দেশে নতুন দরিদ্রের সংখ্যা আসলে কত?
jugantor
স্বদেশ ভাবনা
দেশে নতুন দরিদ্রের সংখ্যা আসলে কত?

  আবদুল লতিফ মন্ডল  

১৮ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে দেশের মানুষের আয় হ্রাস পাওয়ায় বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর জরিপে উঠে আসা নতুন দরিদ্রের হিসাব প্রত্যাখ্যান করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

৯ জুন ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকরা আড়াই কোটির মতো মানুষ নতুন দরিদ্র হয়েছে বলে বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদনের বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নতুন দরিদ্রের এ হিসাব আমি স্বীকার করি না।

যাদের কাছে তালিকা আছে ২ কোটি বা ১ কোটি বা ১০ জন, এ তথ্য তারা কোথায় পেয়েছে, আগে তা জানা দরকার। গবেষণার জন্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) আছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে যতদিন তথ্য পাওয়া না যাবে, ততদিন অন্য প্রতিষ্ঠানের তথ্য গ্রহণ করার সুযোগ নেই।’

২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। ভাইরাসের সংক্রমণের হার বাড়তে থাকলে তা রোধে সরকার ওই মাসের ২৬ তারিখ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। এতে দেশ লকডাউনের মতো অবস্থায় চলে আসে। কৃষি খাতে শস্য উৎপাদন, সংগ্রহ ও বিপণন কার্যক্রম সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চালু থাকলেও অন্য প্রায় সব খাতের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। এতে চাকরিচ্যুতি, বেতন/মজুরি হ্রাস, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি কারণে অনেকের, বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের আয় কমে যাওয়ায় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা এবং দারিদ্র্যহার বেড়ে যায়।

১১ জুন ২০২০ জাতীয় সংসদে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনের আগে একাধিক বেসরকারি গবেষণা সংস্থার গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, করোনা পরিস্থিতিতে দেশে দারিদ্র্যহারে উল্লম্ফন ঘটেছে।

ওই বছর ১০ মে এক ভার্চুয়ালি সেমিনারে উপস্থাপিত বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) যৌথ গবেষণার ফলাফলে জানা যায়, করোনার কারণে দেশে নতুন করে ২২ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ গরিব হয়েছে। এতে নতুন ও পুরোনো মিলিয়ে জনসংখ্যার ৪৩ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। গরিব মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭ কোটির বেশি।

এর প্রায় এক মাস পর অর্থাৎ ৭ জুন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ভার্চুয়ালি মিডিয়া ব্রিফিং উপলক্ষ্যে প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায়, দেশে দারিদ্র্যহার ৩৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে এবং দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ৭৭ লাখের উপরে।

আর ৮ জুন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির এক সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, করোনা সংক্রমণ রোধে সরকার ঘোষিত ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটিতে ৫ কোটি ১০ লাখ নিম্নমধ্যবিত্তের মধ্যে ১ কোটি ১৯ লাখ দরিদ্র হয়েছে। গত বছর আগস্টে প্রকাশিত আইসিডিডিআর’বি এবং অস্ট্রেলিয়া ওয়াল্টার এলিজা হল ইনস্টিটিউটের যৌথ গবেষণায় বলা হয়, করোনা মহামারি ঠেকাতে সরকার ঘোষিত দুমাসের সাধারণ ছুটিতে ৯৬ শতাংশ পরিবারের গড় মাসিক উপার্জন হ্রাস পায়; ৯১ শতাংশ নিজেদের অর্থনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল মনে করে এবং ৪৭ শতাংশ পরিবারের আয় দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায়।

গত ২৩ জানুয়ারি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) আয়োজিত ‘দারিদ্র্য ও জীবিকার ওপর কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব’ শীর্ষক এক ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠানে দেশজুড়ে থানা পর্যায়ে পরিচালিত জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, করোনা মহামারির প্রভাবে দেশে সার্বিক দারিদ্র্যের হার বেড়ে ৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

চলতি বছরের ২০ এপ্রিল পিপিআরসি ও বিআইজিডির এক জরিপের ফলাফল প্রকাশ উপলক্ষ্যে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, কোভিডের আঘাতে দেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ। ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশে এ নতুন দরিদ্র শ্রেণির সংখ্যা জনসংখ্যার ১৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ হয়েছে, ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত যা ছিল ২১ দশমিক ২৪ শতাংশ। জরিপে যারা সাধারণত দারিদ্র্যসীমার উপরে বসবাস করেন কিন্তু যে কোনো অভিঘাতে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারেন, তাদের নতুন দরিদ্র হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

জরিপে আরও বলা হয়েছে, গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলে নতুন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত যেখানে শহরাঞ্চলে নতুন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ছিল ৫৯ শতাংশ, সেখানে গ্রামাঞ্চলে তা ছিল ৪৪ শতাংশ।

গত ১৩ এপ্রিল দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাংকের এক নতুন প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোভিড-১৯ বাংলাদেশের দুই দশকের দারিদ্র্য হ্রাসের নিয়মিত গতিকে উল্টোমুখী করেছে। দেশটিতে এখন ৩০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে।

করোনাকালে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্যহারে ঊর্ধ্বগতির জন্য চিহ্নিত কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- এক. জনগণের প্রধান খাদ্য চালের উৎপাদন হ্রাস ও উচ্চমূল্য।

২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনাভাইরাসের উপস্থিতি জানা যায়। ২০২০-২১ অর্থবছরের মার্চ-জুন সময়কালে করোনা মহামারি, ঘূর্ণিঝড় আম্পান, দীর্ঘ খরা, আগের মৌসুমে (২০১৮-১৯) ধানচাষিরা উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় তুলনামূলকভাবে কম জমিতে বোরোর চাষ ইত্যাদি কারণে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার (২ কোটি ৪ লাখ টন) তুলনায় ৮ লাখ টন কম বোরো চাল উৎপাদিত হয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) হিসাব অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট চাল উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ কোটি ৫৮ লাখ ৫০ হাজার টনে, প্রবৃদ্ধি হারে যা ছিল ঋণাত্মক। এদিকে চাল আমদানিতে উচ্চ শুল্ক আরোপ করায় কেবল বেসরকারি খাতে খুব স্বল্প পরিমাণ চাল আমদানি হয়। ফলে চালের দাম বাড়তে থাকে এবং তা গরিব, নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। পূর্বোক্ত আইসিডিডিআর’বি এবং অস্ট্রেলিয়া ওয়াল্টার এলিজা হল ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী, এসব পরিবারের ৭০ শতাংশ খাদ্যনিরাপত্তায় ভোগে।

সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরেও (২০২০-২১) চালের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সফল না হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইউএসডিএ’র হিসাব অনুযায়ী, উপর্যুপরি বন্যায় ২০২০-২১ অর্থবছরে আমন উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং চালের উৎপাদন দাঁড়ায় ১ কোটি ৩৩ লাখ টনে, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ লাখ টন কম।

ইউএসডিএ’র এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে গত ১৭ মে দ্য ডেইলি স্টারের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, হিটশক ও পোকার আক্রমণে দেশে চলতি বছরে বোরো চালের উৎপাদন দাঁড়াবে ১ কোটি ৯০ লাখ টনে, যা সরকারি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৫ লাখ টন এবং গত অর্থবছরের উৎপাদনের তুলনায় ৬ লাখ টন কম।

বোরো ধান কাটা পূর্ণোদ্যমে শুরুর আগ পর্যন্ত গরিব, নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তের প্রধান খাদ্য মোটা চালের দাম কেজিপ্রতি ৫০ টাকা ছুঁই ছুঁই করছিল। চালের দামের উল্লম্ফন শুধু খাদ্য নিরাপত্তায় হুমকি সৃষ্টি করে না, নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তকে গরিবদের কাতারে নিয়ে আসতেও সহায়তা করে। দুই. করোনাকালে শুধু চাকরিচুতি, বেতন/মজুরি হ্রাস ঘটেনি, শ্রমশক্তির চূড়ামণি যুবকদের, বিশেষ করে শিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থানের পথও অনেকটা রুদ্ধ হয়ে গেছে।

বেকারত্ব বৃদ্ধি দারিদ্র্য বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে, কারণ বেকারত্ব ও দারিদ্র্য একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। তিন. সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দারিদ্র্য হ্রাসে একটি স্বীকৃত পন্থা। এটি ঠিক, এ কর্মসূচির আওতায় ক্রমান্বয়ে কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটছে এবং অর্থ বরাদ্দ বাড়ছে।

সমস্যা হলো, যে হারে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে, সে হারে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে না। উপকারভোগীদের মাথাপিছু বরাদ্দকৃত অর্থ তাদের জীবন ধারণের ন্যূনতম উপকরণের চাহিদা মেটাতে সমর্থ না হওয়ায় তারা ‘দারিদ্র্য চক্র’ থেকে বের হতে পারছেন না।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সহায়তায় তারা কোনো রকমে বেঁচে থাকছেন। জীবন মানের উন্নতি না হওয়ায় তাদের শ্রেণিগত পরিবর্তন হচ্ছে না। অর্থাৎ তারা দরিদ্র্রই থেকে যাচ্ছেন। ফলে দারিদ্র্যহার হ্রাসে তাদের কোনো ভূমিকা থাকছে না।

বিবিএসের সর্বশেষ ২০১৬ সালের হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভেতে (হায়েস) দেশে দারিদ্র্যহার ২৪ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট বক্ততায় অর্থমন্ত্রী ২০১৮ সালে দেশে দারিদ্র্যহার ২১ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে বলে জানান। অর্থমন্ত্রী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট বক্ততায় দেশে বিদ্যমান দারিদ্র্যহার নিয়ে কোনো বক্তব্য রাখেননি, যদিও তিনি বলেছেন, ‘সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে আগামী ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ১২.৩ শতাংশে এবং অতি দারিদ্র্যের হার ৪.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা।’

বিবিএস করোনা মহামারির সময়কালসহ কয়েক বছর ধরে ‘হায়েস’ প্রকাশ না করায় জনগণ বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর জরিপে উঠে আসা নতুন দরিদ্র সংখ্যা ও উচ্চ দারিদ্র্যহারে বিশ্বাস স্থাপন করতে শুরু করেছে।

বিবিএসের সার্ভের অবর্তমানে নতুন দরিদ্র সংখ্যা এবং দারিদ্র্যহার নিয়ে পরিচালিত বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যকে অর্থমন্ত্রীর প্রত্যাখ্যান অনেকটা উটপাখির মতো বালিতে মুখগুঁজে পড়ে থাকার সঙ্গে তুলনীয়। সরকারের উচিত হবে বর্তমানে দেশে নতুন দরিদ্রের সংখ্যা ও দারিদ্র্যের হার সম্পর্কিত তথ্য যত দ্রুত সম্ভব প্রকাশের ব্যবস্থা করা। এতে দেশে দরিদ্রের সংখ্যা ও দারিদ্র্যের হার নিয়ে সৃষ্ট ধোঁয়াশার অবসান হতে পারে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

স্বদেশ ভাবনা

দেশে নতুন দরিদ্রের সংখ্যা আসলে কত?

 আবদুল লতিফ মন্ডল 
১৮ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে দেশের মানুষের আয় হ্রাস পাওয়ায় বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর জরিপে উঠে আসা নতুন দরিদ্রের হিসাব প্রত্যাখ্যান করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

৯ জুন ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকরা আড়াই কোটির মতো মানুষ নতুন দরিদ্র হয়েছে বলে বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদনের বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নতুন দরিদ্রের এ হিসাব আমি স্বীকার করি না।

যাদের কাছে তালিকা আছে ২ কোটি বা ১ কোটি বা ১০ জন, এ তথ্য তারা কোথায় পেয়েছে, আগে তা জানা দরকার। গবেষণার জন্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) আছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে যতদিন তথ্য পাওয়া না যাবে, ততদিন অন্য প্রতিষ্ঠানের তথ্য গ্রহণ করার সুযোগ নেই।’

২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। ভাইরাসের সংক্রমণের হার বাড়তে থাকলে তা রোধে সরকার ওই মাসের ২৬ তারিখ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। এতে দেশ লকডাউনের মতো অবস্থায় চলে আসে। কৃষি খাতে শস্য উৎপাদন, সংগ্রহ ও বিপণন কার্যক্রম সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চালু থাকলেও অন্য প্রায় সব খাতের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। এতে চাকরিচ্যুতি, বেতন/মজুরি হ্রাস, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি কারণে অনেকের, বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের আয় কমে যাওয়ায় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা এবং দারিদ্র্যহার বেড়ে যায়।

১১ জুন ২০২০ জাতীয় সংসদে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনের আগে একাধিক বেসরকারি গবেষণা সংস্থার গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, করোনা পরিস্থিতিতে দেশে দারিদ্র্যহারে উল্লম্ফন ঘটেছে।

ওই বছর ১০ মে এক ভার্চুয়ালি সেমিনারে উপস্থাপিত বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) যৌথ গবেষণার ফলাফলে জানা যায়, করোনার কারণে দেশে নতুন করে ২২ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ গরিব হয়েছে। এতে নতুন ও পুরোনো মিলিয়ে জনসংখ্যার ৪৩ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। গরিব মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭ কোটির বেশি।

এর প্রায় এক মাস পর অর্থাৎ ৭ জুন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ভার্চুয়ালি মিডিয়া ব্রিফিং উপলক্ষ্যে প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায়, দেশে দারিদ্র্যহার ৩৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে এবং দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ৭৭ লাখের উপরে।

আর ৮ জুন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির এক সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, করোনা সংক্রমণ রোধে সরকার ঘোষিত ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটিতে ৫ কোটি ১০ লাখ নিম্নমধ্যবিত্তের মধ্যে ১ কোটি ১৯ লাখ দরিদ্র হয়েছে। গত বছর আগস্টে প্রকাশিত আইসিডিডিআর’বি এবং অস্ট্রেলিয়া ওয়াল্টার এলিজা হল ইনস্টিটিউটের যৌথ গবেষণায় বলা হয়, করোনা মহামারি ঠেকাতে সরকার ঘোষিত দুমাসের সাধারণ ছুটিতে ৯৬ শতাংশ পরিবারের গড় মাসিক উপার্জন হ্রাস পায়; ৯১ শতাংশ নিজেদের অর্থনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল মনে করে এবং ৪৭ শতাংশ পরিবারের আয় দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায়।

গত ২৩ জানুয়ারি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) আয়োজিত ‘দারিদ্র্য ও জীবিকার ওপর কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব’ শীর্ষক এক ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠানে দেশজুড়ে থানা পর্যায়ে পরিচালিত জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, করোনা মহামারির প্রভাবে দেশে সার্বিক দারিদ্র্যের হার বেড়ে ৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

চলতি বছরের ২০ এপ্রিল পিপিআরসি ও বিআইজিডির এক জরিপের ফলাফল প্রকাশ উপলক্ষ্যে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, কোভিডের আঘাতে দেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ। ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশে এ নতুন দরিদ্র শ্রেণির সংখ্যা জনসংখ্যার ১৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ হয়েছে, ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত যা ছিল ২১ দশমিক ২৪ শতাংশ। জরিপে যারা সাধারণত দারিদ্র্যসীমার উপরে বসবাস করেন কিন্তু যে কোনো অভিঘাতে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারেন, তাদের নতুন দরিদ্র হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

জরিপে আরও বলা হয়েছে, গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলে নতুন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত যেখানে শহরাঞ্চলে নতুন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ছিল ৫৯ শতাংশ, সেখানে গ্রামাঞ্চলে তা ছিল ৪৪ শতাংশ।

গত ১৩ এপ্রিল দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাংকের এক নতুন প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোভিড-১৯ বাংলাদেশের দুই দশকের দারিদ্র্য হ্রাসের নিয়মিত গতিকে উল্টোমুখী করেছে। দেশটিতে এখন ৩০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে।

করোনাকালে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্যহারে ঊর্ধ্বগতির জন্য চিহ্নিত কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- এক. জনগণের প্রধান খাদ্য চালের উৎপাদন হ্রাস ও উচ্চমূল্য।

২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনাভাইরাসের উপস্থিতি জানা যায়। ২০২০-২১ অর্থবছরের মার্চ-জুন সময়কালে করোনা মহামারি, ঘূর্ণিঝড় আম্পান, দীর্ঘ খরা, আগের মৌসুমে (২০১৮-১৯) ধানচাষিরা উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় তুলনামূলকভাবে কম জমিতে বোরোর চাষ ইত্যাদি কারণে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার (২ কোটি ৪ লাখ টন) তুলনায় ৮ লাখ টন কম বোরো চাল উৎপাদিত হয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) হিসাব অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট চাল উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ কোটি ৫৮ লাখ ৫০ হাজার টনে, প্রবৃদ্ধি হারে যা ছিল ঋণাত্মক। এদিকে চাল আমদানিতে উচ্চ শুল্ক আরোপ করায় কেবল বেসরকারি খাতে খুব স্বল্প পরিমাণ চাল আমদানি হয়। ফলে চালের দাম বাড়তে থাকে এবং তা গরিব, নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। পূর্বোক্ত আইসিডিডিআর’বি এবং অস্ট্রেলিয়া ওয়াল্টার এলিজা হল ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী, এসব পরিবারের ৭০ শতাংশ খাদ্যনিরাপত্তায় ভোগে।

সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরেও (২০২০-২১) চালের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সফল না হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইউএসডিএ’র হিসাব অনুযায়ী, উপর্যুপরি বন্যায় ২০২০-২১ অর্থবছরে আমন উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং চালের উৎপাদন দাঁড়ায় ১ কোটি ৩৩ লাখ টনে, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ লাখ টন কম।

ইউএসডিএ’র এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে গত ১৭ মে দ্য ডেইলি স্টারের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, হিটশক ও পোকার আক্রমণে দেশে চলতি বছরে বোরো চালের উৎপাদন দাঁড়াবে ১ কোটি ৯০ লাখ টনে, যা সরকারি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৫ লাখ টন এবং গত অর্থবছরের উৎপাদনের তুলনায় ৬ লাখ টন কম।

বোরো ধান কাটা পূর্ণোদ্যমে শুরুর আগ পর্যন্ত গরিব, নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তের প্রধান খাদ্য মোটা চালের দাম কেজিপ্রতি ৫০ টাকা ছুঁই ছুঁই করছিল। চালের দামের উল্লম্ফন শুধু খাদ্য নিরাপত্তায় হুমকি সৃষ্টি করে না, নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তকে গরিবদের কাতারে নিয়ে আসতেও সহায়তা করে। দুই. করোনাকালে শুধু চাকরিচুতি, বেতন/মজুরি হ্রাস ঘটেনি, শ্রমশক্তির চূড়ামণি যুবকদের, বিশেষ করে শিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থানের পথও অনেকটা রুদ্ধ হয়ে গেছে।

বেকারত্ব বৃদ্ধি দারিদ্র্য বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে, কারণ বেকারত্ব ও দারিদ্র্য একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। তিন. সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দারিদ্র্য হ্রাসে একটি স্বীকৃত পন্থা। এটি ঠিক, এ কর্মসূচির আওতায় ক্রমান্বয়ে কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটছে এবং অর্থ বরাদ্দ বাড়ছে।

সমস্যা হলো, যে হারে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে, সে হারে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে না। উপকারভোগীদের মাথাপিছু বরাদ্দকৃত অর্থ তাদের জীবন ধারণের ন্যূনতম উপকরণের চাহিদা মেটাতে সমর্থ না হওয়ায় তারা ‘দারিদ্র্য চক্র’ থেকে বের হতে পারছেন না।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সহায়তায় তারা কোনো রকমে বেঁচে থাকছেন। জীবন মানের উন্নতি না হওয়ায় তাদের শ্রেণিগত পরিবর্তন হচ্ছে না। অর্থাৎ তারা দরিদ্র্রই থেকে যাচ্ছেন। ফলে দারিদ্র্যহার হ্রাসে তাদের কোনো ভূমিকা থাকছে না।

বিবিএসের সর্বশেষ ২০১৬ সালের হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভেতে (হায়েস) দেশে দারিদ্র্যহার ২৪ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট বক্ততায় অর্থমন্ত্রী ২০১৮ সালে দেশে দারিদ্র্যহার ২১ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে বলে জানান। অর্থমন্ত্রী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট বক্ততায় দেশে বিদ্যমান দারিদ্র্যহার নিয়ে কোনো বক্তব্য রাখেননি, যদিও তিনি বলেছেন, ‘সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে আগামী ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ১২.৩ শতাংশে এবং অতি দারিদ্র্যের হার ৪.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা।’

বিবিএস করোনা মহামারির সময়কালসহ কয়েক বছর ধরে ‘হায়েস’ প্রকাশ না করায় জনগণ বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর জরিপে উঠে আসা নতুন দরিদ্র সংখ্যা ও উচ্চ দারিদ্র্যহারে বিশ্বাস স্থাপন করতে শুরু করেছে।

বিবিএসের সার্ভের অবর্তমানে নতুন দরিদ্র সংখ্যা এবং দারিদ্র্যহার নিয়ে পরিচালিত বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যকে অর্থমন্ত্রীর প্রত্যাখ্যান অনেকটা উটপাখির মতো বালিতে মুখগুঁজে পড়ে থাকার সঙ্গে তুলনীয়। সরকারের উচিত হবে বর্তমানে দেশে নতুন দরিদ্রের সংখ্যা ও দারিদ্র্যের হার সম্পর্কিত তথ্য যত দ্রুত সম্ভব প্রকাশের ব্যবস্থা করা। এতে দেশে দরিদ্রের সংখ্যা ও দারিদ্র্যের হার নিয়ে সৃষ্ট ধোঁয়াশার অবসান হতে পারে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন