের মতো ছিল ক্রেতাদের ভিড়। ভেবেছিলাম সাধারণ মানুষের অনেকেরই জীবিকা বন্ধ। বেঁচে থাকার জন্য ত্রাণের অপেক্ষা করছে। মধ্যবিত্তও আর্থিকভাবে তেমন সুখে নেই। তাই ঈদবাজারে ধস নামবে। কিন্তু তেমন বাস্তবতা মার্কেটগুলোয় গেলে দেখা যাচ্ছে না। অনেকে ছোট ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে বুড়ো বাবা-মাকে নিয়েও এসেছেন ঈদবাজারে।

এসব দেখে আমাদের আতঙ্ক কাটছে না। গাদাগাদি করে যানবাহনে ঈদযাত্রা। ঠেলাঠেলি করে ঈদ কেনাকাটা। একমাত্র ঈশ্বর ছাড়া আমাদের কে রক্ষা করবে! এখন করুণাময়ের কাছেই প্রার্থনার হাত তুলতে হয়। এসব অবোধ মানুষের মধ্যে বাস্তববোধ যেন তিনি তৈরি করে দেন।

মহামারির ভয়ংকর পরিস্থিতি বিবেচনায় এক-দুবার না হয় পরিজনদের সঙ্গে ঈদ না করলাম। এক-দুবার ঈদের পোশাক না কিনলেই বা কী আসে যায়। জীবনের দায় কি সবকিছুর চেয়ে বড় নয়? জানি না এ বাস্তববোধ আমাদের মধ্যে জাগবে কি না!

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন