বরাদ্দই প্রমাণ করে সরকারের আকার বাড়ছে
jugantor
নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি
বরাদ্দই প্রমাণ করে সরকারের আকার বাড়ছে

  ড. আর এম দেবনাথ  

১৯ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

একটা কথা আমরা প্রায় সাবই ভুলেই গেছি। ভুলেই গেছি, সরকারের আকার ছোট হয়ে আসার কথা, যেমন ছোট হয়ে এসেছে আমাদের পৃথিবী। সরকারের আকার ছোট হলে সরকার পরিচালনার ব্যয়ও কমার কথা। কেন ও কীভাবে এ কথা বলছি। বলছি গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের কথা স্মরণ করে। ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের পর সবকিছু চলে যায় সরকারের হাতে।

বড় বড় কারখানা-মিল, আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা, ব্যাংক-বিমাসহ সবকিছু জাতীয়করণের ফলে সরকারই হয় এসবের মালিক। তখন প্রধান খাত রাষ্ট্রীয় খাত, ছোট একটি খাত বেসরকারি খাত। অবশ্যই ছিল সমবায় খাত। তিন খাতের সমন্বয়ে আমাদের অর্থনীতি-ব্যবসার যাত্রা শুরু। এটাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের কথা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা, সমাজতন্ত্র ও সুবিচারের কথা।

স্বাধীনতা-উত্তরকালে কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না এর বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার। শত হোক রক্ত দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতা, গরিব-দুঃখী বাঙালির রক্তে কেনা স্বাধীনতা। এ প্রেক্ষাপটে বেসরকারি খাত ছিল নামেমাত্র একটি খাত।

না, এ চেতনা, ধারণা, বিশ্বাস আমরা ধরে রাখতে পারিনি। স্বাধীনতার মাত্র এক দশকের মধ্যে জাতীয়করণ, সরকারিকরণ পড়ে যায় তীব্র সমালোচনার মুখে। দেশে জারি হয় সামরিক শাসন। বিরাট ও গভীর রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে আবার যাত্রা শুরু বেসরকারি খাতের। রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য বেসরকারি খাতের হাতে আবার তুলে দেওয়া হয়। ব্যাংক-বিমা-আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বড় বড় শিল্পে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয় বেসরকারি খাতকে। অনিয়ম, স্বেচ্ছাচার, দুর্নীতি, চরম অদক্ষতার অভিযোগে সরকারি খাত পেছনে পড়ে যায়।

বলা হয়, সরকারি খাত ও সরকারের আকার ছোট হবে। সরকার ব্যবসা-শিল্প করবে না। সরকার করবে অবকাঠামো নির্মাণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কিছু জরুরি কাজ। এর স্থলে আসবে বেসরকারি খাত। একে তুলে ধরা হয় দক্ষ, স্বচ্ছ একটা খাত হিসাবে। বলা হয়, বেসরকারি খাত যতই বড় হবে, ততই সরকারি খাত ও সরকারের আকার ছোট হবে। কারণ সরকারের কাজ অনেকটাই কমে যাবে। এতে সরকারের পরিচালন কমবে। মানুষের ওপর বোঝা হ্রাস পাবে। মানুষকে কর দিতে হবে কম। বেসরকারি খাত হবে উন্নয়নের চাবিকাঠি, যার কথা এবার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল তার বাজেটের পাতায় পাতায় নানাভাবে বলেছেন। এমনিতেও বলেছেন, বেসরকারি খাত থাকবে ‘ড্রাইভিং সিটে’। আসলে আছেও তাই।

২০২১-২২ অর্থবছর শুরু হবে কয়েকদিনের মধ্যেই। বেসরকারি খাতই এখন প্রধান খাত। এর একটা বড় প্রমাণ ব্যাংকিং খাতের মোট আমানতের ৯০ শতাংশের মালিকই এখন বেসরকারি খাত, যা ছিল ঠিক উল্টো আজ থেকে ৩০-৪০ বছর আগে। এখন যোগাযোগ, পরিবহণ, আইটি ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ঘটছে দ্রুততার সঙ্গে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সব উপজেলা কেন, সব ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে মুহূর্তে মুহূর্তে কথা বলতে পারেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সামাজিক ও আর্থিক পরিস্থিতি এবং উন্নয়নের পাই পাই হিসাব তিনি নিতে পারেন। অনুমান করি তিনি তার মেধা ও দক্ষতা দিয়ে তা করছেনও। এখন কম্পিউটার করে দিচ্ছে সবকিছু। মুহূর্তের মধ্যে সব হয়ে যাচ্ছে।

তাই প্রশ্ন : সরকারের আকার বাড়ছে কেন? সরকারের পরিচালন ব্যয় বাড়ছে কেন? সরকারের আকার যেখানে ছোট হওয়ার কথা বলে আমরা বেসরকারি খাতকে বেছে নিলাম, বেছে নিলাম বাজার অর্থনীতি, বিশ্বায়ন, উদারীকরণ ইত্যাদি; সেখানে আজ উল্টোটি হচ্ছে কেন? কেন এর বোঝা সাধারণ মানুষকে বহন করতে হবে। বিশাল আকারের সরকার রক্ষণাবেক্ষণ করতে গিয়ে কেন প্রতি বছর সরকার আয়কর, ভ্যাট, আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক বাড়িয়ে চলেছে? এটা কি উন্নয়নের টাকার জন্য? তাহলেও না হয় কিছুটা মানা যেত। না, উন্নয়নের জন্য নয়।

উন্নয়নের টাকা আসে ঋণ করা টাকা থেকে। দেশের ভেতরের ঋণ, দেশের বাইরের ঋণ, যার বোঝা আবার বহন করতে হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। এ সবের অর্থ কি বোঝা যায়? কেন এটি ঘটছে? আমাদের অবহেলার কারণে? আমাদের দূরদর্শিতার অভাবে? বিষয়টি আমার কাছে বোধগম্য নয়। এ যুগে, ইনফরমেশন টেকনোলজির (আইটি) যুগে কেন সরকারের আকার দিনের পর দিন বেড়ে চলেছে- এ প্রশ্নের জবাব কী?

কীভাবে বোঝা যাচ্ছে সরকারের আকার বাড়ছে, সরকারের পরিচালন ব্যয় বাড়ছে? এর প্রধান সাক্ষ্য সরকারের বাজেট। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট থেকে দেখা যাচ্ছে, ওই বছর সরকারের পরিচালন আবর্তক ব্যয় হবে ৩ লাখ ২৮ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। জিডিপির শতাংশ হিসাবে এর পরিমাণ হচ্ছে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ। এদিকে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সরকারের পরিচালন আবর্তক ব্যয় ছিল ১ লাখ ৬৪ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা।

এ ক্ষেত্রে জিডিপির হিসাবে তা হয় ৮ দশমিক ৪ শতাংশ। টাকার অঙ্কে আবর্তক ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। শুধু এ সূচক নয়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যার নিরিখেও বোঝা যায় সরকারের আকার বড় হচ্ছে। ফলে রাজস্ব বাজেট বড় হচ্ছে, মোট বাজেটের পরিমাণ বাড়ছে, উন্নয়ন বাজেটের আকার বাড়ছে; কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে ঋণ।

এই গেল পর্যালোচনার একদিক। অন্যদিক হচ্ছে রাজস্ব বাজেটের খাতওয়ারি আলোচনা। খাতওয়ারি আলোচনায় গেলে পরিষ্কার বোঝা যায় সরকারি রাজস্ব ব্যয়ের একটা বড় অংশই যাচ্ছে কর্মচারী-কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বাবদ। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে অনুন্নয়ন বাজেটের একটা অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ দেওয়া আছে। তা থেকে দেখা যায়, মোট অনুন্নয়ন বা রাজস্ব বাজেটের ১৯ শতাংশই ব্যয় হবে বেতন ও ভাতা বাবদ। সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের শুধু বেতন ও ভাতা দিলেই চলে না। অবসরগ্রহণের পর তাদের আজীবন দিতে হয় পেনশন। এটা তাদের প্রাপ্য, যদিও তা ‘সামাজিক সুরক্ষা বা নিরাপত্তা’ খাতে দয়া-দাক্ষিণ্য বা অনুদান হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়।

তাই নয় শুধু, কর্মচারী-কর্মকর্তা প্রয়াত হলে তার ছেলেমেয়ে বা স্ত্রীরা এ পেনশন সুবিধা ভোগ করেন। অতএব, পেনশনের টাকাও বেতন-ভাতার টাকার সঙ্গে যোগ করতে হয় বিচারের খাতিরে। সরকারি অনুন্নয়ন বাজেটের ৭ দশমিক ৭ শতাংশই ব্যয় হয় পেনশন বাবদ। তাহলে বেতন-ভাতা ও পেনশন বাবদ মোট খরচ হচ্ছে রাজস্ব বাজেটের ২৬ দশমিক ৭ শতাংশ টাকা। এর সঙ্গে যদি প্রতিবছর ব্যয়িত সুদের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ টাকা যোগ করা হয়, তাহলে তিন খাতেই সরকারের চলে যাচ্ছে ৪৫ দশমিক ২ শতাংশ টাকা। এভাবে অঙ্কের হিসাবে গেলে পাঠকদের যাতনা করা হবে। পরিসংখ্যানে না গিয়েই বলা যায়, সরকারের আকার বাড়ছে, সরকারের ব্যয় বাড়ছে বেতন-ভাতা, পেনশন ও সুদ খরচ বাবদ।

সাধারণভাবে বলা যায়, দেশবাসীর সবাই চায় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী-কর্মকর্তারা সুখে-শান্তিতে থাকুক, আরাম-আয়েশে থাকুক। তাদের যাতে দৈনন্দিন খাওয়া-পরায় বিঘ্ন না ঘটে। এটা যেমন সবাই চায়, তেমনি তাদের সঙ্গে তুলনা করতে হবে বেসরকারি খাতের কর্মকর্তা ও কর্মকর্তাদের জীবনযাপনের। এ ক্ষেত্রে বড় রকমের বৈষম্য সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। এর চেয়ে বড় কথা, সরকার তার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, পেনশন যত খুশি দিক। এখানেই ক্ষমতার প্রশ্ন। সরকারের সামর্থ্যরে প্রশ্ন।

সরকারের যথেষ্ট রাজস্ব আয় থাকলে, রাজস্ব আয় দিন দিন আশানুরূপ বাড়তে থাকলে বেতন-ভাতা বাড়তে আপত্তি কোথায়? কিন্তু কোথাও না কোথাও দেখা যাচ্ছে সরকারের সামর্থ্য সীমিত। সরকার ইচ্ছা করলেই তার খরচ বাড়াতে পারে না। ইচ্ছা করলেই যাচ্ছেতাইভাবে খরচ করতে পারে না। করতে হলে তার পূর্বশর্ত আছে। পূর্বশর্ত হচ্ছে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি। রাজস্ব আয় বৃদ্ধির পথ হচ্ছে আয়কর, ভ্যাট, আমদানি ও রপ্তানি শুল্ক এবং সম্পূরক শুল্কসহ আরও নানা ধরনের কর ও চার্জ, ফি ইত্যাদি। আয়কর মানুষ দিতে চায়, কিন্তু নানা ঝামেলার কারণে ওদিকে যেতে চায় না।

এদিকে অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তি আয়কর দিতে অনাগ্রহী। ব্যবসায়ীরা নিতে চান, সরকারকে কিছু দিতে চান না। তা হতে পারত যদি তারা সমাজের জন্য উল্লেখযোগ্য কিছু করতেন। সেদিন দেখলাম প্রতিবেশী দেশের ‘টাটা’ গ্রুপ তিনটি কাজ করেছে। করোনাকালে কর্মচারীদের সুবিধা বাড়িয়েছে, যাতে তারা ‘সেইফটি’র আশ্রয় নিতে পারে। কয়েক হাজার কোটি টাকা করোনা মোকাবিলায় খরচ করেছে।

সর্বশেষ বলেছে, কোনো কর্মচারী করোনায় প্রয়াত হলে তিনি যতদিন চাকরি করতে পারতেন (জীবিত থাকলে) ততদিন তার পরিবার বেতন-ভাতা সব পাবে। তারপর অবসরকালীন সব সুবিধাও পাবে। টাটার যা যা সুবিধা আছে যেমন শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা ইত্যাদিও তারা পাবে। ভাবা যায় এমন উদারতার কথা! আমাদের ‘বিগ বিজনেস’ যদি এমন করত তাহলে আমরাই বলতাম, তোমরা কর কম দিতে পার। না, তা হওয়ার নয়। এদিকে ‘ভ্যাটে’ জোর আপত্তি, যদিও ভ্যাটের টাকা ভোক্তারাই শেষ পর্যন্ত বহন করে। আমদানি শুল্কে বিরাট ফাঁকি।

এভাবে দেখলে বোঝা যাবে, সরকার রাজস্ব আদায়ে আশানুরূপ অগ্রগতি দেখাতে পারছে না। কিন্তু রাজস্ব ব্যয় বেড়েই চলেছে। তাহলে উপায়? উপায় উন্নয়নের জন্য ধার করে যাওয়া। কারণ রাজস্ব আয় আর রাজস্ব ব্যয়ের ফারাক খুবই কম। অতএব, সরকারকে বাধ্য হয়ে উন্নয়নের জন্য ঋণ করতে হচ্ছে। অথচ অহেতুক সমগ্র বাজেটের আকার দিন দিন স্ফীত হচ্ছে। দৈনন্দিন খরচেই চলে যাচ্ছে সব টাকা।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

rmdebnath@yahoo.com

নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি

বরাদ্দই প্রমাণ করে সরকারের আকার বাড়ছে

 ড. আর এম দেবনাথ 
১৯ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

একটা কথা আমরা প্রায় সাবই ভুলেই গেছি। ভুলেই গেছি, সরকারের আকার ছোট হয়ে আসার কথা, যেমন ছোট হয়ে এসেছে আমাদের পৃথিবী। সরকারের আকার ছোট হলে সরকার পরিচালনার ব্যয়ও কমার কথা। কেন ও কীভাবে এ কথা বলছি। বলছি গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের কথা স্মরণ করে। ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের পর সবকিছু চলে যায় সরকারের হাতে।

বড় বড় কারখানা-মিল, আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা, ব্যাংক-বিমাসহ সবকিছু জাতীয়করণের ফলে সরকারই হয় এসবের মালিক। তখন প্রধান খাত রাষ্ট্রীয় খাত, ছোট একটি খাত বেসরকারি খাত। অবশ্যই ছিল সমবায় খাত। তিন খাতের সমন্বয়ে আমাদের অর্থনীতি-ব্যবসার যাত্রা শুরু। এটাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের কথা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা, সমাজতন্ত্র ও সুবিচারের কথা।

স্বাধীনতা-উত্তরকালে কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না এর বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার। শত হোক রক্ত দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতা, গরিব-দুঃখী বাঙালির রক্তে কেনা স্বাধীনতা। এ প্রেক্ষাপটে বেসরকারি খাত ছিল নামেমাত্র একটি খাত।

না, এ চেতনা, ধারণা, বিশ্বাস আমরা ধরে রাখতে পারিনি। স্বাধীনতার মাত্র এক দশকের মধ্যে জাতীয়করণ, সরকারিকরণ পড়ে যায় তীব্র সমালোচনার মুখে। দেশে জারি হয় সামরিক শাসন। বিরাট ও গভীর রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে আবার যাত্রা শুরু বেসরকারি খাতের। রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য বেসরকারি খাতের হাতে আবার তুলে দেওয়া হয়। ব্যাংক-বিমা-আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বড় বড় শিল্পে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয় বেসরকারি খাতকে। অনিয়ম, স্বেচ্ছাচার, দুর্নীতি, চরম অদক্ষতার অভিযোগে সরকারি খাত পেছনে পড়ে যায়।

বলা হয়, সরকারি খাত ও সরকারের আকার ছোট হবে। সরকার ব্যবসা-শিল্প করবে না। সরকার করবে অবকাঠামো নির্মাণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কিছু জরুরি কাজ। এর স্থলে আসবে বেসরকারি খাত। একে তুলে ধরা হয় দক্ষ, স্বচ্ছ একটা খাত হিসাবে। বলা হয়, বেসরকারি খাত যতই বড় হবে, ততই সরকারি খাত ও সরকারের আকার ছোট হবে। কারণ সরকারের কাজ অনেকটাই কমে যাবে। এতে সরকারের পরিচালন কমবে। মানুষের ওপর বোঝা হ্রাস পাবে। মানুষকে কর দিতে হবে কম। বেসরকারি খাত হবে উন্নয়নের চাবিকাঠি, যার কথা এবার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল তার বাজেটের পাতায় পাতায় নানাভাবে বলেছেন। এমনিতেও বলেছেন, বেসরকারি খাত থাকবে ‘ড্রাইভিং সিটে’। আসলে আছেও তাই।

২০২১-২২ অর্থবছর শুরু হবে কয়েকদিনের মধ্যেই। বেসরকারি খাতই এখন প্রধান খাত। এর একটা বড় প্রমাণ ব্যাংকিং খাতের মোট আমানতের ৯০ শতাংশের মালিকই এখন বেসরকারি খাত, যা ছিল ঠিক উল্টো আজ থেকে ৩০-৪০ বছর আগে। এখন যোগাযোগ, পরিবহণ, আইটি ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ঘটছে দ্রুততার সঙ্গে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সব উপজেলা কেন, সব ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে মুহূর্তে মুহূর্তে কথা বলতে পারেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সামাজিক ও আর্থিক পরিস্থিতি এবং উন্নয়নের পাই পাই হিসাব তিনি নিতে পারেন। অনুমান করি তিনি তার মেধা ও দক্ষতা দিয়ে তা করছেনও। এখন কম্পিউটার করে দিচ্ছে সবকিছু। মুহূর্তের মধ্যে সব হয়ে যাচ্ছে।

তাই প্রশ্ন : সরকারের আকার বাড়ছে কেন? সরকারের পরিচালন ব্যয় বাড়ছে কেন? সরকারের আকার যেখানে ছোট হওয়ার কথা বলে আমরা বেসরকারি খাতকে বেছে নিলাম, বেছে নিলাম বাজার অর্থনীতি, বিশ্বায়ন, উদারীকরণ ইত্যাদি; সেখানে আজ উল্টোটি হচ্ছে কেন? কেন এর বোঝা সাধারণ মানুষকে বহন করতে হবে। বিশাল আকারের সরকার রক্ষণাবেক্ষণ করতে গিয়ে কেন প্রতি বছর সরকার আয়কর, ভ্যাট, আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক বাড়িয়ে চলেছে? এটা কি উন্নয়নের টাকার জন্য? তাহলেও না হয় কিছুটা মানা যেত। না, উন্নয়নের জন্য নয়।

উন্নয়নের টাকা আসে ঋণ করা টাকা থেকে। দেশের ভেতরের ঋণ, দেশের বাইরের ঋণ, যার বোঝা আবার বহন করতে হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। এ সবের অর্থ কি বোঝা যায়? কেন এটি ঘটছে? আমাদের অবহেলার কারণে? আমাদের দূরদর্শিতার অভাবে? বিষয়টি আমার কাছে বোধগম্য নয়। এ যুগে, ইনফরমেশন টেকনোলজির (আইটি) যুগে কেন সরকারের আকার দিনের পর দিন বেড়ে চলেছে- এ প্রশ্নের জবাব কী?

কীভাবে বোঝা যাচ্ছে সরকারের আকার বাড়ছে, সরকারের পরিচালন ব্যয় বাড়ছে? এর প্রধান সাক্ষ্য সরকারের বাজেট। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট থেকে দেখা যাচ্ছে, ওই বছর সরকারের পরিচালন আবর্তক ব্যয় হবে ৩ লাখ ২৮ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। জিডিপির শতাংশ হিসাবে এর পরিমাণ হচ্ছে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ। এদিকে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সরকারের পরিচালন আবর্তক ব্যয় ছিল ১ লাখ ৬৪ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা।

এ ক্ষেত্রে জিডিপির হিসাবে তা হয় ৮ দশমিক ৪ শতাংশ। টাকার অঙ্কে আবর্তক ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। শুধু এ সূচক নয়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যার নিরিখেও বোঝা যায় সরকারের আকার বড় হচ্ছে। ফলে রাজস্ব বাজেট বড় হচ্ছে, মোট বাজেটের পরিমাণ বাড়ছে, উন্নয়ন বাজেটের আকার বাড়ছে; কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে ঋণ।

এই গেল পর্যালোচনার একদিক। অন্যদিক হচ্ছে রাজস্ব বাজেটের খাতওয়ারি আলোচনা। খাতওয়ারি আলোচনায় গেলে পরিষ্কার বোঝা যায় সরকারি রাজস্ব ব্যয়ের একটা বড় অংশই যাচ্ছে কর্মচারী-কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বাবদ। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে অনুন্নয়ন বাজেটের একটা অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ দেওয়া আছে। তা থেকে দেখা যায়, মোট অনুন্নয়ন বা রাজস্ব বাজেটের ১৯ শতাংশই ব্যয় হবে বেতন ও ভাতা বাবদ। সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের শুধু বেতন ও ভাতা দিলেই চলে না। অবসরগ্রহণের পর তাদের আজীবন দিতে হয় পেনশন। এটা তাদের প্রাপ্য, যদিও তা ‘সামাজিক সুরক্ষা বা নিরাপত্তা’ খাতে দয়া-দাক্ষিণ্য বা অনুদান হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়।

তাই নয় শুধু, কর্মচারী-কর্মকর্তা প্রয়াত হলে তার ছেলেমেয়ে বা স্ত্রীরা এ পেনশন সুবিধা ভোগ করেন। অতএব, পেনশনের টাকাও বেতন-ভাতার টাকার সঙ্গে যোগ করতে হয় বিচারের খাতিরে। সরকারি অনুন্নয়ন বাজেটের ৭ দশমিক ৭ শতাংশই ব্যয় হয় পেনশন বাবদ। তাহলে বেতন-ভাতা ও পেনশন বাবদ মোট খরচ হচ্ছে রাজস্ব বাজেটের ২৬ দশমিক ৭ শতাংশ টাকা। এর সঙ্গে যদি প্রতিবছর ব্যয়িত সুদের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ টাকা যোগ করা হয়, তাহলে তিন খাতেই সরকারের চলে যাচ্ছে ৪৫ দশমিক ২ শতাংশ টাকা। এভাবে অঙ্কের হিসাবে গেলে পাঠকদের যাতনা করা হবে। পরিসংখ্যানে না গিয়েই বলা যায়, সরকারের আকার বাড়ছে, সরকারের ব্যয় বাড়ছে বেতন-ভাতা, পেনশন ও সুদ খরচ বাবদ।

সাধারণভাবে বলা যায়, দেশবাসীর সবাই চায় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী-কর্মকর্তারা সুখে-শান্তিতে থাকুক, আরাম-আয়েশে থাকুক। তাদের যাতে দৈনন্দিন খাওয়া-পরায় বিঘ্ন না ঘটে। এটা যেমন সবাই চায়, তেমনি তাদের সঙ্গে তুলনা করতে হবে বেসরকারি খাতের কর্মকর্তা ও কর্মকর্তাদের জীবনযাপনের। এ ক্ষেত্রে বড় রকমের বৈষম্য সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। এর চেয়ে বড় কথা, সরকার তার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, পেনশন যত খুশি দিক। এখানেই ক্ষমতার প্রশ্ন। সরকারের সামর্থ্যরে প্রশ্ন।

সরকারের যথেষ্ট রাজস্ব আয় থাকলে, রাজস্ব আয় দিন দিন আশানুরূপ বাড়তে থাকলে বেতন-ভাতা বাড়তে আপত্তি কোথায়? কিন্তু কোথাও না কোথাও দেখা যাচ্ছে সরকারের সামর্থ্য সীমিত। সরকার ইচ্ছা করলেই তার খরচ বাড়াতে পারে না। ইচ্ছা করলেই যাচ্ছেতাইভাবে খরচ করতে পারে না। করতে হলে তার পূর্বশর্ত আছে। পূর্বশর্ত হচ্ছে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি। রাজস্ব আয় বৃদ্ধির পথ হচ্ছে আয়কর, ভ্যাট, আমদানি ও রপ্তানি শুল্ক এবং সম্পূরক শুল্কসহ আরও নানা ধরনের কর ও চার্জ, ফি ইত্যাদি। আয়কর মানুষ দিতে চায়, কিন্তু নানা ঝামেলার কারণে ওদিকে যেতে চায় না।

এদিকে অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তি আয়কর দিতে অনাগ্রহী। ব্যবসায়ীরা নিতে চান, সরকারকে কিছু দিতে চান না। তা হতে পারত যদি তারা সমাজের জন্য উল্লেখযোগ্য কিছু করতেন। সেদিন দেখলাম প্রতিবেশী দেশের ‘টাটা’ গ্রুপ তিনটি কাজ করেছে। করোনাকালে কর্মচারীদের সুবিধা বাড়িয়েছে, যাতে তারা ‘সেইফটি’র আশ্রয় নিতে পারে। কয়েক হাজার কোটি টাকা করোনা মোকাবিলায় খরচ করেছে।

সর্বশেষ বলেছে, কোনো কর্মচারী করোনায় প্রয়াত হলে তিনি যতদিন চাকরি করতে পারতেন (জীবিত থাকলে) ততদিন তার পরিবার বেতন-ভাতা সব পাবে। তারপর অবসরকালীন সব সুবিধাও পাবে। টাটার যা যা সুবিধা আছে যেমন শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা ইত্যাদিও তারা পাবে। ভাবা যায় এমন উদারতার কথা! আমাদের ‘বিগ বিজনেস’ যদি এমন করত তাহলে আমরাই বলতাম, তোমরা কর কম দিতে পার। না, তা হওয়ার নয়। এদিকে ‘ভ্যাটে’ জোর আপত্তি, যদিও ভ্যাটের টাকা ভোক্তারাই শেষ পর্যন্ত বহন করে। আমদানি শুল্কে বিরাট ফাঁকি।

এভাবে দেখলে বোঝা যাবে, সরকার রাজস্ব আদায়ে আশানুরূপ অগ্রগতি দেখাতে পারছে না। কিন্তু রাজস্ব ব্যয় বেড়েই চলেছে। তাহলে উপায়? উপায় উন্নয়নের জন্য ধার করে যাওয়া। কারণ রাজস্ব আয় আর রাজস্ব ব্যয়ের ফারাক খুবই কম। অতএব, সরকারকে বাধ্য হয়ে উন্নয়নের জন্য ঋণ করতে হচ্ছে। অথচ অহেতুক সমগ্র বাজেটের আকার দিন দিন স্ফীত হচ্ছে। দৈনন্দিন খরচেই চলে যাচ্ছে সব টাকা।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

rmdebnath@yahoo.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন