শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকাল বন্ধ রাখা যায় না
jugantor
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকাল বন্ধ রাখা যায় না

  শরীফুজ্জামান আগা খান  

০৮ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

স্কুলে যাওয়ার পথে এক এসএসসি পরিক্ষার্থীর সঙ্গে দেখা। এতদিনে ওর পরীক্ষা এবং রেজাল্ট হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। সে জানতে চাইল, স্যার আর কতকাল নন্দলাল হয়ে ঘরে বসে থাকব? পালটা প্রশ্ন করলাম, আসলেই কি ঘরে থাকছ? সে মৃদু হাসল। রাস্তার পাশে এক গাছতলায় চারজন শিক্ষার্থী স্মার্টফোন হাতে মনোযোগী হয়ে বসে আছে।

আমায় দেখে অপ্রস্তুত বোধ করল। হয়তো গেম খেলছিল। ফেসবুকে সকালে দেখা এক শিক্ষকের এই স্ট্যাটাসের কথা মনে পড়ল-বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় ভালোমানের বাচ্চারাও গোল্লায় যেতে বসেছে। পড়ালেখা নেই-দিনরাত মোবাইলে। ঘুম-গোসল খাওয়া সবকিছুই এলোমেলো। মা-বাবার সঙ্গে অস্বাভাবিক আচরণ করছে। আমরা তাদের বাঁচাতে চেয়ে মেরে ফেলছি না তো?

করোনাভাইরাসের কারণে ১৫ মাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। আমরা এই ভাইরাস থেকে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছি। কিন্তু করোনা থেকে রেহাই মিলছে না। সহসা মিলবে বলেও মনে হয় না। করোনা একের পর এক রূপ বদলে ঢেউয়ের আকারে আমাদের ওপর এসে পড়ছে। আমরা একটু স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে না আসতে আবার নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছি। কিন্তু এভাবে আর কতদিন করোনার সঙ্গে লুকোচুরি করে বাঁচা সম্ভব? শিক্ষার্থীদের ছন্নছাড়া অবস্থা। চার কোটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। করোনার সঙ্গে বসবাস করাই আমাদের ভবিতব্য হলে আর অনির্দিষ্টকাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ না রেখে কীভাবে সতর্কতার সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা যায় সেই উপায় খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি।

আমাদের দেশে প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজারের মতো মানুষের মৃত্যু হয়। করোনায় এ যাবৎ ১৩ হাজারের কাছাকাছি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গত বছর মার্চে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের পর করোনার কারণে প্রতিদিনের গড় মৃত্যু ২৯ জন। অনেক দেশের তুলনায় এ মৃত্যুর সংখ্যা তেমন একটা বড় নয়। যেসব দেশে করোনায় আমাদের চেয়ে অধিক মৃত্যু ঘটেছে, সেখানেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একেবারে বন্ধ হয়নি। করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে আমরা বোধ হয় মাত্রাতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছি।

এ অবস্থায় আমরা ডিজিটাল পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের কথা বলছি। কিন্তু এনালগে থাকা অধিকাংশ শিক্ষার্থী ডিজিটাল শিক্ষার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। ফলে করোনাকালে শিক্ষার বৈষম্য বেড়েছে। সুবিধাবঞ্চিতরা পিছিয়ে পড়ছে। শিক্ষার্থীরা দেখছে হাটবাজার, কারখানা, অফিস-আদালত, যানবাহন এসব কোনো না কোনোভাবে খোলা, শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। তারা হিসাব মেলাতে পারছে না। তাদের ভেতর অস্থিরতা বাড়ছে।

শিক্ষার্থীদের স্ব-শিখনের কথা বলা হলেও স্ব-শিখনের উপকরণ-কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাব, স্মার্টফোন নিম্নবিত্ত এবং দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের হাতে নেই। গ্রামাঞ্চলে নেট স্পিড যথেষ্ট জোরালো নয়। একটা বড় সংখ্যক দরিদ্র পরিবারে টেলিভিশনও নেই। শিক্ষার জ্ঞানগত উত্তরণে পরম্পরা থাকে। একটি ক্লাসের পাঠ আয়ত্ত করার পর পরবর্তী ক্লাসে উঠতে হয়। গত বছর একরকম না পড়েই শিক্ষার্থীরা পরের ক্লাসে উঠেছে। চলতি শিক্ষাবর্ষেরও অর্ধেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। এভাবে পাঠপরম্পরা ব্যাহত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা উপরের ক্লাসের পাঠ সঠিকভাবে বুঝতে পারবে না। এই সংকট থেকে কিভাবে তাদের উত্তরণ ঘটবে কে জানে?

এখন অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে বিকল্প শিখনের চেষ্টা চলছে। কিন্তু এই শিখন তেমন একটা কাজে আসছে না। এ বছর মার্চ-এপ্রিলে শিক্ষার্থীদের তিনবার অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয়। দেড় মাস বিরতির পর আবার অ্যাসাইনমেন্ট শুরু হয়েছে। এ কাজে প্রথম দিকে শিক্ষার্থীরা বইয়ের সংস্পর্শে থাকলেও এখন অনেকেই বই পড়ার প্রয়োজন বোধ করছে না। অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে এক বিপত্তি দেখা দিয়েছে। তারা যে বই পড়ে মাথা খাটিয়ে অ্যাসাইনমেন্টের উত্তর লিখবে সে গরজ আর নেই। উত্তর ইউটিউব এবং ফেসবুকে ভাসছে। সেখান থেকে অনেকেই কপি করছে।

কোনো কোনো ফটোস্ট্যাটের দোকানেও উত্তরপত্র বিক্রি হচ্ছে। শিক্ষাবোর্ড থেকে প্রতি শ্রেণির জন্য একই অ্যাসাইনমেন্ট না দিয়ে ‘অ্যাসাইনমেন্ট ব্যাংক’ করলে এই বিপত্তি ঘটত না। শ্রেণিশিক্ষকরা এর ভেতর থেকে বাছাই করে অ্যাসাইনমেন্ট শিক্ষার্থীদের দিতেন। একটি শ্রেণিতে শিক্ষার্থীভেদে অ্যাসাইনমেন্টের বিষয় ভিন্ন হলে উত্তর আর ইউটিউব কিংবা ফেসবুকে মিলত না। অ্যাসাইনমেন্টের মূল্যায়নে শিক্ষক অতি উত্তম, উত্তম, ভালো এবং অগ্রগতি প্রয়োজন-এই চারটি থেকে কোনো একটি মন্তব্য লিখছেন। এ রকম মূল্যায়ন শিক্ষার্থীদের যথেষ্ট তাড়িত করছে না। এর চেয়ে নম্বর দিলেই বোধ হয় ভালো হতো।

শিক্ষার্থীদের ঘরে থেকে স্ব-শিখন করতে বললেও গ্রাম এবং মফস্বলে সঙ্গতিসম্পন্ন পরিবারের শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট পড়ছে। অধিক সামর্থ্যবানরা গৃহশিক্ষক দিয়ে সন্তানদের পড়াচ্ছেন। আমার ছেলে বিজ্ঞান বিভাগে প্রথম বর্ষ শেষ করেছে। কলেজে একদিনও ক্লাস হয়নি। সে কয়েক বন্ধুর সঙ্গে মিলে ছয় জায়গায় প্রাইভেট পড়ছে। ওর প্রাইভেটের খরচ জোগাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছি। কলেজে ক্লাস হলে এতটা প্রাইভেটের খরচ লাগত না। ব্যবহারিক ক্লাস বিজ্ঞান শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। একটি বর্ষ শেষ করে পরের বর্ষে গড়ালেও সে কোনো ব্যবহারিক ক্লাস করতে পারেনি। সম্প্রতি সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে।

এখানে এমন কিছুসংখ্যক দরিদ্র পরিবারের মেধাবি শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পেয়েছে, যাদের ভর্তি হওয়া এবং লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার মতো সঙ্গতি নেই। সংবাদপত্রে এ খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সহৃদয় বিত্তবানরা তাদের পাশে দাঁড়াতে চাইছেন। এসব শিক্ষার্থীর প্রাইভেট-কোচিংয়ে পড়ার তেমন অর্থ ছিল না। মূলত শ্রেণিকক্ষের পাঠ এবং নিজেদের প্রচেষ্টায় তারা এ সাফল্য অর্জন করেছে। বছরাধিককাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা নিজেদের মেধা বিকাশের ন্যূনতম সহায়তা এখন আর পাচ্ছে না। আগামীতে দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় এ রকম সাফল্য দেখতে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বাল্যবিয়ের ঘটনা অনেক বেড়ে গেছে। আগে মফস্বলের হাইস্কুলের অষ্টম-নবম শ্রেণি পর্যন্ত বাল্যবিয়ের নিম্নসীমা ছিল। এ বছর বাল্যবিয়ের নিম্নসীমা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত নেমে গেছে। পিইসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছাত্রীদের ভর্তির বিষয় খোঁজ নিতে গিয়ে এ বয়সের মেয়ের বিয়ে হওয়ার ঘটনা জানলাম। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর মাধ্যমিক স্তরে একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ছাত্রীকে আর শ্রেণিকক্ষে পাওয়া যাবে না।

পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে গড়াতে না দিয়ে অতিদ্রুত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া প্রয়োজন। সব শিক্ষার্থী নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা ঝুঁকি বিবেচিত হলে শিক্ষার্থীর উপস্থিতির সংখ্যা অর্ধেক করা যেতে পারে। বাস যাত্রীদের ভেতর সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে দুই সিটে একজন করে বসানো হচ্ছে। তদ্রূপ বিদ্যালয়েও এক বেঞ্চের দুই মাথায় দুইজনকে বসানো যায়। সাধারণত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিচের দিকের ক্লাসে শিক্ষার্থী বেশি থাকে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেণি একদিন এবং তৃতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চম শ্রেণি পরের দিন, এরকম পালাক্রমিক পাঠদানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব। আর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণি একদিন এবং অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণি পরের দিন এরকম বিভাজনে ক্লাস চলতে পারে। এতেও সমস্যা বোধ করলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সপ্তাহে একদিন করে অন্তত একটি শ্রেণির ক্লাস চলুক।

রোগ প্রতিরোধের জন্য শারীরিক সক্ষমতা প্রয়োজন। কায়িক পরিশ্রম, খেলাধুলা এবং ব্যায়ামের মাধ্যমে সেই সক্ষমতা গড়ে ওঠে। ঘরের ভেতর বন্দি জীবনযাপন করার দরুন শিক্ষার্থীদের শারীরিক সক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রম সমাবেশের মাধ্যমে শুরু হয়। এ সময় শরীরের ফিটনেস ধরে রাখতে নানা ধরনের দৈহিক কসরত করানো হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললে সমাবেশের সময় ফুসফুস ও হৃৎপিণ্ড শক্তিশালী করতে নতুন কিছু ব্যায়াম যোগ করলে করোনা প্রতিরোধে শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

কিন্ডারগার্টেন থেকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক লাখ শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োজিত আছেন। উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবীদের এ এক গুরুত্বপূর্ণ কর্মক্ষেত্র। শিক্ষার্থীদের বেতন থেকে এদের বেতন হয়। সরকারি এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা নিয়মিত বেতন পেলেও অধিকাংশ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি বেসরকারি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উঠেই গেছে। বর্তমানে এদের অবস্থা খুবই শোচনীয়।

আমরা বারবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার তারিখ দিয়ে সেই তারিখ পেছাতে দেখছি। এতে করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ ও অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে। সর্বশেষ ১৩ জুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। এই তারিখ ঘোষণায় আবার সংক্রমণের হার ৫ শতাংশের নিচে নামার শর্ত রয়েছে। টেস্ট করালে কী সংখ্যক করোনা রোগী মিলবে তা অনেকটা নির্ভর করছে কিভাবে স্যাম্পল কালেকশন করা হচ্ছে তার ওপর।

এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে করোনার উপসর্গ নিয়ে আসা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের টেস্ট করার পরিপ্রেক্ষিতে করোনা রোগীর শতকরা হার নির্ধারিত হচ্ছে। এতে করে স্বাভাবিকভাবেই সংক্রমণের উঁচু হারের চিত্র মিলছে। র‌্যানডম স্যাম্পল নিয়ে টেস্ট করলে করোনা আক্রান্তদের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যেত। কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকা কিংবা একটি প্রতিষ্ঠানের সবাইকে টেস্ট করালে করোনা সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী তার মন্ত্রণালয়ের সবাইকে করোনার টেস্ট করিয়ে নমুনা যাচাই করতে পারেন। আশা করা যায়, এরকম ঢালাও টেস্টে? ৫ শতাংশের নিচে সংক্রমণের হার মিলবে।

শরীফুজ্জামান আগা খান : শিক্ষক ও গবেষক

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকাল বন্ধ রাখা যায় না

 শরীফুজ্জামান আগা খান 
০৮ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

স্কুলে যাওয়ার পথে এক এসএসসি পরিক্ষার্থীর সঙ্গে দেখা। এতদিনে ওর পরীক্ষা এবং রেজাল্ট হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। সে জানতে চাইল, স্যার আর কতকাল নন্দলাল হয়ে ঘরে বসে থাকব? পালটা প্রশ্ন করলাম, আসলেই কি ঘরে থাকছ? সে মৃদু হাসল। রাস্তার পাশে এক গাছতলায় চারজন শিক্ষার্থী স্মার্টফোন হাতে মনোযোগী হয়ে বসে আছে।

আমায় দেখে অপ্রস্তুত বোধ করল। হয়তো গেম খেলছিল। ফেসবুকে সকালে দেখা এক শিক্ষকের এই স্ট্যাটাসের কথা মনে পড়ল-বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় ভালোমানের বাচ্চারাও গোল্লায় যেতে বসেছে। পড়ালেখা নেই-দিনরাত মোবাইলে। ঘুম-গোসল খাওয়া সবকিছুই এলোমেলো। মা-বাবার সঙ্গে অস্বাভাবিক আচরণ করছে। আমরা তাদের বাঁচাতে চেয়ে মেরে ফেলছি না তো?

করোনাভাইরাসের কারণে ১৫ মাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। আমরা এই ভাইরাস থেকে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছি। কিন্তু করোনা থেকে রেহাই মিলছে না। সহসা মিলবে বলেও মনে হয় না। করোনা একের পর এক রূপ বদলে ঢেউয়ের আকারে আমাদের ওপর এসে পড়ছে। আমরা একটু স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে না আসতে আবার নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছি। কিন্তু এভাবে আর কতদিন করোনার সঙ্গে লুকোচুরি করে বাঁচা সম্ভব? শিক্ষার্থীদের ছন্নছাড়া অবস্থা। চার কোটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। করোনার সঙ্গে বসবাস করাই আমাদের ভবিতব্য হলে আর অনির্দিষ্টকাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ না রেখে কীভাবে সতর্কতার সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা যায় সেই উপায় খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি।

আমাদের দেশে প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজারের মতো মানুষের মৃত্যু হয়। করোনায় এ যাবৎ ১৩ হাজারের কাছাকাছি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গত বছর মার্চে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের পর করোনার কারণে প্রতিদিনের গড় মৃত্যু ২৯ জন। অনেক দেশের তুলনায় এ মৃত্যুর সংখ্যা তেমন একটা বড় নয়। যেসব দেশে করোনায় আমাদের চেয়ে অধিক মৃত্যু ঘটেছে, সেখানেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একেবারে বন্ধ হয়নি। করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে আমরা বোধ হয় মাত্রাতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছি।

এ অবস্থায় আমরা ডিজিটাল পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের কথা বলছি। কিন্তু এনালগে থাকা অধিকাংশ শিক্ষার্থী ডিজিটাল শিক্ষার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। ফলে করোনাকালে শিক্ষার বৈষম্য বেড়েছে। সুবিধাবঞ্চিতরা পিছিয়ে পড়ছে। শিক্ষার্থীরা দেখছে হাটবাজার, কারখানা, অফিস-আদালত, যানবাহন এসব কোনো না কোনোভাবে খোলা, শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। তারা হিসাব মেলাতে পারছে না। তাদের ভেতর অস্থিরতা বাড়ছে।

শিক্ষার্থীদের স্ব-শিখনের কথা বলা হলেও স্ব-শিখনের উপকরণ-কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাব, স্মার্টফোন নিম্নবিত্ত এবং দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের হাতে নেই। গ্রামাঞ্চলে নেট স্পিড যথেষ্ট জোরালো নয়। একটা বড় সংখ্যক দরিদ্র পরিবারে টেলিভিশনও নেই। শিক্ষার জ্ঞানগত উত্তরণে পরম্পরা থাকে। একটি ক্লাসের পাঠ আয়ত্ত করার পর পরবর্তী ক্লাসে উঠতে হয়। গত বছর একরকম না পড়েই শিক্ষার্থীরা পরের ক্লাসে উঠেছে। চলতি শিক্ষাবর্ষেরও অর্ধেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। এভাবে পাঠপরম্পরা ব্যাহত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা উপরের ক্লাসের পাঠ সঠিকভাবে বুঝতে পারবে না। এই সংকট থেকে কিভাবে তাদের উত্তরণ ঘটবে কে জানে?

এখন অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে বিকল্প শিখনের চেষ্টা চলছে। কিন্তু এই শিখন তেমন একটা কাজে আসছে না। এ বছর মার্চ-এপ্রিলে শিক্ষার্থীদের তিনবার অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয়। দেড় মাস বিরতির পর আবার অ্যাসাইনমেন্ট শুরু হয়েছে। এ কাজে প্রথম দিকে শিক্ষার্থীরা বইয়ের সংস্পর্শে থাকলেও এখন অনেকেই বই পড়ার প্রয়োজন বোধ করছে না। অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে এক বিপত্তি দেখা দিয়েছে। তারা যে বই পড়ে মাথা খাটিয়ে অ্যাসাইনমেন্টের উত্তর লিখবে সে গরজ আর নেই। উত্তর ইউটিউব এবং ফেসবুকে ভাসছে। সেখান থেকে অনেকেই কপি করছে।

কোনো কোনো ফটোস্ট্যাটের দোকানেও উত্তরপত্র বিক্রি হচ্ছে। শিক্ষাবোর্ড থেকে প্রতি শ্রেণির জন্য একই অ্যাসাইনমেন্ট না দিয়ে ‘অ্যাসাইনমেন্ট ব্যাংক’ করলে এই বিপত্তি ঘটত না। শ্রেণিশিক্ষকরা এর ভেতর থেকে বাছাই করে অ্যাসাইনমেন্ট শিক্ষার্থীদের দিতেন। একটি শ্রেণিতে শিক্ষার্থীভেদে অ্যাসাইনমেন্টের বিষয় ভিন্ন হলে উত্তর আর ইউটিউব কিংবা ফেসবুকে মিলত না। অ্যাসাইনমেন্টের মূল্যায়নে শিক্ষক অতি উত্তম, উত্তম, ভালো এবং অগ্রগতি প্রয়োজন-এই চারটি থেকে কোনো একটি মন্তব্য লিখছেন। এ রকম মূল্যায়ন শিক্ষার্থীদের যথেষ্ট তাড়িত করছে না। এর চেয়ে নম্বর দিলেই বোধ হয় ভালো হতো।

শিক্ষার্থীদের ঘরে থেকে স্ব-শিখন করতে বললেও গ্রাম এবং মফস্বলে সঙ্গতিসম্পন্ন পরিবারের শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট পড়ছে। অধিক সামর্থ্যবানরা গৃহশিক্ষক দিয়ে সন্তানদের পড়াচ্ছেন। আমার ছেলে বিজ্ঞান বিভাগে প্রথম বর্ষ শেষ করেছে। কলেজে একদিনও ক্লাস হয়নি। সে কয়েক বন্ধুর সঙ্গে মিলে ছয় জায়গায় প্রাইভেট পড়ছে। ওর প্রাইভেটের খরচ জোগাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছি। কলেজে ক্লাস হলে এতটা প্রাইভেটের খরচ লাগত না। ব্যবহারিক ক্লাস বিজ্ঞান শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। একটি বর্ষ শেষ করে পরের বর্ষে গড়ালেও সে কোনো ব্যবহারিক ক্লাস করতে পারেনি। সম্প্রতি সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে।

এখানে এমন কিছুসংখ্যক দরিদ্র পরিবারের মেধাবি শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পেয়েছে, যাদের ভর্তি হওয়া এবং লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার মতো সঙ্গতি নেই। সংবাদপত্রে এ খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সহৃদয় বিত্তবানরা তাদের পাশে দাঁড়াতে চাইছেন। এসব শিক্ষার্থীর প্রাইভেট-কোচিংয়ে পড়ার তেমন অর্থ ছিল না। মূলত শ্রেণিকক্ষের পাঠ এবং নিজেদের প্রচেষ্টায় তারা এ সাফল্য অর্জন করেছে। বছরাধিককাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা নিজেদের মেধা বিকাশের ন্যূনতম সহায়তা এখন আর পাচ্ছে না। আগামীতে দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় এ রকম সাফল্য দেখতে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বাল্যবিয়ের ঘটনা অনেক বেড়ে গেছে। আগে মফস্বলের হাইস্কুলের অষ্টম-নবম শ্রেণি পর্যন্ত বাল্যবিয়ের নিম্নসীমা ছিল। এ বছর বাল্যবিয়ের নিম্নসীমা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত নেমে গেছে। পিইসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছাত্রীদের ভর্তির বিষয় খোঁজ নিতে গিয়ে এ বয়সের মেয়ের বিয়ে হওয়ার ঘটনা জানলাম। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর মাধ্যমিক স্তরে একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ছাত্রীকে আর শ্রেণিকক্ষে পাওয়া যাবে না।

পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে গড়াতে না দিয়ে অতিদ্রুত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া প্রয়োজন। সব শিক্ষার্থী নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা ঝুঁকি বিবেচিত হলে শিক্ষার্থীর উপস্থিতির সংখ্যা অর্ধেক করা যেতে পারে। বাস যাত্রীদের ভেতর সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে দুই সিটে একজন করে বসানো হচ্ছে। তদ্রূপ বিদ্যালয়েও এক বেঞ্চের দুই মাথায় দুইজনকে বসানো যায়। সাধারণত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিচের দিকের ক্লাসে শিক্ষার্থী বেশি থাকে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেণি একদিন এবং তৃতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চম শ্রেণি পরের দিন, এরকম পালাক্রমিক পাঠদানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব। আর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণি একদিন এবং অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণি পরের দিন এরকম বিভাজনে ক্লাস চলতে পারে। এতেও সমস্যা বোধ করলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সপ্তাহে একদিন করে অন্তত একটি শ্রেণির ক্লাস চলুক।

রোগ প্রতিরোধের জন্য শারীরিক সক্ষমতা প্রয়োজন। কায়িক পরিশ্রম, খেলাধুলা এবং ব্যায়ামের মাধ্যমে সেই সক্ষমতা গড়ে ওঠে। ঘরের ভেতর বন্দি জীবনযাপন করার দরুন শিক্ষার্থীদের শারীরিক সক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রম সমাবেশের মাধ্যমে শুরু হয়। এ সময় শরীরের ফিটনেস ধরে রাখতে নানা ধরনের দৈহিক কসরত করানো হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললে সমাবেশের সময় ফুসফুস ও হৃৎপিণ্ড শক্তিশালী করতে নতুন কিছু ব্যায়াম যোগ করলে করোনা প্রতিরোধে শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

কিন্ডারগার্টেন থেকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক লাখ শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োজিত আছেন। উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবীদের এ এক গুরুত্বপূর্ণ কর্মক্ষেত্র। শিক্ষার্থীদের বেতন থেকে এদের বেতন হয়। সরকারি এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা নিয়মিত বেতন পেলেও অধিকাংশ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি বেসরকারি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উঠেই গেছে। বর্তমানে এদের অবস্থা খুবই শোচনীয়।

আমরা বারবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার তারিখ দিয়ে সেই তারিখ পেছাতে দেখছি। এতে করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ ও অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে। সর্বশেষ ১৩ জুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। এই তারিখ ঘোষণায় আবার সংক্রমণের হার ৫ শতাংশের নিচে নামার শর্ত রয়েছে। টেস্ট করালে কী সংখ্যক করোনা রোগী মিলবে তা অনেকটা নির্ভর করছে কিভাবে স্যাম্পল কালেকশন করা হচ্ছে তার ওপর।

এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে করোনার উপসর্গ নিয়ে আসা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের টেস্ট করার পরিপ্রেক্ষিতে করোনা রোগীর শতকরা হার নির্ধারিত হচ্ছে। এতে করে স্বাভাবিকভাবেই সংক্রমণের উঁচু হারের চিত্র মিলছে। র‌্যানডম স্যাম্পল নিয়ে টেস্ট করলে করোনা আক্রান্তদের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যেত। কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকা কিংবা একটি প্রতিষ্ঠানের সবাইকে টেস্ট করালে করোনা সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী তার মন্ত্রণালয়ের সবাইকে করোনার টেস্ট করিয়ে নমুনা যাচাই করতে পারেন। আশা করা যায়, এরকম ঢালাও টেস্টে? ৫ শতাংশের নিচে সংক্রমণের হার মিলবে।

শরীফুজ্জামান আগা খান : শিক্ষক ও গবেষক

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন