দৈনন্দিন ব্যবসায়িক নির্বাচন যেভাবে মানবাধিকারকে প্রভাবিত করে
jugantor
দৈনন্দিন ব্যবসায়িক নির্বাচন যেভাবে মানবাধিকারকে প্রভাবিত করে

  আর্ল আর মিলার  

১৬ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আপনি যেখানেই থাকুন না কেন, পছন্দের পণ্য কেনার মতো একটি সাধারণ কাজ আপনার সঙ্গে কখনো দেখা হয়নি এমন কারও মানবাধিকারকে প্রভাবিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

ব্যবসায়িক কার্যক্রম-উৎপাদন, বিক্রয়, বিনিয়োগ ও কেনাকাটা-বিশ্বব্যাপী শত শত কোটি মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করছে। প্রতিদিন আমরা কোনো না কোনো ধরনের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হই। আমরা নতুন ফোন ব্যবহার করে বার্তা পাঠাই। ফল-ফলাদি ও সবজি কিনতে বাজারে যাই। চামড়ার নতুন জুতা কিনি, নতুন পোশাক বানাই, সামুদ্রিক খাবার উপভোগ করি এবং নতুন বিছানায় ঘুমাই।

একবার ভাবুন তো আপনি যে পণ্যগুলো কিনছেন, সেগুলো এমন কোন কোম্পানি তৈরি করছে, যারা শিশুশ্রম বা জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহার করে। এটি এমনও হতে পারে যে, শ্রমিকরা বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকাসহ বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে এবং বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থগুলো স্থানীয় খাবার পানির উৎসগুলোকে দূষিত করছে।

এমনও হতে পারে যে, শ্রমিকরা সামান্য পারিশ্রমিকে কিংবা কখনো কখনো কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই দীর্ঘসময় কাজ করছেন। তারা হয়তো শিশু শ্রমিকদের ব্যবহার করেন, যারা স্কুলে যায়নি কিংবা যে শিশু মানব পাচার বা যৌন নির্যাতনের শিকার। স্থানীয় এলাকাবাসী যখন কাজের পরিবেশ ও দূষণ নিয়ে কথা বলে, তখন তাদের প্রায়ই হুমকি দেওয়া হয় এবং কখনো কখনো তাদের আক্রমণ করা হয়।

অন্য ধরনের পরিস্থিতিও দেখতে পাওয়া যায়, যেখানে আমাদের কাঙ্ক্ষিত পণ্য ও সেবা দেওয়ার জন্য অবকাঠামো নির্মাণ করতে গিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ না দিয়েই বাস্তুচ্যুত ও স্থানচ্যুত করা হতে পারে কিংবা স্থানীয় জনগোষ্ঠী তাদের ঐতিহ্যবাহী কৃষিভূমিগুলো হারাতে পারে কিংবা সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

হয়তো ওই পণ্যটির উপাদান কোনো এলাকায় অবৈধভাবে বন উজাড় করে, জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ বর্ষাপ্রবণ বনাঞ্চল প্রতিস্থাপন করে এবং বন্যপ্রাণীগুলোকে বিপদাপন্ন করে উৎপাদন করা হচ্ছে, যা আগে স্থানীয় জনগণের জন্য উপযোগী ছিল এবং জলবায়ুর জন্য সহনশীল ছিল।

এমন ঘটনা বিশ্বজুড়ে শিল্পকারখানা নির্বিশেষে আমাদের চেনাজানা প্রায় প্রতিটি পণ্যের ক্ষেত্রে প্রতিদিন ঘটছে, যা মানবাধিকার ও পরিবেশের ওপর ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরে। প্রতিটি ব্যবসারই মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় দায়িত্ব ও সুযোগ রয়েছে।

ব্যবসার ভালো দিকটি হলো ব্যবসায়ীরা স্থানীয় মানুষের মজুরি বাড়িয়ে, স্থানীয় পর্যায়ে কাজের পরিবেশ উন্নত করে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করে এবং টেকসইভাবে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার মাধ্যমে সমাজ ও পরিবেশকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করার অপরিসীম ক্ষমতা রাখে। কিন্তু প্রশ্ন হলো-লাভের জন্য মানবাধিকারকে উপেক্ষা না করার বিষয়টিকে নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার?

এ প্রশ্নের উত্তর জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ কর্তৃক ১০ বছর আগে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত ব্যবসা ও মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের পথনির্দেশক নীতিমালায় (ইউএন গাইডিং প্রিন্সিপাল অন বিজনেস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস-ইউএনজিপি) দেওয়া হয়েছে। সেখানে শেয়ারড রেসপন্সিবিলিটি বা ভাগাভাগি করে সবাই মিলে দায়িত্ব পালনের কথা বলা হয়েছে।

এই নীতিমালায় ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগাতে ও অপব্যবহার প্রতিকারে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো যে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে, সেই বিষয়ে একটি সাধারণ বোঝাপড়া তৈরি করা হয়েছে। জাতিসংঘের পথনির্দেশক নীতিমালায় তিনটি স্তম্ভের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে- ১. মানবাধিকার রক্ষায় সরকারের কর্তব্য।

২. ব্যবসার ক্ষেত্রে মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান দেখানোর দায়িত্ব। ৩. ব্যবসাসংশ্লিষ্ট মানবাধিকার বিষয়গুলো দ্বারা ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থায় অবশ্যই প্রবেশাধিকার থাকা।

ব্যবসা ও মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের পথনির্দেশক নীতিমালার প্রতি সাড়া দিয়ে এই নীতিমালার আলোকে যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশের সরকার গত এক দশকে ব্যবসা ও মানবাধিকার সম্পর্কিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে এবং করপোরেট/কোম্পানিগুলোর (ব্যবসা ও মানবাধিকারবিষয়ক) অপব্যবহার মোকাবিলায় ও জবাবদিহিতা বাড়াতে আইন প্রণয়ন করেছে।

অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, যার মধ্যে কারও কারও বাংলাদেশেও ব্যবসায়িক কার্যক্রম রয়েছে; নিরাপত্তা, শ্রমিক অধিকার এবং সম্পর্কিত করপোরেট নীতিমালা ও চর্চাগুলো জোরদার করেছে এবং তাদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড, বিনিয়োগ, চুক্তি কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে কিংবা অজান্তে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা এড়াতে যথাযথ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ব্যবসাগুলো পরিচালনা, আইনি ও সুনামের ঝুঁকিগুলো প্রশমন বা হ্রাস করার মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অর্জন করে থাকে। এ ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো জানে যে মানবাধিকারকে সম্মান করা শুধুই সঠিক কাজ নয়, এটি স্মার্ট বা আধুনিকতার পরিচয়ও বটে। বাংলাদেশের কিছু রপ্তানি পণ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান শ্রমের অপব্যবহার ও শিশু শ্রম পরীবিক্ষণ করা ও প্রতিরোধের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মান অর্জনে সমর্থ হয়েছে। তারা প্রমাণ করে যে কীভাবে আন্তর্জাতিক নীতিমালা এবং ব্যবসার মান মেনে চলা রফতানি এবং বৃদ্ধির আরও সুযোগ সৃষ্টি করে একইসঙ্গে উচ্চ উৎপাদনশীলতা, উন্নত স্বাস্থ্য এবং শ্রমিকদের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করে।

কোম্পানি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বিকশিত হয় ও দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়, যখন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সরকার শক্তিশালী আইনের শাসন নিশ্চিত করতে একত্রিতভাবে কাজ করে; মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়; জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রম, পরিবেশগত ও প্রযুক্তিগত মানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়; সুশাসন এবং কার্যকর ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকার বৈশ্বিক মানদণ্ডগুলো প্রতিষ্ঠা ও এগিয়ে নিতে সহায়তা ও কাজ করছে, যাতে করে কোম্পানিগুলোর দায়িত্বের সঙ্গে ও অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল পদ্ধতিতে ব্যবসা পরিচালনা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনগোষ্ঠীকে তাদের প্রাপ্য সুবিধা ও অধিকারগুলোকে পৌঁছে দেওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা জাগানো, আইনের শাসনের প্রতি সম্মান দেখানো এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে শক্তিশালীকরণ ও মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি প্রতিপালনের মাধ্যমে দায়িত্বশীল ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী নেতৃত্ব দেওয়া কোম্পানিগুলোর অন্যতম।

আমরা এ অবস্থার উন্নতিতে আরও কিছু করতে আগ্রহী। আমরা বৈশ্বিক মহামারি থেকে উত্তরণের পথে ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করার শুরুর এই সময়টাতে বাংলাদেশের অংশীদারদের সঙ্গেও কাজ করতে আগ্রহী।

সবাই মিলে সমাধান করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোসহ সব কোম্পানির মানবাধিকার বিষয়গুলোতে কার্যক্রম জোরদার করা উচিত এবং সরকার, কর্মী ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা উচিত। জাতিসংঘের পথনির্দেশক নীতিমালা আমাদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এটাই যথেষ্ট নয়।

ইউএনজিপি (ব্যবসায় ও মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের পথনির্দেশক নীতিমালা) কাঠামো এবং অনুরূপ নির্দেশনামূলক নথি ওইসিডি গাইডলাইন ফর মাল্টিন্যাশনাল এন্টারপ্রাইজেসের আওতায় বিগত ১০ বছরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে মানুষ ও পৃথিবীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও সম্মানকে অন্তর্ভুক্ত করে অর্থনৈতিক সাফল্যকে দেখা এবং সেই লক্ষ্যে ব্যবসা পরিচালনা করতে বিশ্বকে উৎসাহিত করার জন্য এখনো অনেক কিছু করার বাকি আছে। এই ফলাফল শুধু তখনই পাওয়া সম্ভব হবে যখন (সব দেশের) সরকার ব্যবসায় মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান নিশ্চিত করতে এবং সরকারি আইন প্রয়োগে শক্তিশালী অংশীদার হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসাসমূহ এই কাজে নিবেদিত। (যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে) মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান বিশ্বজুড়ে মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে কাজের মাধ্যমে সবচেয়ে ভালোভাবে অর্জিত হবে। ইউএনজিপির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যবসার দ্বারা মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রতিষ্ঠার ভবিষ্যৎ প্রচেষ্টাগুলোর সাফল্য নির্ভর করবে সরকার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের যৌথ সহযোগিতার ওপর।

আমাদের প্রতিশ্রুতির বিষয়টি তুলে ধরতে ১৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেট ব্লিনকেন ঘোষণা করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সরকার শিগগিরই দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণ সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পরিকল্পনা হালনাগাদ ও পুনরুজ্জীবিত করার প্রক্রিয়া শুরু করবে। যেহেতু এই মহান জাতি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছে, আগামী দশকগুলোতে বাংলাদেশের ব্যবসাসমূহের মাধ্যমে মানবাধিকারের প্রতি সম্মানকে একসঙ্গে আরও এগিয়ে নেওয়ার এ এক দুর্দান্ত সময়।

আর্ল আর মিলার : বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত

দৈনন্দিন ব্যবসায়িক নির্বাচন যেভাবে মানবাধিকারকে প্রভাবিত করে

 আর্ল আর মিলার 
১৬ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আপনি যেখানেই থাকুন না কেন, পছন্দের পণ্য কেনার মতো একটি সাধারণ কাজ আপনার সঙ্গে কখনো দেখা হয়নি এমন কারও মানবাধিকারকে প্রভাবিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

ব্যবসায়িক কার্যক্রম-উৎপাদন, বিক্রয়, বিনিয়োগ ও কেনাকাটা-বিশ্বব্যাপী শত শত কোটি মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করছে। প্রতিদিন আমরা কোনো না কোনো ধরনের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হই। আমরা নতুন ফোন ব্যবহার করে বার্তা পাঠাই। ফল-ফলাদি ও সবজি কিনতে বাজারে যাই। চামড়ার নতুন জুতা কিনি, নতুন পোশাক বানাই, সামুদ্রিক খাবার উপভোগ করি এবং নতুন বিছানায় ঘুমাই।

একবার ভাবুন তো আপনি যে পণ্যগুলো কিনছেন, সেগুলো এমন কোন কোম্পানি তৈরি করছে, যারা শিশুশ্রম বা জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহার করে। এটি এমনও হতে পারে যে, শ্রমিকরা বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকাসহ বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে এবং বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থগুলো স্থানীয় খাবার পানির উৎসগুলোকে দূষিত করছে।

এমনও হতে পারে যে, শ্রমিকরা সামান্য পারিশ্রমিকে কিংবা কখনো কখনো কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই দীর্ঘসময় কাজ করছেন। তারা হয়তো শিশু শ্রমিকদের ব্যবহার করেন, যারা স্কুলে যায়নি কিংবা যে শিশু মানব পাচার বা যৌন নির্যাতনের শিকার। স্থানীয় এলাকাবাসী যখন কাজের পরিবেশ ও দূষণ নিয়ে কথা বলে, তখন তাদের প্রায়ই হুমকি দেওয়া হয় এবং কখনো কখনো তাদের আক্রমণ করা হয়।

অন্য ধরনের পরিস্থিতিও দেখতে পাওয়া যায়, যেখানে আমাদের কাঙ্ক্ষিত পণ্য ও সেবা দেওয়ার জন্য অবকাঠামো নির্মাণ করতে গিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ না দিয়েই বাস্তুচ্যুত ও স্থানচ্যুত করা হতে পারে কিংবা স্থানীয় জনগোষ্ঠী তাদের ঐতিহ্যবাহী কৃষিভূমিগুলো হারাতে পারে কিংবা সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

হয়তো ওই পণ্যটির উপাদান কোনো এলাকায় অবৈধভাবে বন উজাড় করে, জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ বর্ষাপ্রবণ বনাঞ্চল প্রতিস্থাপন করে এবং বন্যপ্রাণীগুলোকে বিপদাপন্ন করে উৎপাদন করা হচ্ছে, যা আগে স্থানীয় জনগণের জন্য উপযোগী ছিল এবং জলবায়ুর জন্য সহনশীল ছিল।

এমন ঘটনা বিশ্বজুড়ে শিল্পকারখানা নির্বিশেষে আমাদের চেনাজানা প্রায় প্রতিটি পণ্যের ক্ষেত্রে প্রতিদিন ঘটছে, যা মানবাধিকার ও পরিবেশের ওপর ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরে। প্রতিটি ব্যবসারই মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় দায়িত্ব ও সুযোগ রয়েছে।

ব্যবসার ভালো দিকটি হলো ব্যবসায়ীরা স্থানীয় মানুষের মজুরি বাড়িয়ে, স্থানীয় পর্যায়ে কাজের পরিবেশ উন্নত করে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করে এবং টেকসইভাবে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার মাধ্যমে সমাজ ও পরিবেশকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করার অপরিসীম ক্ষমতা রাখে। কিন্তু প্রশ্ন হলো-লাভের জন্য মানবাধিকারকে উপেক্ষা না করার বিষয়টিকে নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার?

এ প্রশ্নের উত্তর জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ কর্তৃক ১০ বছর আগে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত ব্যবসা ও মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের পথনির্দেশক নীতিমালায় (ইউএন গাইডিং প্রিন্সিপাল অন বিজনেস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস-ইউএনজিপি) দেওয়া হয়েছে। সেখানে শেয়ারড রেসপন্সিবিলিটি বা ভাগাভাগি করে সবাই মিলে দায়িত্ব পালনের কথা বলা হয়েছে।

এই নীতিমালায় ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগাতে ও অপব্যবহার প্রতিকারে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো যে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে, সেই বিষয়ে একটি সাধারণ বোঝাপড়া তৈরি করা হয়েছে। জাতিসংঘের পথনির্দেশক নীতিমালায় তিনটি স্তম্ভের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে- ১. মানবাধিকার রক্ষায় সরকারের কর্তব্য।

২. ব্যবসার ক্ষেত্রে মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান দেখানোর দায়িত্ব। ৩. ব্যবসাসংশ্লিষ্ট মানবাধিকার বিষয়গুলো দ্বারা ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থায় অবশ্যই প্রবেশাধিকার থাকা।

ব্যবসা ও মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের পথনির্দেশক নীতিমালার প্রতি সাড়া দিয়ে এই নীতিমালার আলোকে যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশের সরকার গত এক দশকে ব্যবসা ও মানবাধিকার সম্পর্কিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে এবং করপোরেট/কোম্পানিগুলোর (ব্যবসা ও মানবাধিকারবিষয়ক) অপব্যবহার মোকাবিলায় ও জবাবদিহিতা বাড়াতে আইন প্রণয়ন করেছে।

অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, যার মধ্যে কারও কারও বাংলাদেশেও ব্যবসায়িক কার্যক্রম রয়েছে; নিরাপত্তা, শ্রমিক অধিকার এবং সম্পর্কিত করপোরেট নীতিমালা ও চর্চাগুলো জোরদার করেছে এবং তাদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড, বিনিয়োগ, চুক্তি কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে কিংবা অজান্তে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা এড়াতে যথাযথ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ব্যবসাগুলো পরিচালনা, আইনি ও সুনামের ঝুঁকিগুলো প্রশমন বা হ্রাস করার মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অর্জন করে থাকে। এ ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো জানে যে মানবাধিকারকে সম্মান করা শুধুই সঠিক কাজ নয়, এটি স্মার্ট বা আধুনিকতার পরিচয়ও বটে। বাংলাদেশের কিছু রপ্তানি পণ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান শ্রমের অপব্যবহার ও শিশু শ্রম পরীবিক্ষণ করা ও প্রতিরোধের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মান অর্জনে সমর্থ হয়েছে। তারা প্রমাণ করে যে কীভাবে আন্তর্জাতিক নীতিমালা এবং ব্যবসার মান মেনে চলা রফতানি এবং বৃদ্ধির আরও সুযোগ সৃষ্টি করে একইসঙ্গে উচ্চ উৎপাদনশীলতা, উন্নত স্বাস্থ্য এবং শ্রমিকদের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করে।

কোম্পানি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বিকশিত হয় ও দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়, যখন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সরকার শক্তিশালী আইনের শাসন নিশ্চিত করতে একত্রিতভাবে কাজ করে; মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়; জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রম, পরিবেশগত ও প্রযুক্তিগত মানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়; সুশাসন এবং কার্যকর ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকার বৈশ্বিক মানদণ্ডগুলো প্রতিষ্ঠা ও এগিয়ে নিতে সহায়তা ও কাজ করছে, যাতে করে কোম্পানিগুলোর দায়িত্বের সঙ্গে ও অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল পদ্ধতিতে ব্যবসা পরিচালনা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনগোষ্ঠীকে তাদের প্রাপ্য সুবিধা ও অধিকারগুলোকে পৌঁছে দেওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা জাগানো, আইনের শাসনের প্রতি সম্মান দেখানো এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে শক্তিশালীকরণ ও মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি প্রতিপালনের মাধ্যমে দায়িত্বশীল ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী নেতৃত্ব দেওয়া কোম্পানিগুলোর অন্যতম।

আমরা এ অবস্থার উন্নতিতে আরও কিছু করতে আগ্রহী। আমরা বৈশ্বিক মহামারি থেকে উত্তরণের পথে ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করার শুরুর এই সময়টাতে বাংলাদেশের অংশীদারদের সঙ্গেও কাজ করতে আগ্রহী।

সবাই মিলে সমাধান করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোসহ সব কোম্পানির মানবাধিকার বিষয়গুলোতে কার্যক্রম জোরদার করা উচিত এবং সরকার, কর্মী ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা উচিত। জাতিসংঘের পথনির্দেশক নীতিমালা আমাদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এটাই যথেষ্ট নয়।

ইউএনজিপি (ব্যবসায় ও মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের পথনির্দেশক নীতিমালা) কাঠামো এবং অনুরূপ নির্দেশনামূলক নথি ওইসিডি গাইডলাইন ফর মাল্টিন্যাশনাল এন্টারপ্রাইজেসের আওতায় বিগত ১০ বছরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে মানুষ ও পৃথিবীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও সম্মানকে অন্তর্ভুক্ত করে অর্থনৈতিক সাফল্যকে দেখা এবং সেই লক্ষ্যে ব্যবসা পরিচালনা করতে বিশ্বকে উৎসাহিত করার জন্য এখনো অনেক কিছু করার বাকি আছে। এই ফলাফল শুধু তখনই পাওয়া সম্ভব হবে যখন (সব দেশের) সরকার ব্যবসায় মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান নিশ্চিত করতে এবং সরকারি আইন প্রয়োগে শক্তিশালী অংশীদার হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসাসমূহ এই কাজে নিবেদিত। (যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে) মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান বিশ্বজুড়ে মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে কাজের মাধ্যমে সবচেয়ে ভালোভাবে অর্জিত হবে। ইউএনজিপির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যবসার দ্বারা মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রতিষ্ঠার ভবিষ্যৎ প্রচেষ্টাগুলোর সাফল্য নির্ভর করবে সরকার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের যৌথ সহযোগিতার ওপর।

আমাদের প্রতিশ্রুতির বিষয়টি তুলে ধরতে ১৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেট ব্লিনকেন ঘোষণা করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সরকার শিগগিরই দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণ সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পরিকল্পনা হালনাগাদ ও পুনরুজ্জীবিত করার প্রক্রিয়া শুরু করবে। যেহেতু এই মহান জাতি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছে, আগামী দশকগুলোতে বাংলাদেশের ব্যবসাসমূহের মাধ্যমে মানবাধিকারের প্রতি সম্মানকে একসঙ্গে আরও এগিয়ে নেওয়ার এ এক দুর্দান্ত সময়।

আর্ল আর মিলার : বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন