চিকিৎসাব্যবস্থা ও খাদ্য সরবরাহই অগ্রগণ্য বিষয়
jugantor
নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি
চিকিৎসাব্যবস্থা ও খাদ্য সরবরাহই অগ্রগণ্য বিষয়

  ড. আর এম দেবনাথ  

১৮ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঈদের আগে এমনিতেই ঢাকা শহর ছিল ফাঁকা ফাঁকা। ‘লকডাউনের’ কারণে অনেক কিছুই ছিল বন্ধ। মানুষের চলাচল, যানবাহন চলাচল ছিল সীমিত। ঈদ-পরবর্তী সময়ে এখন ঢাকা আরও ফাঁকা। লোকজন রাস্তায় বিরল। পরিবহণ/যানবাহনও খুবই কম। শহর ছেড়ে লোক যেতে শুরু করেছে প্রায় এক সপ্তাহ আগে।

এটা বরাবরই হয়। এবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আহ্বান করেছিলেন সবাইকে ঈদ যার যার কর্মস্থলেই করতে। না, সে আহ্বান দৃশ্যত মাঠে মারা গেছে। লাখ লাখ মানুষ শিকড়ের সন্ধানে গ্রামে ছুটে চলেছে। ফেরিঘাটের দৃশ্য দেখে বিশ্বাস হয়নি যে, মানুষ মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে ঈদ উৎসব পালন করার জন্য এত পাগল হতে পারে। এসবই ঘটেছে করোনা মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ের মধ্যে, যখন সবকিছুই অনিশ্চিত।

মানুষ আতঙ্কে আছে। জীবিকাও অনিশ্চিত। এ অবস্থা চলছে ২০২০ সালের মার্চ থেকে। এ অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক ইত্যাদির মধ্যেই এবারও মানুষ ঢাকা শহর ছেড়েছে। কত লোক ঢাকা ছেড়েছে? এর হিসাব কে করবে? একটি কাগজে দেখলাম কয়েকদিনে প্রায় ৪০ লাখ লোক ঢাকা শহর ছেড়েছে।

বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে প্রতিদিন ৩০-৪০ হাজার গাড়ি পারাপার হয়েছে। সবই গ্রামমুখী। তার মানে শুধু শ্রমজীবী, নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত নয়, ধনী লোকেরাও যাচ্ছে আত্মীয়স্বজন, ভাই-বোন, বাবা-মায়ের সঙ্গে পবিত্র ঈদ পালন করতে। এসবের কিন্তু একটা ফল আছে। ফলটা কী?

মানুষের সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু অর্থ বা অর্থনীতিও যায়। এ মুহূর্তে ধরে নেই অর্ধেক ঢাকা ‘ঢাকায়’ নেই। তার মানে ঢাকা শহরের অর্ধেক অর্থ/অর্থনীতি এখন গ্রামে। যারা গ্রামে গেছে তারা খালি হাতে বাড়ি গেছে, তা সর্বাংশে ঠিক নয়। যার যা সম্বল আছে তাই নিয়ে তারা গ্রামে গেছে। এর মধ্যে শ্রমজীবীদের দৈনিক রোজগারের টাকা আছে, পোশাক কর্মীদের বেতন ও ভাতার টাকা আছে, চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতার টাকা আছে। এসব নিয়েই তারা গ্রামে গেছে। তাই গ্রামে এখন ‘ক্যাশের’ ছড়াছড়ি হওয়ার কথা।

অধিকন্তু রয়েছে রেমিট্যান্সের টাকা। অবশ্য তা দেশের সব অঞ্চলের জন্য সত্য নয়। তবু বেশ বড় একটা অংশে এবার রেমিট্যান্স এসেছে গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি। গত এপ্রিল মাসেই শুধু রেমিট্যান্স এসেছে ২০৬ কোটি ডলার (এক ডলার সমান ৮৫ টাকা)। ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সর্বমোট ১০ মাসে দেশে ডলার এসেছে দুই হাজার ছয় কোটি। এই টাকা গ্রামাঞ্চলের অর্থনীতিতে লেনদেন হচ্ছে।

আবার এবার সরকার সাড়ে ৩৬ লাখ পরিবারকে পরিবার পিছু ২৫০০ টাকা করে সাহায্য হিসাবে দিয়েছে। এতে গ্রামাঞ্চলে গেছে প্রায় ১০০০ কোটি টাকা। দেশের ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, ধনাঢ্য ব্যক্তিরাও যে পিছিয়ে আছেন তা বলা যাবে না। তারাও দান-দক্ষিণা করবেন। সরকার বিনা মূল্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করছে। এসব কর্মকাণ্ডে গ্রামের অর্থনীতিতে এবার লেনদেন মোটামুটি কম হয়নি। তবে এ কথা বলা যাবে না যে, এটা স্বাভাবিক অবস্থা। নিশ্চয়ই অন্যসব বছরের মতো নয়।

এবার নিয়ে তিনটি পবিত্র ঈদ মানুষ শান্তিতে করতে পারছে না। গ্রামের ব্যবসায়ীদের বেচা-কেনা আশাপ্রদ নয়। এই ঈদে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় শাড়ি, লুঙ্গি, জামা-কাপড়, সালওয়ার-কামিজ, ব্র্যান্ড পোশাক, টুপি-চাদর, ওড়না, জুতা, প্রসাধনী সামগ্রী, টেলিভিশন, ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার, মোটরসাইকেল ও সাইকেল ইত্যাদি। বলা বাহুল্য, এসবের বাজারে এবার গেছে মন্দা। ‘লকডাউন’ শিথিল করাতে ঈদের দু-চার দিন আগে বাজার একটু জমেছিল। কিন্তু অন্য স্বাভাবিক বছরের মতো নয়।

পাইকারি ব্যবসায়ী, খুচরা দোকানদারদের চলাচল সীমিত। নরসিংদী, বাবুরহাট, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, টাঙ্গাইলের কাপড়ের ব্যবসায়ীদের এবার সুবিধা হয়নি। এরা পহেলা বৈশাখের বাজারও ধরতে পারেনি। এদিকে হোটেল-রেস্তোরাঁর ব্যবসা গেছে মন্দায়। ইফতারের বাজার মন্দা। ‘বড় লোকের পোলারা’ এবার জমিয়ে খেতে পারেনি। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পর্যটন ব্যবসা। এবার পরিবহণ যাতায়াত বন্ধ থাকায় কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, কুয়াকাটা ইত্যাদি অঞ্চলে চলেছে খরা।

পর্যটন-বিনোদন কর্র্মীদের গেছে দুর্দিন। এভাবে বিচার করলে বলাই যাবে সবকিছু চলেছে আধভাঙা অবস্থার মধ্যদিয়ে। মানুষের মনে সুখ-আনন্দ কিছুই নেই। রোজগারের পথ বন্ধ। অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। অনেকের ব্যবসা বন্ধ। এর প্রতিফলন ঘটছে জাতীয় অর্থনীতিতে? এই মুহূর্তে সার্বিকভাবে অর্থনীতির অবস্থা কী, অর্থনৈতিক লেনদেন, বেচাকেনার অবস্থা কী? কেমন গেছে ঈদের অর্থনীতি? এসবের নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য দেওয়া খুবই কঠিন। সরকারিভাবে এসবের ওপর কোনো তথ্য সংগ্রহ করা হয় বলে আমার জানা নেই। পাইকারি বাজার, খুচরা বাজারের তথ্য জানা থাকলে বলা যেত ঈদে কেমন বেচাকেনা হয়েছে।

বলাই বাহুল্য, আমাদের দুই ঈদ এবং দুর্গাপূজার বাজারই সবচেয়ে বড় বাজার। সারা বছরের ব্যবসা এই তিন ধর্মীয় উৎসবকে উপলক্ষ্য করেই হয়। ব্যবসায়ীরা বাকি বছর শুধু দোকান খরচ তোলেন। এবার তাদের ব্যবসা কেমন হলো? এর একটা ইঙ্গিত দেওয়া যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক এবার ১৪ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট বাজারে ছেড়েছে। বিশাল পরিমাণ টাকা দৃশ্যত। কিন্তু গেল বছরের সঙ্গে তুলনা করলে হতাশ হতে হয়। গেল বছর নতুন নোট বাজারে ছাড়া হয়েছিল ৩০ হাজার কোটি টাকার।

তার মানে এবার অর্ধেকেরও কম। এই ১৪ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে ছেড়েছে কীভাবে? তারা কি বিনা পয়সায় এই টাকা মানুষের মধ্যে বিলি করেছে? নিশ্চয় নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে, গুলিস্তান ও সদরঘাটে নোট বদলের ‘কাণ্ড’ দেখলেই বোঝা যাবে নতুন নোট দিয়ে কী হয়? নতুন নোট পুরোনো নোটের বদলে দেওয়া হয়। তাই যদি হয় এবার নতুন নোট কম ছাড়া হলো কেন?

পরিষ্কার যে, এবারের ঈদে নতুন নোটের চাহিদা কম। নতুন নোট ব্যবহৃত হয় ঈদের সালামি, দান-দক্ষিণা ও বকশিশ ইত্যাদিতে। এবার এই খাতে মানুষের খরচ কম হয়েছে। কারণ? কারণ, মানুষের রোজগার কম, আয় কম। খরচ বেশি। অতএব সঞ্চয় কম। অতএব নতুন নোটের চাহিদা কম।

নতুন নোটের চাহিদা দিয়ে আমরা বোঝার চেষ্টা করলাম মানুষের আর্থিক অবস্থা কী? আরও কতগুলো সূচক আছে যা দিয়ে দেশের আর্থিক অবস্থার কথা বোঝা যায়। ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধির হার, রাজস্ব আয়, মূল্যস্ফীতি, কৃষি উৎপাদন, আমদানি-রপ্তানি, উন্নয়ন ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ, বেসরকারি বিনিয়োগ ইত্যাদি হচ্ছে বড় বড় সূচক। এসব সূচকের নিরিখে বলা যায় অর্থনীতির সেই ঊর্ধ্বমুখীনতা নেই। ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধির হার হ্রাস পেয়েছে। রাজস্ব আয় প্রত্যাশিত হারে হচ্ছে না। রপ্তানি বাড়ছে, কিন্তু আগের মতো নয়।

একমাত্র ভালো দিক হচ্ছে রেমিট্যান্স। শত বাধা-প্রতিকূলতার মধ্যেও রেমিট্যান্স ক্রমশ বাড়ছেই। বাড়ছে বেশ ভালোভাবেই। আমদানি কম, রপ্তানি মোটামুটি ঠিক, এর পাশাপাশি রেমিট্যান্স বেশি-তাই বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে দেখা দিয়েছে বিরাট উল্লম্ফন। এখন আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ ৪৫ বিলিয়ন ডলার যা দিয়ে ১০-১১ মাসের দরকারি আমদানি করা যায়। অথচ একটি দেশের এত বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ লাগে না। সাধারণভাবে এই অবস্থায় মূল্যস্ফীতির কবলে পড়ার কথা দেশ। মজার বিষয়, সার্বিকভাবে আমাদের মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৫ শতাংশের মতো, যা খুবই স্বাভাবিক স্তরের একটা মূল্যস্ফীতি।

কিন্তু গন্ডগোল ও দুশ্চিন্তা অন্যত্র। সার্বিক মূল্যস্ফীতি কম হলেও খাদ্য মূল্যস্ফীতি অসম্ভব বেশি। ২০২০ সালের শেষে তা ছিল ১৮-২০ শতাংশ। এই মূল্যস্ফীতি কমেছে তা মনে করার কোনো কারণ নেই। অথচ খাদ্যমূল্য কমার কথা। আমাদের প্রধান ফসল বোরো কৃষকরা এখন তুলছে। ৬০-৬৫ শতাংশ বোরো ইতোমধ্যে কৃষকরা ঘরে তুলেছে। এখন জ্যৈষ্ঠ মাস। চালের দাম কমার কথা। কিন্তু কিছুতেই তা হচ্ছে না। কারণ কী? কারণ, ব্যবসায়ীদের হিসাবে আমাদের চালের চাহিদা বেশি, উৎপাদন কম, আমদানিও কম, স্টকও কম। সরকারের গুদামে চাল খুবই কম। এ সুযোগ ব্যবসায়ী, চালকল মালিকরা নিচ্ছে।

অথচ এটা তাদের করার কথা নয়। দেশের এই চরম অনিশ্চয়তার দিনে, আতঙ্কের দিনে, মানুষের দুঃখ-কষ্টের দিনে চালের ব্যবসায়ীদের এ কাণ্ড করার কথা নয়। কিন্তু তারা তা করছে। অতএব সরকারকে খুবই সাবধানতা অবলম্বন করার কথা বলব। ‘পচা শামুকে’ পা কাটে। হেলাফেলা করলে কী দাঁড়ায় তার উদাহরণ প্রতিবেশী ভারত। করোনার প্রথম ধাক্কা তারা সফলভাবে মোকাবিলা করে।

সারা বিশ্ব, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভারতকে অভিনন্দন জানায়। তাদের মধ্যে দেখা দেয় আত্মতৃপ্তি। তারা দ্বিতীয় ঢেউ সম্পর্কে সাবধান হয়নি। ফলে এখন দ্বিতীয় ঢেউ ভারতকে ছিন্নভিন্ন করছে। হাসপাতালে জায়গা নেই, অক্সিজেন নেই, ওষুধ নেই। সারা বিশ্ব ভারতের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে। হাজার হাজার লোক মারা যাচ্ছে। তাদের অন্তত একটা সুবিধা আছে।

তাদের চালের অভাব নেই, গুদামভর্তি চাল। এক টাকা, দুই টাকা কেজিতেও তারা মানুষকে চাল দেয়। আমাদের দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। সবাই আতঙ্কে তৃতীয় ঢেউ আসে কি না। সর্বোচ্চ সাবধানতা দরকার। সব পদক্ষেপ অগ্রিম নেওয়া দরকার।

আরেক কথা। এই ঢেউ যদি একের পর এক আসতে থাকে, তাহলে খাদ্যের সমস্যা দেখা দিতে পারে। মানুষকে হয় বিনা মূল্যে খাবার দিতে হবে, নতুবা নগদ টাকা দিতে হবে চাল কেনার জন্য। এর জন্য গুদামে পর্যাপ্ত চালের স্টক থাকা দরকার। দরকার বোধে আমদানি বাড়ানো দরকার। বাজেট সামনে। জুনের দুই তারিখ সংসদে বাজেট পেশ করা হবে। বাজেটে যেন এসব ব্যবস্থা থাকে।

‘জীবন ও জীবিকার’ বাজেটের পুরোটাই গরিব, নিম্নবিত্ত, কৃষক ও শ্রমিকদের জন্য নিবেদিত হওয়া দরকার। ক্ষুদ্র, মাঝারি, অতিক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য হওয়া উচিত এই বাজেট। বিশেষ নজর দেওয়া দরকার খাদ্য নিরাপত্তার ওপর। জীবন বাঁচানোর জন্য চিকিৎসা অবকাঠামোর প্রতি নজর তো দিতেই হবে। চিকিৎসাব্যবস্থা ও খাদ্য সরবরাহ এই দুটিই এখন অগ্রগণ্য বিষয়।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি

চিকিৎসাব্যবস্থা ও খাদ্য সরবরাহই অগ্রগণ্য বিষয়

 ড. আর এম দেবনাথ 
১৮ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঈদের আগে এমনিতেই ঢাকা শহর ছিল ফাঁকা ফাঁকা। ‘লকডাউনের’ কারণে অনেক কিছুই ছিল বন্ধ। মানুষের চলাচল, যানবাহন চলাচল ছিল সীমিত। ঈদ-পরবর্তী সময়ে এখন ঢাকা আরও ফাঁকা। লোকজন রাস্তায় বিরল। পরিবহণ/যানবাহনও খুবই কম। শহর ছেড়ে লোক যেতে শুরু করেছে প্রায় এক সপ্তাহ আগে।

এটা বরাবরই হয়। এবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আহ্বান করেছিলেন সবাইকে ঈদ যার যার কর্মস্থলেই করতে। না, সে আহ্বান দৃশ্যত মাঠে মারা গেছে। লাখ লাখ মানুষ শিকড়ের সন্ধানে গ্রামে ছুটে চলেছে। ফেরিঘাটের দৃশ্য দেখে বিশ্বাস হয়নি যে, মানুষ মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে ঈদ উৎসব পালন করার জন্য এত পাগল হতে পারে। এসবই ঘটেছে করোনা মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ের মধ্যে, যখন সবকিছুই অনিশ্চিত।

মানুষ আতঙ্কে আছে। জীবিকাও অনিশ্চিত। এ অবস্থা চলছে ২০২০ সালের মার্চ থেকে। এ অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক ইত্যাদির মধ্যেই এবারও মানুষ ঢাকা শহর ছেড়েছে। কত লোক ঢাকা ছেড়েছে? এর হিসাব কে করবে? একটি কাগজে দেখলাম কয়েকদিনে প্রায় ৪০ লাখ লোক ঢাকা শহর ছেড়েছে।

বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে প্রতিদিন ৩০-৪০ হাজার গাড়ি পারাপার হয়েছে। সবই গ্রামমুখী। তার মানে শুধু শ্রমজীবী, নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত নয়, ধনী লোকেরাও যাচ্ছে আত্মীয়স্বজন, ভাই-বোন, বাবা-মায়ের সঙ্গে পবিত্র ঈদ পালন করতে। এসবের কিন্তু একটা ফল আছে। ফলটা কী?

মানুষের সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু অর্থ বা অর্থনীতিও যায়। এ মুহূর্তে ধরে নেই অর্ধেক ঢাকা ‘ঢাকায়’ নেই। তার মানে ঢাকা শহরের অর্ধেক অর্থ/অর্থনীতি এখন গ্রামে। যারা গ্রামে গেছে তারা খালি হাতে বাড়ি গেছে, তা সর্বাংশে ঠিক নয়। যার যা সম্বল আছে তাই নিয়ে তারা গ্রামে গেছে। এর মধ্যে শ্রমজীবীদের দৈনিক রোজগারের টাকা আছে, পোশাক কর্মীদের বেতন ও ভাতার টাকা আছে, চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতার টাকা আছে। এসব নিয়েই তারা গ্রামে গেছে। তাই গ্রামে এখন ‘ক্যাশের’ ছড়াছড়ি হওয়ার কথা।

অধিকন্তু রয়েছে রেমিট্যান্সের টাকা। অবশ্য তা দেশের সব অঞ্চলের জন্য সত্য নয়। তবু বেশ বড় একটা অংশে এবার রেমিট্যান্স এসেছে গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি। গত এপ্রিল মাসেই শুধু রেমিট্যান্স এসেছে ২০৬ কোটি ডলার (এক ডলার সমান ৮৫ টাকা)। ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সর্বমোট ১০ মাসে দেশে ডলার এসেছে দুই হাজার ছয় কোটি। এই টাকা গ্রামাঞ্চলের অর্থনীতিতে লেনদেন হচ্ছে।

আবার এবার সরকার সাড়ে ৩৬ লাখ পরিবারকে পরিবার পিছু ২৫০০ টাকা করে সাহায্য হিসাবে দিয়েছে। এতে গ্রামাঞ্চলে গেছে প্রায় ১০০০ কোটি টাকা। দেশের ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, ধনাঢ্য ব্যক্তিরাও যে পিছিয়ে আছেন তা বলা যাবে না। তারাও দান-দক্ষিণা করবেন। সরকার বিনা মূল্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করছে। এসব কর্মকাণ্ডে গ্রামের অর্থনীতিতে এবার লেনদেন মোটামুটি কম হয়নি। তবে এ কথা বলা যাবে না যে, এটা স্বাভাবিক অবস্থা। নিশ্চয়ই অন্যসব বছরের মতো নয়।

এবার নিয়ে তিনটি পবিত্র ঈদ মানুষ শান্তিতে করতে পারছে না। গ্রামের ব্যবসায়ীদের বেচা-কেনা আশাপ্রদ নয়। এই ঈদে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় শাড়ি, লুঙ্গি, জামা-কাপড়, সালওয়ার-কামিজ, ব্র্যান্ড পোশাক, টুপি-চাদর, ওড়না, জুতা, প্রসাধনী সামগ্রী, টেলিভিশন, ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার, মোটরসাইকেল ও সাইকেল ইত্যাদি। বলা বাহুল্য, এসবের বাজারে এবার গেছে মন্দা। ‘লকডাউন’ শিথিল করাতে ঈদের দু-চার দিন আগে বাজার একটু জমেছিল। কিন্তু অন্য স্বাভাবিক বছরের মতো নয়।

পাইকারি ব্যবসায়ী, খুচরা দোকানদারদের চলাচল সীমিত। নরসিংদী, বাবুরহাট, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, টাঙ্গাইলের কাপড়ের ব্যবসায়ীদের এবার সুবিধা হয়নি। এরা পহেলা বৈশাখের বাজারও ধরতে পারেনি। এদিকে হোটেল-রেস্তোরাঁর ব্যবসা গেছে মন্দায়। ইফতারের বাজার মন্দা। ‘বড় লোকের পোলারা’ এবার জমিয়ে খেতে পারেনি। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পর্যটন ব্যবসা। এবার পরিবহণ যাতায়াত বন্ধ থাকায় কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, কুয়াকাটা ইত্যাদি অঞ্চলে চলেছে খরা।

পর্যটন-বিনোদন কর্র্মীদের গেছে দুর্দিন। এভাবে বিচার করলে বলাই যাবে সবকিছু চলেছে আধভাঙা অবস্থার মধ্যদিয়ে। মানুষের মনে সুখ-আনন্দ কিছুই নেই। রোজগারের পথ বন্ধ। অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। অনেকের ব্যবসা বন্ধ। এর প্রতিফলন ঘটছে জাতীয় অর্থনীতিতে? এই মুহূর্তে সার্বিকভাবে অর্থনীতির অবস্থা কী, অর্থনৈতিক লেনদেন, বেচাকেনার অবস্থা কী? কেমন গেছে ঈদের অর্থনীতি? এসবের নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য দেওয়া খুবই কঠিন। সরকারিভাবে এসবের ওপর কোনো তথ্য সংগ্রহ করা হয় বলে আমার জানা নেই। পাইকারি বাজার, খুচরা বাজারের তথ্য জানা থাকলে বলা যেত ঈদে কেমন বেচাকেনা হয়েছে।

বলাই বাহুল্য, আমাদের দুই ঈদ এবং দুর্গাপূজার বাজারই সবচেয়ে বড় বাজার। সারা বছরের ব্যবসা এই তিন ধর্মীয় উৎসবকে উপলক্ষ্য করেই হয়। ব্যবসায়ীরা বাকি বছর শুধু দোকান খরচ তোলেন। এবার তাদের ব্যবসা কেমন হলো? এর একটা ইঙ্গিত দেওয়া যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক এবার ১৪ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট বাজারে ছেড়েছে। বিশাল পরিমাণ টাকা দৃশ্যত। কিন্তু গেল বছরের সঙ্গে তুলনা করলে হতাশ হতে হয়। গেল বছর নতুন নোট বাজারে ছাড়া হয়েছিল ৩০ হাজার কোটি টাকার।

তার মানে এবার অর্ধেকেরও কম। এই ১৪ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে ছেড়েছে কীভাবে? তারা কি বিনা পয়সায় এই টাকা মানুষের মধ্যে বিলি করেছে? নিশ্চয় নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে, গুলিস্তান ও সদরঘাটে নোট বদলের ‘কাণ্ড’ দেখলেই বোঝা যাবে নতুন নোট দিয়ে কী হয়? নতুন নোট পুরোনো নোটের বদলে দেওয়া হয়। তাই যদি হয় এবার নতুন নোট কম ছাড়া হলো কেন?

পরিষ্কার যে, এবারের ঈদে নতুন নোটের চাহিদা কম। নতুন নোট ব্যবহৃত হয় ঈদের সালামি, দান-দক্ষিণা ও বকশিশ ইত্যাদিতে। এবার এই খাতে মানুষের খরচ কম হয়েছে। কারণ? কারণ, মানুষের রোজগার কম, আয় কম। খরচ বেশি। অতএব সঞ্চয় কম। অতএব নতুন নোটের চাহিদা কম।

নতুন নোটের চাহিদা দিয়ে আমরা বোঝার চেষ্টা করলাম মানুষের আর্থিক অবস্থা কী? আরও কতগুলো সূচক আছে যা দিয়ে দেশের আর্থিক অবস্থার কথা বোঝা যায়। ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধির হার, রাজস্ব আয়, মূল্যস্ফীতি, কৃষি উৎপাদন, আমদানি-রপ্তানি, উন্নয়ন ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ, বেসরকারি বিনিয়োগ ইত্যাদি হচ্ছে বড় বড় সূচক। এসব সূচকের নিরিখে বলা যায় অর্থনীতির সেই ঊর্ধ্বমুখীনতা নেই। ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধির হার হ্রাস পেয়েছে। রাজস্ব আয় প্রত্যাশিত হারে হচ্ছে না। রপ্তানি বাড়ছে, কিন্তু আগের মতো নয়।

একমাত্র ভালো দিক হচ্ছে রেমিট্যান্স। শত বাধা-প্রতিকূলতার মধ্যেও রেমিট্যান্স ক্রমশ বাড়ছেই। বাড়ছে বেশ ভালোভাবেই। আমদানি কম, রপ্তানি মোটামুটি ঠিক, এর পাশাপাশি রেমিট্যান্স বেশি-তাই বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে দেখা দিয়েছে বিরাট উল্লম্ফন। এখন আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ ৪৫ বিলিয়ন ডলার যা দিয়ে ১০-১১ মাসের দরকারি আমদানি করা যায়। অথচ একটি দেশের এত বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ লাগে না। সাধারণভাবে এই অবস্থায় মূল্যস্ফীতির কবলে পড়ার কথা দেশ। মজার বিষয়, সার্বিকভাবে আমাদের মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৫ শতাংশের মতো, যা খুবই স্বাভাবিক স্তরের একটা মূল্যস্ফীতি।

কিন্তু গন্ডগোল ও দুশ্চিন্তা অন্যত্র। সার্বিক মূল্যস্ফীতি কম হলেও খাদ্য মূল্যস্ফীতি অসম্ভব বেশি। ২০২০ সালের শেষে তা ছিল ১৮-২০ শতাংশ। এই মূল্যস্ফীতি কমেছে তা মনে করার কোনো কারণ নেই। অথচ খাদ্যমূল্য কমার কথা। আমাদের প্রধান ফসল বোরো কৃষকরা এখন তুলছে। ৬০-৬৫ শতাংশ বোরো ইতোমধ্যে কৃষকরা ঘরে তুলেছে। এখন জ্যৈষ্ঠ মাস। চালের দাম কমার কথা। কিন্তু কিছুতেই তা হচ্ছে না। কারণ কী? কারণ, ব্যবসায়ীদের হিসাবে আমাদের চালের চাহিদা বেশি, উৎপাদন কম, আমদানিও কম, স্টকও কম। সরকারের গুদামে চাল খুবই কম। এ সুযোগ ব্যবসায়ী, চালকল মালিকরা নিচ্ছে।

অথচ এটা তাদের করার কথা নয়। দেশের এই চরম অনিশ্চয়তার দিনে, আতঙ্কের দিনে, মানুষের দুঃখ-কষ্টের দিনে চালের ব্যবসায়ীদের এ কাণ্ড করার কথা নয়। কিন্তু তারা তা করছে। অতএব সরকারকে খুবই সাবধানতা অবলম্বন করার কথা বলব। ‘পচা শামুকে’ পা কাটে। হেলাফেলা করলে কী দাঁড়ায় তার উদাহরণ প্রতিবেশী ভারত। করোনার প্রথম ধাক্কা তারা সফলভাবে মোকাবিলা করে।

সারা বিশ্ব, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভারতকে অভিনন্দন জানায়। তাদের মধ্যে দেখা দেয় আত্মতৃপ্তি। তারা দ্বিতীয় ঢেউ সম্পর্কে সাবধান হয়নি। ফলে এখন দ্বিতীয় ঢেউ ভারতকে ছিন্নভিন্ন করছে। হাসপাতালে জায়গা নেই, অক্সিজেন নেই, ওষুধ নেই। সারা বিশ্ব ভারতের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে। হাজার হাজার লোক মারা যাচ্ছে। তাদের অন্তত একটা সুবিধা আছে।

তাদের চালের অভাব নেই, গুদামভর্তি চাল। এক টাকা, দুই টাকা কেজিতেও তারা মানুষকে চাল দেয়। আমাদের দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। সবাই আতঙ্কে তৃতীয় ঢেউ আসে কি না। সর্বোচ্চ সাবধানতা দরকার। সব পদক্ষেপ অগ্রিম নেওয়া দরকার।

আরেক কথা। এই ঢেউ যদি একের পর এক আসতে থাকে, তাহলে খাদ্যের সমস্যা দেখা দিতে পারে। মানুষকে হয় বিনা মূল্যে খাবার দিতে হবে, নতুবা নগদ টাকা দিতে হবে চাল কেনার জন্য। এর জন্য গুদামে পর্যাপ্ত চালের স্টক থাকা দরকার। দরকার বোধে আমদানি বাড়ানো দরকার। বাজেট সামনে। জুনের দুই তারিখ সংসদে বাজেট পেশ করা হবে। বাজেটে যেন এসব ব্যবস্থা থাকে।

‘জীবন ও জীবিকার’ বাজেটের পুরোটাই গরিব, নিম্নবিত্ত, কৃষক ও শ্রমিকদের জন্য নিবেদিত হওয়া দরকার। ক্ষুদ্র, মাঝারি, অতিক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য হওয়া উচিত এই বাজেট। বিশেষ নজর দেওয়া দরকার খাদ্য নিরাপত্তার ওপর। জীবন বাঁচানোর জন্য চিকিৎসা অবকাঠামোর প্রতি নজর তো দিতেই হবে। চিকিৎসাব্যবস্থা ও খাদ্য সরবরাহ এই দুটিই এখন অগ্রগণ্য বিষয়।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন