নেতানিয়াহুর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিই এই সংঘর্ষের মূল কারণ
jugantor
তৃতীয় মত
নেতানিয়াহুর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিই এই সংঘর্ষের মূল কারণ

  আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী  

১৭ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাপ্লাবিত বিশ্বে একটি পুরোনো উপদ্রব আবার নতুনভাবে দেখা দিয়েছে। এ পুরোনো উপদ্রবটি হলো ইসরাইল-ফিলিস্তিনি যুদ্ধ। বিশ্বের সব সংবাদপত্র এটাকে যুদ্ধ আখ্যা দিয়েছে। কী করে দিয়েছে তা আমি ভেবে পাইনি। একদিকে ইসরাইলের হাতে মিসাইল, জঙ্গিবিমানসহ আধুনিক সমরাস্ত্র।

অন্যদিকে ফিলিস্তিনি হামাসের হাতে কিছু রকেট। এ রকেট হামলাও ব্যর্থ করার কায়দা আয়ত্ত করেছে ইসরাইল। ফলে জল-স্থল, আকাশপথে ইসরাইলের একতরফা হামলায় যেখানে নিহত ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা এ পর্যন্ত দুই শতাধিক, সেখানে ইসরাইলি নিহতের সংখ্যা মাত্র সাত। তার মধ্যে একজন শিশু।

এই তথাকথিত যুদ্ধে কী হবে? জাতিসংঘ কেবল ইসরাইলিদের বর্বরতার নিন্দা জানিয়ে ক্ষান্ত। ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্স ইতোমধ্যে ইসরাইলের গাজায় সামরিক হামলাকে সমর্থন জানিয়েছে। বলেছে, ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য এটা দরকার ছিল। আরব দেশগুলো, যারা মাত্র কিছুকাল আগে ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে দোস্তালি করেছেন, তারা এখন মুখরক্ষার জন্য বিবদমান দুই পক্ষকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়েই তাদের দায়িত্ব পালন করছেন। এরা সবাই আমেরিকার দ্বারস্থ হবেন-সমস্যার একটি ‘সন্তোষজনক’ মিটমাটের জন্য।

আমেরিকা ইসরাইলের পেট্রন, বলতে গেলে এই ইহুদি রাষ্ট্রটির রক্ষাকর্তা। ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি এখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থাকতেন, তিনি নিঃসন্দেহে ফিলিস্তিনিদের ‘ধৃষ্টতা’কে নিন্দা জানিয়ে ইসরাইলকে আরও সমরাস্ত্র দেওয়ার ঘোষণা দিতেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাইডেন তা করবেন না। তিনি ভদ্রলোক, ভদ্রতার আড়ালে ইসরাইলকে পৃষ্ঠপোষকতাদানের পুরোনো নীতি হয়তো অনুসরণ করবেন।

এই বর্বর হামলার জন্য ইসরাইলকে মুখে নিন্দা জানাতে পারে বাইডেন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। কিন্তু তলে তলে স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে আনার নামে ইসরাইলের হাতে এ সংঘর্ষের সব সাফল্য তুলে দিয়ে ফিলিস্তিনিদের আগের মতো ‘কবরের শান্তিতে’ বাস করতে বলা হতে পারে। ইসরাইলি ফিলিস্তিনিদের সংঘর্ষে গত সত্তর বছর ধরে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে আসছে। ফিলিস্তিনিরা মার খাচ্ছে। ঘরবাড়ি-ভূমি হারাচ্ছে। অন্যদিকে ইসরাইল নির্যাতন চালাচ্ছে, ফিলিস্তিনিদের ভূমিদাস করে রাখতে চাইছে। তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হলেই তাকে টেরোরিজম আখ্যা দিয়ে নির্মমভাবে দমন করা হচ্ছে।

ফিলিস্তিনিরা এই অবস্থা মেনে চললেই তারা শান্তি ও স্থিতাবস্থার পক্ষে বলে পশ্চিমা শক্তির কাছে প্রশংসিত হয়। এবারেও কি তাই হবে? ইসরাইলের প্রোভোকেশনের মুখে হামাসের জঙ্গি অংশের সশস্ত্র প্রতিবাদ না-জানিয়ে হয়তো উপায় ছিল না। কিন্তু হামাস তার সামরিক কার্যক্রম দ্বারা নেতানিয়াহুর ইচ্ছাই পূরণ করেছেন। নেতানিয়াহু চাচ্ছিলেন, এই সংঘর্ষ বাধুক। তাহলে তিনি তার টলটলায়মান গদি রক্ষা করতে পারেন এবং শক্তিশালী হয়ে ওঠা বিরোধী দলগুলোকে (ইসরাইলে) শায়েস্তা করতে পারেন।

নেতানিয়াহু জানেন, তাকে বাধা দেওয়ার কেউ নেই। ট্রাম্পের কৃপায় সৌদি আরব, আমিরাত, কুয়েতসহ অধিকাংশ আরব রাষ্ট্র এখন ইসরাইলের মিত্র। ফিলিস্তিনিদের সমর্থনদানের কোনো আরব রাষ্ট্র নেই। ইসরাইলবিরোধী ইরান ও সিরিয়া আমেরিকার অর্থনৈতিক অবরোধে কোণঠাসা।

একমাত্র তুরস্ক রয়েছে, যারা এখন নতুনভাবে ইসরাইলের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাইতে পারে। তা এই মুহূর্তে ইসরাইলের জন্য বিপজ্জনক নয়। ফলে এ সময় তথাকথিত মুসলিম বিশ্ব কর্তৃক পরিত্যক্ত ফিলিস্তিন নেতানিয়াহুর জন্য কোনো সমস্যা নয়, এটা তিনি জানেন। তাই হামাসকে শায়েস্তা করার নামে গাজা উপত্যকায় এই বর্বর তাণ্ডব।

আগেই বলেছি এটা যুদ্ধ নয়, অত্যন্ত আধুনিক সমরাস্ত্রের যুগে রকেট নিয়ে যুদ্ধ করা হচ্ছে বন্দুকের সামনে লাঠি নিয়ে যুদ্ধ করার মতো। সন্দেহ নেই পশ্চিমা দেশগুলো তাদের স্বার্থে ইসরাইলকে এই গণহত্যা আরও কিছুদিন চালাতে দেবে। তারপর তাদেরই প্রচেষ্টায় স্থিতাবস্থা ফিরে আসবে। ইসরাইল তার অপরাধের জন্য শাস্তি পাবে না। কিন্তু ফিলিস্তিনির মানুষকে এই বর্বরতা, নারী, শিশু হত্যা, একান্ত আপনজনকে হারানোর বেদনা, শোক, ক্ষোভ, অপমান, এমনকি নিজস্ব ভূসম্পত্তি হারানোর ক্ষতিও মেনে নিতে হবে। এই অবস্থার পরিবর্তন সেদিনই আসবে, যেদিন ফিলিস্তিনিরাও আধুনিক সমরাস্ত্র, জঙ্গিবিমান ও নৌবহর সংগ্রহ করতে পারবে। সেদিন যুদ্ধ হবে সমানে সমানে।

নেতানিয়াহুকে পবিত্র ঈদের দিনেও পবিত্র মসজিদ আল-আকসায় নিরীহ নামাজিদের ওপর বোমা হামলার সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে তখন তিনবার চিন্তা করতে হবে।

এবারের এই ইসরাইলি-ফিলিস্তিনি সংঘর্ষকে অনেকে বলছেন আকস্মিক। কেউ কেউ এজন্য হামাসকে দায়ী করছেন। কিন্তু এই সংঘর্ষ সৃষ্টির একটি মূল কারণ নেতানিয়াহুর সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। ইসরাইলের এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহু টিকে গেলেও তার ছিল পতনোন্মুখ অবস্থা। ইসরাইলের ভোট রাজনীতি গত কয়েক বছরে একেবারেই বদলে গেছে। ইসরাইলে বসবাসরত আরবদের সংখ্যা গত কয়েক বছরে বেশ বেড়েছে এবং তারা একটি শক্তিশালী ভোট-বাক্স হয়ে উঠেছে। নেতানিয়াহুর বিরোধী কোনো কোনো বিরোধী দল এ আরব ভোট-বাক্সের সঙ্গে মিতালি পাতিয়ে নির্বাচনে নেতানিয়াহুর পতন ও পরাজয় নিশ্চিত করে এনেছিল।

নেতানিয়াহু গদি রক্ষার জন্য নিজে যে চরমপন্থি ইহুদি সংগঠনগুলোর এতকাল নিন্দা করেছেন, এখন তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। ইসরাইলের ইহুদি ও আরব অধিবাসীদের মধ্যে তিনি যে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন, তাতে ইসরাইলে বসবাসকারী আরবরা এতদিন শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করলেও এখন নানা বৈষম্যমূলক আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছেন। ফলে ইসরাইলের ভেতরেই শুরু হয়েছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। ইহুদিরা আরব হত্যা, ঘরবাড়ি লুণ্ঠন, মসজিদে অগ্নিসংযোগ শুরু করে। অন্যদিকে আরবরাও ইহুদিদের ঘরবাড়িতে হামলা, তাদের চার্চে অগ্নিসংযোগ করে।

ইসরাইলি এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এতই বেড়ে ওঠে যে, নেতানিয়াহু এখন স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন, ইসরাইলের ওপর বাইরে থেকে আরবরা যে হামলা চালাচ্ছে, তার চেয়ে ইসরাইলের ভেতরের এই আরব বিদ্রোহ দেশটির অস্তিত্ব ও নিরাপত্তার জন্য আরও বড় হুমকি। ইসরাইলের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করছেন, ইসরাইলকে বাইরে থেকে আক্রমণ করে বাইরে আরব দেশ বা ফিলিস্তিনিরা দেশটির অস্তিত্বের জন্য যে হুমকি সৃষ্টি করতে পারেনি, সেই হুমকি সৃষ্টি করেছে ইসরাইলের অভ্যন্তরে আরব-ইহুদি দাঙ্গা। তাতে নেতানিয়াহু সামরিক শক্তির জোরে এবার পার পেলেও তার রাজনৈতিক বিরোধীদের শক্তিহীন করে দীর্ঘসময় ক্ষমতায় স্থায়ী হতে পারবেন কি না সন্দেহ।

ক্রমাগত যুদ্ধে লিপ্ত থেকে এবং এখন অভ্যন্তরীণ সংঘাত-সংঘর্ষে বিপন্ন ইসরাইলকে বাইরে থেকে যতটা শক্তিশালী মনে হয়, ততটা সে নয়। কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে গেলে কোনো দেশ যে টিকে থাকে না, তার বড় প্রমাণ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। টিকে থাকতে গেলে যে অভ্যন্তরীণ শক্তি ও সংহতির প্রয়োজন হয়, ইসরাইলি সেই সংহতি ও শক্তিতে ভাঙন ধরেছে। হয়তো তা প্রকাশ পেতে কিছু সময় লাগবে।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে অধিকৃত এলাকায় একজন আরবকে অবৈধভাবে উচ্ছেদ এবং ইহুদিদের জেরুজালেম দখলের দিবস পালনকে কেন্দ্র করে বর্তমান সংঘর্ষের শুরু। কিন্তু একটু বিশ্লেষণ করলেই দেখা যাবে, নেতানিয়াহু নির্বাচনে তার পরাজয় ঠেকানোর জন্য যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি শুরু করেছিলেন, এই সংঘর্ষ তার অন্যতম মূল কারণ। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়ে নেতানিয়াহু সাময়িক ফায়দা লুটেছেন। কিন্তু তার দেশের জন্য বিপজ্জনক ভবিষ্যৎ তৈরির ব্যবস্থা করে গেলেন।

অন্যদিকে হামাস হয়তো ভেবেছিল, নির্বাচন নিয়ে নেতানিয়াহু এখন ব্যস্ত, তার এই দুর্বল মুহূর্তে তাদের রকেট হামলা ইসরাইলি কট্টরপন্থিদের কিছুটা শায়েস্তা করবে। বাস্তবে কট্টরপন্থি ইসরাইলিরা তাতে উপকৃত হয়েছে। হামাসের লাভ হয়েছে, তারা এখন ফিলিস্তিনি প্রশ্নে একটি প্রধান পক্ষ হিসাবে নিজেদের তুলে ধরতে পেরেছে।

হিটলারের বর্বরতাকেও ছাড়িয়ে গেছে নেতানিয়াহুর বর্বরতা। ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ লর্ড ব্যালকুরের কৃপায় অবৈধভাবে ইসরাইলি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই চলছে এই রাষ্ট্রের আগ্রাসন। ইসরাইল ও পাকিস্তান এই দুটি ধর্মীয় জাতীয়তাভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে গেছেন দুই ব্রিটিশ লর্ড। একটি (ইসরাইল) করেছেন লর্ড ব্যালকুর। অন্যটি (পাকিস্তান) করেছেন লর্ড র‌্যাডক্লিফ।

ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যে এবং পাকিস্তান উপমহাদেশে নিরন্তর অশান্তি জিইয়ে রেখেছে। ইসরাইল রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠা লাভের পর থেকে আরবদের উচ্ছেদ এবং তাদের ভূমি, ভূখণ্ড অবৈধভাবে দখল করা শুরু করে। আরব অধ্যুষিত পূর্ব জেরুজালেমও তারা অবৈধভাবে দখল করে। সেই অবৈধ দখল এখন পর্যন্ত বলবৎ রয়েছে এবং বাড়ছে। ইসরাইল অধিকৃত আরব ভূমিতে আরবরা চরম নির্যাতন ও বৈষম্যের মধ্যে বাস করে, তা অসহনীয় হলে তারা বিদ্রোহী হয়। ইসরাইল সরকার তা চরম বর্বরতার সঙ্গে দমন করে।

এই নির্যাতন চূড়ান্ত বর্বরতা। এ সম্পর্কে ইসরাইলের একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক বলেছেন, ‘Had he been born a

Palestinian, he did not doubt he would have become a fighter.’ (তিনি ফিলিস্তিনি হিসাবে জন্ম নিলে, সন্দেহ নেই একজন সংগ্রামী হতেন)। ফিলিস্তিনিরা যতদিন পর্যন্ত শক্তিতে ইসরাইলের সমকক্ষতায় না-আসবে, তাদের শক্তিশালী নেতৃত্ব তৈরি না-হবে, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোয়ও বর্তমান বিশ্বাসঘাতক এবং আমেরিকার পদলেহী শাসকদের পতন ঘটিয়ে নাসের ও সাদ্দামের মতো নেতাদের আবির্ভাব না-হবে-ততদিন ফিলিস্তিনি সমস্যার সুষ্ঠু ও স্থায়ী সমাধান হবে না।

ইতোমধ্যে ফিলিস্তিনে স্থিতাবস্থা প্রতিষ্ঠার নামে মার্কিন কূটনৈতিক ধোঁকাবাজি শুরু হয়েছে। এবার একজন মধ্যম শ্রেণির শান্তিদূত আমেরিকা পাঠিয়েছে ইসরাইল। উদ্দেশ্য বর্তমান সংঘর্ষ থামানো। দেখা যাক বাইডেন প্রেসিডেন্সির এই ব্যাপারে আন্তরিকতা, সততা ও নিরপেক্ষতা কতটুকু?

লন্ডন ১৫ মে শনিবার, ২০২১

তৃতীয় মত

নেতানিয়াহুর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিই এই সংঘর্ষের মূল কারণ

 আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী 
১৭ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাপ্লাবিত বিশ্বে একটি পুরোনো উপদ্রব আবার নতুনভাবে দেখা দিয়েছে। এ পুরোনো উপদ্রবটি হলো ইসরাইল-ফিলিস্তিনি যুদ্ধ। বিশ্বের সব সংবাদপত্র এটাকে যুদ্ধ আখ্যা দিয়েছে। কী করে দিয়েছে তা আমি ভেবে পাইনি। একদিকে ইসরাইলের হাতে মিসাইল, জঙ্গিবিমানসহ আধুনিক সমরাস্ত্র।

অন্যদিকে ফিলিস্তিনি হামাসের হাতে কিছু রকেট। এ রকেট হামলাও ব্যর্থ করার কায়দা আয়ত্ত করেছে ইসরাইল। ফলে জল-স্থল, আকাশপথে ইসরাইলের একতরফা হামলায় যেখানে নিহত ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা এ পর্যন্ত দুই শতাধিক, সেখানে ইসরাইলি নিহতের সংখ্যা মাত্র সাত। তার মধ্যে একজন শিশু।

এই তথাকথিত যুদ্ধে কী হবে? জাতিসংঘ কেবল ইসরাইলিদের বর্বরতার নিন্দা জানিয়ে ক্ষান্ত। ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্স ইতোমধ্যে ইসরাইলের গাজায় সামরিক হামলাকে সমর্থন জানিয়েছে। বলেছে, ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য এটা দরকার ছিল। আরব দেশগুলো, যারা মাত্র কিছুকাল আগে ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে দোস্তালি করেছেন, তারা এখন মুখরক্ষার জন্য বিবদমান দুই পক্ষকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়েই তাদের দায়িত্ব পালন করছেন। এরা সবাই আমেরিকার দ্বারস্থ হবেন-সমস্যার একটি ‘সন্তোষজনক’ মিটমাটের জন্য।

আমেরিকা ইসরাইলের পেট্রন, বলতে গেলে এই ইহুদি রাষ্ট্রটির রক্ষাকর্তা। ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি এখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থাকতেন, তিনি নিঃসন্দেহে ফিলিস্তিনিদের ‘ধৃষ্টতা’কে নিন্দা জানিয়ে ইসরাইলকে আরও সমরাস্ত্র দেওয়ার ঘোষণা দিতেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাইডেন তা করবেন না। তিনি ভদ্রলোক, ভদ্রতার আড়ালে ইসরাইলকে পৃষ্ঠপোষকতাদানের পুরোনো নীতি হয়তো অনুসরণ করবেন।

এই বর্বর হামলার জন্য ইসরাইলকে মুখে নিন্দা জানাতে পারে বাইডেন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। কিন্তু তলে তলে স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে আনার নামে ইসরাইলের হাতে এ সংঘর্ষের সব সাফল্য তুলে দিয়ে ফিলিস্তিনিদের আগের মতো ‘কবরের শান্তিতে’ বাস করতে বলা হতে পারে। ইসরাইলি ফিলিস্তিনিদের সংঘর্ষে গত সত্তর বছর ধরে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে আসছে। ফিলিস্তিনিরা মার খাচ্ছে। ঘরবাড়ি-ভূমি হারাচ্ছে। অন্যদিকে ইসরাইল নির্যাতন চালাচ্ছে, ফিলিস্তিনিদের ভূমিদাস করে রাখতে চাইছে। তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হলেই তাকে টেরোরিজম আখ্যা দিয়ে নির্মমভাবে দমন করা হচ্ছে।

ফিলিস্তিনিরা এই অবস্থা মেনে চললেই তারা শান্তি ও স্থিতাবস্থার পক্ষে বলে পশ্চিমা শক্তির কাছে প্রশংসিত হয়। এবারেও কি তাই হবে? ইসরাইলের প্রোভোকেশনের মুখে হামাসের জঙ্গি অংশের সশস্ত্র প্রতিবাদ না-জানিয়ে হয়তো উপায় ছিল না। কিন্তু হামাস তার সামরিক কার্যক্রম দ্বারা নেতানিয়াহুর ইচ্ছাই পূরণ করেছেন। নেতানিয়াহু চাচ্ছিলেন, এই সংঘর্ষ বাধুক। তাহলে তিনি তার টলটলায়মান গদি রক্ষা করতে পারেন এবং শক্তিশালী হয়ে ওঠা বিরোধী দলগুলোকে (ইসরাইলে) শায়েস্তা করতে পারেন।

নেতানিয়াহু জানেন, তাকে বাধা দেওয়ার কেউ নেই। ট্রাম্পের কৃপায় সৌদি আরব, আমিরাত, কুয়েতসহ অধিকাংশ আরব রাষ্ট্র এখন ইসরাইলের মিত্র। ফিলিস্তিনিদের সমর্থনদানের কোনো আরব রাষ্ট্র নেই। ইসরাইলবিরোধী ইরান ও সিরিয়া আমেরিকার অর্থনৈতিক অবরোধে কোণঠাসা।

একমাত্র তুরস্ক রয়েছে, যারা এখন নতুনভাবে ইসরাইলের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাইতে পারে। তা এই মুহূর্তে ইসরাইলের জন্য বিপজ্জনক নয়। ফলে এ সময় তথাকথিত মুসলিম বিশ্ব কর্তৃক পরিত্যক্ত ফিলিস্তিন নেতানিয়াহুর জন্য কোনো সমস্যা নয়, এটা তিনি জানেন। তাই হামাসকে শায়েস্তা করার নামে গাজা উপত্যকায় এই বর্বর তাণ্ডব।

আগেই বলেছি এটা যুদ্ধ নয়, অত্যন্ত আধুনিক সমরাস্ত্রের যুগে রকেট নিয়ে যুদ্ধ করা হচ্ছে বন্দুকের সামনে লাঠি নিয়ে যুদ্ধ করার মতো। সন্দেহ নেই পশ্চিমা দেশগুলো তাদের স্বার্থে ইসরাইলকে এই গণহত্যা আরও কিছুদিন চালাতে দেবে। তারপর তাদেরই প্রচেষ্টায় স্থিতাবস্থা ফিরে আসবে। ইসরাইল তার অপরাধের জন্য শাস্তি পাবে না। কিন্তু ফিলিস্তিনির মানুষকে এই বর্বরতা, নারী, শিশু হত্যা, একান্ত আপনজনকে হারানোর বেদনা, শোক, ক্ষোভ, অপমান, এমনকি নিজস্ব ভূসম্পত্তি হারানোর ক্ষতিও মেনে নিতে হবে। এই অবস্থার পরিবর্তন সেদিনই আসবে, যেদিন ফিলিস্তিনিরাও আধুনিক সমরাস্ত্র, জঙ্গিবিমান ও নৌবহর সংগ্রহ করতে পারবে। সেদিন যুদ্ধ হবে সমানে সমানে।

নেতানিয়াহুকে পবিত্র ঈদের দিনেও পবিত্র মসজিদ আল-আকসায় নিরীহ নামাজিদের ওপর বোমা হামলার সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে তখন তিনবার চিন্তা করতে হবে।

এবারের এই ইসরাইলি-ফিলিস্তিনি সংঘর্ষকে অনেকে বলছেন আকস্মিক। কেউ কেউ এজন্য হামাসকে দায়ী করছেন। কিন্তু এই সংঘর্ষ সৃষ্টির একটি মূল কারণ নেতানিয়াহুর সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। ইসরাইলের এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহু টিকে গেলেও তার ছিল পতনোন্মুখ অবস্থা। ইসরাইলের ভোট রাজনীতি গত কয়েক বছরে একেবারেই বদলে গেছে। ইসরাইলে বসবাসরত আরবদের সংখ্যা গত কয়েক বছরে বেশ বেড়েছে এবং তারা একটি শক্তিশালী ভোট-বাক্স হয়ে উঠেছে। নেতানিয়াহুর বিরোধী কোনো কোনো বিরোধী দল এ আরব ভোট-বাক্সের সঙ্গে মিতালি পাতিয়ে নির্বাচনে নেতানিয়াহুর পতন ও পরাজয় নিশ্চিত করে এনেছিল।

নেতানিয়াহু গদি রক্ষার জন্য নিজে যে চরমপন্থি ইহুদি সংগঠনগুলোর এতকাল নিন্দা করেছেন, এখন তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। ইসরাইলের ইহুদি ও আরব অধিবাসীদের মধ্যে তিনি যে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন, তাতে ইসরাইলে বসবাসকারী আরবরা এতদিন শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করলেও এখন নানা বৈষম্যমূলক আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছেন। ফলে ইসরাইলের ভেতরেই শুরু হয়েছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। ইহুদিরা আরব হত্যা, ঘরবাড়ি লুণ্ঠন, মসজিদে অগ্নিসংযোগ শুরু করে। অন্যদিকে আরবরাও ইহুদিদের ঘরবাড়িতে হামলা, তাদের চার্চে অগ্নিসংযোগ করে।

ইসরাইলি এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এতই বেড়ে ওঠে যে, নেতানিয়াহু এখন স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন, ইসরাইলের ওপর বাইরে থেকে আরবরা যে হামলা চালাচ্ছে, তার চেয়ে ইসরাইলের ভেতরের এই আরব বিদ্রোহ দেশটির অস্তিত্ব ও নিরাপত্তার জন্য আরও বড় হুমকি। ইসরাইলের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করছেন, ইসরাইলকে বাইরে থেকে আক্রমণ করে বাইরে আরব দেশ বা ফিলিস্তিনিরা দেশটির অস্তিত্বের জন্য যে হুমকি সৃষ্টি করতে পারেনি, সেই হুমকি সৃষ্টি করেছে ইসরাইলের অভ্যন্তরে আরব-ইহুদি দাঙ্গা। তাতে নেতানিয়াহু সামরিক শক্তির জোরে এবার পার পেলেও তার রাজনৈতিক বিরোধীদের শক্তিহীন করে দীর্ঘসময় ক্ষমতায় স্থায়ী হতে পারবেন কি না সন্দেহ।

ক্রমাগত যুদ্ধে লিপ্ত থেকে এবং এখন অভ্যন্তরীণ সংঘাত-সংঘর্ষে বিপন্ন ইসরাইলকে বাইরে থেকে যতটা শক্তিশালী মনে হয়, ততটা সে নয়। কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে গেলে কোনো দেশ যে টিকে থাকে না, তার বড় প্রমাণ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। টিকে থাকতে গেলে যে অভ্যন্তরীণ শক্তি ও সংহতির প্রয়োজন হয়, ইসরাইলি সেই সংহতি ও শক্তিতে ভাঙন ধরেছে। হয়তো তা প্রকাশ পেতে কিছু সময় লাগবে।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে অধিকৃত এলাকায় একজন আরবকে অবৈধভাবে উচ্ছেদ এবং ইহুদিদের জেরুজালেম দখলের দিবস পালনকে কেন্দ্র করে বর্তমান সংঘর্ষের শুরু। কিন্তু একটু বিশ্লেষণ করলেই দেখা যাবে, নেতানিয়াহু নির্বাচনে তার পরাজয় ঠেকানোর জন্য যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি শুরু করেছিলেন, এই সংঘর্ষ তার অন্যতম মূল কারণ। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়ে নেতানিয়াহু সাময়িক ফায়দা লুটেছেন। কিন্তু তার দেশের জন্য বিপজ্জনক ভবিষ্যৎ তৈরির ব্যবস্থা করে গেলেন।

অন্যদিকে হামাস হয়তো ভেবেছিল, নির্বাচন নিয়ে নেতানিয়াহু এখন ব্যস্ত, তার এই দুর্বল মুহূর্তে তাদের রকেট হামলা ইসরাইলি কট্টরপন্থিদের কিছুটা শায়েস্তা করবে। বাস্তবে কট্টরপন্থি ইসরাইলিরা তাতে উপকৃত হয়েছে। হামাসের লাভ হয়েছে, তারা এখন ফিলিস্তিনি প্রশ্নে একটি প্রধান পক্ষ হিসাবে নিজেদের তুলে ধরতে পেরেছে।

হিটলারের বর্বরতাকেও ছাড়িয়ে গেছে নেতানিয়াহুর বর্বরতা। ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ লর্ড ব্যালকুরের কৃপায় অবৈধভাবে ইসরাইলি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই চলছে এই রাষ্ট্রের আগ্রাসন। ইসরাইল ও পাকিস্তান এই দুটি ধর্মীয় জাতীয়তাভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে গেছেন দুই ব্রিটিশ লর্ড। একটি (ইসরাইল) করেছেন লর্ড ব্যালকুর। অন্যটি (পাকিস্তান) করেছেন লর্ড র‌্যাডক্লিফ।

ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যে এবং পাকিস্তান উপমহাদেশে নিরন্তর অশান্তি জিইয়ে রেখেছে। ইসরাইল রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠা লাভের পর থেকে আরবদের উচ্ছেদ এবং তাদের ভূমি, ভূখণ্ড অবৈধভাবে দখল করা শুরু করে। আরব অধ্যুষিত পূর্ব জেরুজালেমও তারা অবৈধভাবে দখল করে। সেই অবৈধ দখল এখন পর্যন্ত বলবৎ রয়েছে এবং বাড়ছে। ইসরাইল অধিকৃত আরব ভূমিতে আরবরা চরম নির্যাতন ও বৈষম্যের মধ্যে বাস করে, তা অসহনীয় হলে তারা বিদ্রোহী হয়। ইসরাইল সরকার তা চরম বর্বরতার সঙ্গে দমন করে।

এই নির্যাতন চূড়ান্ত বর্বরতা। এ সম্পর্কে ইসরাইলের একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক বলেছেন, ‘Had he been born a

Palestinian, he did not doubt he would have become a fighter.’ (তিনি ফিলিস্তিনি হিসাবে জন্ম নিলে, সন্দেহ নেই একজন সংগ্রামী হতেন)। ফিলিস্তিনিরা যতদিন পর্যন্ত শক্তিতে ইসরাইলের সমকক্ষতায় না-আসবে, তাদের শক্তিশালী নেতৃত্ব তৈরি না-হবে, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোয়ও বর্তমান বিশ্বাসঘাতক এবং আমেরিকার পদলেহী শাসকদের পতন ঘটিয়ে নাসের ও সাদ্দামের মতো নেতাদের আবির্ভাব না-হবে-ততদিন ফিলিস্তিনি সমস্যার সুষ্ঠু ও স্থায়ী সমাধান হবে না।

ইতোমধ্যে ফিলিস্তিনে স্থিতাবস্থা প্রতিষ্ঠার নামে মার্কিন কূটনৈতিক ধোঁকাবাজি শুরু হয়েছে। এবার একজন মধ্যম শ্রেণির শান্তিদূত আমেরিকা পাঠিয়েছে ইসরাইল। উদ্দেশ্য বর্তমান সংঘর্ষ থামানো। দেখা যাক বাইডেন প্রেসিডেন্সির এই ব্যাপারে আন্তরিকতা, সততা ও নিরপেক্ষতা কতটুকু?

লন্ডন ১৫ মে শনিবার, ২০২১

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন